উত্তরবঙ্গের অর্কিড তুলে ধরার চেষ্টা কই
শৌভিক রায়
কিন্তু হঠাৎ অর্কিড কেন? আসলে প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি অর্কিডকে নিয়ে আমাদের, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে, কোনও ভাবনাচিন্তা নেই। অথচ এই অঞ্চল হল অর্কিডের অন্যতম খনি। পৃথিবীর প্রায় ৩৫ হাজার প্রজাতির অর্কিডের মধ্যে আমাদের দেশে ১ হাজার ৩১৪ প্রজাতির দেখা মেলে। তার মধ্যে ৩০০ ধরণের অর্কিডের জন্ম উত্তরবঙ্গে। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবে অর্কিডকে নিয়ে কিছু করা যেতেই পারে। সমস্যা হল, অনেক কিছুর মতোই এই ব্যাপারেও আমরা কিছু করে উঠতে পারিনি। কালিম্পঙের মতো পাহাড়ি শহরে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু অর্কিড নার্সারি চোখে পড়লেও, সামগ্রিকভাবে অর্কিডকে ঘিরে কোনও প্রচেষ্টা চোখে পড়ে না। কার্সিয়ং - সাদা অর্কিডের দেশেও সেই বাড়তি উদ্যোগ নেই।
অথচ যদি চোখ রাখি প্রতিবেশী রাজ্য অসমের দিকে, তাহলেই দেখতে পাব অন্য চিত্র। অসমের কাজিরাঙ্গায় ১৬ বিঘা জমির ওপর ৫০০ প্রজাতির অর্কিড নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে দেশের বৃহত্তম অর্কিড পার্ক। আর তাকে ঘিরে নিত্যদিন যে কমর্কাণ্ড চলছে, তা নিঃসন্দেহে দেখার মতো। উল্লেখ্য, উত্তর-পূর্ব ভারতের ৮৫০ প্রজাতির মধ্যে অসমে পাওয়া যায় ৪০২ ধরণের অর্কিড। অর্থাৎ পার্কে কিছু অর্কিড আনা হয়েছে বাইরে থেকেও।
এমনিতে কাজি রাঙ্গা অভয়ারণ্য ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের মর্যাদা পেয়েছে। ফলে বন্যপশু দেখতে পর্যটকের সংখ্যা সেখানে বেশি। কিন্তু অর্কিড পার্ক যেন একদমই আলাদা। অর্কিড ছাড়াও এখানকার মিউজিয়ামে অসমের চিরাচরিত বাদ্যযন্ত্রের বিপুল সম্ভার রয়েছে। দেখা যায় কীভাবে তাঁত বোনেন স্থানীয়রা। কোহরা রেঞ্জের এই পার্কে প্রতি সন্ধ্যায় বর্ণময় অসমের সংস্কৃতি তুলে ধরেন স্থানীয় শিল্পীরা। রাভা, বোড়ো, কার্বি প্রভৃতি বিভিন্ন জনজাতির বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে বিহু, দেওধনি, ডোমেদিরাং, হামজার ইত্যাদি নানা শৈলীর নৃত্য গীত পর্যটকদের যেমন মন ভরায়, তেমনি শিল্পীদেরও পরিচিতি দেয়। আর টিকিট বিক্রির প্রাপ্ত অর্থ কো-অপারেটিভ পদ্ধতিতে সকলের উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা হয় ।
অরণ্য- পাহাড়- চা বাগান -ঝর্ণা - হিংস্র বনচর - জনজাতি সম্প্রদায় - কোচবিহার - বক্সার মতো প্রাচীন জনপদ মিলেমিশে উত্তরবঙ্গও কিন্তু কম বর্ণময় নয়। ফলে সদিচ্ছা থাকলে, এখানে পর্যটন প্রসারে অনেক কিছুই করা যেতে পারে। কিন্তু বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করে, জঙ্গলের চারপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো রিসোর্ট আর হোটেল তৈরি ছাড়া, আর কিছু হয়েছে বলে মনে পড়ছে না। উলটে জঙ্গল বা পাহাড় কেটে রাস্তা আর ইঁট-কাঠের জঙ্গল নির্মাণের কুফল টের পাচ্ছি আমরা। বিভিন্ন রিসোর্টে সন্ধেবেলায় ক্যাম্পফায়ার করে স্থানীয় সংস্কৃতি তুলে ধরবার চেষ্টা করা হলেও, কেন্দ্রীয়ভাবে একটি মাত্র মঞ্চে কিছু করবার কোনও তাগিদ নজরে আসে না। সেখানে কাজি রাঙ্গার অর্কিড পার্কের মতো বিষয় নিয়ে ভাবা তো অনেক পরের কথা!
আসলে অন্যেরা যা পারে, আমরা সেটি পারি না। ফলে পর্যটনের ক্ষেত্রে উত্তর যেখানে ছিল, সেখানেই রয়ে গেছে। পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু উত্তরকে চেনানোর প্রয়াস বৃদ্ধি পায়নি।
(লেখক শিক্ষক। কোচবিহারের বাসিন্দা)
** আজকের (মে ১২, ২০২৫) উত্তরবঙ্গ সংবাদের সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত একটি লেখা। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা কার্যকরী সম্পাদক ও উত্তরবঙ্গ সংবাদকে।

No comments:
Post a Comment