Thursday, March 20, 2025

 



বারাণসী, বৃত্তপথের কারসাজি 

(সপ্তম পর্ব/ মহাকুম্ভের শেষ রাত ও দিন )

শৌভিক রায়

ঠিক রাত দুটোয় পৌঁছলাম বাঁধোয়া তাহিতপুর। আমাদের সামনে কানিহার চোরা। পুলিশ সেখানে রাস্তা আটকে বসে। ঝুঁসির দিক থেকে মহাকুম্ভে যেতে হলে এর চাইতে কাছে আর কোনও জায়গা নেই। বারাণসীর ড্রাইভার। খুবই কম বয়স। জানালো মহাকুম্ভ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন আসছে আর যাচ্ছে। আমরাই শেষ যাত্রী। আগামীকাল থেকে আর আসবার ব্যাপার নেই। আমাদের বারাণসীতে পৌঁছে দিয়ে ও নিজে কয়েকদিন বিশ্রাম নেবে। প্রতি রাতে এভাবে জেগে আর গাড়ির মধ্যে সামান্য ঘুমিয়ে আর পারছে না।

বাঁধোয়া তাহিতপুর নেহাতই গ্রাম। রাতের অন্ধকারে অবশ্য ভাল বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু যে কয়েকটা বাড়িঘর বা দোকানপাট নজরে এলো, তাতে সেরকমই মনে হল। অত রাতে সবই অবশ্য আষ্টেপৃষ্ঠে বন্ধ। শুধু পুলিশকর্মী আর কিছু অটো রিক্সাচালক জেগে। আমাদের ড্রাইভার ম্যাপ দেখালো। মেলা প্রাঙ্গণ এখন থেকে ঠিক ছয় কিমি। বাদবাকি যত জায়গায় পার্কিং আছে, সবই তার চাইতে বেশি। 

যাহোক অটো ঠিক হল। মাথাপিছু একশো টাকা। আমাদের সঙ্গে অটোতে উঠলেন এক বৃদ্ধা। ছেলে আর বৌমার সঙ্গে এসেছেন বারাণসী থেকে। ভদ্রলোক বললেন, `মায়ের জন্যই আসা। বয়স তো অনেকটাই। কিন্তু মা স্নান করবেনই।` কিছু বলবার নেই। যার যা বিশ্বাস। জানতে চাইলাম, `কখন আপনাদের স্নান করবার ইচ্ছে?` 
- পৌঁছেই করব। 
- ঠাণ্ডা লেগে যাবে তো। ভাল ঠাণ্ডা আছে তো। 
- নেহি বেটে, কুছ নেহি হোগা। সোচো মত। 
আমরা পশ্চিমবাংলা থেকে এসেছি শুনে মধ্যবয়স্ক অটোড্রাইভার জানালো যে, এবারের মহাকুম্ভে বাংলা, বিহার আর ঝাড়খন্ড থেকে নাকি বেশি মাত্রায় মানুষ দেখেছেন তিনি। অবশ্য ফোর-লেন সড়কে চলতে চলতে আমি নিজেও খেয়াল করছিলাম, পশ্চিমবঙ্গের নম্বর প্লেট লাগানো গাড়ির সংখ্যা প্রচুর।

টুকরো টুকরো গল্প করতে করতে ছয় কিমি রাস্তা শেষ হয়ে গেল। যেখানে আমরা নামলাম, সেখান থেকে দু`তিনশো মিটার দূরে মেলার আলো দেখা যাচ্ছে। মেলায় প্রবেশ করে বুঝলাম ব্যাপারটা অন্যরকম। না দেখলে ঠিক বোঝা যায় না। ত্রিবেণী সঙ্গমের দুদিকেই বিরাট ফাঁকা চত্বর। একদিকে বিভিন্ন মন্দির। অন্যদিকে মন্দির না থাকলেও, নানা আখড়া বসেছিল। সেসব এখন নেই। আমরা যেখানে সেক্টর একুশ-বাইশে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে সেক্টর এক বা দুই বেশ কয়েক কিমির ব্যবধান। জানা ছিল, সেক্টর একুশ বাইশ আসলে ত্রিবেণী সঙ্গম। তাই আমাদের চেষ্টা ছিল, সেখানেই পৌঁছোবার। নদীর মাঝে মাঝে অস্থায়ী ভাসমান ব্রিজ। সেগুলি এক, দুই নম্বর দিয়ে চিহ্নিত। আপাতত নদী পারাপার করা যাচ্ছে না। সব ব্রিজ বন্ধ। এই রাত আড়াইটাতেও দলে দলে লোকে স্নান করছে। বেশ ঠাণ্ডা। গায়ে গরম পোশাক থাকলেও নদীর হাওয়া মাঝে মাঝেই কাঁপিয়ে দিচ্ছে। হালকা কুয়াশাও দেখতে পাচ্ছি। হতে পারে সেটা ধুলোর আস্তরণ। নদীর ওপারের সারি সারি আলো দেখা যাচ্ছে। এপার থেকে দেখা না গেলেও, ওপারেও যে প্রচুর লোক বুঝতে পারছিলাম।  

ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম সব। এত রাতেও ফুলের মালা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জিনিস বিক্রি হচ্ছিল। কপালে তিলক বা ফোঁটা এঁকে দেওয়ার প্রচুর লোকও ঘুরঘুর করছে। যে কয়েকটি আখড়া দেখা যাচ্ছে তার অধিকাংশই বন্ধ বা ঝাঁপ ফেলা। আবার অনেকেই যে চলে গেছে, সেটাও বোঝা যাচ্ছিল। কিছু নাগা সন্ন্যাসী রয়ে গেছেন। ধুনি জ্বালিয়ে তাঁদের বসে থাকতেও দেখলাম। কল্কের আগুনে তাঁদের ঢুলুঢুলু চোখ আরও ছোট দেখাচ্ছিল জটা আর দাঁড়ির মাঝে। 

এক নম্বর ব্রিজ বা বাইশ নম্বর সেক্টর থেকে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা চলে এসেছি। হাতের স্মার্ট ওয়াচ বলছে কিমি পাঁচেক। অনেকগুলি ব্রিজ পেলাম। কিন্তু সব বন্ধ। ফিরলাম আবার। কিন্তু ততক্ষণে বেশ ক্লান্ত লাগছে।  বসা দরকার কোথাও। পেয়েও গেলাম জায়গা। চেয়ারে চা খেতে খেতে গল্প জুড়লাম উত্তরপ্রদেশ পুলিশের এক সব-ইন্সপেক্টরের সঙ্গে। তিনি ডিসেম্বরের ২৪ তারিখ থেকে আছেন। দুদিন পর এখানকার ডিউটি শেষ হবে বলে বেশ চনমনে ভাব। এবারের মহাকুম্ভ নিয়ে এমন কিছু তথ্য দিলেন, যেগুলি আমাদের জানবার নয়। পদপিষ্টের দিন নিজে কিছু মৃতদেহ উদ্ধার করেছিলেন। জানালেন সে কথাও।  

আমরা যেদিকে বসে আছি সেদিকটি পূর্ব। ধীরে ধীরে আকাশ পরিষ্কার হচ্ছে। এক সময় লাল টকটকে সূর্য আকাশে দেখা গেল। সকাল হল। বহুদিন পর এভাবে সকাল হওয়া দেখলাম। বেলা যত বাড়ছে, লোক তত বাড়ছে। শিবরাত্রির পবিত্র দিন। তার ওপর মহাকুম্ভের শেষ। ফলে লোকের বিরাম নেই। ঘন্টা দুয়েক আগেও যে রাস্তা ফাঁকা ফাঁকা দেখেছিলাম, এখন তাতে শুধু মানুষের ঢল।  আর এই ভিড় দেখতে দেখতেই সময় এগিয়ে চলল। দিনের আলোয় এখন ওপার দেখা যাচ্ছিল। সেখানেও প্রচন্ড ভিড়। তবু এত মানুষের প্রবল আওয়াজ, চিৎকার আর উপস্থিতি নিয়েও সঙ্গমে উড়ে বেড়াচ্ছিল একদল পাখি। 

হকারদের ট্রেড ক্রাই, লোকেদের স্নান আর মাইকে মুহুর্মুহ নানা ঘোষণার মধ্যেই আকাশে হেলিকপ্টার দেখা গেল। ওপর থেকে ফুলের বৃষ্টিতে ঢেকে গেল ত্রিবেণী। আওয়াজ উঠল নানা রকম। আর সেই আওয়াজের মধ্যে মহাদেব থেকে ছত্রপতি শিবাজি ও তাঁর পুত্র সম্ভাজিও রইলেন। অধুনা মুক্তিপ্রাপ্ত হিন্দি ছবির দৌলতে এই আওয়াজ কিনা সেটা অবশ্য বুঝলাম না। 




















মহাকুম্ভের ভিড়ের মধ্যে বারাণসীর মতো তথাকথিত ব্রাত্যজনের সংখ্যা বেশি হলেও, সমাজের সব স্তরের মানুষকেই দেখতে পাচ্ছিলাম। অবাক লাগছিল ভেবে, কীসের জন্য, কোন টানে তারা এত দূর বা কাছের থেকে ছুতে এসেছেন। মহাকুম্ভে স্নান করে কি আদৌ পাপ মুক্তি ঘটে? নাকি বিজ্ঞাপনী চমকে মেতে এত কিছু? কিংবা হুজুগ? উত্তর জানি না। হয়ত ভাবীকাল এর জানবে। কিন্তু এরকম দৃশ্য অভূতপূর্ব, অন্তত আমার জীবনে। সত্যি বলতে, মহাকুম্ভে যাবো সেটা মেলা শুরু হওয়ার পরেও ভাবিনি। কিন্তু কীভাবে যে চলে এলাম কোন সংযোগে সেটা নিজেও জানি না। হয়ত এটাই মাহাত্ম্য। 

নদীতে নৌকো ও ড্রাম দিয়ে ঘাট করে দেওয়া হয়েছে। সেখানেই এক এক ঘাটে স্নান করছেন মানুষ। জলে ভাসছে ফুল বেলপাতা থেকে প্রদীপ ইত্যাদি। পরিষ্কারও হচ্ছে যতটা সম্ভব। তর্পণ করছে সবাই। এত ভিড় যে যে ঠেলে গুঁতিয়েও ঘাটের কাছে পৌঁছনো যাচ্ছে না বললেই চলে। ক্যামেরার লেন্সে জুম করে দেখলাম, ওপারেও একই অবস্থা। সেদিন নৌকো করে নিয়ে গিয়ে স্নান করানোও বন্ধ। ব্রিজগুলিও নাকি খুলবে না। রাতের ধকল, মেলায় প্রায় পনেরো কিমি এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি, খাবার না খাওয়া ইত্যাদি সব মিলিয়ে শরীর বেশ কাহিল। তবু যতটা পারছিলাম দেখে নিচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল, এই দৃশ্য অনন্ত। এর শেষ নেই। আসলে প্রবাহিত মানব জীবন কবে আর শেষ হবে! ব্যক্তি চলে যাবে, ব্যক্তি থাকবে। এখানেই জয় মানবাত্মার। আর সেই জয়েরই গান বোধহয় মহাকুম্ভে। 

এগারোটা নাগাদ বেরিয়ে এলাম। এবার আর অটো নয়। বাইকে। সেটির আবার হর্ণ নেই। আমার ছেলের বয়সী বাইক-চালক সারা রাস্তা `হঠিয়ে সাইড দিজিয়ে` আর রীনা `বাবু যারা ধীরে চালাও, গির জায়েঙ্গে` করতে করতে পার্কিং পর্যন্ত এলো। গাড়িতে উঠে চারদিক দেখতে দেখতে দুপুর দুটো-আড়াইটার মধ্যে আবার বেনারসে। সেই সন্ধেতেও বেনারসের ঘাটে। ভিড় উপচে পড়ছে সেখানেও। দেখলাম শিবের বরযাত্রাও।  

মহা শিবরাত্রির  বেনারস না দেখলে ঠিক বুঝে ওঠা যাবে না, সে কী দৃশ্য! আগামীকাল সারাদিন থাকছি। রাতে ট্রেন। মেসেজ এলো দিল্লি থেকে রাজধানী দুই ঘন্টা দেরিতে ছাড়বে। অর্থাৎ বেনারস জংশনে পৌঁছবে রাত একটা নাগাদ। আমাদের এবারের সবকিছুই রাতে। এটিও অন্য অভিজ্ঞতা।         

* ছবি- শৌভিক ও রীনা 

(চলবে)

No comments: