Wednesday, March 19, 2025




বারাণসী, বৃত্তপথের কারসাজি 

(ষষ্ঠ পর্ব/ সিরাজের রিকশা এবং রাতের অভিযান )

শৌভিক রায়

লকসা থানার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল সিরাজ। পায়ে টানা রিকশা নিয়ে। বাঙালি বুঝেই বোধহয় খুব বেশি চাইল না। না হলে, আগের যত রিকশা বা অটোকে জিজ্ঞাসা করেছি, প্রত্যেকেই ভাল পয়সাই চেয়েছে। খুব বেশি কিছু দেখব না। কয়েকটি মন্দির আর কাশী হিন্দু ইউনিভার্সিটি দেখাটাই মূল উদ্দেশ্য। 

গুরুদোয়ারা থেকে বাঁ হাতে বেঁকে আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ রোড আর ভেলুপুরা রোড হয়ে সিরাজ এগিয়ে চলল দুর্গাকুণ্ড রোডের দিকে। তিন পুরুষ ধরে সিরাজরা বারাণসীতে। ওর ঠাকুরদা প্রথম এসেছিলেন। আর বাবার হাত ধরে সে নিজে। দেশের বাড়ি মালদার সঙ্গে অবশ্য রয়েছে যোগ বরাবর। সিরাজের নিজের স্ত্রী-পুত্রও ওখানেই। তিন চার মাস পর পর কিছুদিনের জন্য দেশের বাড়ি যাওয়া আর আবার ফিরে আসা। এভাবেই চলছে তার দিন গুজরান। 

বেশ লাগছিল সকালের বারাণসীতে। হালকা ঠান্ডা। একটু গা শিরশির করলেও, কোচবিহার বা উত্তরবঙ্গের তুলনায় কিছুই না। সদ্য জেগে উঠছে শহরের। এখনও যেন ঘুমের রেশ কাটেনি। মহাকুম্ভ আর শিবরাত্রি বলে এখানেও নানা দিকে নো পার্কিং। যে সব হোটেলে পার্কিং রয়েছে, সেগুলিতে গাড়ির বেশ ভিড়। বিশ্বনাথ মন্দিরমুখী জনতার ঢলের কমতি নেই। রাজপথ, অলিগলি সব রাস্তাতেই দেখা যাচ্ছে তাদের। কে নেই সেই ভিড়ে! মহাদেব নিজে অর্ধনারীশ্বর রূপ নিয়েছিলেন বলে, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরাও আছেন। তাদেরই একটি দল হাতে ক্যামেরা দেখে হাত নাড়লেন। ভাল লাগল খুবই। 

আমাদের প্রথম গন্তব্য দুর্গা মন্দির। ১৮ শতকে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন বাংলার রানি ভবানী। এই মন্দিরের পাঁচটি শিখর ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোমকে  প্রতিনিধিত্ব করছে। শিখরগুলি মিলেমিশে এক হয়ে পঞ্চভূতের পরম বহ্মে মিলিয়ে যাওয়াকেই বোঝাচ্ছে যেন! নাগরা শৈলীর মন্দিরটির রং আর পাশের কুণ্ড নিঃসন্দেহে ভাল লাগতে বাধ্য। দুর্গা মন্দিরের কাছেই তুলসী মানস মন্দির। `রামচরিত মানস` রচয়িতা তুলসীদাসের স্মৃতিতে ১৯৬৪ সালে এই মন্দিরটি  নির্মাণ করা হয়। এখানেই, মন্দিরের কাছে, গঙ্গা তীরে তুলসীদাস সৃষ্টি করেছিলেন তাঁর অমরকাব্য। তাঁর সৃষ্ট আটখণ্ড দোঁহা এখানে উৎকীর্ণ করা হয়েছে শ্বেত পাথরে। 

সঙ্কটমোচন মন্দিরে ঢুকবার আগে বিশেষ প্রয়োজনে ঢুকতে হলে, রাস্তার ওপারের মেগা মার্টে। এত সকাল বলে কোনও ক্রেতা নেই সেখানে। ঝাড়পোঁছ চলছে।  সেলসম্যান ছেলেগুলির বয়স অল্প। আমি জিনিস দেখায় ব্যস্ত ছিলাম। সেই ফাঁকে ওদের সঙ্গে রীনার ভাব জমে গেল। আমার হাতে ক্যামেরা। `ম্যাডামজি`র কাছে ওদের দাবি `স্যারজি`কে ওদের ছবি তুলে দিতে হবে।  শুরু হল ওদের ফোটো সেশন। বেশ মজা লাগছিল। শপিং মলে ঢুকে এভাবে ফোটোগ্রাফার হয়ে যাব, ভাবিনি কোনও দিন। বারাণসী সে সুযোগও করে দিল। 

সঙ্কটমোচন ও হনুমান মন্দিরে সেদিন বেশ ভিড়। মঙ্গলবার নাকি হনুমানজির দিন। জানতাম না সেটা। ফলে অন্য দিনের তুলনায় লোকজন বেশি। লাইন দিতে হল। তবে মিনিট পনেরোর মধ্যে দর্শন হয়ে গেল। ভাল লাগল দেখে বিদেশি দুই মহিলা, উত্তরপ্রদেশ পুলিশের উর্দি পরা এক মাঝবয়সী ভদ্রলক সহ শতাধিক মানুষ কীর্তন গাইছেন। মূল গায়কের চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তিনি বেশ `খানদানি আদমি`। সিরাজ আরও কিছু মন্দির দেখালো। ইতিমধ্যেই মা দুর্গা, রাম সীতা এবং হনুমানের আশীর্বাদ নিয়ে নিয়েছি। তাই রিকশায় বসেই প্রণাম সারলাম। রীনার হাঁটু আর আমার কোমরের সমস্যা। বারবার নাম ওঠা করাটাও কষ্টকর। কী আর করা যাবে!

















সঙ্কটমোচন মন্দির থেকে একটু দূরেই কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় যা বেনারস  হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় বা বিএইচইউ নামেই বিশেষ পরিচিত। আগে কোনও দিন এখানে আসিনি। দীর্ঘদিনের ইচ্ছে ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয় দেখবার। অবশেষে আজ সেটি পূরণ হল। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গন দেশের সর্ব বৃহৎ। দায়ী হাজার একর জমিতে ৫ বর্গ কিমি জুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তার। অ্যানি বেসান্ত-এর সেন্ট্রাল হিন্দু কলেজ পরবর্তীতে মদনমোহন মালব্যের একক প্রচেষ্টায় আজকের এই বিরাট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এখানে মোট ১১২টি বিষয়ে শিক্ষাদান করা হয়। প্রত্যেকটি ভবন আলাদা। তাদের স্থাপত্যও অসাধারণ। ভারত কলা ভবনে টিকিট কেটে মিউজিয়াম দেখে নিলাম। যে ভাস্কর্য প্রদর্শিত হয়েছে, সেরকম নানা জিনিস অন্যত্র বহু দেখেছি। কিন্তু মদনমোহন মালব্যকে মরণোত্তর ভারতরত্ন প্রদান করার সার্টিফিকেটে  বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সই এবং মেডেলটি দেখা জীবনের অন্যতম সেরা পাওনা রয়ে রইল। মদনমোহন মালব্যর জীবন নিয়ে নির্মিত গ্যালারি থেকে তাঁর ও অতীত বারাণসী সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানা গেল। বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে বিড়লা মন্দির। এটি আসলে ধ্বংসপ্রাপ্ত মূল বিশ্বনাথ মন্দিরের রেপ্লিকা। এটির পরিকল্পনাও মদনমোহন মালব্যর। নির্মাণ সহয়তায় ছিলেন বিড়লারা। যতটা সম্ভব ক্যাম্পাস ঘুরে, বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট দেখে ফিরতি পথে ভেলুপুরের সি এম এংলো বেঙ্গলি কলেজটিও বাইরে থেকে দেখলাম। অন্য কোনও কারণ নয়। বারাণসী যে সর্ব ধর্মের প্রাচীনতম জনপদ, সেটি বুঝতেই। বলতে ভুলে গেছি, গোধুলিয়ার  গির্জাটিও কিন্তু বেশ সুন্দর। একই রকম দুরন্ত পার্শ্বনাথের জন্মস্থান।  

এসব দেখতে দেখতে কখন যে বেলা গড়িয়ে গেছে টের পাইনি। হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হতে হতেই সন্ধে কড়া নাড়ল। চললাম আবার ঘাটে। রাতের গঙ্গা আর ভিড় কে বাদ দেয়? পরদিন বুধবার। শিবরাত্রি। সুতরাং ভিড় আর বাঁধ মানছে না। বন্যার স্রোতের মতো মানুষ আর মানুষ। থিকথিকে ভিড়ে, বিশ্বনাথ মন্দির আর লাগোয়া ঘাটগুলিতে, সময় কেটে গেল দ্রুত। 

রাত ঠিক এগারোটায় বেরোলাম আবার। নো এন্ট্রির জন্য গাড়ি ঢুকতে পারছে না। দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছুটা দূরে। টানা রিকশা পৌঁছে দিল সেখানে।

চললাম এলাহাবাদে। মহাকুম্ভে। `পুণ্য অর্জন করতে যাচ্ছে` ভাবলে সেটাই, `দেখতে যাচ্ছে` ভাবলেও সেটাই। আর কয়েক ঘন্টা পরেই শিবরাত্রির পবিত্র দিন। মহাকুম্ভের শেষ শাহি স্নান। মতান্তরে গুরুত্বপূর্ণ স্নান। আমি নিজেও দ্বিতীয় মতে বিশ্বাসী। কেননা আমার যতটুকু জানা, তাতে বাসন্তী পঞ্চমীতেই শেষ শাহি স্নান হয়ে গেছে। ভাঙা কুম্ভে কী দেখব, জানিনা। যাচ্ছি তবু। 

এত লোক কেন যাচ্ছেন, জানতে হবে সেটা। বুঝতে হবে সেটা। 
জানি একদিনে বোঝা বা জানা যাবে না কিছুই। তবু অক্ষম চেষ্টা। 

রাতের অন্ধকারে গাড়ি ছুটল এলাহাবাদের দিকে। চার লেনের রাস্তা। ফাঁকা। হু হু করে বেড়ে গেল গাড়ির স্পিড.....                 

* ছবি- শৌভিক ও রীনা 

(চলবে)

No comments: