Wednesday, November 22, 2023
Tuesday, November 7, 2023
ড. চৌধুরী
শৌভিক রায়
ফালাকাটা বেসিক স্কুল আর গ্রামীণ হাসপাতালের মাঝখান দিয়ে একটা কাঁচা পথ চলে গেছে। সেই পথে নড়বড়ে কাঠের সেতুতে সাপটানা পার হলেই মিল রোড ছোঁওয়া যেত।
বেসিক স্কুলের চারটে কোয়ার্টার। একটায় শেফালী দিদিমণি। তাঁর পাশে রাঙাদার কোয়ার্টার। কী আশ্চর্য! রাঙাদার আসল নামটা আজও জানি না! ধুতি ফতুয়া আর খালি পায়ের অকৃতদার মানুষটি আমার দেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম নিরীহ ও শান্ত মানুষ। তাঁর চরম রাগ মানে চক দিয়ে কপালে একটা ফোঁটা দেওয়া। এই দুই কোয়ার্টারের পরে একটু ফাঁকা জায়গা। তারপর বড়দা আর প্রীতি দিদিমণির কোয়ার্টার। এরপরেই সেই রাস্তা। আর রাস্তার পরেই হাসপাতালের কোয়ার্টার শুরু। প্রথমেই যে কোয়ার্টারটি তাতে থাকেন ড. চৌধুরী।
যে সময়ের কথা বলছি তখন ফালাকাটা ছোট্ট। ছিমছাম। সুন্দর। আরণ্যক। গ্রামীণ হাসপাতালে সেরকম পরিকাঠামো না থাকলেও, শুধুমাত্র ড. চৌধুরীর জন্য আশেপাশে থেকে প্রচুর রুগী আসত।
মনে হতেই পারে, ডক্টরের কাছে রুগী আসবে সেটা আর নতুন কী! আসলে আজকের দিনের পরিস্থিতিতে ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাবে না। এখন ফালাকাটায় সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল (জানিনা অবশ্য সেটা কতটা নামে আর কতটা কাজে), নার্সিং হোম, প্যাথ ল্যাব, নানা রোগের ডাক্তার। কিন্তু সেই সময় ওরকম ছোট্ট জনপদে কোথায় ডাক্তার! চিকিৎসার জন্য সেই আমলের লোকেদের হামেশাই কোচবিহার বা জলপাইগুড়ি দৌড়তে হত। একটু ক্রিটিক্যাল হলে শিলিগুড়ি। সেখানে ড. চৌধুরী ছিলেন এক মনোরম ওয়েসিসের মতো। গ্রামীণ হাসপাতালের জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ সবই তাঁর দায়িত্বে। হরেক কিসিমের রুগী তাঁর তত্বাবধানে।
আমরাও ফালাকাটা হাই স্কুলের কোয়ার্টারে থাকতাম। সুতরাং কোয়ার্টারতুতো একটা সখ্যতা আমাদের সবার মধ্যেই ছিল। বেসিক স্কুলের বিরাট মাঠে বুড়োদা, বাবলু, মধুমিতাদি, নন্দিতা, আখু ও আমার সঙ্গে খেলতে আসত মহুয়া। ও ড. চৌধুরীর মেয়ে ও ফালাকাটায় আমার প্রথম বন্ধু। কাকিমা ছিলেন খাস কলকাতার মানুষ। ওদের তিনজনের কথা শুনে হা হয়ে যেতাম। কেমন 'খেয়েছি' 'করেছি' করে বলতেন ওরা! মহুয়ার জামা কাপড়ও ছিল আমাদের তুলনায় একটু বেশি ভাল।
তবে দুষ্টুমি আর দুরন্তপনায় আমি বরাবর সেরা ছিলাম। আমার উৎপাতে দিদা (ঠাকুমা) গরম খুন্তির ছেঁকাও দিয়েছিলেন একবার। আর সেজন্যই বোধহয় ড. চৌধুরীর সঙ্গে আমার বেশি ভাব ছিল।
কেন? বলছি সেকথা।
দিনহাটা হাই স্কুলের গেটটা ছিল বিরাট বড়। কাঠের পোক্ত ফ্রেমে শক্ত লোহার শিক। ফালাকাটা থেকে দিনহাটায় গেলে, ওই গেট ধরে ঝোলা ছিল অনেক খেলার একটা। একবার ওরকমই ঝুলছি। পেছন থেকে মধু দিল জোরে ধাক্কা। আচমকা ধাক্কায় হুমড়ি খেয়ে কপালে প্রবল ঠোক্কর খেলাম শক্ত লোহার শিকে। মুহূর্তে কপাল ফুলে গেল। সঙ্গে ব্যথা। দুদিন পর ফালাকাটা ফিরলাম। গায়ে জ্বর। কপালের অসম্ভব অবস্থা। আরও ফুলে গেছে। পুরো কপাল নীল। একটা ঘোর মতো অবস্থা।
বাবা আঁতকে উঠলেন অবস্থা দেখে। এরকম নীল বর্ণ কপাল আশা করেননি আসলে। অতএব দৌড়লেন ড. চৌধুরীর কাছে। ব্যস্ত মানুষটি ছুটে এলেন। ইনজেকশন দিলেন। সঙ্গে আরও কিছু ওষুধ। রাতের বেলায় আবার এলেন। এবার ওঁর সঙ্গে কাকিমা আর মহুয়া।
কিছু একটা মলম হাতে করে এনেছিলেন ড. চৌধুরী। সেটা মেখে মেখে কয়েকদিন পর সেই ব্যথা কমল। ফোলাও।
কিছুদিন পর আবার বেসিক স্কুলের কাঁটা তারে পায়ের আঙুল আটকে শুরু হল প্রবল রক্তপাত। সেদিন ছিল হোলি। মনে আছে মহুয়াদের কোয়ার্টারের বারান্দা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। বুড়োদা, আখু, মধুমিতাদি, নন্দিতা চিৎকার করে কাকিমাকে ডাকছে। কাকিমা রঙের ভয়ে দরজা খুলছেন না। শেষে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে ওই অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গে হসপিটালে নিয়ে গেলেন। ড. চৌধুরী সেদিনও আমার ভগবান। আবার সেই জ্বর। আবার রাতে তাঁর আসা। আমাকে দেখে যাওয়া। তাঁর চিকিৎসায় সেরে ওঠা।
এরকম আরও বেশ কিছু ঘটনা আছে। সেসব আর বলছি না। যখন ক্লাস ফাইভে উঠলাম, তখন ওঁরা কলকাতায় চলে গেলেন। তাঁর আগে আমরা দুই পরিবার ফুন্টশেলিং গেছি। জলদাপাড়ার হলং ট্যুরিস্ট লজে থেকেছি। নিত্য যাতায়াত তো ছিলই হসপিটাল কোয়ার্টারে ওঁর বাড়িতে আমাদের স্কুল কোয়ার্টার থেকে। ফালাকাটা ছাড়বার পরেও সল্টলেকে ওঁর বাড়িতে গেছি। ফালাকাটায় আমাদের কলেজ পাড়ার বাড়িতেও এসেছেন ওঁরা। তখন আমি ইউনিভার্সিটিতে যাব বলে অপেক্ষা করছি।
ড. চৌধুরীকে আমার সেই শেষ দেখা। একই রকম দুরন্ত আছি কিনা জানতে চেয়েছিলেন। হেসে ছিলাম। মনে মনে বলেছিলাম, আপনি চলে গিয়ে আমার দুরন্তপনা শেষ। পুটন যেদিন খড়খড়ে গামছা দিয়ে কপালে একশ আট বার ঘষে রাজটিকা তুলে দিয়েছিল, সেদিন আপনার কথা খুব মনে হচ্ছিল। কেননা ওই ঘষায় কপালে দগদগে ঘা হয়েছিল। সঙ্গে জুটেছিল বাবা আর দাদার বেধড়ক মার। পুটন ভয়ের চোটে বহুদিন আমাদের বাড়িতেই আসেনি। আপনি থাকলে সেদিন ওই মার খেতে হত না। ঘা মিলিয়ে যেত আপনার ম্যাজিক টাচে!
দীর্ঘদিন যোগাযোগ ছিল না ওদের কারও সঙ্গে। ফেসবুকের দৌলতে মহুয়া খুঁজে পেয়েছিল আমাকে। মহুয়ার সঙ্গে দেখা হলেও ড. চৌধুরী বা কাকিমা কারও সঙ্গে দেখা হয়নি আর। সেদিন মহুয়া আমার পোস্টে কমেন্ট করেছে, "শুভু রে, আজ আমার বাবা চলে গেলেন। তোর, আমার বাবা মায়েরা আবার সেই ছোটবেলার মতো আড্ডার আসরে বসবেন আকাশে তারাদের মাঝে।"
কাকিমার খবর জানতাম। ড. চৌধুরী কাকুও চলে গেলেন। আমার বাবা মা তো আগেই....!
যেতে হবে। নিয়ম সেটাই। মানতে হবে। মানছিও।
কিন্তু একই সঙ্গে কষ্ট পাচ্ছি, জীবনের সেই প্রথম জাদু হাতটা, যার স্পর্শে আমি শীতল হতাম, যার স্পর্শ অভয় দিত আমার বেলাগাম দুরন্তপনায়, হারিয়ে গেল বলে....
কাকু....ভাল থাকবেন।
আমরা আক্ষরিক অর্থেই অনাথ এখন!
Monday, November 6, 2023
মোখার সঙ্গে মোলাকাত
শৌভিক রায়
১
সাত মে সকাল সাড়ে নটায় যখন পোর্ট ব্লেয়ারে নামলাম, আকাশ তখন ঝকঝকে নীল। মিনি বে'র ন্যাভাল কোয়ার্টারের ফাঁকফোকর দিয়ে স্বচ্ছ জলের সমুদ্র দেখে ওখানকার লোকদের সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল।
আস্তানা ছিল কাপুরদের হোম স্টে। ফিনিক্স বে'র মওলানা আজাদ রোডের ধারে এই বাড়িটি শতাব্দী প্রাচীন। পুরোনো আন্দামান যেন জড়িয়ে রয়েছে বাড়িটিকে। বাড়ির নাম সিভিউ দেখে বিস্মিত হতেই, মিসেস কাপুর হেসে জানালেন, বহুতল হয়ে এখন আর কিছুই দেখা যায় না। আগে তিন-চারশ মিটারের মধ্যে খেলা করত সমুদ্র।
মে মাসের এই গরমে, মোচা যখন চোখ রাঙাচ্ছে, আন্দামান যাচ্ছি শুনে অনেকেই মানা করেছিল। কিন্তু চিরদিন তো উল্টোটাই করে এসেছি। সঙ্গী মহিলাটিও তাই। অবশ্য ঘূর্ণিঝড়ে সমুদ্র কীরকম মারাত্মক হয় সেটা দেখবার একটা চাপা ইচ্ছেও ছিল। কিন্তু সেল ফোনে মৎসজীবীদের সমুদ্রে যেতে সাবধান করা আর দুই এক জায়গায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার মেসেজ ছাড়া ঝড়ের কিছুই বুঝতে পারিনি আজ সকালেও।
বরং প্রথম দুদিনে ফটফটে রোদে চুটিয়ে পোর্ট ব্লেয়ারের আশেপাশের দ্বীপগুলি ঘুরে নিয়েছি। তাপমাত্রা খাতায় কলমে ৩২ ডিগ্রি ছিল, কিন্তু 'ফিল' ছিল আটত্রিশের কাছাকাছি। গরমে ক্লান্ত মধ্যপ্রদেশ থেকে আসা বর্ষীয়ান কুলকার্নি দম্পতি একগাল হেসে বলছিলেন, "ময়েশ্চার জাদা, ইস লিয়ে থক গয়ে।"
আর্দ্রতা যে বেশি সেটি অবশ্য বুঝতে পারছিলাম নিজের ঘেমো অবস্থা দেখে। কিন্তু ঝড়ের বিন্দুমাত্র চিহ্ন পাইনি এই দুদিন। নিম্নচাপ ঘনীভূত হলে এরকম গরম হয় শুনেছি। হয়ত সেটাই ছিল পূর্বাভাস।
অসহ্য গরমের পর গতকাল সকালে একটু বৃষ্টি পেলাম। মেঘের ডাক শুনলাম দুই একবার। কিন্তু সেসব অতি সাধারণ। সাড়ে সাতটায় পোর্ট ব্লেয়ার থেকে হ্যাভলক (স্বরাজ দ্বীপ) আসার দুই ঘণ্টার জলপথে বরং ভেসেল এত দুলছিল যে, অনেকে জানালার ধার থেকে উঠে মাঝে চলে এলেন। বাকি সব একই। সারা রাস্তাতেই মেঘ আর সূর্যের লুকোচুরি খেলা। গত দুদিনের তুলনায় নীল সমুদ্র কিছুটা ঘোলাটে।
হ্যাভলক ঝিরিঝিরি বৃষ্টি দিয়ে স্বাগত জানালেও ঘন মেঘ ছিল না। শরতের পেঁজা তুলোর মতোই এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিল তারা আকাশের ক্যানভাসে। হ্যাভলকের বাসিন্দারা অবশ্য অপেক্ষা করে ছিলেন বৃষ্টি নামার। তাহলে নাকি গরম কমবে। যদি মোচা আসে? "ঝড় সহ্য করার অভ্যেস আছে। জীবনের ঝড়ের কাছে কী এমন কঠিন সে?" সহজ দর্শন তাদের। কিন্তু ঝড় এলে তো ক্ষতি। কিছু করার নেই। মেনে নিতে হবে সেটাই। তাছাড়াও এটি হল উৎসস্থল। হাওয়া বইতে পারে। বৃষ্টি হতে পারে। জলপথ চলাচল বন্ধ থাকতে পারে। এর বেশি খুব কিছু হবে না। নিশ্চিন্ত এখানকার স্থানীয়রা।
২
ব্রিটিশ জেনারেল স্যার হেনরি হ্যাভলকের নামে পরিচিত এই দ্বীপ আজ স্বরাজ দ্বীপ বলা হয়। প্রধানমন্ত্রী মাননীয় নরেন্দ্র মোদি ২০১৮ সালে দ্বীপের নতুন নামকরণ করেন। এই নামকরণের ইতিহাস অবশ্য লুকিয়ে ১৯৪৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে স্বাধীন ঘোষণা করার বার্তায়।
'রিচিস আর্কিপেলাগো'র অন্যতম বৃহৎ এই দ্বীপটি লম্বায় ১৮ কিমি, চওড়ায় ৮ কিমি। দ্বীপের কোস্টলাইন হল ৫৮.৫ কিমি। অন্যান্য দ্বীপের মতো এটিও টিলা আর জঙ্গল অধ্যুষিত। তবে জঙ্গলে কোনও হিংস্র প্রাণী নেই। বাড়িঘরগুলি ইতস্তত ছড়ানো। মাঝে প্রচুর ফাঁকা জায়গা।
কিন্তু রিচিস আর্কিপেলাগো ব্যাপারটি কী? আর্কিপেলাগো বলতে বোঝায় ছোট ছোট দ্বীপের ক্লাস্টারকে। ব্রিটিশ মেরিন সার্ভেয়ার জন রিচি দুই দশক ধরে আন্দামান ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় সমীক্ষা চালিয়ে প্রথম আন্দামান ও নিকোবর সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্য তাঁর এই অসাধারণ কাজ সে আমলে বিশেষ পাত্তা পায়নি। হতাশ মানুষটি ১৭৮৭ সালে নিজের দেশে ফিরে যান। আর কী পরিহাস, তার ঠিক বছর দুই পরে তাঁরই দেখানো দ্বীপপুঞ্জে পেনাল সেটেলমেন্ট তৈরি করতে পা রাখে ব্রিটিশরা।
হ্যাভলক দ্বীপে আমাদের আস্তানা হল ডলফিন রিসোর্টে। আধা-সরকারি এই বিরাট রিসোর্টটির ব্যবস্থাপনা অতুলনীয়। বিশাল জায়গা নিয়ে তৈরি হওয়া রিসোর্টে বিভিন্ন ধরণের কটেজ রয়েছে। আছে রেস্টুরেন্ট, বার, অ্যাসেম্বলি হল আর নিজস্ব বিচ। সম্পূর্ণ রিসোর্ট নারকেল বাগিচায় ছাওয়া। তা বাদেও আছে নানা ধরণের গাছ, ফুল। ঝুনো নারকেল পড়ে রয়েছে সর্বত্র। কেউ তাকিয়েও দেখছে না। ব্যাগপত্র রেখে দৌড়লাম নিজেদের রিসোর্টের বিচে। সবুজ পান্নার মতো জল। জোয়ারের সময় বলে বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে। একদিকে মিহি বালি আর অন্য দিকে শক্ত মাটি। সময় যে কোনদিক দিয়ে কেটে গেল টেরও পেলাম না!
৩
ঠিক করাই ছিল রাধানগর বিচে অনেকটা সময় কাটাব। দেখব সানসেট। হ্যাভলকের এই বিচটি ২০০৪ সালে টাইম পত্রিকার বিচারে এশিয়ার শ্রেষ্ঠ বিচের মর্যাদা পেয়েছে। পৃথিবীর সেরা দশটি বিচের অন্যতম এটি। এছাড়াও ২০২০ সালে পেয়েছে অত্যন্ত মর্যাদাকর ব্লু ফ্ল্যাগ বিচের তকমা। Foundation for Environmental Education থেকে প্রদত্ত এই পুরস্কারের ক্ষেত্রে জলের কোয়ালিটি, পরিবেশ সম্পর্কিত তথ্য, পরিবেশ রক্ষা এবং সুরক্ষা ও সার্ভিস ইত্যাদি দিকগুলি দেখা হয়। যেসব জায়গায় স্থানীয় কমিউনিটি নিজেদের প্রচেষ্টায় কোনও বিচকে প্রোমোট করে, তারাই এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়।
রাধানগর বিচের বিশালত্বের মাঝে মুহূর্তেই হারিয়ে গেলাম। উত্তরের দিকে জঙ্গল আর টিলা আর সামনে বিরাট বেলাভূমি ও সমুদ্র। তার রঙ কখনও নীল হচ্ছে, কখনও সবুজ। ঢেউ ভাঙছে খুব মৃদু লয়ে। আবার কখনও বিরাট বিরাট ঢেউ আছড়ে পড়ছে নিজেদের খুশি মতো। দক্ষিণের দিকে কিছু রক আর টিলার এগিয়ে আসা অংশ। সেটা পার করেও একই রকম চঞ্চল সমুদ্র। দুই কিমি লম্বা এই বিচের ট্রপিক্যাল অরণ্যও অসাধারণ।
একটা গাছের গুঁড়ি দেখে জাঁকিয়ে বসলাম। লোকজন খুব কিছু নেই। তবু তার মধ্যে অস্ট্রিয়া থেকে আসা বারবারা নামের এক তরুণীর সঙ্গে আমার সঙ্গী মহিলাটির ভাব হয়ে গেল। হাত ধরাধরি করে খানিকক্ষণ দুজনে ঘুরে ফিরেও বেরালো। দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি প্রতিটি মুহূর্ত নিংড়ে নিলাম! এক অসামান্য অভিজ্ঞতা। এর কোনও তুলনাই হয় না!
সাড়ে নয়টার মধ্যে ডিনার হয়ে গেলেও, রিসোর্টের বিচে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। রাতের সমুদ্রের একটা অন্যরকম মাদকতা আছে। বিরাট বিরাট রকের গায়ে ধাক্কা খেয়ে জল যখন ছড়িয়ে পড়ে, আধা-অন্ধকারে তার রূপ আলাদা হয়ে যায়! সঙ্গে রয়েছে সমুদ্রের নিজস্ব সঙ্গীত। সেই গান যে শুনেছে সে মরেছে!
৪
দশ মে সূর্যোদয়ের আগেই উঠেছিলাম। দেখি সমুদ্র অনেকটা দূরে সরে গেছে। ভোরের আকাশ বেশ পরিষ্কার আর ঝকঝকে। অদ্ভুত এক মায়াময় পরিবেশ। সকালের নরম আলোয় হ্যাভলককে মনে হচ্ছিল স্বর্গ যেন! রিসোর্টটিকেও অপূর্ব লাগছে। নিজেদের মতো বেশ খানিকটা সময় কাটানো গেল রিসোর্টের বিচে বসে আর মাটিতে পড়ে থাকা নারকেল কুড়িয়ে।
ঝটপট রেডি হয়ে চলে গেলাম কালাপাথর বিচে। আগেই ঠিক ছিল, এলিফ্যান্ট বিচ দেখব না। ওই বিচে হাতি রাখা থাকলেও সেগুলি বুনো নয়। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের পোষ মানা। ডুয়ার্সে বড় হয়ে ওঠা ও উত্তরবঙ্গে থাকবার সুবাদে হাতি প্রাণীটির সঙ্গে এমনিতেই বিশেষ পরিচয় রয়েছে। নতুন করে আর দেখতে চাইনি তাই। তার চেয়ে চললাম কালাপাথর বিচে।
কালাপাথর বিচের কথা প্রথম শুনেছিলাম ছোট ভাই প্রসূনের কাছে। নিজে দেখে বুঝলাম এক বর্ণ বাড়িয়ে বলেনি ও। সত্যিই পিকচার পোস্ট কার্ডের মতো এই বিচ। ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এখানে সমুদ্রের সঙ্গে মিলে এমন শিল্প সৃষ্টি করেছে যে, তার দ্বিতীয় উদাহরণ একটিও নেই। আর সমুদ্রের পান্না সবুজ চোখে বিভ্রম ঘটেছে মুহুর্মুহ। এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
বসে বসে দেখছি সেসব। কোচবিহার থেকে ফোন এলো। টিভিতে দেখাচ্ছে সামুদ্রিক ঝড় মোখা চোখ রাঙাচ্ছে। আমরা কেমন আছি! দিব্যি রোদ। দারুণ সুন্দর চারদিক। হাসিই পেলো। ঝটপট ছবি তুলে পাঠিয়ে দিলাম।
বৃষ্টি শুরু হল বেলা এগারোটায়। সমুদ্রও সামান্য অশান্ত হল। সমুদ্রে বৃষ্টির অন্য রূপ। অনবদ্য লাগছে। রং পাল্টে গেল জলের। একটু ঘোলা, একটু আলাদা। কিন্তু দুরন্ত চারধার। ম্যানগ্রোভ, রক, সমুদ্র আর বৃষ্টি.....এক অনবদ্য কম্বিনেশন!
৫
একটু পরেই পেলাম খারাপ খবরটা। মোখা তাণ্ডব শুরু করেছে। দ্বীপে বসে বোঝা না গেলেও সমুদ্র নাকি উত্তাল। অতএব পোর্ট ব্লেয়ার থেকে কোনও ক্রুজ আসেনি। হ্যাভলক থেকেও জলযান ছাড়বার অনুমতি মেলেনি। সাধারণত হ্যাভলক থেকে দফায় দফায় নিল যাওয়ার বোট মেলে। কিন্তু নিল দ্বীপ ওপেন সি তে হওয়ায় সেখানে সমুদ্র উত্তাল। হ্যাভলক খানিকটা খাঁড়ির মধ্যে।
মাথায় হাত পড়ল। ভাই রুদ্রর মুখে শুনে শুনে নিল সম্পর্কে আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু শুধুমাত্র নিলের জন্য এতদিন অপেক্ষা করা বোকামি। কেননা পরশু আমার যাওয়ার কথা ডিগলিপুর। যে কোনও ভাবে আগামীকাল পোর্ট ব্লেয়ার পৌঁছতেই হবে। কাল সকালে আবহাওয়া ঠিক হলে না হয় নিল ছুঁয়ে পোর্ট ব্লেয়ার চলে যাব। থাকলাম না নিলে। সেরকম হলে পোর্ট ব্লেয়ার থেকে দিন এসে দিন ফিরে যাব। এসব নানা ভাবনার মধ্যেই খবর এলো দিন তিনেকের মধ্যে নিলে যাওয়ার অনুমতি আর পাওয়া যাবে না!
কী করব, না করব বুঝতে পারছি না। সাহায্য করল অনন্ত। আমি ঠিক ট্যুর অপারেটরের সাজানো সূচিতে না ঘুরলেও, হোটেল বুকিং আর গাড়ির জন্য সাহায্য নিচ্ছিলাম। হ্যাভলকের বাঙালি তরুণ অনন্ত সেরকমই একজন। যাহোক বিকেলের দিকে সমুদ্রের আবহাওয়া একটু ভাল হওয়ায় পোর্ট ব্লেয়ার থেকে নওটিকা সহ আরও একটি ক্রুজ এলো।
কখনও ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি, কখনও হালকা রোদ আর মেঘ এরকমই চলছিল। বুঝবার কোনও উপায় নেই মাঝ সমুদ্রে কী চলছে। যাহোক অনন্ত আমাদের ব্যবস্থা করে দিল। এমনিতে আমাদের টিকিট ছিল হ্যাভলক থেকে নিল আর নিল থেকে পোর্ট ব্লেয়ার। মাঝে নিলে এক রাত থাকা। হ্যাভলক-নিল টিকিট ক্যানসেল হচ্ছে। কিন্তু নতুন করে টিকিট কাটবার দরকার নেই। ওই টিকিটেই হয়ে যাবে। কেননা নিলে আগামী তিন চারদিন কোনও ভেসেল যাবে না।
আমাদের ভেসেল নওটিকায় জানালার ধারে বসলাম। নিল দেখতে পেলাম না বলে মন বিষন্ন হয়ে রয়েছে। তবে এই মুহুর্তের পরিস্থিতি বিচারে পোর্ট ব্লেয়ার ফেরাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
৬
মিনিট দশেকের মধ্যে মাঝ-সমুদ্রে এসে পড়লাম। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক ক্রুজে বসে টের পাচ্ছিলাম সমুদ্রে প্রলয় চলছে। হাওয়ার প্রবল বেগ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।
আমাদের সমান্তরাল চলছে আর একটি ক্রুজ। খানিক পর শুরু হল প্রবল দুলুনি! একতলা দেড় তলা বাড়ির সমান উঁচু এক একটি ঢেউ আছড়ে পড়তে শুরু করল ক্রুজের গায়ে। খোলামকুচির মতো একবার ঢেউয়ের ওপরে উঠছি, মুহূর্তেই ধপ করে নিচে নামছি। ঢেউ কখনও ঢেকে দিচ্ছে ডাবল ডেকার ক্রুজকে। আমাদের সঙ্গে থাকা ক্রুজটি পিছিয়ে গেছে। অথবা ফিরে গেছে।
অবর্ণনীয় অবস্থা। জানালার ধারে বসেছি বলে সমুদ্রের অবস্থাটা ভাল করে বুঝতে পারছিলাম। কোথায় সেই গাঢ় নীল অথবা পান্না সবুজ সমুদ্র! বরং কুচক্রির ঘোলাটে চোখের মতো তার রঙ। দু'হাত তুলে বিপুল জলরাশি সে ছুঁড়ে দিচ্ছে আমাদের দিকে। রীতিমতো ছেলেখেলা করছে।
বাতাস আর সমুদ্রের মিলিত গর্জনে ক্রুজের আওয়াজ চাপা পড়ে গেছে। ঢেউ ওপরে উঠে যেন থাপ্পড় মারছে ভেসেলের মাথায়। টালমাটাল অবস্থা। এ ওর গায়ে পড়ছে। বিলাস বহুল ক্রুজের স্মার্ট টিভি থেকে শুরু করে সব কিছু বন্ধ। শুধু পরিত্রাহি চিৎকার। আমার চোখে শুধু পুত্রের মুখ ভাসছে! যে অবস্থা তাতে আর উপায় নেই। আজ আর বাঁচব না। সলিল সমাধি হবে বুঝতে পারছি। থর থর করে কাঁপছে নওটিকা। অন্ধকারও ঘনিয়ে এসেছে। ক্রুজের নিচে থেকেও বিকট যান্ত্রিক আওয়াজ ভেসে আসছে।
এরপর বোধহয় শুরু হল আরও বেশি তাণ্ডব। এক মুহুর্ত থেমে নেই ক্রুজের দুলুনি। সমুদ্র আরও মারাত্মক। কোনও ব্রেকার নেই। শুধু ঢেউ আর ঢেউ। আর এক একটা ঢেউয়ের কী বিরাট উচ্চতা! কল্পনা করা যায় না। প্রবল অভিঘাতে ক্রুজ একবার এদিকে আর একবার ওদিকে টলছে। বার কয়েক পুরো উল্টে যেতে যেতেও রক্ষে পেল যখন তখন দিক পরিবর্তন করলেন ক্যাপ্টেন। ফিরে চললেন আবার। হ্যাভলকে। সেদিনের যাত্রা বাতিল হল। বললেন, পরদিন সকালে আবার চেষ্টা করবেন।
ডলফিন রিসোর্টে বুকিং নেই আর। ইতিমধ্যে যারা এসেছে তারা আর আমরা এই যাত্রা বাতিলের দল মিলে মোটামুটি ভাল ভিড়। তবু একটি রিসোর্টে জায়গা হল। ফোনে ছেলের বকুনি শুনে ঘুমোতে গেলাম। কিছুতেই ঘুম এলো না। ভোরে উঠে আবার দৌড়লাম জেটিতে।
বিগত দিনের মতো অশান্ত না হলেও সেদিনও যথেষ্ট ভয়ঙ্কর সমুদ্র। আসলে ঘূর্ণিঝড় পাক খাচ্ছে যে অঞ্চলে তার মাঝে পড়েছিলাম গতকাল। হাওয়া তখন বিপরীতে বইছিল। এই বারো তেরো ঘণ্টায় তার গতিপথ সামান্য বদল হওয়ায় খানিকটা রক্ষে। তবু বেশ কয়েকবার সেই বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে ফেলল। এভাবেই দুলতে দুলতে ঘণ্টা দুয়েক পর রস আইল্যান্ডকে দেখতে পেয়ে নিশ্চিন্ত হলাম। পোর্ট ব্লেয়ার এসে গেছে!
৭
হ্যাভলক স্মরণীয় হয়ে রইল এই একটি কারণেই। না, হ্যাভলকের সৌন্দর্য নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। এত সুন্দর একটি দ্বীপে যারা থাকেন তাদের সত্যিই ঈর্ষা হয়, যদিও ওদের জীবন মূল ভূখণ্ডের চাইতে অনেকই কঠিন। অত্যন্ত সুন্দর এক একটি বিচ আর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া মানুষজনের হ্যাভলক এক কথায় অসামান্য। আর সঙ্গে যদি মোখার মতো সামুদ্রিক ঝড়ের অভিজ্ঞতা হয়, তবে বলতেই হয় জীবন সুন্দর হলেও ঝড় আসবেই! আর সেটা আসে বলেই বোধহয় জীবনকে এত ভালবাসা!!
প্রকাশিত: ইরাবতী/ সম্পাদক: শৌনক দত্ত
https://irabotee.com/%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0/
Saturday, November 4, 2023
রবি ঠাকুরের মংপু হয়ে সিটং-লাটপাঞ্চারে
শৌভিক রায়
'ঘন ছায়াছন্ন পথ দিয়ে মেঘ কুয়াশার রাজ্য ছাড়িয়ে মংপুতে যখন নামলাম তখন রোদ চারদিকের ধোয়া সবুজের উপর ঝিলমিল করছে, শেষ বেলাকার রোদের সুন্দর শান্ত হাসি।'
'মংপুতে রবীন্দ্রনাথ' বইটিতে মৈত্রেয়ী দেবী এভাবেই মংপুর বর্ণনা দিয়েছিলেন। আজও যেন পাল্টায় নি সেই মংপু।
শিলিগুড়ি থেকে সেভক হয়ে ৫১ কিলোমিটার দূরের ৩৭০০ ফিট উচ্চতার মংপুতে পৌঁছে সেকথাই সবার আগে মনে হল। রাম্ভি থেকে শেষ ১১ কিলোমিটার পথ ভীষণ খাড়াই ও সর্পিল এবং হিমালয়ের নিস্তব্ধতার সঙ্গে মানানসই রকম নির্জন। শীতকালে এই পথের দু`ধার হলুদ কমলালেবুতে ছেয়ে যায়। সে দৃশ্য এই শরতে দেখা না গেলেও, সিঙ্কোনা গাছের নির্জন জঙ্গল দেখাটা কিন্তু একেবারে অন্য অভিজ্ঞতা। সেভক থেকে রাম্ভি অবধি তিস্তা পাশে পাশে চলে আর রাম্ভি থেকে এই পাকদন্ডী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে আমলে গেলখোলা পর্যন্ত আসতেন টয়ট্রেনে আর সেখান থেকে রাম্ভি অবধি বাকি চার কিলোমিটার পথ গাড়িতে। রাম্ভি থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হত পালকিতে।
১৯৩৮ সালে মংপুর কুইনানিন ফ্যাক্টরিতে কর্মরত ছিলেন মনমোহন সেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের কন্যা মৈত্রেয়ী দেবী। তাঁদের আহ্বানে ওই বছর ২১শে মে গুরুদেবের পদার্পণ হয় ছোট্ট এই জনপদে। এই পাহাড়ি শহরটির অসাধারণ নৈসর্গিক দৃশ্য তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। প্রথমবার রবীন্দ্রনাথ ৯ই জুন অবধি কাটিয়েছিলেন মংপুতে। ১৯৩৯ সালে তিনি দু'বার আসেন মংপুতে। প্রথম দফায় পুরী থেকে ১৪ই মে এসে ১৭ জুন কলকাতায় ফেরেন। আবার ১২ই সেপ্টেম্বর এসে দু`মাস কাটিয়ে যান মংপুতে। শেষ এসেছিলেন পরের বছর ১৯৪০ সালের ২১ শে এপ্রিল। ২৫ শে বৈশাখের অনুষ্ঠান পালন করে চলে যান কালিম্পঙে। সে বছরই সেপ্টেম্বরে আসতে চেয়েছিলেন, তিনি কিন্তু অসুস্থ শরীর নিয়ে প্রথমে কালিম্পঙে এলেও, মংপুতে আর আসতে পারেন নি। কিন্তু মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন আসবার জন্য। তাই হয়তো আসবার আগে পাঠিয়েছিলেন নিজের ওষুধের কৌটো। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার জন্য তিনি নিরুপায় হয়ে কলকাতায় ফিরে যান।
রবীন্দ্রস্মৃতি ধন্য মংপুর ভবনে আজও রক্ষিত সেই কৌটোগুলি। শুধু ওষুধের কৌটোই নয়, ষোলোটি ঘরের এই বিরাট ভবনটিতে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যবহৃত খাট, তোশক, বিছানা। তাঁর নিজের নকশায় তৈরী চেয়ারটিও যত্নে রাখা। চেয়ারের ওপর রয়েছে তাঁর ব্যবহৃত কুশনটিও। রক্ষিত কবি ব্যবহৃত রঙের বাক্স। প্রতিটি ঘরেই রাখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসংখ্য নিদর্শন, ব্যবহৃত সামগ্রী। রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্য আনা এক আনা দামের ন্যাশনাল হেরাল্ডের একটি কপিও। বেশ কিছু দামি ফোটোগ্রাফও রয়েছে, তবে অযত্নে সেগুলির দশা অত্যন্ত সঙ্গীন।
১৯৪৪ সালের ২৮ শে মে এই বাড়িটিকে রবীন্দ্রস্মৃতিভবন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আজ এই বাড়িটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। দেখে নেওয়া যায় স্মৃতিভবনের সবকিছুই, এমনকি ইট ও বালি দিয়ে বানানো বাথটবটিও। কুইনাইন ফ্যাক্টরির প্রবেশদ্বারের ঠিক উল্টোদিকে রবীন্দ্রভবনে ঢুকবার রাস্তা। ঢুকেই বাগান। বাগানে রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ মূর্তি। বারান্দায় সাদা চাদরে ঢাকা চেয়ার, চেয়ারে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি। প্রতিকৃতির পেছনে মৈত্রেয়ী দেবী-কৃত রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত তাম্রলিপি যাতে বাংলা, হিন্দি আর নেপালি ভাষার ব্যবহার করা হয়েছে।রবীন্দ্রস্মৃতিভবনের বর্তমান কেয়ারটেকার শিশির রাউত উদাত্ত কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত গাইতে গাইতে গাইড করেন পর্যটকদের। তাঁর ঠাকুরদা ভীমলাল রাউত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাল্কিবাহকদের সর্দার।
মংপুর অদূরে পেশক রোডের ওপর সার্নেল বাংলো একসময়ে অন্যতম পর্যটক আকর্ষণ কেন্দ্র হলেও, বর্তমানে তা ভগ্নস্তূপে পরিণত। মংপুর ডাইছেন শেরপা চোয়েলিং মনাস্ট্রি বা পিস্ প্যাগোডাটিও অনবদ্য। সার্নেল বাংলো থেকে স্থানীয় গাইডের সাহায্যে হিমালয়ের গহন অরণ্যের ভেতর দিয়ে হাঁটা পথে যাওয়া যায় ছটকপুর অবধি। অসামান্য প্রাকৃতিক দৃশ্যের এরকম জায়গা পূর্ব হিমালয়ের এই অঞ্চলে আর দ্বিতীয়টি মেলে না। মংপুর কাছের সিকসিম গ্রামটিও অনবদ্য। প্রকৃতির নিবিড় পাঠে সিকসিম অতুলনীয়। অন্যদিকে মংপু থেকে যাওয়া যেতে পারে ৬কিমি দূরের রিয়াং নদীর কাছে যোগীঘাটেও। বাবা রামদেবের জন্য আজ এই স্থানটি প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।
আজকের পর্যটন মানচিত্রের পরিচিত নাম সিটং, মংপু থেকে মাত্র সাত কিমি দূরে। চিৎকার-চেঁচামেচি-মাথাব্যথার শহরবাসীর কাছে সিটং এক লোভনীয় মনোরম গন্তব্য। সিটং-এর খুব কাছেই রয়েছে শেলফু ও লাটপাঞ্চারের মতো জনপ্রিয় আরও দুটি জায়গা। ট্রেক করবার জন্য এখানে বেশ কিছু পথ রয়েছে। এই অঞ্চলের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছে গেলে ডুয়ার্স, তরাই-সহ দার্জিনিঙের অপূর্ব প্যানারোমা শিহরিত করে তোলে। রয়েছে মামরিং হয়ে বাগোরা অথবা মাজুয়া-মহলদিরাম হয়ে কার্শিয়াং পর্যন্ত ট্রেক করবার পথটিও। সব পথেই উপরি পাওনা কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষার-ধবল ঔদ্ধত্য। পাখির ডাক, আপার সিটং মনাস্ট্রি, চার্চ সব মিলে, সিটং আর লাটপাঞ্চার অফ বিট লোকেশন হিসেবে আজ কড়া টক্কর দিচ্ছে দার্জিলিং, কালিম্পঙের মতো শৈল শহরকে। সিটং পৌঁছনো যায় রাম্ভির আগেই কালিঝোরা বা বিরিক দারা থেকে আহালদারা হয়ে, অথবা রাম্ভি-মংপু হয়ে। থাকবার জন্য রয়েছে বেশ কিছু হোম স্টে থেকে শুরু করে সরকারি ব্যবস্থার লজও।
(ছবি- লেখক)
* প্রকাশিত: শব্দ বাউল/ সম্পাদক: শৌভিক বণিক
https://sabdabaul.blogspot.com/2023/10/blog-post_81.html?m=1
Wednesday, November 1, 2023
দমকলের কর্মী
শৌভিক রায়
বেশ সিরিয়াস মুখ করেই বসেছিলাম। একটু নেতা নেতা ফিলিংসও হচ্ছিল। দুই পাশে দুই জন। বউ আর ছেলে।
বলতেই পারেন বউ আর ছেলে দুই পাশে থাকলে কেন নেতা নেতা মনে হবে?
হবে।
যতই আপনার পয়ষট্টি ইঞ্চি হোক না কেন, কিচেন ক্যাবিনেটে আপনাকে কেউ পাত্তা দেবে না! গ্যারান্টেড। তার ওপর ছেলে যদি পঁচিশ পার করে যায়, তবে তো কথাই নেই। আপনার গুগলি বা ইনসুইং সব 'বাপি বাড়ি যা' হয়ে যাবে।
এরকম অবস্থায় দুই পাশে দুজন থাকলে নেতা নেতা মনে হবে না!
সিরিয়াস মুখ কেন?
সেটাই তো আসল। আদতে এই সময়ের ট্রেন্ড অনুসারে নেতা ভাব বজায় রেখে আমি অ্যারেস্টেড। বউ ছেলের হাতে। কখনও দুজনকে ইডি বা সিবিআই বলেও মনে হচ্ছিল।
কেসটা কিছুই না। জেলা সদরের প্রখ্যাত নার্সিং হোমের ইউ এস জি মেশিন বলে দিয়েছে বুড়ো হয়েছি পুরো। শুধু থুত্থুরে হতেই বাকি যা! ভেতরের কলকব্জা নাকি গন্ডগোল করছে। অতএব সাধু সাবধান। বাঁচাতে জান, ওষুধ সহযোগে জল করুন পান।
আমি চিরকালের শান্তশিষ্ট মানুষ। ডাক্তারবাবু ও তাঁর মেশিনকে আমি বিশ্বকর্মা জ্ঞানে পুজো করি। কিন্তু ওই যে। কিচেন ক্যাবিনেট। 'ঘন ঘন টয়লেট যাচ্ছ', 'এতক্ষণ টয়লেটে কী করছ' ইত্যাদি করে জেলা শহরের মেশিনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে এসেছে মহানগরের বেশ নামি জায়গায়। শরদিন্দুর ভাষায় আসুরিক চিকিৎসা শুরুও হয়েছে। 'কেমন বহে নিরন্তর ধারা' পরীক্ষা ছাড়াও, ভেতরে উঁকি দিয়ে কঙ্কাল পর্যন্ত দেখে নিয়েছে (খুব অপমানজনক ব্যাপার এটা)।চলছে সিমের বীজের মতো মেরি পেয়ারি কিডনি, প্রোস্টেট, লিভার ইত্যাদি একান্ত ব্যক্তিগত সম্পতিতে গর্হিত নজরদারি। দুই দিনে 'ওনলি মি' থেকে আমি একদম 'পাবলিক'! শুধু লাইক নেই। কমেন্ট অবশ্য প্রচুর!
প্রথমদিন ডাক্তারবাবুর কাছে কিচেন ক্যাবিনেটের প্রধান ব্যক্তিত্ব আমাকে নিয়ে ঢুকে ছিলেন। আজ দ্বিতীয় জন ঢুকবে নাকি। দুজনেই চিন্তিত। গম্ভীর মুখ। একজন ভাবছে, বুড়োটা মিনসে হতে আর কদিন সময় নেবে? আর একজন ভাবছে, বাপের সঙ্গে ডাক্তারবাবুর পাঙ্গাও আজ নেওয়া যাবে। আমি সিরিয়াস মুখ করে আছি। মনে মনে বলছি আজ দুটোরই মুখ পুড়বে। ইজ্জত ঢিলে হবে। হাম ভি কিসি সে কম নেহি। এত দ্রুত ময়দান ছাড়ছি না। খেলা শুধু হবে না। খেলা চলবে।
অতঃপর চেম্বার। বিপ বিপ শব্দ। টিপ টিপ আলো।
গম্ভীর মুখ করে ডাক্তারবাবু সব দেখতে শুরু করলেন। আড়চোখে দেখতে পাচ্ছি কিচেন ক্যাবিনেটের দুই নম্বর অপেক্ষায় আছে কখন আমাকে একবারে ঢিট করা যায়। বাইরে এক নম্বরও অপেক্ষায়। বেরোলেই অ্যারেস্ট।
কিন্তু আছেন।
কে?
ঈশ্বর। আবার কে!
'আপনার সব ঠিক। একদম ফাটাফাটি। দুর্দান্ত। আপনার পুরোনো রিপোর্ট সব ভুল।'
বিশ্বাস করবেন না, আমার তখন গুড়গুড় করে হাসি পাচ্ছে। ছোটটার মুখ ব্যাজার হয়ে গেছে। এত করেও কিছু হল না!
- কিন্তু বাবার কিডনি....
- একদম ঠিক
- প্রোস্টেট?
- দুরন্ত।
- লিভার যে বলেছিল....
- ভুল।
কিছুতেই কিছু হচ্ছে না দেখে শেষটায় মরিয়া হয়ে চিৎকার
- ইউরিনের ফ্লো?
- আরে এখনও দমকলে চান্স পাবে হে তোমার বাবা!
হো হো হেসে উঠি আমি। ডাক্তারবাবুও যোগ দেন।
নেচেও উঠতাম জানেন! কিন্তু বেরসিক ঠ্যাং। গেল রাতে সিঁড়ি থেকে চ্যুত হয়ে তিনি আমাকে ধরণীপুত্র করেছেন। নিজের গায়ে ক্রেপ ব্যান্ডেজের ওড়না জড়িয়ে লাজুক হয়ে আছেন। সটান বলে দিলেন নাচলে তিনি মরমে মরে যাবেন!
(বোকামির এককাল)













