ড. চৌধুরী
শৌভিক রায়
ফালাকাটা বেসিক স্কুল আর গ্রামীণ হাসপাতালের মাঝখান দিয়ে একটা কাঁচা পথ চলে গেছে। সেই পথে নড়বড়ে কাঠের সেতুতে সাপটানা পার হলেই মিল রোড ছোঁওয়া যেত।
বেসিক স্কুলের চারটে কোয়ার্টার। একটায় শেফালী দিদিমণি। তাঁর পাশে রাঙাদার কোয়ার্টার। কী আশ্চর্য! রাঙাদার আসল নামটা আজও জানি না! ধুতি ফতুয়া আর খালি পায়ের অকৃতদার মানুষটি আমার দেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম নিরীহ ও শান্ত মানুষ। তাঁর চরম রাগ মানে চক দিয়ে কপালে একটা ফোঁটা দেওয়া। এই দুই কোয়ার্টারের পরে একটু ফাঁকা জায়গা। তারপর বড়দা আর প্রীতি দিদিমণির কোয়ার্টার। এরপরেই সেই রাস্তা। আর রাস্তার পরেই হাসপাতালের কোয়ার্টার শুরু। প্রথমেই যে কোয়ার্টারটি তাতে থাকেন ড. চৌধুরী।
যে সময়ের কথা বলছি তখন ফালাকাটা ছোট্ট। ছিমছাম। সুন্দর। আরণ্যক। গ্রামীণ হাসপাতালে সেরকম পরিকাঠামো না থাকলেও, শুধুমাত্র ড. চৌধুরীর জন্য আশেপাশে থেকে প্রচুর রুগী আসত।
মনে হতেই পারে, ডক্টরের কাছে রুগী আসবে সেটা আর নতুন কী! আসলে আজকের দিনের পরিস্থিতিতে ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাবে না। এখন ফালাকাটায় সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল (জানিনা অবশ্য সেটা কতটা নামে আর কতটা কাজে), নার্সিং হোম, প্যাথ ল্যাব, নানা রোগের ডাক্তার। কিন্তু সেই সময় ওরকম ছোট্ট জনপদে কোথায় ডাক্তার! চিকিৎসার জন্য সেই আমলের লোকেদের হামেশাই কোচবিহার বা জলপাইগুড়ি দৌড়তে হত। একটু ক্রিটিক্যাল হলে শিলিগুড়ি। সেখানে ড. চৌধুরী ছিলেন এক মনোরম ওয়েসিসের মতো। গ্রামীণ হাসপাতালের জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ সবই তাঁর দায়িত্বে। হরেক কিসিমের রুগী তাঁর তত্বাবধানে।
আমরাও ফালাকাটা হাই স্কুলের কোয়ার্টারে থাকতাম। সুতরাং কোয়ার্টারতুতো একটা সখ্যতা আমাদের সবার মধ্যেই ছিল। বেসিক স্কুলের বিরাট মাঠে বুড়োদা, বাবলু, মধুমিতাদি, নন্দিতা, আখু ও আমার সঙ্গে খেলতে আসত মহুয়া। ও ড. চৌধুরীর মেয়ে ও ফালাকাটায় আমার প্রথম বন্ধু। কাকিমা ছিলেন খাস কলকাতার মানুষ। ওদের তিনজনের কথা শুনে হা হয়ে যেতাম। কেমন 'খেয়েছি' 'করেছি' করে বলতেন ওরা! মহুয়ার জামা কাপড়ও ছিল আমাদের তুলনায় একটু বেশি ভাল।
তবে দুষ্টুমি আর দুরন্তপনায় আমি বরাবর সেরা ছিলাম। আমার উৎপাতে দিদা (ঠাকুমা) গরম খুন্তির ছেঁকাও দিয়েছিলেন একবার। আর সেজন্যই বোধহয় ড. চৌধুরীর সঙ্গে আমার বেশি ভাব ছিল।
কেন? বলছি সেকথা।
দিনহাটা হাই স্কুলের গেটটা ছিল বিরাট বড়। কাঠের পোক্ত ফ্রেমে শক্ত লোহার শিক। ফালাকাটা থেকে দিনহাটায় গেলে, ওই গেট ধরে ঝোলা ছিল অনেক খেলার একটা। একবার ওরকমই ঝুলছি। পেছন থেকে মধু দিল জোরে ধাক্কা। আচমকা ধাক্কায় হুমড়ি খেয়ে কপালে প্রবল ঠোক্কর খেলাম শক্ত লোহার শিকে। মুহূর্তে কপাল ফুলে গেল। সঙ্গে ব্যথা। দুদিন পর ফালাকাটা ফিরলাম। গায়ে জ্বর। কপালের অসম্ভব অবস্থা। আরও ফুলে গেছে। পুরো কপাল নীল। একটা ঘোর মতো অবস্থা।
বাবা আঁতকে উঠলেন অবস্থা দেখে। এরকম নীল বর্ণ কপাল আশা করেননি আসলে। অতএব দৌড়লেন ড. চৌধুরীর কাছে। ব্যস্ত মানুষটি ছুটে এলেন। ইনজেকশন দিলেন। সঙ্গে আরও কিছু ওষুধ। রাতের বেলায় আবার এলেন। এবার ওঁর সঙ্গে কাকিমা আর মহুয়া।
কিছু একটা মলম হাতে করে এনেছিলেন ড. চৌধুরী। সেটা মেখে মেখে কয়েকদিন পর সেই ব্যথা কমল। ফোলাও।
কিছুদিন পর আবার বেসিক স্কুলের কাঁটা তারে পায়ের আঙুল আটকে শুরু হল প্রবল রক্তপাত। সেদিন ছিল হোলি। মনে আছে মহুয়াদের কোয়ার্টারের বারান্দা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। বুড়োদা, আখু, মধুমিতাদি, নন্দিতা চিৎকার করে কাকিমাকে ডাকছে। কাকিমা রঙের ভয়ে দরজা খুলছেন না। শেষে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে ওই অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গে হসপিটালে নিয়ে গেলেন। ড. চৌধুরী সেদিনও আমার ভগবান। আবার সেই জ্বর। আবার রাতে তাঁর আসা। আমাকে দেখে যাওয়া। তাঁর চিকিৎসায় সেরে ওঠা।
এরকম আরও বেশ কিছু ঘটনা আছে। সেসব আর বলছি না। যখন ক্লাস ফাইভে উঠলাম, তখন ওঁরা কলকাতায় চলে গেলেন। তাঁর আগে আমরা দুই পরিবার ফুন্টশেলিং গেছি। জলদাপাড়ার হলং ট্যুরিস্ট লজে থেকেছি। নিত্য যাতায়াত তো ছিলই হসপিটাল কোয়ার্টারে ওঁর বাড়িতে আমাদের স্কুল কোয়ার্টার থেকে। ফালাকাটা ছাড়বার পরেও সল্টলেকে ওঁর বাড়িতে গেছি। ফালাকাটায় আমাদের কলেজ পাড়ার বাড়িতেও এসেছেন ওঁরা। তখন আমি ইউনিভার্সিটিতে যাব বলে অপেক্ষা করছি।
ড. চৌধুরীকে আমার সেই শেষ দেখা। একই রকম দুরন্ত আছি কিনা জানতে চেয়েছিলেন। হেসে ছিলাম। মনে মনে বলেছিলাম, আপনি চলে গিয়ে আমার দুরন্তপনা শেষ। পুটন যেদিন খড়খড়ে গামছা দিয়ে কপালে একশ আট বার ঘষে রাজটিকা তুলে দিয়েছিল, সেদিন আপনার কথা খুব মনে হচ্ছিল। কেননা ওই ঘষায় কপালে দগদগে ঘা হয়েছিল। সঙ্গে জুটেছিল বাবা আর দাদার বেধড়ক মার। পুটন ভয়ের চোটে বহুদিন আমাদের বাড়িতেই আসেনি। আপনি থাকলে সেদিন ওই মার খেতে হত না। ঘা মিলিয়ে যেত আপনার ম্যাজিক টাচে!
দীর্ঘদিন যোগাযোগ ছিল না ওদের কারও সঙ্গে। ফেসবুকের দৌলতে মহুয়া খুঁজে পেয়েছিল আমাকে। মহুয়ার সঙ্গে দেখা হলেও ড. চৌধুরী বা কাকিমা কারও সঙ্গে দেখা হয়নি আর। সেদিন মহুয়া আমার পোস্টে কমেন্ট করেছে, "শুভু রে, আজ আমার বাবা চলে গেলেন। তোর, আমার বাবা মায়েরা আবার সেই ছোটবেলার মতো আড্ডার আসরে বসবেন আকাশে তারাদের মাঝে।"
কাকিমার খবর জানতাম। ড. চৌধুরী কাকুও চলে গেলেন। আমার বাবা মা তো আগেই....!
যেতে হবে। নিয়ম সেটাই। মানতে হবে। মানছিও।
কিন্তু একই সঙ্গে কষ্ট পাচ্ছি, জীবনের সেই প্রথম জাদু হাতটা, যার স্পর্শে আমি শীতল হতাম, যার স্পর্শ অভয় দিত আমার বেলাগাম দুরন্তপনায়, হারিয়ে গেল বলে....
কাকু....ভাল থাকবেন।
আমরা আক্ষরিক অর্থেই অনাথ এখন!
No comments:
Post a Comment