বছর শেষে কাছেই কোথাও (পর্ব- ৬)
শৌভিক রায়
বছর শেষের বোলপুর এখন অনেকটা ফাঁকা। পৌষমেলা শেষ হয়েছে। মাঠে আর দোকানপাট নেই। ভাঙামেলাও সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। দু`দিন আগের সেই `নো এন্ট্রি`র চক্করও আর নেই। তবু সকালেই বেরিয়ে গেলাম। পরিচিত রাস্তা ধরে শ্রীনিকেতন হয়ে পৌঁছোলাম সুরুলে। এখানে একটা কথা বলা দরকার। অতীতে বোলপুর স্টেশন এলাকা, শান্তিনিকেতন, প্রান্তিক, শ্রীনিকেতন, সুরুল ইত্যাদি জনপদগুলির মধ্যে খানিকটা স্থানিক ব্যবধান ছিল। আজকাল সেই অর্থে সেটা কিন্তু আর নেই। সবই গায়ে গায়ে লেগে আছে। ফলে সুরুল পৌঁছতে আলাদা কিছু মনে হল না।
আদিবাসী অধ্যুষিত এই গ্রামটি এখন আর গ্রাম নেই। সেভাবে বাগদি, বাউরি, ডোম ইত্যাদি শ্রেণির মানুষদের আলাদা করাও যায় না। তবে এখনও বুননের কাজ চলে পুরো এলাকা জুড়ে। আর এখানেই অবস্থিত বিখ্যাত সুরুল রাজবাড়ি। সরকার পরিবারের এই বাড়িটির বয়স আনুমানিক ২৫০-৩০০ বছর। এখনও এখানে মানুষজন রয়েছেন। প্রথাগত বাঙালি স্থাপত্যের সঙ্গে ইউরোপিয়ান স্থাপত্যের মেলবন্ধনে গড়ে তোলা সুরম্য এই বাড়ির দুর্গাপুজো অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। প্রাসাদের একটি অংশ সাধারণের জন্য উন্মুক্ত। পাশেই রয়েছে টেরাকোটা মন্দির। ঘুরে দেখতে দেখতে আমার বারবার জনাই-এর কথা মনে হচ্ছিল। হুগলি জেলার জনাই অসংখ্য জমিদারবাড়ির জন্য বিখ্যাত। সেখানকার বাড়িগুলির সঙ্গে বেশ মিল পাচ্ছিলাম সুরুল রাজবাড়ির।
বোলপুরের খানিকটা দূরে রায়পুরের সিনহা বা সিংহ পরিবারের ভগ্নপ্রায় প্রাসাদ কিন্তু অবশ্যই দেখা উচিত। এই পরিবারের ভুবন মোহন সিংহের থেকেই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনের জমি কিনেছিলেন। আদতে সিনহা পরিবার এসেছিল অযোধ্যা থেকে। কুড়ি একর জমির ওপর তাঁদের নির্মিত এই প্রাসাদে ঘরের সংখ্যা ছিল ১২০টি। এই পরিবারের সত্যেন্দ্র প্রসন্ন সিনহা সেই আমলে `নাইট` উপাধি পেয়েছিলেন ইংরেজ সরকারের কাছে। অতীতের বিরাট সেই প্রাসাদটি আজ পরিত্যক্ত, ভাঙাচোরা। যদিও এখানকার প্রতিটি ইট যেন বর্ণময় এক সময়কে ধরে রেখেছে। বোলপুর ভ্রমণার্থীদের অবশ্যই উচিত অন্তত একবার রায়পুর দেখে আসা। অজয় নদীর তীরের গ্রামটিও খুব সুন্দর।
বোলপুর-ইলামবাজার পথে, বোলপুর থেকে কুড়ি কিমি দূরে, ইলামবাজারে কাছে, আমখই ফসিল পার্কটি ক্রমে জনপ্রিয়তা লাভ করছে। শাল গাছের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে লাল মাটির পথে সেখানে পৌঁছে দেখা গেল `উড ফসিল`। ২০১৬ সালে আমখইয়ের গ্রামবাসীরা পুকুর খুঁড়তে গিয়ে হাড়ের মতো কিছু পাথর আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে দেখা যায় সেগুলি আসলে প্রস্তুরীভূত কাঠ। গড়ে তোলা হয় পশ্চিমবঙ্গের সম্ভবত একমাত্র ফসিল পার্ক। স্থানীয় মানুষরা এই ফসিল পার্ক দেখাশোনা করছেন। অন্যরকম অভিজ্ঞতা হল ফসিল পার্কটি দেখে। আর এই আমখই গ্রামেই দেখলাম আদিবাসীদের সুন্দর সাজানো বাড়ি। এই বাড়িগুলি দেখলেই লোভ হয় বড্ড।
তবে এই গ্রামটিই কিন্তু প্রথম নয়। এর আগে বনের পুকুর ডাঙ্গা নামে আদিবাসীদের গ্রামটি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। প্রতিটি বাড়ি অত্যন্ত সুন্দর। বাড়ির দেওয়ালে নানা ছবি আঁকা। খুব ছোট ও সামান্য জিনিস দিয়ে সাজানো হয়েছে বেশ কিছু বাড়ি। রয়েছে মারাং বুরুর মন্দিরও। এই গ্রামেই কয়েকজন শিশুর সঙ্গে সখ্য হয়ে গেল আমার। সাদরে তারা অভ্যর্থনা করল বুড়ো বন্ধুকে। চকলেট খেল। ছবি তুলল। নিজেদের বাড়িতেও নিয়ে গেল। অনেকটা একই অভিজ্ঞতা হল সোনাঝুরি হাটের কাছের আদিবাসী গ্রামে। সেখানে আবার উপরি পাওনা বুদ্ধ মন্দির। আমাদের রসিক টোটোচালক মান্নান ভাই প্রান্তিক অঞ্চলে একটি বাড়ির সামনে হঠাৎ গাড়ি থামিয়েছিলেন। দেখি সেই বাড়ির গেটের সামনে লেখা `অপা`।
সোনাঝুরি হাটের কথা সবাই বলেন। আমরাও গেছি। কিন্তু সত্যি বলতে বড্ড বেশি `কমার্শিয়াল` মনে হয়েছে আমার। আদিবাসী প্রান্তিক মানুষদের চাইতে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের ভিড়ে বোধহয় সোনাঝুরি হাট তার কৌলিন্য হারিয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় আদিবাসী মহিলাদের ধামসা মাদলের সঙ্গে দলগত নৃত্যেও মনের তাগিদ নেই। আমাদের মতো শহুরে তথাকথিত আধুনিক মানুষেরা তাঁদের সঙ্গে পা মেলাচ্ছে আর তার পরিবর্তে তাঁরা কিছু উপার্জন করছেন। এটাই বোধহয় উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রান্তিক এই মানুষগুলি ক্রমশ পিছু হটতে হটতে নিজেদের হাটেই যেন বহিরাগত হয়ে গেছেন। এরকমই দুটি ছোট্ট মেয়ের কাছে আমড়ার আঁটি দিয়ে বানানো ঘর সাজানোর জিনিস কিনলাম। কিন্তু মন ভরল না অতি বিখ্যাত সোনাঝুরি ও খোয়াই দেখে।
বোলপুরে আমাদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেল। যদিও পরদিন রাত কাটাবো এখানেই, কিন্তু সারাদিন ঘুরে বেড়াব অন্য কয়েকটি জায়গায়। সেই গল্প অবশ্য বলা যাবে অন্য কখনও।
বোলপুর পৌঁছে ছিলাম সন্ধে বেলায়। সূর্য তখন অস্ত গেছে। বোলপুর ছাড়লাম ভোরবেলায়। সূর্য তখনও ওঠেনি। কুয়াশার ভেতর দিয়ে বীরভূমের রাস্তায় তখন শিরশিরানি ঠাণ্ডা। সেদিনের রাত্রিবাস শিলিগুড়িতে। অর্থাৎ রাস্তা অনেকটা। ছেড়ে যাচ্ছি বীরভূম। মায়ের জেলা। মন খারাপ হচ্ছে বৈকি! তবে ইটাহারে দেখা হবে বন্ধু আমিনুরের সঙ্গে। দীর্ঘ বত্রিশ বছর পর। সে ভাবনাও আনন্দ দিচ্ছে।
আসলে এই আনন্দ আর বিষাদ নিয়েই চলা সারা জীবন। তা না হলে মেঘ দেখে ভয় করতে হয় আড়ালে তার সূর্য যদি না হাসে ভেবে, শীতকাল এলে কুঁকড়ে থাকতে হয় বসন্ত আর আসবে না বলে! বলতে হয় দুঃখের পরেও সুখ আসে না, জীবন চক্রের মতো ঘোরে না।
না। জীবন মানেই বৃত্তপথ। এক বিন্দু থেকে শুরু হয়ে সেই বিন্দুতে শেষ হলেও, বৃত্ত পূর্ণ করতে চলতে হয় অনেকটা পথ......
(শেষ)


















No comments:
Post a Comment