নতুন করে কিছু হারানোর ভয়
শৌভিক রায়
ভূপেন হাজারিকার `এপার ওপার কোন পারে জানি না/ ও আমি সবখানেতে আছি`- গানটি সেদিনও খুব সত্যি বলে মনে হত। গঙ্গা যেমন আমার মা, তেমনই পদ্মাকেও ভাবতাম মা।
আসলে এপার-ওপার বলে কিছু হয় না। কাঁটাতার বিছিয়ে ভূখণ্ডকে ভাগ করা গেলেও, সেই কাঁটাতারেরদুদিকে যাঁরা থাকেন, তাঁদের মন থেকে এই 'সবখানে' থাকা মুছে ফেলা যায় না। তাই হয়তো গায়ক জন লেননের মতো আমার কল্পনাতেও ছিল, এক অখণ্ড গ্রহ। সেখানে কোনও দেশ নেই, কোনও ধর্ম নেই। যদি বা দেশ থাকে তবে তার নাম পৃথিবী। আর ধর্ম? একটাই। মানবতা।
আজ মনে হচ্ছে বড্ড ভুল ছিল সেই ভাবনা। একদমই ভ্রান্ত। সোনার পাথর বাটির মতো। তা না হলে, এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে মৌলবাদীদের হাতে সংখ্যালঘুদের নিগৃহীত হওয়ার এই দৃশ্য কেন দেখতে হবে! ভয়ে দিশেহারা হয়ে তাঁরা ভিড় জমাচ্ছেন সীমান্তে।
আসলে ধর্ম পরিচয় যখন মানবতার চাইতে বড় হয়ে যায়, তখন এমনটাই ঘটে। পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে আজ তাই এই চিত্র প্রকট। আর ভয়টা সেখানেই। এর পরে ধর্ম আর জাতের ভিত্তিতে নিজেরাই নিজেদের চারদিকে শক্ত বেড়া তুলে ধরব না তো? রবার্ট ফ্রস্টের কবিতার অপব্যাখ্যা করে বলব না তো 'Good fences make good neighbors'? কেননা দেখতে পাচ্ছি, এই রাষ্ট্রেও বিচারব্যবস্থার প্রতিনিধি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গিয়ে `সংখ্যাগুরুর কথাই আইন` বলে মতামত দিচ্ছেন। ভারতের মতো গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদের দেশে এই কথা যে কী মারাত্মক হতে পারে, সেটা বোধহয় তিনি ভুলে গেছেন।
ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করে আছে, জানা নেই কারও। কিন্তু প্রতিবেশীর প্রতি এ রকম আক্রোশ কখনই সুস্থ ভাবনার পরিচয় দেয় না।যে কোনও রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের উপরে এই অত্যাচার আসলে রাষ্ট্রের মদতে এক অশ্লীল গুন্ডামি এবং চূড়ান্ত ভন্ডামি। আধুনিক সময়ে প্রতিটি পদক্ষেপে যেখানে আমরা অন্যের মুখাপেক্ষী, সেখানে এই অরাজকতা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।
সকলেরই তাই সংযত হওয়ার সময় এসেছে। না হলে, সমাজমাধ্যমে যেমন ছায়াযুদ্ধ চলবে, তেমনি বাস্তবও অন্য দিকে বাঁক নেবে। এমনিতেই আমরা অনেক কিছু হারানোর বেদনা নিয়ে চলছি। যদি আবারও নতুন করে কিছু হারাতে হয়, তার অভিঘাত হবে মারাত্মক।
(লেখক কোচবিহারের শিক্ষক)
(প্রকাশিত: আনন্দবাজার পত্রিকা, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৪, উত্তরবঙ্গ সংস্করণ
** ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা আনন্দবাজার পত্রিকা )

No comments:
Post a Comment