বছর শেষে কাছেই কোথাও
শৌভিক রায়
তুলাইপাঞ্জি চালের ব্যাগটা নিয়ে যখন গাড়িতে উঠছি, সুনীলের চোখে তখন জল। চোখ ছলছল আমারও। জড়িয়ে ধরেছি দুজন দুজনকে।
আবার কবে হবে দেখা, বন্ধু, তোর সঙ্গে? কবে? কবেএএএ ?
প্রশ্ন বোধহয় রীনারও। আসলে সহপাঠী তো তিনজনই।
কোচবিহার থেকে সকাল সাতটায় যখন রওনা হলাম, তখন দশ হাত দূরের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এত্ত কুয়াশা। বাধ্য হয়েই কুরবানকে খুব ধীরে চালাতে হচ্ছে। ফ্রন্ট সিটে ওর পাশে বসে সজাগ থাকছি নিজেও। ফালাকাটা-ধূপগুড়ি পার হয়েও জমাট বাঁধা কুয়াশা কাটছে না। এদিকে ঘড়িতে তখন অনেকটাই বাজে। শীত নেই, শীত নেই করে এতদিন চেঁচিয়েছি। আজ নিজেকেই মনে মনে গাল দিচ্ছি কী দরকার ছিল এসব বলার ভেবে। শীত মানে যে সে শীত! ভেতর অবধি কাঁপিয়ে দিচ্ছে এতগুলো জামাকাপড় গায়ে থাকা সত্বেও।
জলপাইগুড়ি-ফাটাপুকুরের পর খানিকটা পরিষ্কার হল আকাশ। রক্ষে ওটাই। নাহলে সত্যি বিপদ ছিল। আসলে চলছি তো দীর্ঘ পথ।
ইসলামপুরকে বাইপাস করা গেল। জানি মামা মন খারাপ করবেন। এত কাছে এসেও দেখা করলাম না। কিন্তু উপায় নেই। শহরে ঢুকলেই দেরি হবে। এমনিতেই যথেষ্ট বেলা। সুনীলের ফোন এসেছে বার কয়েক। অপেক্ষা করছে ওরা অধীর আগ্রহে। আমরাও উদগ্রীব দেখা করবার জন্য। ১৯৯৩ সালের পর ওর সঙ্গে দেখা হয়নি। ইউনিভার্সিটিতে যে কয়েকজন আমরা খুব কাছের বন্ধু ছিলাম, সুনীল তাদের একজন। রায়গঞ্জে আমার ছোটমাসির বাড়ি হওয়ার সুবাদে ওর সঙ্গে ভাব হয়ে গিয়েছিল বেশি। ওই বাড়ির প্রায় সবাই ছিল ওর চেনা।
ডালখোলা যখন পার হচ্ছি, তখন মনে পড়ল শ্রদ্ধেয় রাজকুমার জাজোদিয়ার কথা। মানুষটি আনন্দবাজার পত্রিকায় আমার লেখা পড়ে খোঁজ নিয়েছিলেন পত্রিকা দপ্তরে। ঠিকানা জোগাড় করে চিঠি লিখেছিলেন। এখনও ফোন করেন কখনও। ইচ্ছে ছিল দেখা করার। কিন্তু ওই যে। সময় নেই।
ঠিক কতদিন পর যাচ্ছি রায়গঞ্জে? হিসেবে কষলাম। না কষলেই বোধহয় ভাল হত! সম্ভবত ১৯৯৬ শেষ গিয়েছি ওখানে। এই বছর অবশ্য পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমি আয়োজিত লিটিল ম্যাগাজিন মেলায় ডাক পেয়েছিলাম রায়গঞ্জে। কিন্তু আজকাল এই জাতীয় অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলি।
এত কথা বলছি রায়গঞ্জ নিয়ে তার অবশ্য কারণ আছে। আসলে এই শহরটা আমার খুব প্রিয় ছিল একসময়। দু`চার বছরে একবার রায়গঞ্জে যাওয়া পাক্কা ছিল আমাদের। শহরের দেবীনগর এলাকায় ভারত সেবাশ্রমের ঠিক পেছনেই ছিল ছোটমাসির বাড়ি। ওখান থেকে হেঁটে হেঁটে বহুবার এসেছি বিদ্রোহী মোড়ে। গীতাঞ্জলি সিনেমা হলে ছবি দেখেছি। ভোরবেলায় বীরনগরের গৃহস্থ বাড়ি থেকে ফুল চুরি করেছি। কুলিকের জঙ্গলে পাখি দেখে মুগ্ধ হয়েছি।
মাঝে এতগুলো বছর যাইনি। বরং বলা ভাল যাওয়া হয়নি। এখন ওই বাড়িতে মাসতুতো ভাই একা থাকে। ও কিছুটা অসুস্থ। মাসি মেসো নেই। এক বোনও অকালে চলে গেছে। আর এক বোন বিয়ে হয়ে কলকাতায়। একটা ঝলমলে বাড়ি কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেছে। এরকমটাই হয় আসলে। নিয়ম সেটাই বলে।
টুঙ্গিদিঘি যখন পার হচ্ছি, তখন বিশ্বাস করতে পারছি না যে, এই জায়গাগুলো কীরকম ফাঁকা ছিল সেই সময়। অবশ্য পুরো রাস্তাটাই অবিশ্বাস্য যেন। আমাদের ছোটবেলায় এই ফোরলেনের কথা কে আর ভেবেছি। কিষণগঞ্জ আর ডালখোলা যে জ্যাম মুক্ত হতে পারে, সেটাও কল্পনা করিনি কোনও দিন।
এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে দেখি কুলিক হাজির। দেখেই মন খারাপ হয়ে গেল। সেই আরণ্যক পরিবেশটাই আর নেই। এত বাড়িঘর হইচই ভাবাই যায় না। ব্রিজ যখন পার হচ্ছি, তখন মনে পড়ল অজয় স্যারের কথা। ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শ্রদ্ধেয় অজয় বর্মন আসলে রায়গঞ্জের মানুষ। একবার গ্রীষ্মের ছুটিতে বাবা-মা সহ আমরা কুলিক ব্রিজে হাঁটছি, দেখি উল্টোদিক থেকে মোটর সাইকেলে অজয় স্যার আসছেন। মাথায় রুমাল বাঁধা। ছবিটা ফ্রিজ শটে আজও যেন বন্দী চোখে।
শিলিগুড়ি মোড়ে খানিকটা ভিড় পেলাম। শহরেও তাই। আজকাল অবশ্য টোটো-অটো ইত্যাদি সব মিলিয়ে সব শহরের বাজে হাল। অন্য শহরগুলোর মতোই রায়গঞ্জও অনেক বদলে গেছে।
বীরনগরে সুনীলের বাড়ি খুঁজে পেতে কষ্ট হল না। ও এখন একটি স্কুলের হেডমাস্টার। মেয়ে আর সহধর্মিণীকে নিয়ে ছোট্ট সংসার। ওর বাড়ির ছাদ থেকে রায়গঞ্জ ইউনিভার্সিটি দেখা যায়। ওখানে দাঁড়িয়েই ফোন করলাম অরিত্রকে। অরিত্র আমার ছাত্র। রায়গঞ্জ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। এসেছি শুনেই চেঁচামেচি শুরু করে দিল। কিন্তু সময় নেই। যেতে হবে আজ আরও খানিকটা।
সুনীলের বাড়ির খাওয়ার কথা না বললে খারাপ হবে। নিরামিষ রান্না এত সুন্দর হতে পারে, সেটা না খেলে বোঝা যেত না। সুনীল অবশ্য মাছ-মাংসের কথা বলেছিল। কিন্তু আমরাই না করেছিলাম। আর শুধু খাওয়া? তুলাইপাঞ্জি চাল, রায়গঞ্জের স্পেশাল বেগুন ইত্যাদি সব কিছু নিয়ে এসেছে বন্ধুটি আমাদের জন্য।
- ওরে, আমরা তো ফিরব প্রায় পাঁচ-ছয়দিন পর। ততদিন এই বেগুন টিকবে না রে।
- টিকবে টিকবে। ভাবিস না।
সুনীলের গলায় যে কনফিডেন্স, তাতে আর না করা গেল না।
কিন্তু হেডমাস্টারের গাম্ভীর্য উবে গেল যখন বেরোচ্ছি ওর বাড়ি থেকে।
সুনীলের চোখে জল।
আমার চোখ ছলছল।
মাঝে রীনা।
ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে মাসির বাড়িতে একবার উঁকি দিয়ে মন আবার খারাপ হয়ে গেল।
আসলে এইবারের এই চলা বোধহয় মন খারাপের যাত্রা।
ইটাহার, গজল, আদিনা পেরোতে পেরোতে ভাবছিলাম সেটাই।
হঠাৎ কুরবান বলল, `স্যার, মালদা এসে গেছে।`
সন্ধে নামছে তখন। মালদায় থাকব বোনের বাড়ি। আবার মন খারাপ হয়ে গেল।
আড়াই বছর আগে যখন ওর বাড়িতে আসি, তখন ওর বাবা-মা অর্থাৎ আমার মেজকাকু-কাকিমার সঙ্গে এসেছিলাম। মাত্র পাঁচদিনের ব্যবধানে দুজনেই চলে গেছেন বছর খানেক আগে।
(ক্রমশ)






No comments:
Post a Comment