Thursday, July 31, 2025


 

কলেজ দিনের বালক- ৫ 
শৌভিক রায় 

প্রত্যেকটি শহরের একটা নিজস্ব গন্ধ থাকে। আবার শহরের ভেতর এক একটি জায়গায় এক এক ধরণের গন্ধ।

দিনহাটার মহামায়াপাটের গেলে তেল-ডাল-নুন-চিনি-চাল সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত গন্ধ পাওয়া যেত। অনেকটা কোচবিহারের মীনাকুমারী চৌপথি এলাকার মতো। আবার সাহেবগঞ্জ রোডের লেভেল ক্রসিং আসবার আগে, বাঁ দিকে যে রাস্তাটা বলরামপুর রোডে গিয়ে মিশেছে, সেই রাস্তায় পাটের গন্ধ লেগে থাকত সবসময়। এই রাস্তার ওপর থাকা ভিডিও হলটি বেশ রমরম করে চলে। রাজ্যের ভিড় দুপুর থেকে। তামাকের গন্ধ পেতাম চওড়াহাট পেরিয়ে আর ঝুড়িপাড়ায়। 

এই গন্ধগুলোর সঙ্গে মিশে থাকত আমার খুব ছোটবেলা। তখন কাবলিকাকু আমাকে তাঁর `ফুল চেন কাভার` সাইকেলে চাপিয়ে সারা দিনহাটা ঘুরে বেড়াতেন। তখন অনেকেই জানত আমি কাবলিকাকুর ছেলে। কাবলিকাকু মানে মির্জা খান। আফগানিস্থানের মানুষ। ওঁরা কয়েকজন মিলে দিনহাটায় ব্যবসা করতেন। তাঁদের ডেরা ছিল আমাদের বাড়ির উল্টোদিকেই। কাবলিকাকু দিনহাটার এক মহিলাকে বিয়েও করেছিলেন। তাই কাবলিওয়ালার বাঙালি বৌ বললে আমি আজও ওই মহিলাকেই বুঝি। ওঁকে দেশে নিয়ে গিয়েছিলেন কাবলিকাকু।   

সন্ধেবেলায় আর ছুটির দিনে দিনহাটায় এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াই আর কাবলিকাকুর কথা মনে পড়ে। এই রাস্তা দিয়ে কাবলিকাকু নিয়ে যেতেন, ওই রাস্তায় শর্টকাট করতেন। কখনও দাঁড়িয়ে পড়ি প্রপন্ন আশ্রমের সামনে। মনে পড়ে এখানেই প্রথম ভর্তি হয়েছিলাম। অনুপকাকু নিয়ে আসতেন স্কুলে। অনুপকাকু এই মুহূর্তে আমার যে ছোটকাকু অর্থাৎ সুদীপকাকুর বন্ধু। আসলে আশুকাকু ছিলেন আমার সবচেয়ে ছোট কাকু। ভাল খেলোয়াড় ছিলেন। ফুটবলে হেড করতে গিয়ে আঘাত পান মাথায়। মাত্র তিনদিনের জ্বরে চলে যান। ওঁর মৃত্যু আমাকে এতটাই আঘাত দিয়েছিল যে, ক্লাস থ্রি-তে দিনহাটা ছেড়ে, মা কে ছেড়ে, চলে গিয়েছিলাম বাবার কাছে ফালাকাটায়। 

কিন্তু চাইলেই কি আর ছেড়ে যাওয়া যায়? বোধহয় না। আসলে পুরো জীবনটাই বৃত্তপথ। যেখানে শুরু, সেখানেই শেষ। অথবা শুরু থেকে শুরু করে ফিরে আসা শুরুতেই। ইংরেজি সাহিত্যের আধুনিক যুগের মহাকবি এলিয়টের কথা ধার করে বলছি।   

পিসতুতো ভাই বাপ্পার দৌলতে মদনমোহন পাড়ার তাপসের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে। ঝকঝকে ছেলে। আগে থেকেই তপন কর্মকার আর নির্মাল্য ঘোষকে চিনতাম। এছাড়াও নায়কের মতো চেহারার সঞ্জয় মুখার্জি, প্রলয় কুণ্ডু, বিপুল আচার্য, বিপ্লব (টাইটেল ভুলে গেছি) ভাল বন্ধু হয়ে গেল। তবে সবচেয়ে বেশি ভাব জমে গেল সুদর্শন সোমুর সঙ্গে। কোচবিহারের সোমু দিনহাটার বিখ্যাত দোকান রকমারির সাহা পরিবারের কী যেন হত। দুজনেই একসঙ্গে কলেজ যাতায়াত করতাম। কখনও সঙ্গী হত সোনা। 

সোনা ডঃ আশিষ চক্রবর্তীর বাড়ির মেয়ে। ওদের একটি দোকান আছে। লক্ষ্মী ভান্ডার। পরিবারটি দিনহাটায় বেশ পরিচিত। ডঃ চক্রবর্তী নামী মানুষ। প্রচুর রুগী তাঁর। ওঁর একমাত্র মেয়ে রাখু আমাদের একটু বড় ছিল। ওই পরিবারেরই আর এক মানুষ ছিলেন বীরু দাদু। দিনহাটা গার্লস স্কুলের অফিসিয়াল কাজকর্ম সামলে, উনি এখন অবসর জীবনে। সোনার বন্ধু মৌসুমী, পপি, মাধবীরা আমার আর সোমুর বন্ধু হয়ে গেল। সোনাদের ঠিক পাশেই একাদশী ভান্ডার। সেই বাড়ির ছেলেরা আমাদের দাদা। মেয়েরা দিদি বা বোন। ওই বাড়ির বুড়ি হল আমার দিদি-বোন-বন্ধু-অভিভাবক।       

কলেজে যাই। আসি। ক্লাস করি। ইংরেজি অনার্সের সঙ্গে পাস সাবজেক্ট হিসেবে ইকোনোমিক্স আর পলিটিক্যাল সায়েন্স শুনে অনেকে অবাক হয়। আমার কিন্তু দিব্যি লাগে এই দুটো বিষয়। কলেজে স্থায়ী অধ্যক্ষ নেই। পালা করে অন্য অধ্যাপকেরা কাজ চালাচ্ছেন। এই মুহূর্তে অধ্যাপক কৃষ্ণচন্দ্র চ্যাটার্জি (কে সি সি) কলেজের দায়িত্বে। ওঁর কেন জানি না ধারণা হল, আমি ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র। সুতরাং বাংলায় লেকচার দিয়ে আমার জন্য সেটা আবার ইংরেজিতে তর্জমা করেন। স্যারকে বলতে যাব যে, সেটার দরকার নেই, দেখি দুই মাড়োয়ারি সহপাঠিনী ইশারা করছে আমার দিকে তাকিয়ে। আসলে ওরা বাংলায় সড়গড় নয়। ইংরেজি খানিকটা বোঝে। প্রতিদিন ক্লাস শেষ হয়ে গেলে ওদেরকে স্যারের ক্লাসটা হিন্দি-বাংলা-ইংরেজিতে বুঝিয়ে দিতে হত। তবে শুধু কেসিসি স্যারের নয়, সব স্যারেরই।  

অধ্যাপক প্রণব কুমার সমাজদার (পি কে এস) অত্যন্ত জনপ্রিয়। ওঁর পড়ানো এতটাই ভাল যে, বিকেল চারটে অবধি বসে থাকতেও কষ্ট হয় না। স্যার নিতাই চক্রবর্তী আমেরিকা থেকে পি এইচ ডি করে এসেছিলেন। অমিতাভ বচ্চনের মতো লম্বা, ব্যারিটোন গলা। ওঁর ব্যক্তিত্ব ভীষণ আকর্ষণীয়। সম্ভবত ওঁর স্ত্রী কোনও একসময় ফালাকাটা কলেজে লাইব্রেরিয়ান ছিলেন। আর ওঁর দিদি ছিলেন ফালাকাটা হাই স্কুলের শিক্ষক দীপক ব্যানার্জির স্ত্রী ভক্তিকাকিমা। উনি কীভাবে যেন চিনে ফেললেন আমাকে। কাজেই ওঁর ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার উপায় ছিল না। 

ফাঁকি দিতে পারিনি অধ্যাপক জীবনেশ্বর মিশ্রর ক্লাসও। এমন কি লাস্ট বেঞ্চে বসারও উপায় ছিল না। ওঁর শ্যেন চক্ষু ঠিক খুঁজে নিত কোথায় আছি। কোনও প্রশ্নের উত্তর না দিলে খেঁকিয়ে উঠতেন। কেন জানি ওঁর ধারণা ছিল আমি জানি। কিন্তু বলছি না। অস্বীকার করব না, আগে থেকে পড়ে ফেলেছিলাম বলে উত্তরগুলো জানতাম। কিন্তু কলেজের ক্লাসে, কোন ছাত্র কবে বাচ্চাদের মতো উত্তর দেয়! কিন্তু স্যারের ক্লাসে সেটি হওয়ার জো নেই। কুঁকড়ে থাকতাম। তাপস অবশ্য ঠেলে গুঁতিয়ে আগে বসিয়ে দিত আমাকে। নিজেও বসত। কেননা স্যারের ছেলে বিজয় আমাদের সহপাঠী ও ভাল বন্ধু। আমরা যদি ঝামেলা করি ও সমস্যায় পর্বে। বিজয় অত্যন্ত ভদ্র ও নরম ছেলে। ও মাঝেমাঝে আমাদের নিয়ে যায় ওদের কোয়ার্টার্সে। ঘরে স্যার থাকলে এত আদর করেন যে বলার নয়। বুঝলাম, ওঁর বাইরেটা আসলে খোলস। ভেতরটা স্নেহের ফল্গুধারা। 

এই কোয়ার্টার্সে ছোটবেলায় বহুবার এসেছি। অনিলকাকু তখন এখানেই থাকতেন। কোয়ার্টার্সের সামনে ছোট্ট পুকুর। টলটল করছে জল। মিষ্টি হাওয়ায় সন্ধে থেকে রাত সত্যিই শীতল। 

মানি বাদেও দিনহাটা গার্লস স্কুলের মায়ের পুরোনো সহকর্মীদের অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়। ঝর্ণা মাসি তাঁদের মধ্যে একজন। মাসির ছেলে রাজাদা সেই সময় কল্যাণীতে। রাজাদের বোন রিঙ্কু কলেজে আমার এক ব্যাচ আগে। ছোটবেলায় রিঙ্কুর সঙ্গে খুব ভাব ছিল। একবার দিনহাটা গার্লস স্কুলে ও আর আমি জানালার কাছে খেলছিলাম। জানালা গলে কীভাবে যেন রিঙ্কু পড়ে গেল। হাত ভেঙে গেল। এখন বড় হয়ে যাওয়ার পর কিছুটা দূরত্ব এসেছে। কিন্তু দেখা হলেই কথা হয়। রিঙ্কুর বাবা অধ্যাপক হিতেন নাগ বাংলার শিক্ষক। সুলেখক। অত্যন্ত পরিচিত নাম।  তাঁকে স্যার বলব না মেসো বলব এই ঝামেলায় পড়ে সামনেই যাই না। দেখলেই পালাই। উনি সম্ভবত সেটা বোঝেন। আমাকে পালাতে দেখলেই মিটিমিটি হাসেন। মায়ের অন্য সহকর্মীদের মধ্যে ইলা মাসি, গৌরী মাসির সঙ্গে দেখা হয় মাঝে মাঝে। পণ্ডিত দাদু কিছুদিন আগেই গত হয়েছেন। প্রতিমা মাসির বাড়িতেও যাই। মাসির মেয়ে সুমনদি খানিকটা বড়। ছেলে অভি এক-দুই ক্লাস নিচে পড়ছে। বেলা মাসির সঙ্গেও দেখা হয়েছে এক-দুইবার। উনি অবশ্য এখন অধিকাংশ সময় কলকাতায় থাকেন। তবে দেখা হলেই মাসি ছোটবেলার মতোই আদর করেন। যেন আমি এখনও সেই ছোট্ট বাচ্চাটি রয়েছি।   

এর মধ্যে রীনা আবার আর একদিন খেপে গেল। সেই বই নিয়ে ওর রাগ কমবার পর, একটু আধটু কথা বলছিল। কিন্তু আবার গন্ডগোল করেছি। সেদিন ওর নীল টিপ, নীল ব্লাউজ, নীল শাড়ি দেখে বলেছি `চটিটাও নীল পরলে পারতিস`। এতেই খেপেছে। কলেজে বুক খোলা পাঞ্জাবি আর জিনস পরে আসা ফালাকাটার ছেলেটা মহা বদমাশ....এটাই বলছে সবাইকে। তার ওপর কেউ একজন খবর দিয়েছে ছেলেটা ভাল নয়। সিগারেটের নেশাও তো আছেই, রহস্য আছে আরও কিছু। প্রায়ই শ্মশানে যায়। এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। হয়ত নেশাটেশা করে.....

(ক্রমশ)      

*   ছবি- 
সামনে বসে বাঁ দিক থেকে দ্বিতীয় বেলামসি, ডাইনে প্রতিমা মাসি ও মা....
মাঝে দাঁড়িয়ে বাঁ দিক থেকে দ্বিতীয় ইলামসি, একদম ডাইনে ঝর্ণা (বর্ধন) মাসি 
পেছনে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় পণ্ডিতদাদু ও একদম ডাইনে বীরুদাদু 
বাকিদের কথা মনে নেই অথবা দেখিনি     



           



Tuesday, July 29, 2025


 

কলেজ দিনের বালক- ৪
শৌভিক রায় 

কোচবিহার শহরে প্রবেশের মুখে ঘুঘুমারির রেলব্রিজ সেই সময়ের এক বিভীষিকা। 

তখনও পুন্ডিবাড়ি ফালাকাটা সড়ক তৈরি হয়নি। সোনাপুর দিয়ে শিলবাড়ীহাট বা পলাশবাড়ি হয়ে ফালাকাটা যাওয়া যায়। কিন্তু সেটি কেবল শীতকালে। পুজোর পর পর কাঠের ফেয়ার ওয়েদার ব্রিজ তৈরি হয়। বর্ষায় খুলে ফেলা হয়। একসময় এই রাস্তাটিই জাতীয় সড়ক ছিল। অস্থায়ী কাঠের ব্রিজের পাশে ভেঙে যাওয়া পুরোনো ব্রিজের বিরাট বিরাট থামগুলি দেখা যেত। আশির দশকের শুরুতেও একটি পিলারে জ্বলজ্বল করত `প্রমোদ জ্যোতি মাতব্বর/ আপেল পেঁয়াজ এক দর` লেখাটি।  

শীতের সময়টুকু বাদে কোচবিহার থেকে সব গাড়িকেই ঘুঘুমারির রেলব্রিজ পার করতে হত। ফালাকাটা-শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ির বাস নিশিগঞ্জ-হিন্দুস্থান মোড় হয়ে চলে যেত। আর দিনহাটা যেতে তো আজও ঘুঘুমারি পার করতে হয়। ট্রেনও চলত এই ব্রিজের ওপর দিয়ে। ট্রেন এলে দুদিকের গেট বন্ধ করে দেওয়া হত। ফলে, দুদিকেই গাড়ি সার দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ত। অবধারিত ছিল জ্যামজট। সোনায় সোহাগার মতো কখনও ব্রিজের ওপর কোনও গাড়ি নষ্ট হয়ে যেত। তারপর যে জ্যাম শুরু হত, সেটি যারা দেখেনি তারা বুঝবে না। বাস, ট্রাক, টেম্পো, রিকশা, ঠেলা, ট্রেন ইত্যাদি সব মিলিয়ে সে এক নরক গুলজার দশা! ওই সময় বহুদিন বিয়ে করতে যাওয়া টোপর মাথার বরকে হেঁটে ব্রিজ পার করতে দেখেছি। ওপারে হয়ত পাত্রীপক্ষ অন্য গাড়ি নিয়ে দুরুদুরু বুকে  অপেক্ষা করছেন। লগ্ন না পেরিয়ে যায়! সবচেয়ে অসুবিধে হত রুগীদের। বিকেলে কোচবিহার থেকে রওনা দিয়ে ২৪ কিমি দূরের দিনহাটায় পৌঁছতে অনেক সময় মাঝরাত হয়েছে এমন দৃষ্টান্তও কম নয়। উপায় না দেখে অনেক সময় পায়ে হেঁটে ব্রিজ পার করতে হয়েছে। একবার হরিণচওড়ার বাণী নিকেতন গার্লস হাই স্কুলের সামনা থেকে চার নম্বর অবধি হেঁটে ছিলাম। কিমির দূরত্বে মোটামুটি পাঁচ ছয় কিমি হবে সেই  রাস্তা।   

তবে অধ্যাপক অনিলবন্ধু দত্ত সকালে পড়াতেন বলে আমাদের খানিকটা সুবিধে ছিল। কেননা ওই সময় সেভাবে জ্যাম হত না। বাসের জানালার ধারে বসে তোর্ষার বাঁককে সকালের চিকচিকে আলোয় খাপ খোলা তলোয়ারের মতো লাগত। আরও অনেক ছোটবেলায় যখন দিনহাটা-ফালাকাটা করতাম, তখন চাকির মোরের কাছাকাছি কোনও এক বাড়ির কালো দেওয়ালে সাদা কালিতে `অপরাজিতা গোপ্পীকে জয়যুক্ত করুন` লেখা দেখে বুঝতাম, কোচবিহার এসে গেছে। চাকির মোড় পার করে খানিকটা এগিয়ে ভাওয়াল মোড়ের কাছে পাশাপাশি `রায় ভিলা` আর `ভৌমিক লজ` বাড়ি দুটি দেখে মনে হত, এবার শহর শুরু হচ্ছে। যখন নিয়মিত পড়তে আসছি, তখন শহরের কিছুটা বিস্তৃতি হলেও টিনের চালের একতলা, বড়জোর দোতালা বাড়ির সংখ্যাই বেশি। যে কোনও জায়গার থেকে রাজবাড়ির উঁচু গম্বুজ দেখা যায়। ছোটবেলায় দেখা সেই ভিস্তিওয়ালারা শহরের পথগুলিতে জল না দিলেও, নিয়মিত ঝাঁট পড়ে সকালে। পরিচ্ছন্ন শহর। নোংরা কম। সাগর দিঘির পরিবেশ একদম প্রাকৃতিক। মদনমোহন মন্দিরও তাই। আধুনিকতার খানিকটা হাওয়া গায়ে  মেখেও, কোচবিহারের মধ্যে তখনও অনেকটা পুরোনো ব্যাপার রয়ে গেছে। 

স্যারের পড়ানোটা একদম অন্যরকম ছিল। গতানুগতিক নোটস দিতেন না। বরং একগাদা বই দিয়ে দিতেন। পড়তে বলতেন। যে জায়গাগুলো ভাল লাগছে বা গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে, সেগুলি লিখে রাখতে বলতেন। ঘরে টেবিল চেয়ার থাকলেও, মাদুর বিছিয়ে দিতেন বই দেখবার সুবিধে হবে বলে। এভাবে পড়ানোতে সবচেয়ে সুবিধে হল আমার। ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসের বই হিসেবে আলব্যার্ট, লং, ডেভিড ডেচিস, আইফোর ইভান্স প্রমুখদের বইগুলি পড়ে ফেললাম দ্রুত। মেটাফিজিক্যাল কবিদের বুঝতে একগাদা রেফারেন্স বই দিলেন কাকু। সেগুলি পড়তে পড়তে আর ব্যাখ্যা জানতে জানতে মনে হল, এতদিন কিছুই পড়িনি। মিল্টনের `প্যারাডাইস লস্ট` পড়াতে গিয়ে স্যার যখন আবৃত্তি করছেন `....better to reign in hell than serve in heaven`, তখন মনে হচ্ছে স্যাটান যেন আমার  কথাই বলছেন।  

শনিবার আর রবিবার পড়া। শনিবার কলেজের চাপ কম। রবিবার তো ছুটিই। সুতরাং অধ্যয়ন চলতে লাগল। কোনও শনিবার বেলা বারোটা, কোনও দিন একটা বাজত। মাঝে মাঝে গীতা কাকিমা জোর করে খাইয়ে দিতেন। তুতুনদি ইউনিভার্সিটি থেকে এলে গল্প জমে যেত দুজনের। বুবুনের সঙ্গে অবশ্য সেভাবে দেখা হত না। এক-দুদিন খাওয়া আর প্রতিদিন খাওয়া এক নয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই সেটা সম্ভব ছিল না। কিন্তু কাকিমা সেটা শুনবেন কেন! ফলে যাতে কাকিমার মুখোমুখি না হতে হয়, সেজন্য চুপচাপ পালাতাম। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করত। মানিক মুখ দেখেই বুঝে নিত সেটা। মানিক ছিল মিনিবাসের কন্ডাকটার। আমাকে কেন জানি আলাদা চোখে দেখত। নিজের ভাগের খাবার অনেকদিন দিয়েছে মানিক। ড্রাইভার সাধনদা, ক্লিনার বৈরাগীদা, আর এক কন্ডাক্টার পার্থদা (পার্থদা অবশ্য দাদার সহপাঠী ছিল) সবাই ভীষণ ভালবাসত। তাই সেই সকালে বেরিয়ে ঘুঘুমারি ব্রিজে আটকে দিনহাটায় বাড়ি ফিরতে অনেকদিনই বিকেল হয়ে গেলেও, মালুম হত না কিছুই। 

ইলেকট্রিক টেবিল ল্যাম্পের আলোয় পড়তে বসতাম সন্ধ্যায়। সম্পূর্ণ ঘর অন্ধকার। আলো শুধু টেবিলে। চুপচাপ নিজের মতো দেখতাম। বুঝতে পারছিলাম, অনার্স মানে শুধু নোটস লিখে আসা নয়। কোনও প্রশ্নকে নিজের মতো ব্যাখ্যা করা। জোর দিচ্ছিলাম তাই শুধু পড়ায়। অবশ্য মাঝে মাঝে ভয় লাগত। আমার সহপাঠী বিষ্ণু, করুণা, স্বপন, মহামায়ারা পড়ছে অধ্যাপক অম্লানজ্যোতি মজুমদারের কাছে। অত্যন্ত নামী শিক্ষক তিনি। কোচবিহারের নামী মানুষ। উনি বিভিন্ন নোটস দিচ্ছেন। ওদের গল্পে সেই সব জানতাম। তুলনায় আমি যেন অনেকটা পিছিয়ে। কিছু রেফারেন্স বই পড়ছি। আমার সঙ্গে সাথী আর পাঞ্চালি পড়ছে। রীনাও আছে। সাথী একটু গম্ভীর। পাঞ্চালি বিবাহিতা। রীনার সঙ্গে কথা বলার চাইতে বন্ধই বেশি। কোনও কারণ লাগে না। ওর মর্জি। লেটেস্ট কারণ হল, অধ্যাপক সুশান্ত চক্রবর্তীর ক্লাসে ওর বইকে নিজের বলে চালিয়ে ক্রেডিট নিয়েছিলাম। এতেই মারাত্মক খেপে আছে। সুতরাং ওদের কী অবস্থা সেটা জানি না। কিন্তু অন্যদের দেখে ও কথাবার্তা শুনে আমার মনে হচ্ছে, আমি কিছুই জানি না। 

সত্যিই জানি না। সাহিত্যের যে জগত ধীরে ধীরে আমার সামনে উন্মোচিত হচ্ছে, তাতে নিজেকে ছোট্ট পিঁপড়ে ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না। চারদিক থেকে তাই হতাশা ঘিরে ধরছে কেবল। এইরকমই এক দিনে ফালাকাটা থেকে একটা ইনল্যান্ড লেটার এলো। অত্যন্ত চেনা হাতের লেখা। চিঠিটা পড়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। চুরমার হয়ে গেল সব কিছু। এই একটা জায়গা ছিল, যেখানে নিজের সব কিছু দিয়ে দিতে পারতাম। অত্যন্ত ভরসার ছিল সেই সেই হাত। কিন্তু কোনও এক অজানা কারণে সেই হাত গুটিয়ে নিল কেউ। কিন্তু কেন তা কিছুতেই জানতে পারলাম না। সম্পূর্ণ অন্ধকার নেমে এলো জীবনে। জন্মস্থান ফালাকাটা ক্রমশ এক দুঃস্বপ্নের জায়গায় বদলে গেল। 

বয়সে বড় আমার এক তুতো দাদা একদিন সিগারেট দিল। ইতস্তত করলাম। হাজার হলেও বড়। পিঠে চাপড় দিয়ে সেই দাদা বলল, `তোর সবটাই জানি। শান্তি দরকার তোর। সিগারেটটা টান। শুধু টানবার আগে মহাদেবকে মনে মনে প্রণাম কর।` ওর কথায় কী ছিল জানি না। ধরালাম সিগারেট। গরমের রাত। সাড়ে দশটার ওপর তখন। থানার দিঘির পাশে ছোট্ট মাঠে আমরা। জ্যোৎস্না রাত। বিরাট বট গাছটার ফাঁক দিয়ে চাঁদ দেখা যাচ্ছে। চারদিক সাদা রুপোর মতো আলোয় ভেসে যাচ্ছে। একটা সময় মনে হল, আমিও ভাসছি। কেউ কোত্থাও নেই। শান্ত নির্জন চারধার।  অদ্ভুত বিষণ্ণতা চুঁইয়ে পড়ছে আকাশ থেকে। কিন্তু বড্ড প্রশান্তি। বহুদিন পর যেন সব যন্ত্রণা শেষ। এক অসামান্য অপার্থিব জগতে যেন আমার বিচরণ। মনে হল শক্তি চট্টোপাধ্যায় যেন আমার পাশে বসে বলছেন, `বারবার নষ্ট হয়ে যাই প্রভু, তুমি আমাকে একবার পবিত্র করো.....`

সেদিন থেকে সত্যি এক নতুন দুনিয়ায় পা দিলাম। 

(ক্রমশ)





           


Saturday, July 26, 2025


 

কলেজ দিনের বালক- ৩
শৌভিক রায় 

আমাদের দিনহাটার বাড়ি এক চিড়িয়াখানা। অদ্ভুত কিসিমের মানুষদের বাস। মানে আমার কাকুদের কথা বলছি। বড়কাকু মাঝে মাঝেই গামছা হারিয়ে বড় কাকিমার ওপর হম্বিতম্বি করেন। অধিকাংশ সময়েই অবশ্য গামছাটা তাঁর কাঁধেই দেখা যায়। আঙ্কল পোজারের দিনহাটা সংস্করণ বলা যায় তাঁকে। মেজকাকু করিৎকর্মা মানুষ। রাজমিস্ত্রির পাশে দাঁড়িয়ে থেকে ঘর তৈরি করলেন। দরজার পাশেই জানালা। আলো-বাতাস বেশি করে ঢুকবে বলে মিস্ত্রির কথা উড়িয়ে দিয়ে জানালা বড় করলেন। শেষটায় দেখা গেল জানালার পাল্লা দিয়ে দরজা ঢেকে যাচ্ছে। সে এক কীর্তি। সেজকাকু শিল্পী মানুষ। নাট্যকার-অভিনেতা। কখন কোন কাণ্ড করবেন কোনও ঠিক নেই। ছোটকাকু কালী ভক্ত। ঘরে কালী মায়ের ছবি। সিঁদুর লাগানো। সামনে মড়ার খুলি। বিয়ে-থা করবেন না পণ করেছেন। এঁদের অত্যাচারে তিন কাকিমা আর ঠাকুমার অবস্থা খারাপ। এঁরা একমাত্র ভয় পায় নিজেদের বড়দা আর বৌদি অর্থাৎ আমার বাবা-মা`কে। 

আমাদের প্রতিবেশীরা আমাদেরই জ্ঞাতি। তাঁরাও কেউ কম যান না। এ বলে আমায় দেখ, তো অন্যজন বলে তাকে দেখতে। সব কিছু মিলিয়ে সারাদিন হই-হট্টগোল লেগেই আছে। ফালাকাটায় আমাদের পাড়াটি অত্যন্ত নির্জন। দূরে দূরে এক একটি বাড়ি। সন্ধের পর থেকে চারদিক চুপচাপ হয়ে যায়। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর বীরপাড়াগামী যানবাহনের আওয়াজ ছাড়া কিছুই শোনা যায় না। দিনহাটায় উল্টো। গায়ে গায়ে লাগানো বাড়ি। সবার কথা সবাই শুনছে। আমাদের জন্য বরাদ্দ দুটো ঘরের একটায় আমি থাকি। অন্যটায় ঠাকুমা। আমার ঘর থেকে হাত বাড়ালে পাশের বাড়ির জানালায় গিয়ে ঠেকে। পাশের বাড়িটি আবার বাবার মামাবাড়ি। আসলে স্বাধীনতার সময় সব আত্মীয়স্বজনেরা একসঙ্গে এসে এভাবেই পাশাপাশি বাড়ি করেছিলেন। অন্য পাশে যে বাড়িটি, সেটি আবার রেণুপিসির অর্থাৎ বাবার পিসতুতো বোনের। বোঝাই যাচ্ছে, সবাই জ্ঞাতি- দাদা, ভাই, কাকা, জ্যাঠা, মামা, পিসি, মাসি সম্পর্কে।

নিজের ঘর বলছি ঠিকই, আসলে ওটা বাবার ঘর। সুতরাং বাবা দিনহাটায় এলে আমি গৃহহারা। বিবাগী। আশ্রয় পিসির বাড়িতে। রেণুপিসির তিন ছেলে। তিনজনই আমার পরম বন্ধু। সম্পর্কে দাদা-ভাই হলেও, বন্ধুই বেশি। ওদের বাড়ির কোনও ঘরে বা মুদি দোকানে চাল-ডাল-তেল-নুনের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে রাতের ঘুম। গরমের রাতে  দেড়টা-দুটো অবধি বড় রাস্তায়  আড্ডা। বাড়িরই উল্টোদিকে মসজিদ। পাশেই দিনহাটা হাই স্কুল। স্কুলের উল্টোদিকে অর্থাৎ বাবার মামাবাড়ির পরেই থানা। পুলিশ কর্মীরা সবাই মুখ চেনা। সুতরাং আমাদের ভয় নেই। যতক্ষণ না ঘুম আসছে, আমাদের হ্যা হ্যা হি হি চলছেই।  

অনার্সের কিছু বই জোগাড় হয়েছে। তার মধ্যে দুটো দিয়েছেন মানি। মানি মানে শ্রীমতী সন্ধ্যা সাহা। দিনহাটা গার্লস হাই স্কুলের সহপ্রধান শিক্ষিকা। ইতিহাসের এম এ বি এড রাশভারী মানি বিয়ে করেননি। তাঁর আভিজাত্য ও গাম্ভীর্য এতটাই যে, সবাই তাঁকে ভয় পায়। মায়ের সহকর্মী ছিলেন বলে, আমাদের বাড়িতে তাঁর নিত্য যাতায়াত। বলতে গেলে অভিভাবক। আমার দাদা ও আমি মানির অত্যন্ত স্নেহের। আমার ছোটবেলার একটা ছবি ফ্রেম বাঁধানো অবস্থায় মানির শো-কেসে রাখা। সাহেবগঞ্জ রোডে মানির বাড়ি। একাই থাকেন। অবশ্য বাড়ির অন্য অংশে তাঁর পরিজনেরা রয়েছেন। কলেজ থেকে ফিরে আমাকে প্রত্যেকদিন মানির বাড়িতে হাজিরা দিতে হয়। কোনও দিন মানি লুচি খাওয়ান, কোনও দিন পাঁপড় ভেজে দেন। দীর্ঘদিন একমাত্র মানির হাতে তৈরিই নারকেল আর তিলের নাড়ু, চিড়ের মোয়া আর পায়েস খেতাম। এমনকি মা করলেও খেতাম না। এখন মাঝে মাঝে সেসবও জোটে। স্বভাব গম্ভীর মানি প্রতিদিন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব খোঁজ নেন। এটা সেটা বলে বকুনিও দেন। কিন্তু তাঁর স্নেহ ফল্গুধারার মতোই অন্তঃসলিলা। বুঝতে পারতাম সেটা। 

একটা সময় মানিকে নিয়ে ভীষণ অভিমান ছিল আমার। পালাতে চাইতাম মানির কাছ থেকে। প্রশ্ন ভিড় করত মনে। অনেক অপবাদে জর্জরিত হতে হতে নিজের ভাগ্যকে দোষ দিতাম। জানতে চাইতাম, আমি ঠিক কে। পরে বুঝেছি, সময়ের চাইতে এগিয়ে থাকলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমালোচনা শুনতে হয়। বিদ্ধ হতে হয় নানা ভাবে। কিছু সম্পর্ক থাকে যার কোনও নাম হয় না। তাছাড়াও এমন কিছু বিষয় থাকে, যা না জানাই ভাল। কেননা কোন সময়ে, কীসের পরিপ্রেক্ষিতে, কোন অবস্থায় কী ঘটে তা আমরা বুঝে উঠতে পারি না। সেজন্যই ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শীর্ণ চেহারার অতি প্রবীণ কেউ যখন, কোমায় চলে যাওয়া মরণাপন্ন একজন মানুষকে দেখে ধীর পায়ে বেরিয়ে আসেন নার্সিং হোম থেকে, আমার চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। ইচ্ছে হয় তাঁর হাত ধরে বলি- `আমি তো আছি!` কিন্তু পারি না। এক অদ্ভুত আড়ষ্ঠতা আটকে রাখে আমাকে। বারবার মনে হয়, অভিমান করার আমি কে! কতটা আমার যোগ্যতা?   

.....পাস সাবজেক্ট হিসেবে অর্থনীতি আর রাষ্ট্রবিজ্ঞান উল্টেপাল্টে বুঝলাম এমন কিছু কঠিন নয়। মাইক্রো আর ম্যাক্রো ইকোনমিকসের পাশাপাশি ভারতীয় অর্থনীতি খুব দ্রুত শেষ করা গেল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও তাই। কমবেশি সবটাই জানা। মোটামুটি বিগত বছর পাঁচেকের প্রশ্ন ঘেঁটে নিজের মতো সাজেশন তৈরি করে নোটস বানিয়ে ফেললাম। নিজের বই ছিল। লাইব্রেরি থেকে বই আর প্রশ্ন পেয়ে গেলাম। সীতাংশু কাকু (শ্রী সীতাংশু শেখর মুস্তাফি) সাহায্য করলেন। উনি নিজে কলেজের কর্মী। সেজকাকুর বন্ধু এবং দিনহাটা হাই স্কুলে খুব সম্ভবত বাবার ছাত্র ছিলেন। বাড়িও আমাদের বাড়ির পেছন দিকে গোধূলি বাজারে। নোটস তৈরি করায় একটা সুবিধে হল, আমার আর পাস সাবজেক্ট নিয়ে আলাদা করে কোনও টেনশন রইল না। আরও সুবিধে হল, রেণুপিসির মেজো ছেলে মধু আমার কাছে ইকোনোমিক্স বুঝতে শুরু করল। ও নিজে বি কম পড়ছে। কিন্তু পড়ে নিচ্ছে আমার কাছে। ওকে পড়ানোর ফলে নিজেরও পড়া হয়ে যাচ্ছে। ওর ছোট ভাই ভজন মাধ্যমিক দেবে। ওকে পড়াচ্ছি ইংরেজি।        

কিন্তু মাধ্যমিকের ইংরেজি এক আর অনার্সের আর এক। তার জন্য দরকার বিশেষ প্রশিক্ষণ। গুটিগুটি পায়ে গেলাম অনিলকাকুর কাছে। বললেন, তাঁর বাড়িতে পড়তে যেতে। সপ্তাহে দুইদিন। কোচবিহার ইন্দিরা দেবী গার্লস স্কুলের পাশের রাস্তায় গৌরী মহলের পেছনে এক বাড়িতে উনি থাকেন। সেখানেই পড়াবেন। সকাল সাতটা থেকে। 

দিনহাটা পাইওনিয়ার ক্লাবের কাছের বাসস্ট্যান্ড থেকে সকাল ছয়টায় বাস ধরলাম। দুই টাকা ভাড়া। যাতায়াতে চার টাকা। হাত খরচ এক টাকা। সপ্তাহে দুই দিন মানে মাসে আট দিন। পাঁচ আটে চল্লিশ টাকা। বাবা হিসেবে করে বড় কাকিমার হাতে টাকা দিয়েছেন। প্রথম দিন যখন বাড়ি থেকে বেরোলাম, ঠাকুমা ছাড়া কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি। ঠাকুমাকে রান্নাঘরে যেতে দেওয়া হয় না। একবার স্ট্রোকের পর ঠাকুমা একটু কেমন হয়েও গেছেন। সকালের চা বিস্কুট ছাড়া মিনি বাস ধরে চললাম কোচবিহার।  নামলাম কাছারি বা কোর্ট মোড়ে। ইন্দিরা দেবী স্কুল পেরিয়ে বাঁ দিকে দেখি একটা চায়ের স্টল। চল্লিশ পয়সায় চা আর দশ পয়সার বিস্কুট খেয়ে কিছুটা শান্তি হল। দেখি রীনা ও অন্য এক সহপাঠিনী সাথীও গৌরী মহলের দিকে এগোচ্ছে। বুঝলাম ওরাও পড়তে এসেছে। 

চারমিনারের দাম তখন নিতান্ত কম। দিনহাটায় এসে ধরে ফেলেছিলাম সেটা। কিছুতেই মাথা থেকে উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্টের ভাবনা যাচ্ছিল না। এমনিতেই খারাপ ছাত্রের দলে নাম লিখিয়েছি। তাই সিগারেট আর নতুন করে কী খারাপ করবে! 

চা-বিস্কুট শেষে সিগারেটের শেষটুকু ফেলে পা দিয়ে মাড়িয়ে কাকুর বাড়ির দিকে এগোলাম আমিও

(ক্রমশ)   

** ছবি- মা (প্রয়াত লীলা নাগ রায়), দাদা (কৌশিক রায়) ও মানি (শ্রীমতী সন্ধ্যা সাহা)


Friday, July 25, 2025


 

ভিউয়ের দাপটে ব্যাকফুটে ভ্রমণসাহিত্য 

শৌভিক রায় 

সমাজ মাধ্যম খুললেই অজস্র ছবি ও ভিডিও। নতুন কিংবা পুরোনো পর্যটন কেন্দ্রের। ছবির ওপর বিস্তৃত পরিচিতি। ভাষার বর্ণচ্ছটা। ভিডিওতে গাঢ় স্বরে বর্ণনা। স্বর প্রক্ষেপণ বলে দিচ্ছে বর্ণনাকারীর হর্ষ ও উচ্ছ্বাস। 

এই প্রজন্মের অধিকাংশই ভ্রমণসাহিত্য বলতে এগুলিকেই বোঝেন। এতে অবশ্য বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। এই চটজলদির যুগে সাহিত্য সম্পর্কেই যখন আমাদের অনেকের ধারণা সুস্পষ্ট নয়, তখন ভ্রমণসাহিত্য অনেক দূরের ব্যাপার। নিশ্চিত করে বলতে পারি বর্তমান সময়ের অনেক পাঠকই জানেন না প্রবোধ কুমার সান্যাল, শঙ্কু মহারাজ কিংবা উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে। পড়েননি সুবোধ কুমার চক্রবর্তীর 'রম্যাণী বীক্ষ' বা সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'পালামৌ'।

কিন্তু এতে কি কিছু যায় আসে? সাধারণভাবে দেখলে হয়তো কিছুই যায় আসে না। বরং সমাজ মাধ্যমে এইসব ভিডিও ও ছবি দেখে কোনও পর্যটনকেন্দ্র সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়। সেখানে কীভাবে যাওয়া যাবে, কী কী দেখা যাবে, কোথায় থাকা যাবে ইত্যাদি বিভিন্ন তথ্য জানা থাকলে সুবিধে প্রত্যেকের। ফলে, এই জাতীয় পোস্টের চাহিদা তুঙ্গে। তাই ক্রমে বাড়ছে ট্রাভেল ব্লগের চাহিদা। গুগল ম্যাপেও অনেকে বিস্তারিত জানিয়ে দিচ্ছেন নানা তথ্য। এতে যেমন বর্ণনাকারীর লাভ, তেমনি যাঁরা দেখছেন তাঁদেরও। কেননা ভিউয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে অর্থ সমাগম হতে পারে। আর তথ্য নির্ভর এইসব পোস্ট দেখে সেই ভিউয়ার নিশ্চিন্তে চলে যেতে পারেন বেড়াতে। কিন্তু ট্র্যাভেল ব্লগ বা এই জাতীয় বিবরণ আর ভ্রমণ সাহিত্য এক নয়। 

সত্যি বলতে, ভ্রমণ সাহিত্য কোনও অংশে কবিতা, গল্প বা উপন্যাসের চাইতে কম নয়। কেননা শুধু দেখে ও বর্ণনা করেই ভ্রমণসাহিত্য রচিত হয় না। সঠিক অবলোকন, পর্যবেক্ষণ ও রসময় বর্ণনা না থাকলে, ভ্রমণ সাহিত্য জাতে ওঠে না। ফলে ভ্রমণ নিয়ে প্রচুর লেখা হলেও, সেগুলি নিতান্তই ভ্রমণবৃত্তান্ত হয়ে রয়েছে। সাহিত্য হয়নি। 

বাংলায় ভ্রমণ সাহিত্যের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এর টান এতটাই যে, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবধি তা এড়াতে পারেননি। অবশ্য তিনি প্রথম নন। কিন্তু সাহিত্যের এই শাখাকে তিনি অন্য মাত্রা দিয়েছিলেন তাঁর ভ্রমণকথার আটটি গ্রন্থে। স্বামী বিবেকানন্দ, অবধূত, সতীনাথ ভাদুড়ী, বুদ্ধদেব বসু, অন্নদাশঙ্কর রায়, নারায়ণ সান্যাল, রাহুল সাংকৃত্যায়ন, নবনীতা দেবসেন প্রমুখরা সেই ধারাকেই সমৃদ্ধতর করেছেন। এঁদের প্রত্যেকের লেখাতেই যে অন্তর্দৃষ্টি ও আত্মদর্শনের পাশাপাশি পর্যবেক্ষণ ও বোধের যে গভীরতা রয়েছে, সেটিই ভ্রমণসাহিত্যের সবচেয়ে বড় শর্ত। তাঁদের লেখা পাঠককে মানসলোকে নিজস্ব কল্পনার উড়ান ভরতেও সক্ষম। 

আরও অনেক কিছুর মতোই আমরা ভ্রমণসাহিত্য ভুলে গেছি। অন্তর্দৃষ্টির অভাবে পার্থক্য করতে পারছি না ট্যুরিস্ট আর ট্র্যাভেলারের মধ্যে। পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে ভিড় উপচে পড়লেও, লাভ কতটা হল, তা নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। ভ্রমণের রস আস্বাদন ও জানার আগ্রহের চাইতে, অন্যকে দেখানোর আর অর্থ লাভের ইচ্ছে যদি বেশি হয়, তবে সেটি ভ্রমণ থাকে না। দুর্ভাগ্য, এখন সেটিই চলছে। ফলে একদিকে যেমন ভ্রমণসাহিত্যের অপমৃত্যু হয়েছে, তেমনি ভিড় বাড়লেও সফল হচ্ছে না পর্যটনের আসল উদ্দেশ্য।   


( * প্রকাশিত: উত্তরবঙ্গ সংবাদ, জুলাই ২৫, ২০২৫)

Tuesday, July 22, 2025


 

কলেজ দিনের বালক- ২ 
শৌভিক রায় 

কলেজের পেছনেই রেল লাইন। তাতে ট্রেন চলে। এই লাইন চলে গেছে বামনহাট। দেশভাগ না হলে চলে যাওয়া যেত বাংলাদেশে। আমার ঠাকুরদা পরিবার নিয়ে এই পথে ময়মনসিংহ থেকে এসেছিলেন। এখন অবশ্য ধীরগতির লোকাল ট্রেন কোচবিহার- বানেশ্বর ছুঁয়ে আলিপুরদুয়ারে যায়। রেল লাইন পার করে খানিকটা এগোলে কোয়ালিদহ। ওই সব অঞ্চলে আমাদের জমি আছে। ধানী জমি। আধিয়ার হিসেবে আছেন রাজেনদা। ছোটবেলায় দিনহাটায় এলে বড়কাকুর সাইকেলে চেপে খামারবাড়ি যাওয়া ছিল একটা ঘটনা। কখনও শীতকালে ফ্যামিলি পিকনিক করা হত। খামারবাড়ির পেছনেই গড়। গড় মানে উঁচু ঢিবি। দীর্ঘ এর বিস্তৃতি। কলেজ থেকে কোচবিহারের দিকে একটু এগোলেই গড় শুরু হয়েছে। সেখানেই রয়েছে বুড়িমায়ের মন্দির। খুব জাগ্রত দেবী। ছোটবেলায় সামনে দিয়ে গেলেই প্রণাম করতাম। 

গড়ের মোটামুটি উল্টোদিকে পিসির বাড়ি। বাংলাদেশে থাকতেই পিসির বিয়ে হয়েছিল অসমের সুখচরে। অকালে পিসেমশাই চলে গেলে পিসিকে দিনহাটায় আনা হয়েছে। জমি দেওয়া হয়েছে। ছোট্ট বাড়ি করে দেওয়া হয়েছে। পিসির বড় ছেলে বাবুয়াদা ছোট থেকেই ফালাকাটায়। বাবার কাছে। পড়া শেষ করে ওখানেই চাকরি পেয়েছে। ও, আমি আর দাদা একসঙ্গে বড় হয়েছি। দাদার চাইতেও বাবুয়াদার সঙ্গে আমার বেশি ভাব। পিসির অন্য দুই ছেলে দিনহাটায় থাকে। একদম ছোট বাপ্পা আমার বয়সী। আমার সঙ্গেই কলেজে ভর্তি হয়েছে। 

ক্লাসরুমে বসে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকি। ট্রেন চলে। কলেজ হল্টে দাঁড়ায়। কিছু লোকজন নামে। কোচবিহার থেকে স্যারেরা আসেন। ছাত্রছাত্রীদেরও নামতে দেখা যায়। ট্রেন চলে যায় নিজের মতো। মন খারাপ লাগে। ফালাকাটার ওপর দিয়ে যে ট্রেন চলে যায়, তাতে ছোঁওয়া লেগে থাকে মহানগরের। কিংবা অন্য রাজ্যের। এখানে সেটি নেই। মহানগরের কথা ভাবলে একটু কষ্ট হয়। দাদা মাধ্যমিকের পর নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু তিন মাস থেকে চলে আসে। পরে ফালাকাটা থেকে উচ্চ মাধ্যমিক করে স্কটিশ চার্চ কলেজে কেমিস্ট্রি নিয়ে ভর্তি হয়। বাবা আমার জন্য কিছু ভাবেননি। ফালাকাটাতেই রেখে দিয়েছিলেন। একটু অভিমান হয়। হয়ত বাইরে কোথাও পড়লে এরকম রেজাল্ট হত না! 

ক্লাসে ঢুকলেন বিভাগীয় প্রধান শ্রী অনিলবন্ধু দত্ত। আমি ওঁকে চিনি। উনিও আমাকে জানেন। কিন্তু পরিচয় না দিলে চিনবেন না। মাঝে তো দীর্ঘ অদর্শন। স্বাভাবিক সেটা। উনি বাবার এক বন্ধুর ভাই। বাবা আর সেই বন্ধু ধুবড়ির বি এন কলেজের ছাত্র। বাবার ছাত্র জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছিল ধুবড়িতে। ফলে ধুবড়ির সঙ্গে বাবার সখ্য আলাদা। শুনেছি সেই বন্ধু আর বাবা ভরা বর্ষার ব্রহ্মপুত্রেও লাফিয়ে পড়তেন সাঁতার দেওয়ার জন্য। অনিলবন্ধু দত্ত যখন দিনহাটা কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দিলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের পরিবার তাঁর অন্যতম পরিচিত আশ্রয় ছিল। মধুরভাষী মানুষটি ঠাকুমাকে মা ডাকেন। তাঁর স্ত্রী গীতা দত্তও (এখন প্রয়াত বলে শ্রীমতি যোগ করলাম না) দিনহাটা কলেজে ইতিহাস ডিপার্টমেন্টে। দীর্ঘদিন ওঁরা কলেজ কোয়ার্টার্সে ছিলেন। সেই সময় বহুবার গিয়েছি সেখানে। ওঁদের কন্যা তুতুনদি (সোমালি দত্ত) নিজের দিদির মতো। আর পুত্র বুবুনকে (শৌভনিক দত্ত) ভাই বলে জেনে এসেছি। আমি ক্লাস থ্রি-তে দিনহাটা থেকে চলে যাওয়ার পর, ওঁরা বাড়ি করে কোয়ার্টার্স ছাড়েন। সেই বাড়িতেও গেছি। এখন অবশ্য দিনহাটার সেই বাড়িতেও থাকেন না। কোচবিহার থেকে যাতায়াত করেন।

প্রথম ক্লাস। উনি সবার নাম জিজ্ঞাসা করছেন। আমি শেষ বেঁচে বসা। আমার আগের বেঞ্চে কয়েকজন মেয়ে। তার মধ্যে একজনকে ভর্তির লাইনে দেখেছিলাম। খুব ছটফটে। বাবার সঙ্গে এসেছিল। সবার নাম আর স্কুল জানতে জানতে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন অনিলবন্ধু দত্ত।  খুব লজ্জা লাগছে। তুতুনদি দিনহাটা গার্লস হাই স্কুলে আমার মায়ের অত্যন্ত প্রিয় ছাত্রী ছিল। এই মুহূর্তে নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজিতে মাস্টার্স করছে। খুব ভাল ছাত্রী বলে পরিচিত সব জায়গাতেই। গানও গায় দুর্দান্ত। বুবুনও মেধাবী। গুণী। ছোটবেলায় যাদের দিদি আর ভাই বলে জেনে এসেছি, তাদের পাশে এই মুহূর্তে আমার পরিচয়! সত্যিই ঘেন্না হচ্ছে নিজের ওপর। মাথা নিচু করে কোনও মতে নিজের নাম আর স্কুল বললাম। স্যার তাঁর হাত আমার গালে আলতো করে ছোঁয়ালেন। মুহূর্তেই জড়তা কেটে গেল। ওই স্পর্শে যে স্নেহ লুকিয়ে আছে, সেটা সেই সময়ে অমূল্য বলে মনে হল। এত বাজে রেজাল্টের পর কেউ ফিরেও তাকায়নি। আর উনি আদর করলেন। চোখ ছলছল করে উঠল আমার। 

স্যার নিজের চেয়ারের দিকে যাওয়ার জন্য পেছন ফিরতেই সামনের বেঞ্চে বসা সেই মেয়েটা মুখ ঘুরিয়ে বলল, 
- স্যার তোর গালে কেন চড় দিলেন রে ওভাবে?   

বললাম উনি আমার কাকু হন। 
- কাকু! অ....

ততক্ষণে আমি মেয়েটার নাম জেনে ফেলেছি। দেওয়ানহাটের মেয়ে। আমার চাইতে রেজাল্ট অনেক বেশি ভাল। নাম রীনা সাহা। 

(ক্রমশ) 

Saturday, July 19, 2025


 

কলেজ দিনের বালক- 
শৌভিক রায় 


লিস্টে চব্বিশ জন। শেষ নামটা আমার। 

দিনহাটা কলেজের ইংরেজি অনার্সের সেই লিস্ট আমাকে দেখে রীতিমতো ব্যঙ্গ করছিল যেন!

আসলে একেই বলে `স্বর্গ হইতে পতন`। সেটা নয়ত কী! মাত্র দুই বছর আগে, ১৯৮৫ সালে, মাধ্যমিকে পেয়েছিলাম ৭২ শতাংশ নম্বর। উচ্চ মাধ্যমিকে একেবারেই যা তা। বাহাত্তর শতাংশ নম্বর নিয়ে আমাদের সময়ে আর্টস পড়বার রেওয়াজ ছিল না। খানিকটা যেন প্রথা ভেঙেছিলাম। উচ্চ মাধ্যমিকে দারুণ কিছু করব, সেটা কখনই ভাবিনি। কিন্তু তাই বলে এই নম্বর!  

সেই বছর অর্থাৎ ১৯৮৭ সালে, উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণের হার অত্যন্ত কম। যতদূর মনে পড়ছে ৩৯.৭%। আমাদের স্কুলে ফার্স্ট ডিভিশন কেউ নেই। অথচ মেধাবী ছাত্র ভর্তি আমাদের ব্যাচে। সায়েন্সে যেখানে এই অবস্থা, সেখানে আর্টস আর কমার্সের হাল কী সেটা তো বোঝাই যায়! ফালাকাটায় তখন শুধুমাত্র ফালাকাটা হাই স্কুলেই উচ্চ মাধ্যমিক পড়ানো হত। মোটামুটিভাবে পুরো ব্লকে একটাই উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল। বহু দূর থেকে ছাত্রছাত্রীরা আসতো। প্রত্যেকের শোচনীয় দশা। অধিকাংশই ফেল। যারা পাস করেছে তাদের নম্বর অত্যন্ত বাজে। কিছু বিষয়ে অনেকের এক‌ই নম্বর। টোটাল মার্কসও এক।

দিনহাটা কলেজে ভর্তির লাইনে দাঁড়িয়ে শুধু একটা প্রশ্নই মনে ঘুরেফিরে এসেছিল। ইলেভেনের ফাইনালে আমার রাষ্ট্রবিজ্ঞান খাতা কৃষ্ণ স্যার (শ্রী কৃষ্ণ দেব তখন আমাদের স্কুলে ডেপুটেশনে চাকরি করছেন) জলপাইগুড়ির এ সি কলেজের অধ্যাপকদের দেখতে দিয়েছিলেন। তারা ৯৫% নম্বর দিয়েছিলেন। সেই আমিই উচ্চ মাধ্যমিকে পেলাম ৫২ শতাংশ। মাত্র কয়েক মাসে এত বাজে হয়ে গেলাম লেখাপড়ায়! নাকি অধ্যাপকরা ভুল দেখেছিলেন?

দুরন্ত বাজে রেজাল্ট করে চরম বাজে অবস্থা আমার। যারা কোনও দিন ধারে পাশে আসেনি, তাদের অনেকে আমার চাইতে বেশি নম্বর পেয়েছে। কোথায় পড়ব, কী পড়ব কিছুই বুঝতে পারছি না।  আর্টস নিয়ে পড়েছি। অনেক দিকের রাস্তাই বন্ধ। অনার্স ছাড়া পড়বার কিছু নেই। যে মার্কস পেয়েছি তাতে তথাকথিত ভাল কলেজ জুটবে না বুঝতে পারছিলাম। তবুও কোচবিহারের এ বি এন শীল কলেজ, জলপাইগুড়ির এ সি কলেজ, শিলিগুড়ি কলেজ, আলিপুরদুয়ার কলেজ ইত্যাদিতে ফর্ম ফিলাপ করলাম। ফালাকাটায় কলেজ থাকলেও, তখন অনার্স পড়ানো হত না। 

হঠাৎ মনে হল দিনহাটা কলেজে ফর্ম ফিলাপ করা দরকার। দিনহাটায় আমাদের পৈতৃক বাড়ি। বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে, স্বাধীনতার সময়, ঠাকুরদা দিনহাটায় বাড়ি করেন। কাকুরা ওখানেই। একান্নবর্তী পরিবার। বাবা-মা দুজনেই দিনহাটায় শিক্ষকতা করতেন। পরে চলে আসেন ফালাকাটায়। 

জুন-জুলাইয়ের প্রবল বৃষ্টির দিন সেবার। পুণ্ডিবাড়ির রাস্তা তখন ছিল না। ফালাকাটা থেকে কোচবিহার যেতে হত নিশিগঞ্জ হয়ে। সেই রাস্তায় ব্রিজ ভেঙেছে। সেটা বন্ধ। মাদারিহাট হয়ে হাই রোড ধরে চিলাপাতা-পুণ্ডিবাড়ি পথ বন্ধ। ফলে মাদারিহাট হাসিমারা-কালচিনি-রাজাভাতখাওয়া-আলিপুরদুয়ার-বানেশ্বর হয়ে কোচবিহার। সেখান থেকে দিনহাটা। আজকের মতো চকচকে রাস্তা নেই। কাঠের নড়বড়ে ব্রিজ সব। পৌঁছতে প্রায় একদিন শেষ। যাহোক ফর্ম ফিলাপ হল।

এ বি এন শীল কলেজ পাত্তা দিল না। কোনও বিষয়েই চান্স পেলাম না। আলিপুরদুয়ার কলেজ, এ সি কলেজ আর শিলিগুড়ি কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সুযোগ দিল। একমাত্র দিনহাটা কলেজে ইংরেজি অনার্স পেলাম। চব্বিশ জনের মধ্যে শেষ নাম আমার। 

দিনহাটা গোপালনগর শরণার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস থ্রিয়ের অর্ধেক পড়েছিলাম। দুর্গাপুজো ছাড়াও মাসে-দু`মাসে দিনহাটায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল আমাদের। আত্মীয়-স্বজন কমবেশি অনেকেই দিনহাটায় থাকেন। বাড়িতে নিজেদের খান দুয়েক ঘরও আছে। মোটামুটি সব রাস্তাঘাট চেনা। সমবয়স্ক আত্মীয় ভাই, বন্ধু সবাই আছে। প্রত্যেকেই ভালবাসে। আমাদের বাড়ি মসজিদের উল্টোদিকে, বড় রাস্তার ধারে। থানা পাড়া আর গোধূলি বাজারের ঠিক মাঝখানে। কলেজ মেরেকেটে দেড় কিমি। আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চাইতে ইংরেজি অনার্স পরবর্তীতে চাকরির ক্ষেত্রে সুবিধে দেবে।

সব কিছু ভেবে দিনহাটা কলেজের ইংরেজি অনার্স ভর্তির লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। 
আমার আগে তেইশ জন.....

Friday, July 18, 2025

 


Quantity ও Quality শব্দ দুটির মধ্যে পার্থক্য অনেক। সংখ্যা বাড়লেই উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পায় না। এই সত্যটা না বুঝে যারা সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে নাচে, তারা হয় মূর্খ কিংবা ভণ্ড। আজকাল এদের রমরমা। তাই এগিয়ে নয়, পিছিয়েই পড়ছি আমরা.....








Tuesday, July 15, 2025

 

মোহিত

শৌভিক রায় 


বসতে না বসতেই ঝকঝকে পোশাক পরা বয় ঠকাস করে গ্লাসটা রাখল। লাল নীল কমলা সব রং মেশালে যেমন হবে, তেমন রঙের তরল গ্লাসে টলটল করছে। তাতে ভাসছে গোল গোল চাকা চাকা করে কিছু একটা ফলের দু'তিন টুকরো। তরলের ভেতর থেকে খানিকটা মাথা উঁচিয়ে হঠাৎ বিনয়ী হয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে দিয়েছে সাদা স্ট্র বাবাজি। 


চিরকালের ভীতু পাবলিক আমি। এভাবে ওপেন দোকানে কেউ ইয়ে সাপ্লাই দেয় নাকি? তাও আবার অর্ডার ছাড়া! আমাকে কী ভেবেছেটা কী! কেউ যদি দেখে ফেলে? কটমট করে তাকালাম ছেলেটির দিকে। অবশ্য আমার এই ছোট ছোট কুতকুতে চোখে কটমট ভাবটা ফুটে ওঠে কিনা কে জানে। বোধহয় ফোটে না। তাই সে দিব্যি ভ্রু নাচিয়ে বলল, 'মোহিটো স্যার!'


আরে কে তোমার নাম জিজ্ঞাসা করেছে বাবা?তাছাড়া এরকম বিটকেল উচ্চারণ করতেই বা কে বলেছে? তবে খুশি হলাম। ভাবলাম অবাঙালি হয়েও এই যে বাংলা বলার প্রয়াস, এটা তো অভাবনীয়। আজকাল বাঙালিরা বাংলা বলে না! সেখানে এই ছেলেটি ঠিক উচ্চারণ করতে না পারলেও, চেষ্টা করছে।


- মোহিত? আচ্ছা আচ্ছা...লেকিন মোহিত ম্যায় না ইয়ে নেহি চাহা মানে মাঙ্গা...হাম তো দার... মানে ইয়ে...বুঝলে না... শরাব নেহি খাতা..না না পিতা...ফাদার পিতা না কিন্তু...খাওয়া পিতা... মানে জল..নেহি পানি..বুঝলে মোহিত?

- না না স্যার... আমার নাম মোহিত নয়..


নাম মোহিত নয়? তবে মোহিত বলল কেন? আমাকে দেখে তো মোহিত হওয়ার কিছু নেই। যথেষ্ট দানবীয় আমাকে দেখতে। ছেলেটা বলে কী? 


- অ... তুমি তবে বাঙালি? কিন্তু হঠাৎ মোহিত কেন হলে? মানে ঠিক বুঝতে পারছি না। আধা বুড়ো এই টেকোকে দেখে...

- স্যার আমি মোহিত নই, মোহিত‌ও হইনি। এটার নাম মোহিটো। কিউবান ড্রিংক। ওরা রামের সঙ্গে আরও কিছু মিশিয়ে ককটেল তৈরি করে। আমাদের ওসব নয়। সিম্পল শরবত। এটা স্যার আমাদের তরফ থেকে আপনাদের জন্য ওয়েলকাম ড্রিংক...

- কিউবাতে রাম! ওখানে তো ফিদেল কাস্ত্রো শুনি। রাম কীভাবে গেলেন? সেতু বন্ধ তো শ্রীলঙ্কায় হয়েছিল শুনেছি। কিউবা তো সেই আমেরিকার কাছে...বোধহয় আটলান্টিকে...

- স্যার খেলে খান, না হলে থাক...


কিন্তু ওই যে। আমি চিরকালের ভীতু লোক। না খেলে (নাকি পিলে? পিলে চমকানো সব ব্যাপার স্যাপার) যদি কোনও ক্যাচাল হয়...


মিথ্যে বলব না...মোহিটো খেয়ে বেশ মোহিত হলাম কিন্তু.... কুতকুতে ঢুলু ঢুলু চোখে মেন কোর্সের (পাতি বাংলায় ভাত) অপেক্ষায় বসে রইলাম...


( বোকামির এককাল ) 

Saturday, July 12, 2025

 

নিউ কোচবিহার স্টেশনে শেয়ালদা- জলপাইগুড়ি রোড সাপ্তাহিক ট্রেনটি দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখে অবাক লাগল। শুনলাম কোচ পরিষ্কার করবার জন্য ট্রেনটিকে নাকি নিউ কোচবিহার স্টেশনে আনা হয়েছে বা হয়। বিষয়টি কতটা সঠিক জানি না। কিন্তু যদি সত্যিই সেটা হয়, তবে ট্রেনটি তো নিউ কোচবিহার থেকেই ছাড়তে পারত। ট্রেনটিকে নিউ কোচবিহার অবধি টেনে আনা ও আবার পাঠানোর মধ্যে একটা খরচ তো রয়েছে। সেটা তো কিছুটা মিটতো নিশ্চয়ই তাতে। জলপাইগুড়ি রোড থেকে ট্রেনটি ছাড়ে রাত ৮ টা ৩০ মিনিটে।

 

Friday, July 11, 2025

 `ঘরে যখন আগুন লাগিয়াছে তখন কূপ খুঁড়িতে যাওয়ার আয়োজন বৃথা`- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 


* আগুন বহুদিন আগেই লেগেছিল। আমরা তাকিয়েও দেখিনি। এখন গেল গেল রব তুলে কী হবে? কুড়ুল তো বহু আগেই নিজেদের পায়ে মেরেছি আমরা.... 

(প্রসঙ্গ: নিশিগঞ্জ মধুসূদন হোড় কলেজ) 


Monday, July 7, 2025

 

পারি, তবু পারি না...

শৌভিক রায়

ভেবেছিলাম বলি...."হে মধ্যবয়স্কা, স্থূলকায়া, বিগতযৌবনা, শ্রদ্ধেয়া নারীগণ...যেভাবে আপনারা বানেশ্বর শিবমন্দিরের বিরাট চাতালে উঠিয়া, নানা প্রকার অঙ্গভঙ্গি করিয়া, চলমান দূরভাষের ক্যামেরা সামনে রাখিয়া, রিল নামক অত্যাধুনিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনের শুটিং করিতেছেন, তাহাতে আগত ভক্তবৃন্দের চোখ কপালে উঠিলেও, চক্ষুলজ্জা ও আপনাদিগের বয়স বিচারে, সশব্দে কিছু না বলিলেও, মনে মনে সকলেই গালমন্দ করিতেছেন। পাথরের দেবতার আশীর্বাদ লইতে আসিয়া, মনুষ্যকূলের অভিশাপ কুড়াইবার মধ্যে কোনও প্রকার পুণ্য নাই। 'হাই গাইজ' কিংবা 'বন্ধুরা' সম্বোধন করিয়া, যেমত ভাবে আপনারা বর্তমানে, নিজেদের রান্না হইতে স্বামীর লুঙ্গি বা কালি মাখা কুৎসিত গামলা ইত্যাদি যাবতীয় যা কিছু দেখাইতেছেন, তাহাতে আমরা পরম বিস্মিত। এই সকল দ্রব্যাদিও যে প্রদর্শনের বিষয় হইতে পারে, তাহা ছাত্রাবস্থায় জানিলে, রসায়ন শিক্ষকের চাটা খাইয়া, বিদ্যালয়ের বার্ষিক অনুষ্ঠানের বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে রঙ্গ (কেমিক্যাল রঙগুলিকে ওই নামেই ডাকিয়া থাকি) দেখাইতাম না। সমস্যা হইল, ত্রিনেত্র হইলেও মহাদেব‌ এই সব বোঝেন না। ঠাকুর দেবতারা এমত হইয়া থাকেন। উহারা ঝট করিয়া মনুষ্যকূলকে অনুকরণ করিতে অভ্যস্ত। দেখিবেন মাঝেমধ্যেই দুর্গা মাতা জনপ্রিয় নায়িকার মুখ, নিজের মুখে বসাইয়া ফেলেন এবং অসুরটিকে প্রতিপক্ষ নেতা বানাইয়া দেন। মা সরস্বতী প্রায়শই জিন্স টপ পরিয়া বীণার বদলে গিটার লইয়া ভিজিট দিয়া যান। ফলে ব্যোমভোলা দেবাদিদেব শিবঠাকুর যদি আপনাদের দেখিয়ে অনুপ্রাণিত হইয়া (অনুপ্রেরণা ছাড়া আজকাল কিছুই হয় না) রিল বানাইতে শুরু করেন, তবে আর এক চিত্তির হইবে..." কিন্তু বলতে পারলাম না। আমার দিদিমণি ফুট কাটল, "যত বীরত্ব বাড়িতেই! আমাকেই যা বলতে পারে। হুঁ, মুরোদ জানা আছে...."

Tuesday, July 1, 2025

 

কত কিছু প্রকাশ্যে আসছে এখন! আগে এই করেছে, সেই করেছে। কী করছিলেন কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন? অন্যায় চাপা দিতে দিতে কী বানিয়েছেন দেখছেন তো! 

এরকম বহুজন রয়েছে। সর্বত্র। কেউ প্রৌঢ়কে পেটাচ্ছে, কেউ ফোনে গালিগালাজ করছে। কজনকে আর জানি! কানাগলি থেকে আলো ঝলমল পথ। সর্বত্র এদের‌ই দাপট।