বছর শেষে কাছেই কোথাও (পর্ব- ২)
শৌভিক রায়
ফারাক্কা ব্রিজে পা রেখেছি কি রাখিনি, বিশুভাইয়ের ফোন,
- কী রে কতদূর তোরা?
- এই তো ফারাক্কা।
- তাহলে আর বেশিক্ষণ লাগবে না। চন্দ্রজিতকে ফোন করেছিস? মোড়গ্রামে পৌঁছে করিস। ও নিয়ে যাবে।
- বলছিলাম কী, এবার না হয় না গেলাম তোর বাড়ি....
- আরে আগে যা তো, তারপর হবে।
বিশুভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় বছর তিরিশ-পঁয়ত্রিশ। ইউনিভার্সিটি শেষ করে রীনার দাদা প্রয়াত দুর্গাদাস সাহা ও আরও কয়েকজন বন্ধু মিলে শিবমন্দিরে একটা মেস তৈরি করেছিল সাবিত্রী সুইটসের কাছে নিয়োগী বাড়ির একতলায়। সেখানেই একদিন বোর্ডার হিসেবে এসেছিল বিশুভাই। ও তখন উত্তরবঙ্গ গ্রামীণ ব্যাঙ্কের মাটিগাড়া খাপরাইল শাখায় সদ্য যোগ দিয়েছে। আদতে অবাঙালি। কিন্তু অনেক বেশি বাঙালি। এই যে আজকাল বিতর্ক চলছে না, কে বাঙালি আর কে নয়, তারা যদি বিশুভাইকে দেখে তবে লজ্জা পাবে। নলহাটির মানুষ বিশুভাইয়ের বাবা ছিলেন শিক্ষক। আমি ও রীনাও শিক্ষক পরিবারের। তাছাড়া ও আমাদেরই সমবয়সী। ফলে ওর সঙ্গে ভাব হতে বেশিদিন লাগেনি। বিশুভাই এখন শিলিগুড়ির বাসিন্দা। যোগাযোগ-যাতায়াত সবই আছে। বিশুভাইয়ের ইচ্ছে, আমরা যেন নলহাটিতে নলাটেশ্বরী মন্দির দর্শন করি। আর ওর বাড়িতেও ঢুঁ দিই।
মন্দির দর্শন নিয়ে কোনও প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু সত্যি বলতে, এই যাত্রায় ওর বাড়িতে যেতে চাইনি। এমনিতেই যেতে হবে অনেকটা। তার ওপর ঢুকব আর একটি জায়গায়। খুঁজতে হবে একটি বিশেষ বাড়ি। তাই আমতা আমতা করছিলাম। ওদিকে না বলতেও পারছি না। বিশুভাই দুঃখ পাবে। তাছাড়া মন্দির দর্শনে ওর ভাই চন্দ্রজিতের সাহায্য পেলে ভাল হয়। না হলে আমাদের খুঁজতে হবে। সেটা নিঃসন্দেহে সময়-সাপেক্ষ।
প্রকৃতি ইতিমধ্যে বদলে গেছে অনেকটাই। যদিও আজকাল ফোর-লেনের রাস্তায় সেভাবে বোঝা যায় না কিছু। সব জনপদগুলি একই রকম লাগে। তবু মানুষের কথা, ভাবভঙ্গি, হাঁটাচলা ইত্যাদি লক্ষ্য করলে পার্থক্য বোঝা যায়। আর একটু খুঁটিয়ে দেখলে প্রকৃতির।
আহিরণ পার করে মোড়গ্রামে এসে চন্দ্রজিতকে ফোন করলাম। বিশুভাইয়ের মতোই গলা ও বলার ভঙ্গি। জানালো নলহাটি ঢুকতেই নেতাজি সুভাষের মূর্তি রয়েছে যে চৌমাথায়, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ও। আগে বাড়ি নিয়ে যাবে। তারপর মন্দিরে। বললাম যে, বাড়ি আর ঢুকব না। উত্তর এলো,
- আরে আসুন না আগে। তারপর দেখা যাবে।
নলহাটিতে পৌঁছে দেখি বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রজিত। বিশুভাইয়ের কার্বন কপি। আদেশ হল, ওর বাইকের পেছনে যেতে। বুঝতে পারলাম ছাড় নেই। বাড়িতেই নিয়ে চলেছে আগে। কিন্তু ভাগ্য সহায়। স্টেশনের ওপারে ওদের বাড়ি। রেলগেট বন্ধ। সুতরাং ঠিক হল, আগে মন্দির যাওয়া হোক। চললাম আবার ওর পেছন পেছন।
এখানে একটা কথা বলার আছে। আমরা যারা কোচবিহারে থাকি, তারা বাইরে অনেক জায়গায় গিয়ে চাপা রাস্তা দেখে অস্বস্তিতে ভুগি। আজকাল কোচবিহারের রাস্তাঘাটও অনেকটা সংকুচিত হয়ে গেছে নানা কারণে, কিন্তু তবু যা আছে সেটাও কম নয়। নলহাটির রাস্তা তুলনায় অত্যন্ত চাপা। দুটো গাড়ি পাশাপাশি যাওয়া বেশ দুষ্কর। যা হোক, ওভাবেই পৌঁছলাম মন্দিরে।
ছোট্ট টিলার ঢালে নলাটেশ্বরী মন্দির। একটি পাথরকে দেবীর রূপ দিয়ে পুজো করা হয় এখানে। দেবীর চোখ, নাক, মুখ রুপোর। সতীপীঠের অন্যতম এই মন্দির। বলা হয়, বিষ্ণুচক্রে খণ্ডিত হয়ে সতীর কণ্ঠনলা পড়েছিল এখানে। অংকে অবশ্য মনে করেন নলা বা নুলো তথা কনুইয়ের হাড় পড়েছিল নলহাটিতে। তবে সেটি দেখতে হলে যেতে হবে ভোরবেলায় দেবীর স্নানের সময়। এই মন্দিরটি গড়ে দিয়েছিলেন নাটোরের রানি ভবানী। অবশ্য বর্গী হামলা দমনকারী তথা নবাবের সুবেদারের কথাও শোনা যায় মন্দিরের নির্মাতা হিসেবে। মন্দিরের পেছনে বর্গীযুদ্ধে মৃত পীর কেবলা আনাশাহী মাজার শরীফ। নলহাটি থেকে রাজমহল পাহাড় খুব দূরে নয়। বাংলা-বিহার সীমান্তে নাথপাহাড় ও চন্দ্রময়ী পাহাড়ও দেখে নেওয়া যায়।
তবে আমাদের এইবারের যাত্রায় শুধু মন্দির ও দেবী দর্শন। সেটি হয়ে গেলে চন্দ্রজিত রীতিমতো বগলদাবা করে নিয়ে গেল ওদের বাড়িতে। নলহাটি মূল বাজারের মধ্যে একশো বছরের পুরোনো পেল্লায় বাড়ি। কড়ি-বরগার ছাদ, ছোট ছোট ঘর ইত্যাদি সব কিছু মিলে ভিনটেজ ছাপ। পুকুর রয়েছে সঙ্গে। আছে গোয়াল ঘরও। অত্যন্ত অতিথিবৎসল সকলে। কেউ সকালের জলখাবার খায়নি। আমাদের জন্য বসে আছে।
লজ্জায় পড়তে হল। আহিরণে ভরপেট খেয়েছি খানি আগে। আমার পক্ষে আর কিছু খাওয়া অসম্ভব। তবু একটু কিছু মুখে দিতে হল। সামান্যই। কথা দিতে হল আবার আসব। শেষ অবধি ছাড়া পেলাম। মনে হল, যদি না আসতাম তবে কি জানতাম আজও মানুষ এত ভাল?
আসলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরা সত্যিই ভাল। অযথাই খারাপ হয়ে যাই না বুঝে। বাঙালি-অবাঙালি, জাতপাত এসব কিচ্ছু না। দিনের শেষে সত্য শুধু মানুষে মানুষে সম্পর্ক। ভালবাসা। নলহাটি ঠিক এই শিক্ষাটাই দিল।
মা নলাটেশ্বরীকে মনে মনে প্রণাম করলাম আবার....
(ক্রমশ)





No comments:
Post a Comment