Saturday, February 28, 2026


 

গুহা 
শৌভিক রায় 


সেদিন ঝিরকার হাতে মদের বোতলটা দেখেও এতটা অবাক হয়নি সম্পদ, আজ যতটা হল গুহার মুখটাকে দেখে। মুখটা সত্যিই বড় হচ্ছে। ঝিরকা ভুল বলেনি। 

- প্রথম বড় হয়েছিল সেই মহামারির সময়। 
- কোন মহামারি?
- তোরা যখন নামলি দ্বীপে। আমাদের সঙ্গে ভাব করলি। 
- কী যে  বলিস, আর না বলিস! সে সব কি আজকের কথা নাকি?
- জানি তো। 
- জানিস যখন, তখন বলছিস কেন?  তোর বাপ ঠাকুর্দাও তো জন্মায়নি তখন। 
- ইতিহাস তো তাতে বদলাবে না.....তোদের জন্যই ওই মহামারি। তোরাই এনেছিলি। তোদের সঙ্গে মিশেই তো রোগ ছড়ালো আমাদের মধ্যে। তোদের ওই সব রোগ সামলানোর মতো শরীর আমাদের আজও নেই। শেষ করে দিয়েছিলি তোরা। 
- বেশ। মানলাম। কিন্তু তার সঙ্গে গুহার মুখ বড় হওয়ার সম্পর্ক কোথায়?
- আছে আছে। বুঝবি না। একদিন এই গুহা সব কিছু গিলে খাবে। 
- তার আগে বল, মদের বোতল পেলি কোথায়?
- দিয়েছে একজন। 
- গ্রামের কেউ? কী দিয়েছিলি তাকে? হরিণের মাংস?
- পরিচিত না। বেড়াতে এসেছিল। 
- টুরিস্ট? তোদের সঙ্গে না ওদের মেশা বারণ! 
- ওসব কথার কথা। 
- কিন্তু কী দিলি তাকে?
- ছবি তুলতে দিয়েছি আমার সঙ্গে। 
- ছবি? সেকি রে। লোকটা ধরা পড়লে তো জেল খাটবে। 
- সেটা তার সমস্যা। নে সিগারেট খা। 
- সিগারেট? এটাও শিখেছিস? এটা আবার কে দিল?
- তোদের গ্রামের লোক। ঝিনুক দিয়েছিলাম। 
- এখন তোদের রোগ হবে না ?

ঝিরকা উত্তর দিল না। মদ খেতে শুরু করল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে আনাড়ি। এসব খায়নি বিশেষ। একটু পরেই ঝিমিয়ে পড়ল। তারপর ঘুম। 



ঝিরকার গলায় কিছু একটা ছিল। সম্পদ তাই গুহার মুখের ঠিক বাইরের গাছটায় চিহ্ন এঁকেছিল। দুই মাস পর গাছটাকে দেখতে এসে, একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল তার মেরুদণ্ডের মধ্যে। গাছটা গুহার মুখের ভেতরে ঢুকে গেছে। তার মানে গুহার মুখটা সত্যিই বড় হচ্ছে। ঝিরকা ঠিকই বলেছে। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে।  কিন্তু সে বুঝলে কী হবে! তার কথা শুনে তো অন্যেরা হাসে! কেউ বিরক্ত হয়। কেউ মেইনল্যাণ্ডে গিয়ে মাথার ডাক্তার দেখাতে বলে।

কথাটা অবশ্য তার নিজেরও মনে হয়েছে। ডাক্তার একবার দেখালে হয়। গুহা বড় হচ্ছে, সব গ্রাস করছে- এরকমটা আবার হয় নাকি? মনের ব্যারাম। মন? নাকি মাথার? মন আর মাথার পার্থক্যটা কী সেটা অবশ্য সম্পদ বোঝে না। কিন্তু অন্যদের ভাবভঙ্গিতে এটা বোঝে, কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে তার। কিন্তু দেখাবে কোথায়? মেইনল্যান্ডে যাওয়া কি সহজ নাকি? 

প্রথমে বোটে চেপে মেজ শহরে যাও। সেখান থেকে বাসে ধরে, রিজার্ভ ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে, বড় শহর এড়িয়ে ঝলমলে শহরে পৌঁছনো যায়। অবশ্য মেজ শহর থেকে উল্টো দিকে, আর এক জঙ্গলের ভেতর দিয়েও, পৌঁছনো যায় বড় শহরে। তারপর সেখান থেকে সারা রাত ভেসেলে চেপে ঝলমলে শহর।  কিন্তু তাতেও হুজ্জত কম নাকি! আর ঝলমলে শহরে পৌঁছোলেই  তো হল না।  মেইনল্যান্ডে যেতে ধরতে হবে জাহাজ বা প্লেন। প্লেন হলে ঠিক আছে। আড়াই-তিন ঘন্টার মামলা। কিন্তু জাহাজে চাপলে প্রায় তিন দিন। আইল্যান্ডার কার্ডে প্লেনের ভাড়া কিছুটা কম পড়ে ঠিকই, কিন্তু সেটাও  তার কাছে অনেক। ওদিকে জাহাজে চাপলে সময় তো সময়, অবিরাম দুলুনিতে তার বমি-টমি হয়ে একাকার অবস্থা! 

এমনিতে সম্পদ এখন তিরিশ বিঘে জমির মালিক। এই তিরিশ বিঘের পনের বিঘে চাষের। বাকিটা আধা জঙ্গল। ঠাকুরদা যখন উদ্বাস্তু হয়ে এই আইল্যান্ডে আসেন  তখন সেটেলার হিসেবে এটুকুই পেয়েছিলেন। কিন্তু এত দ্বীপ থাকতে কেন যে ঠাকুরদা এখানে এলেন, সেটাই মাথায় ঢোকে না সম্পদের। এখনও তাদের এখানে গুটি কয়েক বাড়ি। ফাঁকা ফাঁকা। জমির পরিমাণ সবারই ওই এক। তিরিশ বিঘে। কিন্তু তার বেশিটাই জঙ্গল। চাষের উপযুক্ত নয়। যেটুকুতে করা যায়, সেখানেও সব কিছু ফলে না সমুদ্রের নোনা জল আর হাওয়ায়। 

তার ওপর ওই গুহাটা এখন বেড়ে চলেছে দিনদিন। সম্পদ স্পষ্ট দেখছে, ওটা হাঁ করে একটু একটু করে গিলে নিচ্ছে চারপাশ। সে বারবার বলছে সবাইকে। কিন্তু তাকে কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। তাদের দোষ নেই। ওই গুহাটাই তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। ওটা দেখতে প্রতিদিন দলে দলে লোক আসে। মোটামুটি সকাল দশ-এগারো থেকে একের পর এক স্পিড বোটে রাজ্যের লোক হৈহৈ করতে করতে নামে জেটিতে। তারপর ম্যানগ্রোভের ভেতর দিয়ে কিমি তিনেক হেঁটে পৌঁছোয় এখানে। অবশ্য ম্যানগ্রোভের সেই ঘন অরণ্য এখন অনেকটা পাতলা। তবে এতটা হেঁটে সবাই নেতিয়ে পরে। শহুরে লোক। মেইনল্যান্ডের আরামে মানুষ। তারা একটু বসতে চায়।  গলা ভেজাতে চায়। 

ফলে দোকান দিয়ে বসে গেছে কম বেশি গ্রামের সবাই। বিস্কুট, চিপস, চা, লেবু জল। মোটামুটি এই আইটেম সব দোকানেই। লেবু জলের কাটতিই বেশি। এক গ্লাস জলের জন্য কুড়ি টাকাও পাওয়া যায় সিজন টাইমে। কেউ কেউ আবদার করে জংলি মুরগির মাংস খাবে বলে। গুহা দেখতে যত সময় লাগে, তার মধ্যে রান্না হয়ে যায়। এই জঙ্গলে অন্য হিংস্র প্রাণী পাওয়া না গেলেও, মুরগি আছে প্রচুর। 

নিজেদের জমিতে চাষ আর দোকান। মোটামুটি এভাবেই চলে সবার। এর মধ্যেই কেউ কেউ সাহস করে স্পিড বোট কিনেছে ব্যাংক লোন নিয়ে। ঠিকঠাক চালাতে পারলে তেলের খরচ মিটিয়ে আর ইন্টারেস্টের টাকা শোধ করে বছর দুয়েক পর লাভ শুরু হয়। সম্পদের প্রতিবেশীদের অনেকেই বোট কিনে স্বচ্ছল হয়ে গেছে। সম্পদও টাকা জমিয়েছিল। বোট কিনবে বলে। কিন্তু যেদিন থেকে বুঝেছে গুহাটা সব খেয়ে নিচ্ছে, সেদিন থেকে বোট কেনার চিন্তা ছেড়েছে। 



ঝিরকা এই দ্বীপের আদিবাসী। সত্যি বলতে এই দ্বীপ ঝিরকাদের সম্পত্তি। কিন্তু এখন ওরা কোনঠাসা। সম্পদের মতো মেইনল্যান্ড আসা মানুষেরা ঝিরকাদের প্রায় হটিয়ে দিয়েছে। তারা প্রথমটায় ঝিরকাদের হাত করেছিল এটা সেটা দিয়ে। মিশতে শুরু করেছিল খোলামেলা। তারপর যা হওয়ার হল তাই! বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে না মিশে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতাই ছিল না ঝিরকাদের। ফলে সামান্য সংক্রমণ আকার নিল মহামারির। সংখ্যা কমতে লাগল ঝিরকাদের। এখন তারা হাতে গোনা। 

মহামারির আগে নাকি গুহাটা ছোট ছিল। ঝিরকা বলে। সম্পদের হাসি পায়। যে আমলে মহামারি দেখা দিয়েছিল ঝিরকাদের মধ্যে, তখন বোধহয় ঝিরকার বাবাও জন্মায়নি। কিন্তু ও এমন করে বলে যেন নিজের চোখে গুহাটাকে দেখেছিল। সম্পদের হাসি দেখে গম্ভীর হয়েছিল ঝিরকা। বুঝিয়ে দিয়েছিল, ঠাকুরদা আর বাবার মুখে শুনে আসা কথাকে এভাবে অবজ্ঞা করাটা সে ভালভাবে নিচ্ছে না। তবে সম্পদের হাসি অবশ্য মিলিয়ে যেতে সময় লাগেনি। ঝিরকার সঙ্গে ওই সেদিনের কথার পর, মাস দুয়েক পরে সম্পদ নিজেও দেখল, গুহার মুখটা সত্যিই বড় হচ্ছে।


৪  
গুহাটা একটু অদ্ভুত। যেদিকে ওদের গ্রাম সেদিকে একটা মুখ। সেদিক দিয়েই সবাই ঢোকে আদিম গুহাটা  দেখতে। একটা নির্দিষ্ট জায়গার পর আর কেউ এগোয় না। কেননা রাস্তাটা সেখান থেকে ভাগ হয়ে গেছে। রাস্তা দুটো কোনদিকে গেছে কে জানে। তবে গুহাটা যে পাহাড়ে সেটা পেরিয়ে খুব কষ্ট করে ওপারে যাওয়া যায়।ফলে ওই পাশে লোকজন এমনিতেই যায় না। একেই পাহাড়, তার ওপর জঙ্গল। সম্পদও বিশেষ যায়নি কোনও দিন। কিন্তু সেবার টুরিস্টের ঢল নেমেছিল। চাহিদা বেড়েছিল বনমোরগের। পাহাড়ের ওপরে বা ওপাশে মুরগি মিলতে পারে ভেবে কষ্ট করছিল সম্পদ। তখনই প্রথম দেখা ঝিরকার সঙ্গে। বেশ গুছিয়ে বসেছিল সে। পাহাড়ের ঢালে খানিকটা সমতল জায়গায়। সামনে ছিল কচ্ছপের কাঁচা মাংস। আর মদের বোতল। ওর নৌকোটা দেখা যাচ্ছিল নিচে। ব্যাক ওয়াটারেঝিরকার মুখে সাদা হলুদ রং। কুচকুচে কালো সুঠাম চেহারা। সম্পদ প্রথমটায় ভয় পেয়েছিল। কিন্তু তাকে অবাক করে ভাঙা ভাঙা বাংলায় ঝিরকাই প্রথম কথা বলেছিল। ও নাকি  ভাষাটা শিখেছে কোন কোন টুরিস্টের সঙ্গে মিশে।

অথচ ওদের সঙ্গে টুরিস্টদের মেশা তো অনেক পরের ব্যাপার, দূর থেকে ছবি তোলাও বারণ। সম্পদ হিসেবে মেলাতে পারে না। 


ঝিরকা আর গুহার কথাটা সম্পদ বেমালুম ভুলে গেল নতুন দ্বীপে এসে। তার বাড়ি থেকে প্রায় তিনশো কিমি দূরের এই দ্বীপ। নতুন এক প্রকল্পের কাজ চলছে সেখানে। সারা বিশ্ব থেকে এখানে মালবাহী জাহাজ আসবে। আদান-প্রদান হবে সেগুলির। তার জন্য নানা রকম কাজ চলছে। বসছে অতিকায় পাওয়ার প্ল্যান্ট। টাউনশিপ তৈরি হচ্ছে আর একদিকে। আর এত কিছুর সঙ্গে যদি এয়ারপোর্ট না হয়, তবে কি চলে? মোট কথা, বিরাট এক কর্মযজ্ঞের ছোট্ট অংশীদার হয়ে  ডুবে রয়েছে সম্পদ। দেখছে কীভাবে সবুজ অরণ্য কাটতে হয়। পুঁততে হয় আরসিসি পিলার। পাওয়ার প্ল্যান্টের দূষিত জল কেমন করে ফেলতে হয় সমুদ্রে। দ্বীপের আদি বাসিন্দাদের ওখান থেকে উঠিয়ে কী সুন্দরভাবে বসিয়ে দিতে হয় অন্য কোথাও, সেটাও জেনে গেল সম্পদ। 

মোটামুটি বছর দেড়েক কাজ করে বাড়ি ফিরল সম্পদ। আর ফিরেই দেখতে গেল গুহাটাকে। ঠিক যা ভেবেছিল। গুহাটা আরও বড় হয়েছে। তার বিরাট মুখের মধ্যে ঢুকে গেছে আশেপাশের অনেকটা অংশ। কিন্তু গ্রামের লোকেদের কোনও হেলদোল নেই। তারা কেউ মানতেই চাইল না যে, গুহার মুখটা বড় হয়েছে। উল্টে সম্পদের দিকে এমন করে তাকালো যে বলার না! এক খুড়ো বলে বসল,
- নতুন দ্বীপে গিয়ে তোর মাথাটা ঠিক হবে ভেবেছিলাম। ওখানে কত বিরাট কাজ হচ্ছে। কত লোক। মেইনল্যান্ড থেকে এসেছে। তাদের সঙ্গে মিশে কি কিছুই শিখলি না? আবার সেই গুহার মুখটা বড় হয়েছে বলছিস! তুই তাড়াতাড়ি এখন থেকে চলে যা। না হলে সবাই তোকে পেটাবে এবার। তোর এই বলার জন্য সেবার সার্ভে হয়েছিল। টুরিস্ট আসা বন্ধ করে দিয়েছিল সরকার। আমাদের পেটে  লাথি মেরেছিলি তুই । আবার শুরু করলি?

অবাক হল সম্পদ। সত্যিই কি এরা অন্ধ? দেখতে পাচ্ছে না? গুহাটা যে তাদের গ্রামের কতটা গ্রাস করেছে, বুঝতে পারছে না সেটা? মন খারাপ করে সে এলো আবার গুহার কাছে। শেষ বিদায় নিতে। সে সত্যিই এবার চলে যাবে একবারে। নতুন দ্বীপেই থেকে যাবে। ডুবিয়ে দেবে নিজেকে আরও অনেক কাজে। 


গুহার কাছে আসতেই যেন মাটি ফুঁড়ে বেরোল ঝিরকা। সেই চকচকে কালো চেহারা আর নেই। ঋজু শরীরটাও কেমন নুইয়ে গেছে। মুখে ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ। তবু হিসহিসে গলায় ঝিরকা বলে উঠল,  
- সম্পদ। তুই চলে যা। নতুন দ্বীপে। ওখানকার গুহাটা বড় হচ্ছে। পাহারা দে গিয়ে। আর বড় হতে দিস না। 
- নতুন দ্বীপে গুহা আবার কোথায়? 
- কেন পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য মাটি খুঁড়িসনি? এয়ারপোর্টের জন্য গাছ কাটিসনি? 
- তার সঙ্গে গুহার সম্পর্ক কোথায়?
- পাশে পাহাড় আছে? ওসব জায়গার?
- আছে তো। এখানকার সব দ্বীপেই তো পাহাড়। 
- যা। ভাল করে দেখ। গুহা পাবি। ওটা বড় হতে দিস না। তাহলে সমস্যা। 
- কী সমস্যা?
- এই গুহাটা পুরো দ্বীপটাকে খেয়ে নিচ্ছে বুঝতে পারছিস তো?
- হ্যাঁ তো। কেন বুঝব না? কিন্তু কেউ তো বিশ্বাস করছে না। 
- তুই করলেই হল। এই দ্বীপের আয়ু আর মাত্র কয়েক বছর। তারপর শুধু গুহাটাই থাকবে। 
- কী বলছিস এসব?
- ঠিকই বলছি। অভিশাপ। 
- কার অভিশাপ?
- সমুদ্রের। আকাশের। জঙ্গলের। সবার.... 
- কী পাগলামো করছিস?
- তুই যা সম্পদ। নতুন দ্বীপে পাহারা দে। নইলে ওটাও যাবে। 
- ওখানে যে এত কিছু হচ্ছে সেই খবর তুই কীভাবে জানলি?
- হাওয়া বয়ে খবর আসে রে। তুইও জানবি, তুইও জানবি। যা সম্পদ...দেরি করিস না। 


...... নতুন দ্বীপের লোকজন আজকাল সম্পদকে দেখে অবাক হয়। যখন প্রথম এখানে আসে তখনই একটু ছিটেল ছিল। কিন্তু শেষবার নিজের বাড়ি থেকে ফিরে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যাবে, কেউ ভাবেনি। 

আজকাল নতুন এয়ারপোর্টের পাশের ছোট্ট পাহাড়টায় সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। ওখানে একটা গুহা দেখা গেছে কিছুদিন আগে। এতদিন ওটার অস্তিত্ব কেউ টেরই পায়নি। সেদিক থেকে বলতে গেলে সম্পদই ওটাকে আবিষ্কার করেছে। কিন্তু গুহাটা বড় হচ্ছে বলে যে কথাটা সম্পদ সারাদিন বলে বেড়ায়, সেটা পাগলামির লক্ষণ। 

মজা হল, পাগলেরও বন্ধু থাকে। তার কথাও কেউ বিশ্বাস করে। এখানকার আদি বাসিন্দারা অন্য জায়গায় সরে গেলেও,  শম্পু মাটি কামড়ে পড়েছিল। সম্পদের সঙ্গে ওর বেশ ভাব। সারাদিন সেও সম্পদের সঙ্গে ঘোরে। হাওয়ায় কান পেতে কী যেন শোনে। সমুদ্রের কাছে গিয়ে বিড়বিড় করে। গাছের গায়ে হাত বোলায়। আর যখন পাগলামি চরমে ওঠে আকাশের দিকে দুই হাত তুলে চিৎকার করে ওঠে,
- গুহাটা বড় হচ্ছে....খেয়ে নিচ্ছে সব। তোরা দেখছিস না কেন? মরবি রে সব্বাই মরবি....গুহার পেটে পচে মরবি.....

(প্রকাশিত: কোচবিহার সাহিত্যসভা পত্রিকা, ২০২৫)
              


Friday, February 27, 2026

 যুগল

শৌভিক রায় 


আমরা আছি পাশাপাশি,

হালকা হাসি ভালবাসি, 

দুঃখে সুখে, চোখ রেখেছি, 

তোমার কথায় কান পেতেছি, 

দিচ্ছি তোমায় সুখ,

নেই তো কোনও দুখ,

বুঝবে সবই কারণ তুমি

মস্ত কবি, হামি টামি ফুক!


(কবি সাহিত্যিক যশপ্রার্থী যুগলদের উদ্দেশ্যে....)

Wednesday, February 25, 2026

 



বছর শেষে কাছেই কোথাও (পর্ব- ৬)

শৌভিক রায়

বছর শেষের বোলপুর এখন অনেকটা ফাঁকা। পৌষমেলা শেষ হয়েছে। মাঠে আর দোকানপাট নেই। ভাঙামেলাও সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। দু`দিন আগের সেই `নো এন্ট্রি`র চক্করও আর নেই। তবু সকালেই বেরিয়ে গেলাম। পরিচিত রাস্তা ধরে শ্রীনিকেতন হয়ে পৌঁছোলাম সুরুলে। এখানে একটা কথা বলা দরকার। অতীতে বোলপুর স্টেশন এলাকা, শান্তিনিকেতন, প্রান্তিক, শ্রীনিকেতন, সুরুল ইত্যাদি জনপদগুলির মধ্যে খানিকটা স্থানিক ব্যবধান ছিল। আজকাল সেই অর্থে সেটা কিন্তু আর নেই। সবই গায়ে গায়ে লেগে আছে। ফলে সুরুল পৌঁছতে আলাদা কিছু মনে হল না। 

আদিবাসী অধ্যুষিত এই গ্রামটি এখন আর গ্রাম নেই। সেভাবে বাগদি, বাউরি, ডোম ইত্যাদি শ্রেণির মানুষদের আলাদা করাও যায় না। তবে এখনও বুননের কাজ চলে পুরো এলাকা জুড়ে। আর এখানেই অবস্থিত বিখ্যাত সুরুল রাজবাড়ি। সরকার পরিবারের এই বাড়িটির বয়স আনুমানিক ২৫০-৩০০ বছর। এখনও এখানে মানুষজন রয়েছেন। প্রথাগত বাঙালি স্থাপত্যের সঙ্গে ইউরোপিয়ান স্থাপত্যের মেলবন্ধনে গড়ে তোলা সুরম্য এই বাড়ির দুর্গাপুজো অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। প্রাসাদের একটি অংশ সাধারণের জন্য উন্মুক্ত। পাশেই রয়েছে টেরাকোটা মন্দির। ঘুরে দেখতে দেখতে আমার বারবার জনাই-এর কথা মনে হচ্ছিল। হুগলি জেলার জনাই অসংখ্য জমিদারবাড়ির জন্য বিখ্যাত। সেখানকার বাড়িগুলির সঙ্গে বেশ মিল পাচ্ছিলাম সুরুল রাজবাড়ির। 









বোলপুরের খানিকটা দূরে রায়পুরের সিনহা বা সিংহ পরিবারের ভগ্নপ্রায় প্রাসাদ কিন্তু অবশ্যই দেখা উচিত। এই পরিবারের ভুবন মোহন সিংহের থেকেই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনের জমি কিনেছিলেন। আদতে সিনহা পরিবার এসেছিল অযোধ্যা থেকে। কুড়ি একর জমির ওপর তাঁদের নির্মিত এই প্রাসাদে ঘরের সংখ্যা ছিল ১২০টি। এই পরিবারের সত্যেন্দ্র প্রসন্ন সিনহা সেই আমলে `নাইট` উপাধি পেয়েছিলেন ইংরেজ সরকারের কাছে। অতীতের বিরাট সেই প্রাসাদটি আজ পরিত্যক্ত, ভাঙাচোরা। যদিও এখানকার প্রতিটি ইট যেন বর্ণময় এক সময়কে ধরে রেখেছে। বোলপুর ভ্রমণার্থীদের অবশ্যই উচিত অন্তত একবার রায়পুর দেখে আসা। অজয় নদীর তীরের গ্রামটিও খুব সুন্দর।







বোলপুর-ইলামবাজার পথে, বোলপুর থেকে কুড়ি কিমি দূরে, ইলামবাজারে কাছে, আমখই ফসিল পার্কটি ক্রমে জনপ্রিয়তা লাভ করছে। শাল গাছের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে লাল মাটির পথে সেখানে পৌঁছে দেখা গেল `উড ফসিল`। ২০১৬ সালে আমখইয়ের গ্রামবাসীরা পুকুর খুঁড়তে গিয়ে হাড়ের মতো কিছু পাথর আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে দেখা যায় সেগুলি আসলে প্রস্তুরীভূত কাঠ। গড়ে তোলা হয় পশ্চিমবঙ্গের সম্ভবত একমাত্র ফসিল পার্ক। স্থানীয় মানুষরা এই ফসিল পার্ক দেখাশোনা করছেন। অন্যরকম অভিজ্ঞতা হল ফসিল পার্কটি দেখে। আর এই আমখই গ্রামেই দেখলাম আদিবাসীদের সুন্দর সাজানো বাড়ি। এই বাড়িগুলি দেখলেই লোভ হয় বড্ড। 





তবে এই গ্রামটিই কিন্তু প্রথম নয়। এর আগে বনের পুকুর ডাঙ্গা নামে আদিবাসীদের গ্রামটি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। প্রতিটি বাড়ি অত্যন্ত সুন্দর। বাড়ির দেওয়ালে নানা ছবি আঁকা। খুব ছোট ও সামান্য জিনিস দিয়ে সাজানো হয়েছে বেশ কিছু বাড়ি। রয়েছে মারাং বুরুর মন্দিরও। এই গ্রামেই কয়েকজন শিশুর সঙ্গে সখ্য হয়ে গেল আমার। সাদরে তারা অভ্যর্থনা করল বুড়ো বন্ধুকে। চকলেট খেল। ছবি তুলল। নিজেদের বাড়িতেও নিয়ে গেল। অনেকটা একই অভিজ্ঞতা হল সোনাঝুরি হাটের কাছের আদিবাসী গ্রামে। সেখানে আবার উপরি পাওনা বুদ্ধ মন্দির। আমাদের রসিক টোটোচালক মান্নান ভাই প্রান্তিক অঞ্চলে একটি বাড়ির সামনে হঠাৎ গাড়ি থামিয়েছিলেন। দেখি সেই বাড়ির গেটের সামনে লেখা `অপা`।  












সোনাঝুরি হাটের কথা সবাই বলেন। আমরাও গেছি। কিন্তু সত্যি বলতে বড্ড বেশি `কমার্শিয়াল` মনে হয়েছে আমার। আদিবাসী প্রান্তিক মানুষদের চাইতে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের ভিড়ে বোধহয় সোনাঝুরি হাট তার কৌলিন্য হারিয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় আদিবাসী মহিলাদের ধামসা মাদলের সঙ্গে দলগত নৃত্যেও মনের তাগিদ নেই। আমাদের মতো শহুরে তথাকথিত আধুনিক মানুষেরা তাঁদের সঙ্গে পা মেলাচ্ছে আর তার পরিবর্তে তাঁরা কিছু উপার্জন করছেন। এটাই বোধহয় উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রান্তিক এই মানুষগুলি ক্রমশ পিছু হটতে হটতে নিজেদের হাটেই যেন বহিরাগত হয়ে গেছেন। এরকমই দুটি ছোট্ট মেয়ের কাছে আমড়ার আঁটি দিয়ে বানানো ঘর সাজানোর জিনিস কিনলাম। কিন্তু মন ভরল না অতি বিখ্যাত সোনাঝুরি ও খোয়াই দেখে। 






বোলপুরে আমাদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেল। যদিও পরদিন রাত কাটাবো এখানেই, কিন্তু সারাদিন ঘুরে বেড়াব অন্য কয়েকটি জায়গায়। সেই গল্প অবশ্য বলা যাবে অন্য কখনও।

বোলপুর পৌঁছে ছিলাম সন্ধে বেলায়। সূর্য তখন অস্ত গেছে। বোলপুর ছাড়লাম ভোরবেলায়। সূর্য তখনও ওঠেনি। কুয়াশার ভেতর দিয়ে বীরভূমের রাস্তায় তখন শিরশিরানি ঠাণ্ডা। সেদিনের রাত্রিবাস শিলিগুড়িতে। অর্থাৎ রাস্তা অনেকটা। ছেড়ে যাচ্ছি বীরভূম। মায়ের জেলা। মন খারাপ হচ্ছে বৈকি! তবে ইটাহারে দেখা হবে বন্ধু আমিনুরের সঙ্গে। দীর্ঘ বত্রিশ বছর পর। সে ভাবনাও আনন্দ দিচ্ছে। 

আসলে এই আনন্দ আর বিষাদ নিয়েই চলা সারা জীবন। তা না হলে মেঘ দেখে ভয় করতে হয় আড়ালে তার সূর্য যদি না হাসে ভেবে, শীতকাল এলে কুঁকড়ে থাকতে হয় বসন্ত আর আসবে না বলে! বলতে হয় দুঃখের পরেও সুখ আসে না, জীবন চক্রের মতো ঘোরে না। 

না। জীবন মানেই বৃত্তপথ। এক বিন্দু থেকে শুরু হয়ে সেই বিন্দুতে শেষ হলেও, বৃত্ত পূর্ণ করতে চলতে হয় অনেকটা পথ......     

(শেষ)

               


Sunday, February 22, 2026



বছর শেষে কাছেই কোথাও (পর্ব- ৫)

শৌভিক রায়

কঙ্কালীতলা যাওয়ার পথেই রাস্তার দু`ধারে সিউলিদের দেখেছিলাম। খেজুর গাছে হাঁড়ি ঝুলছে, সেটাও দেখা যাচ্ছিল। আমাদের উত্তরে একসময় এই দৃশ্য খুব না হলেও, দেখা যেত। আজকাল কমে এসেছে। আসলে উত্তরে নগরায়ণের গতি বোধহয় তুলনায় বেশি। বোলপুরেও অবশ্য কম নয়। `প্রান্তিক` অঞ্চল দিয়ে কঙ্কালীতলা আসবার সময় সেটি বেশ বুঝতে পারছিলাম। এখনও যে উন্মুক্ত প্রান্তর আছে, সেটি কতদিন আর এরকম ফাঁকা থাকবে বলা মুশকিল। 

যাহোক, এক তরুণ সিউলির কাছে দাঁড়ানো গেল। সদ্য গাছ থেকে নিয়ে আসা ঠাণ্ডা খেজুরের রস খাওয়া গেল অনেকদিন পর। দেখলাম আগুনে জ্বাল দিয়ে কীভাবে সে গুড় তৈরি করছে। কথায় কথায় জানা গেল, তার বাড়ি বাঁকুড়াতে। অন্য সময় বেকারিতে কাজ করে। রুটি, বিস্কুট বানায়। শীতকাল চলে এলে এইসব অঞ্চলে চলে আসে। ইজারা নেয় গাছের। রস আর গুড় বিক্রি করে মোটামুটি লাভ থাকে। 

এখানেই দেখা লাল কৌপিন করা এক সাধু ও তার চ্যালার সঙ্গে। দুই গ্লাস খেজুর রসের বিনিময়ে তাঁরা মোটামুটি এই জন্মের সব পাপ মুক্ত করে দিলেন আমাদের। মজা লাগল বেশ।
 





এবার কোপাই দর্শন। `আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে...`কবিতার লাইন আওড়াতে আওড়াতে পৌঁছে গেলাম সেখানে। নদীর ওপর পুরোনো ব্রিজ ওপারে চলে গেছে। দুই পাশে ছোটখাটো মেলা। বাউল সঙ্গীতের আসর থেকে হস্তশিল্পের দোকান। আর মানুষজন। প্রকৃতি এখানে এখনও যথেষ্ট আরণ্যক। বোঝাই যাচ্ছে অতীতে কতটা সুন্দর ছিল কোপাইয়ের দুই ধার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চাইতেও কেন যেন বারবার মনে পড়ছিল নন্দলাল বসুর কথা। এক প্রবন্ধে শিল্প সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞানতার কথা উল্লেখ করেছিলেন তিনি। অথচ আমাদের চারদিকে কত শিল্প সামগ্রী! শুধু দেখবার চোখের অভাবে তার কিছুই আমাদের নজরে পড়ে না। নান্দনিক ব্যাপারগুলি এভাবেই বোধহয় হারিয়ে যায়। এই যে ছোট্ট কোপাই যে আসলে বক্রেশ্বরের উপনদী তার চলার পথ মাত্র ১৭৫ কিমি। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে তার পথ কি কখনও কিলোমিটার দিয়ে বেঁধে রাখা যায়? ভাবছিলাম সেটাই। শান্তিনিকেতন, বোলপুর, কঙ্কালীতলা, কীর্ণাহার, লাভপুরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত এই ছোট্ট নদী তিতাস, গঙ্গা, পদ্মা, তিস্তা, আংরাভাসা ইত্যাদি বিখ্যাত নদীগুলির অনেক আগে আমাদের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। 






কোপাইয়ের কাছেই এক শাড়ি কারখানায় ঢুকে পড়লাম কীভাবে শাড়িতে রং করা হচ্ছে দেখার জন্য। এমনিতে এখানে কেউ ঢোকে না। কিন্তু ওই যে, আমাদের কৌতূহল। মনে পড়ল, বাবা মাঝেমাঝে বিরক্ত হতেন আমার `কেন` শুনে শুনে। সেই বদভ্যাস আজও ছাড়েনি। সুতরাং ঢুকে পড়লাম শাড়ি রং করার কারখানায়। জানা গেল, আশেপাশের গ্রামগুলি থেকে শাড়িগুলি তৈরি হয়ে আসে। তারপর এখানে বেশ কয়েকটি পদ্ধতিতে রং করা হয়। রং পাকা করবার জন্য গরম জলে চুবিয়ে রাখা থেকে শুরু করে পদ্ধতিগুলি জেনে ভাল লাগল বেশ। তবে এটি বিশুদ্ধ কারখানা। এখানে কোনও কেনাবেচার ব্যাপার নেই। এদের নিজস্ব দোকান আছে শহরের দু`একটি জায়গায়। আমরা পরে গিয়েছিলাম এদের হোলসেলের দোকানে। বিভিন্ন ধরণের কাপড়ের কালেকশন দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। তবে অধিকাংশই মহিলাদের জন্য। পুরুষরা এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে অনেকটাই। পুরুষদের ভাগ্যই আসলে খারাপ। 




পূর্বাঞ্চলীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাংস্কৃতিক গ্রাম সৃজনী শিল্পগ্রাম বোলপুরের অন্যতম আকর্ষণ। ছাব্বিশ বিঘা জুড়ে এর বিস্তৃতি। রয়েছে বিহার, ঝাড়খণ্ড, মণিপুর, ওড়িশা, সিকিম, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ অঞ্চলের নয়টি ঐতিহ্যবাহী কুঁড়েঘরের আকারে নয়টি জাদুঘর। কুঁড়েঘরগুলিতে ঐতিহ্যবাহী, স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য এবং নকশা রয়েছে। এখানকার শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ অবশ্য দর্শনার্থীদের ভিড় আর ছবি তোলার হিড়িকে নষ্ট হতে বসেছে। অধিকাংশই দেখলাম 'আদি বিম্ব' নামে লোকচিত্রকলার আর্ট গ্যালারি সম্পর্কে উদাসীন। এবাদেও রয়েছে 'আদি ক্রান্তি`। আদতে এটি একটি মণ্ডপ যেটি উৎসর্গ করা হয়েছে  বিরসা মুন্ডা, লক্ষ্মণ নায়ক, রানী গাইদিনলু, সিধু কানু, তিলকা মাঝি এবং তিরট সিং-এর উদ্দেশ্যে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব কাছে হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই লোকসমাগম বেশি সৃজনী শিল্পগ্রামে। এটি ঘুরে দেখতে দেখতে আমার মনে পড়ছিল হায়দ্রাবাদের শিল্পরমমের কথা। শিল্পগ্রাম হিসেবে সেটি ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন।


 




বোলপুর শহরের খানিকটা দূরে `আমার কুটির` হস্তশিল্পের আর একটি প্রখ্যাত কেন্দ্র। পরাধীন ভারতে জায়গাটি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র ছিল।বর্তমানে  এখানে সমবায়ের ভিত্তিতে হস্তশিল্প প্রসারণ ও বিপণন চলছে। শ্রদ্ধেয় সুষেন মুখার্জি ও তাঁর অনুগামীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা `আমার কুটির`-এর অবদান বীরভূম জেলায় আলাদা মর্যাদা পেয়েছে। বিশেষ করে বীরভূমের গ্রামীণ শিল্প বিকাশে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠিত `আমার কুটির`-এর ইতিহাস চমকপ্রদ। শুরুর দিকে স্বাধীনতা সংগ্রামী সুষেন মুখার্জি বাড়ি বাড়ি গিয়েও এখানকার হস্তশিল্প বিপণন করেছেন। মুম্বাই, চেন্নাই গিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে বাটিক প্রিন্টে এক্সপার্ট হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রদর্শিত পথেই আজও চলছে এখানকার নানা কাজ। এমনিতে প্রায় সারা বোলপুর শহরেই বিভিন্ন জায়গায় এই জাতীয় জিনিস কিনতে পাওয়া যায়। তবে `আমার কুটির` থেকে সংগ্রহের বিষয়টি একটু আলাদা। কেননা এখানে সমবায়ের ভিত্তিতে লভ্যাংশ ভাগ হচ্ছে মূল কারিগরদের মধ্যে। তাই ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, এখান থেকে হস্তশিল্প সামগ্রী কেনা ভাল। তবে শুধু কেনা নয়, দেখে নেওয়া উচিত ছোট্ট মিউজিয়ামটিও। তাহলে `আমার কুটির`-এর ঐতিহ্য বোঝা যায়। এখানেও পাশেই রয়েছে কোপাই। 





বিকেলের অস্তমিত সূর্যের আলোয় মনে হচ্ছিল মুজনাই কোপাই সব যেন কোনও জায়গায় এক। কেননা সব নদীই বলে মানুষের কথা। নদী ছাড়া আমরা? ভাবতেই পারি না।    

(ক্রমশ) 

  



Saturday, February 21, 2026

 ।। নিজের ভাবনায়।।

    শৌভিক রায় 


১/ এরপর কি 'হ্যাপি হোলি'? 

২/ মহারাজ (মহারাজা নয়) তোমাকে সেলাম...

৩/ সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা নিপাত যাও ( প্রতীকী)।  সুযোগ পেলে সবার আগে নিজে সেখানে দৌড়ব।

৪/ বাংলা ভাষার কবি বললেন, নিজের সন্তানকে ভর্তি করে বুঝেছেন ইংলিশ মিডিয়ামে বড্ড চাপ

৫/ সারাদিনে মাত্র তিনটে পোস্ট ভাষা দিবস নিয়ে!! ইসস আরও করতে হত তো...অবশ্য রাতটা এখনও আছে  হাতে...

Thursday, February 19, 2026



বছর শেষে কাছেই কোথাও (পর্ব- ৪)

শৌভিক রায়     

বোলপুরে পৌষমেলা চলছে। চারদিকে হইচই। বিভিন্ন রাস্তায় `নো এন্ট্রি`। আমাদের হোটেল ভুবনডাঙায়। মেলার কাছেই। 

হোটেলে পৌঁছে ব্যাগ রেখেই ছুটলাম মেলা দেখতে। হিসেবে মতো সেদিনই মেলার শেষদিন। দলে দলে লোক চলেছে তাই। ভিড়ে ভিড়াক্কার। যাহোক ঠেলে-গুঁতিয়ে মেলায় পৌঁছে বুঝলাম, দোকানপাটের ক্ষেত্রে আমাদের রাসমেলার সঙ্গে পৌষমেলার বিশেষ পার্থক্য নেই। সেই একই ধরণের জিনিসপত্র বিক্রি হচ্ছে। তবে রাসমেলার `পাট`-এর ব্যাগ, ঘরসজ্জা ইত্যাদির মতোই এখানেও স্থানীয় কিছু `প্রোডাক্ট` অবশ্যই আলাদা। এক স্থূলকায় নাগা সাধু বসে আছেন। তাঁর সামনে বেশ ভিড়। কোচবিহারের তুলনায় ঠাণ্ডা অনেকই কম। তবে একটা শিরশিরানি হাওয়া বইছে। 

ভিড়ের মধ্যেই লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পৌঁছোলাম পৌষমেলার সাংস্কৃতিক মঞ্চের সামনে। আমার মতে, পৌষমেলার এই মঞ্চের বিভিন্ন অনুষ্ঠান তাকে অন্য যে কোনও মেলার চাইতে আলাদা করে। শুধু বাউল সংগীতের জন্য নয়, অন্য যে সমস্ত অনুষ্ঠান হয়, সেগুলিও যথেষ্ট উঁচুদরের। ওখানেই জানলাম, সেদিনের অনুষ্ঠানের পরেই সাংস্কৃতিক মঞ্চ বন্ধ হয়ে হবে। মেলার দোকানপাট আর হয়ত দিন দুয়েক থাকবে। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান দেখা গেল। যাত্রাপালা চলছে। সত্যি বলতে, আজকাল কোনও অনুষ্ঠানেই যাই না। আর শেষ কবে যাত্রা দেখেছি, সে কথা মনে করতে পারলাম না। অথচ আমাদের ছোটবেলায় যাত্রা ছিল বিনোদনের বড় অঙ্গ। মনে পড়ছিল নট্ট কোম্পানির `অচল পয়সা` যাত্রাপালার সেই অ্যানাউন্সমেন্ট, শান্তিগোপালের চরিত্রাভিনয়, ফালাকাটার খাসমহল ময়দানের যাত্রাপালা `মহুয়া`, দিনহাটার গোধূলী বাজারে অজিতেশ বন্দোপাধ্যায়ের যাত্রা ইত্যাদির কথা। কোচবিহারের রাসমেলায় মদনমোহন মন্দিরের মঞ্চে এখনও যাত্রা হয়। মন্দিরের পেছনে বাড়ি হওয়ার সুবাদে যাত্রার `ডায়ালগ` কানে আসে। কিন্তু ওই অবধিই। কতজন যাত্রা শোনে কে জানে। আসলে, শীতের রাতে খড় বিছানো মাটিতে বসে যাত্রা দেখার মজা ছিল আলাদা। চারদিক খোলা মঞ্চে যখন যাত্রার `কনসার্ট` বেজে উঠত, তখন আমাদের দর্শকদের মনে যে কী উথালপাথাল শুরু হত, সেটাও বলে বোঝানো যাবে না। যদিও বলা হত `যাত্রা দেখে ফাত্রা লোকে` কিন্তু সেটা যে কথার কথা তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কেননা বহু তথাকথিত `ভদ্র` ও `সংস্কৃতিমনস্ক` মানুষকেও যাত্রা শুনতে দেখেছি। যাহোক, আরও কিছুক্ষণ মেলায় থেকে রাতের বিশ্বভারতী ক্যাম্পাস দেখে ফেরা গেল। সকালে মালদা থেকে বেরিয়েছি। সারাদিনের ক্লান্তি। বিশ্রাম অবশ্যই প্রয়োজন।    

পরদিন সকাল আটটা নাগাদ মান্নান ভাই টোটোরিক্সা নিয়ে হাজির। দেরি না করে বেরিয়ে পড়া গেল। হাতে আজ আর আগামীকাল রয়েছে। তার পরদিন অন্য একটা প্রোগ্রাম রয়েছে। ফিরতে হবে তার পরে। যদিও বোলপুর শান্তিনিকেতন দেখার জন্য এক বা দেড়দিন যথেষ্ট, তবু হাতে সময় থাকলে রয়েসয়ে দেখা যায় সব। 

বোলপুর দর্শনকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমভাগে অবশ্যই রবীন্দ্র স্মৃতিধন্য শান্তিনিকেতন। সঙ্গে সুরুল ও রায়পুর রাজবাড়ি, বুদ্ধস্তুপ, সৃজনী শিল্পগ্রাম এবং আমার কুটির। অন্যভাগে আদিবাসীদের গ্রাম, সোনাঝুরি হাট, ফসিল পার্ক, কঙ্কালীতলা, কোপাই ইত্যাদি। এগুলি বাদেও অবশ্যই আরও কিছু রয়েছে। সেগুলি দেখা নির্ভর করে সময় ও মর্জির ওপর। 

কমবেশি সবাই জানেন যে, ১৮৬ সালে রায়পুরের জমিদার এস পি সিনহার থেকে নিকডাঙায় ২০ বিঘা জমি কিনে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত সেটি ছিল একটি বাড়ি। সেই বাড়ি থেকেই জায়গাটির নাম হয় শান্তিনিকেতন। আর সেই শান্তিনিকেতন নামের আশ্রমেই ১৯০১ সালের ২২ ডিসেম্বর পাঁচজন ছাত্র নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুরু করেন তাঁর ব্রহ্মচর্যাশ্রম। ১৯২২ সালের  ১৬ মে সেখানে গড়ে ওঠে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। এর বেশি কিছু বলতে যাওয়া বাতুলতা মাত্র। 

















শান্তিনিকেতনের মূল আকর্ষণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ জীবনের আবাস উত্তরায়ণ। এখানেই বিচিত্রা ভবনে রয়েছে রবীন্দ্র মিউজিয়াম। রবীন্দ্র স্মৃতি বিজড়িত উদয়ন, কোনার্ক, শ্যামলী, পুনচ, উদীচী ইত্যাদিও অন্যতম আকর্ষণ। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাধনবেদি ছাতিমতলার অমোঘ আকর্ষণ আজও অস্বীকার করা যায় না। রয়েছে রঙিন কাঁচের উপাসনা মন্দির ব্রহ্মচর্যাশ্রম। কলাভবনে দেখা মেলে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, রামকিঙ্কর বেইজ প্রমুখ বিখ্যাত শিল্পীর আঁকা ছবি ও ভাস্কর্য। আলাদা করে উল্লেখ করতেই হয় তালধ্বজের। 

সমস্যা হল, অতীতের সেই উন্মুক্ত শান্তিনিকেতন আর নেই। কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার জন্য আজকাল নানা নিয়মকানুন হয়েছে। এমনিতেই অবশ্য পৌষমেলার জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ।তবে আজকাল নাকি রবিবার নির্দিষ্ট ফি দিয়ে গাইড নিয়ে প্রবেশ করতে হয়। অন্যদিনগুলিতে ঢুকবার অনুমতি মেলে না। যাহোক আমরা নিজেদের মতো দেখলাম সব। কখনও মান্নান ভাইয়ের টোটোরিক্সায় চেপে, আবার কখনও পায়ে হেঁটে। খুব ভাল লাগল নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রোফেসর অমর্ত্য সেনের বাড়ি দেখে। এমনিতেই ওঁর প্রতি আমার আলাদা শ্রদ্ধা রয়েছে। কেননা উনি আমার বাবার শিক্ষক। 

বিশ্বভারতী ও সংলগ্ন বিভিন্ন পল্লী ঘুরে বল্লভপুর ডিয়ার পার্কের পাশ দিয়ে প্রান্তিক স্টেশন পৌঁছে চললাম কঙ্কালীতলায়। বেঙ্গুটিয়া গ্রামে কুণ্ডের পাড়ে ৫১ পীঠের অন্যতম এই পীঠে দেবীর কাঁকাল বা কোমর পড়েছে। দেবী মন্দিরের পাশাপাশি রয়েছে কাঞ্চিশ্বর শিব মন্দির।  কঙ্কালীতলা মন্দিরে দেবীর প্রতীক হিসেবে ত্রিশূল আর পটে কালীরূপী কঙ্কালী মায়ের পুজো হয়। জনশ্রুতি, দেবীর কাঁকাল শিলাখন্ডরূপে মন্দির লাগোয়া কুণ্ডে রয়েছে। 

কঙ্কালীতলায় সেদিন বেশ ভিড়। আমাদের অবশ্য পুজো দেওয়ার ব্যাপার ছিল না। তাই মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করিনি। বাইরের মিষ্টি রোদে বসে বসে দেখছিলাম সব। একবার উঠে বাইরে থেকেই দেবীর ছবি ও ত্রিশূলটি দেখে নিলাম। এখানেই প্রথম পেলাম আদিবাসী মহিলাদের। তাঁরা দল বেঁধে তাঁদের চিরায়ত নৃত্য করে চলেছেন গোল করে ঘুরে ঘুরে। অনেকেই তাঁদের সঙ্গে পা মেলাচ্ছেন। আমরা অবশ্য ভিডিও করা আর ছবি তোলার মধ্যেই রইলাম। এখানেই দেখা হল বিখ্যাত কোপাই নদীর সঙ্গে। যদিও কোপাই বলতে সবাই যেখানে যায়, এটি সেই জায়গা নয়। তবু প্রথম কোপাই দেখা। ভাল তো লাগবেই। কত শুনেছি এই নদীর কথা। আজ সে চোখের সামনে। 

(ক্রমশ)