Sunday, May 12, 2024

মায়ের সঙ্গে নার্সেরাও আজ  
শৌভিক রায় 

মাতৃ দিবস! 

আলাদা করে পালন করার কী আর আছে? অনেকেই বলবেন। কিংবা বলেন। 

সত্যিই তো। মা-কে ভালবাসবার জন্য কী আলাদা কোনও দিন লাগে? সে তো বোন বা ভাইয়ের ক্ষেত্রেও সত্যি। কিন্তু তবু তো রাখি পূর্ণিমা, ভাইফোঁটা ইত্যাদি করে থাকি আমরা। কেন করি? না করলে কি ভাই-বোনের স্নেহের সম্পর্ক কমে যাবে? নিশ্চয়ই না। তবু আমাদের পরম্পরায় এসব রয়েছে। গুরু পূর্ণিমাও রয়েছে। শিক্ষক দিবসও আছে। 

সেরকমই কোনও জায়গা থেকে যদি মায়ের জন্য আলাদা করে একটা দিন রাখা যায় মন্দ কি তাতে! মা তো আমাদের অন্তরেই থাকেন। সবসময়। থাকবেনও। তবু যদি মা`কে নিয়ে একটা দিন যদি একটু কিছু আলাদা করা হয়, তাতে আমি অন্তত খারাপ কিছু দেখি না। 

আধুনিক মাতৃ দিবস শুরু হয়েছিল ১৯০৭ সালের মে মাসের ১২ তারিখে। ফিলাডেলফিয়ার আনা জারভিস ছিলেন এর স্রষ্টা। আনার মা ছিলেন দক্ষ সংগঠক। তিনি মহিলাদের বেশ কয়েকটি গ্ৰুপ করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল বন্ধুত্ব ও উন্নত স্বাস্থ্যের প্রচার। সেই মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর জন্য ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনের এক চার্চে একটি বিশেষ প্রার্থনা সভা রাখেন আনা। তিনি হয়ত নিজেও বোঝেননি, তাঁর আয়োজিত এই প্রার্থনা সভা সাধারণ মানুষকে কতটা প্রেরণা দিয়েছিল। কেননা পরবর্তী পাঁচ বছরে আমেরিকার প্রায় প্রতিটি স্টেটে মা`কে স্মরণ করে এরকম প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হতে লাগল। সাধারণ মানুষের মায়ের প্রতি এই সম্মাননা দেখে ১৯১৪ সালে তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন দিনটিকে জাতীয় ছুটির দিন ঘোষণা করলেন। 

আনা এই দিনটিতে সাদা পোশাকের প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু যে মায়েরা বেঁচে আছেন তাঁদের জন্য গোলাপি বা লাল পোশাক পরাই এখনকার রীতি। আর শুধুমাত্র নিজের মায়ের জন্য নয়, দিনটি উদযাপিত হয় মায়ের জায়গা নিয়েছেন এমন যে কোনও মহিলার জন্য। তিনি ঠাকুমা, দিদিমা, কাকিমা, পিসিমা, মাসিমা যে কেউ হতে পারেন। একদম ব্যক্তিগত স্তরে থাকা দিনটিকে আমেরিকানরা অবশ্য কার্ড, ফুল ইত্যাদি পাঠিয়ে ব্যবসায়িক রূপ দিতে দেরি করেনি। সেটাও এতটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যে, স্বয়ং আনা নিজে জীবনের শেষদিকে চেয়েছিলেন এই দিনটিকে যেন জাতীয় ছুটির মর্যাদা দেওয়া না হয়। 

ঘটনা হল, মাতৃ দিবসের ভাবনা কিন্তু আজকের নয়। ধরিত্রী মা রিয়া এবং সিবিলকে পুজোর মাধ্যমে প্রাচীনকালে গ্রিক ও রোমানরা এই দিনটির উদযাপন করতেন। উর্বরতা এবং মাতৃত্বের সেই উৎসব বসন্তকালে অনুষ্ঠিত হত। বর্ষা ঋতুতে আমাদের অম্বুবাচি পরবের সঙ্গে কোনও মিল কি পাওয়া যাচ্ছে প্রাচীন গ্রিস ও রোমের এই উৎসবের? অম্বুবাচিও তো মাতৃ পুজোর একটি বিশেষ ধারা। 

ষোলশো শতকে ইংল্যান্ডে `মাদারিং সানডে` চালু হয়। কাছের চার্চে পরিবারের সবাই একত্রিত হত। প্রার্থনার পর মায়ের হাতে ফুলে তুলে দিত শিশুরা। এই দিনটির সঙ্গে অবশ্য মাদার্স ডে-কে মেলালে চলবে না। কেননা এটি হয় লেন্টের চতুর্থ রবিবারে। প্রশ্ন হল, লেন্ট কী? লেন্ট হল চল্লিশ দিনের সেই বিশেষ দীর্ঘ সময় যখন ক্রিষ্টানরা জিশুর মৃত্যু সহ, তাঁর পুনরোজ্জীবন সহ বিভিন্ন ঘটনার কথা স্মরণ করে। `লেন্থেন` বা দীর্ঘ শব্দটি থেকে `লেন্ট` এসেছে। সম্ভবত এই আমায় থেকে দিন বড় হতে শুরু করে এবং গ্রীষ্মের দিকে এগোয় বলেই এই লেন্থেন বা লেন্ট। এই সময় ক্ষমা ও দানের কথা বলে। জীবনের গুরুত্ব বোঝায়। লেন্টের একদম শেষ পর্যায়ে আসে ইস্টার। এই বছর সেই মাদারিং ডে কিন্তু ইংল্যান্ডে মার্চের ১০ তারিখে উদযাপিত হয়েছে। 

পাশাপাশি আজ কিন্তু আন্তর্জাতিক নার্স দিবস। ১৮৬০ সালে লন্ডনে প্রথম নার্সিং স্কুলটি গড়ে তুলেছিলেন `লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প` ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল। নার্সদের সেবা সম্পর্কে নতুন কিছু বলবার আছে কি? এক অর্থে তাঁরাও তো মা। তাঁদের নিরলস সেবা রোগীকে যে প্রশান্তি দেয়, তা আর পাই কোথায় আমরা? মায়ের স্নেহ আঁচল আর বাবার মমতার পরেই বোধহয় আসেন নার্সরা। স্যালুট তাঁদের।    

ইতিহাস, স্মরণ, উদযাপন,ব্যবসা  ইত্যাদি সবকিছু মিলেমিশে রয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃ ও নার্স দিবসকে ঘিরে। কে কীভাবে নেবেন সেটি তার নিজস্ব। 

আমি শুধু জানি, মায়ের জন্য নিত্যদিনের স্মরণে যদি একটি দিন একটু অন্যভাবে পালিত হয়, তাতে কিছু যায় আসে না। বরং কুসন্তানেরা যদি এই দিবসের ছলে একটিবার হলেও মায়ের কথা ভাবে, তাহলে তার কু-বৃত্তি কিছুটা হলেও কমে। কেননা মা তো সন্তানের ক্ষেত্রে সর্বংসহা, পরম ক্ষমাদাত্রী। তিনি ওই ভাবনাটুকু পেয়ে ভুলে যান সব অবহেলা, অপমান। একইভাবে রোগশয্যায় যখন `পেশেন্স` বা ধৈর্য্য হারিয়ে একজন `পেশেন্ট` বা রোগী নার্সের ওপর কুবচন বা কুব্যবহার করেন, তিনিও হয়ত আজ আমাদের সামান্য উষ্ণ ব্যবহারে ভুলে যান তাঁর কাজের বিড়ম্বনাময় পরিস্থিতি। নতুন উদ্যমে আবারও নামেন সেবা কাজে।  

তাই মাতৃ দিবস অবশ্যই আলাদা। তাই সেবিকা দিবস আলাদা।  

সব দিন মায়েদের হয়েও মাতৃ দিবস অন্য কিছু। সব দিন সেবিকাদের হয়েও নার্স ডে আলাদা কিছু।

ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্মদাত্রী মা মায়ের পাশাপাশি বিশেষভাবে মনে পড়ছে আমার বড় কাকিমাকে। আমাকে পুনর্জীবন দিয়েছেন তিনি। মায়ের সহকর্মী ও পারিবারিক বন্ধু মানি-কেই বা ভুলব কীভাবে! আমার অন্য কাকিমারা যাঁরা মায়ের অনুপস্থিতিতে (চাকরি সুবাদে) দীর্ঘদিন আমাদের বাবা-ছেলের সংসার সামলেছেন, তাঁরা কি কম যান? কিংবা আমার ঠাকুমা! তিনিও তো ওই একই স্নেহ দিয়ে গেছেন আমৃত্যু। আমার ফালাকাটার বাড়িতে বছর তিরিশের ওপর গৃহস্থালি কাজে সাহায্য করা আমোদি এবং কোচবিহারের বাড়িতে প্রায় পঁচিশ বছর ধরে থাকা স্বপ্নাই বা অনুল্লিখিত থাকবে কেন! মা ও বাবার শেষ সময়ের নিত্যসঙ্গী পারুলদি যেভাবে ঋণী করেছে আমাদের, তাতে নার্সদের ওপর শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেছে। 

আমার স্ত্রী রীনা ও ওর মা-ও এর বাইরে নন। কেননা ওরাও মা। নিজের স্ত্রীর কথা বলব না। ওর কথা বলবে ওর ছেলে। ওর মায়ের কথা বলতে পারি। নিজের ছেলেকে একটি কিডনি দান করে উনি আমার চোখে দেবত্ব স্পর্শ করেছেন। 

এই তালিকা আর বাড়াচ্ছি না। কেননা কুলোবে না। কম তো পেলাম না এই জীবনে। 
যদি তলিয়ে দেখি, তবে তার অধিকাংশই মায়েদের জন্য।
যদি আমরা সবাইই একটু ভাবি, দেখব মায়েদের জন্যই আমাদের সব।  


(তথ্য- ব্রিটানিকা, বিবিসি, ইকোনমিক টাইম)  


    

No comments: