Tuesday, February 17, 2026


 


আরও বিমানবন্দর চাই উত্তরবঙ্গে

শৌভিক রায় 


বছর কয়েক আগের কথা। বর্ষাকালে একটি রেলব্রিজ ভেঙে দেশের অন্য অংশের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল উত্তরবঙ্গ। বেহাল সড়কপথে কোনও ভাবে ক্ষীণ যোগাযোগ টিকে ছিল। বাগডোগরা বিমানবন্দর হয়ে উঠেছিল একমাত্র বিকল্প। মাঝে কয়েকবছর কেটে গিয়েছে। দ্বিতীয় লাইন-সহ রেলপথের বৈদ্যুতিকরণ হয়েছে। সড়কপথও অনেকটা উন্নত। ফোর-লেনের মসৃণ পথে দ্রুত ছুটছে গাড়ি। বিভিন্ন জায়গায় জ্যাম এড়ানো গিয়েছে। বহু জায়গায় নদীর ওপর দ্বিতীয় সেতু তৈরি হয়েছে। ফলে, রেলপথে যেমন ছুটছে `বন্দে ভারত`-এর মতো দ্রুত গতির ট্রেন, তেমনই সড়কপথেও দেখা যাচ্ছে দ্রুতগতির আধুনিক বাস। 

কিন্তু আজ অবধি বাগডোগরা ছাড়া উত্তরবঙ্গে, সেই অর্থে, আর কোনও বিমানবন্দর গড়ে ওঠেনি। যদিও তা খুবই জরুরি।সেই কারণেই, ভৌগোলিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চলটি যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেকাংশেই পিছিয়ে রয়েছে। কোচবিহার বা মালদহতে বিমানবন্দর থাকলেও, আমরা জানি সেগুলির অবস্থা কী। কিছুদিন আগেও সপ্তাহের ছ`দিন কোচবিহার থেকে ছোট বিমান চালু ছিল। বর্তমানে বিমান উড়ছে মাত্র একদিন। অন্যদিকে, মালদায় বিরাট রানওয়ে থাকলেও পরিষেবা নেই। ফলে, দার্জিলিং পাহাড়, সিকিম থেকে শুরু করে সমগ্র ডুয়ার্স, এমনকি নিম্ন অসমের একটি বিরাট অঞ্চলের মানুষকে সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে বাগডোগরার ওপর।   

মুশকিল হল, উত্তরবঙ্গের বহু জায়গা থেকে বাগডোগরা পৌঁছতে সময় লাগে পাঁচ-ছয় ঘন্টা। তারপরে বিমানবন্দরেও দেড়-দুই ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়। গন্তব্যে পৌঁছতে যদি একঘন্টাও লাগে, তবুও মোট সময় লাগছে আট-নয় ঘন্টা। আর যদি কোনও কারণে বিমানবন্দর বন্ধ থাকে, তবে কী হয়রানি হয় সেটা ভুক্তভোগীরা জানেন। তাই উত্তরের আরও দু`একটি জায়গায় যদি উড়ানের ব্যবস্থা থাকত, তবে এই অবস্থা সহজেই এড়ানো যেত। 

উত্তরবঙ্গ থেকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন কী পরিমাণ যাত্রী বিভিন্ন জায়গায় যান, বাগডোগরা বিমানবন্দর তার প্রমাণ। এই মুহূর্তে সেখান থেকে ১২ হাজারেরও বেশি যাত্রী যাতায়াত করেন। বছরের হিসেবে সংখ্যাটি ৩০ লক্ষ। উড়ানের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৭৪। এই বিপুল সংখ্যক যাত্রীর অধিকাংশই উত্তরবঙ্গের নানা এলাকার। মজার কথা হল, মুম্বাই-চেন্নাই বা তিরুবন্তপুরমের মতো বহু দূরের জায়গা থেকে তারা দুই-আড়াই ঘন্টায় বাগডোগরায় পৌঁছে যান। কিন্তু সেখান থেকে বাড়ি পৌঁছতে তাঁদের অনেকের সময় লাগে চার-পাঁচ ঘন্টা বা আরও বেশি। আজ, যদি আরও দুই-একটি জায়গায় চালু বিমানবন্দর থাকত, তবে যাত্রীদের সময় ও খরচ দু`টিই বাঁচত। কোচবিহারের ৭০ কিমি দূরের রূপসী-গৌরীপুর থেকেও প্রতিদিন উড়ান ছিল। অজানা কারণে সেটিও আজ প্রায় `নন-ফাংশনাল`। কোচবিহারের মতোই সেই বিমানবন্দরটিও যেন ঢাল নেই তরোয়াল নেই নিধিরাম সর্দার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! 

অন্তত আরও একটি বিমানবন্দর চালু করা হোক। তবে এ  ব্যাপারে প্রশাসনের অনিচ্ছা বোধহয় উত্তরবঙ্গবাসীর গা সওয়া হয়েগিয়েছে। তাই বিমানবন্দর চালু হওয়ার কথা শুনেও, কেউ আর কর্ণপাত করেন না। কেননা নির্বাচন এলেই শেয়ালের কুমীরছানা দেখানোর মতো এই বিষয়টিকে গর্ত থেকে টেনে বের করা হয়। তারপর-  যাহা পূর্বং, তাহাই পরং হয়ে যায়।

( শিক্ষক, কোচবিহার)

(প্রকাশিত: আনন্দবাজার পত্রিকা, উত্তরবঙ্গ সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬)

No comments: