আত্মনিবেদনের ছট
শৌভিক রায়
স্কুলে দীপক সাসনারের কপালে ফোঁটা দেখতাম। আর রামসেবককাকুও ঠেকুয়া দিয়ে যেতেন। তার আগে অবধি আমাদের বোঝার উপায় ছিল না যে একটি বড় উৎসব চলছে ভারতের বেশ কয়েকটি প্রদেশ জুড়ে...
ছটের গুরুত্ব যে দিনদিন বাড়ছে সেটা বুঝতে পারলাম কোচবিহারে আসবার কয়েকবছর পর থেকে। তবে তখনও সাগরদিঘিতে ছোট ছোট ঘাটে পুণ্যার্থীরা পুজো করতেন। অনেককে দণ্ডি কেটে যেতে দেখতাম। এখন ছট উৎসব আরও বড় আকার নিয়েছে। শুধুমাত্র এক শ্রেণির মানুষের মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ নেই ছট। বিভিন্ন ভাষার মানুষ এখন ছট উৎসবে সামিল।
কিন্তু ছট পুজো ব্যাপারটা কী ও কেন? জেনেবুঝে ছট পুজোয় মেতে উঠছি তো? নাকি সবটাই বাঙালির সেই কুখ্যাত হুজুগ!
ছট আসলে সূর্য এবং তার স্ত্রী উষা দেবীর পুজো। যদিও এই পুজোর মূল হল সূর্যের উপাসনা। মনে রাখতে হবে, হিন্দু ধর্মের তেত্রিশ কোটি দেবতার মধ্যে সূর্য হল একমাত্র দেবতা যাঁকে দেখা যায়। বেদে সূর্যকে জগতের আত্মা বলা হয়েছে। সূর্যের আলোর যেমন অনেক রোগ ধ্বংস করার ক্ষমতা রয়েছে, তেমনি সূর্যের শুভ প্রভাবে কোনও ব্যক্তি স্বাস্থ্য ও আত্মবিশ্বাস লাভ করে। বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রে সূর্যকে আত্মা, পিতা, পূর্বপুরুষ, সম্মান এবং উচ্চ সরকারি চাকরির কারক বলা হয়েছে। ছট পুজোয় সূর্য দেবতা ও ছটি মাতা অর্থাত্ ষষ্ঠী দেবীর পুজো করলে সন্তান, সুখ ও কাঙ্খিত ফল পাওয়া যায়।
আবার পুরাণ অনুযায়ী, ছট মাতা হলেন ব্রহ্মার কন্যা এবং সূর্যদেবের বোন। বলা হয়, ব্রহ্মা জগতের সৃষ্টির সময় নিজেকে দুই ভাগে ভাগ করেন। তাঁর ডান দিকটা পুরুষ এবং বাঁ দিক প্রকৃতি হিসেবে প্রকাশিত হয়। প্রকৃতি দেবী অর্থাৎ সৃষ্টির অধিষ্ঠাত্রী দেবী নিজেকে ছয় ভাগে ভাগ করেন এবং তাঁর ষষ্ঠ অংশটি দেবসেনা নামে পরিচিত হয়। ষষ্ঠ অংশ হওয়ায় তিনি ছটি মাইয়া নামেও পরিচিত। সেজন্য অনেক জায়গায় সন্তান জন্মের ষষ্ঠ দিনে সন্তানের মঙ্গল কামনায় ছটি মাতার পুজো করা হয়।
প্রতিবছর কার্তিক মাসের শুক্ল তিথিতে চতুর্দশীর দিন (কালীপুজোর ০৬ দিন পর) থেকে সপ্তমী পর্যন্ত মোট চার দিন ধরে ছট পুজো অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া চৈত্র মাসে একই নিয়মে আরও একবার ছট পুজো হয়। কার্তিক মাসের ছট পুজোকে কার্তিক ছট এবং চৈত্র মাসের ছট পুজোকে চৈতি ছট বলা হয়। রামায়ণ এবং মহাভারতের কাহিনীতে ছট পুজোর বর্ণনা পাওয়া যায়। রামায়ণে শ্রী রামচন্দ্র লঙ্কা থেকে অযোধ্যায় ফিরে আসেন। অযোধ্যায় ফিরে এলে রামচন্দ্রের রাজ্য অভিষেক করা হয়। রামচন্দ্র তখন তার পত্নী সীতার সঙ্গে প্রজা কল্যাণে রামরাজ্য স্থাপনের জন্য কার্তিক মাসের শুক্ল ষষ্ঠীতে সূর্যের উপাসনা করেছিলেন। মহাভারতে, পঞ্চ পান্ডবদের স্ত্রী দ্রৌপদী কৌরবদের হাত থেকে হস্তিনা পুরের রাজপাট ফিরে পাবার জন্য সূর্যের উপাসনা করেছিলেন। এছাড়াও সূর্য পুত্র কর্ণ প্রত্যহ সকালবেলা স্নান সেরে অঙ্গরাজ্যের কল্যানে সূর্যের উপাসনা করতেন।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের কাহিনীতে মা অন্নপূর্ণার ছট পুজো করার উল্লেখ পাওয়া যায়। একবার আষাঢ় মাসে বর্ষার আগমনে চাষিরা খেতে শস্য বুনে দেয়। কিন্তু ধীরে ধীরে বর্ষা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ে তখন সূর্যের প্রবল দাবদাহে মাঠ ঘাট পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। চাষীদের ঘরে অন্নাভাব শুরু হয়ে যায়। চাষিরা তখন মা অন্নপূর্ণার স্মরণ নেয়। মা অন্নপূর্ণা উপায় না দেখে সূর্যদেবের ধ্যানে মগ্ন হন। কিন্তু সূর্যদেবের ধ্যান করে বিশেষ ফল পাওয়া যায় না। উল্টে মা অন্নপূর্ণা সূর্যের প্রখর রোদ্রের তেজে জীর্ণ হয়ে যান। দেবতারা মা অন্নপূর্ণার করুণ দশা দেখে সকলে মিলে সূর্যের স্মরণাপন্ন হন। সূর্যদেব তখন মা অন্নপূর্ণাকে কার্তিক মাসের শুল্ক পক্ষে ষষ্ঠিতে গঙ্গা তীরে গিয়ে সূর্য উপাসনা করার বিধান দেন। এরপর মা অন্নপূর্ণা গঙ্গাতীরে সূর্যের উপাসনা করেন। পৃথিবী আবার সবুজ হয়। সেই থেকে পরিবারের মহিলারা মূলত পরিবার ও বিশ্বের কল্যানে ছট পুজো করে থাকেন।
আরও একটি আখ্যান বলছে, স্বয়ম্ভু মনুর পুত্র রাজা প্রিয়ব্রত এবং তাঁর স্ত্রী মালিনী ছিলেন নিঃসন্তান। তাঁদের সন্তান লাভের জন্য মহর্ষি কাশ্যপ পুত্র্যেষ্টি যজ্ঞ করার পরামর্শ দেন। যজ্ঞের কিছুকাল পরে মালিনী অন্তঃসত্ত্বা হলেও তাঁর গর্ভজাত সন্তানের মৃত্যু হয়। এর পর ছটি মাতা প্রিয়ব্রতকে দর্শন দিয়ে সন্তান লাভের জন্য তাঁর উপাসনা করতে বলেন। রাজা সেই দেবীর নির্দেশ মতো পুজো করেন এবং পুত্র সন্তান লাভ করেন। বলা হয়ে থাকে, সেই দিনটি ছিল কার্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ দিন। তার পর থেকেই এই পুজোর প্রচার হয়।
ছট শব্দটি ষষ্ঠ থেকে নেওয়া হয়েছে। বিহারি ভোজপুরি এবং মৈথিলী ভাষায় ষষ্ঠ-কে ছঠি উচ্চারণ করা হয়। ছট পুজো হল মূলত সূর্য দেবের পুজো। সূর্যের ছটা অর্থাৎ সূর্য কিরণকে এখানে ছঠি হয়ে গেছে। তাছাড়া ছট পুজোয় ষষ্ঠীর দিনকেই ছট পুজোর সন্ধ্যাকালীন অর্ঘ্য উৎসর্গের প্রধান দিন হিসাবে ধরা হয় তাই এখানে ষষ্ঠীর দিনটাকে ছয় দিন অথাৎ ছঠি ধরা হয়। ছট পুজোর প্রথম দিন মানে চতুর্দশীর দিন ছট ব্রতীরা শুদ্ধ বস্ত্রে ছট পুজোর জন্য ব্রতী হয় এবং সেই দিন লবন ছাড়া ছোলার ডাল,মিষ্টি কুমড়ো দিয়ে ভাত রান্না করে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে প্রসাদ হিসাবে গ্রহণ করে। ছট পুজোর দ্বিতীয় দিন অথাৎ পঞ্চমীর দিন হল খরনা ব্রত পালনের দিন। এই দিন থেকেই ছট পুজোর নির্জলা ৩৬ ঘন্টার উপোস শুরু হয়। এই দিন ছট ব্রতী মহিলারা কাঠের আঁচে মাটির উনুনে গুড়ের পায়েস রান্না করে খেয়ে পড়ে ছট পুজো (ছট মাইয়ার ব্রত রাখে) এবং ঠেকুয়া,নাড়ু ইত্যাদি প্রসাদ তৈরী করে। ছট পুজোর তৃতীয় দিন হল ষষ্ঠীর দিন। এই দিনে ছট ব্রতী মহিলারা সূর্যাস্তের সময় ডুবিত সূর্যকে গঙ্গা ঘাটে কিংবা বড় জলাশয়ে ধারে ধামা ভর্তি করে গোটা আখ গাছ, হলুদ গাছে এছাড়া পুজোর বিভিন্ন উপাদেয় সামগ্রী নিয়ে গিয়ে সূর্য দেবের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য নিবেদন করেন। ছট পুজোর চতুর্থ দিন হল সপ্তমীর দিন। এই দিন সকাল বেলা সূর্যোদয়ের সময় ছট ব্রতী মহিলারা তাদের পরিবারের সঙ্গে ছট ঘাটে গিয়ে সূর্যদেবকে অর্ঘ্য নিবেদন করে ছট উপবাস ভঙ্গ করে।
বৈজ্ঞানিক ও জ্যোতিষী দৃষ্টিকোণ থেকে ছট উৎসবের গুরুত্ব অপরিসীম। কার্তিক শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথি একটি বিশেষ জ্যোতির্বিদ্যার উপলক্ষ, যখন সূর্য পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত। এই সময়ে, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণে পৃথিবীতে সংগৃহীত হয়। এই ক্ষতিকর রশ্মি মানুষের চোখ, পেট ও ত্বকে সরাসরি প্রভাব ফেলে। মনে করা হয় সূর্যদেবের পুজো ও অর্ঘ্য নিবেদনেই মাধ্যমে অতিবেগুনি রশ্মি যেন মানুষের ক্ষতি না করে সেই চেষ্টাই করা হয়। এই পুজোর মাধ্যমে শরীর থেকে টক্সিন দূর করা হয়। সূর্যের প্রথম আলোয় গঙ্গাস্নান করলে শরীরে সোলার বায়ো-ইলেকট্রিসিটি সঞ্চালিত হয় যা বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়ায় সাহায্য করে। অনেকে মনে করেন শীতকাল শুরুর আগে এই প্রক্রিয়া শরীর থেকে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস দূর করতে সাহায্য করে।
ছট পুজো এখন গো-বলয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ভারতের বহু অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। একসময় উত্তর ভারতের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ধর্মীয় উৎসবটি এখন আর শুধু তাদের নেই। আজকাল অনেকেই ছট পুজো করে থাকেন। কার্তিক মাসের এই হালকা ঠাণ্ডায় নদীতে বা জলাশয়ে নেমে সূর্যদেবের উপাসনা নিঃসন্দেহে অন্য মাত্রা নিয়ে আসে। আসলে যে কোনও উৎসব বা ধর্মীয় আচরণের মধ্যে কিছু বৈজ্ঞানিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাপার লুকিয়ে থাকে। তাই ছট শুধুমাত্র সূর্যদেবের বা ছটি মাইয়ার পুজো নয়, ছটের অন্তর্নিহিত অর্থ লুকিয়ে রয়েছে সুখ সমৃদ্ধি সুস্বাস্থ্য কামনার আত্মনিবেদন।
ছবি: ঋতভাষ রায়
তথ্য: বিকাশপিডিয়া, হিন্দুস্থান টাইমস, আনন্দবাজার পত্রিকা, এই সময়

No comments:
Post a Comment