বছর শেষে কাছেই কোথাও (পর্ব- ৫)
শৌভিক রায়
কঙ্কালীতলা যাওয়ার পথেই রাস্তার দু`ধারে সিউলিদের দেখেছিলাম। খেজুর গাছে হাঁড়ি ঝুলছে, সেটাও দেখা যাচ্ছিল। আমাদের উত্তরে একসময় এই দৃশ্য খুব না হলেও, দেখা যেত। আজকাল কমে এসেছে। আসলে উত্তরে নগরায়ণের গতি বোধহয় তুলনায় বেশি। বোলপুরেও অবশ্য কম নয়। `প্রান্তিক` অঞ্চল দিয়ে কঙ্কালীতলা আসবার সময় সেটি বেশ বুঝতে পারছিলাম। এখনও যে উন্মুক্ত প্রান্তর আছে, সেটি কতদিন আর এরকম ফাঁকা থাকবে বলা মুশকিল।
যাহোক, এক তরুণ সিউলির কাছে দাঁড়ানো গেল। সদ্য গাছ থেকে নিয়ে আসা ঠাণ্ডা খেজুরের রস খাওয়া গেল অনেকদিন পর। দেখলাম আগুনে জ্বাল দিয়ে কীভাবে সে গুড় তৈরি করছে। কথায় কথায় জানা গেল, তার বাড়ি বাঁকুড়াতে। অন্য সময় বেকারিতে কাজ করে। রুটি, বিস্কুট বানায়। শীতকাল চলে এলে এইসব অঞ্চলে চলে আসে। ইজারা নেয় গাছের। রস আর গুড় বিক্রি করে মোটামুটি লাভ থাকে।
এখানেই দেখা লাল কৌপিন করা এক সাধু ও তার চ্যালার সঙ্গে। দুই গ্লাস খেজুর রসের বিনিময়ে তাঁরা মোটামুটি এই জন্মের সব পাপ মুক্ত করে দিলেন আমাদের। মজা লাগল বেশ।
এবার কোপাই দর্শন। `আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে...`কবিতার লাইন আওড়াতে আওড়াতে পৌঁছে গেলাম সেখানে। নদীর ওপর পুরোনো ব্রিজ ওপারে চলে গেছে। দুই পাশে ছোটখাটো মেলা। বাউল সঙ্গীতের আসর থেকে হস্তশিল্পের দোকান। আর মানুষজন। প্রকৃতি এখানে এখনও যথেষ্ট আরণ্যক। বোঝাই যাচ্ছে অতীতে কতটা সুন্দর ছিল কোপাইয়ের দুই ধার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চাইতেও কেন যেন বারবার মনে পড়ছিল নন্দলাল বসুর কথা। এক প্রবন্ধে শিল্প সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞানতার কথা উল্লেখ করেছিলেন তিনি। অথচ আমাদের চারদিকে কত শিল্প সামগ্রী! শুধু দেখবার চোখের অভাবে তার কিছুই আমাদের নজরে পড়ে না। নান্দনিক ব্যাপারগুলি এভাবেই বোধহয় হারিয়ে যায়। এই যে ছোট্ট কোপাই যে আসলে বক্রেশ্বরের উপনদী তার চলার পথ মাত্র ১৭৫ কিমি। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে তার পথ কি কখনও কিলোমিটার দিয়ে বেঁধে রাখা যায়? ভাবছিলাম সেটাই। শান্তিনিকেতন, বোলপুর, কঙ্কালীতলা, কীর্ণাহার, লাভপুরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত এই ছোট্ট নদী তিতাস, গঙ্গা, পদ্মা, তিস্তা, আংরাভাসা ইত্যাদি বিখ্যাত নদীগুলির অনেক আগে আমাদের মনে জায়গা করে নিয়েছিল।
কোপাইয়ের কাছেই এক শাড়ি কারখানায় ঢুকে পড়লাম কীভাবে শাড়িতে রং করা হচ্ছে দেখার জন্য। এমনিতে এখানে কেউ ঢোকে না। কিন্তু ওই যে, আমাদের কৌতূহল। মনে পড়ল, বাবা মাঝেমাঝে বিরক্ত হতেন আমার `কেন` শুনে শুনে। সেই বদভ্যাস আজও ছাড়েনি। সুতরাং ঢুকে পড়লাম শাড়ি রং করার কারখানায়। জানা গেল, আশেপাশের গ্রামগুলি থেকে শাড়িগুলি তৈরি হয়ে আসে। তারপর এখানে বেশ কয়েকটি পদ্ধতিতে রং করা হয়। রং পাকা করবার জন্য গরম জলে চুবিয়ে রাখা থেকে শুরু করে পদ্ধতিগুলি জেনে ভাল লাগল বেশ। তবে এটি বিশুদ্ধ কারখানা। এখানে কোনও কেনাবেচার ব্যাপার নেই। এদের নিজস্ব দোকান আছে শহরের দু`একটি জায়গায়। আমরা পরে গিয়েছিলাম এদের হোলসেলের দোকানে। বিভিন্ন ধরণের কাপড়ের কালেকশন দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। তবে অধিকাংশই মহিলাদের জন্য। পুরুষরা এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে অনেকটাই। পুরুষদের ভাগ্যই আসলে খারাপ।
পূর্বাঞ্চলীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাংস্কৃতিক গ্রাম সৃজনী শিল্পগ্রাম বোলপুরের অন্যতম আকর্ষণ। ছাব্বিশ বিঘা জুড়ে এর বিস্তৃতি। রয়েছে বিহার, ঝাড়খণ্ড, মণিপুর, ওড়িশা, সিকিম, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ অঞ্চলের নয়টি ঐতিহ্যবাহী কুঁড়েঘরের আকারে নয়টি জাদুঘর। কুঁড়েঘরগুলিতে ঐতিহ্যবাহী, স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য এবং নকশা রয়েছে। এখানকার শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ অবশ্য দর্শনার্থীদের ভিড় আর ছবি তোলার হিড়িকে নষ্ট হতে বসেছে। অধিকাংশই দেখলাম 'আদি বিম্ব' নামে লোকচিত্রকলার আর্ট গ্যালারি সম্পর্কে উদাসীন। এবাদেও রয়েছে 'আদি ক্রান্তি`। আদতে এটি একটি মণ্ডপ যেটি উৎসর্গ করা হয়েছে বিরসা মুন্ডা, লক্ষ্মণ নায়ক, রানী গাইদিনলু, সিধু কানু, তিলকা মাঝি এবং তিরট সিং-এর উদ্দেশ্যে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব কাছে হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই লোকসমাগম বেশি সৃজনী শিল্পগ্রামে। এটি ঘুরে দেখতে দেখতে আমার মনে পড়ছিল হায়দ্রাবাদের শিল্পরমমের কথা। শিল্পগ্রাম হিসেবে সেটি ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন।
বোলপুর শহরের খানিকটা দূরে `আমার কুটির` হস্তশিল্পের আর একটি প্রখ্যাত কেন্দ্র। পরাধীন ভারতে জায়গাটি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র ছিল।বর্তমানে এখানে সমবায়ের ভিত্তিতে হস্তশিল্প প্রসারণ ও বিপণন চলছে। শ্রদ্ধেয় সুষেন মুখার্জি ও তাঁর অনুগামীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা `আমার কুটির`-এর অবদান বীরভূম জেলায় আলাদা মর্যাদা পেয়েছে। বিশেষ করে বীরভূমের গ্রামীণ শিল্প বিকাশে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠিত `আমার কুটির`-এর ইতিহাস চমকপ্রদ। শুরুর দিকে স্বাধীনতা সংগ্রামী সুষেন মুখার্জি বাড়ি বাড়ি গিয়েও এখানকার হস্তশিল্প বিপণন করেছেন। মুম্বাই, চেন্নাই গিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে বাটিক প্রিন্টে এক্সপার্ট হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রদর্শিত পথেই আজও চলছে এখানকার নানা কাজ। এমনিতে প্রায় সারা বোলপুর শহরেই বিভিন্ন জায়গায় এই জাতীয় জিনিস কিনতে পাওয়া যায়। তবে `আমার কুটির` থেকে সংগ্রহের বিষয়টি একটু আলাদা। কেননা এখানে সমবায়ের ভিত্তিতে লভ্যাংশ ভাগ হচ্ছে মূল কারিগরদের মধ্যে। তাই ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, এখান থেকে হস্তশিল্প সামগ্রী কেনা ভাল। তবে শুধু কেনা নয়, দেখে নেওয়া উচিত ছোট্ট মিউজিয়ামটিও। তাহলে `আমার কুটির`-এর ঐতিহ্য বোঝা যায়। এখানেও পাশেই রয়েছে কোপাই।
বিকেলের অস্তমিত সূর্যের আলোয় মনে হচ্ছিল মুজনাই কোপাই সব যেন কোনও জায়গায় এক। কেননা সব নদীই বলে মানুষের কথা। নদী ছাড়া আমরা? ভাবতেই পারি না।
(ক্রমশ)













No comments:
Post a Comment