বছর শেষে কাছেই কোথাও (পর্ব- ৩)
শৌভিক রায়
এবারের এই চলা আসলে নিজেকে ফিরে দেখা। মাঝে কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। সেদিনের সেই ছোট্ট আমি আজ বার্ধক্যের দোরগোড়ায়।
নলহাটি থেকে রামপুরহাটে পৌঁছতেই স্মৃতিরা সব ঘিরে ধরল। সেই কবে বাবা-মায়ের হাত ধরে কোনও এক অন্ধকার রাতে নেমেছিলাম এখানকার স্টেশনে। দার্জিলিং মেলে। তখন আমাদের এদিক, অর্থাৎ আলিপুরদুয়ার-কোচবিহার-ফালাকাটা, থেকে দক্ষিণে যাওয়ার ট্রেন বলতে কামরূপ আর জনতা এক্সপ্রেস। সেই দুটির রুট ছিল আলাদা। ফলে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে ধরতে হয়েছিল দার্জিলিং মেল।
আমাদের দল ছিল বেশ বড়। কেননা সঙ্গে ছিলেন দুই কাকিমা, বোন আর আমার দাদাও। মামাবাড়ি দেখব বলে আমার আর দাদার উত্তেজনা ছিল বেশি। জন্ম থেকেই শুনে এসেছি আমার মামাবাড়ি বীরভূমে। তারাপীঠের কাছে। কিন্তু কোনও দিন যাইনি। ভাগ্যান্বেষণে আমার দাদু ও তাঁর দাদা গ্রাম ছেড়েছিলেন। দুজনেই থিতু হয়েছিলেন কাটিহারে। তিন মামার একজন রেলের চাকরি নিয়ে কাটিহারে থেকে গেলেও, অন্য দুই মামা বাড়ি করেছিলেন ইসলামপুরে। ফলে কাটিহার ও ইসলামপুর দুটিই ছিল মামার বাড়ি। কিন্তু আক্ষরিক অর্থে যদি বলতে হয়, তবে মামাবাড়ি বীরভূমেই। এক ছোট্ট গ্রামে। আমার মা-মামাদের জন্ম সেখানেই। শুধু বড় হয়ে ওঠা কাটিহারে।
সেবারই ছিল দাদা ও আমার প্রথম মামাবাড়ি দর্শন। দার্জিলিং মেল ভোররাতে পৌঁছে দিয়েছিল রামপুরহাটে। আলো ফুটলে বাস ধরেছিলাম সাঁইথিয়ার। পাকা সড়কে কোনও এক জায়গায় নামিয়ে দিয়েছিল বাস। সেখান থেকে পায়ে টানা রিক্সা আর গরুর গাড়িতে চেপে আরও কিমি দুয়েক ঢুকতে হয়েছিল। আমাদের নিতে এসেছিল সাধনদা। যে কয়েকদিন ছিলাম, সকাল থেকে চষে বেড়াতাম গ্রাম। একদিন তারাপীঠ যাওয়া হয়েছিল। ছোট্ট একটি গ্রাম। কয়েকটি দোকানপাট। মন্দিরে ছিল হালকা ভিড়। মাতৃমূর্তি দর্শন করেছিলাম একদম কাছে থেকে। মহাশ্মশানে পায়ের তলায় মানুষের হাড় দেখে চমকে উঠেছিলাম। মেজ কাকিমার কোল থেকে বোন ঝিনিকে নিজের কোলে তুলে নিয়েছিলেন সেই সময়ের তারাপীঠের প্রখ্যাত সাধক শংকরখ্যাপা।
সেই যাত্রায় বক্রেশ্বরও দেখা হয়েছিল। তখনও `রক্ত দিয়ে গড়ব বক্রেশ্বর` দেওয়াল লিখন শুরু হয়নি। আরণ্যক পরিবেশে জীবনে প্রথমবার ভাত খেয়েছিলাম তালপাতার থালায়। সাধনদা একদিন নিয়ে গিয়েছিল পূর্ণদাস বাউলের আদিবাড়ি দেখাতে।
ছায়াছবির মতো এই দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। হঠাৎ দেখি তারাপীঠ লেখা সুদৃশ্য গেট। রামপুরহাটের এত লাগোয়া তো ছিল না গ্রামটি! এগিয়ে এসেছে নাকি? নিজের প্রশ্নে নিজেই হাসলাম মনে মনে। তা কখনও হয় নাকি! এগিয়ে আসেনি কেউই। শুধু বাড়িঘর আর লোকের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু তাই বলে এত! বিশ্বাসই হচ্ছে না। এ কোন তারাপীঠ? সেই ছোট্ট সুন্দর মনোরম গ্রামটি কোথায়? চারদিকে একের পর এক হোটেল, লজ আর রিসোর্ট। রাস্তা থেকে মন্দির দেখবার কোনও উপায় নেই আর। অজস্র মানুষের ভিড়। গাড়ি এগোতেই পারছে না। মন্দিরকে কেন্দ্র করে এত কিছু হতে পারে, ভাবাই যায় না। সত্যি বলতে, মন খারাপ হয়ে গেল দেখে। এটা ঠিক যে, এইসব হোটেল রিসোর্টের ফলে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। কিন্তু তারাপীঠের সেই সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে।
কোনও মতে খানিকটা এগোতে রাস্তা দুই ভাগ হল। একদিক সোজা চলে গেল তারাপীঠ বাইপাস হয়ে সাঁইথিয়ার দিকে। অন্য একটি পথ দেখাচ্ছে বীরচন্দ্রপুর ও বড় তুড়িগ্রামকে। আমাদের পথ এটিই। আঠারো কিমির সেই রাস্তা দ্রুত পেরিয়ে এলাম। রাস্তা একটু আঁকাবাঁকা। তবে ট্রাফিক কম।
তারাপীঠের দাপটে বীরচন্দ্রপুর একটু যেন কোনঠাসা। কিন্তু এই গ্রামটির গুরুত্বও কম নয়। শাক্তভূমি বীরভূমে বীরচন্দ্রপুর হল প্রখ্যাত বৈষ্ণব ক্ষেত্র। কেননা এখানেই জন্ম নিয়েছিলেন চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রখ্যাত সহচর নিত্যানন্দ স্বামী। আমাদের পৌঁছতে খানিকটা দেরি হওয়ায় আমরা শুধু `নিতাই বাড়ি` খোলা পেলাম। নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর মূল মন্দিরটি বাইরে থেকেই দর্শন করতে হল। ইসকন মন্দিরও দেখা গেল। সঙ্গে নিত্যানন্দের স্মৃতি বিজড়িত আরও কিছু দ্রষ্টব্যও। একই দিনে শাক্ত ও বৈষ্ণব ধর্মের দুটি পীঠ দেখাও বোধহয় ভাগ্যের ব্যাপার। এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দেখি রাস্তার ধারে লেখা রয়েছে বড় তুড়িগ্রাম মোড়। বীরচন্দ্রপুর আর বড় তুড়িগ্রামের দূরত্ব আসলে মাত্র পাঁচ কিমি।
বড় তুড়িগ্রাম মোড় থেকে গ্রামে ঢোকা ও সেখানকার অভিজ্ঞতা নিয়ে ইতিমধ্যেই আলাদা করে তিনটে পর্ব লিখেছি। তাই নতুন করে আর কিছু বলছি না এই লেখায়। শুধু একটাই বলার যে, মাত্র কয়েক ঘন্টার অবস্থানে মামাবাড়ি বড় তুড়িগ্রাম থেকে যা পেয়েছি, সেটি বলে বা লিখে বোঝানোর নয়। মানুষ যে মানুষের কত কাছের হতে পারে, সেটিও শিখেছি ওখানেই। খুব ভাল লাগছিল `লীলুদির ছোট ছেলে` ডাকটি শুনে। মামাবাড়ির গ্রাম খুব দ্রুত নিজের করে নিয়েছিল তার নাতিকে। মায়ের আশীর্বাদ ছাড়া সেটা হয় না। মা`কে হারানোর পাঁচ বছর পর তাই এই পাওয়া বারবার আর্দ্র করে তুলছিল চোখ। ভেসে যাচ্ছিলাম এক অদ্ভুত আবেগে।
সাঁইথিয়ায় ময়ূরাক্ষী পার হয়ে যত এগোচ্ছি, তত ইতস্তত বড় বড় পাথর আর তাল-খেজুরের সারি বলে দিচ্ছিল উত্তরের সবুজ থেকে আমরা এখন অনেকটা দূরে। পশ্চিম দিকে তখন সূর্য ক্রমে বিরাট লাল রংয়ের বল হয়ে অস্ত যাচ্ছে। এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ঢেকে যাচ্ছে চারদিক। কিন্তু তার মধ্যে কোথায় যেন অনবরত বেজে চলেছে ভাল লাগার এক অদ্ভুত সুর।
মা নলাটেশ্বরীকে সামনে থেকে আর মা তারাকে দূর থেকে প্রণাম করেছি আজ। পেয়েছি নিত্যানন্দ স্বামীর জন্মস্থানের দর্শন। একদিনে কত বৈচিত্র্য।
কিন্তু সব ছাপিয়ে গেছে বড় তুড়িগ্রাম। সেখানে মা`কে স্পর্শ করেছি। মাথা ছুঁইয়েছি মায়ের ভিটেয়। শুধু কানে বেজেছে শিলিগুড়ির এক নার্সিং হোমের বেডে শুয়ে থাকা মায়ের সেই কথা, `আমি আর বাঁচব না রে শুভু....` হাউহাউ করে কান্না পেলেও মনে হচ্ছে এই তো মা। আমার কাছেই। মা-কে নিয়েই চলছি মায়ের দেশে।
খারাপ-ভাল লাগার সেই অপার্থিব অনুভূতি নিয়ে সন্ধে নামার ঠিক মুহূর্তে দেখি চলে এসেছে আমাদের গন্তব্য। বোলপুর।
(ক্রমশ)










No comments:
Post a Comment