Wednesday, March 12, 2025


 


বারাণসী, বৃত্তপথের কারসাজি (প্রথম পর্ব/ পথে যখন) 
শৌভিক রায় 

সার দিয়ে থাকা নৌকোগুলো অল্প অল্প দুলছে.... একমাথা ঝাঁকড়া চুলের সাদা চামড়ার লোকটাকে দেখিয়ে বাবা বললেন, `হিপি। আমেরিকা থেকে এসেছে। কুশ, তুমি পেছনে গিয়ে বসো তো!`.......টাঙ্গায় চেপে যাচ্ছি.... খটখটে রাস্তায় ঝাঁকুনি লাগছে। জেদ ধরে বসেছি টাঙ্গাওয়ালার পাশে.... যাচ্ছি সারনাথ। দাদা-মা-বাবার সঙ্গে ঠাকুরদা ঠাকুমা....ধামেক স্তুপের সামনে বিরাট মাঠ..... সবুজ হয়ে আছে ঘাস.... এক ছুট নিজের মতো ফড়িং ধরতে.....কানে বড্ড ব্যথা! মা বললেন, `গঙ্গায় নামতে বারণ করেছিলাম। ঠাণ্ডা জল কি তোর সহ্য হয়! এত ভুগিস, তাও বায়না`..... 

এক ঝটকায় তন্দ্রা ভেঙে গেল! জানালা দিয়ে দেখলাম ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। স্টেশনের বাইরে এক বহুতলের গায়ে গ্লো সাইনে জ্বলজ্বল করছে। সেখানে লেখা দেখে বুঝলাম ছাপড়ায় দাঁড়িয়ে আছি। এরপর বালিয়া। তারপরেই বারাণসী। 

যেদিন থেকে বারাণসীর টিকিট কেটেছি, সেদিন থেকেই ঢেউয়ের মতো স্মৃতিগুলো এসে আছড়ে পড়ছে। যদি বলি এবারের বারাণসী আসলে অতীত অন্বেষণ, তাহলে খুব একটা ভুল হবে না।

আমাদের বর্তমান তো যা পেছনে ফেলে আসি, তার ওপরই দাঁড়িয়ে। ফলে, জীবনের যাত্রা সরলরৈখিক হতে পারে না কখনও। তলিয়ে দেখলে দেখব, সেটি আদ্যন্ত একটি বৃত্তপথ। সেই গোলাকার রাস্তায় এখন, অন্তত আমি, যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখানে ওই দিনগুলি নিজস্ব ধূসরতা নিয়েও বড্ড স্পষ্ট!

কিন্তু হঠাৎ বারাণসী কেন? বিশ্বের প্রাচীনতম `লিভিং সিটি` নিয়ে নতুন করে লিখবার আছেই বা কী! ইতিহাস বলছে, ব্যাবিলন ও নিনেভার সমতুল্য হল এই নগরী। সময়ের হিসেবে খ্রিস্ট পূর্ব ৭ শতকে। যদি পুরান দেখি, তবে পাচ্ছি, খ্রিস্টের জন্মের ১২০০ বছর আগে সুহত্য পুত্র কাশ্য পত্তন করেন এই শহরের। তাঁর নাম থেকেই কাশী। অনেকে অবশ্য বলেন, এখানে সূর্য যখন ওঠে, তখন আকাশের রং হয় গোলাপি লাল অর্থাৎ `কষায়` বা গৈরিক। কাশী শব্দটি এসেছে সেখান থেকেই। তাই কাশী অনেকের কাছে `সিটি অফ লাইট` বলেও পরিচিত। 
 
কাশী তো হল, বারাণসী এলো কীভাবে? বরুণা ও অসি নদীর সঙ্গম এখানে। দুইয়ের মিলনেই বারাণসী। বামনপুরাণ মতে, বিষ্ণুর অংশসম্ভূত অব্যয় পুরুষের দক্ষিণ পদ থেকে সৃষ্টি হয়েছে বরুণা। আর বাম পদ থেকে অসি। তবে কাশীরাজের বর্ণা বারাণসী দেবীর প্রতিষ্ঠা থেকে বারাণসী নামকরণের তত্ত্ব উড়িয়ে দেওয়া যায় না। 

তবে কি প্রাচীনতম `লিভিং সিটি` বা  `সিটি অফ লাইট`-এর জন্যই বারাণসী বেছে নেওয়া? কিন্তু আগেও তো গেছি। রীনাও গেছে। তাহলে আবার কেন? ওই যে! উত্তর দিয়েছি আগেই। সবটাই বৃত্তপথের কারসাজি। আমার আগেও আমার পূর্বপুরুষ এভাবেই ঘুরেছেন সেই পথে, আমার পরেও ঘুরবে উত্তরাধিকারীরা। নিস্তার নেই কারও।








তর্ক জমেছিল এক বন্ধুর সঙ্গে। তাকে বোঝাতে পারিনি, নাস্তিকতার সঙ্গে মনুষ্য শক্তির বিপুলতার কোনও সংঘাত নেই। মানত, পুজো বা অন্যান্য উপাচার আসলে সেই বৃহৎ মানব শক্তিকেই সম্মান প্রদর্শন। একক মানুষ হিসেবে আমার কিছু নিজস্বতা থাকলেও, সেই বৃহত্তরের কাছে আমি কে! কতটা? ব্যক্তি আমি তো একদিন চলে যাব সময়ের গর্ভে, কিন্তু মানুষ তো থাকবে! প্রবাহিত এই মানব শক্তিকে যদি পুজোর ছলে আরাধনা করি, তাতে দোষ ঠিক কোথায়? 

প্রশ্ন আসতে পারে, সেই সম্মান প্রদর্শন বা আরাধনা তো যে কোনও জায়গায় করা যায়। তার জন্য কেন বা বারাণসী, কেন বা কামাখ্যা! এখানেও আমার নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। প্রতিটি জায়গার কিছু না কিছু বিশেষত্ব থাকে। যেমন ধরা যাক উড়িষ্যার কোনার্কের কাছে চন্দ্রভাগা। সেখানে সূর্যরশ্মি যে কৌণিক ভাবে পড়ছে, তাতে কুষ্ঠের মতো রোগ নিরাময় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আধুনিক কালে অবশ্য এই রোগ কিছুই না। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন মানুষকে প্রকৃতির ওপর এভাবেই নির্ভর করতে হত। রোগ সারানোর ক্ষেত্রেও। এবার যদি চন্দ্রভাগা জায়গাটিকে অন্য দৃষ্টিতে দেখি, তবে কি খুব ভুল করব? আমার মনে হয়, না। সেভাবেই যে স্থান তার নিজস্ব বিশেষত্ব নিয়ে বৃহত্তর মানব শক্তিকে আকৃষ্ট করতে পারে, তাকে তো সমীহ করতেই হবে! 

বারাণসীও আমার কাছে ঠিক তেমনই। আর সত্যি বলতে দেখতে চেয়েছিলাম সেই মানব শক্তি। ফলে, শিবরাত্রির দুদিন আগে, রবিবারে, পৌঁছলাম বারাণসীতে। ডিব্রুগড় রাজধানী যখন বারাণসী জংশনে ঢুকছে, তখন রাত দেড়টা। কোচবিহার থেকে পুরোটা রাস্তা ভয়ে ভয়ে এসেছি। প্রয়াগরাজে মহাকুম্ভের ভিড়ের খবর খানিকটা চিন্তায় রেখেছিল। সমস্তিপুর জংশনে ট্রেনের কাঁচ ভাঙবার ভিডিও দেখেছি। ট্রেনে থিকথিকে ভিড়ে যাত্রীরা নাড়াচাড়া করতে পারছেন না, সেটা দেখেও ভাবনায় ছিলাম। 

কিন্তু কিচ্ছু হল না। স্টেশনে দাঁড়ানো মাত্র দরজার সামনে রেল পুলিশের জওয়ানরা দাঁড়িয়ে যাচ্ছিলেন। `আনঅথরাইজড` কোনও যাত্রীই উঠবার সুযোগ বা সাহস কিছুই পায়নি। হতে পারে ট্রেন প্রয়াগরাজগামী নয় বলে সেভাবে কিছু বুঝলাম না। কিন্তু স্টেশন থেকে বাইরে বেরোতেই বুঝলাম আমার সে ধারণা ভুল। কত মানুষ যে স্টেশনের বাইরে শুয়ে আছেন, সেটা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। 

এই মানব শক্তি দেখতেই এবার বারাণসী আসা। শিবরাত্রির ভিড় কী হয়, জানতে আসা। আরাধনা করতে আসা বিপুল এই মানব প্রবাহকে..... 

No comments: