Inconvenience is regretted
শৌভিক রায়
হাজার হলেও ইংরেজির একটা ইয়ে আছে। আমার মতো ভেতো বাঙালকে যখন তখন পেড়ে ফেলতে পারে।
তাই টুক করে যখন 'Inconvenience is regretted' লেখা মেসেজটা ঢুকল ফোনে, তখন নিজেকে বেশ কেউকেটা মনে হচ্ছিল। একেই ইংরেজি, তায় আবার সেটা পাঠিয়েছে ভারতীয় রেল। চাড্ডিখানি কথা!
আমার মতো কালেভদ্রে ট্রেনে চাপা, শুধুমাত্র দিপুদা (দিঘা পুরী দার্জিলিং) ঘুরে বেড়ানো পাবলিকের কাছে সেটা বেশ ইয়ে ব্যাপার।
কিন্তু হঠাৎ এই সময়ে মেসেজ কেন? ঘড়িতে এখন দুপুর ১১.৩৯। পুরী থেকে আমার ট্রেন বন্দে ভারত (ট্রেন নম্বর২২৮৯৬) ছাড়বে দুপুর ১৩ টা ৫০ মিনিট। মেসেজ বলছে সেটি রিশিডিউল হয়েছে। ছাড়বে ২১টায়। অর্থাৎ মাত্র ৭ ঘণ্টা ১০ মিনিট পর।
পুলকিত হলাম। কত্ত যত্ন! কত্ত ভাবনা। আহা। স্টেশনে চলে গেলে শুধুমুধু বসে থাকতে হবে। ভিড় বাড়বে। টয়লেট উপচে পড়বে। কিছু লোক একটু পর পর 'হাওড়া থেকে ট্রেনটা এলো?' বলে খোঁজ নেবে! তার চাইতে এই ভাল। জানিয়ে দেওয়া আগেই। দুঃখ প্রকাশ করে নেওয়া।
আমার মনে হল বন্দে ভারত গাইছে, 'সেই ভাল সেই ভাল, আমারে না হয় না জানো!'
সত্যিই তো। অত জেনে হবেটা কী! মাত্র তো কয়েক ঘণ্টা লেট। ছাড়বে তো নির্দিষ্ট তারিখেই। ১৯ মে। একটু না হয় দেরি। ওটা মানা যায়।
হোটেলে চেক আউট ছিল সকাল সাতটায়। পুরীর নাকি সিস্টেম এটাই। ঘর ছেড়ে দিয়ে মালপত্র রেখেছিলাম রিসেপশনে। ভেবেছিলাম ঘণ্টা পাঁচেক এদিক ওদিক উঁকি দিয়ে ঢুকে যাব স্টেশনে। কিন্তু রাত নয়টা মানে অনেকটা।
অগত্যা গুটিগুটি পায়ে আবার রিসেপশনে। আমার কথা শেষ হতে না হতেই অধোবদনে গলায় মধু ঢেলে রিসেপশনিস্ট বললেন, 'স্যার...এটা কোনও কথা! আপনার ওই ঘরেই আপনি থাকবেন। যান। একটু রেস্ট নিন। আমরা তো আছি আপনার জন্য। এটুকু যদি না করি তবে কী করলাম স্যার...না না তাতে কী...কিচ্ছু অসুবিধে নেই। না স্যার জি এস টি লাগবে না। ওই বেস রেট যেটা, সেটাই দিন। কার্ড না স্যার... ক্যাশ... হে হে বোঝেনই তো! এই স্যারের ঘর পরিষ্কার করিসনি তো? না না দরকার নেই। করতে হবে না। স্যারকে দেখেই বোঝা যায় পরিচ্ছন্ন লোক। মাথায় চুল পর্যন্ত নেই। ঝকঝকে। যান স্যার। যান...রেস্ট করুন। ওহো....রেস্টুরেন্টে বলে যান। আজ তো ছাড়ছি না আপনাকে। আমাদের এখানে খেতেই হবে। কয়েকদিন ফাঁকি দিয়েছেন। বুঝেছি স্যার....আজ ছাড়ছি না.... হে হে... বোধহয় অসুবিধে হচ্ছিল আপনার। Inconvenience regretted স্যার...'
পুলকিত হলাম। সত্যি কত খেয়াল রাখে এরা! রেল কোম্পানির মতো এরাও কী সুন্দর দুঃখ প্রকাশ করল। আহা। এই না হলে ইয়ে!
রাত নয়টার মধ্যে স্টেশনে ঢুকে দেখি ডিসপ্লে বোর্ডে সেই রিশিডিউল সময় ২১ টা লেখা।পাশে প্ল্যাটফর্ম নম্বর নেই। ভাবলাম হতেই পারে। বন্দে ভারত বলে কথা। ইয়ে ট্রেন।
তারপর যা হয়। মোটামুটি পুরী স্টেশনের কোথায় কী আছে মুখস্ত হয়ে গেল। হাতের স্মার্ট ওয়াচ কনগ্রাচুলেট করল এত কম সময়ে পাঁচ হাজার পা হেঁটে ফেলার জন্য। দুজন উর্দিধারী প্রথমে কয়েকবার ট্যারা চোখে তাকিয়ে একটু পরেই বুঝে গেল আমি নেহাতই শান্তশিষ্ট ইয়ে লোক। দুটো নেড়ি কুকুর চার ঠ্যাং ছড়িয়ে শুয়ে শুয়ে নজর রাখতে লাগল!
চারদিকের ফিসফাস কানে এলো। প্রিমিয়াম ট্রেন! এই সেই...লেট রাইট... আরাইভাল ডিপারচার.... ওসবে কান দিলাম না। ট্রেন তো ঠিক তারিখেই ছাড়বে! সেটা কেউ বুঝছে না!!
রাত দশটার পর হাওড়া থেকে বন্দে ভারত পৌঁছল। লোকজন নামতেই দুদ্দাড় চেপে বসলাম আমরা। জলের বোতল থেকে পেপার সব এলো একে একে। নিজের সিটে বসে এই আমি, শান্তশিষ্ট, ভেতো বাঙাল, ঝিমুচ্ছিলাম।
হঠাৎ কপালে গুঁতো। সামনের সিটের। হ্যাঁচকা টানে কপাল ঠুকে গেছে আসলে। ধড়মড়িয়ে উঠলাম। দেখি ট্রেন চলছে। ঘড়ি বলছে সময় তখন ২৩:৪৫।
এটাই বন্দে ভারত। তারিখ ঠিক রেখেছে। একটু শুধু লেট করেছে। আসলে বড়ি বড়ি দেশ মে এরকম ছোটি ছোটি ইয়ে হোতা হ্যায়....
( বি দ্রঃ: হাওড়া পৌঁছলাম সকাল ৮.৫০। মাত্র ১৩ ঘণ্টা লেটে।
অবশ্য ১৯ মে, ২০২৫ তারিখের একটা দিন দেখে এই ট্রেনকে দাগিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। দিন কয়েক আগে পুরী পৌঁছেছিলাম কিন্তু ওই ট্রেনেই। নির্দিষ্ট সময়ের
আগেই.....)
( বোকামির এককাল)
No comments:
Post a Comment