যাঁরা যুদ্ধ চাইছেন তাঁরা
যুদ্ধের অভিঘাত সহ্য করতে পারবেন তো!
শৌভিক রায়
দেশ আর রাষ্ট্রের পার্থক্য ঠিক কোথায়? মোটামুটি সকলে জানি আমরা। একটি ভৌগোলিক অঞ্চলে বসবাসকারী মোটামুটিভাবে একই ভাষার মানুষজন নিয়ে গঠিত হয় দেশ। কিন্তু একটি রাষ্ট্রে থাকতে পারে বিবিধ ভাষা, বর্ণ, ধর্মের মানুষ। তার নিজস্ব সার্বভৌমত্বও তাকে আলাদা করে। আধুনিক পৃথিবীতে যে কোনও রাষ্ট্র তার নিজের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে সবচেয়ে বেশি তৎপর। আর সেটাই তো হওয়া উচিত। অন্য রাষ্ট্র থেকে কেউ এসে আমার ভূখণ্ডে গোলমাল পাকিয়ে যাবে, সেটি কেন মানবে স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র? আবার নিজের ব্যাপারে অধিকারের বিষয়ে কেউ নাক গলাবে, কোনও ভাবেই সেটিও মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। কেননা তাহলে রাষ্ট্রের নিজস্বতায় বিচ্যুতি আসতে বাধ্য। অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে রাষ্ট্রটি হারাবে তার স্বাধীন স্বত্বা!
কাশ্মীরে ঘটে যাওয়া নারকীয় হত্যাকাণ্ড এই অর্থেই আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিরাট আঘাত। যদি প্রত্যাঘাত না করা হত, তবে ভারতের নিজস্বতার ব্যাপারেই প্রশ্ন উঠত। বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদতে ঘটা এই ঘৃণ্যতম অপরাধের জবাব তো এভাবেই দিতে হত। সন্দেহ নেই, সেটা যথেষ্ট ভালভাবেই দেওয়া হয়েছে। যাঁরা সামান্যতম খবর রাখেন, তাঁরা সকলেই জানেন যে, কীভাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মুখোশ খুলে দেওয়া হয়েছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানটিকেও চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়েছে সারা পৃথিবীকে। কূটনৈতিক দিক থেকেও ভারতের প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
কিন্তু আমেরিকার হস্তক্ষেপে সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাময়িক বিরতি নিয়ে ভ্রুকুটি করছেন অনেকে। খুবই স্বাভাবিক সেটা। আগেই বলেছি, নিজের অধিকারের ব্যাপারে অন্য কেউ নাক গলালে, সেটি মেনে নেওয়া যায় না। তাই প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন দিক থেকেই। এই ব্যাপারটি বুঝতেও অসুবিধে হয় না। প্রশ্ন জাগা সঙ্গত। কোন মূল্যে এই বিরতি এলো সেটা জানার অধিকার তো আমাদের সবারই রয়েছে। সেটা পরিষ্কার না হলে, স্বস্তি পাচ্ছি না আমরা কেউই।
কিন্তু এই ব্যাপারটিও যখন নিজের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণার মতো হয়ে যায়, তখন সংশয় হয়। ঠিক শুনছি তো? জানবার অধিকার অবশ্যই আছে। কিন্তু তার মানে কি এই মুহূর্তেও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচারণ করা? বিশেষ করে যখন সব দিকেই টালমাটাল দশা সেই সময়েও? কেউ কেউ তো এক ধাপ এগিয়ে নানা তুলনা টেনে এনে প্রমাণ করতে চাইছেন যে, দারুণ সুযোগ থাকা সত্বেও এই বিরতি মেনে নেওয়া অত্যন্ত কাপুরুষোচিত। এই সুযোগে এটা ছিনিয়ে নেওয়া যেত, ওটা করা যেত। অতি উৎসাহী কিছু অপগন্ড তো তাল সামলাতে না পেরে বিদেশ সচিবকে যেভাবে আক্রমণ করেছে সেটা দেখে বিস্মিত হয়ে ভাবতে হয়, এরা কারা!
একবিংশ শতাব্দীতে সব কিছু এত সহজ নয়। বিগত কুড়ি পঁচিশ বছরে যেভাবে অতি দ্রুত দুনিয়া পাল্টে গেছে বা পাল্টাচ্ছে, তাতে 'উঠল বাই যুদ্ধে যাই' করলে হয় না। আধুনিক সমর শুধুমাত্র আক্রমণ প্রতি-আক্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। কূটনৈতিক দিক থেকেও লড়তে হয়। লড়াই হয় সমাজ মাধ্যমেও। আলেকজান্ডার আর পুরুর সেই সময়ও নয় এখন। এমনকি কার্গিল যুদ্ধের সময়ের সঙ্গেও আজকের বিরাট পার্থক্য। বিশ্বায়নের যুগে প্রতিটি পদক্ষেপ মেপে না চললে তার ফল অত্যন্ত খারাপ হতে বাধ্য। বিভিন্ন বিধি-নিষেধের চক্করে পুরো পৃথিবীই। সেখানে হঠকারিতা দেখানো শেষমেশ কিন্তু নিজের ক্ষতিই ডেকে আনবে। বিশেষত, ভারতের মতো দ্রুত উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের ঝক্কিও বেশি। আজও দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা গরিবী ও বেকারত্ব। একটি সর্বাঙ্গীন যুদ্ধ যে কী বিপুল সমস্যা সৃষ্টি করে, সেটি তো যুগে যুগে প্রমাণিত। ফলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই আর প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অল আউট যুদ্ধে নেমে পড়ার মধ্যে পার্থক্য থেকেই যায়।
ফলে যাঁরা যুদ্ধ যুদ্ধ করছেন, তাঁদের বোধহয় একটু ভেবে দেখবার সময় এসেছে। আবার সবেতেই যাঁরা 'আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের কালো হাত' দেখেন, তাঁরাও একটু ভাবুন। ওপার বাংলার যে সব মান্যবর জনাবরা প্রতিদিন নিয়ম করে সমাজ মাধ্যমে ভারতকে গালিগালাজ করে চলেছেন, তাঁরাও একটু চিন্তা করুন।
যাঁরা যুদ্ধ চাইছেন, তাঁরা যুদ্ধের অভিঘাত সহ্য করতে পারবেন তো? বেকারত্ব বৃদ্ধি, মাথা পিছু আয় কমে যাওয়া, সার্বিক উন্নয়ন থমকে যাওয়া ইত্যাদি কিন্তু যুদ্ধের অনুষঙ্গ। আরও অনেক কিছু যোগ করা যায়। সেসব না হয় করলাম না। শুধু একটা কথা। দুটি দেশই পরমাণু অস্ত্রধারী। হিরোশিমার বুকে একটি এটম বোম্ব কী করেছিল, সেটা প্রত্যেকেই জানি। এর বেশি আর বলছি না।
যাঁরা সব বিষয়ে সাম্রাজ্যবাদী একটি রাষ্ট্রের কালো হাত দেখেন, তাঁরা বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, সুযোগ পেলে নিজের সন্তানকে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠাবেন না! দরকারে চিকিৎসা করাতেও যাবেন না! আপনাদের ভন্ডামি তো এমন পর্যায়ে গেছে যে, আপনাদের মধ্যে থাকা সত্যিকারের নিরাসক্ত মানুষেরা আজ নিরুদ্দেশের দেশে। দামি গাড়ি চেপে টিভি স্টুডিওতে এসে আপনাদের বড় বড় ভাষণ এখন হাস্যকর মনে হয়।
এটুকু শুনে ওপার বাংলার মাননীয় গালিগালাজকারীরা পুলকিত হবেন না। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই ও জিরো টলারেন্স একই থাকবে। এর জন্য মদতদাতার বিরুদ্ধে আমরা যাব। বারবার। প্রত্যাঘাত করব। হ্যাঁ, আমাদের রাষ্ট্রে বিরুদ্ধ ভাবনা থাকবেই। কেননা এটা গণতান্ত্রিক দেশ। বহুত্ববাদের এক বিরাট ভূখণ্ড। এখানে কোনও ছদ্ম মৌলবাদীর রাজত্ব চলে না। এই রাষ্ট্রের মানুষ, এই দেশের মানুষ শান্তি চায়। আর তার জন্য মৌলবাদী ঘৃণ্য সন্ত্রাসের মূলে আঘাত হানতে তারা বদ্ধপরিকর।
(প্রকাশিত: প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা/ সম্পাদক: শ্রী কৃষ্ণ দেব)

No comments:
Post a Comment