Wednesday, November 22, 2023


 

আঙরাভাসা, ও আঙরাভাসা
শৌভিক রায়
তেলিপাড়া চা-বাগানের প্রস্রবণ থেকে যখন তার সৃষ্টি হয়, তখন কি জানত সে, একদিন এতটা বিখ্যাত হয়ে উঠবে?
বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত লেখকদের হাত ধরে বহু নদী বিখ্যাত হয়েছে। ইছামতি, গঙ্গা, তিস্তা, তিতাস... উদাহরণ কম নয়! অবশ্য এই নদীগুলির প্রত্যেকে এমনিতেই বিখ্যাত। তাই আঙরাভাসার মতো অখ্যাত অজ্ঞাত একটি ছোট্ট প্রবাহের বিখ্যাত হয়ে ওঠা অবশ্যই বিস্ময়ের। কিন্তু বাস্তব এটাই।
আঙরাভাসার এই বিপুল পরিচিতির পেছনে রয়েছে সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের ট্রিলজি `উত্তরাধিকার`, `কালবেলা` ও `কালপুরুষ`। `কালপুরুষ`-এ অবশ্য নদীটিকে দেখা যায় না। কিন্তু তার অদৃশ্য উপস্থিতি টের পান পাঠক। আসলে এই বিখ্যাত ট্রিলজির গত যেন বেঁধে দিয়েছিল এই নদীটি। তাই ছোট্ট আঙরাভাসার তীর থেকে শুরু উপাখ্যান তিস্তার মতো বৃহৎ নদীকে ছুঁয়ে শেষ পর্যন্ত শেষ হয়েছে কলকাতায় গঙ্গার তীরে। সেই অর্থে এই যাত্রা কিন্তু অনন্য।
ছোট একটি নদীর এই বয়ে চলায় একাকার হয়েছে উত্তর থেকে দক্ষিণ। সে যেমন নিজে ছোট্ট নায়ককে উপযুক্ত করে তুলেছে তিস্তাপাড়ের জলপাইগুড়ি বা গঙ্গাতীরের কলকাতার মতো বৃহৎ শহরের জীবনযাত্রাকে মানিয়ে নেওয়ার, ঠিক তেমনি নিজে রয়ে গেছে নায়কের বুকের গভীরে। তাই নকশাল আমলের সেই তুমুল দিনে, পুলিশের হাত থেকে বাঁচবার জন্য, নায়ক শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছিল তার কাছেই। এ যেন সব হারিয়ে নিজেকেই খোঁজা আবার। নদীর চরিত্রের সঙ্গে এক অদ্ভুত মিল আমরা দেখি তাই। আর সেজন্যই নায়ক অনিমেষের সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তেই আঙরাভাসা আমাদের আপনজন হয়ে ওঠে। এই নিবন্ধে অবশ্য আমরা আঙরাভাসাকে নদী হিসেবেই দেখব। কিন্তু এই নদী ও সমরেশ মজুমদারের সাহিত্যকর্ম এতটাই মিলেমিশে গেছে যে, ওই ট্রিলজি, বিশেষ করে `উত্তরাধিকার`কে বাদ দিয়ে আঙরাভাসা সম্পর্কে লেখা সম্ভব নয়। তাই উপন্যাসের কথা ঘুরেফিরে আসবে।
উত্তরের কয়েকটি নদীর উৎস কিন্তু রীতিমতো গবেষণার বিষয়। আঙরাভাসা নদীর উৎসের ক্ষেত্রেও এই কথা বলা যায়। উত্তরের অধিকাংশ নদীর সৃষ্টি ভুটান পাহাড়ের উচ্চাংশে। কিছু নদী বরফগলা জলে পুষ্ট। কিন্তু মুজনাই, ঘোড়ামারা ইত্যাদির মতো কিছু নদীর প্রবাহের মূল উৎস কিন্তু টিলা বা তরঙ্গায়িত ভূমির মধ্যে থাকা কিছু প্রস্রবণ। মুজনাইয়ের ক্ষেত্রে উৎসমুখ হিসেবে ভুটান পাহাড়কে ধরা হলেও, সেই নদীর সারা বছর জলের জোগান দেয় কিন্তু মুজনাই চা-বাগানের কাছে থাকা বাঙাবাড়ির কিছু প্রস্রবণ। এরকমই কয়েকটি প্রস্রবণ দেখা যায়, তেলিপাড়া চা-বাগানেও। বিন্নাগুড়ি থেকে তেলিপাড়ার দূরত্ব মাত্র সাড়ে ছয় কিমি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, গয়েরকাটার খুব কাছেই এই চা-বাগানটি। ডুয়ার্সের অন্যান্য চা-বাগানগুলির মতোই অত্যন্ত সুন্দর এই চা-বাগানটি যথেষ্ট প্রাচীন। এই চা-বাগানেই দেখা যায় একাধিক প্রস্রবণ। সত্তরের দশকে অবশ্য প্রস্রবণের সংখ্যা ছিল একটি। কিন্তু এখন সেই সংখ্যা বেড়েছে এবং একাধিক প্রস্রবণ মিলে একটি জলাশয়ের আকৃতি নিয়েছে জায়গাটি। এখান থেকেই প্রবাহের জল বুকে নিয়ে আঙরাভাসা দক্ষিণে সামান্য পথ অতিক্রম করে গয়েরকাটা ছুঁয়ে মিশেছে ডুডুয়ার সঙ্গে। ডুডুয়া আবার মিশেছে জলঢাকায়। আঙরাভাসা, ডুডুয়া ও জলঢাকার মিলনস্থলটি রীতিমতো সুন্দর। মাঝে থাকা খুট্টিমারি অরণ্যের প্রান্তসীমা বোধহয় সেই সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি করেছে।
আঙরাভাসার নামকরণের ইতিহাসের জন্য আবার আশ্রয় নিচ্ছি 'উত্তরাধিকার` উপন্যাসে। সমরেশ মজুমদার লিখেছেন, '...ওপাশের লাইনের মদেসিয়া মেয়ের দল যখন নদী পেরিয়ে এপারে আসে তখন ওদের হাঁটু অবধি নামা কালো পোশাকের ঘেরটা পদ্মপাতার মতো স্রোতে ভাসে। কাপড়টাকে ওরা বলে আঙরা। নদীর নাম তাই আঙরাভাসা।' উত্তরের জনজীবনের সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে এই নদী যে, একই নামে রয়েছে জলপাইগুড়ি জেলার নাগরাকাটা তহশিলের একটি গ্রামও। তবে রাস্তার ধারে প্রশাসনের তরফে যে বানান লেখা হয়েছে গ্রামটিকে চিহ্নিত করতে, সেটি বড্ডো পীড়াদায়ক। অতীতে, 'উত্তরাধিকার` উপন্যাসের সময়ে, অনিমেষেদের কোয়ার্টারের গোয়ালঘরের পেছনে ছিল 'বড় বড় জঙ্গলে গাছ` আর সেদিক দিয়ে খানিকটা গেলে আঙরাভাসা নদীটিকে পাওয়া যেত। লেখক বলছেন, 'অদ্ভুত একটা আঁষটে গন্ধ উঠছে নদীর গা থেকে। চওড়ায় পনেরো ফুট, তীব্র স্রোতের এই নদী চলে গেছে নিচে চা-ফ্যাক্টরীর ভিতর দিয়ে। ফ্যাক্টরীর বিরাট হুইলটা চলছে এর স্রোতে। বলতে গেলে স্বর্গছেঁড়ার হৃদস্পন্দনের মত এই নদীর ঢেউগুলি।`
কিন্তু এখন আঙরাভাসা আর সেখানে নেই। ধূপগুড়িমুখী পথে চা-বাগান শেষে বিখ্যাত নদীটির দেখা মেলে। সাহেবি আমল থেকেই আঙরাভাসার মূলস্রোতকে ঘুরিয়ে দিয়ে চা-বাগানের কারখানায় জল সরবরাহ করা হত। 'উত্তরাধিকার'-এ 'নদী বন্ধ' করবার কথাও রয়েছে। লেখক সমরেশ মজুমদারের ভাই সুদীপ মজুমদার জানাচ্ছেন যে, এই ব্যবস্থা আজ আর নেই। কেননা আশি-একাশি সালের বন্যায় নদী নিজেই তার মূলস্রোতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। চা-বাগানের তদানীন্তন ম্যানেজার সাহেব চেষ্টা করেও নদীকে বাগানের ভেতর দিয়ে নিয়ে যেতে পারেন নি। আজ নদী বাগানের প্রান্তে। দেখা যায় না 'উত্তরাধিকার'-এ বর্ণিত সেই দৃশ্যও - 'প্রায় ছুটতে ছুটতে ওরা আঙরাভাসার পাড়ে এসে দাঁড়াল। আর দাঁড়াতেই একটা অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল অনির। পুরো নদীটা জুড়ে যতদূর দেখা যায়, সেই ধোপার ঘাট পর্যন্ত, অজস্র হ্যারিকেন আর টর্চের আলো জোনাকির মত নাচছে। আচমকা দেখলে মনে হয় যেন দেওয়ালির রাতটাকে কে উপুড় করে দিয়েছে নদীতে। সমস্ত কুলি লাইন ভেঙ্গে পড়েছে এখানে। আঙরাভাসার দিকে তাকিয়ে কেমন বিশ্রী লাগল অনির। জল এখন পায়ের তলায়। কাপড়কাচা পাথরটা ভেজা নুড়ির ওপর পড়ে আছে। জল মাঝখানে। তাও কমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। লাফ দিয়ে নেমে পড়ল ঝাড়িকাকু। একটা বিরাট বানমাছ ঠিক সামনেটায় খলবল করছিল। একটা মদেসিয়া মেয়ে মাছটার দিকে এগোবার আগেই ঝাড়িকাকু বাঁ হাতে সেটাকে তুলে খলুইতে ঢুকিয়ে নিল।`
আঙরাভাসার সৌন্দর্যে বিমোহিত হন না এরকম মানুষ খুব কম পাওয়া যায়। এই নদীর এত বাঁক যে কল্পনা করা যায় না। উন্নয়নের জোয়ারে আজ গয়েরকাটা চৌপথী থেকে বীরপাড়ার দিকে যেতে কখন যে আঙরাভাসা চলে যায় বোঝা যায় না। নব্বইয়ের দশকেও কিন্তু এই পথে আঙরাভাসার ওপর কাঠের ব্রিজ পার হতে হত। আর আজ গয়েরকাটা চৌপথী থেকে ধূপগুড়ির দিকে যেতে আঙরাভাসার ওপর পাকা ব্রিজ পার হতে হয়। নদীর শান্ত রূপ দেখলে কিন্তু কেউ ভাবতেই পারবে না যে, এই নদী কখনও কখনও মারাত্মক আকার নেয়। আশির দশকে ভুটান পাহাড় ও সমতলে বৃষ্টি হলেই নদী দুকূল ছাপাতো। সম্প্রতি বানারহাট ব্লকের সাঁকোয়াঝোরা ১ গ্রাম পঞ্চায়েতের নেপালি বস্তির মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আঙরাভাসা। এই বস্তি ঘেষেই বয়ে গিয়েছে নদী। বর্ষায় ফুলেফেঁপে ওঠা নদীবক্ষের জল নেমে যাওয়ার পর শুরু হয় ভাঙন। `আগে এই বস্তি থেকে অনেকটাই দূরে ছিল নদী। কিন্তু ভাঙনের জেরে এখন বস্তির একদম কাছে এসে গিয়েছে। ইতিমধ্যেই প্রায় ১৫ বিঘা কৃষিজমি তলিয়ে গিয়েছে নদীতে। গতবছর বর্ষার মরশুমে তিনটি বাড়ি তলিয়ে যায় ভাঙনে। এইবছরও একটি বাড়ি ভাঙনের গ্রাসে গিয়েছে। আতঙ্কে বাড়িছাড়া হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন গোয়ালঘরের বাসিন্দারা। আবার অনেকেই অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কৃষি জমি চলে যাওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা বদলে দৈনিক শ্রমিকের কাজ করছেন। ভিটে বাঁচাতে দ্রুত বাঁধ নির্মাণের দাবিতে সরব হয়েছেন নেপালি বস্তির বাসিন্দারা।` আনন্দবাজার পত্রিকা বলছেন, `গ্রামবাসীদের অভিযোগ, বেআইনি ভাবে নদীখাত থেকে বালি পাথর তোলার কারণে নদী গতিপথ পরিবর্তন করেছে।` আর একটি খবর বলছে, ` ডুয়ার্স­ পুজোর আগে ডুয়ার্সের গয়েরকাটা চা বাগানের বিঘা লাইনে আংরাভাসা নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হবে তো? আশা ও আশঙ্কা এই দুয়েরই দোলাচলের মাঝে এলাকার শ্রমিক মহল্লার বাসিন্দারা। চলতি বর্ষায় এখনও পর্যন্ত সেভাবে নদী তার রুদ্র রূপ ধারণ না করলেও গত দু বছরে কিন্তু গয়েরকাটার টিন লাইন ও বিঘা লাইন এলাকার মোট ২১ টি শ্রমিক আবাস সহ কবর খানা, বাঁশ বাগান ও সুপারি বাগানের কিছুটা অংশ নদী গ্রাস করে নেয়। এছাড়াও দেড়শো বিঘার ওপর কৃষকের চাষের জমি এই আঙরাভাসা নদীর তলে যায় বলে সূত্রের খবর। চলতি বর্ষায় এখনও পর্যন্ত কৃষকের চাষের জমি ছাড়া বড়সড়ও ক্ষয়ক্ষতির খবর নেই।`
ডুয়ার্সের প্রাচীন জনপদ গয়েরকাটার নদী নাম পরিচিত আঙরাভাসা বোধহয় এই জনপদের মূল সুরকে বেঁধে দিয়েছে। শহরের শতাব্দী প্রাচীন লাইব্রেরি থেকে শুরু করে স্কুল, বাড়ি সবেতেই যেন আঙরাভাসার অদৃশ্য উপস্থিতি নজরে আসে। কাছের মধুবনী পার্কটির থেকে আঙরাভাসার দূরত্ব বেশ কিছুটা হলেও, নদীর আভাস পাওয়া যায়। তবে আজও বোধহয় এই জনপদের সেরা আকর্ষণ গয়েরকাটা চা-বাগানের সেই কোয়ার্টারটি যেখানে জন্মেছিলেন সমরেশ মজুমদার। করোনা অতিমারির আগেও নিয়ম করে সেই কোয়ার্টারে আসতেন তিনি। তাঁর সেই কোয়ার্টারের পাশেই থাকেন ডুয়ার্সের অন্য এক বিখ্যাত মানুষ অশীতিপর শ্রদ্ধেয় শ্রী ব্রজগোপাল ঘোষ। অনেকে মনে করেন যে, গয়েরকাটা জায়গাটির নামকরণের পেছনে 'খয়ের' কথাটির অবদান রয়েছে। 'খয়ের' গাছের আধিক্য হেতু 'খয়ের' লোকমুখে 'গয়ের` হয়ে থাকতে পারে। আবার হাতির গর্তে বা খোট্টায় পড়ে যাওয়া থেকেও নামটি আসতে পারে। 'গৈর' অর্থে হাতিকে বোঝানো হচ্ছে। আবার প্রচলিত আর একটি মত হল যে, এখানে গারো সম্প্রদায়ের মানুষেরা বাস করতেন। তারা গ্রামকে 'খোটা' বলতেন। সেখান থেকেও গয়েরকাটা শব্দটি এসে থাকবে। নামকরণের পেছনে যে ইতিহাসই থাকুক, একথা বলবার অপেক্ষা রাখে না যে এই জনপদটি যথেষ্ট প্রাচীন এবং ডুয়ার্সে চা-বাগান বিস্তারের সঙ্গে গয়েরকাটা গড়ে ওঠে।
তবে গয়েরকাটা নামে নয়, স্বর্গছেঁড়া নামে পরিচিত হয়েছে জনপদটি সমরেশ মজুমদারের হাত ধরে। আর তার অনুষঙ্গে যে নামটি সর্বপ্রথমে আসে, সেটি হল আঙরাভাসা। একটি নদীর এই উপস্থিতি তাকে অন্য পরিচয় দিয়েছে। আজ ডুয়ার্সের অন্যতম দ্রষ্টব্য পরিণত হয়েছে আঙরাভাসা। তার ছোট্ট যাত্রায় সে ঠিক কতটা পথ অতিক্রম করেছে, তা যেমন সে নিজেও জানে না, তেমনি আগামীতে আরও কতটা পথ যাবে তারও কোনও ইঙ্গিত মেলে না। ডুডুয়ার আর তার মিলনস্থলে পড়ন্ত সূর্যের আলো পড়ে যে দৃশ্যমুখ সৃষ্টি হয়, তার থেকে অনেক যোজন দূরে এক অদ্ভুত অনির্বচনীয় সৌন্দর্যের অধিকারী আঙরাভাসা তাই এক স্বতন্ত্র নাম উত্তরের নদীকথায়।
প্রকাশিত: দাগ
সম্পাদক: মনোনীতা চক্রবর্তী


 

আত্মনিবেদনের ছট
শৌভিক রায়

স্কুলে দীপক সাসনারের কপালে ফোঁটা দেখতাম। আর রামসেবককাকুও ঠেকুয়া দিয়ে যেতেন। তার আগে অবধি আমাদের বোঝার উপায় ছিল না যে একটি বড় উৎসব চলছে ভারতের বেশ কয়েকটি প্রদেশ জুড়ে...
ছট ঘিরে এখন যে উৎসব-উন্মাদনা দেখতে পাই, গত শতকের সত্তরের শেষ থেকে আশির দশক পর্যন্ত, নিজের ছোটবেলায়, সেরকমটি দেখিনি। এমনটা নয় যে, আমাদের ছোট্ট জনপদ ফালাকাটায় ছট পুজো করবার মানুষজন কম ছিলেন। আসলে কোনও কিছুতেই তখন আজকের এই জৌলুশ থাকত না। থাকবে কীভাবে? সময়টাই তো ছিল ওরকম!
ছটের গুরুত্ব যে দিনদিন বাড়ছে সেটা বুঝতে পারলাম কোচবিহারে আসবার কয়েকবছর পর থেকে। তবে তখনও সাগরদিঘিতে ছোট ছোট ঘাটে পুণ্যার্থীরা পুজো করতেন। অনেককে দণ্ডি কেটে যেতে দেখতাম। এখন ছট উৎসব আরও বড় আকার নিয়েছে। শুধুমাত্র এক শ্রেণির মানুষের মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ নেই ছট। বিভিন্ন ভাষার মানুষ এখন ছট উৎসবে সামিল।
কিন্তু ছট পুজো ব্যাপারটা কী ও কেন? জেনেবুঝে ছট পুজোয় মেতে উঠছি তো? নাকি সবটাই বাঙালির সেই কুখ্যাত হুজুগ!
ছট আসলে সূর্য এবং তার স্ত্রী উষা দেবীর পুজো। যদিও এই পুজোর মূল হল সূর্যের উপাসনা। মনে রাখতে হবে, হিন্দু ধর্মের তেত্রিশ কোটি দেবতার মধ্যে সূর্য হল একমাত্র দেবতা যাঁকে দেখা যায়। বেদে সূর্যকে জগতের আত্মা বলা হয়েছে। সূর্যের আলোর যেমন অনেক রোগ ধ্বংস করার ক্ষমতা রয়েছে, তেমনি সূর্যের শুভ প্রভাবে কোনও ব্যক্তি স্বাস্থ্য ও আত্মবিশ্বাস লাভ করে। বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রে সূর্যকে আত্মা, পিতা, পূর্বপুরুষ, সম্মান এবং উচ্চ সরকারি চাকরির কারক বলা হয়েছে। ছট পুজোয় সূর্য দেবতা ও ছটি মাতা অর্থাত্ ষষ্ঠী দেবীর পুজো করলে সন্তান, সুখ ও কাঙ্খিত ফল পাওয়া যায়।
আবার পুরাণ অনুযায়ী, ছট মাতা হলেন ব্রহ্মার কন্যা এবং সূর্যদেবের বোন। বলা হয়, ব্রহ্মা জগতের সৃষ্টির সময় নিজেকে দুই ভাগে ভাগ করেন। তাঁর ডান দিকটা পুরুষ এবং বাঁ দিক প্রকৃতি হিসেবে প্রকাশিত হয়। প্রকৃতি দেবী অর্থাৎ সৃষ্টির অধিষ্ঠাত্রী দেবী নিজেকে ছয় ভাগে ভাগ করেন এবং তাঁর ষষ্ঠ অংশটি দেবসেনা নামে পরিচিত হয়। ষষ্ঠ অংশ হওয়ায় তিনি ছটি মাইয়া নামেও পরিচিত। সেজন্য অনেক জায়গায় সন্তান জন্মের ষষ্ঠ দিনে সন্তানের মঙ্গল কামনায় ছটি মাতার পুজো করা হয়।
প্রতিবছর কার্তিক মাসের শুক্ল তিথিতে চতুর্দশীর দিন (কালীপুজোর ০৬ দিন পর) থেকে সপ্তমী পর্যন্ত মোট চার দিন ধরে ছট পুজো অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া চৈত্র মাসে একই নিয়মে আরও একবার ছট পুজো হয়। কার্তিক মাসের ছট পুজোকে কার্তিক ছট এবং চৈত্র মাসের ছট পুজোকে চৈতি ছট বলা হয়। রামায়ণ এবং মহাভারতের কাহিনীতে ছট পুজোর বর্ণনা পাওয়া যায়। রামায়ণে শ্রী রামচন্দ্র লঙ্কা থেকে অযোধ্যায় ফিরে আসেন। অযোধ্যায় ফিরে এলে রামচন্দ্রের রাজ্য অভিষেক করা হয়। রামচন্দ্র তখন তার পত্নী সীতার সঙ্গে প্রজা কল্যাণে রামরাজ্য স্থাপনের জন্য কার্তিক মাসের শুক্ল ষষ্ঠীতে সূর্যের উপাসনা করেছিলেন। মহাভারতে, পঞ্চ পান্ডবদের স্ত্রী দ্রৌপদী কৌরবদের হাত থেকে হস্তিনা পুরের রাজপাট ফিরে পাবার জন্য সূর্যের উপাসনা করেছিলেন। এছাড়াও সূর্য পুত্র কর্ণ প্রত্যহ সকালবেলা স্নান সেরে অঙ্গরাজ্যের কল্যানে সূর্যের উপাসনা করতেন।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের কাহিনীতে মা অন্নপূর্ণার ছট পুজো করার উল্লেখ পাওয়া যায়। একবার আষাঢ় মাসে বর্ষার আগমনে চাষিরা খেতে শস্য বুনে দেয়। কিন্তু ধীরে ধীরে বর্ষা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ে তখন সূর্যের প্রবল দাবদাহে মাঠ ঘাট পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। চাষীদের ঘরে অন্নাভাব শুরু হয়ে যায়। চাষিরা তখন মা অন্নপূর্ণার স্মরণ নেয়। মা অন্নপূর্ণা উপায় না দেখে সূর্যদেবের ধ্যানে মগ্ন হন। কিন্তু সূর্যদেবের ধ্যান করে বিশেষ ফল পাওয়া যায় না। উল্টে মা অন্নপূর্ণা সূর্যের প্রখর রোদ্রের তেজে জীর্ণ হয়ে যান। দেবতারা মা অন্নপূর্ণার করুণ দশা দেখে সকলে মিলে সূর্যের স্মরণাপন্ন হন। সূর্যদেব তখন মা অন্নপূর্ণাকে কার্তিক মাসের শুল্ক পক্ষে ষষ্ঠিতে গঙ্গা তীরে গিয়ে সূর্য উপাসনা করার বিধান দেন। এরপর মা অন্নপূর্ণা গঙ্গাতীরে সূর্যের উপাসনা করেন। পৃথিবী আবার সবুজ হয়। সেই থেকে পরিবারের মহিলারা মূলত পরিবার ও বিশ্বের কল্যানে ছট পুজো করে থাকেন।
আরও একটি আখ্যান বলছে, স্বয়ম্ভু মনুর পুত্র রাজা প্রিয়ব্রত এবং তাঁর স্ত্রী মালিনী ছিলেন নিঃসন্তান। তাঁদের সন্তান লাভের জন্য মহর্ষি কাশ্যপ পুত্র্যেষ্টি যজ্ঞ করার পরামর্শ দেন। যজ্ঞের কিছুকাল পরে মালিনী অন্তঃসত্ত্বা হলেও তাঁর গর্ভজাত সন্তানের মৃত্যু হয়। এর পর ছটি মাতা প্রিয়ব্রতকে দর্শন দিয়ে সন্তান লাভের জন্য তাঁর উপাসনা করতে বলেন। রাজা সেই দেবীর নির্দেশ মতো পুজো করেন এবং পুত্র সন্তান লাভ করেন। বলা হয়ে থাকে, সেই দিনটি ছিল কার্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ দিন। তার পর থেকেই এই পুজোর প্রচার হয়।
ছট শব্দটি ষষ্ঠ থেকে নেওয়া হয়েছে। বিহারি ভোজপুরি এবং মৈথিলী ভাষায় ষষ্ঠ-কে ছঠি উচ্চারণ করা হয়। ছট পুজো হল মূলত সূর্য দেবের পুজো। সূর্যের ছটা অর্থাৎ সূর্য কিরণকে এখানে ছঠি হয়ে গেছে। তাছাড়া ছট পুজোয় ষষ্ঠীর দিনকেই ছট পুজোর সন্ধ্যাকালীন অর্ঘ্য উৎসর্গের প্রধান দিন হিসাবে ধরা হয় তাই এখানে ষষ্ঠীর দিনটাকে ছয় দিন অথাৎ ছঠি ধরা হয়। ছট পুজোর প্রথম দিন মানে চতুর্দশীর দিন ছট ব্রতীরা শুদ্ধ বস্ত্রে ছট পুজোর জন্য ব্রতী হয় এবং সেই দিন লবন ছাড়া ছোলার ডাল,মিষ্টি কুমড়ো দিয়ে ভাত রান্না করে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে প্রসাদ হিসাবে গ্রহণ করে। ছট পুজোর দ্বিতীয় দিন অথাৎ পঞ্চমীর দিন হল খরনা ব্রত পালনের দিন। এই দিন থেকেই ছট পুজোর নির্জলা ৩৬ ঘন্টার উপোস শুরু হয়। এই দিন ছট ব্রতী মহিলারা কাঠের আঁচে মাটির উনুনে গুড়ের পায়েস রান্না করে খেয়ে পড়ে ছট পুজো (ছট মাইয়ার ব্রত রাখে) এবং ঠেকুয়া,নাড়ু ইত্যাদি প্রসাদ তৈরী করে। ছট পুজোর তৃতীয় দিন হল ষষ্ঠীর দিন। এই দিনে ছট ব্রতী মহিলারা সূর্যাস্তের সময় ডুবিত সূর্যকে গঙ্গা ঘাটে কিংবা বড় জলাশয়ে ধারে ধামা ভর্তি করে গোটা আখ গাছ, হলুদ গাছে এছাড়া পুজোর বিভিন্ন উপাদেয় সামগ্রী নিয়ে গিয়ে সূর্য দেবের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য নিবেদন করেন। ছট পুজোর চতুর্থ দিন হল সপ্তমীর দিন। এই দিন সকাল বেলা সূর্যোদয়ের সময় ছট ব্রতী মহিলারা তাদের পরিবারের সঙ্গে ছট ঘাটে গিয়ে সূর্যদেবকে অর্ঘ্য নিবেদন করে ছট উপবাস ভঙ্গ করে।
বৈজ্ঞানিক ও জ্যোতিষী দৃষ্টিকোণ থেকে ছট উৎসবের গুরুত্ব অপরিসীম। কার্তিক শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথি একটি বিশেষ জ্যোতির্বিদ্যার উপলক্ষ, যখন সূর্য পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত। এই সময়ে, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণে পৃথিবীতে সংগৃহীত হয়। এই ক্ষতিকর রশ্মি মানুষের চোখ, পেট ও ত্বকে সরাসরি প্রভাব ফেলে। মনে করা হয় সূর্যদেবের পুজো ও অর্ঘ্য নিবেদনেই মাধ্যমে অতিবেগুনি রশ্মি যেন মানুষের ক্ষতি না করে সেই চেষ্টাই করা হয়। এই পুজোর মাধ্যমে শরীর থেকে টক্সিন দূর করা হয়। সূর্যের প্রথম আলোয় গঙ্গাস্নান করলে শরীরে সোলার বায়ো-ইলেকট্রিসিটি সঞ্চালিত হয় যা বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়ায় সাহায্য করে। অনেকে মনে করেন শীতকাল শুরুর আগে এই প্রক্রিয়া শরীর থেকে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস দূর করতে সাহায্য করে।
ছট পুজো এখন গো-বলয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ভারতের বহু অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। একসময় উত্তর ভারতের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ধর্মীয় উৎসবটি এখন আর শুধু তাদের নেই। আজকাল অনেকেই ছট পুজো করে থাকেন। কার্তিক মাসের এই হালকা ঠাণ্ডায় নদীতে বা জলাশয়ে নেমে সূর্যদেবের উপাসনা নিঃসন্দেহে অন্য মাত্রা নিয়ে আসে। আসলে যে কোনও উৎসব বা ধর্মীয় আচরণের মধ্যে কিছু বৈজ্ঞানিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাপার লুকিয়ে থাকে। তাই ছট শুধুমাত্র সূর্যদেবের বা ছটি মাইয়ার পুজো নয়, ছটের অন্তর্নিহিত অর্থ লুকিয়ে রয়েছে সুখ সমৃদ্ধি সুস্বাস্থ্য কামনার আত্মনিবেদন।
ছবি: ঋতভাষ রায়
তথ্য: বিকাশপিডিয়া, হিন্দুস্থান টাইমস, আনন্দবাজার পত্রিকা, এই সময়

Tuesday, November 7, 2023

 ড. চৌধুরী

শৌভিক রায় 


ফালাকাটা বেসিক স্কুল আর গ্রামীণ হাসপাতালের মাঝখান দিয়ে একটা কাঁচা পথ চলে গেছে। সেই পথে নড়বড়ে কাঠের সেতুতে সাপটানা পার হলেই মিল রোড ছোঁওয়া যেত।


বেসিক স্কুলের চারটে কোয়ার্টার। একটায় শেফালী দিদিমণি। তাঁর পাশে রাঙাদার কোয়ার্টার। কী আশ্চর্য! রাঙাদার আসল নামটা আজও জানি না! ধুতি ফতুয়া আর খালি পায়ের অকৃতদার মানুষটি আমার দেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম নিরীহ ও শান্ত মানুষ। তাঁর চরম রাগ মানে চক দিয়ে কপালে একটা ফোঁটা দেওয়া। এই দুই কোয়ার্টারের পরে একটু ফাঁকা জায়গা। তারপর বড়দা আর প্রীতি দিদিমণির কোয়ার্টার। এরপরেই সেই রাস্তা। আর রাস্তার পরেই হাসপাতালের কোয়ার্টার শুরু। প্রথমেই যে কোয়ার্টারটি তাতে থাকেন ড. চৌধুরী। 


যে সময়ের কথা বলছি তখন ফালাকাটা ছোট্ট। ছিমছাম। সুন্দর। আরণ্যক। গ্রামীণ হাসপাতালে সেরকম পরিকাঠামো না থাকলেও, শুধুমাত্র ড. চৌধুরীর জন্য আশেপাশে থেকে প্রচুর রুগী আসত। 


মনে হতেই পারে, ডক্টরের কাছে রুগী আসবে সেটা আর নতুন কী! আসলে আজকের দিনের পরিস্থিতিতে ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাবে না। এখন ফালাকাটায় সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল (জানিনা অবশ্য সেটা কতটা নামে আর কতটা কাজে), নার্সিং হোম, প্যাথ ল্যাব, নানা রোগের ডাক্তার। কিন্তু সেই সময় ওরকম ছোট্ট জনপদে কোথায় ডাক্তার! চিকিৎসার জন্য সেই আমলের লোকেদের হামেশাই কোচবিহার বা জলপাইগুড়ি দৌড়তে হত। একটু ক্রিটিক্যাল হলে শিলিগুড়ি। সেখানে ড. চৌধুরী ছিলেন এক মনোরম ওয়েসিসের মতো। গ্রামীণ হাসপাতালের জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ সবই তাঁর দায়িত্বে। হরেক কিসিমের রুগী তাঁর তত্বাবধানে। 


আমরাও ফালাকাটা হাই স্কুলের কোয়ার্টারে থাকতাম। সুতরাং কোয়ার্টারতুতো একটা সখ্যতা আমাদের সবার মধ্যেই ছিল। বেসিক স্কুলের বিরাট মাঠে বুড়োদা, বাবলু, মধুমিতাদি, নন্দিতা, আখু ও আমার সঙ্গে খেলতে আসত মহুয়া। ও ড. চৌধুরীর মেয়ে ও ফালাকাটায় আমার প্রথম বন্ধু। কাকিমা ছিলেন খাস কলকাতার মানুষ। ওদের তিনজনের কথা শুনে হা হয়ে যেতাম। কেমন 'খেয়েছি' 'করেছি' করে বলতেন ওরা! মহুয়ার জামা কাপড়ও ছিল আমাদের তুলনায় একটু বেশি ভাল। 


তবে দুষ্টুমি আর দুরন্তপনায় আমি বরাবর সেরা ছিলাম। আমার উৎপাতে দিদা (ঠাকুমা) গরম খুন্তির ছেঁকাও দিয়েছিলেন একবার। আর সেজন্যই বোধহয় ড. চৌধুরীর সঙ্গে আমার বেশি ভাব ছিল। 


কেন? বলছি সেকথা।


দিনহাটা হাই স্কুলের গেটটা ছিল বিরাট বড়। কাঠের পোক্ত ফ্রেমে শক্ত লোহার শিক। ফালাকাটা থেকে দিনহাটায় গেলে, ওই গেট ধরে ঝোলা ছিল অনেক খেলার একটা। একবার ওরকমই ঝুলছি। পেছন থেকে মধু দিল জোরে ধাক্কা। আচমকা ধাক্কায় হুমড়ি খেয়ে কপালে প্রবল ঠোক্কর খেলাম শক্ত লোহার শিকে। মুহূর্তে কপাল ফুলে গেল। সঙ্গে ব্যথা। দুদিন পর ফালাকাটা ফিরলাম। গায়ে জ্বর। কপালের অসম্ভব অবস্থা। আরও ফুলে গেছে। পুরো কপাল নীল। একটা ঘোর মতো অবস্থা।


বাবা আঁতকে উঠলেন অবস্থা দেখে। এরকম নীল বর্ণ কপাল আশা করেননি আসলে। অতএব দৌড়লেন ড. চৌধুরীর কাছে। ব্যস্ত মানুষটি ছুটে এলেন। ইনজেকশন দিলেন। সঙ্গে আরও কিছু ওষুধ। রাতের বেলায় আবার এলেন। এবার ওঁর সঙ্গে কাকিমা আর মহুয়া।

কিছু একটা মলম হাতে করে এনেছিলেন ড. চৌধুরী। সেটা মেখে মেখে কয়েকদিন পর সেই ব্যথা কমল। ফোলাও। 


কিছুদিন পর আবার বেসিক স্কুলের কাঁটা তারে পায়ের আঙুল আটকে শুরু হল প্রবল রক্তপাত। সেদিন ছিল হোলি। মনে আছে মহুয়াদের কোয়ার্টারের বারান্দা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। বুড়োদা, আখু, মধুমিতাদি, নন্দিতা চিৎকার করে কাকিমাকে ডাকছে। কাকিমা রঙের ভয়ে দরজা খুলছেন না। শেষে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে ওই অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গে হসপিটালে নিয়ে গেলেন। ড. চৌধুরী সেদিনও আমার ভগবান। আবার সেই জ্বর। আবার রাতে তাঁর আসা। আমাকে দেখে যাওয়া। তাঁর চিকিৎসায় সেরে ওঠা।


এরকম আরও বেশ কিছু ঘটনা আছে। সেসব আর বলছি না। যখন ক্লাস ফাইভে উঠলাম, তখন ওঁরা কলকাতায় চলে গেলেন। তাঁর আগে আমরা দুই পরিবার ফুন্টশেলিং গেছি। জলদাপাড়ার হলং ট্যুরিস্ট লজে থেকেছি। নিত্য যাতায়াত তো ছিলই হসপিটাল কোয়ার্টারে ওঁর বাড়িতে আমাদের স্কুল কোয়ার্টার থেকে। ফালাকাটা ছাড়বার পরেও সল্টলেকে ওঁর বাড়িতে গেছি। ফালাকাটায় আমাদের কলেজ পাড়ার বাড়িতেও এসেছেন ওঁরা। তখন আমি ইউনিভার্সিটিতে যাব বলে অপেক্ষা করছি। 


ড. চৌধুরীকে আমার সেই শেষ দেখা। একই রকম দুরন্ত আছি কিনা জানতে চেয়েছিলেন। হেসে ছিলাম। মনে মনে বলেছিলাম, আপনি চলে গিয়ে আমার দুরন্তপনা শেষ। পুটন যেদিন খড়খড়ে গামছা দিয়ে কপালে একশ আট বার ঘষে রাজটিকা তুলে দিয়েছিল, সেদিন আপনার কথা খুব মনে হচ্ছিল। কেননা ওই ঘষায় কপালে দগদগে ঘা হয়েছিল। সঙ্গে জুটেছিল বাবা আর দাদার বেধড়ক মার। পুটন ভয়ের চোটে বহুদিন আমাদের বাড়িতেই আসেনি। আপনি থাকলে সেদিন ওই মার খেতে হত না। ঘা মিলিয়ে যেত আপনার ম্যাজিক টাচে!


দীর্ঘদিন যোগাযোগ ছিল না ওদের কারও সঙ্গে। ফেসবুকের দৌলতে মহুয়া খুঁজে পেয়েছিল আমাকে। মহুয়ার সঙ্গে দেখা হলেও ড. চৌধুরী বা কাকিমা কারও সঙ্গে দেখা হয়নি আর। সেদিন মহুয়া আমার পোস্টে কমেন্ট করেছে, "শুভু রে, আজ আমার বাবা চলে গেলেন। তোর, আমার বাবা মায়েরা আবার সেই ছোটবেলার মতো আড্ডার আসরে বসবেন আকাশে তারাদের মাঝে।"


কাকিমার খবর জানতাম। ড. চৌধুরী কাকুও চলে গেলেন। আমার বাবা মা তো আগেই....!


যেতে হবে। নিয়ম সেটাই। মানতে হবে। মানছিও।


কিন্তু একই সঙ্গে কষ্ট পাচ্ছি, জীবনের সেই প্রথম জাদু হাতটা, যার স্পর্শে আমি শীতল হতাম, যার স্পর্শ অভয় দিত আমার বেলাগাম দুরন্তপনায়, হারিয়ে গেল বলে....


কাকু....ভাল থাকবেন। 

আমরা আক্ষরিক অর্থেই অনাথ এখন! 



Monday, November 6, 2023


 

মোখার সঙ্গে মোলাকাত

শৌভিক রায়


সাত মে সকাল সাড়ে নটায় যখন পোর্ট ব্লেয়ারে নামলাম, আকাশ তখন ঝকঝকে নীল। মিনি বে'র ন্যাভাল কোয়ার্টারের ফাঁকফোকর দিয়ে স্বচ্ছ জলের সমুদ্র দেখে ওখানকার লোকদের সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। 


আস্তানা ছিল কাপুরদের হোম স্টে। ফিনিক্স বে'র মওলানা আজাদ রোডের ধারে এই বাড়িটি শতাব্দী প্রাচীন। পুরোনো আন্দামান যেন জড়িয়ে রয়েছে বাড়িটিকে। বাড়ির নাম সিভিউ দেখে বিস্মিত হতেই, মিসেস কাপুর হেসে জানালেন, বহুতল হয়ে এখন আর কিছুই দেখা যায় না। আগে তিন-চারশ মিটারের মধ্যে খেলা করত সমুদ্র। 


মে মাসের এই গরমে, মোচা যখন চোখ রাঙাচ্ছে, আন্দামান যাচ্ছি শুনে অনেকেই মানা করেছিল। কিন্তু চিরদিন তো উল্টোটাই করে এসেছি। সঙ্গী মহিলাটিও তাই। অবশ্য ঘূর্ণিঝড়ে সমুদ্র কীরকম মারাত্মক হয় সেটা দেখবার একটা চাপা ইচ্ছেও ছিল। কিন্তু সেল ফোনে মৎসজীবীদের সমুদ্রে যেতে সাবধান করা আর দুই এক জায়গায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার মেসেজ ছাড়া ঝড়ের কিছুই বুঝতে পারিনি আজ সকালেও। 


বরং প্রথম দুদিনে ফটফটে রোদে চুটিয়ে পোর্ট ব্লেয়ারের আশেপাশের দ্বীপগুলি ঘুরে নিয়েছি। তাপমাত্রা খাতায় কলমে ৩২ ডিগ্রি ছিল, কিন্তু 'ফিল' ছিল আটত্রিশের কাছাকাছি। গরমে ক্লান্ত মধ্যপ্রদেশ থেকে আসা বর্ষীয়ান কুলকার্নি দম্পতি একগাল হেসে বলছিলেন, "ময়েশ্চার জাদা, ইস লিয়ে থক গয়ে।" 


আর্দ্রতা যে বেশি সেটি অবশ্য বুঝতে পারছিলাম নিজের ঘেমো অবস্থা দেখে। কিন্তু ঝড়ের বিন্দুমাত্র চিহ্ন পাইনি এই দুদিন। নিম্নচাপ ঘনীভূত হলে এরকম গরম হয় শুনেছি। হয়ত সেটাই ছিল পূর্বাভাস।


অসহ্য গরমের পর গতকাল সকালে একটু বৃষ্টি পেলাম। মেঘের ডাক শুনলাম দুই একবার। কিন্তু সেসব অতি সাধারণ। সাড়ে সাতটায় পোর্ট ব্লেয়ার থেকে হ্যাভলক (স্বরাজ দ্বীপ) আসার দুই ঘণ্টার জলপথে বরং ভেসেল এত দুলছিল যে, অনেকে জানালার ধার থেকে উঠে মাঝে চলে এলেন। বাকি সব একই। সারা রাস্তাতেই মেঘ আর সূর্যের লুকোচুরি খেলা। গত দুদিনের তুলনায় নীল সমুদ্র কিছুটা ঘোলাটে।


হ্যাভলক ঝিরিঝিরি বৃষ্টি দিয়ে স্বাগত জানালেও ঘন মেঘ ছিল না। শরতের পেঁজা তুলোর মতোই এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিল তারা আকাশের ক্যানভাসে। হ্যাভলকের বাসিন্দারা অবশ্য অপেক্ষা করে ছিলেন বৃষ্টি নামার। তাহলে নাকি গরম কমবে। যদি মোচা আসে? "ঝড় সহ্য করার অভ্যেস আছে। জীবনের ঝড়ের কাছে কী এমন কঠিন সে?" সহজ দর্শন তাদের। কিন্তু ঝড় এলে তো ক্ষতি। কিছু করার নেই। মেনে নিতে হবে সেটাই। তাছাড়াও এটি হল উৎসস্থল। হাওয়া বইতে পারে। বৃষ্টি হতে পারে। জলপথ চলাচল বন্ধ থাকতে পারে। এর বেশি খুব কিছু হবে না। নিশ্চিন্ত এখানকার স্থানীয়রা।



ব্রিটিশ জেনারেল স্যার হেনরি হ্যাভলকের নামে পরিচিত এই দ্বীপ আজ স্বরাজ দ্বীপ বলা হয়। প্রধানমন্ত্রী মাননীয় নরেন্দ্র মোদি ২০১৮ সালে দ্বীপের নতুন নামকরণ করেন। এই নামকরণের ইতিহাস অবশ্য লুকিয়ে ১৯৪৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে স্বাধীন ঘোষণা করার বার্তায়।

'রিচিস আর্কিপেলাগো'র অন্যতম বৃহৎ এই দ্বীপটি লম্বায় ১৮ কিমি, চওড়ায় ৮ কিমি। দ্বীপের কোস্টলাইন হল ৫৮.৫ কিমি। অন্যান্য দ্বীপের মতো এটিও টিলা আর জঙ্গল অধ্যুষিত। তবে জঙ্গলে কোনও হিংস্র প্রাণী নেই। বাড়িঘরগুলি ইতস্তত ছড়ানো। মাঝে প্রচুর ফাঁকা জায়গা।


কিন্তু রিচিস আর্কিপেলাগো ব্যাপারটি কী? আর্কিপেলাগো বলতে বোঝায় ছোট ছোট দ্বীপের ক্লাস্টারকে। ব্রিটিশ মেরিন সার্ভেয়ার জন রিচি দুই দশক ধরে আন্দামান ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় সমীক্ষা চালিয়ে প্রথম আন্দামান ও নিকোবর সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্য তাঁর এই অসাধারণ কাজ সে আমলে বিশেষ পাত্তা পায়নি। হতাশ মানুষটি ১৭৮৭ সালে নিজের দেশে ফিরে যান। আর কী পরিহাস, তার ঠিক বছর দুই পরে তাঁরই দেখানো দ্বীপপুঞ্জে পেনাল সেটেলমেন্ট তৈরি করতে পা রাখে ব্রিটিশরা।


হ্যাভলক দ্বীপে আমাদের আস্তানা হল ডলফিন রিসোর্টে। আধা-সরকারি এই বিরাট রিসোর্টটির ব্যবস্থাপনা অতুলনীয়। বিশাল জায়গা নিয়ে তৈরি হওয়া রিসোর্টে বিভিন্ন ধরণের কটেজ রয়েছে। আছে রেস্টুরেন্ট, বার, অ্যাসেম্বলি হল আর নিজস্ব বিচ। সম্পূর্ণ রিসোর্ট নারকেল বাগিচায় ছাওয়া। তা বাদেও আছে নানা ধরণের গাছ, ফুল। ঝুনো নারকেল পড়ে রয়েছে সর্বত্র। কেউ তাকিয়েও দেখছে না। ব্যাগপত্র রেখে দৌড়লাম নিজেদের রিসোর্টের বিচে। সবুজ পান্নার মতো জল। জোয়ারের সময় বলে বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে। একদিকে মিহি বালি আর অন্য দিকে শক্ত মাটি। সময় যে কোনদিক দিয়ে কেটে গেল টেরও পেলাম না!



ঠিক করাই ছিল রাধানগর বিচে অনেকটা সময় কাটাব। দেখব সানসেট। হ্যাভলকের এই বিচটি ২০০৪ সালে টাইম পত্রিকার বিচারে এশিয়ার শ্রেষ্ঠ বিচের মর্যাদা পেয়েছে। পৃথিবীর সেরা দশটি বিচের অন্যতম এটি। এছাড়াও ২০২০ সালে পেয়েছে অত্যন্ত মর্যাদাকর ব্লু ফ্ল্যাগ বিচের তকমা। Foundation for Environmental Education থেকে প্রদত্ত এই পুরস্কারের ক্ষেত্রে জলের কোয়ালিটি, পরিবেশ সম্পর্কিত তথ্য, পরিবেশ রক্ষা এবং সুরক্ষা ও সার্ভিস ইত্যাদি দিকগুলি দেখা হয়। যেসব জায়গায় স্থানীয় কমিউনিটি নিজেদের প্রচেষ্টায় কোনও বিচকে প্রোমোট করে, তারাই এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়।


রাধানগর বিচের বিশালত্বের মাঝে মুহূর্তেই হারিয়ে গেলাম। উত্তরের দিকে জঙ্গল আর টিলা আর সামনে বিরাট বেলাভূমি ও সমুদ্র। তার রঙ কখনও নীল হচ্ছে, কখনও সবুজ। ঢেউ ভাঙছে খুব মৃদু লয়ে। আবার কখনও বিরাট বিরাট ঢেউ আছড়ে পড়ছে নিজেদের খুশি মতো। দক্ষিণের দিকে কিছু রক আর টিলার এগিয়ে আসা অংশ। সেটা পার করেও একই রকম চঞ্চল সমুদ্র। দুই কিমি লম্বা এই বিচের ট্রপিক্যাল অরণ্যও অসাধারণ।


একটা গাছের গুঁড়ি দেখে জাঁকিয়ে বসলাম। লোকজন খুব কিছু নেই। তবু তার মধ্যে অস্ট্রিয়া থেকে আসা বারবারা নামের এক তরুণীর সঙ্গে আমার সঙ্গী মহিলাটির ভাব হয়ে গেল। হাত ধরাধরি করে খানিকক্ষণ দুজনে ঘুরে ফিরেও বেরালো। দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি প্রতিটি মুহূর্ত নিংড়ে নিলাম! এক অসামান্য অভিজ্ঞতা। এর কোনও তুলনাই হয় না!


সাড়ে নয়টার মধ্যে ডিনার হয়ে গেলেও, রিসোর্টের বিচে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। রাতের সমুদ্রের একটা অন্যরকম মাদকতা আছে। বিরাট বিরাট রকের গায়ে ধাক্কা খেয়ে জল যখন ছড়িয়ে পড়ে, আধা-অন্ধকারে তার রূপ আলাদা হয়ে যায়! সঙ্গে রয়েছে সমুদ্রের নিজস্ব সঙ্গীত। সেই গান যে শুনেছে সে মরেছে!



দশ মে সূর্যোদয়ের আগেই উঠেছিলাম। দেখি সমুদ্র অনেকটা দূরে সরে গেছে। ভোরের আকাশ বেশ পরিষ্কার আর ঝকঝকে। অদ্ভুত এক মায়াময় পরিবেশ। সকালের নরম আলোয় হ্যাভলককে মনে হচ্ছিল স্বর্গ যেন! রিসোর্টটিকেও অপূর্ব লাগছে। নিজেদের মতো বেশ খানিকটা সময় কাটানো গেল রিসোর্টের বিচে বসে আর মাটিতে পড়ে থাকা নারকেল কুড়িয়ে।


ঝটপট রেডি হয়ে চলে গেলাম কালাপাথর বিচে। আগেই ঠিক ছিল, এলিফ্যান্ট বিচ দেখব না। ওই বিচে হাতি রাখা থাকলেও সেগুলি বুনো নয়। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের পোষ মানা। ডুয়ার্সে বড় হয়ে ওঠা ও উত্তরবঙ্গে থাকবার সুবাদে হাতি প্রাণীটির সঙ্গে এমনিতেই বিশেষ পরিচয় রয়েছে। নতুন করে আর দেখতে চাইনি তাই। তার চেয়ে চললাম কালাপাথর বিচে।


কালাপাথর বিচের কথা প্রথম শুনেছিলাম ছোট ভাই প্রসূনের কাছে। নিজে দেখে বুঝলাম এক বর্ণ বাড়িয়ে বলেনি ও। সত্যিই পিকচার পোস্ট কার্ডের মতো এই বিচ। ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এখানে সমুদ্রের সঙ্গে মিলে এমন শিল্প সৃষ্টি করেছে যে, তার দ্বিতীয় উদাহরণ একটিও নেই। আর সমুদ্রের পান্না সবুজ চোখে বিভ্রম ঘটেছে মুহুর্মুহ। এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।


বসে বসে দেখছি সেসব। কোচবিহার থেকে ফোন এলো। টিভিতে দেখাচ্ছে সামুদ্রিক ঝড় মোখা চোখ রাঙাচ্ছে। আমরা কেমন আছি! দিব্যি রোদ। দারুণ সুন্দর চারদিক। হাসিই পেলো। ঝটপট ছবি তুলে পাঠিয়ে দিলাম।


বৃষ্টি শুরু হল বেলা এগারোটায়। সমুদ্রও সামান্য অশান্ত হল। সমুদ্রে বৃষ্টির অন্য রূপ। অনবদ্য লাগছে। রং পাল্টে গেল জলের। একটু ঘোলা, একটু আলাদা। কিন্তু দুরন্ত চারধার। ম্যানগ্রোভ, রক, সমুদ্র আর বৃষ্টি.....এক অনবদ্য কম্বিনেশন!



একটু পরেই পেলাম খারাপ খবরটা। মোখা তাণ্ডব শুরু করেছে। দ্বীপে বসে বোঝা না গেলেও সমুদ্র নাকি উত্তাল। অতএব পোর্ট ব্লেয়ার থেকে কোনও ক্রুজ আসেনি। হ্যাভলক থেকেও জলযান ছাড়বার অনুমতি মেলেনি। সাধারণত হ্যাভলক থেকে দফায় দফায় নিল যাওয়ার বোট মেলে। কিন্তু নিল দ্বীপ ওপেন সি তে হওয়ায় সেখানে সমুদ্র উত্তাল। হ্যাভলক খানিকটা খাঁড়ির মধ্যে।


মাথায় হাত পড়ল। ভাই রুদ্রর মুখে শুনে শুনে নিল সম্পর্কে আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু শুধুমাত্র নিলের জন্য এতদিন অপেক্ষা করা বোকামি। কেননা পরশু আমার যাওয়ার কথা ডিগলিপুর। যে কোনও ভাবে আগামীকাল পোর্ট ব্লেয়ার পৌঁছতেই হবে। কাল সকালে আবহাওয়া ঠিক হলে না হয় নিল ছুঁয়ে পোর্ট ব্লেয়ার চলে যাব। থাকলাম না নিলে। সেরকম হলে পোর্ট ব্লেয়ার থেকে দিন এসে দিন ফিরে যাব। এসব নানা ভাবনার মধ্যেই খবর এলো দিন তিনেকের মধ্যে নিলে যাওয়ার অনুমতি আর পাওয়া যাবে না!


কী করব, না করব বুঝতে পারছি না। সাহায্য করল অনন্ত। আমি ঠিক ট্যুর অপারেটরের সাজানো সূচিতে না ঘুরলেও, হোটেল বুকিং আর গাড়ির জন্য সাহায্য নিচ্ছিলাম। হ্যাভলকের বাঙালি তরুণ অনন্ত সেরকমই একজন। যাহোক বিকেলের দিকে সমুদ্রের আবহাওয়া একটু ভাল হওয়ায় পোর্ট ব্লেয়ার থেকে নওটিকা সহ আরও একটি ক্রুজ এলো।


কখনও ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি, কখনও হালকা রোদ আর মেঘ এরকমই চলছিল। বুঝবার কোনও উপায় নেই মাঝ সমুদ্রে কী চলছে। যাহোক অনন্ত আমাদের ব্যবস্থা করে দিল। এমনিতে আমাদের টিকিট ছিল হ্যাভলক থেকে নিল আর নিল থেকে পোর্ট ব্লেয়ার। মাঝে নিলে এক রাত থাকা। হ্যাভলক-নিল টিকিট ক্যানসেল হচ্ছে। কিন্তু নতুন করে টিকিট কাটবার দরকার নেই। ওই টিকিটেই হয়ে যাবে। কেননা নিলে আগামী তিন চারদিন কোনও ভেসেল যাবে না।


আমাদের ভেসেল নওটিকায় জানালার ধারে বসলাম। নিল দেখতে পেলাম না বলে মন বিষন্ন হয়ে রয়েছে। তবে এই মুহুর্তের পরিস্থিতি বিচারে পোর্ট ব্লেয়ার ফেরাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।



মিনিট দশেকের মধ্যে মাঝ-সমুদ্রে এসে পড়লাম। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক ক্রুজে বসে টের পাচ্ছিলাম সমুদ্রে প্রলয় চলছে। হাওয়ার প্রবল বেগ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।


আমাদের সমান্তরাল চলছে আর একটি ক্রুজ। খানিক পর শুরু হল প্রবল দুলুনি! একতলা দেড় তলা বাড়ির সমান উঁচু এক একটি ঢেউ আছড়ে পড়তে শুরু করল ক্রুজের গায়ে। খোলামকুচির মতো একবার ঢেউয়ের ওপরে উঠছি, মুহূর্তেই ধপ করে নিচে নামছি। ঢেউ কখনও ঢেকে দিচ্ছে ডাবল ডেকার ক্রুজকে। আমাদের সঙ্গে থাকা ক্রুজটি পিছিয়ে গেছে। অথবা ফিরে গেছে।


অবর্ণনীয় অবস্থা। জানালার ধারে বসেছি বলে সমুদ্রের অবস্থাটা ভাল করে বুঝতে পারছিলাম। কোথায় সেই গাঢ় নীল অথবা পান্না সবুজ সমুদ্র! বরং কুচক্রির ঘোলাটে চোখের মতো তার রঙ। দু'হাত তুলে বিপুল জলরাশি সে ছুঁড়ে দিচ্ছে আমাদের দিকে। রীতিমতো ছেলেখেলা করছে।

বাতাস আর সমুদ্রের মিলিত গর্জনে ক্রুজের আওয়াজ চাপা পড়ে গেছে। ঢেউ ওপরে উঠে যেন থাপ্পড় মারছে ভেসেলের মাথায়। টালমাটাল অবস্থা। এ ওর গায়ে পড়ছে। বিলাস বহুল ক্রুজের স্মার্ট টিভি থেকে শুরু করে সব কিছু বন্ধ। শুধু পরিত্রাহি চিৎকার। আমার চোখে শুধু পুত্রের মুখ ভাসছে! যে অবস্থা তাতে আর উপায় নেই। আজ আর বাঁচব না। সলিল সমাধি হবে বুঝতে পারছি। থর থর করে কাঁপছে নওটিকা। অন্ধকারও ঘনিয়ে এসেছে। ক্রুজের নিচে থেকেও বিকট যান্ত্রিক আওয়াজ ভেসে আসছে।


এরপর বোধহয় শুরু হল আরও বেশি তাণ্ডব। এক মুহুর্ত থেমে নেই ক্রুজের দুলুনি। সমুদ্র আরও মারাত্মক। কোনও ব্রেকার নেই। শুধু ঢেউ আর ঢেউ। আর এক একটা ঢেউয়ের কী বিরাট উচ্চতা! কল্পনা করা যায় না। প্রবল অভিঘাতে ক্রুজ একবার এদিকে আর একবার ওদিকে টলছে। বার কয়েক পুরো উল্টে যেতে যেতেও রক্ষে পেল যখন তখন দিক পরিবর্তন করলেন ক্যাপ্টেন। ফিরে চললেন আবার। হ্যাভলকে। সেদিনের যাত্রা বাতিল হল। বললেন, পরদিন সকালে আবার চেষ্টা করবেন।


ডলফিন রিসোর্টে বুকিং নেই আর। ইতিমধ্যে যারা এসেছে তারা আর আমরা এই যাত্রা বাতিলের দল মিলে মোটামুটি ভাল ভিড়। তবু একটি রিসোর্টে জায়গা হল। ফোনে ছেলের বকুনি শুনে ঘুমোতে গেলাম। কিছুতেই ঘুম এলো না। ভোরে উঠে আবার দৌড়লাম জেটিতে।


বিগত দিনের মতো অশান্ত না হলেও সেদিনও যথেষ্ট ভয়ঙ্কর সমুদ্র। আসলে ঘূর্ণিঝড় পাক খাচ্ছে যে অঞ্চলে তার মাঝে পড়েছিলাম গতকাল। হাওয়া তখন বিপরীতে বইছিল। এই বারো তেরো ঘণ্টায় তার গতিপথ সামান্য বদল হওয়ায় খানিকটা রক্ষে। তবু বেশ কয়েকবার সেই বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে ফেলল। এভাবেই দুলতে দুলতে ঘণ্টা দুয়েক পর রস আইল্যান্ডকে দেখতে পেয়ে নিশ্চিন্ত হলাম। পোর্ট ব্লেয়ার এসে গেছে!



হ্যাভলক স্মরণীয় হয়ে রইল এই একটি কারণেই। না, হ্যাভলকের সৌন্দর্য নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। এত সুন্দর একটি দ্বীপে যারা থাকেন তাদের সত্যিই ঈর্ষা হয়, যদিও ওদের জীবন মূল ভূখণ্ডের চাইতে অনেকই কঠিন। অত্যন্ত সুন্দর এক একটি বিচ আর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া মানুষজনের হ্যাভলক এক কথায় অসামান্য। আর সঙ্গে যদি মোখার মতো সামুদ্রিক ঝড়ের অভিজ্ঞতা হয়, তবে বলতেই হয় জীবন সুন্দর হলেও ঝড় আসবেই! আর সেটা আসে বলেই বোধহয় জীবনকে এত ভালবাসা!!


প্রকাশিত: ইরাবতী/ সম্পাদক: শৌনক দত্ত


https://irabotee.com/%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0/










Saturday, November 4, 2023

 

রবি ঠাকুরের মংপু হয়ে সিটং-লাটপাঞ্চারে 

শৌভিক রায় 


'ঘন ছায়াছন্ন পথ দিয়ে মেঘ কুয়াশার রাজ্য ছাড়িয়ে মংপুতে যখন নামলাম তখন রোদ চারদিকের ধোয়া সবুজের উপর ঝিলমিল করছে, শেষ বেলাকার রোদের সুন্দর শান্ত হাসি।' 

'মংপুতে রবীন্দ্রনাথ' বইটিতে মৈত্রেয়ী দেবী এভাবেই মংপুর বর্ণনা দিয়েছিলেন। আজও যেন পাল্টায় নি সেই মংপু।



শিলিগুড়ি থেকে সেভক হয়ে ৫১ কিলোমিটার দূরের ৩৭০০ ফিট উচ্চতার মংপুতে পৌঁছে সেকথাই সবার আগে মনে হল। রাম্ভি থেকে শেষ ১১ কিলোমিটার পথ ভীষণ খাড়াই ও সর্পিল এবং হিমালয়ের নিস্তব্ধতার সঙ্গে মানানসই রকম নির্জন। শীতকালে এই পথের দু`ধার হলুদ কমলালেবুতে ছেয়ে যায়। সে দৃশ্য এই শরতে দেখা না গেলেও, সিঙ্কোনা গাছের নির্জন জঙ্গল দেখাটা কিন্তু একেবারে অন্য অভিজ্ঞতা। সেভক থেকে রাম্ভি অবধি তিস্তা পাশে পাশে চলে আর রাম্ভি থেকে এই পাকদন্ডী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে আমলে গেলখোলা পর্যন্ত আসতেন টয়ট্রেনে আর সেখান থেকে রাম্ভি অবধি বাকি চার কিলোমিটার পথ গাড়িতে। রাম্ভি থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হত পালকিতে। 



১৯৩৮ সালে মংপুর কুইনানিন ফ্যাক্টরিতে কর্মরত ছিলেন মনমোহন সেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের কন্যা মৈত্রেয়ী দেবী। তাঁদের আহ্বানে ওই বছর ২১শে মে গুরুদেবের পদার্পণ হয় ছোট্ট এই জনপদে। এই পাহাড়ি শহরটির অসাধারণ নৈসর্গিক দৃশ্য তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। প্রথমবার রবীন্দ্রনাথ ৯ই জুন অবধি কাটিয়েছিলেন মংপুতে। ১৯৩৯ সালে তিনি দু'বার আসেন মংপুতে। প্রথম দফায় পুরী থেকে ১৪ই মে এসে ১৭ জুন কলকাতায় ফেরেন। আবার ১২ই সেপ্টেম্বর এসে দু`মাস কাটিয়ে যান মংপুতে। শেষ এসেছিলেন পরের বছর ১৯৪০ সালের ২১ শে এপ্রিল। ২৫ শে বৈশাখের অনুষ্ঠান পালন করে চলে যান কালিম্পঙে। সে বছরই সেপ্টেম্বরে আসতে চেয়েছিলেন, তিনি কিন্তু অসুস্থ শরীর নিয়ে প্রথমে কালিম্পঙে এলেও, মংপুতে আর আসতে পারেন নি। কিন্তু মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন আসবার জন্য। তাই হয়তো আসবার আগে পাঠিয়েছিলেন নিজের ওষুধের কৌটো। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার জন্য তিনি নিরুপায় হয়ে কলকাতায় ফিরে যান।   


রবীন্দ্রস্মৃতি ধন্য মংপুর ভবনে আজও রক্ষিত সেই কৌটোগুলি। শুধু ওষুধের কৌটোই নয়, ষোলোটি ঘরের এই বিরাট ভবনটিতে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যবহৃত খাট, তোশক, বিছানা। তাঁর নিজের নকশায় তৈরী চেয়ারটিও যত্নে রাখা। চেয়ারের ওপর রয়েছে তাঁর ব্যবহৃত কুশনটিও। রক্ষিত কবি ব্যবহৃত রঙের বাক্স। প্রতিটি ঘরেই রাখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসংখ্য নিদর্শন, ব্যবহৃত সামগ্রী। রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্য আনা এক আনা দামের ন্যাশনাল হেরাল্ডের একটি কপিও। বেশ কিছু দামি ফোটোগ্রাফও রয়েছে, তবে অযত্নে সেগুলির দশা অত্যন্ত সঙ্গীন। 



১৯৪৪ সালের ২৮ শে মে এই বাড়িটিকে রবীন্দ্রস্মৃতিভবন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আজ এই বাড়িটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। দেখে নেওয়া যায় স্মৃতিভবনের সবকিছুই, এমনকি ইট ও বালি দিয়ে বানানো বাথটবটিও। কুইনাইন ফ্যাক্টরির প্রবেশদ্বারের ঠিক উল্টোদিকে রবীন্দ্রভবনে ঢুকবার রাস্তা। ঢুকেই বাগান। বাগানে রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ মূর্তি। বারান্দায় সাদা চাদরে ঢাকা চেয়ার, চেয়ারে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি। প্রতিকৃতির পেছনে মৈত্রেয়ী দেবী-কৃত রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত তাম্রলিপি যাতে বাংলা, হিন্দি আর নেপালি ভাষার ব্যবহার করা হয়েছে।রবীন্দ্রস্মৃতিভবনের বর্তমান কেয়ারটেকার শিশির রাউত উদাত্ত কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত গাইতে গাইতে গাইড করেন পর্যটকদের। তাঁর ঠাকুরদা ভীমলাল রাউত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাল্কিবাহকদের সর্দার।  


মংপুর অদূরে পেশক রোডের ওপর সার্নেল বাংলো একসময়ে অন্যতম পর্যটক আকর্ষণ কেন্দ্র হলেও, বর্তমানে তা ভগ্নস্তূপে পরিণত। মংপুর ডাইছেন শেরপা চোয়েলিং মনাস্ট্রি বা পিস্ প্যাগোডাটিও অনবদ্য। সার্নেল বাংলো থেকে স্থানীয় গাইডের সাহায্যে হিমালয়ের গহন অরণ্যের ভেতর দিয়ে হাঁটা পথে যাওয়া যায় ছটকপুর অবধি। অসামান্য প্রাকৃতিক দৃশ্যের এরকম জায়গা পূর্ব হিমালয়ের এই অঞ্চলে আর দ্বিতীয়টি মেলে না। মংপুর কাছের সিকসিম গ্রামটিও অনবদ্য। প্রকৃতির নিবিড় পাঠে সিকসিম অতুলনীয়। অন্যদিকে মংপু থেকে যাওয়া যেতে পারে ৬কিমি দূরের রিয়াং নদীর কাছে যোগীঘাটেও। বাবা রামদেবের জন্য আজ এই স্থানটি প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।  


আজকের পর্যটন মানচিত্রের পরিচিত নাম সিটং, মংপু থেকে মাত্র সাত কিমি দূরে। চিৎকার-চেঁচামেচি-মাথাব্যথার শহরবাসীর কাছে সিটং এক লোভনীয় মনোরম গন্তব্য। সিটং-এর খুব কাছেই রয়েছে শেলফু ও লাটপাঞ্চারের মতো জনপ্রিয় আরও দুটি জায়গা। ট্রেক করবার জন্য এখানে বেশ কিছু পথ রয়েছে। এই অঞ্চলের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছে গেলে ডুয়ার্স, তরাই-সহ দার্জিনিঙের অপূর্ব প্যানারোমা শিহরিত করে তোলে। রয়েছে মামরিং হয়ে বাগোরা অথবা মাজুয়া-মহলদিরাম হয়ে কার্শিয়াং পর্যন্ত ট্রেক করবার পথটিও। সব পথেই উপরি পাওনা কাঞ্চনজঙ্ঘার তুষার-ধবল ঔদ্ধত্য। পাখির ডাক, আপার সিটং মনাস্ট্রি, চার্চ সব মিলে, সিটং আর লাটপাঞ্চার অফ বিট লোকেশন হিসেবে আজ কড়া টক্কর দিচ্ছে দার্জিলিং, কালিম্পঙের মতো শৈল শহরকে। সিটং পৌঁছনো যায় রাম্ভির আগেই কালিঝোরা বা বিরিক দারা থেকে আহালদারা হয়ে, অথবা রাম্ভি-মংপু হয়ে। থাকবার জন্য রয়েছে বেশ কিছু হোম স্টে থেকে শুরু করে সরকারি ব্যবস্থার লজও। 


(ছবি- লেখক) 


* প্রকাশিত: শব্দ বাউল/ সম্পাদক: শৌভিক বণিক

https://sabdabaul.blogspot.com/2023/10/blog-post_81.html?m=1






Wednesday, November 1, 2023

 দমকলের কর্মী

শৌভিক রায় 


বেশ সিরিয়াস মুখ করেই বসেছিলাম। একটু নেতা নেতা ফিলিংসও হচ্ছিল। দুই পাশে দুই জন। বউ আর ছেলে।


বলতেই পারেন বউ আর ছেলে দুই পাশে থাকলে কেন নেতা নেতা মনে হবে? 


হবে। 


যতই আপনার পয়ষট্টি ইঞ্চি হোক না কেন, কিচেন ক্যাবিনেটে আপনাকে কেউ পাত্তা দেবে না! গ্যারান্টেড। তার ওপর ছেলে যদি পঁচিশ পার করে যায়, তবে তো কথাই নেই। আপনার গুগলি বা ইনসুইং সব 'বাপি বাড়ি যা' হয়ে যাবে। 


এরকম অবস্থায় দুই পাশে দুজন থাকলে নেতা নেতা মনে হবে না! 


সিরিয়াস মুখ কেন? 


সেটাই তো আসল। আদতে এই সময়ের ট্রেন্ড অনুসারে নেতা ভাব বজায় রেখে আমি অ্যারেস্টেড। বউ ছেলের হাতে। কখনও দুজনকে ইডি বা সিবিআই বলেও মনে হচ্ছিল। 


কেসটা কিছুই না। জেলা সদরের প্রখ্যাত নার্সিং হোমের ইউ এস জি মেশিন বলে দিয়েছে বুড়ো হয়েছি পুরো। শুধু থুত্থুরে হতেই বাকি যা! ভেতরের কলকব্জা নাকি গন্ডগোল করছে। অতএব সাধু সাবধান। বাঁচাতে জান, ওষুধ সহযোগে জল করুন পান।


 আমি চিরকালের শান্তশিষ্ট মানুষ। ডাক্তারবাবু ও তাঁর মেশিনকে আমি বিশ্বকর্মা জ্ঞানে পুজো করি। কিন্তু ওই যে। কিচেন ক্যাবিনেট। 'ঘন ঘন টয়লেট যাচ্ছ', 'এতক্ষণ টয়লেটে কী করছ' ইত্যাদি করে জেলা শহরের মেশিনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে এসেছে মহানগরের বেশ নামি জায়গায়। শরদিন্দুর ভাষায় আসুরিক চিকিৎসা শুরুও হয়েছে। 'কেমন বহে নিরন্তর ধারা' পরীক্ষা ছাড়াও, ভেতরে উঁকি দিয়ে কঙ্কাল পর্যন্ত দেখে নিয়েছে (খুব অপমানজনক ব্যাপার এটা)।চলছে সিমের বীজের মতো মেরি পেয়ারি কিডনি, প্রোস্টেট, লিভার ইত্যাদি একান্ত ব্যক্তিগত সম্পতিতে গর্হিত নজরদারি। দুই দিনে 'ওনলি মি' থেকে আমি একদম 'পাবলিক'! শুধু লাইক নেই। কমেন্ট অবশ্য প্রচুর!


প্রথমদিন ডাক্তারবাবুর কাছে কিচেন ক্যাবিনেটের প্রধান ব্যক্তিত্ব আমাকে নিয়ে ঢুকে ছিলেন। আজ দ্বিতীয় জন ঢুকবে নাকি। দুজনেই চিন্তিত। গম্ভীর মুখ। একজন ভাবছে, বুড়োটা মিনসে হতে আর কদিন সময় নেবে? আর একজন ভাবছে, বাপের সঙ্গে ডাক্তারবাবুর পাঙ্গাও আজ নেওয়া যাবে। আমি সিরিয়াস মুখ করে আছি। মনে মনে বলছি আজ দুটোরই মুখ পুড়বে। ইজ্জত ঢিলে হবে। হাম ভি কিসি সে কম নেহি। এত দ্রুত ময়দান ছাড়ছি না। খেলা শুধু হবে না। খেলা চলবে।


অতঃপর চেম্বার। বিপ বিপ শব্দ। টিপ টিপ আলো। 


গম্ভীর মুখ করে ডাক্তারবাবু সব দেখতে শুরু করলেন। আড়চোখে দেখতে পাচ্ছি কিচেন ক্যাবিনেটের দুই নম্বর অপেক্ষায় আছে কখন আমাকে একবারে ঢিট করা যায়। বাইরে এক নম্বরও অপেক্ষায়। বেরোলেই অ্যারেস্ট।


কিন্তু আছেন। 

কে? 

ঈশ্বর। আবার কে!


'আপনার সব ঠিক। একদম ফাটাফাটি। দুর্দান্ত। আপনার পুরোনো রিপোর্ট সব ভুল।'


বিশ্বাস করবেন না, আমার তখন গুড়গুড় করে হাসি পাচ্ছে। ছোটটার মুখ ব্যাজার হয়ে গেছে। এত করেও কিছু হল না!


- কিন্তু বাবার কিডনি....

- একদম ঠিক

- প্রোস্টেট?

- দুরন্ত।

- লিভার যে বলেছিল....

- ভুল।


কিছুতেই কিছু হচ্ছে না দেখে শেষটায় মরিয়া হয়ে চিৎকার

- ইউরিনের ফ্লো?

- আরে এখনও দমকলে চান্স পাবে হে তোমার বাবা!


হো হো হেসে উঠি আমি। ডাক্তারবাবুও যোগ দেন। 


নেচেও উঠতাম জানেন! কিন্তু বেরসিক ঠ্যাং। গেল রাতে সিঁড়ি থেকে চ্যুত হয়ে তিনি আমাকে ধরণীপুত্র করেছেন। নিজের গায়ে ক্রেপ ব্যান্ডেজের ওড়না জড়িয়ে লাজুক হয়ে আছেন। সটান বলে দিলেন নাচলে তিনি মরমে মরে যাবেন!


(বোকামির এককাল)