Wednesday, November 1, 2023

 দমকলের কর্মী

শৌভিক রায় 


বেশ সিরিয়াস মুখ করেই বসেছিলাম। একটু নেতা নেতা ফিলিংসও হচ্ছিল। দুই পাশে দুই জন। বউ আর ছেলে।


বলতেই পারেন বউ আর ছেলে দুই পাশে থাকলে কেন নেতা নেতা মনে হবে? 


হবে। 


যতই আপনার পয়ষট্টি ইঞ্চি হোক না কেন, কিচেন ক্যাবিনেটে আপনাকে কেউ পাত্তা দেবে না! গ্যারান্টেড। তার ওপর ছেলে যদি পঁচিশ পার করে যায়, তবে তো কথাই নেই। আপনার গুগলি বা ইনসুইং সব 'বাপি বাড়ি যা' হয়ে যাবে। 


এরকম অবস্থায় দুই পাশে দুজন থাকলে নেতা নেতা মনে হবে না! 


সিরিয়াস মুখ কেন? 


সেটাই তো আসল। আদতে এই সময়ের ট্রেন্ড অনুসারে নেতা ভাব বজায় রেখে আমি অ্যারেস্টেড। বউ ছেলের হাতে। কখনও দুজনকে ইডি বা সিবিআই বলেও মনে হচ্ছিল। 


কেসটা কিছুই না। জেলা সদরের প্রখ্যাত নার্সিং হোমের ইউ এস জি মেশিন বলে দিয়েছে বুড়ো হয়েছি পুরো। শুধু থুত্থুরে হতেই বাকি যা! ভেতরের কলকব্জা নাকি গন্ডগোল করছে। অতএব সাধু সাবধান। বাঁচাতে জান, ওষুধ সহযোগে জল করুন পান।


 আমি চিরকালের শান্তশিষ্ট মানুষ। ডাক্তারবাবু ও তাঁর মেশিনকে আমি বিশ্বকর্মা জ্ঞানে পুজো করি। কিন্তু ওই যে। কিচেন ক্যাবিনেট। 'ঘন ঘন টয়লেট যাচ্ছ', 'এতক্ষণ টয়লেটে কী করছ' ইত্যাদি করে জেলা শহরের মেশিনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে এসেছে মহানগরের বেশ নামি জায়গায়। শরদিন্দুর ভাষায় আসুরিক চিকিৎসা শুরুও হয়েছে। 'কেমন বহে নিরন্তর ধারা' পরীক্ষা ছাড়াও, ভেতরে উঁকি দিয়ে কঙ্কাল পর্যন্ত দেখে নিয়েছে (খুব অপমানজনক ব্যাপার এটা)।চলছে সিমের বীজের মতো মেরি পেয়ারি কিডনি, প্রোস্টেট, লিভার ইত্যাদি একান্ত ব্যক্তিগত সম্পতিতে গর্হিত নজরদারি। দুই দিনে 'ওনলি মি' থেকে আমি একদম 'পাবলিক'! শুধু লাইক নেই। কমেন্ট অবশ্য প্রচুর!


প্রথমদিন ডাক্তারবাবুর কাছে কিচেন ক্যাবিনেটের প্রধান ব্যক্তিত্ব আমাকে নিয়ে ঢুকে ছিলেন। আজ দ্বিতীয় জন ঢুকবে নাকি। দুজনেই চিন্তিত। গম্ভীর মুখ। একজন ভাবছে, বুড়োটা মিনসে হতে আর কদিন সময় নেবে? আর একজন ভাবছে, বাপের সঙ্গে ডাক্তারবাবুর পাঙ্গাও আজ নেওয়া যাবে। আমি সিরিয়াস মুখ করে আছি। মনে মনে বলছি আজ দুটোরই মুখ পুড়বে। ইজ্জত ঢিলে হবে। হাম ভি কিসি সে কম নেহি। এত দ্রুত ময়দান ছাড়ছি না। খেলা শুধু হবে না। খেলা চলবে।


অতঃপর চেম্বার। বিপ বিপ শব্দ। টিপ টিপ আলো। 


গম্ভীর মুখ করে ডাক্তারবাবু সব দেখতে শুরু করলেন। আড়চোখে দেখতে পাচ্ছি কিচেন ক্যাবিনেটের দুই নম্বর অপেক্ষায় আছে কখন আমাকে একবারে ঢিট করা যায়। বাইরে এক নম্বরও অপেক্ষায়। বেরোলেই অ্যারেস্ট।


কিন্তু আছেন। 

কে? 

ঈশ্বর। আবার কে!


'আপনার সব ঠিক। একদম ফাটাফাটি। দুর্দান্ত। আপনার পুরোনো রিপোর্ট সব ভুল।'


বিশ্বাস করবেন না, আমার তখন গুড়গুড় করে হাসি পাচ্ছে। ছোটটার মুখ ব্যাজার হয়ে গেছে। এত করেও কিছু হল না!


- কিন্তু বাবার কিডনি....

- একদম ঠিক

- প্রোস্টেট?

- দুরন্ত।

- লিভার যে বলেছিল....

- ভুল।


কিছুতেই কিছু হচ্ছে না দেখে শেষটায় মরিয়া হয়ে চিৎকার

- ইউরিনের ফ্লো?

- আরে এখনও দমকলে চান্স পাবে হে তোমার বাবা!


হো হো হেসে উঠি আমি। ডাক্তারবাবুও যোগ দেন। 


নেচেও উঠতাম জানেন! কিন্তু বেরসিক ঠ্যাং। গেল রাতে সিঁড়ি থেকে চ্যুত হয়ে তিনি আমাকে ধরণীপুত্র করেছেন। নিজের গায়ে ক্রেপ ব্যান্ডেজের ওড়না জড়িয়ে লাজুক হয়ে আছেন। সটান বলে দিলেন নাচলে তিনি মরমে মরে যাবেন!


(বোকামির এককাল)



No comments: