Tuesday, December 19, 2023



মুজনাই কথা

শৌভিক রায়

নদী নাকি এক পার ভেঙে আর এক পার গড়ে তোলে! 

ছোট থেকে শুনে আসা এই আপ্তবাক্যকে এভাবে চোখের সত্যি হতে দেখব, কস্মিনকালেও ভাবি নি। কিন্তু ভাবনা আর বাস্তব যদি এক হত, তবে তো হয়েই যেত সব! হয় না বলেই জীবন রহস্যময়, অনিশ্চিত। নদীর মতোই তারও বাঁকে বাঁকে কখনও উজান, কখনও ভাটা। আসলে নদী মানে প্রবাহ। আর প্রবাহ মানে জীবন। তাই নদী বাদে জীবন ভাবা যায় না, নদী ছাড়া জীবনের গল্পও সম্পূর্ণ হয় না। 

সুতরাং সেই সকালে নদী ভাঙনের কথা শুনে দৌড়ে গিয়েছিলাম। সে এক অবাক দৃশ্য! এতদিনের চেনা নদী তার নিজের জায়গায় নেই। পড়ে আছে থকথকে কাদা। ভাবতেই পারছিলাম না গত বিকেলে এখানেই সাঁতার কাটছিল বালকেরা। গা ধুয়ে নিচ্ছিল বঁধূরা। ওই ওপাশে খানিকটা দূরে গা ডুবিয়ে নিজেদের ঠান্ডা করছিল বিহারি গোয়ালার মোষেরা। নিশ্চুপে বয়ে চলা নদীর পারে কাল বিকেলেও ছিল ছেলে-ছোকরার প্রাত্যহিক আড্ডা, বয়স্কদের অলস পায়চারি।  



 

আজ কোথায় নদী ? কোথায় তার প্রবাহ? চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে গেল আস্ত একটা নদী! মন খারাপ হয়ে গেল। জন্ম ইস্তক এই নদীকে  শ্রেষ্ঠ বন্ধুর মতো দেখে এসেছি। সব কথা তার সঙ্গেই। হতে পারে তা মৌন, কিন্তু নদীর মতো বোঝে ক`জনা! আমার মৌন কথার উত্তরে কুলুকুলু শুরে সে জবাব দেয় নিজের মতো। সেই অনন্ত সুর মূর্ছনায় খুঁজে পাই বিষাদ সংগীত থেকে শুরু করে জীবনের যাবতীয় রসদ। এসব বলব কাকে আর! ভাবনা গ্রাস করে। ব্যথিত হই। পিঠে হাত রাখে সময়। আঙুল তুলে দেখায় নদী একেবারে ছেড়ে চলে যায় নি। কেবল পথ বদলেছে। ওই দূরে দেখা যাচ্ছে তাকে। খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে এগিয়ে যাই সেদিকে। আর সেই এগোনোই হল কাল। সেই যে নদী অষ্টাদশী নারীর মতো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নিলো, ছাড়ল না আর। জীবনভর সে রয়েছে আমার সঙ্গে। মুজনাই নামে পরিচিত সেই সুন্দরী আজও আমার যাপনে, পরিচয়।      

    
অথচ ভুটান পাহাড়ের দক্ষিণ বনাঞ্চলে আট হাজার উচ্চতায় সে যখন জন্ম নেয় তখন তার নাম ছিল 'রঙ্গোরি'। তবে উৎসমুখের নামে নয়, তার অধিক পরিচিতি 'মুজনাই' নামে এবং এই উৎস নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কেননা উৎস থেকে যে প্রবাহ দেখা যায় তার খাত বর্ষা বাদে সারা বছর শুকনো থাকে। অথচ আলিপুরদুয়ার জেলার মাদারিহাটের কাছে বাঙাবাড়ি অঞ্চলে নদীতে সারাবছর জল দেখা যায়। এর কারণ আসলে, এই অঞ্চলে থাকা কয়েকটি প্রস্রবণ। অনবরত সেগুলি থেকে জল বেরিয়ে দক্ষিণ মুখে বয়ে চলেছে। ডুয়ার্সের আরও দুই একটি নদীও এরকম প্রস্রবণের জলে পুষ্ট। আদি অনন্তকাল ধরে বেরিয়ে আসা এই প্রবাহের জন্যই হয়ত নদীর নাম 'মজে নাই' যা লোকমুখে মুজনাই হয়ে গেছে। তবে তা অনুমান মাত্র। যদি ভুটান পাহাড়ের সেই বনাঞ্চলে মুজনাইকে সদ্য জন্ম নেওয়া এক শিশু ভাবি, তবে সে যেন যৌবনে পা দেয় এই অঞ্চলে এসে। তার পাগলপারা রূপে মোহিত হতে হয় তখন। 

কল্লোলিনী মুজনাই বাঙাবাড়ি থেকে নিজের খাতে জল নিয়ে রাঙালিবাজনা হয়ে প্রবেশ করে খয়েরবাড়ি বনাঞ্চলে। খয়েরবাড়ির চরিত্রও ডুয়ার্সের অন্য অরণ্যগুলির মতো। একটা সময় এখানেও সূর্যের আলো মাটি স্পর্শ করতে পারত না। আজ সে অবস্থা না থাকলেও, হাতি, বাইসন-সহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী, অজস্র পাখি ও সরীসৃপ সমৃদ্ধ এই বনভূমি যথেষ্টই গা-ছমছমে। মুজনাই তার একক যাত্রায় ইতিমধ্যে বেশ কিছু নামহীন প্রবাহকে অঙ্গীকৃত করেছে। তার জলে তৃষ্ণা মেটাচ্ছে হিংস্র শ্বাপদেরা। প্রবাহে ভেসে যাচ্ছে, শাল- সেগুন- চিকরাশি- মাদার- জারুল- অর্জুন-শিরীষের ছিন্নপত্র। বোরোলি- বাটা- আড়- রুই- কালবাউশ- মৃগেল- কাতলা ইত্যাদি মাছেরা খেলা করছে মুজনাইয়ের গভীরে। উত্তরের প্রায় সব নদীর সঙ্গে বোধহয় অরণ্যের আলাদা মিতালি আছে। প্রায় প্রত্যেকেই কোনও না কোনও অরণ্য ছুঁয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছে তাদের প্রবাহ। তাই নদীর চরিত্র বুঝতে গেলে অরণ্যের ভেতর বয়ে চলা নদীকে ভালভাবে চিনতে হয়। জানতেও হয়। মুজনাইয়ের ক্ষেত্রেও কথাটি প্রযোজ্য। আর এই জানতে গিয়েই দেখা যাচ্ছে মুজনাই সত্যিই এক রহস্যময়ী নারীর মতো আজও সবার অচেনা হয়ে রয়েছে। কেননা, কিছুদিন আগে মাদারিহাটে পুলিশের হাতে এক চোরাশিকারী ধরা পড়ে এবং তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় বাতাগুড় বাসকা নামের বিরল প্রজাতির কিছু কচ্ছপ। জেরায় জানা যায় যে, মুজনাই নদীর একটি নির্দিষ্ট স্থানে এই কচ্ছপগুলির দেখা মেলে। উত্তর-পূর্ব ভারতের ত্রিপুরা ও অসমের দু'একটি জায়গা ছাড়া এই ধরণের কচ্ছপ আর কোথাও দেখা যায় না। প্রশ্ন জাগছে, কীভাবে এই বিরল প্রজাতির কচ্ছপ মুজনাইতে এলো! উত্তর খুঁজবেন বিজ্ঞানীরা। আমি আমার প্রিয় নারীটির সামান্য রহস্যময়তা বিবৃত করতে পারি মাত্র!    


 

অরণ্য ভ্রমণ শেষে, লোকালয়ে মুজনাইকে দেখা যায় ফালাকাটা-জটেশ্বরের মাঝে। এরপর মুজনাই ফালাকাটার একদম পাশ দিয়ে বয়ে শৌলমারির কাছে কোচবিহার জেলায় প্রবেশ করেছে। ইতিমধ্যে মুজনাইয়ের সঙ্গে মিশেছে বুড়া তোর্ষা বা বালাতোর্ষা ও বীরকিটি। ফলে মুজনাইয়ের কলেবর আরও বেড়েছে। উপচে পড়া স্বাস্থ্যবতী মুজনাই এবার বিপুল আনন্দে, উচ্ছল নারীর মতোই, অনবরত দিক পরিবর্তন করতে করতে মুকুলডাঙা- রাঙামাটি-রামঠেঙা-উত্তর দাইভাঙ্গী হয়ে ৮৫ কিমির যাত্রা শেষে, মিশে গেছে জলঢাকার সঙ্গে। জলঢাকা-মুজনাইয়ের মিলিত প্রবাহ এরপর থেকে মানসাই নামে বয়ে চলেছে। উল্লেখ্য যে, অতীতে মুজনাইকে মানসাই নামে ডাকা হত। এখনও বয়স্ক বৃদ্ধ মানুষেরা মানসাই বলতে মুজনাইকেই বোঝেন। মুজনাই নামটি তুলনায় নতুন। কিন্তু সেই সময়ে মুজনাইয়ের যাত্রাপথটি অন্যরকম ছিল। জলঢাকা-সহ মুজনাই মাটিয়ার কুঠি, ভোগমারা, ডুমনিগুড়ি হয়ে কালাপানিতে এসে পুরোনো তোর্ষার সঙ্গে মিশে দক্ষিণ-পূবে আঠারোকোঠা, ঘেগিরঘাট, মোয়ামারি হয়ে বানিয়াদহের পূবদিকে রংপুরের ধরলাতে মিশত। হয়ত সেজন্যই অতীতে মুজনাই মানসাই নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু কালের গতিতে জলঢাকা তার প্রবাহকে অঙ্গীকৃত করে তার বামতীরের উপনদীতে পরিণত করে এবং মানসাই নামটি মুছে গিয়ে মুজনাই নামটি জায়গা নেয়। আর জলঢাকা ও মুজনাইয়ের মিলিত প্রবাহ মানসাই নামে বয়ে চলে ব্রম্মপুত্রের দিকে।   

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন মানচিত্রও বলছে মুজনাই রহস্যময় নদী। উজানের দিকে নদীর প্রবাহ তোর্ষা নদীর সমান্তরাল। পরবর্তীতে সে তার গতিপথ পাল্টেছে। ডুয়ার্সের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব শ্রী ব্রজগোপাল ঘোষ এই নদীর রহস্যময় চরিত্রের আর একটি ঘটনা জানাচ্ছেন। একসময় এই নদীতে ঘড়িয়াল দেখা যেত। স্বাধীনতার পরে পরে, যখন ডুয়ার্স অনেক বেশি দুর্গম ছিল, তখন তাসাটি চা-বাগানের বড়বাবু অনাথবন্ধু ঘোষ, ডিমডিমা চা-বাগানের ফিডারবাবুর সঙ্গে শীতকালে দুপাশে জঙ্গলাকীর্ণ বীরপাড়া- ফালাকাটা পথে জটেশ্বরের ক্যালভার্ট পেরিয়ে মুজনাইতে মাছ ধরতে যেতেন। তাঁদের সেই মৎস্য অভিযান একবার ব্যাহত হয় যখন তাঁরা আবিষ্কার করেন যে, মুজনাইয়ের তীরে একাধিক ঘড়িয়াল রোদ পোহাচ্ছে। কীভাবে এতগুলি ঘড়িয়াল মুজনাইয়ের মতো একটি নদীতে এল তা আজও জানা যায় নি।  





মুজনাইয়ের রহস্যময়তার জন্যই বোধহয় ১৯৫৯ সালে সারদানন্দজী এই নদীর তীরে ফালাকাটার কাছে শৌলমারিতে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সদ্য সদ্য স্বাধীন হওয়া ভারতে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর ছায়া তখনও দীর্ঘ। সারদানন্দজীর সঙ্গে নেতাজির মুখের সাদৃশ্য থাকায় 'মুজনাইয়ের তীরে নেতাজির আগমন'বার্তা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে এবং অচিরেই মুজনাই-সহ ফালাকাটা-শৌলমারি হয়ে উঠেছিল সারা ভারতের আকর্ষণের কেন্দ্র। আশ্রমে প্রবেশের মুখে ছিল অখন্ড ভারতের ম্যাপ। প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বিদ্যালয়। সারদানন্দজী মাঝেমাঝেই মুজনাই ও আশ্রমের মাঝের মাঠে বক্তব্য রাখতেন। অত্যন্ত প্রাণচঞ্চল সেই আশ্রম ছেড়ে অবশ্য তিনি ১৯৬৭ সালে চলে যান। আজও আশ্রমে তাঁর ব্যবহৃত ঘর, বসবার বেদী, পঞ্চবটি ইত্যাদি দেখা যায়।

মুজনাইয়ের তীরে ফালাকাটার দশমী উৎসবের অতীত জৌলুষ খানিকটা ফিকে হলেও এখনও দলে দলে মানুষ ওইদিন নদীর তীরে ভীড় জমান। সাবেক জলপাইগুড়ি জেলার প্রথম মহকুমা (বর্তমানে বিলুপ্ত)  ফালাকাটায় কবে এই উৎসবের সূচনা তা নিয়ে প্রামাণ্য কোনও নথি নেই। তবে ১৮৬৯ সালে জলপাইগুড়ি জেলা গঠনের সঙ্গে সঙ্গে ফালাকাটাকে মহকুমা তৈরি করা হয়েছিল। ঠিক সেই সময় থেকে না হলেও, অনুমান করতে ভুল হয় না যে, মুজনাইয়ের তীরে এই উৎসবের বয়স কম নয়। বর্তমানে মুজনাইয়ের গতিপথ পাল্টালেও, পুরোনো খাতে জল থাকায় ফি বছর উৎসবটি সম্পন্ন করতে অসুবিধা হয় না। একইভাবে আরও একটি তথ্য উল্লেখ করতে হয় যে, ১৯৮১ সালে উত্তরবঙ্গের দ্বিতীয় মুক্তমঞ্চ নাট্য আন্দোলন শুরু হয় ফালাকাটায় মুজনাই নদীর তীরেই। শিলিগুড়ির মুক্তমঞ্চের আদলে, ফালাকাটার এই নাট্যোৎসব মাসে দুটি বুধবার অনুষ্ঠিত হত এবং তাতে অংশ নিত উত্তরবঙ্গের নানা জায়গার নাট্য দলগুলি। আজ মুক্তমঞ্চ অতীত হলেও, মুজনাই ও জলঢাকার মিলনস্থলে প্রতি বছর ১৩ই ভাদ্র বাইচ প্রতিযোগিতাটি কিন্তু বেশ জনপ্রিয়। 






মুজনাই তীরের জনজীবন একটু ভাল মতো লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এখানে শৈব ধর্মের বা দেবাদিদেব মহাদেবের প্রভাব বেশি। বাঙাবাড়িতে মুজনাইয়ের জলের উৎস সেই প্রস্রবণগুলির পাশেই উঁচু টিলায় রয়েছে শিব মন্দির। শিবরাত্রিতে এখানে বসে বিরাট মেলা। হান্টপাড়া, টোটোপাড়া, মাদারিহাট,  রাঙালিবাজনা,বীরপাড়া, শিশুবাড়ি, খয়েরবাড়ি ইত্যাদি অঞ্চল থেকে সেই মেলা ও পুজোয় অংশ নিতে ভিড় জমান ডুয়ার্সের জনজাতি মানুষ সহ বহু জন। এই অঞ্চলের কমবেশি প্রায় সব বাড়িতেই রয়েছে নানা মাপের শিবমন্দির। মুজনাইয়ের যাত্রাপথে জটেশ্বর নামের জনপদের নামটিও মহাদেবকেই ইঙ্গিত করে। আবার ফালাকাটার প্রসিদ্ধ মহাকাল মন্দির ও তার পাশে অবস্থিত মহাশ্মশানও  আদি দেবতার পরিচয় বহন করেছে। মুজনাইয়ের বাকি যাত্রাপথেও ছড়িয়ে রয়েছে বেশ কিছু মন্দির যেখানে পূজিত হন মহাদেব।

এখানে একটি কথা মনে রাখা দরকার। ফালাকাটা-সহ ডুয়ার্সের এই বিস্তীর্ন অঞ্চল কিন্তু দ্বিতীয় ইঙ্গ-ভুটান যুদ্ধের আগে ভুটানের অধীনে ছিল। যুদ্ধের পরে ডুয়ার্সের এই এলাকা ইংরেজদের হাতে এলেও ভুটানের প্রভাবে এখানে বৌদ্ধ ধর্মের রমরমা ছিল সে কথা বলা বাহুল্য। কিন্তু তার মধ্যেও মুজনাই তীরবর্তী অঞ্চলে মহাদেবের পুজোর প্রসার ঘটল কীভাবে? এই বিষয়ে আলোকপাত করা বোধহয় জরুরি। বাঙাবাড়ি অঞ্চলকে যদি মহাদেবের মস্তক মনে করি, তবে কিন্তু মাটির তলা থেকে ক্রমাগত উঠে আসা জলপ্রবাহ অনেকটা যেন দেবাদিদেব শিবের সেই আদি মূর্তিকেই বাস্তবায়িত করে। এইজন্যই কি মুজনাই তীর শিবের এলাকা? প্রশ্ন জাগলেও, উত্তর জানা নেই।             

উত্তরের অধিকাংশ নদীর মতোই মুজনাইও বর্ষাকালে এই অঞ্চলের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রায় প্রতি বছর দুকূল ছাপায় এই নদী। প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ অঞ্চল। দুর্ভোগে পড়ে সাধারণ মানুষ। তবে মুজনাইয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল ক্রমাগত গতিপথ বদল। ডুয়ার্সের খুব কম নদীই মুজনাইয়ের মতো গতিপথ বদল করেছে। আর এর ফলে, মুজনাই তার যাত্রাপথের বেশ কিছু অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মাথাব্যথার জন্য দায়ি অনেক সময়। আবার পাশাপাশি, মুজনাইয়ের দানও কিন্তু অপরিসীম। ফালাকাটা ব্লক আলিপুরদুয়ার জেলার বৃহত্তম ব্লকের পাশাপাশি, জেলার শস্যভান্ডার বলে পরিচিত। সারা জেলার চাহিদা মিটিয়েও এখানকার সবজি চালান যায় বাইরেও। ফালাকাটার উর্বর মৃত্তিকার পেছনে মুজনাই-সহ তার সঙ্গে মিশে যাওয়া ছোট ছোট প্রবাহর ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না। জলসেচের ক্ষেত্রেও মুজনাই সদর্থক ভূমিকা নিয়েছে। কষ্ট দিলেও নিক্তি পাথরে মুজনাইয়ের দেওয়া সুখের পরিমাণ অনেক বেশি ভারী হবে সেকথা বলবার অপেক্ষা রাখে না। 

লোকগাথা থেকে শুরু করে লোকসঙ্গীত, লোকজীবন সর্বত্রই মুজনাইয়ের অস্তিত্ব অনস্বীকার্য। মুজনাইকে নিয়ে রয়েছে ব্রতকথাও। মুজনাই তীরের জনপদগুলিতে শোনা যায় সেসব গান বা লৌকিক ছড়া। মুজনাইকে চরিত্র করে লেখা হয়েছে গল্পগাথাও। কবিতায়-নাটকে স্থান নিয়েছে মুজনাই। তার রহস্যময় চরিত্রের জন্য মুজনাইকে ঘিরে লেখা হয়েছে উপন্যাসও। নদীর নামেই মাদারিহাটের বাঙাবাড়ির সেই প্রস্রবণগুলির পাশেই তরঙ্গায়িত ভূমিতে রয়েছে মুজনাই চা-বাগান। অত্যন্ত সুন্দর সেই চা-বাগানের মালিকানা বারবার বদল হয়েছে। চা-বাগানটি বহু পুরোনো এবং মনে করা হয় যে, ১৯০৫ সালে যখন ব্রিটিশ ডুয়ার্স রেলওয়ে বীরপাড়া থেকে সম্প্রসারিত হয়, তখন এই বাগানের চা-পাতা পাঠানোর জন্য যে স্টেশনটি প্রতিষ্ঠা করা হয়, তার নাম দেওয়া হয় মুজনাই। মুজনাই চা-বাগান, মুজনাই স্টেশন, মুজনাই নদীর পাশাপাশি, জটেশ্বর-ফালাকাটা পথে মুজনাই নদীর পাশে গড়ে ওঠা জনপদটিও আজকাল মুজনাই নামে পরিচিত হয়েছে। একটি নদীর নামে চা-বাগান, রেলস্টেশন ও জনপদের নামের এরকম দৃষ্টান্ত বিশেষ দেখা যায় না। এর থেকেই প্রমাণিত যে, মুজনাইয়ের প্রভাব এই অঞ্চলে ঠিক কতটা! অবশ্য প্রভাব না থাকলে ওই নামে পত্রিকাই বা প্রকাশ করতে যাব কেন! 





 নিজের সম্পাদিত সেই পত্রিকার জন্য একবার, লেখা চেয়ে চিঠি দিয়েছিলাম পরম শ্রদ্ধেয়া লীলা মজুমদারকে। ডুয়ার্সের ছোট্ট মুজনাই বালকের অনুরোধ তিনি ফেলতে পারেন নি। দিয়েছিলেন একটি লেখা। সেই লেখার একটু অংশ উদ্ধৃত করে শেষ করছি এই নদীকথা। ভাবতে বিস্মিত হই যে, না দেখে, শুধুমাত্র নাম ও সামান্য কথা শুনে, মহিয়সী সেই মানুষটি যে কথাগুলি লিখেছিলেন তা যেন সত্যি মুজনাইয়ের আসল কথা-
'...নদীর নামও মুজনাই
যাত্রাপথের বুঝ নাই,
সেই পথে চলেছি, বুকে
বল পেয়েছি, পরম সুখে
ডাকি তোদের, আয় ভাই।'

মুজনাই নিয়ে কিছু বলতে গেলেই সেই চিঠির কথা মনে পড়ে আর সেই চিঠির সুরেই সুর মিলিয়ে সবাইকে বলতে ইচ্ছে করে যে, মুজনাইকে নিয়েই চলেছি আজও। নদীই যোগাচ্ছে বল, নদীই দিচ্ছে সুখ! রহস্যময় নারীর মতো সেই নদী  আজও জীবনে জড়িয়ে আছে প্রতিটি মুহূর্তে।  

(প্রকাশিত- দাগ / সম্পাদক- মনোনীতা চক্রবর্তী) 

No comments: