`নবজাতকের কাছে দৃঢ় অঙ্গীকার` মনে নেই আর?
শৌভিক রায়
সেই ছবিটি বিবর্ণ হয়নি আজও। তিন বছরের একটি ছোট্ট ছেলে তুরস্কের সাগরতীরে মুখ গুঁজে শুয়ে রয়েছে। নিথর প্রাণহীন তার দেহ।
ঠিক এক দশক আগে, আয়লান কুর্দি নামের সেই একরত্তি শিশুর ছবিটি, কমবেশি পৃথিবীর সব মানুষের মস্তিষ্কেই, তীব্র অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল। সিরিয়া থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আয়লানের পরিবার গ্রিসে পৌঁছতে চেয়েছিল। কিন্তু ভূমধ্যসাগরে নৌকো উল্টে গিয়ে আয়লান-এর সঙ্গেই মৃত্যু হয় তার মা ও ভাইয়ের। আর আয়লান-এর ওই ছবিটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল, এই বিশ্বে শিশুরা কতটা অসহায়। সে দিন কোনও রাষ্ট্রনেতার ক্ষমতা হয়নি অসংখ্য শিশু-কিশোরকে রক্ষা করা। দুর্ভাগ্য, আয়লান-এর মৃত্যুর পর এতগুলি বছর পেরিয়ে গিয়েও বিশ্বনেতাদের অবস্থা একই।
বিভিন্ন রাষ্ট্র ও গোষ্ঠীর ক্ষমতার মোহ, দম্ভ ও অহংকারের দাম দিতে গিয়ে এই পৃথিবীতে সব চাইতে ক্ষতি হচ্ছে শিশুদের। দ্বিতীয় যুদ্ধের পর এ রকম অবস্থা আর দেখা যায়নি। ইউনিসেফ-এর পরিসংখ্যান বলছে, এই মুহূর্তে ছ`জনের মধ্যে একের বেশি শিশু এমন এলাকায় বাস করে, যেগুলি হয় যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত অথবা সংঘাতে জর্জরিত। বিগত বছরগুলির তুলনায়, সবচাইতে বেশি শিশু অধিকার লঙ্ঘন হয়েছে বলে ইতিমধ্যে ২০২৪ সাল অভিশপ্ত বছর হিসেবে চিহ্নিত। শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধে এগিয়ে রয়েছে পশ্চিম এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকা। এই সব অঞ্চলে ২০০৫ থেকে ২০২৩ অবধি এ রকম অপরাধের সংখ্যা মোট ৩ লক্ষ ৪৭ হাজার। বাস্তবে এই সংখ্যাটি আরও বেশি। কেননা বহু ঘটনা সামনেই আসেনি।
কিন্তু ঠিক কী করা হয়েছে বা হয় শিশুদের বিরুদ্ধে? ভাবতে অবাক লাগে, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ তো রয়েইছে, জোর করে শিশুদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগের ঘটনাও কম নয়। সংঘাতে জড়িয়ে পড়া রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীগুলি ভাবে যে, তাদের বিকলাঙ্গ করে দেওয়া, স্কুল বা হসপিটালের ওপর আক্রমণ করা আদৌ কোনও ঘৃণ্য অপরাধ নয়। আসলে শত্রু গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রকে শিক্ষা দিতে, শিশুদের ওপর আক্রমণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বোধ হয় সবচেয়ে সহজ অস্ত্র। বড়জোর দু`চারদিন হইচই হবে। তার পর কে আর কী মনে রাখবে? কেননা সবাই জানে, `বিংশ শতকে শোকের আমাদের আয়ু বড়জোর এক বছর`। আর এখন তো মানবসভ্যতা সেই শতকও পার করে এসেছে। ফলে, এই জাতীয় অপরাধও ক্রমবর্ধমান। শিশুদের হয়ে কেউ বলার নেই বলে, তাদের নিয়ে ভাবারও সময় নেই বড়দের। ইউনিসেফ-এর মতো কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা কিছুটা সোচ্চার হলেও, তাদের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত।
এই মুহূর্তে সংঘর্ষের আওতাধীন গাজা, প্যালেস্টাইন বা ইউক্রেন-এই শুধু নয়, হাইতি, মিয়ানমার, সুদান ইত্যাদি বহু দেশেই শিশুদের অবস্থা শোচনীয়। খাদ্য, পানীয়, জীবনদায়ী ওষুধ এবং সঠিক যত্নের অভাবে এই শিশুদের জীবন হয়ে উঠছে এক বিভীষিকা। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শুরুতেও, সংঘর্ষ চলছে এরকম এলাকায় শিশুদের সংখ্যা ছিল ১০ শতাংশ। এই মুহূর্তে সেটি বেড়ে হয়েছে ১৯ শতাংশ। ভাগ্যের পরিহাস এমনই যে, আক্রান্ত শিশুরা জানেই না, কী কারণে তাদের পরিবার হারাতে হচ্ছে কিংবা নাম লেখাতে হচ্ছে উদ্বাস্তুদের দলে, বা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে পশুর মতো মারামারি করে এক টুকরো রুটি জোগাড় করতে হচ্ছে!
যুদ্ধ বা সংঘর্ষ হচ্ছে না, এ রকম অঞ্চলে শিশুদের অবস্থা কেমন? চিত্রটি হতাশার। শুধুমাত্র দক্ষিণ এশিয়া ও সাহারা-সন্নিহিত আফ্রিকা ধরলে, পাঁচ বছরের নিচে ১৮ কোটি ১০ লক্ষ শিশু চরম দারিদ্রের মধ্যে রয়েছে। তাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান কিছুই নেই। নেই সঠিক শিক্ষা ও যত্ন। অপুষ্টিতে ভুগতে থাকা এই বিরাট সংখ্যক শিশুদের যৌন হেনস্থার পাশাপাশি পাচারের বিরুদ্ধেও লড়তে হচ্ছে। ১৮ বছরের আগে বিয়ে গেছে, এ রকম শিশুকন্যার সংখ্যা এই মুহূর্তে সারা বিশ্বে ৬৫ কোটি। অন্য দিকে, ২০০৭ সালে অভিভাবক বা পরিবার স্বীকৃতি পায়নি এমন শিশুর সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ১০ লক্ষ। সেটি আজ প্রায় দ্বিগুণ। জলবায়ুর ক্রমাগত বদলও প্রভাব ফেলছে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। তাদের মৃত্যুর হার অবশ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিন্তু নিউমোনিয়া, ডায়েরিয়া ও ম্যালেরিয়াতে ২০২৩ সালে পাঁচ বছরের নিচে ৪৮ লক্ষ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আবার প্রতি সাতজনে একজন শিশুর মানসিক অসুস্থতাও উড়িয়ে দেওয়ার নয়।
সারা বিশ্বেই যখন শিশুদের এই অবস্থা, তখন আমাদের দেশে খুব ভাল কিছু আশা করা যায় না। ইউনিসেফ-এর রিপোর্ট অনুসারে, ভারতে ২০২৪ সালে ৪০ শতাংশ শিশু দারিদ্রসীমা রেখার এতটা নিচে যে, তাদের একবেলাও ঠিকঠাক খাওয়া জোটে না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় এ দেশে শিশুদের অপুষ্টির হার অনেকটা বেশি এবং সেই কারণে শিশুমৃত্যুর হারও। এর সঙ্গে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, যোগ হয়েছে সঠিক টিকাকরণের অভাব। ফলে, যে রোগ হওয়ার কথা নয়, সেই রোগেই আক্রান্ত হচ্ছে ভারতের শিশুরা। শিশুশিক্ষার ছবিটি হতাশার। মাধ্যমিক স্তরে স্কুলছুটের হার ভারতে ১৪.১ শতাংশ। করোনা অতিমারির পর, এই সংখ্যা আরও বেড়েছে। সংসারে অন্নের জোগান দিতে পরিবারের স্কুল-পড়ুয়া শিশুটিকেও এগিয়ে আসতে হয়েছে। যুঝতে হচ্ছে বিরুদ্ধ পরিস্থিতির সঙ্গে। বেড়ে চলেছে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা।
সামগ্রিকভাবে শিশুদের অবস্থা আদৌ আশাপ্রদ নয়। জন্মের পর থেকে তাদের যে অবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তাকে অভিশপ্ত জীবন ছাড়া আর কীই বা বলা যেতে পারে? অথচ মানব সভ্যতার ইতিহাসে আজ অবধি একটি নিদর্শন নেই, যেখানে শিশুরা যুদ্ধ সৃষ্টি করেছে বা গোষ্ঠী সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। বড়দের সৃষ্ট সংঘাতের দায় তাদেরকে কেন নিতে হবে? সত্যি বলতে, শিশুদের নিয়ে বড়রা বিশেষ ভাবেই না। ফলে তাদের জন্য কোনও সুস্পষ্ট রূপরেখাও তৈরি হয় না। আগামীর নাগরিক এই শিশুদের কল্যাণে কতটা খরচ হয়? ভারতের মতো দেশে, কেন্দ্রীয় বাজেটে, শিশু কল্যাণে, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে, বরাদ্দ হয় মাত্র ২.২৮ শতাংশ যা বিগত বছরের তুলনায় ০.১ শতাংশ বেশি। ডেনমার্ক, ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, কোরিয়া, নরওয়ে ও সুইডেন-এর মতো হাতে গোনা কিছু রাষ্ট্র ছাড়া অন্যত্র শিশুদের জন্য খুব একটা ব্যয় করা হয় না। আমেরিকার মতো দেশেও শিশু কল্যাণ ও শিক্ষার জন্য ব্যয় করা হয় জিডিপি-র নগণ্য অংশ। রাশিয়াতেও সেটি খুব বেশি নয়। এশিয়া বা আফ্রিকার বিভিন্ন রাষ্ট্রের কথা না বলাই ভাল।
`আমরা শিশুরা সকালের সূর্য` গাইতে ও শুনতে যত ভাল লাগে, বাস্তবে তাদেরকে অন্ধকারে রাখতেই মানুষ ভালোবাসে হয়ত।
লেখক কোচবিহার নিবাসী শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক
(প্রকাশিত- এই সময়, অগাস্ট ২০, ২০২৫)
https://epaper.eisamay.co.in/imageview_11434_7964_4_1_20-08-2025_8_i_1_sf.html

No comments:
Post a Comment