Monday, December 30, 2024


 

চিকেন নেক কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল

শৌভিক রায় 


ঘরের কাছের ফালাকাটায় জঙ্গি গোষ্ঠীর স্লিপার সেলের অস্তিত্ব পেয়ে আমরা সকলেই বিস্মিত ও উদ্বিগ্ন। কিন্তু এত জায়গা থাকতে জঙ্গিরা হঠাৎ ফালাকাটাকে বেছে নিল কেন? শুধুই  নিরুপদ্রব এলাকা বলে? না। মূল কারণ, ফালাকাটার ভৌগোলিক অবস্থান। আর তার সঙ্গে এই বঙ্গের চিকেন নেক তথা শিলিগুড়ি করিডোরের খুব ভাল যোগাযোগ। 


যাঁরা একটু বয়স্ক, তাঁদের নিশ্চয়ই মনে আছে ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৫ অবধি ফালাকাটার শৌলমারি সারা ভারতের নজরে ছিল। সৌজন্যে স্বামী সারদানন্দজী ও তাঁর আশ্রম। যাঁরা আজও স্বামী সারদানন্দের মধ্যে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোসকে খুঁজে পান, তাঁরা বলেন খুব সুচতুরভাবে স্বামীজী ফালাকাটা বেছে নিয়েছিলেন। কেননা, ফালাকাটার কাছে হলেও শৌলমারি কোচবিহার জেলায়। প্রান্তিক হওয়ায় কোচবিহারের পুলিশের সেখানে পৌঁছতে বহু সময় লাগত। খুব কাছে ভুটান, অসম ও নেপাল। এমনকি নেফা ( North-East Frontier Agency) অর্থাৎ পূর্বোত্তর ভারতের রাজ্যগুলিও খুব কিছু দূরে নয়। তাই যদি আবারও  অন্তর্ধান করতে হয় তবে ফালাকাটার মতো জায়গা আর দ্বিতীয়টি নেই। আজকের এই জঙ্গিদের ফালাকাটা বেছে নেওয়ার পেছনে কি সেরকমই কোনও মনোভাব কাজ করছিল? 


এই উত্তর তো সময় দেবে। কিন্তু তার আগে একটু জেনে নেওয়া দরকার চিকেন নেক ব্যাপারটা ঠিক কী। দৈর্ঘ্যে ৬০ কিমি আর প্রস্থে ২২ থেকে ১৭ কিমির ক্ষুদ্র এই  ভূখণ্ড দেখতে অনেকটা মুরগির গলার মতো বলেই এই নামকরণ। আয়তনে ছোট্ট হলে হবে কী, এর ভৌগোলিক গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা এই ভূখণ্ডের মধ্যে দিয়েই সারা দেশের সঙ্গে উত্তর পূর্ব ভারতের ৭টি (অরুণাচল প্রদেশ, অসম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়) রাজ্যের যোগাযোগ। সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত এই সাতটি রাজ্য এমনিতেই রাজনৈতিক নানা কারণে অস্থির। স্বাধীনতার পর থেকেই, কোনও না কোনও সমস্যায় জর্জরিত হয়ে চলেছে রাজ্যগুলি। ফলে এই রাজ্যগুলির সঙ্গে অবিরাম যোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি। আর তার জন্য প্রয়োজন উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। আকাশ বা জলপথে (এখানে জলপথের ব্যাপার আসছে না) সব কিছু সম্ভব নয়। ভরসা শুধুমাত্র সড়ক ব্যবস্থা। আর তার জন্য শিলিগুড়ি তথা এই করিডোরকে স্পর্শ করতেই হবে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে কী নিদারুণ এর গুরুত্ব। তাছাড়া শুধু সেভেন সিস্টার্স নয়, এই করিডোরকে ঘিরে রয়েছে নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশ। রয়েছে ভারতের আর এক রাজ্য সিকিমও। ফলে কোনওভাবে যদি শিলিগুড়ি করিডোর তথা চিকেন নেককে করায়ত্ত করা যায়, তবে এই অঞ্চলের ভূগোল ও ইতিহাস দুইই বদলে যাবে। তাই এই এলাকার দিকে নজর প্রত্যেকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ও জঙ্গি সংগঠনের। 


সন্দেহ নেই, আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রে সাম্প্রতিক পালাবদলের জামাত-ই-ইসলামির অনবরত হুমকি চিকেন নেককে বিচ্ছিন্ন করবার  ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অঙ্গ। উদ্বেগের কথা, সেই প্রচেষ্টা আর হুমকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তারা ময়দানে নেমে পড়েছে। নিজেদের রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের ওপর তাদের অত্যাচার তার প্রমাণ। চলছে সংখ্যালঘুদের উপাসনালয় ভাঙা থেকে, প্রতিবাদীদের খুন ও মহিলাদের ধর্ষণ। প্রাণ ও সম্মানের ভয়ে ভীত অগুন্তি মানুষ ভীড় জমাচ্ছেন সীমান্তে। কেউ কেউ চলে আসছেন এপারেও। ওই রাষ্ট্রের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা সব চুপ। বহু জায়গাতে বিরাজ করছে শ্মশানের নীরবতা। আর এসবের মধ্যে ফায়দা লুটতে নেমে পড়েছে রাজনৈতিক ব্যবসায়ীরা। তাদের ভারত-বিদ্বেষী চিল চিৎকারে অস্থির হয়ে উঠছে উপমহাদেশের সুস্থিত পরিবেশ। এই নারকীয় দশা থেকে কবে মুক্তি পাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে থাকা আমাদের প্রিয়জনেরা, সেটা আজ বহু মূল্য প্রশ্ন। 


নিজেদের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা বজায় রাখবার জন্য আমাদের যাবতীয় চেষ্টা করাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি। তার সঙ্গে দরকার চিকেন নাকের সুরক্ষা আরও বৃদ্ধি করা। ঢিলেঢালা নজরদারির দিন আর নেই। প্রয়োজন প্রতিটি বিষয় খুঁটিয়ে দেখা। গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করা। কেন, কী জন্য, কবে, কোথায়, কখন ইত্যাদি বিষয়গুলি আজ জরুরি হয়ে পড়ছে। ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলির সঙ্গেও যাতে আরও দ্রুত যোগাযোগ করা যায়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। নাহলে এই বিচ্ছিন্নতাকামীরা অতি দ্রুত সেদিকেও অশান্তির আগুন ছড়িয়ে দেবে। এমনিতেই এই রাজ্যগুলি নানা সমস্যায় জর্জরিত। সঠিক উন্নয়ন এখনও সেখানে অনেকটাই বাকি। আমাদের নিজেদের রাষ্ট্রেও অনেকে মণিপুর বা মিজোরামকে দেশের বাইরে মনে করে। মেঘালয় নামটি পর্যন্ত জানে না। দরকার নিজেদের সচেতনতাও। চিকেন নেকের গুরুত্ব সম্পর্কেও সবাইকে অবহিত করা দরকার। প্রত্যেকেরই দায়িত্ব রয়েছে এই ব্যাপারে। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার যেটি, তা হল কোনও প্ররোচনায় পা না দিয়ে নিজেদেরকেই মজবুত করা। উপকারী উপকার ভুলে অকৃতজ্ঞ ও উপকারীর ক্ষতি করার মতো কৃতঘ্ন হওয়ার মানসিকতা আমাদের নেই। কিন্তু প্রয়োজনে আমরাও কঠোর হতে পারি সেটা যেন কেউ ভুলে না যায়।


No comments: