আয়নায় দেখি মুখ বদলে গেল কেমন
শৌভিক রায়
আমাদের সময়ে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবর্ষ এক বছর দেরিতে চলছিল। ফলে এম এ পাস করে বি এড ট্রেনিং নিয়ে চাকরি পেতে পেতে, আমাদের অনেকের বয়স সাতাশ ছুঁই ছুঁই হত। তবে আমাদের একটি ভরসা ছিল, এম এ বি এড ডিগ্রি থাকলে মোটামুটি চাকরি একটি পাব।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই চাকরি হত শিক্ষকতার। আর কোনও বিকল্পও ছিল না। রাজ্যের অবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে, সে যুগেও এই উত্তরে চা ছাড়া আর কোনও শিল্প ছিল না। সেই সময় অবশ্য চা শিল্পও ধুঁকছে। লক আউট, মালিক পক্ষের চা বাগান ছেড়ে চলে যাওয়া ইত্যাদি ছিল নিত্য ঘটনা। ফলে, এম এ বি এড পাস করা মানে মোটামুটিভাবে শিক্ষকতার খাতায় নাম লেখানো।
যারা শিক্ষকতায় আসতে চাইত না, তারা গ্রাজুয়েট হয়েই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলি দিত। অনেকে এম এ পড়তে পড়তেও সেগুলি টকাটক পাস করে যেত। আমাদের আনন্দ হত, আবার ঈর্ষাও হত। তবে ভরসা ছিল চাকরি আমাদেরও হবে। হতও। যতদূর জানি, আমাদের সময়ে পাস করা বন্ধুরা, মোটামুটি চার পাঁচ বছরের মধ্যে, চাকরিতে ঢুকে গিয়েছিল সবাই।
আমি নিজে যখন চাকরিতে ঢুকি, তখন আমার বয়স সাড়ে পঁচিশ। মনে আছে, আমার ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন অধ্যাপক গুরুপদ দেব ও অধ্যাপক অম্লানজ্যোতি মজুমদার। দুজনেই কোচবিহারের জাঁদরেল ইংরেজির শিক্ষক। ক্লাস প্রেজেন্টেশন শেষে ভাইবাতে বিকেল চারটা দশ থেকে পাঁচটা অবধি ওঁরা ইংরেজি সাহিত্যের পুরো পরিক্রমা করিয়েছিলেন আমাকে। চাকরিটা অবশ্য হয়েছিল। বেসিক ছিল ১৭৮০ টাকা। গ্রস স্যালারি ৩০০০ টাকার একটু বেশি বা কম। তখনও 'আচ্ছে দিন' আসেনি। ফলে মুদি দোকানে তিন চারশ টাকায় মাসের মাল হয়ে যেত। সবজি, মাছ, বাড়ি ভাড়া (তখনও কোচবিহারে আমার নিজের বাড়ি হয়নি) ইত্যাদি খরচের পর সামান্য যে পয়সা থাকত, সেটা দিয়ে ঘরের জন্য কিছু কিনলে নিজেকে রাজা বাদশা মনে হত।
১৯৯৬ সালের সেই সময় আর আজকের দিন! বেতন বেড়েছে। পরিচিতি আর বয়সও বেড়েছে। কিন্তু এখন যত অসহায় লাগে, তেমনটি আর কোনোদিন লাগেনি ! অথচ আগের তুলনায় সামাজিকভাবে অনেক ভাল আছি হয়ত বা!
আমাদের ব্যাচমেট, সহকর্মী প্যারা-টিচার, দুপুরে বলছিল, "আর কোর্ট! টেট পাস করেছি সেই কবে। হবে হচ্ছে করে করে রিটায়ারমেন্টের সময় হয়ে এল। অন্যান্য রাজ্যেও প্যারা টিচারদের এই হাল নয়, যা আমাদের এখানে।"
তবু ওর কিছু অন্তত আছে। কিন্তু যে প্রজন্মগুলো পর পর শেষ হয়ে গেল! তাদের কি কিছু যাবে আসবে? যে প্রিয় প্রাক্তন ছাত্রটির চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করতে পারিনা "কেমন আছিস", তার কী যায় আসে কোটি কোটি টাকা পাওয়া গেলে!
যারা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত নিজেদের দাবিতে খোলা আকাশের তলায় পড়ে রয়েছে, তাদের জন্যই তো এডওয়ার্ড থমাসের সেই প্যাঁচা আজও ডেকে চলেছে! আমরা বধির হয়েছি বলেই বোধহয় শুনতে পারিনা সেটা! এই দমবন্ধ করা পরিবেশের জন্য কি আমরা একদিন স্বপ্ন দেখেছিলাম!!
মোটামুটি স্বচ্ছল বেতনের একজন সরকারি বা বেসরকারি চাকুরে সারা জীবন নিজেকে নিংড়ে দিয়েও, অবসরের সময় যে পয়সা পান, তা দিয়ে কোচবিহারের মতো শহরেও তিন কাঠা জমি কেনা যায় না। মেগা সিটি তো বাদই দিলাম। তবু আমরা তাতেই সন্তুষ্ট থাকি। নিজেদের ওপর আমাদের সেই আস্থা আছে যে, কোনও অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করিনি। সেটাই আমাদের জীবনীশক্তি। কিন্তু আমাদের সেই অহংকারকে আজ একদম শেষ করে দিল কিছু ঘটনা পরম্পরা! এটাই কি আমাদের পাওনা ছিল? কে এই অধিকার দিল আপনাদের?
এই লেখা পড়ে অনেকে কোনও একটি নির্দিষ্ট শব্দবন্ধে আমাকে হয়ত বেঁধে ফেলবেন। না। আমি কোনও রাজনৈতিক দলের নই। বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সময়ের প্রবল প্রতাপশালী শাসকদের বিরুদ্ধে গিয়ে হাজতে পর্যন্ত ঢুকেছি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলাম সেদিনও, আজও আছি। থাকবও। সাধারণত এই জাতীয় লেখা লিখতেও পছন্দ করি না। লিখিও না। কিন্তু লিখতে বাধ্য হচ্ছি আজ। ওই সময় ওটা হয়েছিল, সেটা হয়েছিল, ওই রাজ্যে এটা হয়, সেটা হয়, চক্রান্ত করা হয়েছে ইত্যাদি যে যা খুশি বলতে পারেন, আজ কোনও যুক্তিই শুনব না।
এটা মানা যায় না। মানবও না। জানি বিরুদ্ধ শক্তির বিপরীতে ক্ষমতা আমার কিছুই নেই। তবু বলব। এই বলাটাই আমার কাজ। হয়ত এটাই ক্ষমতা.....
প্রকাশিত: প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা
সম্পাদক: শ্রী কৃষ্ণ দেব
No comments:
Post a Comment