বারাণসী, বৃত্তপথের কারসাজি
(পঞ্চম পর্ব/ গঙ্গা আমার মা.....))
শৌভিক রায়
আরজু বলল, `আমি শুধু বিকেলেই থাকি। স্কুল থাকে তো। সকালে আর দুপুরে দাদারা চালায়।`
- ভাল লাগে? এভাবে প্রতিদিন চালাতে? বিকেলে তো সবাই খেলে তোমার বয়সীরা।
- গঙ্গা মায়ের কাছে থাকি, এর চাইতে ভাল আর কী! আর নৌকো চালানোও তো খেলা।
মজা লাগল শুনে। ঘাট দেখতে আরজুর নৌকোয় চলেছি। নৌকো ছেড়েছে অহল্যাবাঈ ঘাট থেকে। দশাশ্বমেধ ঘাটের দক্ষিণে এই ঘাট। ইন্দোরের রানি অহল্যাবাঈ হোলকারের নামে ঘাটের নাম।
বেনারসে এসে ঘাট দেখেননি, এরকম কাউকে পাওয়া দুষ্কর। প্রশ্ন জাগতেই পারে, ঘাট দেখবার আছে কী! সব ঘাটই তো একইরকম। হ্যাঁ। অবশ্যই তাই। কিন্তু একই হলেও, প্রত্যেকের ইতিহাস যে আলাদা! অন্তত বেনারসে। যেমন দশাশ্বমেধ ঘাট। আগেই বলেছি তার মাহাত্ম্য। সৃষ্টির দেবতা ব্রহ্মার পরামর্শে কাশীর রাজা রিপুঞ্জয় রুদ্র সরোবরের তীরে দশ অশ্ব মেধ বা যজ্ঞ করেছিলেন। তাঁর ইচ্ছে পূরণের জন্যই অন্যান্য দেবতাদেরও সরিয়ে দেন রাজা। স্বয়ং শিব যখন কাশী ছাড়বার উদ্যোগ নিচ্ছেন, তখন ব্রহ্মা রাজার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মেশ্বর লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন। এখনকার ঘাট অবশ্য তৈরী করেন পেশোয়া বালাজি বাজিরাও। ১৭৪৮ সালে। ১৭৭৪ সালে রানি অহল্যাবাঈ হোলকার পুনর্নির্মাণ করেন ঘাটের। দশাশ্বমেধ ঘাটের গঙ্গা আরতি আজ জগৎবিখ্যাত। যদিও মহাকুম্ভ চলছে বলে এই মুহূর্তে আরতি বন্ধ রয়েছে। এখানে রয়েছে দশাশ্বমেধেশ্বর ও ব্রজেশ্বর শিবের মন্দির।
আবার শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের পর মা দুর্গার অসি যে ঘাটে পড়েছিল, সেটিই অসি ঘাট নামে পরিচিত। অসি নদী এখানেই মিলেছে গঙ্গার সঙ্গে। কেদার ঘাটে দেখা যায় কেদারনাথের মন্দিরে কালোপাথরের লিঙ্গ মূর্তি। শিবের বাড়ি কৈলাস ও মানুষের স্মরণে মানসসরোবর নির্মাণ করেন অম্বররাজ মান সিং। তাঁর তৈরি আর একটি বিখ্যাত ঘাট হল মানমন্দির ঘাট। এখানে মানমন্দির বা অবজারভেটরি দেখা যায় জয়রপুরের রাজা জয় সিংয়ের সৌজন্যে। আবার জৈন সম্প্রদায়ের মানুষেরা তৈরি করেছিলেন বেচারাজ ঘাট। মণিকর্ণিকা ঘাটের শ্মশানে আগুন কখনও নেভে না। দূর থেকেও সেখানে ধোঁয়া দেখা যায় সবসময়। বলা হয়, শিবের পত্নী পার্বতীর কুণ্ডল পড়েছিল এখানে। সেটি খুঁজতে শিব ঘেমে গিয়েছিলেন। তাঁর ঘাম হয় কুণ্ডের জল। আবার অনেকের মতে শবদাহের জন্য বিষ্ণু এখানে খনন করেছিএখন। সেটি অবশ্য গঙ্গার মর্ত্যে আগমনের আগে। পাথরের ফলকে বিষ্ণুর পদচিহ্ন ছাড়াও গণেশ মূর্তি এই ঘাটের দ্রষ্টব্য। দেখে নিলাম পঞ্চগঙ্গা ঘাটটিও। অতীতে এখানেই মিলেছিল পাঁচ নদী - গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, তৃণা ও দুর্গা। এখানেই রয়েছে বিষ্ণু মন্দির। আর সেই মন্দির ধ্বংস হয়ে তৈরি হয়েছিল আলমগীর মসজিদ।
আনন্দময়ী ঘাট, রাজা ঘাট, তুলসী ঘাট ইত্যাদি দেখে নৌকো থেকে নেমে পড়লাম হরিশচন্দ্র ঘাটে। রাজা হরিশচন্দ্র শৈব্যা ও রুহিতাস্যের স্মৃতি বিজড়িত এই ঘাটে শবদাহ চলে এখনও। এখানে এই মুহূর্তে ডেরা বেঁধেছেন নাগা সাধু ও সন্ন্যাসীদের। তাঁদের অনেককেই খুব কাছে থেকে দেখলাম। দুই চারজন হাত তুলে আশীর্বাদ দিলেন। সম্পূর্ণ নগ্ন এই সাধুদের গায়ে চিতাভস্ম মাখা। কয়েকজন সন্ন্যাসিনী পেলাম। কথাও হল তাঁদের সঙ্গে। তাঁরা এসেছেন অমরকণ্টক থেকে। সেখানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। ক্যামেরা দেখে ছবিও তুলতে দিলেন। নাগা সন্ন্যাসীদের অনেকেও অবশ্য ছবি তুলতে দিলেন। কথাও বললেন। কয়েকজন বিদেশীকে দেখলাম তাঁদের সঙ্গে ছিলিম টানতে। ভারতীয় চ্যালারাও রয়েছেন দেখলাম।
মোট ৮৭টি ঘাট রয়েছে বেনারসের গঙ্গায়। বিতর্কে ৮৫। মাহাত্ম্য ও পবিত্রতায় দশাশ্বমেধ, মণিকর্ণিকা, পঞ্চগঙ্গা, কেদার ও অসি ঘাট অন্যান্য ঘাটের তুলনায় এগিয়ে। তবে অস্বীকার করা যায় না মাতা আনন্দময়ী, সিন্ধিয়া, শিবালা, চেত সিং, নারদ, দ্বারভাঙা, পান্ডে, রাজেন্দ্রপ্রসাদ, ত্রিপুরা ভৈরবী ইত্যাদি ঘাটের কোনোটিকেই। হরিশচন্দ্র ঘাট থেকে আবার নৌকো চেপে গঙ্গায় এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে সন্ধে হয়ে উঠল। তীরে থাকা বাড়ি, মন্দির সর্বত্রই জ্বলে উঠলো আলো। মহাকুম্ভ বলে গঙ্গারতি বন্ধ। খেদ রয়ে গেল মনে।
নৌকো থেকে নেমে বেনারসে বিখ্যাত অলিগলি দিয়ে এলাম সুধীরবাবুর দোকানের প্যাড়া আর রাবড়ি কিনতে। ইতিমধ্যে কত যে মন্দির দেখেছি তার সংখ্যা মনে নেই। পুণ্য করতে আসা লোকের সংখ্যাও প্রচুর। অবশ্য এই ভিড় সত্যিই দেখবার। বসে পড়লাম বিশ্বনাথ গলির মুখের চৌরাস্তার ধারে একটি দোকানের সামনে ফাঁকা বেদীতে। চলমান জনতাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সমস্ত ভারত বোধহয় বেনারসে এসে মিশেছে। দলে দলে লোক। আর তাদের মধ্যে সমাজের সব স্তরের মানুষেরা। কোনও ভেদাভেদ নেই, কোনও বৈষম্য নেই। যদিও তথাকথিত পিছিয়ে পড়া মানুষদের সংখ্যা বেশি, তবু এ এক অসামান্য দৃশ্য। উপলদ্ধিও একেবারেই আলাদা।
এর মধ্যেই দেখা হয়ে গেল মহাকুম্ভ ফেরত আমার চার ভাই তথা সহকর্মী শুভঙ্কর, মৃত্যুঞ্জয়, সুবল ও দীনবন্ধুর সঙ্গে। এক টুকরো কোচবিহার তখন। মৃত্যুঞ্জয় আর সুবল আবার আমার ছাত্রও। ফলে খানিকক্ষণ হৈচৈ, ভিড়ের মধ্যে গা ভাসিয়ে বিশ্বনাথ মন্দিরের সামনে যাওয়া, ছবি তোলা। মন্দির তখন আলোকিত। সুনামির ঢেউয়ের মতো মানুষের ভিড় আছড়ে পড়ছে। কেউ সকাল এগারোটায় লাইনে দাঁড়িয়ে রাত নয়টায় দর্শন পাচ্ছে, কেউ বা আরও পরে। কাশী বিশ্বনাথের এমনই মহিমা।
রাত ক্রমে বাড়ছে। ভিড়ও বাড়ছে। আমাদের অবশ্য এবার হোটেলে ফিরতেই হবে। কয়েকদিনের টানা পরিশ্রমে সত্যিই ক্লান্ত দশা। তাই এক টুকরো ভারত ভূমির এই অসামান্য দৃশ্য ছেড়ে খানিকটা জোর করেই হোটেলের ঘরে ফিরলাম।
আসলে কি ফেরা? নাকি তাঁর কাছে আবার আসবো বলে প্রস্তুতি নেওয়া!
* ছবি- শৌভিক ও রীনা
(চলবে)





No comments:
Post a Comment