Friday, March 14, 2025


 

বারাণসী, বৃত্তপথের কারসাজি 
(তৃতীয় পর্ব/ জয় বাবা বিশ্বনাথ)
শৌভিক রায়

ভোর তিনটায় দাঁড়িয়ে পড়লাম লাইনে। দশাশ্বমেধ ঘাট ফেরতা ডাইনে আর গোধূলিয়ার দিক থেকে ঘাটের দিকে আসতে বাঁ হাতে সরু গলি। সেই গলিতেই কাশী বিশ্বনাথ মন্দির। আজকাল গঙ্গা থেকেও সোজা মন্দিরে ঢোকা যায় নবনির্মিত সুদৃশ্য ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে। 

আমরা দাঁড়িয়ে আছি দশাশ্বমেধ ঘাট রোডে।  বিশ্বনাথ মন্দিরের গলি, অর্থাৎ যেখান থেকে ডাইনে বেঁকতে হবে আমাদের, সেই চৌমাথা মেরেকেটে বড়জোর দুশো মিটার। আর সেখান থেকে আরও চারশো মিটার দূরেই মন্দির। 

এখনও ভোরের আলো ফোটেনি। কিন্তু রাস্তায় অজস্র লোক। রাস্তার একপাশে লোহার রেলিং। আমাদের লাইন তার ভেতরেই। শুনলাম এটা চার নম্বর গেটের লাইন। আমাদের ঠিক  পেছনে এক সম্ভ্রান্ত পরিবার। আমারই মতো প্রৌঢ় দুই ভাই। সঙ্গে তাঁদের স্ত্রী ও সন্তানরা। কর্ণাটক থেকে এসেছেন। আমাদের সামনে বিহারের কোনও এক গ্রাম থেকে আসা দেহাতি পরিবার। বেশ কয়েকজন। 

পাশাপাশি দুটি লাইন। একসঙ্গে এগোচ্ছে। ওই লাইনে চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়সী কয়েকজন ছেলেকে দেখতে পাচ্ছি। তাদের আগে মাথায় ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন মধ্যবয়স্কা। মোটামুটি সবাই নিশ্চিন্ত, খুব তাড়াতাড়ি দর্শন হয়ে যাবে। লাইন মাঝে মাঝে এগোচ্ছে। থামছে। আবার এগোচ্ছে। রেলিংয়ের ওপাশে ক্রমশ সাধারণ মানুষের ভিড় বাড়ছে। দলে দলে লোক চলছে ঘাটের দিকে। কেউ আবার ঘাট ফেরত। 

লাইনের ওপাশে অর্থাৎ রাস্তার বিপরীতে সার দেওয়া হরেক কিসিমের দোকান। কী নেই সেসবে! জামাকাপড় থেকে শুরু করে চুড়ি, মিষ্টি, মনিহারি সামগ্রী। মাঝে মাঝে দু`একটা ছোট ছোট মন্দির। আপাতত সেই সব দোকান ও মন্দিরগুলি বন্ধ। লাইনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম এই দোকানগুলিতে কীভাবে ক্রেতারা ঢুকবে! দোকানের সামনে রাস্তার ওপর মন্দিরে প্রবেশের জন্য রেলিং দেওয়া লাইন। সেই লাইন টপকে দোকানে ঢোকাটাই তো একটা যুদ্ধ। তুলনায় উল্টোদিকের দোকানগুলির অবস্থা ভাল।





ভোর পাঁচটা নাগাদ চৌমাথা এলো। অর্থাৎ দুই ঘন্টায় দুশো মিটার এগিয়েছি। ইতিমধ্যে চা-ওয়ালারা এসে গেছেন। এসে গেছেন ফুল বিক্রেতারা। তাদের ব্যবসা চলছে। লাইনে দাঁড়ানো অনেকেই চা খাচ্ছেন। কেউ কেউ এসে বলে যাচ্ছেন, আমরা ভাগ্যবান। তাড়াতাড়ি দর্শন হয়ে যাবে। মাঝেমাঝেই আওয়াজ উঠছে `হর হর মহাদেব`। মন্দিরের দিক থেকে যারা আসছেন, তাদের দেখে সবার যে একটু ঈর্ষা হচ্ছে, সেটা নিজেকে দিয়ে বুঝতে পারছি। তারা ভাগ্যবান। চৌমাথায় রাজ্যের চটি জুতো স্তূপাকৃতি হয়ে রয়েছে। সেগুলি কাদের কে জানে! একটু খুঁটিয়ে দেখলেই অবশ্য বোঝা যাচ্ছে সেই জুতো-চটির মধ্যে সব বয়সের মানুষের পাদুকা আছে। দামি জুতোর পাশেই ছেঁড়া চটি তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানও বলে দিচ্ছে।

আরও ঘন্টাখানেক পর মন্দিরের মোটামুটি দেড়শো মিটার দূরে এসে লাইন একেবারে থেমে গেল। ততক্ষণে আকাশে আলো ফুটেছে। তবে রোদ ওঠেনি। কতদিন পর এভাবে সারা রাত জেগে ভোর হতে দেখলাম, সেটা আর মনে পড়ল না। শুধু চোখে ভাসছিল বারাণসী স্টেশনে হোল্ডলের ওপর বসে আছি। মায়ের পাশে। আমরা দুই ভাই। খানিক দূরে ঠাকুরদা, ঠাকুমা বেঞ্চে বসা। বাবা পায়চারি করছেন স্টেশনে। আজকের প্রজন্ম হোল্ডল ব্যাপারটি বুঝবে না। কিন্তু একটা সময় এটার মধ্যেই যাত্রীদের বালিশ, চাদর, ছোট তোষক ঢুকে যেত। বেল্ট দিয়ে সেটা বেঁধে কুলির মাথায় চাপিয়ে বাঙালিবাবুরা পশ্চিমে `চেঞ্জে` যেতেন। সেই বাঙালি অস্মিতা আজ শেষ হতে বসেছে। অন্য রাজ্যের তুলনায় অনেক কিছুতেই আজ `পিছিয়ে বাংলা`। তবু এই লাইনে দাঁড়িয়ে কিছু দোকানের সাইন বোর্ডে বাংলা হরফে দোকানের নাম দেখে ভাল লাগছিল। বারাণসী যে বাঙালির `দ্বিতীয় বাড়ি` এগুলি তারই প্রমাণ।





সকাল সাতটা নাগাদ কোমর টনটন করতে শুরু করল। রীনার হাঁটুর অবস্থা বহুদিন থেকেই খারাপ। ওর মুখ দেখে বুঝতে পারছিলাম খুব কষ্টে রয়েছে। আমার পিঠে ক্যামেরার ব্যাগ। কর্তব্যরত এক পুলিশ কর্মী পরামর্শ দিলেন, ব্যাগ জমা করে দেওয়ার জন্য। রাস্তার দুই ধারের দোকানগুলির প্রায় সব কটিতেই লকার রয়েছে। আগেই জেনেছি, মন্দিরের ভেতরও জমা করা যায়। কিন্তু ব্যাগটি তখন প্রবল ভারী লাগছে। তাই ব্যাগ জমা করে টোকেন নিয়ে এগোতে লাগলাম আবার। মোটামুটি সাড়ে আটটা নাগাদ চার নম্বর গেটের সামনে এসে পৌঁছলাম। 

চোখের সামনে কাশী বিশ্বনাথ মন্দির। ক্যামেরা মোবাইল ফোন সব জমা করে দিয়েছি। ফলে ছবি তুলতে পারছি না। অবশ্য তখন ছবি তুলবার অবস্থাতেও নেই। অনেকটা আগেই দুটো মিনার দেখেছিলাম। সম্ভবত সেই দুটিই বেণীমাধবের ধ্বজা। আজান মিনার নামেও এদের পরিচিতি রয়েছে। আসলে ১১ থেকে ১৭ শতক পর্যন্ত বারবার কাশী বিশ্বনাথ মন্দির আক্রান্ত হয়েছে। যতদূর জেনেছি, ১৫৮৫ সালে আকবরের মন্ত্রী টোডরমল আদি মন্দির সংস্কার করেছিলেন। ১৭ শতকের গোড়াতেই সেই মন্দির ধ্বংস করা হয়। নতুন করে আবার মন্দির নির্মাণ করেন বেণীমাধব রাও সিন্ধিয়া। ১৬৬৯ সালে সেই মন্দির আবার ধ্বংস করা হয়। নির্মিত হয় আলমগীর মসজিদ। এভাবেই নির্মাণ আর ধ্বংসের মাঝে ১৭৭৭ সালে ইন্দোরের রানি অহল্যাবাই হোলকার আজকের মন্দির নির্মাণ করেন। মন্দিরের শিখরগুলি তামার পাতে ৮২০ কেজি সোনা দিয়ে মুড়ে দেন পাঞ্জাব কেশরী রণজিৎ সিং। একান্ন ফুট উচ্চতার মূল শিখরটিও সোনার। আশেপাশে ছোট বড় অনেকগুলি শিখর। মন্দিরের বা দিকের নহবতখানা তৈরি করে দিয়েছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। ঘন্টাটি প্রদান করেন নেপালের মহারাজা। হিউয়েন সাং থেকে ভারতে আসা বিভিন্ন পর্যটকদের বর্ণনায় এই মন্দির বারবার বিবৃত হয়েছে। মন্দির আর মসজিদের মাঝে রয়েছে জ্ঞানভাপী কূপ। এক হাজার কলস দিয়ে এই কূপের জলে স্নান করেন বিশ্বনাথ। মন্দির ঘিরে নানা মিথ আর সত্য। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে কাশী বিশ্বনাথ সবার ওপরে। 







মন্দির চত্বরে প্রবেশ করলাম সাড়ে আটটা নাগাদ। অবশেষে চোখের সামনে মন্দির দেখতে পেলাম। কিন্তু তখনও লাইন চলছে এঁকেবেঁকে। বিভিন্ন দিক থেকে আরও তিনটে লাইনে দলে দলে লোক প্রবেশ করছেন। আমাদের সামনে অনেকে লাইনের মধ্যেই বসে পড়েছেন। কেউ বসে বসেই এগিয়ে চলেছেন। আমাদের নিজেদের অবস্থাও তাদের মতোই। এভাবে এতক্ষণ টানা দাঁড়িয়ে থাকবার অভ্যেস নেই বলেই আরও বেশি কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু সব কিছুই মুহূর্তে উবে গেল যখন মূল মন্দিরের সামনে এলাম। 

আমার অবশ্য দর্শন হল রীনার সৌজন্যে। সত্যি বলতে আমি বিশ্বনাথ দর্শন না করেই এগিয়ে গিয়ে ছিলাম নিরাপত্তা রক্ষীদের ধাক্কা খেয়ে। বুঝতেই পারিনি নিচের দিকে তাকিয়ে বিশ্বনাথ দর্শন করতে হবে। রীনাই বলেকয়ে নিরাপত্তা রক্ষীদের বুঝিয়ে আবার এগিয়ে দিল। ওর কথা আর আমার বিধস্ত চেহারা দেখেই বোধহয় ওরা আধা মিনিট সময় দিলেন। আর দর্শন মাত্রেই পরম প্রশান্তি। সেটা কী ব্যাখ্যা করব না। ওই অনুভূতি নিজস্ব। সব শেষ করে যখন মন্দির থেকে বেরোচ্ছি, তখন ঘড়িতে সাড়ে নয়টা। গুজরাটের পালিতানায় জৈন মন্দির বা মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে ডাবল ডেকার রুট ব্রিজ দেখতে হাজার চার-পাঁচেক সিঁড়ি ভাঙাও তুচ্ছ হয়ে গেল সেদিনের পরিশ্রমের কাছে। কিন্তু যা পেলাম তা অতুলনীয়। ঐশ্বরিক। 

হোটেলে ফিরে খাওয়া শেষ করে আর পারলাম না। গতকাল সকাল নয়টায় কোচবিহারের বাড়ি থেকে বেরিয়েছি। ট্রেনে বসা বা আধা-শোওয়া। তারপর রাত দেড়টা থেকে টানা এতক্ষণ! চোখ বন্ধ হয়ে সঙ্গে সঙ্গেই। তবে বেশিক্ষণ নয়। দেখতে হবে বারাণসীর কোচবিহার কালীবাড়ি। চাপতে হবে নৌকো। ঘুরতে হবে ঘাটগুলি....  

     

No comments: