ভিউয়ের দাপটে ব্যাকফুটে ভ্রমণসাহিত্য
শৌভিক রায়
সমাজ মাধ্যম খুললেই অজস্র ছবি ও ভিডিও। নতুন কিংবা পুরোনো পর্যটন কেন্দ্রের। ছবির ওপর বিস্তৃত পরিচিতি। ভাষার বর্ণচ্ছটা। ভিডিওতে গাঢ় স্বরে বর্ণনা। স্বর প্রক্ষেপণ বলে দিচ্ছে বর্ণনাকারীর হর্ষ ও উচ্ছ্বাস।
এই প্রজন্মের অধিকাংশই ভ্রমণসাহিত্য বলতে এগুলিকেই বোঝেন। এতে অবশ্য বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। এই চটজলদির যুগে সাহিত্য সম্পর্কেই যখন আমাদের অনেকের ধারণা সুস্পষ্ট নয়, তখন ভ্রমণসাহিত্য অনেক দূরের ব্যাপার। নিশ্চিত করে বলতে পারি বর্তমান সময়ের অনেক পাঠকই জানেন না প্রবোধ কুমার সান্যাল, শঙ্কু মহারাজ কিংবা উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে। পড়েননি সুবোধ কুমার চক্রবর্তীর 'রম্যাণী বীক্ষ' বা সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'পালামৌ'।
কিন্তু এতে কি কিছু যায় আসে? সাধারণভাবে দেখলে হয়তো কিছুই যায় আসে না। বরং সমাজ মাধ্যমে এইসব ভিডিও ও ছবি দেখে কোনও পর্যটনকেন্দ্র সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়। সেখানে কীভাবে যাওয়া যাবে, কী কী দেখা যাবে, কোথায় থাকা যাবে ইত্যাদি বিভিন্ন তথ্য জানা থাকলে সুবিধে প্রত্যেকের। ফলে, এই জাতীয় পোস্টের চাহিদা তুঙ্গে। তাই ক্রমে বাড়ছে ট্রাভেল ব্লগের চাহিদা। গুগল ম্যাপেও অনেকে বিস্তারিত জানিয়ে দিচ্ছেন নানা তথ্য। এতে যেমন বর্ণনাকারীর লাভ, তেমনি যাঁরা দেখছেন তাঁদেরও। কেননা ভিউয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে অর্থ সমাগম হতে পারে। আর তথ্য নির্ভর এইসব পোস্ট দেখে সেই ভিউয়ার নিশ্চিন্তে চলে যেতে পারেন বেড়াতে। কিন্তু ট্র্যাভেল ব্লগ বা এই জাতীয় বিবরণ আর ভ্রমণ সাহিত্য এক নয়।
সত্যি বলতে, ভ্রমণ সাহিত্য কোনও অংশে কবিতা, গল্প বা উপন্যাসের চাইতে কম নয়। কেননা শুধু দেখে ও বর্ণনা করেই ভ্রমণসাহিত্য রচিত হয় না। সঠিক অবলোকন, পর্যবেক্ষণ ও রসময় বর্ণনা না থাকলে, ভ্রমণ সাহিত্য জাতে ওঠে না। ফলে ভ্রমণ নিয়ে প্রচুর লেখা হলেও, সেগুলি নিতান্তই ভ্রমণবৃত্তান্ত হয়ে রয়েছে। সাহিত্য হয়নি।
বাংলায় ভ্রমণ সাহিত্যের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এর টান এতটাই যে, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবধি তা এড়াতে পারেননি। অবশ্য তিনি প্রথম নন। কিন্তু সাহিত্যের এই শাখাকে তিনি অন্য মাত্রা দিয়েছিলেন তাঁর ভ্রমণকথার আটটি গ্রন্থে। স্বামী বিবেকানন্দ, অবধূত, সতীনাথ ভাদুড়ী, বুদ্ধদেব বসু, অন্নদাশঙ্কর রায়, নারায়ণ সান্যাল, রাহুল সাংকৃত্যায়ন, নবনীতা দেবসেন প্রমুখরা সেই ধারাকেই সমৃদ্ধতর করেছেন। এঁদের প্রত্যেকের লেখাতেই যে অন্তর্দৃষ্টি ও আত্মদর্শনের পাশাপাশি পর্যবেক্ষণ ও বোধের যে গভীরতা রয়েছে, সেটিই ভ্রমণসাহিত্যের সবচেয়ে বড় শর্ত। তাঁদের লেখা পাঠককে মানসলোকে নিজস্ব কল্পনার উড়ান ভরতেও সক্ষম।
আরও অনেক কিছুর মতোই আমরা ভ্রমণসাহিত্য ভুলে গেছি। অন্তর্দৃষ্টির অভাবে পার্থক্য করতে পারছি না ট্যুরিস্ট আর ট্র্যাভেলারের মধ্যে। পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে ভিড় উপচে পড়লেও, লাভ কতটা হল, তা নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। ভ্রমণের রস আস্বাদন ও জানার আগ্রহের চাইতে, অন্যকে দেখানোর আর অর্থ লাভের ইচ্ছে যদি বেশি হয়, তবে সেটি ভ্রমণ থাকে না। দুর্ভাগ্য, এখন সেটিই চলছে। ফলে একদিকে যেমন ভ্রমণসাহিত্যের অপমৃত্যু হয়েছে, তেমনি ভিড় বাড়লেও সফল হচ্ছে না পর্যটনের আসল উদ্দেশ্য।
( * প্রকাশিত: উত্তরবঙ্গ সংবাদ, জুলাই ২৫, ২০২৫)

No comments:
Post a Comment