Saturday, August 30, 2025


 

কলেজ দিনের বালক- ১৬ 
শৌভিক রায় 

মৌলিক স্যারকে শেষ পর্যন্ত বলে বসলাম,
- স্যার....নভেল পেপারের নোটস আমাদের প্রয়োজন নেই। সময় তো এমনিতেই কম আর আপনিও বলেছিলেন, যে নোটসগুলি প্রয়োজন সেগুলিই দেবেন। ওই পেপারটা লাগবে না। 

চুপচাপ শুনলেন মৌলিকবাবু। মুখে কিছু বললেন না।

এপ্রিল মাস। একটু গরম পড়েছে। স্যার বাড়ির ভেতর গেলেন। মিষ্টির প্লেট নিয়ে ফিরলেন। পয়লা বৈশাখ গেছে কয়েকদিন আগেই। অনেকগুলি মিষ্টি। আমার আর শুভর এমনিতেই খিদে পায়। পড়ার পরে কোনও দিন কোর্ট মোড়ে, কোনও দিন বাজারের ভেতরে মরু ঘোষের মিষ্টির দোকানে চা-সিঙাড়া খাই। তাই প্লেটে সাজানো মিষ্টি উড়ে যেতে সময় লাগল না।

বুক থেকে পাথর নেমে গেল। একটা পেপারের নোটস লাগবে না। এটা স্যারকে বলা খুব চাপের ছিল। সেদিন সবাই আমার ওপর জোর করেই চাপিয়ে দিয়েছিল। আমাকেই বলতে হবে। বলতে পারব কি পারব না করতে করতে, শেষ অবধি বলে ফেলেছি। ফলে চাপ কমে গেছে। আর সব চাইতে বড় হল, স্যার মেনেও নিয়েছেন। কিছু বলেননি। 

যেভাবে পড়া এগোচ্ছে তাতে আমার নিজের খুব একটা লাভ হয়ত হচ্ছে না। কিন্তু অনার্সের ফাইনাল ইয়ারে এই গাইডেন্স ছাড়া এগোনোও সম্ভব নয়। নিজের মতো বিভিন্ন বই দেখছি, যতটা পারি। কিন্তু তাই বলে দিনহাটার আড্ডা বন্ধ নেই। হলের মাঠে প্রতিদিনই রাতে অনেকটা সময় থাকি। রাতে ভাত খাওয়ার পর থানার মাঠে কিংবা মসজিদের সামনে বসে থাকি। 

মসজিদের সামনে একটা বিরাট শিরীষ গাছ রয়েছে। বিকেল থেকে সেখানে এক বয়স্ক দরবেশ গাছের ডালপালা-তাবিজ কবজ বিক্রি করেন। ইদানিং মসজিদের উল্টোদিকে সন্তোষী মা মন্দিরটি আগের তুলনায় আরও একটু ঝকমকে হচ্ছে। মসজিদেও সেই ছোটবেলার চোখা চোখা ঘাসগুলো চোখে পড়ে না। ওখানে ফুটবল খেলতাম এক সময় মধু আর আমি। আমাদের ছোট নরম পায়ে ওই ঘাসগুলো তখন খুব ব্যথা দিত। কলেজের প্রায় শেষে এসে বুঝতে পারছি ওই ব্যথাটায় ভাল লাগা ছিল। মসজিদটাও বদলে যাচ্ছে। এমনিতে এই মসজিদের একটা নিজস্ব স্থাপত্য আছে। এটা যে বেশ পুরোনো, সেটা দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু মনে হচ্ছে, তার বদল ঘটবে। 

রাত পাহারা বন্ধ হয়ে গেছে। দিনহাটার কুখ্যাত দুই ডাকাত ইতিমধ্যে ধরা পড়েছে। ক্ষিপ্ত জনতার প্রহারে তারা আর বাঁচতে পারেনি। অবস্থা এতটাই চরমে উঠেছিল যে, শেষ অবধি পুলিশকে লাঠি চালাতে হয়। অনেক সাধারণ মানুষ আহত হন। 

এদের মধ্যে আমাদের ফটাকাকাও রয়েছে। যথেষ্ট আহত হয়ে ফটাকাকা হসপিটালে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু অদম্য স্পিরিট ফটাকাকার। হসপিটালে ম্যানেজ করে প্রতিদিন বাড়ি এসে স্নান-খাওয়া সেরে যাচ্ছে। একদিন জিজ্ঞাসা করলাম, 
- তুমি না অসুস্থ? তাও এভাবে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে আসছো?
- ধু-ধু-ধু-ধুর.....নো-নোংরা! তাই না-নার্সকে বলছি দি-দিদি বাড়ি থে-থেকে স্না-স্নান করে এসে আ-আবার শু-শুয়ে থাকব। বা-বাড়ি তো কা-কাছেই।..
 
নার্স মহিলা নিশ্চয়ই এরকম পেশেন্ট আগে দেখেননি। কী আর বলবেন। ছাড় দিয়েছেন। অতএব ফটাকাকা, হসপিটালের পেশেন্ট, বাড়িতে স্নান-খাওয়া সেরে এখন ধূমপান সেরে, আবার চলছে হসপিটালে রুগী হয়ে শুয়ে থাকতে। সাহস করে জিজ্ঞাসা করলাম,
- তোমাকে এত পেটালো কেন পুলিশ? অনেককেই তো মেরেছে। কিন্তু তোমার ইনজুরি সবচেয়ে বেশি। 
- পা-পালাই নাই তো। 
- মানে?
- পু-পুলিশ যখন মা-মারে তখন তো স-সবাই পা-পালাইচে। আ-আমি পা-পালাই না-নাই। যে পু-পুলিশটা মা-মারছিল তাকে বলছি মা-মারবেন, মা-মারেন। দে-দেখি কত শ-শক্তি আপনার। মা-মারছে রে শু-শুভু...ম-মনের সু-সুখে মা-মারছে....

হাসবো না কাঁদব বুঝে পেলাম না ফটাকাকার এই কাণ্ডে। যাহোক, বিড়ি টেনে ফটাকাকা চলে যাওয়া মাত্রই জীবনদা মুখ খুলল,
- ওরে মারবে না? মারবে তো! যে পুলিশটা মারসে ওরে, ওইটাও তোতলা। আর ফটা বলসে, সিভিল ড্রেসে থাকলে নাকি লোকটাকে দেইখে নিবে। তুই কি ভাবস এর পরেও পুলিশ ওরে পিটাবে না?

সব মিলিয়ে আনন্দেই আছি। এই মাসের আর কয়েকদিন বাকি। সামনের মাস থেকে ফিলোলোজি শুরু। একেবারেই নতুন বিষয়। তবে এটা হলেই আমাদের পড়া শেষ হয়ে যাবে। ইতিমধ্যে গৌরাঙ্গর কাছ থেকে পাওয়া নভেল পেপারের নোটস সবাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে লিখে নিয়েছি। 

পড়া শুরু করলেন স্যার। খানিকটা এগিয়ে হঠাৎ থেমে গেলেন,
- শোনো, আমার শরীরটা বিশেষ ভাল নেই। তাই তোমাদেরকে আর বেশিদিন পড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। আর দুদিন তোমাদের দেখাবো। নোটস দেব। সামনের মাস থেকে তোমাদের আর আসবার প্রয়োজন নেই। 

থমকে গেলাম সবাই। নিজেদের কানকে বিশ্বাস হচ্ছে না। এটা কী বলছেন স্যার? একটা পেপার পুরো বাকি। কিছুই জানি না সেটা নিয়ে। স্যার আর পড়াবেন না বলছেন। কাতরে উঠলো শুভ,
- স্যার ফিলোলোজি! ওটা তো বাকি। 
- হ্যাঁ জানি। ওটা নিজেরা দেখে নাও। ওখানে তো ষাট মার্কস। এই পেপারে চল্লিশ মার্কসের  একটা `এসে` লিখতে হবে। সেটা নিজেরা পারবে। আর ওই কবিতার স্ক্যান ইত্যাদি সেটাও পারবে আশা করছি। 
- কিন্তু স্যার...
- কোনও কিন্তু নেই। এটাই আমার ফাইনাল কথা। 

কোনও মতে সেদিনের পড়া শেষ হল। বাইরে বেরিয়ে সাহিত্য সভার কাছে এসে হঠাৎ কেঁদে ফেলল শুভ। সবাই চুপ। কী বলবে কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। আমাদের নভেল পেপার নোটস না নেওয়ার সিদ্ধান্ত স্যার যে ভালভাবে নেননি সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছি এখন। কিন্তু কিছু করার নেই। তীর ছুটে গেছে। সেটাকে ফিরিয়ে আনা আর সম্ভব নয়। গৌরাঙ্গ বিড়বিড় করছে,
- আমার জন্য। আমার জন্য। সবাই বিপদে পড়ে গেলাম। 
অরিন্দম আর মুকুল কোনও কথা বলছে না। কিন্তু মুখ দেখেই মনে হচ্ছে ভয় পেয়েছে মারাত্মক। 

মাথা ঠাণ্ডা রেখে বললাম, 
- চল আমার সঙ্গে। 
- কোথায়?
- চল না!

মদনমোহন মন্দিরের সামনের খোলা বাগানে বসলাম। সন্ধে হবে হবে। মন্দিরের সামনের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলছে। ফাঁকা ফাঁকা চারদিক। 
- শোন। অযথা ভেবে লাভ নেই। স্যার আর করাবেন না। সেটা পরিষ্কার। কিন্তু আমাদের তো পাস করতে হবে। অনার্স পেতে হবে। 
- কী বলতে চাইছিস?
- নিজেরা পড়ব। 
- মানে?
- মানে নিজেরা পড়ব।  তুই আমাকে পড়াবি, আমি তোকে। পাঁচজনে মিলে ওই পেপারটা পড়ব। পারব না, সেটা হতে পারে না। 
- আমরা পারব? একেবারে নতুন যে!
- অনার্স যখন প্রথম শুরু করি, তখন সব নতুন ছিল না?
- ছিল। 
- পারিসনি? পার্ট ওয়ান পাস করিসনি?
- করেছি। 
- তাহলে এটাও পারব। পারতে হবে। হবেই। 

বৈরাগী দিঘির জল থেকে রাস্তার আলোর রিফ্লেকশন আমাদের মুখের মধ্যে পড়ছে। অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকা মুখগুলো দেখে এই কথাগুলো বলে ফেলেছি ঠিকই, কিন্তু নিজেও জানি না আদৌ পারব কিনা। 

কিন্তু না হারার আগে, হার মানব না। গত আড়াই-তিন বছরে জীবন এটুকু অন্তত আমাকে শিখিয়েছে। 

নিজেকে স্যাটানের মতো লাগছে। স্বর্গ থেকে বিতাড়িত। প্রবল যন্ত্রণা হচ্ছে। কিন্তু তবু মাথা তুলতে হবে। বজ্রের মতো প্রবল শক্তিশালী অস্ত্র আমাদের নেই। কিন্তু আছে ইচ্ছাশক্তি। পার্ট ওয়ানের রেজাল্ট সেই শক্তিকে অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। এবার সামনে আরও বড় বাধা। কিন্তু বিরুদ্ধ পরিবেশ যত প্রবল হবে, তাকেও ততটা কঠিন প্রত্যাঘাত সইতে হবে। সেই কাঠিন্যেই নিজেকে তৈরি করছি এবার....   

(ক্রমশ) 

* ছবি- পারিবারিক অ্যালব্যামে রাখা এই ছবিটিতে কারা দাঁড়িয়ে আছেন সেটা জানা নেই। দীর্ঘদিন থেকে ছবিটি রয়েছে আমাদের কাছে। এর আগে দিনহাটা গার্লস স্কুলের একটি পুরোনো ছবি পোস্ট করেছিলাম। সেটিতে জলছাপ না রাখলেও, এটায় রাখছি। 






 

        
  

           

       

 

 

 

       

    








           

Monday, August 25, 2025


 

কলেজ দিনের বালক- ১৫ 
শৌভিক রায় 

আবছায়া অন্ধকার। গাছের ডালগুলো নেমে এসেছে প্রায় রাস্তায়। খুনিয়া মোড় থেকে ডাইনে বাঁক নিতেই পাহাড়ের আভাস। 

পাহাড় আর অরণ্য। দুর্দান্ত কম্বিনেশন। নীল পাহাড়ের গায়ে সাদা মেঘ আর চারপাশে সবুজ জঙ্গল। হৈ হৈ করে উঠল সবাই। বিরক্ত হলাম। অরণ্যের নির্জনতাকে ভাঙবার পক্ষপাতী নই কখনও।  উঠে দাঁড়িয়ে একটু বকুনিই দিলাম সবাইকে। কিন্তু রীনা ভেংচে উঠল। কথা শুনবে না। ওরকমই করবে। সবাইকে নিয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে শুরু করল গান- `ফেটে গেল ফেটে গেল কালীরামের ঢোল`।

মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এমনিতেই বসে আছি বাসের পাদানিতে। কখনও ইঞ্জিনের কাছে যেতে হচ্ছে। সাধনদা ডাকছে। বৈরাগীদা নিজে বসে আছে লাস্ট সিটে। আজ বাসের ক্লিনার-হ্যান্ডিম্যান আমিই। আর আমার সঙ্গে সঙ্গত করছে মধু। 

রীনাকে যখন দেওয়ানহাট থেকে তুলছি, তখন ওর মেজদার কথা ভাল লাগেনি। শুনেছি এই দাদা ইউনিভার্সিটিতে অংক নিয়ে পড়ছে। বোনকে যেন ভালভাবে ফিরিয়ে আনা হয়, সেই ব্যাপারে জ্ঞান দিয়েছে আমাদের। সঙ্গে স্যারেরা যাচ্ছেন, অন্য অনেক মেয়েও আছে। তবু এত চিন্তা কেন কে জানে!

সিটে আমাদের জায়গা হয়নি। যে যার মতো বসে পড়েছে। তাতে অবশ্য অসুবিধে নেই। আমি আর মধু দিব্যি বসে আছি পাদানির ওপর। কখনও বাইরে দেখতে ইচ্ছে হলে, উঠে দাঁড়াচ্ছি। সোনাপুর থেকে ফালাকাটা অবধি ধুলো রাস্তা। শিলতোর্ষা আর বুড়িতোর্ষায় কাঠের ব্রিজ। ল্যাগব্যাগ করে। রাস্তায় বিরাট পাথর একটা। গাড়ি এগোতে পারে না। নেমে দুই হাতে পাথর সরাই। আলি স্যার বলে ওঠেন, `তোমার তো দেখি বেশ ইয়ে আছে....পাথরটা তুলে ফেললে!` 

আসলে পাথর তো আমি তুলিনি। আমাকে দিয়ে তুলিয়েছে। সকাল থেকেই নিজেদের মতো রয়েছি মধু আর আমি। কিন্তু রীনার তাকানো দেখে মনে হচ্ছে, ও কিছু আঁচ করেছে। মুখে যদিও বলছে না। ভাবভঙ্গিতে বুঝিয়ে দিচ্ছে সেটা। এই গান তারই প্রকাশ। 

জলঢাকায় অনেকটা সময় কেটে গেল জায়গা বাছতে। আরও কিছু পিকনিকের দল আছে। তবে মোটামুটি ফাঁকাই। টিফিন নিয়েই যে যার মতো ভ্যানিশ হয়ে গেল। লক্ষ্য করলাম একদল ছেলে-মেয়ের সঙ্গে রীনাও চলে গেল। ওরা নাকি পাহাড়ে উঠবে। নদীতে জল কম। পাথরের ওপর পা দিয়ে এপার-ওপার করা যায়। 

মধু আর আমি কাঠ জ্বালিয়ে শুরু করলাম রান্না। এই ব্যাপারে কোনও অভিজ্ঞতা নেই। মধু যা বলে, সেটাই করি। আমাদের কাণ্ড দেখে সাধনদা আর বৈরাগীদা হেসেই মরে! শেষটায় ওরাও যোগ দিল আমাদের সঙ্গে। ঝটপট এগোতে লাগল রান্না। একটু খারাপ লাগছিল, কিচ্ছু দেখতে পারলাম না বলে। অবশ্য এইসব এলাকা আমার বহুবার ঘোরা। মধুই বরং প্রথম এলো। তাই ঠেলে গুঁতিয়ে ওকে পাঠিয়ে দিলাম ঘুরতে। বাকি যা ছিল রান্নার, তার সবটা উঠে গেল সাধনদাদের জন্য। 

একজন দুজন করে ফিরে আসছে সবাই। দেখেই বোঝা যাচ্ছে যথেষ্ট ক্লান্ত। আসলে পাকদন্ডী রাস্তায় অভ্যেস না থাকলে বেশিক্ষণ এনার্জি ধরে রাখা যায় না। রীনাদের দলটাও ফিরে এলো। কোথায় গিয়েছিল কে জানে। তবে রীনাকে দেখলাম বেশ গম্ভীর হয়ে আছে। তেমন কথা বলছে না কারও সঙ্গেই।  

নদীর ধরে গোল করে বসে খাওয়া শুরু হল। একদম শেষে মধু আর আমি। চুপচাপ দেখলাম, আমাদের খাবার থালা রীনা রেডি করল। 

সব সেরে ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধে । শীতের বেলা। ঝপ করে অন্ধকার নেমে আসে। স্যারেরাও আর থাকতে চাইছেন না। বেশ স্পিডে বাস চালিয়ে ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই ফালাকাটায় চলে এলাম। বাড়ির সামনে দিয়ে সকালে গেছি, স্যারদের বললাম পাঁচ মিনিটের জন্য ঢুকতে। কেউ না করলেন না। ছেলেমেয়েরাও সব্বাই নেমে পড়ল আমার বাড়ি দেখতে। রীনাও নেমেছে। কোন ফাঁকে রান্নাঘরে মায়ের কাছে চলে গিয়ে গল্পও করে এসেছে। পাঁচ মিনিট আধাঘন্টা হয়ে গেল। কোচবিহারের লোকেদের নামিয়ে দেওয়ানহাটে যখন রীনাকে নামাচ্ছি, মনে হল ওর দাদাকে বলে যাই বোনকে বুঝে নিতে। কিন্তু সেটা আর হল না। 

দুদিন পর পরের ব্যাচের কাকলি, পপি, সোমা সব ছেঁকে ধরল,
- ও শুভদা....রীনাদি তো সেই বলছে!
- মানে?
- তোমাদের বাড়ি খুব পছন্দ হয়েছে। 
- ওহ, তোদের ভাল লাগেনি?
- আরে তোমাদের তো সুন্দর বাড়ি। সে তো ঠিকই। কী সুন্দর বাগান সামনে। কিন্তু রীনাদির ভাল লাগা অন্যরকম। 
- কী যে বলিস তোরা বুঝি না!
- আহা! বোঝো না? শুধু বলছে শুভুর মা কী ভাল, শুভুর বাবা কী ভাল, ওদের বাড়িটা কী সুন্দর! তোমাকে শুভু বলে কেন?
- ওটাও আমার নাম তো। তবে সবাই জানে না।  
- তাহলেই বুঝে নাও! কী ব্যাপার। 

আমি আর কথা বাড়াই না। রীনার মাথায় এমনিতেই পোকা আছে। কখন কী কাণ্ড করবে ঠিক নেই। এখন বলছে একরকম। পরে হয়ত আবার উল্টো বলবে। তবে বাবা-মায়ের ব্যাপারে অন্যরকম বলবে না বলেই মনে হয়। ওদের বাড়ি যতটুকু বুঝেছি দুই-চারদিনে, মনে হয়েছে সংস্কার ব্যাপারটা সত্যিই ওদের মজ্জাগত। তবে এখন এসব শুনে বুক ঢিপঢিপ করে উঠল। টুংটাং আওয়াজ হল। কিন্তু ওটুকুই। এর বেশি আর কিছু ভাবতে পারলাম না। 

.....দ্রুত সময় চলে যাচ্ছে। কবিতা পেপার শেষ করে মৌলিক স্যার প্রবন্ধের নোটস দিচ্ছেন। মূল প্রশ্নগুলি আমরাই বলছি। নিজের মতো উনি হয়ত দুই-একটা আলাদা কিছু দিচ্ছেন। পড়ার প্রায় দুই মাস হতে চলল। পার্ট টু পরীক্ষার বাকি আর মাস তিনেক। 

হঠাৎ গৌরাঙ্গ একদিন একটা অদ্ভুত প্রস্তাব দিল, 
- শোন। আমার কাছে স্যারের দেওয়া নভেল পেপারের সব নোটস আছে। ওটা যদি আমরা নিজেরা লিখে নিই, তাহলে অন্তত দেড় মাস সময় বেঁচে যাবে। সঙ্গে একশো কুড়ি টাকাও। তাছাড়া প্রিপারেশনের জন্য বাড়তি সময়ও পাবো। 
- তার মানে বলতে চাইছিস, ওই পেপার আমরা করব না। তাই তো?
- হ্যাঁ। স্যার তো নিজেই বলেছেন আমাদের যা দরকার সেটাই উনি দেবেন। নিজের থেকে কিছু নয়। তো আমাদের ওই পেপার দরকার নেই!
- সে তো বুঝলাম। কিন্তু সেটা তো স্যারকে বলতে হবে। 
- হ্যাঁ বলতে হবে। তোরা বলবি। 
- কেন? তুই বল। 
- নোটস আমি দেব আর আমিই বলব? না। নোটস আমার। স্যারকে বলার ব্যাপার তোদের।
- কিন্তু কে বলবে?
- ঠিক কর সেটা। 
সবাই খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর দেখি সবার চোখ আমার দিকে। চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম,  
- মানে? কী হল? সবাই আমার দিকে তাকাচ্ছিস কেন?

(ক্রমশ)     

* ছবি- 
পেছনে দাঁড়িয়ে বাঁ দিকে দাদা, ডাইনে আমি 
বসে- বাঁ দিক থেকে বোন অ্যানি, ঝিনি, রিনি 
নিচে- ঝিনির সামনে ভাই 
আমাদের যৌথ পরিবারে আলাদা কোনও ভাগ ছিল না। আমরা খুড়তুতো-জ্যাঠতুতো ভাইবোন কখনও নিজেদের আলাদা ভাবিনি। এই ছবিতে আরও দুই বোন নেই।   

                  

               




 

        
  

           

       

 

 

 

       

    





Saturday, August 23, 2025


 

কলেজ দিনের বালক- ১৪ 
শৌভিক রায় 

মৌলিক স্যার প্রথম দিনই একটা ব্যাপার স্পষ্ট করে বললেন,
- তোমরা অনেক পরে শুরু করলে। হাতে মাত্র পাঁচ মাস। আমার আর একটা ব্যাচ অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। ওদেরকে আমি থরোলি পড়াচ্ছি। তোমাদের ক্ষেত্রে যে সেরকমটা সম্ভব নয় নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ। তাই, তোমরা আমাকে বলবে, তোমাদের কী নোটস লাগবে। আমি সেটা দেব। পরদিন সেটা মুখস্ত করে আমার এখানে বসে লিখে দেখাতে হবে। 

মাথায় হাত পড়ল আমার। মুখস্ত করতে পারি না। নোটসের গতানুগতিক পদ্ধতির পড়ায় একেবারেই অভ্যস্ত নই। পরিবর্ত কোনও উপায়ও নেই। এমনিতে  আমাদের ডিসি স্যারের কাছে কোনও কিছু বুঝতে হলে, যে কোনও সময় সেটা পারব। ওঁর দরজা সবসময় খোলা। এসসি স্যারও  ফিরে এসেছেন। তাঁর কাছেও যাওয়া যাবে। সেদিক থেকেও কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু নিয়মিত টিউশন আর বুঝে নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। তাছাড়া অনিলকাকু যেভাবে বই দিয়ে দিতেন, সেটা ওঁদের কাছে নাও পেতে পারি। তাই বিকল্প একটাই- মাটি কামড়ে পড়ে থাকা। 

নির্দিষ্ট দিনগুলোতে পড়তে যাই। স্যার নোটস দেন। লিখি। উনি নোটস বুঝিয়ে দেন। বাড়ি ফিরে এসে সেটা পড়ি। মুখস্ত হয় না। 

ফলে যেটা এতদিন করিনি, সেটাই করি। যেদিন নোটস লিখে দেখাতে হয়, সেদিন নকল করি। ইচ্ছে করে দুই একটা ভুল করি। যাতে স্যার বুঝতে না পারেন যে, নকল করেছি। 

এভাবেই চলল। পার্ট ওয়ানে তিনটে পেপার ছিল। স্যার শুরু করলেন ফিফথ পেপার দিয়ে। এই পেপারে কবিতা। ফোর্থ পেপারে উপন্যাস। সেটা পরে হবে। প্রবন্ধ বিষয়টি নতুন না হলেও, গ্রিক নাটক ব্যাপারটা নতুন। তবে একেবারেই অন্য ব্যাপার ছিল সাত নম্বর পেপার। ফিলোলোজি। 

স্যারের নোটস বোঝানোতে একটু লাভ হয়। দুই একটা প্রশ্ন করা যায়। কিছু জানা যায়। কিন্তু সেটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো। শুভ বাদেও আমাদের ব্যাচে রয়েছে এবিএন শীল কলেজের মুকুল, তুফানগঞ্জ থেকে আসা অরিন্দম আর দিনহাটা কলেজের স্পেশাল অনার্সের গৌরাঙ্গ। তিনজনই অত্যন্ত নিরীহ ও ভদ্র। ওদের পাশে আমি আর শুভ একেবারেই বেমানান। আমরা প্রথম থেকেই বেপরোয়া। স্যারের বাড়িতে ঢোকার আগে সিগারেট। পড়া শেষে আবার। আর মাঝে মাঝেই ওরা চলে গেলে, অন্য কিছু। কখনও সাগরদিঘির পাশে, কখনও বাঁধের ওপরে।  

কলেজে নতুন ব্যাচ এসেছে। জয়দীপ, সঞ্জীব, জহিররা ভর্তি হয়েছে। পুরোদমে ওদের ক্লাস চলছে। কিন্তু থার্ড ইয়ারের ক্লাসের কথা কেউ বলছে না। কয়েকদিন কলেজে ইতস্তত ঘুরে বুঝলাম, ক্লাস না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বুঝলাম যা করার নিজেরই করতে হবে। টিউশন ও কলেজের ভরসায় থাকলে চলবে না। 

দাদা কলকাতায়। ওকে চিঠি লিখলাম কিছু বই কিনবার জন্য। ও সেগুলো কিনে পাঠাল। হাজির হলাম ফালাকাটা কলেজে। বাবি মাসি ওখানকার লাইব্রেরিয়ান। তাসাটি চা-বাগানে বাবি মাসির বাড়ি। ফালাকাটা কলেজে জয়েন করবার পর, বাবি মাসি প্রয়োজনে কোনও কোনও দিন আমাদের বাড়িতে রাতে থাকতেন। একটা সুন্দর সম্পর্ক ওঁর সঙ্গে। মাসির জামাইবাবু ডঃ বাজপেয়ী একসময় ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার ছিলেন। আমার বাবার সঙ্গে তাঁর বেশ হৃদ্যতা ছিল। ডঃ বাজপেয়ীর মেয়ে আছে একটি। নামটা সুন্দর। সাহানা। 

বাবি মাসিকে সমস্যাটা বললাম। মাসি নিজের কার্ডে ফালাকাটা কলেজ থেকে কিছু বই ইস্যু করলেন। তাপসদাও লাইব্রেরির দায়িত্বে ছিলেন। উনিও দিলেন। ফালাকাটা কলেজে অনার্স না থাকলেও, ইংরেজির বেশ ভাল ভাল বই ছিল। আমার প্রয়োজন অনেকটাই মিটে গেল। 

সপ্তাহে দুই দিন ফালাকাটা লাইব্রেরিতে নিজের মতো নোটস নিই। কিছু বই নিয়ে আসি। বাকি দিনগুলি কোচবিহার-দিনহাটা করে কেটে যায়। 

জানুয়ারি মাসে অনিলকাকুর হঠাৎ ডাক,
- কলেজে আয়। কথা আছে। 
গেলাম। 
- চল....একটা পিকনিক করি। 
- পিকনিক?
- হ্যাঁ। আমরা কয়েকজন যাব। আর তোরা। মানে ছাত্রছাত্রীরা। 

শুরু হল প্রস্তুতি। দেখা গেল, পিকনিকে যেতে অনেকেই রাজি। স্যারদের মধ্যে অনিলকাকু ছাড়াও ডিসি স্যার যাবেন। অন্য ডিপার্টমেন্ট থেকে শওকত আলি আর এক-দুজন যাবেন। গাড়ি ঠিক হল। শ্রীমা। সাধনদা ড্রাইভার। বৈরাগীদা গাড়ির ক্লিনার। ডেকোরেটার্সের জিনিস, রান্নার কাঠ সব কিনলাম। ডিসি স্যার দিনহাটা থেকে উঠবেন। অনিলকাকু আর আলিস্যারকে কোচবিহার থেকে তুলতে হবে। রীনা উঠবে দেওয়ানহাট থেকে। কিছু ছেলেমেয়ে কোচবিহার থেকে। 

সব হল। সকালের খাবার, দুপুরের রান্নার সবজি, মাংস ইত্যাদি সব রেডি। কিন্তু রাঁধুনি আর পাওয়া যায় না। সব দায়িত্ব আমার ওপর। মহা সমস্যায় পড়লাম। হঠাৎ মধু প্রস্তাব দিল, ও রান্না করে দেবে। শুধু ওকে বিনে পয়সায় নিয়ে যেতে হবে। 

মধু রাঁধবে? ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। মধু শুধু আত্মীয় নয়। বন্ধুও। কমার্স নিয়ে আমার এক ব্যাচ আগে পড়লেও, এতদিন ইকোনোমিক্স বুঝে নিয়েছে আমার কাছে। ওর বন্ধু রঘু, গাঠু, কানুরা আমারও বন্ধু। ওরা সবাই আমাকে ভালবাসে। এমনিতে সবাই ওদের যারা চোখে দেখলেও, আমি জানি যে কোনও সাহায্যে সবার আগে আমার পাশে ওরাই দাঁড়াবে। কিন্তু তাই বলে মধু? রাঁধুনি?   

উপায়ও দেখছি না সামনে। এমনিতেই ভরা পিকনিকের সিজন। প্রতি রবিবার সকালে শোনা যায় `রাম্বা হো হো....`, `হাওয়া হাওয়া এ হাওয়া....`, `এ আমার গুরুদক্ষিণা...` বাজাতে বাজাতে পিকনিক পার্টি চলছে। কোথায় পাব রাঁধুনি? আর যদিও বা পাই, সে যে পয়সা চাইবে সেটা দেওয়া সম্ভব হবে না। 

কিন্তু মধু পারবে তো? সবার সামনে বেইজ্জত হব না তো? টেনশন শুরু হয়ে গেল...... 

(ক্রমশ) 

ছবি- আমি আর ভজন। দিনহাটার সুচিত্রা স্টুডিওতে তোলা। ভজন আর নেই। পরবর্তী জীবনে সফল ওষুধ ব্যবসায়ী ভজন দিনহাটা ফুলদিঘিতে সাঁতার কাটতে কাটতেই চলে যায় সবাইকে ছেড়ে।   



 

        

Thursday, August 21, 2025


 

কলেজ দিনের বালক- ১৩
শৌভিক রায়   

সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি। চোখে চশমা। ব্যাকব্রাশ করা চুল। 
এক চিলতে বাগান। সেটা পার করেই কয়েকটা কাঠের সিঁড়ি। একফালি কাঠের বারান্দা। তারপরেই ছোট্ট ঘর। সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অবশ্য ঘরের ওপারে কী আছে বোঝা যাচ্ছে না। 
সৌম্য দর্শন মৌলিকবাবুকে প্রথম দর্শনেই ভাল লাগল। বোঝাই যাচ্ছিল মানুষটি নিপাট ভদ্রলোক। 

পার্ট ওয়ানের রেজাল্টে মা-বাবা খুশি। দিনহাটা কলেজ তো বটেই, কোচবিহারের এবিএন শীল কলেজ সহ অন্য কোনও কলেজ থেকেও ওই দুই পেপারে এত নম্বর কেউ পেয়েছে বলে জানা নেই। সম্ভবত জলপাইগুড়ি জেলাতেও কাউকে পাওয়া যাবে না। তবে এখনও একটা পেপারের মার্কস আসেনি। কাজেই মোট নম্বর কী হচ্ছে জানিনা এখনও। কিন্তু আমার কনফিডেন্স বেড়ে গেছে। `অমুক স্যারের নোটস`, `তমুক স্যারের সাজেশন` না পড়েও যে অনার্স পাওয়া যায়, সেটা বুঝে গিয়েছি। রীনাকে চিঠি লিখিনি আর। ওর বাড়িতে গিয়েই দুই পেপারের মার্কস জানিয়ে এসেছি। রীনা খুশি হয়েছে জানি। কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ করেনি। 

মৌলিক স্যারের কাছে ওরা তিনমাস আগে পড়তে শুরু করেছে। এখন যে ওই ব্যাচে জায়গা হবে না, সেটা পরিষ্কার। এজেএম স্যারের কাছে যেতে মন চাইছে না। তাই রীনার কাছে যখন জানলাম, মৌলিক স্যার আর একটা ব্যাচ করতে পারেন, হাজির হলাম ওঁর কাছে। 

রানিবাগানের উল্টোদিকে ওঁর বাড়ি। সামনে কিছুটা এগোলেই তোর্ষা। পাটাকুড়া নামে এলাকাটা পরিচিত। অধিকাংশ বাড়িই একতলা। টিনের চাল। কাছেই কোচবিহারের বিখ্যাত সাহিত্য সভা। মৌলিক বাবুর বাড়ির বেশ খানিকটা আগে ডান হাতে প্রাচীর দেওয়া একটি রাজকীয় বাড়ি। লনে দোলনা দেখা যায়। কুকুর ঘোরাফেরা করে। সেই বাড়ির মোটামুটি বিপরীতেই নাকি এক বিশিষ্ট মানুষের বাড়ি। দেসরকার বাড়ি বলে চিনিয়ে দিল কেউ একজন। রানিবাগান আগেও এসেছি। ভাল লাগে দেখতে। এখন এই পড়ন্ত বিকেলে ওখানে ছোটরা খেলছে। 

- কোন কলেজ?
- দিনহাটা কলেজ স্যার। 
- একটা ব্যাচ তো শুরু করেছি তিন মাস আগে। ওখানে হবে না। ওরা অনেকটা এগিয়ে গেছে। 
- স্যার...অন্য কোনও ব্যাচ?
- হ্যাঁ পরশু থেকে শুরু হয়েছে। একদিনই হয়েছে। ওখানে হতে পারে। কিন্তু তোমার রেজাল্ট কী?
- উইথ হেল্ড হয়ে আছে স্যার। 
- উইথ হেল্ড? ওহহ...তাহলে তো মুশকিল। এই অবস্থায় পার্ট টু পড়ে কী করবে? অনার্স পাও আগে। 
- স্যার ইউনিভার্সিটিতে খোঁজ নিয়েছিলাম। অনার্স পাবো বলে মনে হয়.....
- কোথায় খোঁজ নিয়েছ? কার কাছে?
- কন্ট্রোলার অফ এক্সাম আমার বাবার সহপাঠী....ওঁর কাছেই। ফার্স্ট পেপারটা থার্ড এক্সামিনার হচ্ছে স্যার। অন্য দুটো পেপারে সমস্যা নেই। দুটোতেই সাতচল্লিশ করে পেয়েছি...
- কত বললে?
- সাতচল্লিশ সাতচল্লিশ স্যার। 
- মানে পোয়েট্রি আর ড্রামা? সাতচল্লিশ? 
- হ্যাঁ স্যার। 
- আচ্ছা! এক কাজ কারো। তুমি কাল থেকেই এসো। দু`দিন পড়াবো সপ্তাহে। 
- আচ্ছা স্যার। কখন আসবো?
- বিকেলে। চারটে থেকে। দিনহাটা থেকে আসবে তো? অসুবিধে হবে না নিশ্চয়ই। 
- না স্যার। হবে না। স্যার....আর একটা কথা। মানে, টিউ...
- টিউশুন ফি? আমি ১২০ টাকা নেব মাসে। 

কথা শেষ হতে না হতেই দেখি, পেছনে আর একটি ছেলে দাঁড়িয়ে। ছিপছিপে চেহারা। ওর দিকে তাকিয়ে স্যার বললেন, 
- ও তুমি। হ্যাঁ, তুমিও কাল থেকে আসবে। একদিনই ব্যাচটা হয়েছে। দুজন আছে। একজন এবিএন শীল কলেজের। একজন আসছে তুফানগঞ্জ থেকে। ওর কলেজ বোধহয় আলিপুরদুয়ার। আর তোমরা দুজন হলে। আর একটি ছেলেও আসতে পারে। এই পাঁচজন নিয়েই তোমাদের ব্যাচ। তুমি তো আমার কলেজেরই। নামটা যেন কী..
- শুভাশিষ মুখার্জি স্যার। 
- হ্যাঁ হ্যাঁ...তোমাদের বাড়িটা হল....
- পুরোনো পোস্ট অফিস পাড়ায়। `প্রিয় কুটির` স্যার।
- ঠিক ঠিক....তাহলে ওই কথাই রইল। কাল চলে এসো। 

দুজনেই বেরিয়ে এলাম স্যারের বাড়ি থেকে। ছেলেটি হাত বাড়িয়ে দিল,
- আমি শুভাশিস। তুই?
- শৌভিক। 
- কোন কলেজ তোর?
- দিনহাটা। 
- ওখানেই বাড়ি তোর?
- হ্যাঁ ওখানেও আছে। 
- আরও আছে নাকি? বাড়ি?
- ফালাকাটায় আছে। 
- ফালাকাটায়? ওখানে তো আমার পিসির বাড়ি। চিনবি তুই পিসেমশাইকে। 
- কে?
- হরচন্দ্র চক্রবর্তী। ফালাকাটা হাই স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার। 
- আচ্ছা!! তার মানে তুই টিঙ্কুদা আর রুবিদির ভাই?
- চিনিস  নাকি?
- চিনব না? হরকাকু তো আমার মাস্টারমশাই। আমাদের স্যার। 
- কাকু বললি যে?
- কাকুই বলি। আমার বাবাও ওই স্কুলে। হেডমাস্টার। 
- তাই নাকি? তাহলে তো তুই সেই ছেলেটা, যে রুবিদির বিয়েতে ছবি তুলেছিলিস? ক্যামেরাম্যান তো তুই ছিলিস !
- হ্যাঁ। আমিই। 
- চিনতেই পারিনি। 
- আমিও তো চিনিনি। 
- দারুণ হল। চল সিগারেট টানি। টানিস তো?
- হুমমম....

সাগর দিঘি খোলামেলা। সন্ধের মুখে বেশ লাগছে। অল্প কিছু মানুষ। ঢালু জমি নেমে গেছে জলে। 
- তোর ডাক নাম কী?
- শুভু, শুভ....যে যেটা বলে।  
- আমাকেও সবাই শুভ বলে। শুভাশিস থেকে শুভ। 
- আমিও তাই বলব। 
- দুজনেই শুভ। ভালোই হল। আর কিছু টানিস ?
চোখ মটকে শুভ বলল। ওর কাণ্ডে হেসে ফেললাম। 
- বুঝেছি বুঝেছি। আর বলতে হবে না। তুমি হলে বস। দেখেই চিনেছি। চলবে চলবে। তবে বস, তোমার মতো নম্বর আমি পাইনি। কোয়ালিফাইং মার্কস আমার।   
হৈ হৈ করে উঠল শুভ। বুঝে গেলাম তখনই ভালই হবে এখানে। 

দিন পনেরোর মধ্যেই মার্কশিট চলে এলো কলেজে। ফার্স্ট পেপারে দেখলাম ৪৫ এসেছে। মৌলিক স্যারের দুটো ব্যাচের মধ্যে বোধহয় আমারই সবচেয়ে বেশি নম্বর। ভাল তো অবশ্যই লাগছে। সব কিছু মিলিয়েই। 

একদিন সন্ধেয় হঠাৎ বাড়িতে দিনহাটার সকলের পরিচিত পরিচিত শিক্ষক শ্রদ্ধেয় দেবদাস মুখার্জি এলেন। সঙ্গে ওঁর মেয়ে। মাস্টারমশাইয়ের ছেলে দেবাশিস আমাদের সমসাময়িক। মেয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছে। বিষয় হিসেবে ইংরেজি আছে। কিছু ব্যাপার বুঝে নেবে। ভীষণ লজ্জায় পড়লাম। কেননা মাস্টারমশাই নিজেও ইংরেজির। উনি মেয়েকে আমার কাছে নিয়ে এসেছেন! নিঃসন্দেহে বিরাট প্রাপ্তি। উনি অকপট বললেন,
- আমি তো ভাবতেই পারিনি তুমি অনার্স পাবে। তোমাকে তো সারাদিন এদিক সেদিক ঘুরতে দেখি। তাও এমন সব ছেলেদের সঙ্গে, কী আর বলা! 

আমি নিজেই বা কী আর বলব। মাথা নিচু করে রইলাম। সত্যিই তো। ভুল তো বলেননি। 
- তুমি কি জানো যে, তোমার মা লীলাদি, আমার মেয়ের মা, মানে আমার মিসেসের দিদিমণি?
এটা জানতাম। দিনহাটার বিখ্যাত চ্যাটার্জি বাড়ির মেয়ে উনি। সুমিতা ওঁর নাম। 
- যাহোক, দেখাও ওকে একটু। 

কলেজে গিয়েও একই অবস্থার মধ্যে পড়লাম। পরের ব্যাচের অনেকেই এটা-সেটা বুঝে নিতে শুরু করল। 

গত দুই বছরের সব উপেক্ষা মুছে গেল যেন। একদমই সিঁটিয়ে ছিলাম। আমাদের ফালাকাটার বিখ্যাত চারমূর্তির দুজন পুটন আর বাপি এর মধ্যে পালা করে ফালাকাটা কলেজের জি এস হয়েছে। প্রণব পড়ার পাশাপাশি নাটক, গান চালিয়ে গেছে। আমিই শুধু একটু একটু করে ঢুকে গেছি আরও অন্ধকারের মধ্যে। একটা ছোট্ট মুহূর্ত টুকরো টুকরো করে দিয়েছিল সব। উচ্চ মাধ্যমিকের ওই রেজাল্টের পরেও সামলে উঠবার চেষ্টা করেছিলাম। নিয়েও ছিলাম সামলে। কিন্তু হঠাৎই সব অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। পায়ের তলা থেকে মাটি কেড়ে নিয়েছিল কেউ। 

এখন এই আলো ভাল লাগলেও, বুঝতে পারছি আর একটা যাত্রা শুরু হল। যদিও জীবন মানেই বৃত্তপথ, তবু চলতে তো হবে..... এলিয়টের মতো বিশ্বাস করতে শুরু করেছি In my beginning is my end..... কিন্তু সেই `end`-কে পেতেও প্রয়োজন আর একটা `beginning`  


(ক্রমশ)

* ছবি- দাঁড়িয়ে ডান দিকে পুটন (ও আজ আমাদের মধ্যে সশরীরে নেই, কিন্তু জানি সবসময় আছে), বাঁয়ে বাপি। বসে আমি। আমাদের চারমূর্তির আর একজন প্রণব এই ছবিতে নেই। ছবি নেই ঋত্বিক, শৈবাল, কমল, অনুপ, বিনোদ, রানা, অরুণ, দেবল, রাজা, রণজিৎ...কারও সঙ্গেই। কিন্তু সবাই রয়েছে নিজের হয়ে। ফালাকাটার এক স্টুডিওতে আড্ডার ফাঁকে আমাদের অজান্তেই ছবিটি তুলেছিল প্রসাদ।          
    

   

      

           

       

Wednesday, August 20, 2025


 

`নবজাতকের কাছে দৃঢ় অঙ্গীকার` মনে নেই আর?
শৌভিক রায়  

সেই ছবিটি বিবর্ণ হয়নি আজও। তিন বছরের একটি ছোট্ট ছেলে তুরস্কের সাগরতীরে মুখ গুঁজে শুয়ে রয়েছে। নিথর প্রাণহীন তার দেহ। 

ঠিক এক দশক আগে, আয়লান কুর্দি নামের সেই একরত্তি শিশুর ছবিটি, কমবেশি পৃথিবীর সব মানুষের মস্তিষ্কেই, তীব্র অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল। সিরিয়া থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আয়লানের পরিবার গ্রিসে পৌঁছতে চেয়েছিল। কিন্তু ভূমধ্যসাগরে নৌকো উল্টে গিয়ে আয়লান-এর সঙ্গেই মৃত্যু হয় তার মা ও ভাইয়ের। আর আয়লান-এর ওই ছবিটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল, এই বিশ্বে শিশুরা কতটা অসহায়। সে দিন কোনও রাষ্ট্রনেতার ক্ষমতা হয়নি অসংখ্য শিশু-কিশোরকে রক্ষা করা। দুর্ভাগ্য, আয়লান-এর মৃত্যুর পর এতগুলি বছর পেরিয়ে গিয়েও বিশ্বনেতাদের অবস্থা একই।  

বিভিন্ন রাষ্ট্র ও গোষ্ঠীর ক্ষমতার মোহ, দম্ভ ও অহংকারের দাম দিতে গিয়ে এই পৃথিবীতে সব চাইতে ক্ষতি হচ্ছে শিশুদের। দ্বিতীয় যুদ্ধের পর এ রকম অবস্থা আর দেখা যায়নি। ইউনিসেফ-এর পরিসংখ্যান বলছে, এই মুহূর্তে ছ`জনের মধ্যে একের বেশি শিশু এমন এলাকায় বাস করে, যেগুলি হয় যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত অথবা সংঘাতে জর্জরিত। বিগত বছরগুলির তুলনায়, সবচাইতে বেশি শিশু অধিকার লঙ্ঘন হয়েছে বলে ইতিমধ্যে ২০২৪ সাল অভিশপ্ত বছর হিসেবে চিহ্নিত। শিশুদের বিরুদ্ধে  অপরাধে এগিয়ে রয়েছে পশ্চিম এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও  আফ্রিকা। এই সব অঞ্চলে ২০০৫ থেকে ২০২৩ অবধি এ রকম অপরাধের সংখ্যা মোট ৩ লক্ষ ৪৭ হাজার। বাস্তবে এই সংখ্যাটি আরও বেশি। কেননা বহু ঘটনা সামনেই আসেনি। 

কিন্তু ঠিক কী করা হয়েছে বা হয় শিশুদের বিরুদ্ধে? ভাবতে অবাক লাগে, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ তো রয়েইছে, জোর করে শিশুদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগের ঘটনাও কম নয়। সংঘাতে জড়িয়ে পড়া রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীগুলি ভাবে যে, তাদের বিকলাঙ্গ করে দেওয়া, স্কুল বা হসপিটালের ওপর আক্রমণ করা আদৌ কোনও ঘৃণ্য অপরাধ নয়। আসলে শত্রু গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রকে শিক্ষা দিতে, শিশুদের ওপর আক্রমণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বোধ হয় সবচেয়ে সহজ অস্ত্র। বড়জোর দু`চারদিন হইচই হবে। তার পর কে আর কী মনে রাখবে? কেননা সবাই জানে, `বিংশ শতকে শোকের আমাদের আয়ু বড়জোর এক বছর`। আর এখন তো মানবসভ্যতা সেই শতকও পার করে এসেছে। ফলে, এই জাতীয় অপরাধও ক্রমবর্ধমান। শিশুদের হয়ে কেউ বলার নেই বলে, তাদের নিয়ে ভাবারও সময় নেই বড়দের। ইউনিসেফ-এর  মতো কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা কিছুটা সোচ্চার হলেও, তাদের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত।  

এই মুহূর্তে সংঘর্ষের আওতাধীন গাজা, প্যালেস্টাইন বা ইউক্রেন-এই শুধু নয়, হাইতি, মিয়ানমার, সুদান ইত্যাদি বহু দেশেই শিশুদের অবস্থা শোচনীয়। খাদ্য, পানীয়, জীবনদায়ী ওষুধ এবং সঠিক যত্নের অভাবে এই শিশুদের জীবন হয়ে উঠছে এক বিভীষিকা। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শুরুতেও, সংঘর্ষ চলছে এরকম এলাকায় শিশুদের সংখ্যা ছিল ১০ শতাংশ। এই মুহূর্তে সেটি বেড়ে হয়েছে ১৯ শতাংশ। ভাগ্যের পরিহাস এমনই যে, আক্রান্ত শিশুরা জানেই না, কী কারণে তাদের পরিবার হারাতে হচ্ছে কিংবা নাম লেখাতে হচ্ছে উদ্বাস্তুদের দলে, বা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে পশুর মতো মারামারি করে এক টুকরো রুটি জোগাড় করতে হচ্ছে! 

যুদ্ধ বা সংঘর্ষ হচ্ছে না, এ রকম অঞ্চলে শিশুদের অবস্থা কেমন? চিত্রটি হতাশার। শুধুমাত্র দক্ষিণ এশিয়া ও সাহারা-সন্নিহিত আফ্রিকা ধরলে, পাঁচ বছরের নিচে ১৮ কোটি ১০ লক্ষ শিশু চরম দারিদ্রের মধ্যে রয়েছে। তাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান কিছুই নেই। নেই সঠিক শিক্ষা ও যত্ন। অপুষ্টিতে ভুগতে থাকা এই বিরাট সংখ্যক শিশুদের যৌন হেনস্থার পাশাপাশি পাচারের বিরুদ্ধেও লড়তে হচ্ছে। ১৮ বছরের আগে বিয়ে গেছে, এ রকম শিশুকন্যার সংখ্যা এই মুহূর্তে সারা বিশ্বে ৬৫ কোটি। অন্য দিকে, ২০০৭ সালে অভিভাবক বা পরিবার স্বীকৃতি পায়নি এমন শিশুর সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ১০ লক্ষ। সেটি আজ প্রায় দ্বিগুণ। জলবায়ুর ক্রমাগত বদলও প্রভাব ফেলছে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। তাদের মৃত্যুর হার অবশ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিন্তু নিউমোনিয়া, ডায়েরিয়া ও ম্যালেরিয়াতে ২০২৩ সালে পাঁচ বছরের নিচে ৪৮ লক্ষ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আবার প্রতি সাতজনে একজন শিশুর মানসিক অসুস্থতাও উড়িয়ে দেওয়ার নয়।

সারা বিশ্বেই যখন শিশুদের এই অবস্থা, তখন আমাদের দেশে খুব ভাল কিছু আশা করা যায় না। ইউনিসেফ-এর রিপোর্ট অনুসারে, ভারতে ২০২৪ সালে ৪০ শতাংশ শিশু দারিদ্রসীমা রেখার এতটা নিচে যে, তাদের একবেলাও ঠিকঠাক খাওয়া জোটে না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় এ  দেশে শিশুদের অপুষ্টির হার অনেকটা বেশি এবং সেই কারণে শিশুমৃত্যুর হারও। এর সঙ্গে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, যোগ হয়েছে সঠিক টিকাকরণের অভাব। ফলে, যে রোগ হওয়ার কথা নয়, সেই রোগেই আক্রান্ত হচ্ছে ভারতের শিশুরা। শিশুশিক্ষার ছবিটি হতাশার। মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুটের হার ভারতে ১৪.১ শতাংশ। করোনা অতিমারির পর, এই সংখ্যা আরও বেড়েছে। সংসারে অন্নের জোগান দিতে পরিবারের স্কুল-পড়ুয়া শিশুটিকেও এগিয়ে আসতে হয়েছে। যুঝতে হচ্ছে বিরুদ্ধ পরিস্থিতির সঙ্গে। বেড়ে চলেছে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা। 
 
সামগ্রিকভাবে শিশুদের অবস্থা আদৌ আশাপ্রদ নয়। জন্মের পর থেকে তাদের যে অবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তাকে অভিশপ্ত জীবন ছাড়া আর কীই বা বলা যেতে পারে? অথচ মানব সভ্যতার ইতিহাসে আজ অবধি একটি নিদর্শন নেই, যেখানে শিশুরা যুদ্ধ সৃষ্টি করেছে বা গোষ্ঠী সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। বড়দের সৃষ্ট সংঘাতের দায় তাদেরকে কেন নিতে হবে? সত্যি বলতে, শিশুদের নিয়ে বড়রা বিশেষ ভাবেই না। ফলে তাদের জন্য কোনও সুস্পষ্ট রূপরেখাও তৈরি হয় না। আগামীর নাগরিক এই শিশুদের কল্যাণে কতটা খরচ হয়? ভারতের মতো দেশে, কেন্দ্রীয় বাজেটে, শিশু কল্যাণে, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে, বরাদ্দ হয় মাত্র ২.২৮ শতাংশ  যা বিগত বছরের তুলনায় ০.১ শতাংশ বেশি। ডেনমার্ক, ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, কোরিয়া, নরওয়ে ও সুইডেন-এর মতো হাতে গোনা কিছু রাষ্ট্র ছাড়া অন্যত্র শিশুদের জন্য খুব একটা ব্যয় করা হয় না। আমেরিকার মতো দেশেও  শিশু কল্যাণ ও শিক্ষার জন্য ব্যয় করা হয় জিডিপি-র নগণ্য অংশ। রাশিয়াতেও  সেটি খুব বেশি নয়। এশিয়া বা আফ্রিকার বিভিন্ন রাষ্ট্রের কথা না বলাই ভাল। 

`আমরা শিশুরা সকালের সূর্য` গাইতে ও শুনতে যত ভাল লাগে, বাস্তবে তাদেরকে অন্ধকারে রাখতেই মানুষ  ভালোবাসে হয়ত। 

লেখক কোচবিহার নিবাসী শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক 


(প্রকাশিত- এই সময়, অগাস্ট ২০, ২০২৫)


https://epaper.eisamay.co.in/imageview_11434_7964_4_1_20-08-2025_8_i_1_sf.html

Monday, August 18, 2025


 

কলেজ দিনের বালক- ১২
শৌভিক রায় 

মাথায় শুধু ঘোরে কন্যাকুমারী। কিছুতেই সেই ঘোর থেকে বেরিয়ে আসতে পারি না। এক বছর থেকে ওখানকার ভাবনা এমন ঘুরপাক খাচ্ছে যে, ঠিক করলাম  বিবেকানন্দপুরমে চিঠি লিখব। যদি জায়গা দেয়। 

পারিবারিক ভ্রমণে নানা জায়গায় গিয়েছি আগেও। কিন্তু কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে প্রায় একমাসের দক্ষিণ ভারত বেড়ানো একটা অন্য অভিজ্ঞতা হয়ে আছে। হাওড়া থেকে করমণ্ডল এক্সপ্রেসে মা-বাবা-মানি আর আমি মাদ্রাজ নেমেছি। এত লম্বা ট্রেন জার্নি আমার প্রথম। দুর্দান্ত ট্রেন। খড়্গপুর-ভুবনেশ্বর-বিশাখাপত্তনম-রাজমুন্দ্রি-বিজয়ওয়ারা থামল শুধু। মাদ্রাজ পৌঁছে দিল পাঁচ মিনিট আগে। 

মাদ্রাজ সহ মহাবলীপুরম-পক্ষিতীর্থম-কাঞ্চিপুরম দেখে পন্ডিচেরির অরবিন্দ আশ্রমের গার্ডেন হাউসে আমাদের সাত দিনের থাকা। ফাঁকা শহর। লম্বা মেরিন ড্রাইভ। পঞ্চাশ পয়সা প্রতি ঘন্টায় সাইকেল ভাড়া করে পন্ডিচেরি চষে বেড়াই আর মাতৃমন্দিরে গিয়ে বসে থাকি। সন্ধে থেকে রাত কাটে সমুদ্রের ধারে। অরোভিল তৈরি হচ্ছে। এটা যে দারুণ একটা ব্যাপার হবে, সেটা দেখেই বুঝেছি। গার্ডেন হাউসেই পরিচয় হল আলিপুরদুয়ারের এক প্রাথমিক শিক্ষক দম্পতির সঙ্গে। তারা হয়ে গেলেন আমার কাকু-কাকিমা। দল ভারী হয়ে গেল। পন্ডিচেরি থেকে মাদুরাই-কোদাইকানাল-রামেশ্বরম হয়ে পৌঁছলাম কন্যাকুমারী। ইন্ডিয়ান পেনিনসুলার একদম প্রান্তে এসে সে এক অদ্ভুত অবস্থা আমার। পন্ডিচেরির কোজাগরী পূর্ণিমার সমুদ্র কন্যাকুমারীতে হয়ে গেল দীপাবলি অমাবস্যার গহন কালো রাত। পূর্ণ জোয়ারে সমুদ্রের সে কী উত্তাল অবস্থা! বিরাট পাথরের ওপর ঢেউ আছড়ে পড়ে রুপোর মতো জল মাঝ আকাশে উঠে যাচ্ছে। দূরে দূরে ফসফরাসের আলো সমুদ্রের মধ্যে নিজেদের মতোই জ্বলছে-নিভছে। লাইটহাউসে উঠলাম এখানেই। দেখে এলাম ত্রিবান্দম, কোভালম, সুচিন্দ্রম, ভট্টাকট্টাই। তারপর কোচিন হয়ে ব্যাঙ্গালোর। আর সেখান থেকে মাইশোর-বৃন্দাবন গার্ডেন। 

দক্ষিণ ভারত আমাকে মানসিকভাবে কিছুটা থিতু করল। অনার্স না পেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাব ঠিক করলাম। কন্যাকুমারীর বিবেকানন্দপুরমে চিঠি লিখবার ভাবনা সেখান থেকেই। এইসব করতে করতেই একদিন টুক করে রেজাল্ট বেরিয়ে গেল। দৌড়লাম রেজাল্ট জানতে। কোচবিহারে। অনিলকাকুই নিয়ে এসেছেন ইউনিভার্সিটি থেকে। রীনা অনার্স পেয়ে গেছে। স্বপন আর করুণার কোয়ালিফাইং মার্কস। আর কেউ অনার্স পায়নি। আমার রেজাল্ট `উইথ হেল্ড`। এ এক অদ্ভুত অবস্থা। ফেল করলে দুঃখ হবে, পাস করলে আনন্দ। আমার কিছুই হচ্ছে না। ফেরার পথে রীনার বাড়িতে নেমে ওকে ওর রেজাল্ট জানিয়ে এলাম। নিজে কী করব বুঝতে পারছি না। 

চললাম ফালাকাটায়। বাড়িতে বললাম। বাবা পরদিন ইউনিভার্সিটি গেলেন। আমাদের ইউনিভার্সিটির `কন্ট্রোলার অফ এক্সাম` শ্রদ্ধেয় অশোক ঘোষ যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন বাবার সহপাঠী ছিলেন। তাঁকে আমার রোল নম্বর দিয়ে এলেন। উনি দুদিন পর আমাকে পাঠাতে বললেন। ইউনিভার্সিটিতে। 

সত্যিই ত্রিশঙ্কু অবস্থা। খাচ্ছি। স্বাদ পাচ্ছি না। খিদে পাচ্ছে। বুঝতে পারছি না। ঘুম এলে ঘুমোচ্ছি ঠিকই, কিন্তু উঠবার পর মনে হচ্ছে ঘুমোইনি। এভাবে কাটল দুদিন। প্রণবকে নিয়ে পৌঁছলাম ইউনিভার্সিটিতে। দুই নম্বর গেটের কাছে, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিল্ডিঙের পেছনে, কন্ট্রোলারের অফিস। পর্দা সরিয়ে বললাম,
- স্যার আসব?
- কে তুমি?
- স্যার বাবা এসেছিলেন ফালাকাটা....
- ও.... নীরদের ছেলে! আয় আয়। 
চেম্বারে ঢুকে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি। স্যার বসতে বললেন। যতই বাবার বন্ধু হন, আসলে তো উনি আমার স্যার। বসার প্রশ্নই নেই। দাঁড়িয়ে রইলাম চুপচাপ। কানে এলো,
- কী রে রেজাল্ট উইথ হেল্ড কেন হল?
- জানি না স্যার....
- কী প্ল্যান এরপর? মানে পার্ট টুয়ের পর?
- স্যার অনার্স পাবো কিনা....পার্ট টু তো.....
- ঠিক ঠিক। অনার্স পাবি কিনা...ঠিক.....
- হ্যাঁ স্যার।
- এবার একটা সত্যি বল তো....তোর নিজের কী মনে হচ্ছে এই উইথ হেল্ডের ব্যাপারে....
- কী বলব স্যার... 
- না না বল বল। কিছু তো একটা মনে হচ্ছে তোর। কেমন দিয়েছিলি পরীক্ষা?
- স্যার নোটস তো মুখস্থ করতে পারি না। নিজের মতো লিখেছি...
- বলে যা....
- ফার্স্ট পেপার যদি বয়স্ক কেউ দেখেন তবে বেশি মার্কস পাব না। কমবয়েসি স্যার হলে কিছুটা পাব।
- কেন বলছিস?
- স্যার টি এস এলিয়ট কে নিয়ে লিখেছিলাম। এই প্রজন্মের কাছে ওঁর ব্যাপারটা আলাদা। 
- আর বাকি দুই পেপার?
- জানিনা স্যার। নিজের মতো লেখা সব। 
- শোন, তোকে একটা কথা বলি। অনার্স মানে বুঝিস তো? এখানে দেখা হয়, তুই নিজে কী লিখলি। কী বুঝেছিস আর কী শিখেছিস। কীভাবে সেটা বলতে পারছিস। নোটস তো সবাই পারবে কমন এলে। কিন্তু সেটা অনেকের এক হয়ে যায়। এভারেজ নম্বর আসে.....তুই পার্ট টু পড়া শুরু করে দে। 
- পার্ট টু?
- কেন? ইচ্ছে নেই পড়ার? শোন। দুটো পাস পেপারে তো ভালই পেয়েছিস। সিক্সটি পার্সেন্টের ওপর। অনার্সের সেকেন্ড আর থার্ড পেপারেপেয়েছিস ৪৭ আর ৪৭। তা ৪০ পেলেই অনার্স... সেখানে দুই পেপার মিলে তুই ১৪ নম্বর এগিয়ে আছিস। অর্থাৎ ফার্স্ট পেপারে যদি মাত্র ২৬ পাস, তাহলেই অনার্স পাচ্ছিস। আর হ্যাঁ। তোর ধারণাই ঠিক। ফার্স্ট পেপারে দুই এক্সামিনারের মধ্যে তোর খাতায় ২০ নম্বর পার্থক্য হয়েছে। তাই ওটা গেছে থার্ড এক্সামিনারের কাছে। অনার্সে ডাবল এক্সামিনার খাতা দেখেন, জানিস তো? দুজনের মধ্যে কুড়ি নম্বরের পার্থক্য হলে সেটা যায় আর একজনের কাছে।  

স্যারের আর কোনও কথা কানে ঢুকল না। কোনও ভাবে ওঁকে প্রণাম করে বেরিয়ে এলাম। থরথর করে কাঁপছি। প্রণব হাত চেপে ধরেছে। রাস্তার ধারে বসে পড়লাম। চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে। উচ্চ মাধ্যমিকে ওই রেজাল্ট, সবার বিরূপ চোখে তাকানো, গায়ে সেঁটে যাওয়া বাজে ছেলের তকমা, নেশার ঘোরের এক অদ্ভুত দুনিয়া.... পিঠ দেওয়ালে ঠেকতে ঠেকতে নিঃশ্বাস না নিতে পারার অবস্থা থেকে হঠাৎ এই ঝলমলে আলো চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে আমার। অনার্স পেপারে যেখানে কোয়ালিফাইং মার্কস ৩৮ পেতেই জান কবুল হয়ে যায়, সেখানে দুই পেপারে ১৪ নম্বর এগিয়ে আছি। ভাবতেই পারছি না। সংখ্যাগুলো ভাসছে চোখের সামনে। কী করব বুঝতে পারছি না। 

হঠাৎই মনে হল, বাবা-মায়ের পর এই রেজাল্ট শুনে সবচেয়ে খুশি হবে রীনা। ও আমার সহপাঠী। হয়ত প্রতিদ্বন্দ্বীও। নম্বর পাওয়ার দিক থেকে। কিন্তু ও খুশি হবে। ওকে জানাতে হবে দ্রুত যে, আমি টিকে গেছি......

(ক্রমশ)    

ছবি- কলেজ দিনের রীনা  
   

Saturday, August 16, 2025


 

কলেজ দিনের বালক- ১১
শৌভিক রায় 

পাস সাবজেক্টের পরীক্ষাগুলি আগে হয়ে গেল। সেই কবে, কলেজ জীবনের একদম শুরুতে, বিগত বছরগুলির প্রশ্ন ঘেঁটে, নিজের মতো সাজেশন বানিয়ে, নোটস তৈরি করেছিলাম। সেগুলিই এলো। সমস্যা হল না কোনও। 

ঝামেলা হল অনার্স পেপারে এসে। ফার্স্ট পেপারে ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস। প্রশ্ন পেয়ে দেখি সেই অর্থে একটিও `কমন` নেই। কী করব বুঝতে পারছি না। ভাবলাম খাতা জমা দিয়ে হল থেকে বেরিয়ে যাই। পরক্ষণেই মনে হল, অনার্স তো পাচ্ছিই না। একদম নিশ্চিন্ত। বেরিয়ে আর কোথায় যাব! তার চাইতে নিজের মতো লিখি। যা মনে আসে। 

মিনিট কুড়ি-পঁচিশেক এসব ভাবতেই গেল। শুরু করলাম নিজের মতো। প্রিয় কবি টি এস এলিয়টকে নিয়ে প্রশ্ন এসেছে।  ডিসি স্যারের কাছে যা জেনেছি সবটা লিখলাম। অনিলকাকুর নানা কথা মনে পড়ল ওল্ড ইংলিশ আর রোমান্টিক পিরিয়ডের প্রশ্নে। লিখতে থাকলাম। এক সময় দেখি ডিসি আমার পেছনে দাঁড়িয়ে খাতা দেখছেন। কিছু বললেন না। চুপচাপ চলে গেলেন। 

ফেল করছি, এই ভাবনা নিয়ে পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরলাম। সেকেন্ড পেপার অর্থাৎ কবিতার ক্ষেত্রেও একই হল। আবার সেই নিজের মতো লেখা। যা জানি। বা বলা ভাল, যতটুকু বুঝেছি। থার্ড পেপার নাটক। আগের দুই পেপারের চাইতে ভাল হয়েছে বলে আমার মনে হল। তবে নিশ্চিন্ত অনার্স টিকবে না। 

পরীক্ষা শেষে চলে এলাম ফালাকাটায়। এমনিতে সবসময়ই ফালাকাটার সঙ্গে যোগাযোগ। আমি, পুটন, প্রণব, বাপি ফালাকাটায় চারমূর্তি নামে পরিচিত। প্রণব জলপাইগুড়ি এ সি কলেজে পড়ছে। বাপি আর পুটন ফালাকাটা কলেজে। চারজন একসঙ্গে হলেই হৈ হৈ আড্ডা চলে। বাকিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। ঋত্বিক আলিপুরদুয়ারে। শৈবাল শিলিগুড়িতে। কমল অবশ্য ফালাকাটাতেই আছে। পূর্ণ, কিছুদিন আগেও, দিনহাটায় চিঠি পাঠিয়ে, আমাকে ডেকে আনত ওদের পাড়ার হয়ে ক্রিকেট খেলার জন্য। ও-ও আছে। .তবে খুব দ্রুত সীমান্তরক্ষী হিসেবে চাকরিতে চলে যাবে।  

আপাতত পড়া-টড়া নেই। অতএব পুটন আর আমি চললাম বানারহাটে। পুটনের পিসির বাড়িতে। চা-বাগান ঘেরা বানারহাট চিরকালের প্রিয় জায়গা। ওখানে পুটনের পিসতুতো ভাই বাবুর সুবাদে পরিচয় হল রাহুলের সঙ্গে। রাহুল এ সি কলেজে ইংরেজি অনার্স পড়ছে। আমাদেরই ব্যাচ। সারারাত পিসির বাড়ির টিনের চলে বৃষ্টির শব্দ শুনে, পরদিন জলপাইগুড়ি। বড় কাকিমার বাপের বাড়ি। পাণ্ডা পাড়ায়। নিউ সার্কুলার রোডে সেজ কাকিমার বাপের বাড়িও যাওয়া হল। এভাবেই উল্টোপাল্টা ঘুরতে ঘুরতে মনে হল এবার কী? পার্ট টু তো আছে। পড়া কি শুরু করব, নাকি রেজাল্টের অপেক্ষায় থাকব?

সাহস করে পোস্টকার্ড লিখলাম রীনাকে। কী করছে জানবার জন্য। ভাবিনি উত্তর আসবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে উত্তর এলো। ওর চিঠিতেই জানলাম, অনিলকাকু হয়ত আর পড়াবেন না। তাই ও কোচবিহারে মৌলিকবাবুর কাছে পড়তে শুরু করেছে। 

টনক নড়ল আমার। ভাবলাম আমাকে নিশ্চয়ই কাকু পড়াবেন! যদিও নিজেই জানিনা অনার্স পাব কিনা। তবু অন্তত খোঁজ নেওয়া দরকার। যদি অনার্স পাই, তবে? এলাম কোচবিহারে। গৌরী মহলের পেছনের সেই বাড়ি ছেড়ে কাকুরা এখন গোলবাগানের কাছে, সুনীতি একাডেমির পাশে, একটা বাড়িতে এসেছেন। কাকু জানালেন, এম ফিল করতে যাচ্ছেন। তাই ওঁর পক্ষে পড়ানো সম্ভব নয়। সাজেস্ট করলেন, আমি যেন অম্লানজ্যোতি স্যারের (এ জে এম) কাছে যাই। আমি যেরকম ভাবে পড়তে ভালবাসি, তাতে উনি আদর্শ হবেন। 

কাকুর বাড়ি থেকে যখন বেরোচ্ছি, তখন আমার জুতোর ফিতে বাঁধা দেখে কাকু হেসে কুটোপাটি। সত্যিই জুতোর ফিতে ঠিকঠাক বাঁধতে পারতাম না। কাকু নিজে বসে পড়লেন ফিতে বেঁধে দিতে। হাজারও বাধাতেও থামলেন না। এক রাশ ভাল লাগা নিয়ে চললাম  এ জে এম-এর বাড়ি। 

বাড়ির নাম `রাজনগর`। কাঠ আর কাঁচের সুদৃশ্য বাড়ি। এই বাড়ি থেকে কয়েক বছর আগে রিপ্লাই পোস্টকার্ডে চিঠি গেছে ফালাকাটায়। লিখেছেন একবোদ্বিতীয়ম অমিয়ভূষণ মজুমদার। আমাদের পত্রিকা মুজনাইয়ের জন্য ওঁর শুভেচ্ছা বার্তা চেয়েছিলাম। নিরাশ করেননি। উত্তর দিয়েছিলেন। ওই পোস্টকার্ডে তিনি লিখেছেন  এক অমোঘ সত্য- `প্রত্যেকটা মানুষ-জীবন একটা কাব্য। লিখে ফেলতে পারলেই তা সুন্দর।` গেট খুলে সামনে এগিয়েই দেখি ইজিচেয়ারে উনি আধা শোওয়া হয়ে আছেন। ওঁর চরণ স্পর্শ করে এ জে এম স্যারের খোঁজ করলাম। 
  
 এ জে এম স্যার  সম্পর্কে বহু কিছু শুনেছি। একটু ভয় ভয় লাগছে। দেখি পড়ার ঘরে আমার চার সহপাঠী পড়ছে। পড়ার কথা বললাম। জানতে চাইলেন, আগে কোথায় পড়তাম। অনিলকাকুর কথা শুনে, চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, `আমি তাহলে তোমার সেকেন্ড চয়েজ। উনি পড়াচ্ছেন না, বলে আমার কাছে এসেছ। কিন্তু আমার ব্যাচ ফুল। তোমার কলেজের যারা পড়ছে তারা সব্বাই অনার্স পাবে। তোমার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, তুমি পাবে না। যদি পাও, তখন খোঁজ ক`র। যদি ব্যাচ ফাঁকা থাকে, তবে দেখা যাবে। এখন হবে না। চলে যাও।`

এভাবে এ জে এম স্যার ফিরিয়ে দেবেন কল্পনাতেও আসেনি। একটু আগে কাকুর জুতোর ফিতে বেঁধে দেওয়ার আনন্দে আকাশে ভাসছিলাম। দুম করে পড়লাম শক্ত মাটিতে। মন খুব খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু কিছু করার নেই। চললাম দিনহাটায়। আমার অবস্থা দেখে ভজন কী বুঝল কে জানে। বলল, 
- চল ঘুরে আসি। 
- কোথায়?
- বাইরে। 
- বাইরে বলতে?
- তুই ঠিক কর। তুই তো ঘুরিস। 
- কিন্তু কোথায়?
- দার্জিলিং দেখি নাই। দেখাবি?
- দার্জিলিং? কিন্তু পয়সা?
- দাদার কাছ থেকে নিয়ে নেব। চল
- নিবি? তাহলে চল। 

জীবনদা ৩০০ টাকা দিল। দুপুরে রওনা দিয়ে, জলপাইগুড়িতে এক রাত থেকে, পরদিন পৌঁছে গেলাম দার্জিলিংয়ে। চকবাজারের কাছে সস্তার হোটেল পেলাম। দার্জিলিং বহুবার গিয়েছি। মোটামুটি সব চিনি। ভজনের গাইড হয়ে সারাদিন দার্জিলিং চষে বেড়াই। রাতের বেলায় চকবাজারের সমতল অংশে মিটিং শুনি। মশাল জ্বালিয়ে জ্বালাময়ী ভাষণ দেন নেতারা। চাপা অসন্তোষ ধরা পড়ে সেই মিটিংয়ে। পাহাড় যে অশান্ত হয়ে আছে বুঝি।  যদিও আমার আর ভজনের মতো কমবয়সী দুই টুরিস্টকে পাহাড়ের সরল মানুষেরা রাস্তা চিনিয়ে দিতে বা সস্তার খাবার হোটেলের খোঁজ দিতে আন্তরিকভাবেই সাহায্য করেন। 

দার্জিলিং থেকে ফিরতে ফিরতে ঠিক করলাম, রেজাল্ট না বেরোনো পর্যন্ত পড়ার ব্যাপারে আর কোনও খোঁজ করব না। যা হওয়ার হবে। এমনিতেই অনার্স পাব না। তাই শুধু শুধু ভেবে লাভ কী!

(ক্রমশ)

* ছবি- প্রখ্যাত সাহিত্যিক অমিয়ভূষণ মজুমদারের লেখা সেই চিঠি 

           

       

 

 

 

       

Friday, August 15, 2025


 

এই ইতিহাসটা আমরা অনেকেই জানি না। 

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের অনেক আগে, ১৯৪৩ সালে, ভারতের একটি অংশ স্বাধীন হয়েছিল। আর সেই স্বাধীনতার পেছনে ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস। 

কোন অংশ সেটি? ঠিক ধরেছেন। ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। 




সেই স্বাধীনতা অবশ্য বেশিদিন টেকেনি। তবু স্বাধীনতার প্রথম স্বাদ পেয়েছিলেন তখনকার দ্বীপবাসী।  

আজকের পোর্ট ব্লেয়ারে, মেরিন রোডে, দেশের প্রথম স্বাধীনতার স্মারক বসেছে। 
তাতে বলা হয়েছে - 30th December is a very significant day for all Indians. On this day in 1943, Netaji Subhas Chandra Bose accompanied by officials of the Azad Hind Fauj and Provisional Government of Azad Hind had hoisted the Tricolour for the first time at Port Blair. He declared the Andaman and Nicobar Islands as the first Indian territory to be freed from British Raj.... (নিচের ছবি দ্রষ্টব্য)




ফ্ল্যাগ পয়েন্ট থেকে সামনে রাস্তা চলে গেছে করবিনস কোভের দিকে। উল্টোদিকে, সমুদ্র তীরে, সুবিখ্যাত রস আইল্যান্ড। 




 

Wednesday, August 13, 2025


 

কলেজ দিনের বালক- ১০
শৌভিক রায় 

বাড়ির কাছেই মহামায়া সিনেমা হল। খানিক দূরে ভবানী। মহামায়া সিনেমা হলের পাশেই টাউন হল। বড়দের মুখে শুনেছি, আগে নাকি টাউন হলে ছবি দেখানো হত। চোঙ নিয়ে নতুন ছবির অ্যানাউন্স করতে করতে যেতেন হলের কোনও কর্মচারী। এখন নানা অনুষ্ঠান, নাটক ইত্যাদি হয়ে থাকে এখানে। পুরোনো দিনের এই টাউন হলের ঐতিহ্য আলাদা। 

বালুরঘাটের ত্রিতীর্থের নাটক দেখলাম এখানে। নাটকের পরিভাষা ও আঙ্গিক বহুদিন আগেই বদলে গিয়েছিল। ত্রিতীর্থ নতুন করে সেটা প্রমাণ করল আবার। মনে হল, নাটক দেখছি না, চলমান জীবন দেখছি যেন। ফালাকাটায় নাটক করতাম নিয়মিত। নিজেদের নাটকের দল আছে। দিনহাটায় চলে আসার পরেও ফালাকাটি গিয়ে নাটক করেছি। প্রতিযোগিতায় গিয়েছি। কিন্তু বালুরঘাটের এই নাটকের দলটি সত্যিই আলাদা। 






এই সময়েই প্রগতি মঞ্চস্থ করল মনোজ মিত্রের লেখা `রাজদর্শন`। প্রত্যেকেই অনবদ্য অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু নিজের সেজকাকু মদন রায় আর তাঁর বন্ধু ও আমাদের কলেজের সঙ্গে যুক্ত শ্রী সীতাংশু শেখর মুস্তাফির অভিনয় মুগ্ধ করেছিল। সেজকাকুর সঙ্গে আমার বেশ ভাব। কোনও নাটক লিখলে, প্রথম শ্রোতা হলাম আমি। বিশেষ করে এই সময়ে। কেননা দিনহাটায় আছি এখন।    

নাটক, যাত্রা, সিনেমার বিজ্ঞাপনে অ্যানাউন্স একটা আর্ট। ফালাকাটায় গৌতম আসোয়ার সেটা বেশ ভাল করেন। দিনহাটায় যাঁরা করেন, তাঁদের নাম জানিনা। শ্রদ্ধেয় নারায়ণ সাহা তাঁর আবৃত্তির জন্য দিনহাটার পরিচিত মুখ। কিন্তু সেটা প্রথাগত আবৃত্তি, ভাষ্য ইত্যাদির জন্য।  যাত্রা, সিনেমা ইত্যাদির  অ্যানাউন্স  একেবারেই আলাদা। খুব কিছু সুন্দর গলা বা উচ্চারণ না হলেও চলে। মোটামুটি কখন কোন শো, ছবির নাম বলতে পারলেই হল। যাত্রার ক্ষেত্রে অবশ্য একটু নাটকীয় করে ঘোষণাগুলো হয়। কখনও উচ্চগ্রামে, কখনও টেনে টেনে, কখনও গলা খেলিয়ে। খুব মনোযোগ দিয়ে সেসব শুনি। বেশ মজা লাগে। 

একদিন রাতের বেলায়, ভজনদের দোকানের সামনে আড্ডা দিচ্ছি, ভবানী সিনেমা হলের মাইকিং কানে এলো- `আগামীকাল, রবিবার, দুপুর সাড়ে এগারোটায় ভবানী সিনেমা হলে দেখুন ক্যানোন দি বারব্রেন....` বার কয়েক শুনেও ছবির নাম মাথায় ঢুকল না। এগিয়ে গিয়ে রিক্সার গায়ে সাঁটা পোস্টার দেখলাম- Conan the Barbarian.... আর্নল্ড সোয়ার্জেনেগারের ছবি। শুদ্ধ করে দিলাম যিনি অ্যানাউন্স করছেন  তাঁকে। ছবির নাম এই। এরপর `কোনান` ঠিক হলেও, `বারবারিয়ান` ঠিক হল না। বুঝলাম মানুষটি আমার মতো ভুলভাল ছেলের ওপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে পারেননি। 

সপ্তাহে একটা ছবি তো বটেই, কখনও দুটো-তিনটে ছবিও দেখি। বেশিটাই নাইট শো। সঙ্গী কখনও জীবনদা। কখনও মধু বা ভজন। ম্যাটিনি দেখলে সঙ্গে বাবুন। ছবির ব্যাপারে জীবনদার একটা থিয়োরি আছে। ও সব ছবি দেখে। বাদ নেই একটাও। দেখা ছবি আবার দেখতে যায় কেউ সঙ্গে গেলে।  ছবি কেমন জানতে চাইলে বলে- `আছে`। ছবিটি খারাপ লাগলে যদি বলা যায়, `ধ্যাৎ বেকার ছবি, তুমি বললে ভালই`। ওর উত্তর হবে, `তরে কইলাম না আছেএএএ`।  আর ভাল লাগলে তো কথাই নেই। জীবনদা ক্রেডিট নিত, `আগেই তো কইছি, আছে!` 







আমাদের ছবি দেখার কোনও মা-বাপ নেই। হলেই হল। কখনও ইন্টারভ্যালের পর মনে হত আর এই ছবি তো আগে দেখেছি! কোনও ছবিতে আবার সানি দেওল ভেবে অনেকটা দেখে আবিষ্কার করি ওটা রাজ বব্বর। `শোলে` যতবার আসে, ততবার দেখতে যাই। তবে অদ্ভুতভাবে একমাত্র আমিই বোধহয় `বেদের মেয়ে  জ্যোৎস্না' দেখলাম না। মহামায়া সিনেমা হলে ছবিটি রমরম করে এক মাসের ওপর চলল। ছবি দেখে কার কী হল জানি না, আমার বড়কাকুর ছেলে অর্থাৎ ভাই, নিজের মা`কে `বেদের মেয়ে` বলতে শুরু করল। কেননা বড় কাকিমার নাম জ্যোৎস্না।

আমাদের মাতিয়ে দিল  Love...the Crime of the Century শীর্ষক ছবিটি। কেউ কেউ বেশ কয়েকবার দেখে ফেলল। আমি অবশ্য দুবারই ইতি টানলাম। তাও পরের বার ফালাকাটা থেকে বন্ধু পুটন এসেছিল বলে ওর সঙ্গে গেলাম। আমির খানের লিপে উদিতনারায়ণের `পাপা কহতে হ্যায়` যেন আমাদের সবার গান হয়ে উঠল। জুহি চাওলাকে স্বপ্নে দেখতে শুরু করলাম কম বেশি প্রত্যেকেই। ছবিটির নাম আসলে `ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তক`। তবে পোস্টারের ওপরে ইংরেজিতে ওই কথাগুলিও ছিল। মহামায়া হলের দিকে যেতে, মাঠ শুরু হওয়ার আগে, ডানদিকের দোকানগুলির শেষটি ছিল একটি মিষ্টির দোকান। তার সামনে এই পোস্টারটি, অখণ্ড মনোযোগ দিয়ে কেবল দেখি  আর জুহির কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। তবে ওই অবস্থা কেটে গেল আর একবার `লাওয়ারিশ` দেখে। `আপনি তো জ্যায়সে ত্যায়সে...` বারবার শুনে মনে হল, এটাই ঠিক। না কেউ আগে, না কেউ পিছে। চল পানসি বেলঘরিয়া। তবে শুধু  `ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তক` বা কিছুটা পুরোনো `লাওয়ারিশ` নয়, বলার মতো অনেক ছবিই ছিল। সেসব আর উল্লেখ করছি না। তবে মিঠুন চক্রবর্তীর উত্থান দেখতে পাচ্ছিলাম। আর অমিতাভের `অগ্নিপথ`এক দুরন্ত ছবি হয়েছিল ১৯৯০ সালে।    

`ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তক`দেখতে গিয়ে বহুদিন পর কিংশুকের সঙ্গে দেখা। ওরা একসময় ফালাকাটায় ছিল। ওর দাদার নাম কৌশিক ঘোষ। ওদের বাবা ছিলেন ফালাকাটা স্টেট ব্যাংকের ম্যানেজার শ্রদ্ধেয় কল্যাণ ঘোষ। কৌশিকদা ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি, পড়াশোনাতেও ভাল ছিল। কিংশুকও কম যেত না। ফালাকাটা স্টেট ব্যাংকের আর এক ম্যানেজারও দিনহাটায় বদলি হয়েছিলেন। ওঁর আসল বাড়ি ছিল কোচবিহারের ধর্মতলা মোড়ের কাছে। ওঁর দুই পুত্র সন্তান শিবতোষ ও ভবানী এবং এক কন্যা লায়লি একই  বয়সী ছিল বলে, ফালাকাটায় আমি, পুটন, প্রণব, বাপি ছিলাম ওদের খেলার সঙ্গী। দুই ম্যানেজারের ফালাকাটার পরেই দিনহাটায় বদলি, দিনহাটা-ফালাকাটার যে কিছু একটা সম্পর্ক আছে সেটা যেন বলে দিত। থমাস হার্ডির উপন্যাসের মতো সেই বিখ্যাত  fate and inescapable doom বলেই মনে হত।         

মহামায়া সিনেমা হলের সঙ্গে লাগানো মাঠ `হলের মাঠ` নামেই পরিচিত। দিনহাটার ফুসফুস এই মাঠ। এক্সচেঞ্জ মোড়ের রাস্তা পার করলেই ওপারে থানার মাঠ আর দিঘি। সিনেমা হলের পেছনে জলাজমির মাঝখান দিয়ে রাস্তা উঠে গেছে এক্সচেঞ্জ পাড়ায়। সেই রাস্তায় উত্তরে গেলেই মদনমোহন পাড়া। হলের মাঠ আমাদের অনেক রাতের আড্ডাখানা। গরমের দিনে ছোট ছোট দলে বহু রাত  অবধি হাওয়া খাই। সঙ্গে দেদার সিগারেট-বিড়ি  চলে। নাইট শো-এর ছবি দেখতে বোর লাগলে, মাঠে এসে বসে থাকি। ভবানী সিনেমা হলের এই সুবিধে নেই। চাপা রাস্তার ধারে হলটি। পেছনে দিনহাটার কুখ্যাত নিষিদ্ধ পল্লী। সুতরাং কোনও দিকে যাওয়ার প্রশ্ন নেই। নাইট শো দেখে এসে আমার ঘরে সসপ্যানে ঢেকে রাখা ভাত খাই প্রায় মাঝরাতে। এর ফাঁকেই পড়া চলে কখনও। 






কলেজে পরের ব্যাচের বিভূতির সঙ্গে বেশ ভাব হয়েছে। ছেলেটির অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের। কিন্তু পড়ায় নিষ্ঠা রয়েছে। কখনও পড়া বুঝে নেয়। বাকি সময় আড্ডা দিই। ও কবিতা লেখে। আমি অবশ্য নিতান্ত পাঠক। ওর সঙ্গে মাঝেমাঝে কোচবিহারে আসি। ওদের ব্যাচের কাকলি আর সোমার বাড়িতে গেলাম একদিন। কাকলিদের বাড়ি নরসিংহ দিঘির ধরে। ওর ভাইয়ের নামটি খুব পছন্দ হল। শঙ্খশুভ্র। সোমাদের বাড়ি নিউটাউন পোস্ট অফিস মোড় থেকে আরও একটু সামনে এগিয়ে। 

সিনেমা, রাতের আড্ডা, উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ানো....এই ভাবেই দিন কাটছে। গায়ে `খারাপ ছেলে` তকমা সেঁটে গেছে। পড়া পারি বলে স্যারেরা স্নেহ করেন। কিন্তু সেটা কলেজেই। তাঁরা তো অন্য সময় আর দেখেন না! ইতিমধ্যে শওকত আলি স্যারের সঙ্গে আমাদের বন্ধু পারভিনের বিয়ে হল। ওকে আমরা `লাভলি` বলেই ডাকি। স্যার যেন এক ঝটকায় অনেকটা কাছের হয়ে গেলেন। বন্ধুর বর বলে, আগের সেই ভীতিটা কেটে গেল। আমাদের আর এক বন্ধু সোনাও (রোমি) বিয়ে করে বসল। ওর বর মধুদার ফোটোগ্রাফির দোকান আছে। সেই দোকানে আমরা ছবিও তুলেছি বেশ কয়েকবার।    

পার্ট ওয়ান পরীক্ষা এগিয়ে আসছে। যাদের অনার্স নেই, পাস করলেই তাদের ছুটি। আমাদের আরও একবছর থাকতে হবে। শুনতে পাচ্ছি বিষ্ণু, মহামায়া, স্বপন, করুণা প্রত্যেকেরই দারুণ প্রস্তুতি। প্রচুর নোটস মুখস্থ করেছে। রীনা, স্বাতী, পাঞ্চালিও বোধহয় ভালই করছে। আমার কোনও নোটস নেই। মুখস্থ কোনও কালে করতে পারিনি। শুধু ঘুরে বেড়াই আর মাঝে মাঝে টেক্সট উল্টেপাল্টে দেখি। 

বুঝতে পারছি, এক চরম বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু ফেরার কোনও ইচ্ছে জাগছে না। ঘোরের যে জগত, সেটাকেই যেন আরও আপন করে নিচ্ছি। কোনও পিছুটান নেই। জীবন শেষ হয়ে গেলেও বোধহয় কিছুই হবে না.....  

(ক্রমশ)   

* ছবি- দিনহাটা শ্রী গুরু প্রপন্ন আশ্রম। এখানেই চলত ছোটদের ক্লাস। সেই অর্থে আমার প্রথম স্কুল।