Thursday, May 23, 2024

 স্যালুট 

শৌভিক রায় 

ট্র্যাফিক পুলিশ আমাকে স্যালুট ঠুকছে! একি কাণ্ড! ঠিক বুঝতে পারছি না কী করব। বোকা বোকা হাসলাম। 
ততক্ষণে লোকটি গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ ঢুকিয়ে গদগদ মুখে বলছে,
- কাভানামাকেই ইরুনকাই সা। উনকালেই শান্তিত্তাতিল মিক্কা মাগেচেই।  

পুরোটাই উড়ে গেল মাথার ওপর দিয়ে। আমার মাথায় চুল নেই বলে সেই ওড়াটাও সম্ভবত নর্মাল স্পিডের চাইতে আরও একটু দ্রুত হল। 
আবার বোকার মতো হাসলাম। সঙ্গে সঙ্গে আবার ঠকাত করে স্যালুট। খারাপ কিছু হচ্ছে না বুঝে, মুখটা গম্ভীর করে মাথাটা নাড়লাম। কানে এলো, 
- ভেলুর পকুমপতে শান্তিপম সা ডক্টর 

কোনও এক্সপ্রেশন দেওয়ার আগেই শিবা গাড়ি চালিয়ে দিল। 
ততক্ষণে টোল গেটের স্পিড ব্রেকার সরে গেছে। শিবার ফাইভ গিয়ার অ্যাম্বাসডর সাঁ করে এগিয়ে গেল। 
সামনেই সাইনবোর্ড, `ওয়েলকাম টু তামিলনাড়ু`।   
 
ভেলোর থেকে বেরিয়েছিলাম দিন সাতেক আগে। শিবাকে নিয়ে। সেই সময় ভেলোর আমার দ্বিতীয় বাড়ি। বছরে একবার তো বটেই, কোনও কোনও সময়ে দু`বারও যেতে হয়। ভেলোর না গেলে বাঙালি হওয়া যায় না তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ আমি। খ্রীষ্টান মিশনারি কলেজ এন্ড হসপিটালের উল্টো দিকের গান্ধি রোডের ডন বেকারির মালিক থেকে শুরু করে আপ্পাজি, ভেলমুরুগান এরকম বেশ কিছু স্থানীয় মানুষের বন্ধু হয়ে গেছি। শিবা আমার ড্রাইভার। ওর নিজের গাড়ি আছে। হসপিটালে দেখানোর ফাঁকে ফাঁকে ওকে নিয়ে এদিক ওদিক চলে যাই। সেবার একটু সময় নিয়ে গিয়েছিলাম উটি-মুদুমালাই-বন্দিপুর-মাইশোর-শ্রাবনবেলগোলা-হ্যালোবিদু-বেলুড়-ব্যাঙ্গালোর। 

ব্যাঙ্গালোর থেকে ফেরার সময় শিবা সদ্য হওয়া ফোর যেন ধরল না। ওল্ড মাদ্রাজ রোড ধরে চলল। মাঝে থামলো কোলারে। খানিকক্ষণ আমাদের বসিয়ে রেখে নিজে ভ্যানিশ। ওদিকে কোলারে এসে আমি উত্তেজিত। খনি খুঁজছি শুধু। জন্মানো ইস্তক পড়ে এসেছি কোলার স্বর্ণখনি।  

খনি টনি অবশ্য কিছু দেখলাম না। তবে দূরে মাটির ঢিবি দেখে নিজেই ভেবে নিলাম ওগুলোই হবে। তখন কোথায় আর কেজিএফ পার্ট ওয়ান পার্ট টু! বীরাপ্পন কিছুদিন আগে কন্নড় ছবির সুপারস্টার রাজকুমারকে পণবন্দি করেছিল। তারই রেশ রয়ে গেছে। 

ফিরে এসে শিবা জানালো বোনের সঙ্গে দেখা করে এলো। জল দেওয়া ভাত খেয়ে এলো। চেঁচামেচি করলাম। আমাদের ফেলে খেয়ে এসেছে বলে। প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে ওকে। 

করল সেটা শিবা। কোটিলিঙ্গেশ্বরম মন্দির দেখিয়ে। ছোট-মাঝারি-বড়-দৈত্যাকার এত সংখ্যক শিবলিঙ্গ আমার ঊর্ধতন চতুর্দশ পুরুষ পর্যন্ত কেউ দেখেনি সেটা গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি। ভালই লাগল। নতুন জায়গা দেখা সবসময়ের নেশা। শিবা সেটা খুব ভালভাবে জানে। সুতরাং আমাকে ম্যানেজ করতে ওর বেশি সময় লাগে না.... 

ইতিমধ্যে কর্ণাটক ছেড়ে তামিলনাড়ুতে ঢুকেছি। ভেলোর খুব বেশি দূরে নয়। কিন্তু এই কেসটা কী হল? ট্রাফিক পুলিশ আমাকে দেখে আজ অবধি চালান কাটা ছাড়া কিছু করেনি, হঠাৎ স্যালুট দিতে গেল কেন? আর নিজের ভাষায় বললটা কী? চেপে ধরলাম শিবাকে। এবার শুরু হল ওর স্বীকারোক্তি। আমারই মতো মারাত্মক হিন্দিতে,
- আপকো স্যালুট কিয়া না?
- হাঁ....কিয়া। তো?
- আপ খুশ নেহি হুঁয়ে!
- আরে স্যালুট করলে কে না খুশ হুয়ে, এ তো আবার পুলিশ হ্যায়...
- ওহি তো। 
- আরে ধুত্তোর তোমার ওহি তো। কেসটা কও তো। 
- জি?
- আরে কেস কী? স্যালুট কিঁউ কিয়া ও পুলিশওয়ালা?
- ডক্টর কো তো করতে হ্যায় সবলোগ 
- কোন ডক্টর?
- আপ
- আমি! ম্যায়!
- বিলকুল আপ 
- পাগল নাকি! 
- নেহি নেহি শুনিয়ে। কেয়া হ্যায়, ও যো ফোর লেন হ্যায়, উধার যানে সে টোল ট্যাক্স জাদা হ্যায়। ওল্ড মাদ্রাজ রোড মে এক হি টোল হ্যায়। বর্ডার মে। তো ম্যায়নে ট্রাফিক কো বতায়া আপ সিএমসি কে ডক্টর হ্যায়। ট্যাক্স নেহি লিয়া। ছোড় দিয়া আয়সেই!
- ডক্টর!! ম্যায়!!
- লাগতে হো না দাদা। বাল নেহি হ্যায় না আপকা। ডক্টর কি তারহা দেখতে হো না!

বোমকে গেলাম। এ বলে কী! একবারে ডাক্তার বানিয়ে ছেড়েছে! তাও ভেলোর সিএমসির! এবার সত্যিই কেস না খাই। রিয়ার ভিউয়ে দুশ্চিন্তায় ভরা আমার মুখ দেখে শিবা অভয় দিল,
- ডড়িয়ে মত দাদা। ও পুলিশ বোলা না আপ কো দেখ কে খুশ হুয়া। ভেলোর আনে সে আপকে সাথ মুলাকাত ভি করেগা। 

হা হা করে হাসব নাকি রেগে অগ্নিশর্মা হব বুঝতে পারলাম না। কেমন একটা অবস্থা হল। উদাস হয়ে তাকিয়ে রইলাম বাইরে। এই তামিলনাডু, কোলার, হ্যালোবিদু, কুব্বন পার্ক, পান্তাভাত, ডাক্তার, চুল......আহা জীবন! স্যালুট, পুলিশ, বীরাপ্পন, গোঁফ, টাক মাথা....হায় জীবন....  

দুম করে মাথায় ভাবনা এলো। একটা স্টেথো কিনে গলায় ঝুলিয়ে যদি যখন খুশি হসপিটাল যাই, তাহলে সিকিউরিটিকে আটকাবে না! ডাক্তার ভেবেই ছেড়ে দেবে হয়ত। কথাটা গিন্নিকে বলব ভেবে মুখ ফেরাতেই তিনি চোখ পাকিয়ে উঠলেন,
- না।  একদম না। ওসব ভাববে না। কখনই না। 

ধুস! কিছুই বললাম না তার আগেই এত `না`! 
তার চাইতে ওই পুলিশ মানুষটিই ভাল। 
আহা স্যালুট....বাহা স্যালুট....    
   
(বোকামির এককাল)
   

No comments: