Thursday, January 25, 2024

 


আজকের উত্তরবঙ্গ সংবাদে (২৫ জানুয়ারি, ২০২৪) `আমার কোচবিহার`-এ প্রকাশিত একটি লেখা। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা উত্তরবঙ্গ সংবাদ ও কার্যকরী সম্পাদককে। 


স্বপ্ন আর বাস্তবের রাজনগরী 

শৌভিক রায় 


 পেছনে নীল পাহাড় আর খাপ খোলা তলোয়ারের মতো স্রোতস্বিনী তোর্ষা। সামনে বিশালাকার রাজপ্রাসাদ। 


কোচবিহারের সিগনেচার দৃশ্য এটাই। তবে এটুকুতেই শেষ নয়। 

প্রবীণদের মতে, কোচবিহার মানেই কাকভোরে রাস্তায় জল ছেটানো ভিস্তিওয়ালা আর প্রশস্ত রাজপথে দ্রুত ছোটা ভারতের অন্যতম প্রাচীন পরিবহন সংস্থার বাস। ঝকঝকে শহরটা তখন সত্যিই বাসিন্দাদের গর্বের আর অন্যদের ঈর্ষার!  


কুয়াশার মতো কবেই মিলিয়ে গেছে সেই সব দিন। সময়ের পালাবদলে হয়ত এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হেরিটেজের মর্যাদা প্রাপ্ত এই শহরকে ঘিরে আজও স্বপ্ন দেখি অনেক।


শহরের ফুসফুস সাগরদিঘির কথাই ভাবি। কয়েক বছর আগেও শীতকালে পরিযায়ী পাখিদের ভিড়ে সন্ধে নামত সেখানে। অদ্ভুতভাবে সেই পাখিরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এই জলাশয় থেকে। যত সেজে উঠেছে সাগরদিঘি, ততই যেন দূরে সরে গেছে প্রকৃতির থেকে। স্বপ্ন দেখি, সকালের নরম আলো তাদের ডানাতে স্বপ্নের অঞ্জন মাখিয়ে দিচ্ছে। আর তাদের দেখেই সুদূরের পিয়াসী হয়ে উঠছে নবীন কিশোর।  


সাগরদিঘি যদি ফুসফুস হয়, তবে দিঘির শহর কোচবিহারের অন্যান্য জলাশয়গুলি হল তার শিরা-ধমনী। কিন্তু তাদের অনেকেই তো কচুরিপানায় ঢেকে রেখেছে নিজেদের। মুক্ত হোক তারাও। সূর্যের আলোয় জল উছলে উঠুক তাদের বুকে।  


অতীতের ভিস্তিওয়ালার জায়গা নিয়েছে পৌরসভার জলবাহী গাড়ি। কিছু কিছু রাস্তায় মোটামুটি ঝাঁটও পড়ে নিয়মিত। কিন্তু তারপরেও শহরের শরীর চাপা পরে যায় জঞ্জালে। প্রায় প্রতিটি রাস্তায় পড়ে থাকা আবর্জনা আর নোংরা বলে দেয় পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে আমরা কতটা উদাসীন। না, প্রশাসনের ওপর সব দায় চাপাচ্ছি না। দোষ আমাদেরও কম নেই। বন্ধ হোক এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। রাস্তাকে পান-গুটকার পিকদানি আর নিজস্ব ডাস্টবিন ভাবার বদভ্যাস থেকে মুক্তি পাই আমরা!


স্থান পরিবর্তন করুক বাস স্ট্যান্ড। অতীতে রাজবাড়ির জায়গা দখল করে বাস স্ট্যান্ড তৈরি করা ছিল নিজের পায়েই কুড়োল মারা। সেই ক্ষত আজ বাড়তে বাড়তে সমস্ত শরীরটাকেই গ্রাস করছে। `নিজের ব্যবসার ক্ষতি জানি, কিন্তু স্ট্যান্ড এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া দরকার,` আমার সুরেই সুর মেলালেন ওই এলাকার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। একই সঙ্গে প্রয়োজন বেশ কিছু রাস্তাকে ওয়ান ওয়ে করা। ই-রিক্সার প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা। সেটা না হলে ভবানীগঞ্জ বাজার সহ সারা শহরেই যে নরক গুলজার হয়, তা দিনদিন বেড়েই চলবে। 


জেলা তো বটেই, নিম্ন অসম সহ ডুয়ার্সের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের `ভেলোর` কিন্তু কোচবিহার। সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসা পরিষেবা নেওয়ার জন্য ভিড় এখানে সবসময়। এই ভিড়ের সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্যাথ ল্যাব ও ডায়গনস্টিক সেন্টার। আক্ষরিক অর্থেই তাদের বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকেছে শহর। প্রশ্ন জাগে, এই দৃশ্য দূষণ নিয়ে কেন ভাবব না আমরা? 


স্বপ্ন দেখি, হেরিটেজ এই শহরের রাস্তার দুই ধারে অতীতের মতো আবার ফিরে এসেছে নানা ধরণের গাছ। তাদের শীতল ছায়ায় `সাস্টেনেবেল ডেভলপমেন্ট'-এর ভরপুর ফায়দা পাচ্ছি আমরা। দূষণ কমছে শহরের। ছায়াবীথি ধরে জবরদখল মুক্ত ফুটপাথে হেঁটে চলেছে সবাই। 


সৌন্দর্য্যায়নের নামে অসুন্দরকে আহ্বান করা হচ্ছে না। ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা বলে, বাস্তুতন্ত্রকে মর্যাদা দিয়ে, হাই রাইজ ঢেকে দিচ্ছে না নীল আকাশ। তৈরি একটি আর্ট গ্যালারি। হায়দারাবাদের শিল্পারমমের মতো ওপেন থিয়েটারে সৃজনশীলেরা মগ্ন রয়েছেন নিজস্ব সৃষ্টিতে। ন্যূনতম ভাড়ায় নাট্যকর্মীরা আধুনিক প্রেক্ষাগৃহে করছেন নাটক।  

   

দেখছি, নিউ কোচবিহার থেকে বন্দে ভারতে চেপে দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছি রাজধানীতে। ফিরতি পথে বহু সংখ্যক যাত্রীর সঙ্গে নামছি কোচবিহার এয়ারপোর্টে। পছন্দের বিষয় পড়বার জন্য আমার সন্তানকে ছুটতে হচ্ছে না অন্যত্র। মেডিক্যাল কলেজ রেফার করছে না রুগীকে উত্তরের অলিখিত রাজধানীর মেডিক্যাল কলেজে! পরিবহন সংস্থার ঝকঝকে বাস ছুটছে আরও নানা রুটে। 


সাধারণ এই সাধগুলি কিন্তু সাধ্যের মধ্যেই। প্রশাসনিক সদিচ্ছার সঙ্গে আমার মতো সাধারণ নাগরিকদের একটু সচেতনতা- প্রিয় শহরের জন্য এটুকু তো আমরা করতেই পারি!

No comments: