Saturday, August 30, 2025


 

কলেজ দিনের বালক- ১৬ 
শৌভিক রায় 

মৌলিক স্যারকে শেষ পর্যন্ত বলে বসলাম,
- স্যার....নভেল পেপারের নোটস আমাদের প্রয়োজন নেই। সময় তো এমনিতেই কম আর আপনিও বলেছিলেন, যে নোটসগুলি প্রয়োজন সেগুলিই দেবেন। ওই পেপারটা লাগবে না। 

চুপচাপ শুনলেন মৌলিকবাবু। মুখে কিছু বললেন না।

এপ্রিল মাস। একটু গরম পড়েছে। স্যার বাড়ির ভেতর গেলেন। মিষ্টির প্লেট নিয়ে ফিরলেন। পয়লা বৈশাখ গেছে কয়েকদিন আগেই। অনেকগুলি মিষ্টি। আমার আর শুভর এমনিতেই খিদে পায়। পড়ার পরে কোনও দিন কোর্ট মোড়ে, কোনও দিন বাজারের ভেতরে মরু ঘোষের মিষ্টির দোকানে চা-সিঙাড়া খাই। তাই প্লেটে সাজানো মিষ্টি উড়ে যেতে সময় লাগল না।

বুক থেকে পাথর নেমে গেল। একটা পেপারের নোটস লাগবে না। এটা স্যারকে বলা খুব চাপের ছিল। সেদিন সবাই আমার ওপর জোর করেই চাপিয়ে দিয়েছিল। আমাকেই বলতে হবে। বলতে পারব কি পারব না করতে করতে, শেষ অবধি বলে ফেলেছি। ফলে চাপ কমে গেছে। আর সব চাইতে বড় হল, স্যার মেনেও নিয়েছেন। কিছু বলেননি। 

যেভাবে পড়া এগোচ্ছে তাতে আমার নিজের খুব একটা লাভ হয়ত হচ্ছে না। কিন্তু অনার্সের ফাইনাল ইয়ারে এই গাইডেন্স ছাড়া এগোনোও সম্ভব নয়। নিজের মতো বিভিন্ন বই দেখছি, যতটা পারি। কিন্তু তাই বলে দিনহাটার আড্ডা বন্ধ নেই। হলের মাঠে প্রতিদিনই রাতে অনেকটা সময় থাকি। রাতে ভাত খাওয়ার পর থানার মাঠে কিংবা মসজিদের সামনে বসে থাকি। 

মসজিদের সামনে একটা বিরাট শিরীষ গাছ রয়েছে। বিকেল থেকে সেখানে এক বয়স্ক দরবেশ গাছের ডালপালা-তাবিজ কবজ বিক্রি করেন। ইদানিং মসজিদের উল্টোদিকে সন্তোষী মা মন্দিরটি আগের তুলনায় আরও একটু ঝকমকে হচ্ছে। মসজিদেও সেই ছোটবেলার চোখা চোখা ঘাসগুলো চোখে পড়ে না। ওখানে ফুটবল খেলতাম এক সময় মধু আর আমি। আমাদের ছোট নরম পায়ে ওই ঘাসগুলো তখন খুব ব্যথা দিত। কলেজের প্রায় শেষে এসে বুঝতে পারছি ওই ব্যথাটায় ভাল লাগা ছিল। মসজিদটাও বদলে যাচ্ছে। এমনিতে এই মসজিদের একটা নিজস্ব স্থাপত্য আছে। এটা যে বেশ পুরোনো, সেটা দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু মনে হচ্ছে, তার বদল ঘটবে। 

রাত পাহারা বন্ধ হয়ে গেছে। দিনহাটার কুখ্যাত দুই ডাকাত ইতিমধ্যে ধরা পড়েছে। ক্ষিপ্ত জনতার প্রহারে তারা আর বাঁচতে পারেনি। অবস্থা এতটাই চরমে উঠেছিল যে, শেষ অবধি পুলিশকে লাঠি চালাতে হয়। অনেক সাধারণ মানুষ আহত হন। 

এদের মধ্যে আমাদের ফটাকাকাও রয়েছে। যথেষ্ট আহত হয়ে ফটাকাকা হসপিটালে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু অদম্য স্পিরিট ফটাকাকার। হসপিটালে ম্যানেজ করে প্রতিদিন বাড়ি এসে স্নান-খাওয়া সেরে যাচ্ছে। একদিন জিজ্ঞাসা করলাম, 
- তুমি না অসুস্থ? তাও এভাবে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে আসছো?
- ধু-ধু-ধু-ধুর.....নো-নোংরা! তাই না-নার্সকে বলছি দি-দিদি বাড়ি থে-থেকে স্না-স্নান করে এসে আ-আবার শু-শুয়ে থাকব। বা-বাড়ি তো কা-কাছেই।..
 
নার্স মহিলা নিশ্চয়ই এরকম পেশেন্ট আগে দেখেননি। কী আর বলবেন। ছাড় দিয়েছেন। অতএব ফটাকাকা, হসপিটালের পেশেন্ট, বাড়িতে স্নান-খাওয়া সেরে এখন ধূমপান সেরে, আবার চলছে হসপিটালে রুগী হয়ে শুয়ে থাকতে। সাহস করে জিজ্ঞাসা করলাম,
- তোমাকে এত পেটালো কেন পুলিশ? অনেককেই তো মেরেছে। কিন্তু তোমার ইনজুরি সবচেয়ে বেশি। 
- পা-পালাই নাই তো। 
- মানে?
- পু-পুলিশ যখন মা-মারে তখন তো স-সবাই পা-পালাইচে। আ-আমি পা-পালাই না-নাই। যে পু-পুলিশটা মা-মারছিল তাকে বলছি মা-মারবেন, মা-মারেন। দে-দেখি কত শ-শক্তি আপনার। মা-মারছে রে শু-শুভু...ম-মনের সু-সুখে মা-মারছে....

হাসবো না কাঁদব বুঝে পেলাম না ফটাকাকার এই কাণ্ডে। যাহোক, বিড়ি টেনে ফটাকাকা চলে যাওয়া মাত্রই জীবনদা মুখ খুলল,
- ওরে মারবে না? মারবে তো! যে পুলিশটা মারসে ওরে, ওইটাও তোতলা। আর ফটা বলসে, সিভিল ড্রেসে থাকলে নাকি লোকটাকে দেইখে নিবে। তুই কি ভাবস এর পরেও পুলিশ ওরে পিটাবে না?

সব মিলিয়ে আনন্দেই আছি। এই মাসের আর কয়েকদিন বাকি। সামনের মাস থেকে ফিলোলোজি শুরু। একেবারেই নতুন বিষয়। তবে এটা হলেই আমাদের পড়া শেষ হয়ে যাবে। ইতিমধ্যে গৌরাঙ্গর কাছ থেকে পাওয়া নভেল পেপারের নোটস সবাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে লিখে নিয়েছি। 

পড়া শুরু করলেন স্যার। খানিকটা এগিয়ে হঠাৎ থেমে গেলেন,
- শোনো, আমার শরীরটা বিশেষ ভাল নেই। তাই তোমাদেরকে আর বেশিদিন পড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। আর দুদিন তোমাদের দেখাবো। নোটস দেব। সামনের মাস থেকে তোমাদের আর আসবার প্রয়োজন নেই। 

থমকে গেলাম সবাই। নিজেদের কানকে বিশ্বাস হচ্ছে না। এটা কী বলছেন স্যার? একটা পেপার পুরো বাকি। কিছুই জানি না সেটা নিয়ে। স্যার আর পড়াবেন না বলছেন। কাতরে উঠলো শুভ,
- স্যার ফিলোলোজি! ওটা তো বাকি। 
- হ্যাঁ জানি। ওটা নিজেরা দেখে নাও। ওখানে তো ষাট মার্কস। এই পেপারে চল্লিশ মার্কসের  একটা `এসে` লিখতে হবে। সেটা নিজেরা পারবে। আর ওই কবিতার স্ক্যান ইত্যাদি সেটাও পারবে আশা করছি। 
- কিন্তু স্যার...
- কোনও কিন্তু নেই। এটাই আমার ফাইনাল কথা। 

কোনও মতে সেদিনের পড়া শেষ হল। বাইরে বেরিয়ে সাহিত্য সভার কাছে এসে হঠাৎ কেঁদে ফেলল শুভ। সবাই চুপ। কী বলবে কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। আমাদের নভেল পেপার নোটস না নেওয়ার সিদ্ধান্ত স্যার যে ভালভাবে নেননি সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছি এখন। কিন্তু কিছু করার নেই। তীর ছুটে গেছে। সেটাকে ফিরিয়ে আনা আর সম্ভব নয়। গৌরাঙ্গ বিড়বিড় করছে,
- আমার জন্য। আমার জন্য। সবাই বিপদে পড়ে গেলাম। 
অরিন্দম আর মুকুল কোনও কথা বলছে না। কিন্তু মুখ দেখেই মনে হচ্ছে ভয় পেয়েছে মারাত্মক। 

মাথা ঠাণ্ডা রেখে বললাম, 
- চল আমার সঙ্গে। 
- কোথায়?
- চল না!

মদনমোহন মন্দিরের সামনের খোলা বাগানে বসলাম। সন্ধে হবে হবে। মন্দিরের সামনের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলছে। ফাঁকা ফাঁকা চারদিক। 
- শোন। অযথা ভেবে লাভ নেই। স্যার আর করাবেন না। সেটা পরিষ্কার। কিন্তু আমাদের তো পাস করতে হবে। অনার্স পেতে হবে। 
- কী বলতে চাইছিস?
- নিজেরা পড়ব। 
- মানে?
- মানে নিজেরা পড়ব।  তুই আমাকে পড়াবি, আমি তোকে। পাঁচজনে মিলে ওই পেপারটা পড়ব। পারব না, সেটা হতে পারে না। 
- আমরা পারব? একেবারে নতুন যে!
- অনার্স যখন প্রথম শুরু করি, তখন সব নতুন ছিল না?
- ছিল। 
- পারিসনি? পার্ট ওয়ান পাস করিসনি?
- করেছি। 
- তাহলে এটাও পারব। পারতে হবে। হবেই। 

বৈরাগী দিঘির জল থেকে রাস্তার আলোর রিফ্লেকশন আমাদের মুখের মধ্যে পড়ছে। অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকা মুখগুলো দেখে এই কথাগুলো বলে ফেলেছি ঠিকই, কিন্তু নিজেও জানি না আদৌ পারব কিনা। 

কিন্তু না হারার আগে, হার মানব না। গত আড়াই-তিন বছরে জীবন এটুকু অন্তত আমাকে শিখিয়েছে। 

নিজেকে স্যাটানের মতো লাগছে। স্বর্গ থেকে বিতাড়িত। প্রবল যন্ত্রণা হচ্ছে। কিন্তু তবু মাথা তুলতে হবে। বজ্রের মতো প্রবল শক্তিশালী অস্ত্র আমাদের নেই। কিন্তু আছে ইচ্ছাশক্তি। পার্ট ওয়ানের রেজাল্ট সেই শক্তিকে অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। এবার সামনে আরও বড় বাধা। কিন্তু বিরুদ্ধ পরিবেশ যত প্রবল হবে, তাকেও ততটা কঠিন প্রত্যাঘাত সইতে হবে। সেই কাঠিন্যেই নিজেকে তৈরি করছি এবার....   

(ক্রমশ) 

* ছবি- পারিবারিক অ্যালব্যামে রাখা এই ছবিটিতে কারা দাঁড়িয়ে আছেন সেটা জানা নেই। দীর্ঘদিন থেকে ছবিটি রয়েছে আমাদের কাছে। এর আগে দিনহাটা গার্লস স্কুলের একটি পুরোনো ছবি পোস্ট করেছিলাম। সেটিতে জলছাপ না রাখলেও, এটায় রাখছি। 






 

        
  

           

       

 

 

 

       

    








           

No comments: