Friday, December 6, 2024


 

তবু শীত আসে, অপেক্ষার শীত আসে...
শৌভিক রায় 

মিল রোডের ওভারব্রিজ পেরিয়ে একটু যেতেই বিস্তৃত ফুলকপিখেত। দূর থেকে মনে হতো বরফ পড়ে আছে যেন! ফাঁকে ফাঁকে বেগুনেরও চাষ। ছোট ছোট গাছ থেকে ঝুলছে তারা। নানা আকৃতির। হলুদ সর্ষে এখনও নীল দিগন্তে ম্যাজিক দেখানো শুরু করেনি। করবে আর কয়েকদিন পর থেকেই। ধানের ক্ষেতে অবশ্য ব্যস্ততা। সোনা ঝরিয়েছে তারা। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে ফসলের ভারে। কে যেন বলেছিলেন, জ্ঞানী মানুষ ফলবতী ওই গাছেরই মতো। যত জানেন, তত নত হন। উদ্ধত শিরে জানান দেন না তিনি আসলে কতটা! 

এরকম সব দিনে বাড়ির বয়স্করা অনেকে পিঁড়ি পেতে পিঠে রোদ লাগিয়ে ভাত খেতে বসতেন। গরম ভাতের ধোঁয়ায় টাটকা পালং বা রাই শাকের গন্ধ মিশে এক উতরোল সৃষ্টি হতো। ক্যাপসিকাম তখনও এই অঞ্চলে আসেনি। স্কোয়াশও নিত্যদিনের পদে থাকত না। বিনস, গাজর, বিট ইত্যাদি কোচবিহার-শিলিগুড়ির মতো বড় শহরে লভ্য হলেও, উত্তরের ছোট জনপদে সেভাবে মিলত না। বরং কচি সবুজ লাউ  এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যাত্রা করত প্রায়ই। মোটামুটি সবার বাড়িতেই এক টুকরো জমিতে শখের সবজি বাগান। সেই বাগানের ফল যদি না প্রিয়জনকে দেওয়া যায়, তবে আর বাগান করা কেন!

মাছের অবশ্য কোনও কাল হয় না। তবু কেন জানি এই সময়ে আঁশবোরোলি, পাথরচাটা, মোওয়া, পাবদা, আড়, রাইখড়ের স্বাদ যেত পালটে। টাটকা ধনেপাতা আর টমেটো দিয়ে মাছের ঝোল মুখে লেগে থাকত দিনভর। নদীগুলিতে জল কমে এলে এইসব মাছেরা তাদের রুপোলি শরীর নিয়ে উঠে আসত অনেকটা ওপরে। ফলে বালাতোর্ষা, শিশামারা, ঘরঘরিয়া, দোলংয়ের মতো ছোট ছোট নদীতে মাছ ধরতে নেমে পড়ত স্কুল ফেরত একরাম বা বুধিয়ারা। তাদের বাগানে এখন প্রোডাকশন কম। চা গাছেরাও শীত ঘুমে চলে গেছে আলগোখরোর সঙ্গে। তাদের পাতায় খেলা করছে ছোট ছোট পোকারা। উধাও দুটি পাতা আর একটি কুঁড়ি ।

সেই অক্টোবর শুরুর পর আর বৃষ্টি হয়নি বলে ধুলো তার চাদর পড়িয়ে দিত পথের ধরে থাকা বাড়ি আর গাছগুলোকে। শিলতোর্ষা আর বুড়িতোর্ষার দীর্ঘ চর পেরিয়ে সারা গায়ে ধুলো মেখে ধুনকররা সাহেবপোঁতা, সোনাপুর, পুণ্ডিবাড়ি ঘুরে বেড়াত। রোদে পুড়ে কালো হয়ে শুকিয়ে যাওয়া বড় বড় ঘাসের ফাঁকফোকর দিয়ে দেখা যেত জলদাপাড়ার রেখা। সেখানে তখন সূর্যের আলো মাটি স্পর্শ করছে। কেননা গাছেরা পাতা ঝরিয়েছে। সেভাবে পর্যটক আর কোথায় ছিল এই জলজঙ্গলার  দেশে! ফলে নিরুপদ্রবে ঘুরে বেড়াত পায়ে সাদা মোজা বাইসন আর মোটা চামড়ার গন্ডারেরা। হাতিরা থাকত যূথবদ্ধ। মানুষের রাজ্যে তাদের আসবার প্রয়োজন হতো না কখনোই।  

সারাদিন কুয়াশা জড়িয়ে মন খারাপিয়া শীত ক্রমশ যেন উধাও। টিনের চালে শিশিরের জলতরঙ্গও হারিয়ে গেছে। উঠোন ব্যাপারটিও এখন বিলাসিতা। সারাবছর সব সবজির ভিড়ে প্রথম শীতের নতুন সবজির সেই স্বাদ আর অপেক্ষাও আর নেই। বদলে গেছে সেই কিশোরও। মধ্যবয়সের চালশে গ্রাস করেছে তার সব। 

তবু শীত আসে। অপেক্ষার শীত আসে।   

(লেখক শিক্ষক। কোচবিহারের বাসিন্দা)   

(আজকের উত্তরবঙ্গ সংবাদের সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত একটি লেখা। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা কার্যকরী সম্পাদক ও উত্তরবঙ্গ সংবাদকে) 

No comments: