Tuesday, January 30, 2024


 

কিছু সঞ্চয় এমনই থাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে

নিয়ে যাবে কেউ দিন শেষে, 
সেই সব উত্তরাধিকার..... 


(দক্ষিণ খয়েরবাড়ি/ ফালাকাটা) 

* ছবি ও লেখা- শৌভিক রায় 

Thursday, January 25, 2024

 


আজকের উত্তরবঙ্গ সংবাদে (২৫ জানুয়ারি, ২০২৪) `আমার কোচবিহার`-এ প্রকাশিত একটি লেখা। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা উত্তরবঙ্গ সংবাদ ও কার্যকরী সম্পাদককে। 


স্বপ্ন আর বাস্তবের রাজনগরী 

শৌভিক রায় 


 পেছনে নীল পাহাড় আর খাপ খোলা তলোয়ারের মতো স্রোতস্বিনী তোর্ষা। সামনে বিশালাকার রাজপ্রাসাদ। 


কোচবিহারের সিগনেচার দৃশ্য এটাই। তবে এটুকুতেই শেষ নয়। 

প্রবীণদের মতে, কোচবিহার মানেই কাকভোরে রাস্তায় জল ছেটানো ভিস্তিওয়ালা আর প্রশস্ত রাজপথে দ্রুত ছোটা ভারতের অন্যতম প্রাচীন পরিবহন সংস্থার বাস। ঝকঝকে শহরটা তখন সত্যিই বাসিন্দাদের গর্বের আর অন্যদের ঈর্ষার!  


কুয়াশার মতো কবেই মিলিয়ে গেছে সেই সব দিন। সময়ের পালাবদলে হয়ত এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হেরিটেজের মর্যাদা প্রাপ্ত এই শহরকে ঘিরে আজও স্বপ্ন দেখি অনেক।


শহরের ফুসফুস সাগরদিঘির কথাই ভাবি। কয়েক বছর আগেও শীতকালে পরিযায়ী পাখিদের ভিড়ে সন্ধে নামত সেখানে। অদ্ভুতভাবে সেই পাখিরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এই জলাশয় থেকে। যত সেজে উঠেছে সাগরদিঘি, ততই যেন দূরে সরে গেছে প্রকৃতির থেকে। স্বপ্ন দেখি, সকালের নরম আলো তাদের ডানাতে স্বপ্নের অঞ্জন মাখিয়ে দিচ্ছে। আর তাদের দেখেই সুদূরের পিয়াসী হয়ে উঠছে নবীন কিশোর।  


সাগরদিঘি যদি ফুসফুস হয়, তবে দিঘির শহর কোচবিহারের অন্যান্য জলাশয়গুলি হল তার শিরা-ধমনী। কিন্তু তাদের অনেকেই তো কচুরিপানায় ঢেকে রেখেছে নিজেদের। মুক্ত হোক তারাও। সূর্যের আলোয় জল উছলে উঠুক তাদের বুকে।  


অতীতের ভিস্তিওয়ালার জায়গা নিয়েছে পৌরসভার জলবাহী গাড়ি। কিছু কিছু রাস্তায় মোটামুটি ঝাঁটও পড়ে নিয়মিত। কিন্তু তারপরেও শহরের শরীর চাপা পরে যায় জঞ্জালে। প্রায় প্রতিটি রাস্তায় পড়ে থাকা আবর্জনা আর নোংরা বলে দেয় পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে আমরা কতটা উদাসীন। না, প্রশাসনের ওপর সব দায় চাপাচ্ছি না। দোষ আমাদেরও কম নেই। বন্ধ হোক এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। রাস্তাকে পান-গুটকার পিকদানি আর নিজস্ব ডাস্টবিন ভাবার বদভ্যাস থেকে মুক্তি পাই আমরা!


স্থান পরিবর্তন করুক বাস স্ট্যান্ড। অতীতে রাজবাড়ির জায়গা দখল করে বাস স্ট্যান্ড তৈরি করা ছিল নিজের পায়েই কুড়োল মারা। সেই ক্ষত আজ বাড়তে বাড়তে সমস্ত শরীরটাকেই গ্রাস করছে। `নিজের ব্যবসার ক্ষতি জানি, কিন্তু স্ট্যান্ড এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া দরকার,` আমার সুরেই সুর মেলালেন ওই এলাকার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। একই সঙ্গে প্রয়োজন বেশ কিছু রাস্তাকে ওয়ান ওয়ে করা। ই-রিক্সার প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা। সেটা না হলে ভবানীগঞ্জ বাজার সহ সারা শহরেই যে নরক গুলজার হয়, তা দিনদিন বেড়েই চলবে। 


জেলা তো বটেই, নিম্ন অসম সহ ডুয়ার্সের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের `ভেলোর` কিন্তু কোচবিহার। সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসা পরিষেবা নেওয়ার জন্য ভিড় এখানে সবসময়। এই ভিড়ের সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্যাথ ল্যাব ও ডায়গনস্টিক সেন্টার। আক্ষরিক অর্থেই তাদের বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকেছে শহর। প্রশ্ন জাগে, এই দৃশ্য দূষণ নিয়ে কেন ভাবব না আমরা? 


স্বপ্ন দেখি, হেরিটেজ এই শহরের রাস্তার দুই ধারে অতীতের মতো আবার ফিরে এসেছে নানা ধরণের গাছ। তাদের শীতল ছায়ায় `সাস্টেনেবেল ডেভলপমেন্ট'-এর ভরপুর ফায়দা পাচ্ছি আমরা। দূষণ কমছে শহরের। ছায়াবীথি ধরে জবরদখল মুক্ত ফুটপাথে হেঁটে চলেছে সবাই। 


সৌন্দর্য্যায়নের নামে অসুন্দরকে আহ্বান করা হচ্ছে না। ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা বলে, বাস্তুতন্ত্রকে মর্যাদা দিয়ে, হাই রাইজ ঢেকে দিচ্ছে না নীল আকাশ। তৈরি একটি আর্ট গ্যালারি। হায়দারাবাদের শিল্পারমমের মতো ওপেন থিয়েটারে সৃজনশীলেরা মগ্ন রয়েছেন নিজস্ব সৃষ্টিতে। ন্যূনতম ভাড়ায় নাট্যকর্মীরা আধুনিক প্রেক্ষাগৃহে করছেন নাটক।  

   

দেখছি, নিউ কোচবিহার থেকে বন্দে ভারতে চেপে দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছি রাজধানীতে। ফিরতি পথে বহু সংখ্যক যাত্রীর সঙ্গে নামছি কোচবিহার এয়ারপোর্টে। পছন্দের বিষয় পড়বার জন্য আমার সন্তানকে ছুটতে হচ্ছে না অন্যত্র। মেডিক্যাল কলেজ রেফার করছে না রুগীকে উত্তরের অলিখিত রাজধানীর মেডিক্যাল কলেজে! পরিবহন সংস্থার ঝকঝকে বাস ছুটছে আরও নানা রুটে। 


সাধারণ এই সাধগুলি কিন্তু সাধ্যের মধ্যেই। প্রশাসনিক সদিচ্ছার সঙ্গে আমার মতো সাধারণ নাগরিকদের একটু সচেতনতা- প্রিয় শহরের জন্য এটুকু তো আমরা করতেই পারি!


 

আজকের (২৩ জানুয়ারি, ২০২৪) আনন্দবাজার পত্রিকার উত্তরবঙ্গ সংস্করণে `আপনার অভিমত`-এ প্রকাশিত একটি লেখা। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা আনন্দবাজার পত্রিকাকে। 


পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনা বাস্তবোচিত নয় 

শৌভিক রায় 

সাধারণত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিক থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হওয়াই রেওয়াজ। এবার পরীক্ষা এগিয়ে আনা হয়েছে অনেকটা। দেশের সাধারণ নির্বাচনের দিকে লক্ষ্য রেখে নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে সবাই স্বাগতও জানিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা অন্যত্র। এ বারের পরীক্ষা দুপুর ১১টা ৪৫ মিনিটের বদলে শুরু হচ্ছে সকাল ৯ টা ৪৫ মিনিটে। শেষ হচ্ছে দুপুর ১টায়। সময় বদলের সঠিক কারণ এখনও পর্যন্ত ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। পশ্চিমবঙ্গ মধ্য শিক্ষা পর্ষদ বলেছে, বেলা ৩টায় পরীক্ষা শেষে পরীক্ষার্থীদের বাড়ি ফিরতে সন্ধে হয়ে যায় বলে এই সিদ্ধান্ত। 


মুশকিল এখানেই। পর্ষদ কর্তৃপক্ষ তাঁদের এই যুক্তি দিলেও সমস্যা আছে। ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে যে আবহাওয়া থাকে, তাতে পর্ষদের নির্দেশানুসারে পরীক্ষার্থীদের পক্ষে সকাল সাড়ে আটটায় পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছোনো অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে উত্তরের পাহাড় ও ডুয়ার্স অঞ্চলের পরীক্ষার্থীদের পক্ষে এটা আরও কঠিন। বহু জায়গায় যোগাযোগের ব্যবস্থা যথেষ্ট উন্নত নয়। অনেকেই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসে। কাউকে রিক্সা বা টোটোয় বাসস্ট্যান্ড, সেখান থেকে বাস ধরে পৌঁছতে হবে। অনেকটাই তাতে সময় লাগে। সকালের দৃশ্যমানতা বিকেলের চাইতে যথেষ্ট কম এই সব অঞ্চলে। রয়েছে বনপ্রাণীদের থেকে ভয়ও। যে যুক্তিতে পরীক্ষার্থীদের বাড়ি ফিরতে সন্ধে হবে, সেই যুক্তিতেই পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছতে রওনা দিতে হবে সাত সকালে।


সময় রদবদলের এই ডামাডোলে আরও একটা সমস্যায় পড়তে পারে পরীক্ষার্থীরা । এত দিন ধরে দুপুরে পরীক্ষা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তারা। হঠাৎ করে সপ্তাহ দুয়েক আগে সময় বদলের খবর জেনে তাদের মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে, তার খবর কি রাখছি আমরা? এই টানাপোড়েনে একজন পরীক্ষার্থীরও যদি মানসিক স্থিতি নষ্ট হয়, তার দায় নেব তো আমরা?    


যে পদ্ধতিতে মাধ্যমিক পরীক্ষা হয় তাতে একটি সেন্টারের অধীনে গোটা সাতেক স্কুল পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে থাকে। প্রশ্নপত্র আনতে হয় ট্রেজারি থেকে। নতুন সময়ে সকাল ৭টার মধ্যে প্রশ্নপত্র এনে পরীক্ষা কেন্দ্রগুলিতে বিতরণ করতে হবে। ফলে সেন্টার ও পরীক্ষাকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদেরও পৌঁছোতে হচ্ছে অনেকটা আগে। শিক্ষকদের এতে খানিক অসুবিধে হলেও, বৃহত্তর ছাত্র সমাজের স্বার্থে তাঁরা হাসিমুখেই দায়িত্ব পালন করবেন। সেটা জানি।


কিন্তু চাপিয়ে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত মানতে কষ্ট হয়। পর্ষদ যদি প্রত্যন্ত এলাকার পরীক্ষার্থীদের কথা একটু মনোযোগ দিয়ে ভাবত, তা হলে বোধহয় সুবিধেই হত। 

( শিক্ষক, কোচবিহার )

Monday, January 15, 2024

 অগ্নি

শৌভিক রায়

এভাবেই অগ্নিপ্রিয় হবো একদিন,
রয়ে যাবে তর্পণ আর পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা

বড্ড শীতল ছিল অগ্নি সে 
মৃত্যুর চেয়েও শীতল বরফ যে!

চুপচাপ পুড়ে যাচ্ছি, দেখো অগ্নি,
পুড়ছে কিছু অহং সেই সাথে

সারি সারি প্রজ্জ্বলিত কুন্ডে
খুঁজে ফিরি পিতা তোমাকে আবার

পুড়ে যাই এভাবেই,
এভাবেই বলে যাই পবিত্র অগ্নির কথা....

প্রকাশিত: দৈনিক বজ্রকণ্ঠ/ 
সম্পাদক: রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ 




Sunday, January 14, 2024


 

সাত মহল আর এক স্বপ্নপুরী
শৌভিক রায়

'সাড়ে চুয়াত্তর' ছবিটি মনে আছে? সেই মেস বাড়ি যেখানে উত্তম সুচিত্রার রোমান্স আর ভানু বন্দোপাধ্যায়ের 'মাসিমা মালপোয়া খামু'! তুলসী চক্রবর্তীও ছিলেন অবশ্য! কিংবা ঘনাদার সেই বিখ্যাত মেস?
একটা সময় মহানগরের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল মেস বাড়িরা। তাই বাংলা সাহিত্যে বা ছায়াছবিতে জায়গা করে নিতে তাদের সময় লাগেনি। আজও শহরতলীতে তাদের অস্তিত্ব রয়েছে কমবেশি। তবে সেই কৌলীন্য নেই আর। কিন্তু সেকথা আলাদা। আপাতত নিজের প্রসঙ্গে আসি।
সবসময় বেয়াড়া ঘোরাঘুরিতে আমার বেশ ইয়ে আছে। এটা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। বর্তেছে পুত্রের ওপরেও। গুটিগুটি পায়ে তাই মাঝে মাঝেই হাজির হই এমন সব জায়গায় যা আক্ষরিক অর্থেই 'থোড়া হটকে'। 'মহল' যেমন।




কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের খুব কাছে, রামনাথ মজুমদার স্ট্রিটের এই পুরোনো বাড়িটিতে ১৯১৭ সালে প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউসের যাত্রা শুরু হয়েছিল। নন্দলাল দত্ত তখন মালিক সেই মেস বাড়ির।
কিন্তু সে আর এমন কী ব্যাপার! হতেই পারে। এমন কিছুই হত না, যদি না এই বাড়িটির সঙ্গে দুটি নাম জড়িয়ে যেত।
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় আর জীবনানন্দ দাশ।




হ্যাঁ এই মেস বাড়ির বাসিন্দা ছিলেন তাঁরা। শরদিন্দুর ব্যোমকেশের বেশ কিছু লেখা এখানে বসেই। জীবনানন্দও হয়ত লিখেছেন কিছু কবিতা সেই মেস বাড়ির এক ঘরে বসে।
এখন অবশ্য মেসবাড়ি নেই। রয়েছে পাইস হোটেল 'মহল'। মালিকানায় নন্দলাল দত্তের নাতি সন্দীপ দত্ত। হোটেল অত্যন্ত নাম করা। সুস্বাদু খাবার। অবশ্য আমার মতো খাদ্য বেরসিকের কাছে ওই বাড়িটি বেশি আগ্রহের খাবারের চাইতে।



কলকাতায় গেলে দেখে আসতে পারেন। হরদম তো অনেকে যান। এদিক সেদিক খান। ঘুরে আসুন মহল থেকে। খাওয়ার সঙ্গে অন্য একটা লিগ্যাসিকে স্পর্শ করার সুযোগ হাতছাড়া করার কোনও মানে হয় না.....
ছবি - শৌভিক রায়