Thursday, August 21, 2025


 

কলেজ দিনের বালক- ১৩
শৌভিক রায়   

সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি। চোখে চশমা। ব্যাকব্রাশ করা চুল। 
এক চিলতে বাগান। সেটা পার করেই কয়েকটা কাঠের সিঁড়ি। একফালি কাঠের বারান্দা। তারপরেই ছোট্ট ঘর। সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অবশ্য ঘরের ওপারে কী আছে বোঝা যাচ্ছে না। 
সৌম্য দর্শন মৌলিকবাবুকে প্রথম দর্শনেই ভাল লাগল। বোঝাই যাচ্ছিল মানুষটি নিপাট ভদ্রলোক। 

পার্ট ওয়ানের রেজাল্টে মা-বাবা খুশি। দিনহাটা কলেজ তো বটেই, কোচবিহারের এবিএন শীল কলেজ সহ অন্য কোনও কলেজ থেকেও ওই দুই পেপারে এত নম্বর কেউ পেয়েছে বলে জানা নেই। সম্ভবত জলপাইগুড়ি জেলাতেও কাউকে পাওয়া যাবে না। তবে এখনও একটা পেপারের মার্কস আসেনি। কাজেই মোট নম্বর কী হচ্ছে জানিনা এখনও। কিন্তু আমার কনফিডেন্স বেড়ে গেছে। `অমুক স্যারের নোটস`, `তমুক স্যারের সাজেশন` না পড়েও যে অনার্স পাওয়া যায়, সেটা বুঝে গিয়েছি। রীনাকে চিঠি লিখিনি আর। ওর বাড়িতে গিয়েই দুই পেপারের মার্কস জানিয়ে এসেছি। রীনা খুশি হয়েছে জানি। কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ করেনি। 

মৌলিক স্যারের কাছে ওরা তিনমাস আগে পড়তে শুরু করেছে। এখন যে ওই ব্যাচে জায়গা হবে না, সেটা পরিষ্কার। এজেএম স্যারের কাছে যেতে মন চাইছে না। তাই রীনার কাছে যখন জানলাম, মৌলিক স্যার আর একটা ব্যাচ করতে পারেন, হাজির হলাম ওঁর কাছে। 

রানিবাগানের উল্টোদিকে ওঁর বাড়ি। সামনে কিছুটা এগোলেই তোর্ষা। পাটাকুড়া নামে এলাকাটা পরিচিত। অধিকাংশ বাড়িই একতলা। টিনের চাল। কাছেই কোচবিহারের বিখ্যাত সাহিত্য সভা। মৌলিক বাবুর বাড়ির বেশ খানিকটা আগে ডান হাতে প্রাচীর দেওয়া একটি রাজকীয় বাড়ি। লনে দোলনা দেখা যায়। কুকুর ঘোরাফেরা করে। সেই বাড়ির মোটামুটি বিপরীতেই নাকি এক বিশিষ্ট মানুষের বাড়ি। দেসরকার বাড়ি বলে চিনিয়ে দিল কেউ একজন। রানিবাগান আগেও এসেছি। ভাল লাগে দেখতে। এখন এই পড়ন্ত বিকেলে ওখানে ছোটরা খেলছে। 

- কোন কলেজ?
- দিনহাটা কলেজ স্যার। 
- একটা ব্যাচ তো শুরু করেছি তিন মাস আগে। ওখানে হবে না। ওরা অনেকটা এগিয়ে গেছে। 
- স্যার...অন্য কোনও ব্যাচ?
- হ্যাঁ পরশু থেকে শুরু হয়েছে। একদিনই হয়েছে। ওখানে হতে পারে। কিন্তু তোমার রেজাল্ট কী?
- উইথ হেল্ড হয়ে আছে স্যার। 
- উইথ হেল্ড? ওহহ...তাহলে তো মুশকিল। এই অবস্থায় পার্ট টু পড়ে কী করবে? অনার্স পাও আগে। 
- স্যার ইউনিভার্সিটিতে খোঁজ নিয়েছিলাম। অনার্স পাবো বলে মনে হয়.....
- কোথায় খোঁজ নিয়েছ? কার কাছে?
- কন্ট্রোলার অফ এক্সাম আমার বাবার সহপাঠী....ওঁর কাছেই। ফার্স্ট পেপারটা থার্ড এক্সামিনার হচ্ছে স্যার। অন্য দুটো পেপারে সমস্যা নেই। দুটোতেই সাতচল্লিশ করে পেয়েছি...
- কত বললে?
- সাতচল্লিশ সাতচল্লিশ স্যার। 
- মানে পোয়েট্রি আর ড্রামা? সাতচল্লিশ? 
- হ্যাঁ স্যার। 
- আচ্ছা! এক কাজ কারো। তুমি কাল থেকেই এসো। দু`দিন পড়াবো সপ্তাহে। 
- আচ্ছা স্যার। কখন আসবো?
- বিকেলে। চারটে থেকে। দিনহাটা থেকে আসবে তো? অসুবিধে হবে না নিশ্চয়ই। 
- না স্যার। হবে না। স্যার....আর একটা কথা। মানে, টিউ...
- টিউশুন ফি? আমি ১২০ টাকা নেব মাসে। 

কথা শেষ হতে না হতেই দেখি, পেছনে আর একটি ছেলে দাঁড়িয়ে। ছিপছিপে চেহারা। ওর দিকে তাকিয়ে স্যার বললেন, 
- ও তুমি। হ্যাঁ, তুমিও কাল থেকে আসবে। একদিনই ব্যাচটা হয়েছে। দুজন আছে। একজন এবিএন শীল কলেজের। একজন আসছে তুফানগঞ্জ থেকে। ওর কলেজ বোধহয় আলিপুরদুয়ার। আর তোমরা দুজন হলে। আর একটি ছেলেও আসতে পারে। এই পাঁচজন নিয়েই তোমাদের ব্যাচ। তুমি তো আমার কলেজেরই। নামটা যেন কী..
- শুভাশিষ মুখার্জি স্যার। 
- হ্যাঁ হ্যাঁ...তোমাদের বাড়িটা হল....
- পুরোনো পোস্ট অফিস পাড়ায়। `প্রিয় কুটির` স্যার।
- ঠিক ঠিক....তাহলে ওই কথাই রইল। কাল চলে এসো। 

দুজনেই বেরিয়ে এলাম স্যারের বাড়ি থেকে। ছেলেটি হাত বাড়িয়ে দিল,
- আমি শুভাশিস। তুই?
- শৌভিক। 
- কোন কলেজ তোর?
- দিনহাটা। 
- ওখানেই বাড়ি তোর?
- হ্যাঁ ওখানেও আছে। 
- আরও আছে নাকি? বাড়ি?
- ফালাকাটায় আছে। 
- ফালাকাটায়? ওখানে তো আমার পিসির বাড়ি। চিনবি তুই পিসেমশাইকে। 
- কে?
- হরচন্দ্র চক্রবর্তী। ফালাকাটা হাই স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার। 
- আচ্ছা!! তার মানে তুই টিঙ্কুদা আর রুবিদির ভাই?
- চিনিস  নাকি?
- চিনব না? হরকাকু তো আমার মাস্টারমশাই। আমাদের স্যার। 
- কাকু বললি যে?
- কাকুই বলি। আমার বাবাও ওই স্কুলে। হেডমাস্টার। 
- তাই নাকি? তাহলে তো তুই সেই ছেলেটা, যে রুবিদির বিয়েতে ছবি তুলেছিলিস? ক্যামেরাম্যান তো তুই ছিলিস !
- হ্যাঁ। আমিই। 
- চিনতেই পারিনি। 
- আমিও তো চিনিনি। 
- দারুণ হল। চল সিগারেট টানি। টানিস তো?
- হুমমম....

সাগর দিঘি খোলামেলা। সন্ধের মুখে বেশ লাগছে। অল্প কিছু মানুষ। ঢালু জমি নেমে গেছে জলে। 
- তোর ডাক নাম কী?
- শুভু, শুভ....যে যেটা বলে।  
- আমাকেও সবাই শুভ বলে। শুভাশিস থেকে শুভ। 
- আমিও তাই বলব। 
- দুজনেই শুভ। ভালোই হল। আর কিছু টানিস ?
চোখ মটকে শুভ বলল। ওর কাণ্ডে হেসে ফেললাম। 
- বুঝেছি বুঝেছি। আর বলতে হবে না। তুমি হলে বস। দেখেই চিনেছি। চলবে চলবে। তবে বস, তোমার মতো নম্বর আমি পাইনি। কোয়ালিফাইং মার্কস আমার।   
হৈ হৈ করে উঠল শুভ। বুঝে গেলাম তখনই ভালই হবে এখানে। 

দিন পনেরোর মধ্যেই মার্কশিট চলে এলো কলেজে। ফার্স্ট পেপারে দেখলাম ৪৫ এসেছে। মৌলিক স্যারের দুটো ব্যাচের মধ্যে বোধহয় আমারই সবচেয়ে বেশি নম্বর। ভাল তো অবশ্যই লাগছে। সব কিছু মিলিয়েই। 

একদিন সন্ধেয় হঠাৎ বাড়িতে দিনহাটার সকলের পরিচিত পরিচিত শিক্ষক শ্রদ্ধেয় দেবদাস মুখার্জি এলেন। সঙ্গে ওঁর মেয়ে। মাস্টারমশাইয়ের ছেলে দেবাশিস আমাদের সমসাময়িক। মেয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছে। বিষয় হিসেবে ইংরেজি আছে। কিছু ব্যাপার বুঝে নেবে। ভীষণ লজ্জায় পড়লাম। কেননা মাস্টারমশাই নিজেও ইংরেজির। উনি মেয়েকে আমার কাছে নিয়ে এসেছেন! নিঃসন্দেহে বিরাট প্রাপ্তি। উনি অকপট বললেন,
- আমি তো ভাবতেই পারিনি তুমি অনার্স পাবে। তোমাকে তো সারাদিন এদিক সেদিক ঘুরতে দেখি। তাও এমন সব ছেলেদের সঙ্গে, কী আর বলা! 

আমি নিজেই বা কী আর বলব। মাথা নিচু করে রইলাম। সত্যিই তো। ভুল তো বলেননি। 
- তুমি কি জানো যে, তোমার মা লীলাদি, আমার মেয়ের মা, মানে আমার মিসেসের দিদিমণি?
এটা জানতাম। দিনহাটার বিখ্যাত চ্যাটার্জি বাড়ির মেয়ে উনি। সুমিতা ওঁর নাম। 
- যাহোক, দেখাও ওকে একটু। 

কলেজে গিয়েও একই অবস্থার মধ্যে পড়লাম। পরের ব্যাচের অনেকেই এটা-সেটা বুঝে নিতে শুরু করল। 

গত দুই বছরের সব উপেক্ষা মুছে গেল যেন। একদমই সিঁটিয়ে ছিলাম। আমাদের ফালাকাটার বিখ্যাত চারমূর্তির দুজন পুটন আর বাপি এর মধ্যে পালা করে ফালাকাটা কলেজের জি এস হয়েছে। প্রণব পড়ার পাশাপাশি নাটক, গান চালিয়ে গেছে। আমিই শুধু একটু একটু করে ঢুকে গেছি আরও অন্ধকারের মধ্যে। একটা ছোট্ট মুহূর্ত টুকরো টুকরো করে দিয়েছিল সব। উচ্চ মাধ্যমিকের ওই রেজাল্টের পরেও সামলে উঠবার চেষ্টা করেছিলাম। নিয়েও ছিলাম সামলে। কিন্তু হঠাৎই সব অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। পায়ের তলা থেকে মাটি কেড়ে নিয়েছিল কেউ। 

এখন এই আলো ভাল লাগলেও, বুঝতে পারছি আর একটা যাত্রা শুরু হল। যদিও জীবন মানেই বৃত্তপথ, তবু চলতে তো হবে..... এলিয়টের মতো বিশ্বাস করতে শুরু করেছি In my beginning is my end..... কিন্তু সেই `end`-কে পেতেও প্রয়োজন আর একটা `beginning`  


(ক্রমশ)

* ছবি- দাঁড়িয়ে ডান দিকে পুটন (ও আজ আমাদের মধ্যে সশরীরে নেই, কিন্তু জানি সবসময় আছে), বাঁয়ে বাপি। বসে আমি। আমাদের চারমূর্তির আর একজন প্রণব এই ছবিতে নেই। ছবি নেই ঋত্বিক, শৈবাল, কমল, অনুপ, বিনোদ, রানা, অরুণ, দেবল, রাজা, রণজিৎ...কারও সঙ্গেই। কিন্তু সবাই রয়েছে নিজের হয়ে। ফালাকাটার এক স্টুডিওতে আড্ডার ফাঁকে আমাদের অজান্তেই ছবিটি তুলেছিল প্রসাদ।          
    

   

      

           

       

No comments: