আগে বড়ো আগে বড়ো.....
শৌভিক রায়
আর মাত্র কয়েকজন আমার সামনে।
অবশেষে!
ভাবতেই পুলক জাগল।
প্যাড়া-ফুল-বেলপাতা ভর্তি ডালিটাকে শক্ত করে চেপে ধরলাম। সেটা অবশ্য আনন্দে নয়। ভয়ে।
লম্বা ল্যাজের তিন বাঁদর শ্যেন দৃষ্টিতে জরিপ করছে চারদিক। চান্স পেলেই আক্রমণ করবে বুঝতে পারছি।
এই ব্যাপারে আমার এক্সপেরিয়েন্স ব্যাপক। ঘরের কাছের বগড়িবাড়ি মন্দিরে, এদের সঙ্গে আমার, বেশ কয়েকবার, আকাশপথে সংঘর্ষ হয়েছে। ওপর থেকে সাঁ করে নেমে, ঝপ করে পুজোর প্রসাদ নিয়ে পালিয়েছে। আমিও হাতের লাঠি তীরের মতো ছুঁড়েছি। আর সেটা প্রতিবারই আমার মাথাতেই পড়েছে। ওদের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারেনি। তবু লড়াই বলে কথা। আমি কনফার্ম, একবার না একবার এদের সঙ্গে পাঙ্গায় জিতবোই।
হঠাৎ ধাক্কা। পেছন থেকে।
- এগোওও....
এবার তিনি। ধাক্কিয়েই চলছেন সেই কবে থেকে!
- কী হল? ধাক্কা দিচ্ছ কেন?
- ওই যে দেখছ বাঁদর...এবার যদি প্রসাদ চুরি করে তো বুঝবে!
- বুঝবো আর কী!
- বুঝবে না? এগুলো কিন্তু বেনারসের বাঁদর।
আরে কী কয়! বাঁদর তো বাঁদর-ই। তার আবার কী বেনারস কী বগড়িবাড়ি!
যাহোক তর্ক করলাম না। বিশ্বাসে মেলায় বাঁদর তর্কে কী বলে ইয়ে....
এখন অবশেষে একদম সামনে।
সেই ভোর তিনটেয় লাইনে দাঁড়িয়েছি। এখন বাজে সকাল সোওয়া নটা। বাবা বিশ্বনাথ দর্শন বলে কথা। তার ওপর শিবরাত্রির তিথি।
গঙ্গার জল, না লাইনের লোক বেশি সেটা নিয়ে রীতিমতো সমীক্ষা চালানো যেতে পারে।
যাহোক মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত। বাবা দর্শন দিলেন বলে!
- আগে বড়ো আগে বড়ো.....
এক ধাক্কায় এগিয়ে গেলাম। মন্দিরের সামনে। ওই যে গর্ভগৃহ! সুদৃশ্য। ফুল বেলপাতা ধূপ ধুনোর গন্ধে ম ম করছে। আওয়াজ উঠছে হর হর মহাদেব!
আবার ধাক্কা। গর্ভগৃহের বাইরে এবার।
- দেখলে?
- কী?
- শিবলিঙ্গ?
- শিবলিঙ্গ?
- হ্যাঁ হ্যাঁ...বাবা বিশ্বনাথ!
- কোথায়?
- মানে?
- এখানে ছিল নাকি?
- তুমি দেখোনি?
- কোথায়? পেলাম না তো!
- তুমি কী গো!
- না মানে তাকালাম তো চারদিকে।
- নিচে দেখোনি?
- নিচে?
- শিবলিঙ্গ তো নিচেই থাকবে! মেঝের দিকে তাকাওনি?
হায় হরি! আমি তো চোখের লেভেলে দেখছিলাম। মাথা উঁচু করে ওপরেও তাকিয়েছিলাম। নিচে তো দেখিনি! মাথাতেও আসেনি।
- এই লোকটাকে নিয়ে কী যে করি! এতক্ষণ ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে উনি কিছুই দেখলেন না! নাহ.... এর সঙ্গে থাকা যায় না! কোনও কাজের না।
আধুনিক দিনকাল। আজকাল সতীর পুণ্যে পতির পুণ্য হচ্ছে। তিনি সিকিউরিটির লোকজনকে ধরে আমাকে আবার পাঠালেন।
তাঁর কাইমাই, নাকি আমার ভাবলে যাওয়া মুখ জানিনা। অন্যদের চাইতে এবার আধা মিনিট সময় বেশি পেলাম।
নব-পতির মতো মাথা নিচু করে দেখলাম। ওই যে তিনি...
`আগে বড়ো আগে বড়ো.....` ধাক্কায় আবার সামনে।
এবার মুখ হাসি হাসি। প্রশান্তি।
কিচ কিচ আওয়াজ শুনে, ওপরে তাকিয়ে দেখি সেই তিন বাঁদর দাঁত বের করে আমাকে ভ্যাঙাচ্ছে।
শক্ত করে প্রসাদের ঝুড়ি চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠলাম,
- আগে বড়ো আগে বড়ো.....
তিনি বললেন,
- চুপ! আদিখ্যেতা!! বাঁদর দেখেনি যেন!!!!!
(বোকামির এককাল)
No comments:
Post a Comment