Thursday, February 19, 2026



বছর শেষে কাছেই কোথাও (পর্ব- ৪)

শৌভিক রায়     

বোলপুরে পৌষমেলা চলছে। চারদিকে হইচই। বিভিন্ন রাস্তায় `নো এন্ট্রি`। আমাদের হোটেল ভুবনডাঙায়। মেলার কাছেই। 

হোটেলে পৌঁছে ব্যাগ রেখেই ছুটলাম মেলা দেখতে। হিসেবে মতো সেদিনই মেলার শেষদিন। দলে দলে লোক চলেছে তাই। ভিড়ে ভিড়াক্কার। যাহোক ঠেলে-গুঁতিয়ে মেলায় পৌঁছে বুঝলাম, দোকানপাটের ক্ষেত্রে আমাদের রাসমেলার সঙ্গে পৌষমেলার বিশেষ পার্থক্য নেই। সেই একই ধরণের জিনিসপত্র বিক্রি হচ্ছে। তবে রাসমেলার `পাট`-এর ব্যাগ, ঘরসজ্জা ইত্যাদির মতোই এখানেও স্থানীয় কিছু `প্রোডাক্ট` অবশ্যই আলাদা। এক স্থূলকায় নাগা সাধু বসে আছেন। তাঁর সামনে বেশ ভিড়। কোচবিহারের তুলনায় ঠাণ্ডা অনেকই কম। তবে একটা শিরশিরানি হাওয়া বইছে। 

ভিড়ের মধ্যেই লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পৌঁছোলাম পৌষমেলার সাংস্কৃতিক মঞ্চের সামনে। আমার মতে, পৌষমেলার এই মঞ্চের বিভিন্ন অনুষ্ঠান তাকে অন্য যে কোনও মেলার চাইতে আলাদা করে। শুধু বাউল সংগীতের জন্য নয়, অন্য যে সমস্ত অনুষ্ঠান হয়, সেগুলিও যথেষ্ট উঁচুদরের। ওখানেই জানলাম, সেদিনের অনুষ্ঠানের পরেই সাংস্কৃতিক মঞ্চ বন্ধ হয়ে হবে। মেলার দোকানপাট আর হয়ত দিন দুয়েক থাকবে। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান দেখা গেল। যাত্রাপালা চলছে। সত্যি বলতে, আজকাল কোনও অনুষ্ঠানেই যাই না। আর শেষ কবে যাত্রা দেখেছি, সে কথা মনে করতে পারলাম না। অথচ আমাদের ছোটবেলায় যাত্রা ছিল বিনোদনের বড় অঙ্গ। মনে পড়ছিল নট্ট কোম্পানির `অচল পয়সা` যাত্রাপালার সেই অ্যানাউন্সমেন্ট, শান্তিগোপালের চরিত্রাভিনয়, ফালাকাটার খাসমহল ময়দানের যাত্রাপালা `মহুয়া`, দিনহাটার গোধূলী বাজারে অজিতেশ বন্দোপাধ্যায়ের যাত্রা ইত্যাদির কথা। কোচবিহারের রাসমেলায় মদনমোহন মন্দিরের মঞ্চে এখনও যাত্রা হয়। মন্দিরের পেছনে বাড়ি হওয়ার সুবাদে যাত্রার `ডায়ালগ` কানে আসে। কিন্তু ওই অবধিই। কতজন যাত্রা শোনে কে জানে। আসলে, শীতের রাতে খড় বিছানো মাটিতে বসে যাত্রা দেখার মজা ছিল আলাদা। চারদিক খোলা মঞ্চে যখন যাত্রার `কনসার্ট` বেজে উঠত, তখন আমাদের দর্শকদের মনে যে কী উথালপাথাল শুরু হত, সেটাও বলে বোঝানো যাবে না। যদিও বলা হত `যাত্রা দেখে ফাত্রা লোকে` কিন্তু সেটা যে কথার কথা তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কেননা বহু তথাকথিত `ভদ্র` ও `সংস্কৃতিমনস্ক` মানুষকেও যাত্রা শুনতে দেখেছি। যাহোক, আরও কিছুক্ষণ মেলায় থেকে রাতের বিশ্বভারতী ক্যাম্পাস দেখে ফেরা গেল। সকালে মালদা থেকে বেরিয়েছি। সারাদিনের ক্লান্তি। বিশ্রাম অবশ্যই প্রয়োজন।    

পরদিন সকাল আটটা নাগাদ মান্নান ভাই টোটোরিক্সা নিয়ে হাজির। দেরি না করে বেরিয়ে পড়া গেল। হাতে আজ আর আগামীকাল রয়েছে। তার পরদিন অন্য একটা প্রোগ্রাম রয়েছে। ফিরতে হবে তার পরে। যদিও বোলপুর শান্তিনিকেতন দেখার জন্য এক বা দেড়দিন যথেষ্ট, তবু হাতে সময় থাকলে রয়েসয়ে দেখা যায় সব। 

বোলপুর দর্শনকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমভাগে অবশ্যই রবীন্দ্র স্মৃতিধন্য শান্তিনিকেতন। সঙ্গে সুরুল ও রায়পুর রাজবাড়ি, বুদ্ধস্তুপ, সৃজনী শিল্পগ্রাম এবং আমার কুটির। অন্যভাগে আদিবাসীদের গ্রাম, সোনাঝুরি হাট, ফসিল পার্ক, কঙ্কালীতলা, কোপাই ইত্যাদি। এগুলি বাদেও অবশ্যই আরও কিছু রয়েছে। সেগুলি দেখা নির্ভর করে সময় ও মর্জির ওপর। 

কমবেশি সবাই জানেন যে, ১৮৬ সালে রায়পুরের জমিদার এস পি সিনহার থেকে নিকডাঙায় ২০ বিঘা জমি কিনে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত সেটি ছিল একটি বাড়ি। সেই বাড়ি থেকেই জায়গাটির নাম হয় শান্তিনিকেতন। আর সেই শান্তিনিকেতন নামের আশ্রমেই ১৯০১ সালের ২২ ডিসেম্বর পাঁচজন ছাত্র নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুরু করেন তাঁর ব্রহ্মচর্যাশ্রম। ১৯২২ সালের  ১৬ মে সেখানে গড়ে ওঠে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। এর বেশি কিছু বলতে যাওয়া বাতুলতা মাত্র। 

















শান্তিনিকেতনের মূল আকর্ষণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ জীবনের আবাস উত্তরায়ণ। এখানেই বিচিত্রা ভবনে রয়েছে রবীন্দ্র মিউজিয়াম। রবীন্দ্র স্মৃতি বিজড়িত উদয়ন, কোনার্ক, শ্যামলী, পুনচ, উদীচী ইত্যাদিও অন্যতম আকর্ষণ। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাধনবেদি ছাতিমতলার অমোঘ আকর্ষণ আজও অস্বীকার করা যায় না। রয়েছে রঙিন কাঁচের উপাসনা মন্দির ব্রহ্মচর্যাশ্রম। কলাভবনে দেখা মেলে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, রামকিঙ্কর বেইজ প্রমুখ বিখ্যাত শিল্পীর আঁকা ছবি ও ভাস্কর্য। আলাদা করে উল্লেখ করতেই হয় তালধ্বজের। 

সমস্যা হল, অতীতের সেই উন্মুক্ত শান্তিনিকেতন আর নেই। কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার জন্য আজকাল নানা নিয়মকানুন হয়েছে। এমনিতেই অবশ্য পৌষমেলার জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ।তবে আজকাল নাকি রবিবার নির্দিষ্ট ফি দিয়ে গাইড নিয়ে প্রবেশ করতে হয়। অন্যদিনগুলিতে ঢুকবার অনুমতি মেলে না। যাহোক আমরা নিজেদের মতো দেখলাম সব। কখনও মান্নান ভাইয়ের টোটোরিক্সায় চেপে, আবার কখনও পায়ে হেঁটে। খুব ভাল লাগল নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রোফেসর অমর্ত্য সেনের বাড়ি দেখে। এমনিতেই ওঁর প্রতি আমার আলাদা শ্রদ্ধা রয়েছে। কেননা উনি আমার বাবার শিক্ষক। 

বিশ্বভারতী ও সংলগ্ন বিভিন্ন পল্লী ঘুরে বল্লভপুর ডিয়ার পার্কের পাশ দিয়ে প্রান্তিক স্টেশন পৌঁছে চললাম কঙ্কালীতলায়। বেঙ্গুটিয়া গ্রামে কুণ্ডের পাড়ে ৫১ পীঠের অন্যতম এই পীঠে দেবীর কাঁকাল বা কোমর পড়েছে। দেবী মন্দিরের পাশাপাশি রয়েছে কাঞ্চিশ্বর শিব মন্দির।  কঙ্কালীতলা মন্দিরে দেবীর প্রতীক হিসেবে ত্রিশূল আর পটে কালীরূপী কঙ্কালী মায়ের পুজো হয়। জনশ্রুতি, দেবীর কাঁকাল শিলাখন্ডরূপে মন্দির লাগোয়া কুণ্ডে রয়েছে। 

কঙ্কালীতলায় সেদিন বেশ ভিড়। আমাদের অবশ্য পুজো দেওয়ার ব্যাপার ছিল না। তাই মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করিনি। বাইরের মিষ্টি রোদে বসে বসে দেখছিলাম সব। একবার উঠে বাইরে থেকেই দেবীর ছবি ও ত্রিশূলটি দেখে নিলাম। এখানেই প্রথম পেলাম আদিবাসী মহিলাদের। তাঁরা দল বেঁধে তাঁদের চিরায়ত নৃত্য করে চলেছেন গোল করে ঘুরে ঘুরে। অনেকেই তাঁদের সঙ্গে পা মেলাচ্ছেন। আমরা অবশ্য ভিডিও করা আর ছবি তোলার মধ্যেই রইলাম। এখানেই দেখা হল বিখ্যাত কোপাই নদীর সঙ্গে। যদিও কোপাই বলতে সবাই যেখানে যায়, এটি সেই জায়গা নয়। তবু প্রথম কোপাই দেখা। ভাল তো লাগবেই। কত শুনেছি এই নদীর কথা। আজ সে চোখের সামনে। 

(ক্রমশ)        

No comments: