Saturday, February 14, 2026

বৃক্ষ শেখায় সহনশীলতা

শৌভিক রায়

সরু ফুটব্রিজে দুলতে দুলতে এগোচ্ছি। আক্ষরিক অর্থেই দাঁতে দাঁত চেপে। অনেকটা নিচে ছড়িয়ে থাকা পাথরগুলোর ফাঁকফোকর দিয়ে বয়ে চলেছে নদী। প্রবল তার শব্দ। আসলে চারদিক এত নির্জন যে, সামান্য শব্দও বিকট মনে হচ্ছে।
চেরাপুঞ্জির চেরা বাজার থেকে ২১ কিমি দূরের টিরনা নামের ছোট্ট গ্রামটায় পৌঁছে গিয়েছিলাম সকালেই। পথেই দেখে নিয়েছিলাম মওকিরদুরের বিখ্যাত মনোলিথগুলি। মু শিনরাং নামের উলম্ব এবং মু কিনথাই নামের অনুভূমিক পাথরগুলি যথাক্রমে পুরুষ ও মহিলা পূর্বপুরুষদের জন্য নির্মিত। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত স্টোনহেঞ্জের মতোই অদ্ভুত আকার আর রহস্যে ঢাকা পাথরগুলি খাসি সভ্যতার পরিচয় বহন করে চলেছে সেই কবে থেকে!
টিরনা থেকে গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে নেমে গেছে আনুমানিক সাড়ে তিন থেকে চার হাজার সিঁড়ি। দুর্গম এই পথের শেষে দেখা যাবে ডাবল ডেকার লিভিঙ রুটব্রিজ। সত্যি বলতে, সেটা দেখতেই আসা চেরাপুঞ্জি আসা। ছবির মতো সুন্দর মৌসিনরামে দিনভর ঘুরে আর গা ছমছমে গুহা দেখে চেরা বাজারে পৌঁছেছিলাম রাতে। পরদিন সারাদিন ধরে দেখে নিয়েছি মৌসমাই গুহা, সেভেন সিস্টার্স আর নোহকালিকাই জলপ্রপাত সমেত বাদবাকি সবকিছুই। অবশেষে চলা টিরনা হয়ে ডাবল ডেকার লিভিঙ রুটব্রিজ দেখতে।
মেঘালয়ের এই অংশে প্রকৃতি অত্যাধিক বৃষ্টিপাত ও ট্রপিক্যাল ফরেস্টের জন্য অত্যন্ত দুর্গম। প্রচুর নদী আর পাহাড়ও পথকে করেছে রুদ্ধ। তাই খাসি প্রজাতির লোকেরা অভিনব পদ্ধতিতে ব্রিজ বানিয়ে সমস্যা সমাধান করেন বহুদিন থেকেই। বয়স্ক রাবার গাছের শেকড়গুলিকে তারা এমনভাবে লালন করেন যে, সেগুলি ব্রিজের আকার নেয়। নদীর ওপরে যেখানে চলাচল অসম্ভব, সেখানে এই রুটব্রিজই ভরসা। প্রায় বছর পনের লাগে একটি রুটব্রিজ তৈরী করতে। কেননা শেকড়কে হতে হয় ততটাই শক্ত, যাতে সে মানুষের ওজন নিতে পারে। একবার তৈরী হলে রুটব্রিজ টিকে যেতে পারে পাঁচশো বছর। টিরনা থেকে সিঁড়ি ভেঙে উমশিয়াং যাবার কারণ এই রুটব্রিজ। এই ব্রিজটি ডাবল ডেকার, অর্থাৎ দু'টো তল এর। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি জানাচ্ছে, পৃথিবীতে এরকম ব্রিজ এই একটিই। আরও কাণ্ড হ'ল, এই ব্রিজ নির্মিত নয়, গড়ে উঠেছে নিজেই!
ট্রেক আগেও করেছি। সিঁড়িও ভেঙেছি পালিতানা, পক্ষীতীর্থম বা শ্রাবণবেলগোলায়। কিন্তু এখানে ব্যাপারটা আলাদা। এই সিঁড়িগুলো অনেকটা বেশী খাড়াই। চাপাও। তাই পায়ের ওপর চাপ পড়ছে তুলনায় বেশী। নজর রাখতে হচ্ছে তীক্ষ্ণ, যাতে পা ঠিক জায়গায় পড়ে। কোথাও কোথাও টানা আটশো সিঁড়ি নেমে গেছে। চারদিকে পাহাড় আর গভীর জঙ্গল। কোনও কোনও জায়গায় অরণ্য এত দুর্ভেদ্য যে, আলোও ঢোকে না ঠিকঠাক। রাস্তা জনশূন্য।
প্রথম ফুটব্রিজ পার করে বেশ আনন্দেই ছিলাম। কিন্তু লাভ হল না বিশেষ। খানিকটা এগোতেই আবার একটি ফুটব্রিজ। লম্বাও অনেকটা। তবে ভয় কেটে গেছে। এবার দিব্যি পার করে এলাম। সামান্য যেতেই দেখা হয়ে গেল একটি রুটব্রিজ সঙ্গে।
আমার দেখা প্রথম রুটব্রিজ। এটি অবশ্য একতল। তাতে কী! প্রকৃতি আর মানুষের হাতের এই অসামান্য নির্মাণের কোনও তুলনা চলে কি! এসব ভাবছি আর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছি। তবে সময় কম। কেননা এখনও গন্তব্য আসেনি। তাই এগিয়ে যাই। প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছে আর বোধহয় পারবো না। তবু এক অদম্য জেদ নিয়ে চলতে থাকি।
আরও কিছু সিঁড়ি আর আঁকাবাঁকা রাস্তা শেষে অবশেষে চোখের সামনে ডাবল ডেকার লিভিং রুটব্রিজ! বিশ্বাসই করতে পারছি না। একটি গাছ থেকে শেকড় বেরিয়ে দু'টো ব্রিজ হয়ে ওপরে নীচে দাঁড়িয়ে আছে ! বেশ লম্বা। নীচে বইছে নদী। শোনা যাচ্ছে পাথরের বুকে আছড়ে পড়া জলের শব্দ। ঝুলছে সরু সরু ঝুরি। নদীতে সামান্য দূরে দু'একজন কাপড় ধুচ্ছে। বড় বড় পাথরের অনেকগুলিতেই শ্যাওলা জমে পেছল পেছল ভাব। নদীর স্বচ্ছ জলে মাছের দল। চোখের সামনে বিশ্বের একমেবাদ্বিতীয়ম ডাবল ডেকার রুটব্রিজ। কী অদ্ভুত তার রূপ। সমাহিত নীরবতায় যেন সয়ে চলছে যাবতীয় কষ্ট। নিমেষেই মিলিয়ে যায় আমার সব ক্লান্তি। প্রণাম করি সেই বৃক্ষকে। তার সহনশীলতা মুহূর্তেই পড়িয়ে দেয় জীবনের পাঠ।
ফিরতি পথে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা কেবল। বুকে হাঁপ ধরে ভীষণ। থেমে থেমে চলি। বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে। প্রতি মুহূর্তেই মনে হয় আর বোধহয় পারবো না। কিন্তু যে শিক্ষা মাত্র নিয়ে এলাম বৃক্ষের থেকে, উজ্জীবিত করে সে-ই। এগোই। থামি। আবার এগোই। অবশেষে এক সময় শেষ হয় সিঁড়ি। ফিরে আসি টিরনায়। চাপ চাপ ব্যথা শুরু হয়েছে বুকে, কোমরে আর পায়ে। কিন্তু উপেক্ষা করি সে সব। এক আদি বৃক্ষ অসামান্য শিক্ষা দিয়েছে একটু আগেই। মনে পড়ে তারই কথা- যে সহে, সে রহে।


সামনে বিশ্বের একমেবাদ্বিতীয়ম ডাবল ডেকার রুটব্রিজ, পায়ের নীচে বইছে নদী। তার স্বচ্ছ জলে মাছের দল https://aaroananda.com/social/article/10987631


'আরও আনন্দ' অ্যাপে হাওয়া বদল' বিভাগে আজ (১৩/০২/২০২৬) প্রকাশিত একটি লেখা....

No comments: