শৌভিক রায়
`অলিগলির গোলকধাঁধাঁয়` কোথায় যে লুকিয়ে মন্দিরটি, বুঝতেই পারিনি। অথচ ওই রাস্তায় বারতিনেক এদিক ওদিক করলাম একটু আগেও। যে দু`তিনজনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁরাও ঠিকঠাক বলতে পারলেন না। অবশেষে খুঁজে পেলাম বারাণসীর বিখ্যাত কোচবিহার কালীবাড়ি।
সোনারপুরা বাঙালিটোলায় এই প্রাচীন মন্দিরটির দুশো বছর বয়স হতে খুব বেশি বাকি নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে কোচবিহারের পুরোনো ইতিহাস। কিন্তু এই ভগ্নপ্রায় এই মন্দির দেখে কে বলবে, কত ঐশ্বর্য লুকিয়ে এখানে!
বাঙালিদের দ্বিতীয় বাড়ি বলে খ্যাত বারাণসীর সঙ্গে কোচবিহারের যোগ দীর্ঘদিনের হলেও, মন্দির প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন মহারাজা হরেন্দ্রনারায়ণ ভূপ। কোচবিহারের মহারাজাদের মধ্যে, তিনি ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই আলাদা। সাহিত্যপ্রেমী ও কবি হরেন্দ্রনারায়ণের `রাজত্বকাল কোচবিহারের সাহিত্য আলোচনায় এলিজাবেথানীয় যুগ' বলে পরিচিত। পণ্ডিত নিযুক্ত করে সংস্কৃত থেকে বাংলায় রামায়ণ, মহাভারত, বিষ্ণুপুরাণ ইত্যাদিও অনুবাদ করিয়েছিলেন তিনি। ১৮৩৬ সালে রাজকার্য থেকে অবসর নিয়ে চলে যান বারাণসীতে।
সেখানেই বাসস্থান নির্মাণের পাশাপাশি, কালীমন্দির স্থাপনার কাজেও হাত দেন হরেন্দ্রনারায়ণ। কিন্তু ১৮৩৯ সালে মৃত্যু হয় তাঁর। অসমাপ্ত নির্মাণ সম্পূর্ণ করতে এগিয়ে আসেন জ্যেষ্ঠপুত্র মহারাজা শিবেন্দ্রনারায়ণ। তৈরি হয় মন্দির। অক্ষয় তৃতীয়ার পবিত্র দিনে, ১৮৪৬ সালের ৭ মে (বঙ্গাব্দ ১২৫৩, বৈশাখ ২৪), উদ্বোধন হয় মন্দিরের। প্রতিষ্ঠিত হন করুণাময়ী কালী ও দয়াময়ী কালী। অনিন্দ্যসুন্দর মূর্তির পাশাপাশি সত্ৰও নির্মাণ করা হয়েছিল। এখনও দেখেই বোঝা যায়, অতীতে অত্যন্ত সুদৃশ্য ছিল মন্দিরটি। চ্যাপ্টা লাল ইটের তৈরি মন্দিরগাত্রের অপরূপ কারুকাজ বিস্মিত করে তুলল। একদিকের প্রবেশদ্বারে মহারাজা শিবেন্দ্রনারায়ণের নামোল্লেখ বলে দিচ্ছিল মন্দিরের প্রাচীনত্ব। লাগোয়া রাধাকৃষ্ণ ও শিবমন্দির দেখে নিলাম। মুগ্ধ করল হাওয়ামহলটি। এখানে থাকাও যায়।
কিন্তু সবেতেই এখন ছন্নছাড়া অবস্থা। বারাণসীর বাসিন্দা চিত্রশিল্পী শর্মিষ্ঠা রাহা বললেন, `বছর কুড়ি আগের সেই মন্দির আর নেই। অত্যন্ত করুণ হাল। সংরক্ষণ ও যত্নের অভাবে নষ্ট হচ্ছে সব।` অতীতে এখানে `বড়মা` ও `ছোটমা`-এর পুজো হতো শুদ্ধ উপাচারে। নিত্যদিন রুপোর বিরাট পরতে সাজানো থাকত নৈবেদ্য। অন্নভোগ নিবেদিত হত গোটা কুড়ি রুপোর বাটিতে। `সামনের সুদৃশ্য বাগানের ফোয়ারা দেখতেই তো কত মানুষ ভিড় জমাতেন`, বললেন গবেষক-শিক্ষক প্রসাদ দাস। সেই সময় তাঁরা প্রায়ই যেতেন ওখানে। থাকতেন মন্দির চত্বরে। `খুব ভাল ছিল থাকবার ব্যবস্থা। আর এখন? না বলাই ভাল।`
সত্যিই তাই। ভাঙা দেওয়াল, উঠে যাওয়া চুন সড়কি, রং চটে যাওয়া দেওয়াল, ইতস্তত ফেলা আবর্জনা সব মিলিয়ে নান্দনিক পরিবেশটিই আর নেই। শুকিয়ে গেছে একদা সাজানো বাগান। চারদিকেই নৈরাজ্যের হাহাকার। ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহৃত হতে হতে, মন্দির হারিয়ে ফেলছে তার নিজস্ব গাম্ভীর্য ও শুদ্ধ পরিবেশ। দৈনন্দিন কাজে এখন যেন শুধুই নিয়মরক্ষা। ভালবাসার অভাব সুস্পষ্ট। মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে গঙ্গার কেদারঘাট কাছেই। আর সামান্য এগোলেই হরিশচন্দ্র ঘাট। মন্দির থেকে ভেতর দিয়েই একসময় ঘাটে যাওয়া যেত। দেখলাম সেই পথ এখন জবরদখলকারীদের। রয়েছেন অন্যান্য ভাড়াটেরাও। তাঁদের শরীরী ভাষা বলে দিচ্ছে, মন্দিরের ঐতিহ্য নিয়ে তাঁদের কোনও মাথাব্যথা নেই।
অথচ, পিতার মতোই মহারাজা শিবেন্দ্রনারায়ণ ভূপ তাঁর শেষ জীবন কাটিয়েছিলেন বারাণসীতে। তিনিও এখানে দেহরক্ষা করেন। এই ভবনেই যাতায়াত ছিল বর্তমান কোচবিহারের রূপকার মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ ভূপ বাহাদুরের। কোচবিহারের মানুষদের জন্য একসময় এই মন্দির ছিল বারাণসী ভ্রমণের সেরা আশ্রয়। ছিল বৃদ্ধাবাসও। ঐতিহাসিক দিক থেকেও তাই এই মন্দিরের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু প্রশাসনিক স্তরে মন্দির নিয়ে সেভাবে কোনও ভাবনাচিন্তা আছে বলে মনে হয় না। `মৌখিকভাবে জেলা কর্তৃপক্ষকে কালীবাড়ির দৈন্যদশা সম্পর্কে জানিয়েছি। দেখা যাক, কতটা কাজ হয়। দরকারে বৃহত্তর আন্দোলনে যেতে হবে। এই প্রজন্ম তো জানতেই পারল না এই মন্দিরের কথা।`, বললেন কোচবিহার রয়াল ফ্যামিলি সাকসেসরস ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের অন্যতম কর্তা কুমার মৃদুলনারায়ণ।
কিছুদিন আগে এই মন্দির চত্বরে বঙ্গভবন তৈরির একটি প্রস্তাব এসেছিল। বেশ বিতর্ক হয়েছিল সেটি নিয়ে। সেটি হলে, ভাল না মন্দ হতো, সে প্রশ্নে যাচ্ছি না। কিন্তু চোখের সামনে হেরিটেজ একটি ভবন ও মন্দিরের এই অবস্থা দেখে, পর্যটক হিসেবে কষ্ট হল। ভাবতে অবাক লাগছিল, এখানে কত ধুমধামের সঙ্গে একসময় দুর্গাপুজো হত। প্রসাদ গ্রহণ করতেন পুরো মহল্লা। রাজকর্মচারী ও আধিকারিকদের দৃপ্ত পদচারণায় ফুটে উঠত কোচবিহার রাজ্যের গৌরব। শুধু স্থানীয়রা নন, বাইরে থেকেও মন্দির দর্শনে আসতেন বহু পুণ্যার্থী। সেটি হয় এখনও। কিন্তু সেই গৌরব আর নেই।
সবই যেন হারিয়ে গেছে আজ। মনে হল, প্রবাহিত গঙ্গার মতোই, সময়ের স্রোতে, এক উজ্জ্বল অতীত খন্ডহর হওয়ার অপেক্ষায় বোধহয় দিন গুনছে।
(প্রকাশিত: রংদার রোববার/ উত্তরবঙ্গ সংবাদ, মার্চ ১৬, ২০২৫)
** বিশেষ কৃতজ্ঞতা কার্যকরী সম্পাদক ও উত্তরবঙ্গ সংবাদকে
( প্রকাশিত এই লেখাটি `বারাণসী, বৃত্তপথের কারসাজি` সিরিজের চতুর্থ পর্ব)

No comments:
Post a Comment