যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ, মরিবার হলো তার সাধ
শৌভিক রায়
`পৃথিবীটা আমার জন্য নয়। আমি মানসিক অবসাদে রয়েছি।'
হোস্টেলের ন`তলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার আগে এই কথাগুলি লিখেছিল বম্বে আইআইটি-র সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ২১ বছরের মেধাবী ছাত্র, রাজস্থানের নমন আগরওয়াল।
নতুন বছরের শুরুতে, ফেব্রুয়ারি মাসে এই আত্মহত্যা আবারও প্রশ্ন তুলে দিল যে, দেশের সবচাইতে নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির শিক্ষার্থীরা কেন এইভাবে অবসাদে ভুগবে? কেনই বা বেছে নেবে আত্মহত্যার চরম পথ?
ভারতের শিক্ষা মন্ত্রক ও প্রাক্তন ছাত্রদের বিভিন্ন সংগঠনের রিপোর্ট থেকে দেখা যাচ্ছে, বিগত পাঁচ বছরে শুধুমাত্র আইআইটি-গুলিতেই ৬৫ জন ছাত্র আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। যদি আরও একটু বিস্তৃত সময়সীমায় যাই, তবে দেখতে পাচ্ছি, ২০০৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত দুই দশকে এই সংখ্যা ছিল ১১৫। অর্থাৎ বিগত পাঁচ বছরে আত্মহত্যার হার বিগত পনেরো বছরের তুলনায় যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এদের মধ্যে অবসাদে ভুগে- ছায়াছবির সেই ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রের মতো, `আই কুইট` বলে চলে যাওয়ার সংখ্যাই বেশি।
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো-র রিপোর্ট অনুযায়ী, বিগত এক দশকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংখ্যার হিসেবে, ২০২২ সালে, সারা দেশে সেটি ছিল ১৩ হাজারের সামান্য ওপরে। আর ২০২৩ সালে সেই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়ে হলো ১৩ হাজার ৮৯২ জন। নথিভুক্ত না হওয়া আরও কতজন যে আছে, তা জানার অবশ্য উপায় নেই। অবস্থা এতটাই উদ্বেগজনক যে, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার `মহামারী` ঠেকানোর জন্য দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়কে এগিয়ে আসতে হয়েছে। কী ভাবে এই প্রবণতা বন্ধ করা যায় তার জন্য বিশেষ গাইডলাইন তৈরি করতে বলা হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলিকে।
ছাত্রদের মধ্যে আত্মহত্যার এই প্রবণতার পেছনের কারণগুলি খুঁজতে গিয়ে `বর্ধিত অ্যাকাডেমিক চাপ' শব্দবন্ধকে বোধহয় আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তার বদলে `অত্যন্ত কঠোর` ও `চূড়ান্ত অপরিকল্পিত পাঠক্রম`-কেই দায়ি করছেন সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়। সঙ্গে যোগ হয়েছে যোগ্য শিক্ষকের অভাব, অনভিজ্ঞ অতিথি শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীলতার মতো বিষয়গুলি। প্রমাণিত হয়েছে, গবেষণা করেও আজ ভবিষ্যত নিশ্চিন্ত নয়।
তবে ছাত্রদের আত্মহত্যার পেছনে শুধুমাত্র এগুলিই কারণ নয়। বরং তার জন্য বহুলাংশে দায়ী মানসিক অবসাদ। আর তার জন্য পরিবারগুলি নিজেদের দায় এড়াতে পারে না। আসলে সামাজিক কারণেই ভারতের মতো দেশে, শিক্ষাকে উচ্চ স্থান দেওয়া হয়। ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অফিসের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী- দেশের ৭৫ শতাংশ পরিবার মনে করে, জয়েন্ট এনট্রান্স, জেইই, নিট, ইউপিএসসি ইত্যাদি পরীক্ষায় সাফল্য শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নয়, বরং পারিবারিক সাফল্য। কেননা সফল পড়ুয়ার পেছনে থাকে পুরো পরিবারের অবদান। এইসব পরীক্ষায় সাফল্য পাওয়ার জন্য, শুধুমাত্র কোচিংয়ের ক্ষেত্রে পরিবারগুলি ছাত্রপিছু মাসে গড়ে ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ করে। তারা মনে করে, এইসব পরীক্ষায় সাফল্য মানেই নিজেদের অবস্থান বদলে যাওয়া, সামাজিকভাবে গর্বের স্থান অর্জন করা। সঙ্গে থাকে আর্থিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা। ফলে, যারা এই পরীক্ষাগুলি দিচ্ছে, তাদের ওপর সৃষ্টি হয় প্রবল চাপ। এই চাপ সহ্য করতে না পেরে অন্তত ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী চলে যায় অবসাদে। উচ্চ মানসিক চাপে ভোগে ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর এদের মধ্যেই কেউ কেউ বেছে নেন চরম পথ। একটি পরিসংখ্যানই এখানে যথেষ্ট। রাজস্থানের কোটায় কোচিং নিতে গিয়ে ২০২৩ মানসিক অবসাদে ভুগে ২৮ জন আত্মহত্যা করেছিল। দুই বছরে সেই সংখ্যা কিছুটা কমলেও, আত্মহত্যা থামেনি।
এমনিতেই মানসিক অবসাদ এই যুগের অন্যতম কঠিন সমস্যা। সারা বিশ্বে অবসাদে ভুগছেন এমন মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ৩.৮ থেকে ৮ শতাংশ। এদের মধ্যে আবার মহিলাদের সংখ্যা ৬.৯ শতাংশ যা পুরুষদের (৪.৬ শতাংশ) থেকে অনেকটা বেশি। আবার অবসাদগ্রস্ত এই বিপুল পরিমাণ মানুষদের মধ্যে যদি বয়স অনুযায়ী ভাগ করা যায়, তাহলে দেখা যাচ্ছে, অবসাদ ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের সব চাইতে বেশি প্রভাবিত করেছে এবং বিশ্বব্যাপী ১৫ থেকে ২৯ বছরের তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে অবসাদগ্রস্ত মানুষ মোট জনসংখ্যার ৪.৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি ২০ জন্যে ১ জন। এই ব্যাপারে পিছিয়ে নেই গ্রামীণ ভারত। অবিশ্বাস্যভাবে ভারতের গ্রামাঞ্চলে ৯.৮ শতাংশ মানুষ অবসাদে ভুগছেন। তুলনামূলকভাবে শহরে তা কম, ৬.২ শতাংশ।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, অবসাদগ্রস্ত ভারতীয়দের হার যে বয়স-সীমায় সবচাইতে বেশি, সেটি হল ১৫ থেকে ২৯ বছর। অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, এই মুহূর্তে ভারত সারা পৃথিবীতে অবসাদে ভুগে ছাত্র-আত্মহত্যার শীর্ষে থাকা দেশগুলির অন্যতম। ইউনিসেফ দ্বর্থ্যহীন ভাষায় বলছে, `ভারতে পনেরো থেকে চব্বিশ বছর বয়সী প্রতি সাতজন তরুনের মধ্যে একজন মানসিক অবসাদে ভোগে। আরও দুর্ভাগ্য যে, এই বিপুল পরিমাণ অবসাদগ্রস্ত তরুণের মধ্যে মাত্র ৪১ শতাংশ সাহায্য চায়।` বাকিরা হারিয়ে যায় অবসাদের তীব্রতর অন্ধকারে। এই রাজ্যের অবস্থা কী এই ব্যাপারে? একটি লাইন-ই যথেষ্ট- `অবসাদে ভোগা ছাত্রদের আত্মহত্যার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ দেশের প্রথম পাঁচটি রাজ্যের অন্যতম`। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো-র তথ্য অনুযায়ী এই রাজ্যে ছাত্র আত্মহত্যার হার ৭.৪ থেকে ১১ শতাংশে ঘোরাফেরা করে।
মুশকিল হল, অবসাদ মুক্ত হওয়ার নির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসা নেই। ফলে সম্পূর্ণ সেরে ওঠার সুযোগটিও কম। তবে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় কাউন্সেলিং, সাইকো-ডায়নামিক ও কগনিটিভ সাইকোথেরাপি থেরাপি ইত্যাদির পাশাপাশি, জন হপকিন্স হাসপাতালের মতো অত্যন্ত নামী প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ ও খাদ্য-তালিকাকেও প্রাধান্য দিচ্ছে। কিন্তু এ সবই বাহ্য। অবসাদে ভোগা মানুষের কাছে অনেক বেশি প্রয়োজন সঠিক পথে নিজেকে পরিচালনা করা। আর এই ব্যাপারে রাষ্ট্র থেকে পরিবার যদি তার পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে কোনও ভাবেই অবসাদ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। এই ব্যাপারে রাষ্ট্রের যেমন উচিত তরুণদের ভবিষ্যত নিশ্চিন্ত করা, তেমনি পরিবারগুলিকেও চাপমুক্ত পরিবেশে ছাত্রদের নিজেদের মতো এগিয়ে যেতে দিতে হবে। ছাড়তে হবে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির অলীক স্বপ্ন।
এই বিপুল জনসংখ্যার দেশে, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রবল চাপ নিয়ে, আমাদের আগামী প্রজন্ম সেই সহায়তা পাবে কিনা, সেই ব্যাপারে সন্দেহ থেকেই যায়। এই মুহূর্তে সেটিই বোধহয় দেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
(লেখক কোচবিহার নিবাসী শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক)
(প্রকাশিত: এই সময়/ ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬
আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা `এই সময়')

No comments:
Post a Comment