বারাণসী, বৃত্তপথের কারসাজি ((দ্বিতীয় পর্ব/ রাতের কাশীর দশাশ্বমেধ ঘাট)
শৌভিক রায়
`তুই যে নীচের দিকে তাকিয়ে শুধু একটা রাস্তা দেখছিস তা তো নয়; তুই দেখছিস বেনারসের রাস্তা। বেনারস! কাশী! বারাণসী!- চারটিখানি কথা নয়। পৃথিবীর প্রাচীনতম শহর, পুণ্যতীর্থ, পীঠস্থান! রামায়ণ, মহাভারত, মুনিঋষি যোগী সাধক হিন্দু মুসলমান বোধ জৈন সব মিলে রি বেনারসের একটা ভেলকি আছে যার ফলে শহরটা নোংরা হয়েও ঐতিহ্যে ঝলমল করতে থাকে। যারা এখানে বসবাস করে তারা দিন গুজরানের চিন্তায় আর এ সব কথা ভাববার সময় পায় না, কিন্তু যারা কয়েকদিনের জন্য আসে তারা এইসব ভেবেই মশগুল হয়ে থাকে।`
কথাগুলি ফেলুদার। বলেছিলেন তোপসেকে। `জয় বাবা ফেলুনাথ`-এ।
রাত দেড়টায় যখন বারাণসী জংশন থেকে বাইরে এলাম, তখন ঠিক এই কথাগুলিই মনে হল। স্টেশনের বাইরে কাতারে কাতারে লোক। অস্থায়ী টেন্টে শুয়ে বসে তারা। কেউ মহাকুম্ভ ফেরতা, কেউ বা ওদিকেই যাচ্ছে। এই জনসমুদ্র এর আগে কখনো দেখিনি। বিস্মিত হচ্ছিলাম। এতদিন টিভি বা কাগজে যে ভিড় দেখে এসেছি, তা এখন চোখের সামনে। বারাণসীতেই! প্রয়াগরাজে তাহলে কী অবস্থা হচ্ছে, অনুমান করলাম।
আমাদের গন্তব্য গোধূলিয়ার লকসা থানা। পাওয়া গেল এক রিক্সাওয়ালা। এত রাতে তিনি বেশ টালমাটাল। নাম বললেন বেনারসি। রাজ্যের কথা বলতে বলতে আর জ্ঞান দিতে দিতে চললেন ঝকঝকে চওড়া রাস্তা দিয়ে। বেশ মজা লাগছিল। বিদ্যাপীঠ রোড, রথযাত্রা সিগরা রোড হয়ে গুরু নানক রোডে ঢুকে বুঝতে পারলাম মোটামুটি কাছাকাছি চলে এসেছি। এই রাস্তাটিই নাম পাল্টে রামপুরা-লকসা রোড, লকসা রোড হয়ে গোধূলিয়া রোড হয়েছে। গির্জা ঘর মোড় থেকে অবশ্য এই রাস্তা দশাশ্বমেধ ঘাট রোড নামে পরিচিত।
আমাদের হোটেল এই রাস্তার ওপর মাজদা পার্কিংয়ের উল্টোদিকে। লকসা থানার থেকে একটু দূরে। পায়ে টানা বলেই রিক্সা ঢুকতে পারল। ই বা অটো রিক্সা হলে ঢোকা সম্ভব ছিল না। পুরো এলাকা নো পার্কিং জোন। ঘড়ির কাঁটা বলছে রাত প্রায় দুটো। কিন্তু এই রাস্তায় লোক-চলাচল দেখলে মনে হবে সদ্য সন্ধে নেমেছে।
হোটেলে ব্যাগ রেখেই দৌড়লাম দশাশ্বমেধ ঘাটে। আবার মনে পড়ল `জয় বাবা ফেলুনাথ`-এর কথা- `দুটো বাজে। আকাশে মেঘ। দশাশ্বমেধ ঘাটে এখন লোক নেই নেই বললেই চলে।` আমরা অবশ্য রাত দুটোয়। লোকে লোকারণ্য না হলে, যথেষ্ট ভিড় এত রাতেও। অনেকেই গঙ্গায় স্নান করছেন। দুই চারজন নাগা সন্ন্যাসীও বসে রয়েছেন দেখলাম। মনে করা হয়, সৃষ্টির দেবতা ব্রহ্মার পরামর্শে কাশীর রাজা রিপুন্যয় রুদ্র সরোবরের তীরে দশ অশ্ব মেধ বা যজ্ঞ করেছিলেন। তাঁর ইচ্ছে পূরণের জন্যই অন্যান্য দেবতাদেরও সরিয়ে দেন রাজা। স্বয়ং শিব যখন কাশী ছাড়বার উদ্যোগ নিচ্ছেন, তখন ব্রহ্মা রাজার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মেশ্বর লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন। এখনকার অবশ্য তৈরী করেন পেশোয়া বালাজি বাজিরাও। ১৭৪৮ সালে। ১৭৭৪ সালে রানি অহল্যাবাঈ হোলকার পুনর্নির্মাণ করেন ঘাটের। দশাশ্বমেধ ঘাটের গঙ্গা আরতি আজ জগৎবিখ্যাত। যদিও মহাকুম্ভ চলছে বলে এই মুহূর্তে আরতি বন্ধ রয়েছে।
এই রাতের বেলাতেও জমজমাট গঙ্গা তীরের দশাশ্বমেধ ঘাট। গঙ্গার বুকে ভেসে থাকা নৌকোগুলো সহ চারদিকে আলো ঝলমল করছে। এই শহর যে ঘুমোয় না তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। একটা নৌকোর দিকে তাকিয়ে আবার মনে পড়ল সেই ছোট্টবেলার কথা। ওরকমই এক নৌকোর ওপর বসে ছিলেন এক আমেরিকান হিপি। দাদাকে তার পেছনে বসিয়ে বাবা ছবি তুলেছিলেন। ঘাটের ঝিরঝিরে হাওয়ায় শীত শেষের শিরশিরানি। নিজস্ব অনুভূতিতে আমার পাশে দাঁড়িয়েই আমার মা-বাবা।
রীনা জলে নামল। স্নান নয়। আচমন শুধু। জল ছিটিয়ে দিল আমাকেও। জানিনা কতটা শুদ্ধ হলাম। আসলে সবই তো মনের বিষয়। তাই বললাম, `হে মনং, ত্বং স্থিরং ভব, নিশ্চিন্তং ভব, সর্বভূতেষু সমং ভব`।
ছবি- শৌভিক ও রীনা





No comments:
Post a Comment