বারাণসী, বৃত্তপথের কারসাজি
(অন্তিম পর্ব/ বুদ্ধ পথই শেষ কথা)
শৌভিক রায়
অটো ড্রাইভার ছান্নু প্যাটেল নিয়ে এলেন শ্রীকৃষ্ণ ভাণ্ডারে। পরিচ্ছন্ন দোকানে এই সকালেই যথেষ্ট ভিড়। সারাদিনের নামে বেরোনোর আগে বারাণসীর কিছু বিশেষ খাবার চাখা হল। তার মধ্যে মন কাড়ল মালাইয়ো। আপাতত গন্তব্য সারনাথ। `সারঙ্গ` অর্থাৎ মৃগ আর তাদের দলপতি `নাথ` থেকে জায়গাটির নাম সারঙ্গনাথ বা সারনাথ। তবে অতীতে ঋষিদের আশ্রমের জন্য ঋষিপত্তন বলেও পরিচিত ছিল বারাণসীর ১০ কিমি দূরের একদা ছোট্ট গ্রামটি। আজ অবশ্য আর গ্রাম নয় সেটি। নগরায়ণ এখন এতটাই ব্যাপ্ত যে, কোনটি গ্রাম আর কোনটি শহর, বোঝা শক্ত।
সারনাথের খ্যাতি বিশ্বময়। নির্বাণ প্রাপ্তির পর, এখান থেকেই সিদ্ধার্থ, তাঁর পাঁচ শিষ্যের মধ্যে, প্রথম ধর্মচক্র প্রবর্তন অর্থাৎ পরম শান্তি মহাজ্ঞান ও নির্বাণ প্রাপ্তির অষ্টমার্গের পথ বা বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন। খ্রিস্টের জন্মের চারশো বছর আগে থেকে ১২ শতক পর্যন্ত ভারতের শিক্ষাদীক্ষার পীঠস্থান ছিল সারনাথ। ফা-হিয়েন এবং হিউয়েন সাঙের বর্ণনায় পাওয়া যায় সারনাথের কথা। পাঁচ থেকে ক্রমে ৬০ জন শিষ্য হলে এখানে সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ছড়িয়ে পড়েছিল বুদ্ধের অহিংসার বাণী সারা ভারতে।
সারনাথের অন্যতম আকর্ষণ ধামেক স্তুপের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ ভিজে উঠল। মনে পড়ল, একদিন আমাকে আর দাদাকে স্তুপের সামনে দাঁড় করিয়ে বাবা আগফা ক্যামেরায় সাদা-কালো ছবি তুলেছিলেন। জনশ্রুতি এই স্তুপে রাখা আছে বুদ্ধের অস্থি। এখানেই বুদ্ধ তাঁর প্রথম পাঁচ শিষ্যকে পাঠ দিয়েছিলেন। আটকোণা স্তুপ বুদ্ধধর্মের অষ্টমার্গকে অনুসরণ করে গড়ে তোলা হয়েছে। নিচের ব্যাস ২৮ মিটার, মাঝখানে ১৩ মিটার এবং চুড়ো ৩১ মিটার। স্তুপের গায়ে নানা নকশা করা। সেগুলি গুপ্ত যুগের হলেও, স্তুপের ইঁট খ্রিস্ট পূর্ব ২০০ বছরের অর্থাৎ মৌর্যকালের। সুসজ্জিত স্তুপের সামনে আমাকে দাঁড় করিয়ে ছবি তুলল রীনা। আর উল্টোদিকের এক্সক্যাভেশন সাইটকে পেছনে রেখে আমাদের দুজনের ছবি তুলে দিল কোরিয়া থেকে আসা এক মিষ্টি ছেলে। এতটাই ভাল সে যে, ওর স্মৃতি রাখলাম সেলফি তুলে।
ধামেক ছাড়াও চৌখণ্ডি ও ধর্মরাজিক স্তুপ রয়েছে এখানে। রয়েছে অশোক পিলার। মহাবোধি সোসাইটি টেম্পলটিও ভারতের প্রাচীন মন্দিরগুলির একটি। ধামেক স্তুপের কাছের এই মন্দিরটি গুপ্ত যুগে ইঁট নির্মিত ছিল। পরবর্তীতে জরাজীর্ন অবস্থা হলে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ধর্মপালের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য নিয়ে মন্দিরটি আবার গড়ে তোলা হয়। মন্দিরে রাখা আছে সোনার বুদ্ধমূর্তি। কাছেই রয়েছে বোধিবৃক্ষ। শ্রীলঙ্কার অনুরাধাপুর থেকে এনে ১৯৩১ সালে এই গাছটি পোঁতা হয়। গাছের তলায় মহানামা, ভদ্দিয়, ওয়াপ্পা, অস্মজী ও কোন্দানোয়ের মূর্তি। এঁরাই বুদ্ধের সেই পাঁচ শিষ্য। মন্দির চত্বরে ধর্মপালের স্মৃতিস্তম্ভটিও দর্শনীয়। এখানেই আমাদের সঙ্গে দেখা হল ভিয়েতনাম থেকে আসা একদল পর্যটকের সঙ্গে।
সারনাথে জাপান, তিব্বত, থাইল্যান্ড ইত্যাদি বৌদ্ধ ধরে দেশ থেকে বিভিন্ন মন্দির তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকটিই অত্যন্ত সুন্দর। অনবদ্য তাদের স্থাপত্য। জাপানি বৌদ্ধ মন্দিরে, প্রসাদ হিসেবে, সন্ধেবেলায় চকলেট দেওয়া হয়। মোটামুটি সব দেখে ঢুকে পড়লাম মিউজিয়ামে। অত্যন্ত যত্নে এখানে রাখা হয়েছে বুদ্ধমূর্তি, সম্রাট অশোকের তৈরি ধর্মচক্রের ওপর চার সিংহ, ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে প্রাপ্ত নানা ভাস্কর্য। ফরাসি, ইংরেজি, হিন্দি ইত্যাদি নানা ভাষায় টুরিস্ট গাইডরা নানা বিষয় বোঝাচ্ছেন বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা নানুষদের। আমাদের অবশ্য গাইড নেই। প্রয়োজনও নেই। সব কিছুতেই স্ক্যানার রয়েছে। গুগুল লেন্স দিয়ে স্ক্যান করে দেখে নিলেই হল।
সব দেখতে দেখতে অনেকটাই বেলা হয়ে গেল। ছান্নুজি বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন ঠিক কী দেখতে চাই। ফলে ফিরতি পথে নিয়ে চললেন বারাণসীর অখ্যাত সব রাস্তা দিয়ে। এই অঞ্চলে গরীব মুসলিমদের বাড়িই বেশি। অন্য ধর্মের মানুষও আছেন। দারিদ্র তাদের এক করে দিয়েছে। বারাণসী সিটি রেল স্টেশনের কাছ দিয়ে অবশেষে আসা গেল রাজপথে। গন্তব্য রামনগর রাজবাড়ি। ১৭ শতকে বারাণসীর সবচেয়ে আলোকিত আর ঝলমলে মহল ছিল কাশীরাজের এই মহল। অবশ্য আজও যথেষ্ট সম্ভ্রম জাগিয়ে তোলে সেই প্রাসাদ। এখানে এখনও রাজবংশের উত্তরাধিকারীরা থাকলেও, একটি অংশ আমাদের মতো সাধারণদের জন্য উন্মুক্ত। সেখানেই দেখা গেল কাশীরাজের অতীত বিত্ত ও বৈভব। রয়েছে অস্ত্রাগার, দুষ্প্রাপ্য গাড়ি, রুপোর পালকি, হাওড়া, হাতির দাঁতের বিভিন্ন সামগ্রী। আমাকে বিশেষ করে আকৃষ্ট করল কাশী মহারাজকে উপহার দেওয়া বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লার তরবারি। ১৮৭২ সালে বি. মূলচাঁদের তৈরি ঘড়িটিও অনবদ্য। এটিতে সূর্য, চন্দ্রের অবস্থান, সময়-তারিখ-বার ইত্যাদি সব দেখা যায়। গঙ্গার ধারে রাজপরিবারের মন্দিরটিও দুর্দান্ত। এখানে দাঁড়ালে আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। তবে আজকাল সর্বত্র রিল শিকারিদের ভিড়। নিষেধাজ্ঞা সত্বেও যেভাবে রাজবাড়ীর মধ্যে তাদের তাণ্ডব চলছিল, তাতে মনে হচ্ছিল, এসব দেখে সাহস পর্যন্ত রাজবাড়ীর দরজা না বন্ধ হয়ে যায়!
...... কোনও কোনও ভ্রমণ শেষ হয় অতীতের হাত ধরে। এই লেখার শুরুতেই বলেছিলাম, আসলে এবারের বারাণসী আসলে নিজেকে ফিরে দেখা। বাবা-মায়ের হাত ধরে, ঠাকুমা-ঠাকুরদা স্নেহ মেখে যে পথে ঘুরেছি একদিন, আবার দেখা সেসব।
মিথ্যে বলব না, এবারের বারাণসীর শেষ দিনে মনে হচ্ছে, আরও কিছু বাকি রয়ে গেল হয়ত! যতই বলি না কেন, পৃথিবীতে শূন্য কিছু থাকে না, আসলে প্রিয়জনদের অভাব কখনও মেটে না। কোমরে হাত দিয়ে একটু টেনে টেনে চলা কোনও বৃদ্ধাকে দেখে তাই মনে হয়েছে, ওই তো ঠাকুমা! আবার ন্যুব্জ হয়ে যাওয়া বৃদ্ধটির মধ্যে দেখেছি ঠাকুরদাকে। আর বাবা-মা তো সবসময় সঙ্গে আছেন তাঁদের মমতা আর ভালবাসা নিয়ে গঙ্গার ধারে, বিশ্বনাথ মন্দিরে, বারাণসীর অলিগলিতে, সারনাথে। শক্ত করে ধরে রেখেছেন হাত। অগণিত এই যে জনতা তারাই তো আমার আসল জন, আপন জন। তাদের মধ্যেই লুকিয়ে আমার পরিবার পরিজন। তবু এ এক অন্য পরিভ্রমণ।
বারাণসী জংশনে ট্রেন ঢুকল যখন, রাত তখন একটা। পাঁচটা রাত আর ছয়টি দিন। আমার হিসেবে কত? না-ই বা বললাম। হিসেবে তো আসলে মেলে না কখনও। তার ওপর সেটা যদি হয় বারাণসী, তবে তো মিলবে না আরও......
* ছবি- শৌভিক ও রীনা

















No comments:
Post a Comment