আঙরাভাসা, ও আঙরাভাসা
শৌভিক রায়
তেলিপাড়া চা-বাগানের প্রস্রবণ থেকে যখন তার সৃষ্টি হয়, তখন কি জানত সে, একদিন এতটা বিখ্যাত হয়ে উঠবে?
আঙরাভাসার এই বিপুল পরিচিতির পেছনে রয়েছে সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের ট্রিলজি `উত্তরাধিকার`, `কালবেলা` ও `কালপুরুষ`। `কালপুরুষ`-এ অবশ্য নদীটিকে দেখা যায় না। কিন্তু তার অদৃশ্য উপস্থিতি টের পান পাঠক। আসলে এই বিখ্যাত ট্রিলজির গত যেন বেঁধে দিয়েছিল এই নদীটি। তাই ছোট্ট আঙরাভাসার তীর থেকে শুরু উপাখ্যান তিস্তার মতো বৃহৎ নদীকে ছুঁয়ে শেষ পর্যন্ত শেষ হয়েছে কলকাতায় গঙ্গার তীরে। সেই অর্থে এই যাত্রা কিন্তু অনন্য।
ছোট একটি নদীর এই বয়ে চলায় একাকার হয়েছে উত্তর থেকে দক্ষিণ। সে যেমন নিজে ছোট্ট নায়ককে উপযুক্ত করে তুলেছে তিস্তাপাড়ের জলপাইগুড়ি বা গঙ্গাতীরের কলকাতার মতো বৃহৎ শহরের জীবনযাত্রাকে মানিয়ে নেওয়ার, ঠিক তেমনি নিজে রয়ে গেছে নায়কের বুকের গভীরে। তাই নকশাল আমলের সেই তুমুল দিনে, পুলিশের হাত থেকে বাঁচবার জন্য, নায়ক শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছিল তার কাছেই। এ যেন সব হারিয়ে নিজেকেই খোঁজা আবার। নদীর চরিত্রের সঙ্গে এক অদ্ভুত মিল আমরা দেখি তাই। আর সেজন্যই নায়ক অনিমেষের সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তেই আঙরাভাসা আমাদের আপনজন হয়ে ওঠে। এই নিবন্ধে অবশ্য আমরা আঙরাভাসাকে নদী হিসেবেই দেখব। কিন্তু এই নদী ও সমরেশ মজুমদারের সাহিত্যকর্ম এতটাই মিলেমিশে গেছে যে, ওই ট্রিলজি, বিশেষ করে `উত্তরাধিকার`কে বাদ দিয়ে আঙরাভাসা সম্পর্কে লেখা সম্ভব নয়। তাই উপন্যাসের কথা ঘুরেফিরে আসবে।
উত্তরের কয়েকটি নদীর উৎস কিন্তু রীতিমতো গবেষণার বিষয়। আঙরাভাসা নদীর উৎসের ক্ষেত্রেও এই কথা বলা যায়। উত্তরের অধিকাংশ নদীর সৃষ্টি ভুটান পাহাড়ের উচ্চাংশে। কিছু নদী বরফগলা জলে পুষ্ট। কিন্তু মুজনাই, ঘোড়ামারা ইত্যাদির মতো কিছু নদীর প্রবাহের মূল উৎস কিন্তু টিলা বা তরঙ্গায়িত ভূমির মধ্যে থাকা কিছু প্রস্রবণ। মুজনাইয়ের ক্ষেত্রে উৎসমুখ হিসেবে ভুটান পাহাড়কে ধরা হলেও, সেই নদীর সারা বছর জলের জোগান দেয় কিন্তু মুজনাই চা-বাগানের কাছে থাকা বাঙাবাড়ির কিছু প্রস্রবণ। এরকমই কয়েকটি প্রস্রবণ দেখা যায়, তেলিপাড়া চা-বাগানেও। বিন্নাগুড়ি থেকে তেলিপাড়ার দূরত্ব মাত্র সাড়ে ছয় কিমি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, গয়েরকাটার খুব কাছেই এই চা-বাগানটি। ডুয়ার্সের অন্যান্য চা-বাগানগুলির মতোই অত্যন্ত সুন্দর এই চা-বাগানটি যথেষ্ট প্রাচীন। এই চা-বাগানেই দেখা যায় একাধিক প্রস্রবণ। সত্তরের দশকে অবশ্য প্রস্রবণের সংখ্যা ছিল একটি। কিন্তু এখন সেই সংখ্যা বেড়েছে এবং একাধিক প্রস্রবণ মিলে একটি জলাশয়ের আকৃতি নিয়েছে জায়গাটি। এখান থেকেই প্রবাহের জল বুকে নিয়ে আঙরাভাসা দক্ষিণে সামান্য পথ অতিক্রম করে গয়েরকাটা ছুঁয়ে মিশেছে ডুডুয়ার সঙ্গে। ডুডুয়া আবার মিশেছে জলঢাকায়। আঙরাভাসা, ডুডুয়া ও জলঢাকার মিলনস্থলটি রীতিমতো সুন্দর। মাঝে থাকা খুট্টিমারি অরণ্যের প্রান্তসীমা বোধহয় সেই সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি করেছে।
আঙরাভাসার নামকরণের ইতিহাসের জন্য আবার আশ্রয় নিচ্ছি 'উত্তরাধিকার` উপন্যাসে। সমরেশ মজুমদার লিখেছেন, '...ওপাশের লাইনের মদেসিয়া মেয়ের দল যখন নদী পেরিয়ে এপারে আসে তখন ওদের হাঁটু অবধি নামা কালো পোশাকের ঘেরটা পদ্মপাতার মতো স্রোতে ভাসে। কাপড়টাকে ওরা বলে আঙরা। নদীর নাম তাই আঙরাভাসা।' উত্তরের জনজীবনের সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে এই নদী যে, একই নামে রয়েছে জলপাইগুড়ি জেলার নাগরাকাটা তহশিলের একটি গ্রামও। তবে রাস্তার ধারে প্রশাসনের তরফে যে বানান লেখা হয়েছে গ্রামটিকে চিহ্নিত করতে, সেটি বড্ডো পীড়াদায়ক। অতীতে, 'উত্তরাধিকার` উপন্যাসের সময়ে, অনিমেষেদের কোয়ার্টারের গোয়ালঘরের পেছনে ছিল 'বড় বড় জঙ্গলে গাছ` আর সেদিক দিয়ে খানিকটা গেলে আঙরাভাসা নদীটিকে পাওয়া যেত। লেখক বলছেন, 'অদ্ভুত একটা আঁষটে গন্ধ উঠছে নদীর গা থেকে। চওড়ায় পনেরো ফুট, তীব্র স্রোতের এই নদী চলে গেছে নিচে চা-ফ্যাক্টরীর ভিতর দিয়ে। ফ্যাক্টরীর বিরাট হুইলটা চলছে এর স্রোতে। বলতে গেলে স্বর্গছেঁড়ার হৃদস্পন্দনের মত এই নদীর ঢেউগুলি।`
কিন্তু এখন আঙরাভাসা আর সেখানে নেই। ধূপগুড়িমুখী পথে চা-বাগান শেষে বিখ্যাত নদীটির দেখা মেলে। সাহেবি আমল থেকেই আঙরাভাসার মূলস্রোতকে ঘুরিয়ে দিয়ে চা-বাগানের কারখানায় জল সরবরাহ করা হত। 'উত্তরাধিকার'-এ 'নদী বন্ধ' করবার কথাও রয়েছে। লেখক সমরেশ মজুমদারের ভাই সুদীপ মজুমদার জানাচ্ছেন যে, এই ব্যবস্থা আজ আর নেই। কেননা আশি-একাশি সালের বন্যায় নদী নিজেই তার মূলস্রোতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। চা-বাগানের তদানীন্তন ম্যানেজার সাহেব চেষ্টা করেও নদীকে বাগানের ভেতর দিয়ে নিয়ে যেতে পারেন নি। আজ নদী বাগানের প্রান্তে। দেখা যায় না 'উত্তরাধিকার'-এ বর্ণিত সেই দৃশ্যও - 'প্রায় ছুটতে ছুটতে ওরা আঙরাভাসার পাড়ে এসে দাঁড়াল। আর দাঁড়াতেই একটা অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল অনির। পুরো নদীটা জুড়ে যতদূর দেখা যায়, সেই ধোপার ঘাট পর্যন্ত, অজস্র হ্যারিকেন আর টর্চের আলো জোনাকির মত নাচছে। আচমকা দেখলে মনে হয় যেন দেওয়ালির রাতটাকে কে উপুড় করে দিয়েছে নদীতে। সমস্ত কুলি লাইন ভেঙ্গে পড়েছে এখানে। আঙরাভাসার দিকে তাকিয়ে কেমন বিশ্রী লাগল অনির। জল এখন পায়ের তলায়। কাপড়কাচা পাথরটা ভেজা নুড়ির ওপর পড়ে আছে। জল মাঝখানে। তাও কমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। লাফ দিয়ে নেমে পড়ল ঝাড়িকাকু। একটা বিরাট বানমাছ ঠিক সামনেটায় খলবল করছিল। একটা মদেসিয়া মেয়ে মাছটার দিকে এগোবার আগেই ঝাড়িকাকু বাঁ হাতে সেটাকে তুলে খলুইতে ঢুকিয়ে নিল।`
আঙরাভাসার সৌন্দর্যে বিমোহিত হন না এরকম মানুষ খুব কম পাওয়া যায়। এই নদীর এত বাঁক যে কল্পনা করা যায় না। উন্নয়নের জোয়ারে আজ গয়েরকাটা চৌপথী থেকে বীরপাড়ার দিকে যেতে কখন যে আঙরাভাসা চলে যায় বোঝা যায় না। নব্বইয়ের দশকেও কিন্তু এই পথে আঙরাভাসার ওপর কাঠের ব্রিজ পার হতে হত। আর আজ গয়েরকাটা চৌপথী থেকে ধূপগুড়ির দিকে যেতে আঙরাভাসার ওপর পাকা ব্রিজ পার হতে হয়। নদীর শান্ত রূপ দেখলে কিন্তু কেউ ভাবতেই পারবে না যে, এই নদী কখনও কখনও মারাত্মক আকার নেয়। আশির দশকে ভুটান পাহাড় ও সমতলে বৃষ্টি হলেই নদী দুকূল ছাপাতো। সম্প্রতি বানারহাট ব্লকের সাঁকোয়াঝোরা ১ গ্রাম পঞ্চায়েতের নেপালি বস্তির মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আঙরাভাসা। এই বস্তি ঘেষেই বয়ে গিয়েছে নদী। বর্ষায় ফুলেফেঁপে ওঠা নদীবক্ষের জল নেমে যাওয়ার পর শুরু হয় ভাঙন। `আগে এই বস্তি থেকে অনেকটাই দূরে ছিল নদী। কিন্তু ভাঙনের জেরে এখন বস্তির একদম কাছে এসে গিয়েছে। ইতিমধ্যেই প্রায় ১৫ বিঘা কৃষিজমি তলিয়ে গিয়েছে নদীতে। গতবছর বর্ষার মরশুমে তিনটি বাড়ি তলিয়ে যায় ভাঙনে। এইবছরও একটি বাড়ি ভাঙনের গ্রাসে গিয়েছে। আতঙ্কে বাড়িছাড়া হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন গোয়ালঘরের বাসিন্দারা। আবার অনেকেই অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কৃষি জমি চলে যাওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা বদলে দৈনিক শ্রমিকের কাজ করছেন। ভিটে বাঁচাতে দ্রুত বাঁধ নির্মাণের দাবিতে সরব হয়েছেন নেপালি বস্তির বাসিন্দারা।` আনন্দবাজার পত্রিকা বলছেন, `গ্রামবাসীদের অভিযোগ, বেআইনি ভাবে নদীখাত থেকে বালি পাথর তোলার কারণে নদী গতিপথ পরিবর্তন করেছে।` আর একটি খবর বলছে, ` ডুয়ার্স পুজোর আগে ডুয়ার্সের গয়েরকাটা চা বাগানের বিঘা লাইনে আংরাভাসা নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হবে তো? আশা ও আশঙ্কা এই দুয়েরই দোলাচলের মাঝে এলাকার শ্রমিক মহল্লার বাসিন্দারা। চলতি বর্ষায় এখনও পর্যন্ত সেভাবে নদী তার রুদ্র রূপ ধারণ না করলেও গত দু বছরে কিন্তু গয়েরকাটার টিন লাইন ও বিঘা লাইন এলাকার মোট ২১ টি শ্রমিক আবাস সহ কবর খানা, বাঁশ বাগান ও সুপারি বাগানের কিছুটা অংশ নদী গ্রাস করে নেয়। এছাড়াও দেড়শো বিঘার ওপর কৃষকের চাষের জমি এই আঙরাভাসা নদীর তলে যায় বলে সূত্রের খবর। চলতি বর্ষায় এখনও পর্যন্ত কৃষকের চাষের জমি ছাড়া বড়সড়ও ক্ষয়ক্ষতির খবর নেই।`
ডুয়ার্সের প্রাচীন জনপদ গয়েরকাটার নদী নাম পরিচিত আঙরাভাসা বোধহয় এই জনপদের মূল সুরকে বেঁধে দিয়েছে। শহরের শতাব্দী প্রাচীন লাইব্রেরি থেকে শুরু করে স্কুল, বাড়ি সবেতেই যেন আঙরাভাসার অদৃশ্য উপস্থিতি নজরে আসে। কাছের মধুবনী পার্কটির থেকে আঙরাভাসার দূরত্ব বেশ কিছুটা হলেও, নদীর আভাস পাওয়া যায়। তবে আজও বোধহয় এই জনপদের সেরা আকর্ষণ গয়েরকাটা চা-বাগানের সেই কোয়ার্টারটি যেখানে জন্মেছিলেন সমরেশ মজুমদার। করোনা অতিমারির আগেও নিয়ম করে সেই কোয়ার্টারে আসতেন তিনি। তাঁর সেই কোয়ার্টারের পাশেই থাকেন ডুয়ার্সের অন্য এক বিখ্যাত মানুষ অশীতিপর শ্রদ্ধেয় শ্রী ব্রজগোপাল ঘোষ। অনেকে মনে করেন যে, গয়েরকাটা জায়গাটির নামকরণের পেছনে 'খয়ের' কথাটির অবদান রয়েছে। 'খয়ের' গাছের আধিক্য হেতু 'খয়ের' লোকমুখে 'গয়ের` হয়ে থাকতে পারে। আবার হাতির গর্তে বা খোট্টায় পড়ে যাওয়া থেকেও নামটি আসতে পারে। 'গৈর' অর্থে হাতিকে বোঝানো হচ্ছে। আবার প্রচলিত আর একটি মত হল যে, এখানে গারো সম্প্রদায়ের মানুষেরা বাস করতেন। তারা গ্রামকে 'খোটা' বলতেন। সেখান থেকেও গয়েরকাটা শব্দটি এসে থাকবে। নামকরণের পেছনে যে ইতিহাসই থাকুক, একথা বলবার অপেক্ষা রাখে না যে এই জনপদটি যথেষ্ট প্রাচীন এবং ডুয়ার্সে চা-বাগান বিস্তারের সঙ্গে গয়েরকাটা গড়ে ওঠে।
তবে গয়েরকাটা নামে নয়, স্বর্গছেঁড়া নামে পরিচিত হয়েছে জনপদটি সমরেশ মজুমদারের হাত ধরে। আর তার অনুষঙ্গে যে নামটি সর্বপ্রথমে আসে, সেটি হল আঙরাভাসা। একটি নদীর এই উপস্থিতি তাকে অন্য পরিচয় দিয়েছে। আজ ডুয়ার্সের অন্যতম দ্রষ্টব্য পরিণত হয়েছে আঙরাভাসা। তার ছোট্ট যাত্রায় সে ঠিক কতটা পথ অতিক্রম করেছে, তা যেমন সে নিজেও জানে না, তেমনি আগামীতে আরও কতটা পথ যাবে তারও কোনও ইঙ্গিত মেলে না। ডুডুয়ার আর তার মিলনস্থলে পড়ন্ত সূর্যের আলো পড়ে যে দৃশ্যমুখ সৃষ্টি হয়, তার থেকে অনেক যোজন দূরে এক অদ্ভুত অনির্বচনীয় সৌন্দর্যের অধিকারী আঙরাভাসা তাই এক স্বতন্ত্র নাম উত্তরের নদীকথায়।
প্রকাশিত: দাগ
সম্পাদক: মনোনীতা চক্রবর্তী

No comments:
Post a Comment