পরিবর্তনের গারো সম্প্রদায়
শৌভিক রায়
জনজাতির দেশ হল উত্তরবঙ্গ। বহুদিন থেকে এখানে বিভিন্ন জনজাতি মানুষ বাস করছেন। তাদের প্রত্যেকেই আলাদা হলেও, কোথায় যেন মিলনের সুর সবাইকে বেঁধে রেখেছে। নিজস্ব সমাজ, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ভাষা, বিনোদন ইত্যাদি সব কিছু নিয়ে তারা একে অন্যের থেকে আলাদা হলেও, একাত্ম হয়ে ওঠেন উত্তরবঙ্গের সার্বিক বিষয়ে। আসলে প্রকৃতি উত্তরবঙ্গে এতটাই উদার যে তার প্রভাব পড়েছে সেখানকার মানুষদের মধ্যে। আর তার জন্যই বোধহয় বিভিন্ন জনজাতি মিলে গড়ে উঠেছে উত্তরের এমন এক নিজস্বতা, যা দেশের আর কোথাও পাওয়া যায় না।
এই বিভিন্ন জনজাতির মধ্যে ক্রমশ কমতে থাকা ও ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া অন্যতম একটি জনজাতি হল গারো। অবিভক্ত মেঘালয়ের `গারো হিলস'-এই মূলত তাদের বাস। কিন্তু আজকের পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলাতে তাদের দেখা পাওয়া যায়। তারা রয়েছেন ত্রিপুরা ও অসমেও। মনে করা হয়, দেশভাগের আগে গারো পাহাড়ের সীমান্তবর্তী ময়মনসিংহের সুসং দুর্গাপুরে এদের বাসস্থান থাকলেও, দেশভাগের পর তারা এপারে চলে আসেন। তবে এদের অধিকাংশই উত্তরের বনভূমি সংলগ্ন অঞ্চলের বাসিন্দা।
কোচবিহার জেলায় গারোরা এসেছিলেন সম্ভবত উনিশ শতকের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে। সেই সময় কোচবিহার করদ রাজ্য ছিল। খ্রীষ্টান মিশনারিদের প্রভাবে ধর্মান্তরিত এই গারোরা জীবিকার সন্ধানে কোচবিহারে এসেছিলেন বলে মনে করা হয়। সে আমলে কোচবিহার শহর লাগোয়া ঘুঘুমারিতে তাদের স্থায়ী নিবাস গড়ে ওঠে। আরও কিছু পর বেশ কিছু সংখ্যক গারো পরিবার দেওয়ানহাটের কাছের নাটুয়ার পার অঞ্চলে চলে যান ও জঙ্গলাবৃত স্থানটিতে বসতি গড়ে তোলেন। কালক্রমে জায়গাটি গারোপাড়া বলেই পরিচিতি লাভ করে। আলিপুরদুয়ারের গরম বস্তি, গারোপাড়া ইত্যাদি অঞ্চলেও তারা হয়ত ওই একই সময়ে এসেছিলেন। তবে কোচবিহারের গারোদের মতো তারা করদ রাজ্যে অন্য কোনও জীবিকা বেছে নেননি। সম্ভবত অন্যান্য বহু জনজাতির মতো তাদের উদ্দেশ্য ছিল চা-বাগানের কাজে যোগ দেওয়া।
প্রশ্ন হল, হঠাৎ কেন গারোদের নিয়ে এই লেখার অবতারণা? আসলে মাতৃতান্ত্রিক একটি সমাজ কীভাবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে যায়, তার প্রমাণ হলেন গারোরা। আজকের গারোদের দেখলে বোঝার উপায় নেই মাত্র একশো বছর আগেও তাদের নিজস্ব জীবনযাত্রা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। মিশনারিদের প্রভাব, অন্য ধর্ম গ্রহণ, শহরমুখী হওয়া ইত্যাদি সব কিছু মিলে আজকের গারোরা যেন আলাদা। অবশ্য বিভিন্ন জনজাতি সমাজের অবস্থাই আজ এরকম। বিশেষ কাউকে চিহ্নিত করে লাভ নেই। তথ্য প্রযুক্তির এই বিস্ফোরণের যুগে নিজের স্বতন্ত্রতাকে বাঁচিয়ে চলা সত্যিই মুশকিলের বিষয়। কিন্তু পাশাপাশি এটাও সত্যি, তথ্য প্রযুক্তির হাত ধরেই নিজেদের কৃষ্টি সংস্কৃতি বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা যায়। এই বিষয়ে আমাদের প্রত্যেকেরই সচেতন হাওয়া উচিত। যে সমৃদ্ধ রীতিনীতি ও কৃষ্টি জনজাতি সমাজে বিদ্যমান তা বাঁচিয়ে রাখাটা আমাদের কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে।
নিজেদের `আচিক মান্দে` (আচিক= পাহাড়, মান্দে = মানুষ) পরিচয় দেওয়া গারোরা `সাংমা` ও `মারাক` নামে দুটি ভাগ বা তাদের নিজেদের ভাষায় `মাচং`-এ বিভক্ত। কোনও নির্দিষ্ট মাচংয়ের মানুষ নিজের মাচংয়ে বিয়ে করতে পারেন না। অর্থাৎ গারোদের বিয়ে হয় অসম গোষ্ঠীতে। `মোমিন` নামে গারোদের আরও একটি মাচং আছে। কোনও মুসলিম পুরুষ ও গারো রমণী যে সন্তানের জন্ম দেয়, সে মোমিন নামে পরিচিত হয়। `মাচং` কে আবার `চাচ্চি` বা উপশাখায় ভাগ করা হয়। আদিমা, আমকাং, বাংশাল, চিসিক, দিলসি, গারা, কোকসি, রিচিল, মান্দা, মিচেঙ, সিমসাং, দিব্রা, বোলদাকগ্রি, স্নাল ইত্যাদি হল সাংমার উপশাখা। অন্যদিকে মারাকের উপশাখা হল আরেং, বোলাঙ, চিসিম,নাপাক, রংমা, রংমুথু, খাগরা, খামা, মাজি, চামবুগঙ ইত্যাদি। চেরান, এবাং, রিমসু, কোঞ্চিকল, নংমিলং, ওয়ারি হল মোমিনদের উপশাখা। প্রত্যেকটি উপশাখার নিজস্ব টোটেম রয়েছে। সেগুলি সাধারণত প্রকৃতি থেকে নেওয়া কোনও বস্তু বা প্রাণী।
গারোদের সমাজ মাতৃতান্ত্রিক হলেও তাতে একটি সূক্ষ রেখা রয়েছে। এই রেখাকে অতিক্রম করে, মহিলারা কিন্তু কখনই পুরুষদের ওপর আধিপত্য দেখান না। সমাজের নিয়মানুযায়ী মহিলারা সম্পত্তির অধিকারী হলেও, পুরুষকে তারা যথাযোগ্য মর্যাদা দেন। প্রাপ্য সম্মান দেওয়ার ক্ষেত্রেও তারা পিছপা হন না। বরং নারী ও পুরুষ উভয়ের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলাতেই তারা বিশ্বাসী। সম্পত্তির ওপর পুরুষদের কোনও অধিকার না থাকলেও, স্ত্রীর মৃত্যু হলে গারো পুরুষ সম্পত্তি ভোগ করতে পারেন। কিন্তু মালিকানা থাকে কন্যার হাতে। এমনকি পুরুষের নিজের অর্জিত সম্পদের মালিকানাও তার নিজের হয় না। বিয়ের পর অর্জিত সম্পদের মালিকানা পে স্ত্রী। বিয়ের আগে হলে, মা সেই সম্পত্তি পান। মায়ের অবর্তমানে কোনও বোন মালিকানা ভোগ করেন। বিয়ের পর সেই পুরুষের স্ত্রী নিজের শাশুড়ি বা ননদকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে সেই সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন। আমৃত্যু সেই সম্পত্তির মালিক থাকেন স্ত্রী। মৃত্যুর পর একাধিক মেয়ের মধ্যে কোন মেয়ে সম্পত্তি ভোগ করবে সে নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে, `নোকনা` বা উত্তরাধিকারিণী বেছে নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে মায়ের। নিঃসন্তান অবস্থায় স্ত্রীর মৃত্যু হলে, গারো পুরুষ স্ত্রীর বংশের কাউকে বিবাহ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে সেই দ্বিতীয় স্ত্রী সম্পত্তির অধিকারী হন। পুরুষটি নিজের পছন্দে অন্যত্র বিয়ে করলে, সেক্ষেত্রেও দ্বিতীয় স্ত্রী সম্পত্তি পান। গারো সমাজে সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে নিজস্ব আইন এত মজবুত যে বিস্মিত হতে হয়। কোনও দম্পতির কন্যা সন্তান না থাকলে, স্ত্রীর মাতৃকুল থেকে কোনও কন্যাকে দত্তক নিয়ে নোকনা করা হয়। নোকনার জন্য জামাতা বা `নোকরাম` নির্বাচন করা হয় মাতৃকুল থেকেই। নোকনা তার নোকরামকে নিয়ে পিতৃগৃহেই বাস করে। বর্তমানে আধুনিক সভ্যতার স্পর্শে গারো সমাজের এই নিয়মের কিছু ব্যতিক্রম যে একেবারে চোখে পড়ছে না, তা নয়। তবে সেই পরিবর্তন কিন্তু সমাজের মূল ভিতকে এক ও ঠিক রেখেই হচ্ছে।
গারোরা সাধারণত ধর্মভীরু হয়ে থাকেন। প্রকৃতির যে কোনও বিষয় নিয়েই তাদের দেবতা থাকায়, গারোদের দেবতার সংখ্যাও বহু। গোঙ্গা বা ঐশ্বর্যের দেবতাকে তারা বিশেষ মান্যতা দেয়, কেননা গারোরা যে ঝুম চাষে অভ্যস্ত সেই ঝুমচাষ গোঙ্গা আবিষ্কার করেছেন বলে তাদের বিশ্বাস। রোক্কিমা নামের দেবীরও গারো সমাজে আলাদা স্থান রয়েছে। কেননা তিনি হলেন ধান-চালের দেবী। সুস্বাস্থ্য ও শক্তি কামনায় গারোরা গোয়েরা নামের দেবতার উপাসনা করে থাকেন। কুবেরা হলেন পাতালের দেবতা। হিন্দু ধর্মের কুবেরের মতো তিনিও পাতালে সঞ্চিত সম্পদকে রক্ষা করছেন। বালওয়া হলেন বায়ুর দেবতা, সালগ্রা আলোর ও সালজং উর্বরতার দেবতা। নোয়েমি সিমেরি, আবেত রেঙের মতো ক্ষতিকারক দেবতাও গারো সমাজে দেখা যায়। কঠিন রোগাক্রান্ত হলে গারোরা মনে করেন, অপদেবতার অভিশাপ। চলে অপদেবতার পুজো। পাশাপাশি ছোটখাটো রোগে নিজেদের আবিষ্কৃত ভেষজের ওপরে নির্ভর করেন তারা। তবে এখন অনেক বদল এসেছে গারো সমাজে। অতীতের বহু প্রথা ও অভ্যাস মুক্ত হয়েছেন তারা। আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ নিচ্ছেন সকলেই। কোচবিহারের গারোরা অধিকাংশই
খ্রিষ্টান হওয়ায় সেই ধর্মের নানা পরব যথেষ্ট নিষ্ঠার সঙ্গে তারা পালন করেন। বড়দিন মানেই তাদের কাছে `গারো-পিঠে` সহযোগে আনন্দের দিন। এই পিঠে তৈরী করার সময় আতপ চাল, গুড়, ও কলা একসঙ্গে মেখে কলাপাতায় ভাঁজ করে নির্দিষ্ট সময় জলে সেদ্ধ করা হয়। বিশেষ এই পিঠে বাদেও মাছ, মাংস সবকিছুই রান্না করা হয়। তাদের নিত্যদিনের খাবারে বাঙালি স্পর্শ থাকলেও, বড়দিনের সময়টা তারা নিজেদের মতো উপভোগ করেন। এই সময় খ্রিস্টমাস ক্যারোল আর বিভিন্ন প্রার্থনা সংগীতে চারদিক গমগম করে। আজকাল নিজেদের গানের রেকর্ডও করছেন তারা।
মূলত কৃষিজীবী গারোদের প্রধান জীবিকা হল ঝুম চাষ। তবে সেটা করেন সেই গারোরা, যারা পাহাড়ে থাকেন। সমতলের গারোরা জমি চাষের জন্য অন্যদের মতোই বলদ-লাঙলের সাহায্য নেন। চাষকে কেন্দ্র করে গারোদের বিভিন্ন উৎসব সৃষ্টি হয়েছে। এই উৎসবগুলির মধ্যে `ওয়াংগালা` প্রধান। এক মাস ধরে চলা এই উৎসবে পান-ভোজন, নাচগানের সঙ্গে চলে বিভিন্ন ধরণের সংস্কারের যাপন। ওয়াংগালার প্রথম দিনের উৎসবটি আবার রুগালা নাম চিহ্নিত। শরতের শেষে যখন শস্য ঘরে ওঠে, সেই সময়েই এই উৎসবের সূচনা। অনেকটা আমাদের নবান্নের মতো।
ওয়াংগালা বাদে `আগালমাকা`, `আসিওকা`, `জামেগাপা` ইত্যাদি উৎসবগুলিও গারো সমাজে প্রচলিত। তবে পরিবর্তিত সমাজে আজকাল এইসব উৎসবগুলির প্রচলন সেভাবে দেখা যায় না। এমনিতেও চাষের জমির পরিমান দিন দিন কমছে। ঝুম চাষের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। ফলে নব্য গারোরা আর সেদিকে বেশি যাচ্ছে না। বরং সরকারি চাকরির দিকে তাদের জীবিকার অভিমুখ ঘুরে গেছে। আজকাল সেনাবাহিনী, শিক্ষকতা ও অন্যান্য সরকারি চাকরিতে তাদের যোগদান প্রমান করে যে, অতীতের সেই অবস্থা আর নেই। অতীতের `গান্দো`, `গান্দো মাখাল`, `গানা` ইত্যাদি পোশাকও আজ অকল্পনীয়। এইসব পোশাকে কেবলমাত্র লজ্জা নিবারণ চলত। কিন্তু সে সব আজ অতীত। পোশাক দেখে তাদের চিনবার উপায় নেই। অবশ্য এমনটাই হওয়া উচিত।
বিবাহের ক্ষেত্রেও অতীতের `দোবিকাদোকা` পিছু হটেছে। এই প্রথায় সাধারণত মামাতো-পিসতুতো ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ে হত। এখন আর গারো পুরুষ বহুবিবাহ করেন না। যত দিন যাচ্ছে, নিজেদের সংস্কৃতির খারাপ বিষয়গুলি দূরে সরিয়ে রেখে তারা আধুনিক বিষয়গুলোকেই আঁকড়ে ধরছেন। একই কথা বলা যায় তাদের পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস নিয়ে। ফলে আধুনিক গারো পরিবারে `নাখাম` (শুঁটকি মাছ), `তা বোলচু` (বিশেষ ধরণের কন্দ) ইত্যাদি সেভাবে দেখা যায় না। তিব্বতি-বর্মি বা ভোট--বর্মি ভাষার অন্তর্গত গারোদের নিজস্ব কোনও লিপি নেই। রোমান লিপির ব্যবহার গারো সমাজে স্বীকৃত। এই ব্যবহার তারা শিখেছেন মিশনারিদের কাছ থেকে। Caroline Marak গারো সাহিত্যে গান, লোকগাথা, ধর্মীয় মন্ত্র, চিরাচরিত মৌখিক কবিতা, গ্রাম্য জীবন নিয়ে গান, নাটক ইত্যাদি পাওয়া যায়। ১৮৭৯ সালে American Baptist Mission প্রথম গারো লিটেরারি জার্নাল প্রকাশ করলেও তার চরিত্র ছিল ধর্মীয়। সেই অর্থে দেখলে ১৯৩৮ থেকে গারো সাহিত্যের সূচনা।
নিজস্বতা বজায় রেখে উত্তরের যে জনজাতিরা অনেকটা এগিয়ে গিয়েছেন আধুনিক শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য সব বিষয়ে, গারোরা তাদের মধ্যে অন্যতম। তবে তাদের ক্রমহ্রাসমান সংখ্যা সত্যিই চিন্তার। পাশাপাশি কিছুটা হলেও আজকের ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতার আঁচ তো তাদের ওপরেও পড়েছে। ফলে কিছুটা হলেও হারিয়ে যাচ্ছে গারো সংস্কৃতি। সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি না দিলে অচিরেই হারিয়ে যাবেন গারোরা। সেটা হলে বর্ণময় একটি প্রাচীন সম্প্রদায়ের অপমৃত্যু ঘটবে। সেটি কখনই কাম্য নয়।
(প্রকাশিত- কথা লহরী/ সম্পাদক: দেবশ্রী রায় ও সৈকত সেন)

No comments:
Post a Comment