Saturday, December 23, 2023


 

দ্রোণাচার্যের দেরায়

শৌভিক রায়

পিকচার পোস্ট-কার্ড যেন! আর হবে না-ই বা কেন ! এরকম `নজারা` দেশের আর কোথায় মেলে? চারদিকের এই ভাগদৌড়ের জীবনে প্রশান্তি বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তবে সেটা মিলবে এখানেই। ইতিমধ্যে ভারতের অন্যতম সুখী শহর হিসেবেও তালিকার প্রথমদিকে উঠে এসেছে এই শহরের নাম। পাহাড়-সমতল, ঠান্ডা-গরম সবকিছু মিলে দেরাদুন তাই টুরিস্ট সার্কিটে একদমই আলাদা।
সেই কোন দ্বাপর যুগে নাকি আচার্য দ্রোণ শিবালিক পর্বতমালা পেরিয়ে, উদয়গিরি আর বহিৰ্গিরির মাঝে, দেওদার পর্বতের ঢালে, দেরা অর্থাৎ অস্ত্রশিক্ষা আশ্রম গড়ে তুলেছিলেন। তারও আগে রাম-লক্ষ্মণ নাকি এখানেই রাবণ বোধের প্রায়শ্চিত্ত করেন। যাহোক, অতি প্রাচীন এই জনপদ দ্রোণাশ্রম হয়ে দেরাদুনে পরিণত হয় কালের যাত্রায়। ১৬৭৬ সালে `দুন' (পাহাড়ের পাদদেশে শায়িত সুন্দর ভূমি) উপত্যকায় সপ্তম শিখ গুরু হর রায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র বাবা রাম রায়ের `ডেরা' (ভগবানের ঘর) স্থাপন থেকে `দেরাদুন` নামটি সৃষ্টি হয়েছে। অন্তত আমার জানা এটাই বলছে।
এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম উপত্যকা দেরাদুনের অর্থ ছবির মতো উপত্যকা। উপত্যকার দক্ষিণ পূর্বে বয়ে চলেছে গঙ্গা আর উত্তর পশ্চিমে যমুনা। অতীতে গাড়োয়ালের অংশ দেরাদুনের হাতবদল হয়েছে বেশ কয়েকবার। একসময় গোর্খারাও দখল করেছিল এই সুন্দর জায়গাটি। এলাকার দখল নিয়ে লড়াই লেগেই থাকত। পরে ব্রিটিশদের অধীনে আসে দেরাদুন। আর স্বাধীনতার অনেক বছর পরে, ২০০০ সালে, ভারতের ২৭তম রাজ্য উত্তরাখণ্ডের রাজধানীর মর্যাদা পায় কাঠমান্ডু ও শ্রীনগরের পর আয়তনের দিক থেকে হিমালয়ের তৃতীয় বৃহত্তম ছিমছাম এই শহরটি।
দেরাদুন গেছি বেশ কয়েকবার। আসলে হরিদ্বারে মাঝেমাঝেই আসি। কিন্তু আসা আর দেখার মধ্যে পার্থক্য অনেকটাই। এবার তাই ঠিক করেছিলাম চুপচাপ দেখে যাব সব। বাকি সব কাজ পরে। এই দেখতে গিয়েই হতবাক হলাম! কে জানে আমার প্রিয় এই শহরের ক্লেমেন্ট টাউন দেশের ভেতরেই পৌঁছে দেবে অন্য দেশে! সত্যিই বিশ্বাস হচ্ছিল না, ভারতে রয়েছি। আসলে দেরাদুনের ক্লেমেন্ট টাউনে বসতি গড়েছেন বৌদ্ধ ধর্মের প্রাচীনতম শাখা নিয়ংমে শাখার অনুসারীরা। এই শাখার বৌদ্ধরা আট শতকের পদ্মসম্ভাবা বা রিনপোচেকে নিজেদের গুরু হিসেবে মানেন। রিনপোচে তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটিয়েছিলেন। সেদিক থেকে দেখতে গেলে তাঁর স্মৃতি বিজড়িত মনাস্ট্রি ছিল তিব্বতের অন্যতম প্রাচীন। কিন্ত ১৯৫৯ সালে চিনের কমুনিস্ট সরকার সেই মনাস্ট্রির ব্যাপক ক্ষতি করে। মনাস্ট্রির প্রধান খোছেন রিনপোচে মাত্র বাইশ বছর বয়সে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। আশ্রয় নেন ভারতে। তাঁর প্রচেষ্টায় ১৯৬৫ সালে শুরু হয় তিব্বতের মূল মনাস্ট্রির অনুকরণে দেরাদুনের মিনড্রোলিং মনাস্ট্রির কাজ। তিব্বতি `মিন-ড্রোলিং` শব্দটির অর্থ মুক্তির স্থান। ইংরেজি বানানে অবশ্য কথাটি `মাইন্ডরোলিং` হয়ে গেছে। গাড়োয়াল হিমালয়ের বিরাট উদারতায় আর প্রকৃতির অকৃপণ রূপসজ্জায় মনাস্ট্রি আর ক্লেমেন্ট টাউনে সত্যিই মুক্তি মেলে যেন! স্তুপকে ঘিরে রয়েছে জাপানি আর তিব্বতি স্থাপত্যে সাজানো বুদ্ধ মন্দির, বৌদ্ধ ধর্মের রীতি অনুযায়ী আরও আটটি স্তুপ, পদ্মসম্ভাবার মূর্তি আর ভারতের অন্যতম বৃহৎ বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠান নগাগিউর নিয়ংমে কলেজ। একে একে দেখে নিলাম সব। সে যে কী অসামান্য অভিজ্ঞতা সেটা বোধহয় লিখে বোঝানো যায় না।
ক্লেমেন্ট টাউনের পরে চললাম ইঁট নির্মিত ভারতের বৃহত্তম ইমারতটি দেখতে। আজ ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট নামে পরিচিত হলেও, ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠার সময় এর নাম ছিল ইম্পেরিয়াল ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট। প্রথমে দেরাদুনের ম্যাল রোডে দুন স্কুলের কাছে স্থাপিত হয় এই প্রতিষ্ঠান। উদ্দেশ্য ছিল, হিমালয়-সহ ভারতের বিপুল অরণ্যসম্পদকে চেনা ও জানা। ১৯২৩ সালে শহরের চক্রাতা রোডে জমি অধিগ্রহণ করে নতুন ভবনের কাজ শুরু হয়। সি জি ব্লুমফিল্ডের নকশায় তৈরি সেই ভবনের উদ্বোধন হয় ১৯২৯ সালে। ইঁটের কাজে কোনও একটি ইমারতকে এত সুন্দর দেখাতে পারে তা সত্যিই জানা ছিল না! সঙ্গের বিরাট বিরাট পিলারগুলি দেখলে বোঝা যায় স্থাপত্যের দিক এটি অতুলনীয়। গ্রিনিজ বুক অফ রেকর্ডসে এই প্রতিষ্ঠানের নাম সাধেই তো আর স্থান পায়নি!

কী নেই ৪৫০ হেক্টর জমি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রতিষ্ঠানে! মিউজিয়াম, লাইব্রেরি, শুকনো ওষুধের সংগ্রহশালা বা হার্বেরিয়াম, প্রিন্টিং প্রেস, বোটানিক্যাল গার্ডেন ইত্যাদি সবকিছু রয়েছে এক ছাতার তলায়। ব্যাকড্রপে হিমালয়ের অনিন্দ্য শোভা নিয়ে নামী এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের নাম উজ্জ্বল করে চলেছে শতাব্দী পার করে! হিমালয় তো বটেই, বিশ্বের নানা প্রান্তের উদ্ভিদ মজুদ এখানে। ব্রিটিশ আমলের ফায়ার প্লেস আর চিমনি শোভিত কোয়ার্টারগুলি দেখে লোভ লাগে বড্ড। এই ক্যাম্পাসের মধ্যেই রয়েছে ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ফরেস্ট একাডেমি। প্রতিষ্ঠানের মিউজিয়ামটি না দেখলে অবশ্য দেখাটাই অসম্পূর্ন থেকে যায়। এখানে প্রায় ৩০০০ জিনিস রক্ষিত আছে। সেরা হল `টিম্বার' বিভাগের ৭০৪ বছরের পুরোনো দেওদার বৃক্ষটি। ১৯১৯ সালে হিমালয় থেকে এই গাছটি কাটা হয়েছিল। বৃক্ষটির কাণ্ডের রিং দেখে এর বয়স স্পষ্ট গোনা যায়। তিনশ বছর অতিক্রান্ত ওক গাছটির আকর্ষণও কম নয়। `সিলভিকালচার` বিভাগে অরণ্যের বিবর্তনের ইতিহাস সমৃদ্ধ করল আমাদের। গাছেদের রোগ আর তাদের প্রতিকার সম্পর্কে জেনে নিলাম `প্যাথোলজি`বিভাগ থেকে।
খুব কাছেই সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার দপ্তর। অনেকটা জায়গা জুড়ে এই দপ্তর দেখবার কারণ একটাই। এখানে বসেই এক বাঙালি খুঁজে পেয়েছিলেন এই পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতা। শৃঙ্গটির নামকরণ হয়েছিল তদানীন্তন সার্ভেয়ার জেনারেল অফ ইন্ডিয়ার নামে। স্যার জর্জ এভারেস্টের নামে পরিচিত পৃথিবীর উচ্চতম সেই শৃঙ্গের কথা আমরা সকলেই জানি। যিনি উচ্চতা মেপেছিলেন সেই বাঙালিকে অনেকেই হয়ত ভুলে গেছি। রাধানাথ শিকদার নামের মানুষটি সেদিন বোধহয় এক অসাধ্য সাধন করেছিলেন। ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অফ জিওলজিও দেখে নিলাম টুক করে। এখানকার প্রস্তর শিলা আয় ফসিল সংগ্রহ অনবদ্য। তবে আমাদের মতো `লে-ম্যান` সেসবের প্রকৃত মূল্য বুঝবে না, যতটা বুঝবেন ভূতত্ব পড়াশোনা করা ছাত্ররা। তবু চেষ্টা করলাম নিজের বোধে সবটা বুঝে নিতে। কতটা বুঝলাম তার জন্য অবশ্য কোনও পরীক্ষা দিতে হচ্ছে না। বাঁচোয়া এটাই।
পড়াশোনার এই মুডটা জারি রইল বিশ্ববন্দিত দুন স্কুল অবধি। এই স্কুল নিয়ে নতুন আর কী বলব। আমাদের মতো আমজনতার নাগালের বাইরে। শুধু এটুকুই জানি দুন স্কুল ভারতের এলিট ক্লাস তৈরির কারিগর। এই স্কুলের প্রাক্তনীদের মধ্যে রয়েছেন রাজীব গান্ধি থেকে শুরু করে অভিনব বিন্দ্রার মতো বিখ্যাতরা। এই চক্কর কাটতে কাটতেই দেখে ফেললাম মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি, বিধানসভা, ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমির একটা অংশ, চেটউড হল, অন্যান্য বিভিন্ন নামী স্কুল। কে না জানে দেরাদুন স্কুলের জন্য বিখ্যাত। যেমন রাজপুরের পথে সামরিক বিদ্যালয়। মেয়েদের জন্যও রয়েছে আলাদা বিভাগ- গুরুকুল। তবে বিশেষ ভাল লাগল ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমির অংশটি। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাজানো গোছানো। দেখে মনে হবে ঈশ্বর যেমন ঠিক বুঝে শুনে তাঁর উপহার দিয়েছে পাহাড়ের কোলে, তেমনি তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে মানুষও একই রকমভাবে জবাব দিয়েছে তার অমূল্য সৃষ্টি দিয়ে!

চলে আসি তপকেশ্বর শিবমন্দিরে। বলা হয় এখানকার গুহায় বাস করতেন স্বয়ং দ্রোণাচার্য। অশ্বত্থামারও জন্ম নাকি এখানেই। গুহার ভেতরে স্বয়ম্ভু শিবলিঙ্গের ওপর টপ টপ করে জল পড়ছে অনবরত। রয়েছে দূর্গা মন্দির, বাল্মীকি গুহা। শহর থেকে কিমি আটেক দূরে রবার্স কেভ বা গুচ্ছপানি। টনস নদীর প্রবাহ এখানে লুকিয়ে পড়ছে কখনও, কখনও আবার দৃশ্যমান হচ্ছে গুহার ভেতরে। অতীতে ডাকাতরা এখানেই আশ্রয় নিত। তাই ব্রিটিশরা নাম দেয় রবার্স কেভ। তবে স্থানীয়রা বলেন গুচ্ছপানি। এখানকার প্রকৃতি অত্যন্ত মনোরম। চারদিকের পাহাড় আর অরণ্য একটা গা ছমছমে পরিবেশ তৈরি করেছে। তবে আজকাল টুরিস্টের আর স্থানীয় বিক্রেতাদের ভিড়ে স্বাভাবিক নির্জনতা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তবু ভাল লাগে টনস নদীর লুকোচুরি আর গুহার ভেতরের গা শিরশির করা ঠান্ডা ভাব। সব শেষে চলে আসি তপোবনে। আলাদা করে তপোবন নিয়ে কিছু বলবার নেই। কেননা এখানে পুরোটাই বিশ্বাসের ব্যাপার। বলা হয়, লক্ষণ এখানেই ইন্দ্রজিৎ বধের প্রায়শ্চিত্ত করতে আসেন। দ্রোণাচার্যও নাকি প্রায়শ্চিত্তের জন্য বেছে নিয়েছিলেন তপোবন। তবে এখানকার নৈসর্গিক দৃশ্য অনবদ্য।
মুগ্ধ করল সহস্রধারা। পাহাড়ের গা বেয়ে অনবরত জল বেরিয়ে আসছে। জলে রয়েছে গন্ধক। স্বাভাবিক প্রস্রবণ এটি। ঝরনাটিও দেখবার মতো। মনে করা হয় পাহাড়ের গায়ে রয়েছে সহস্রটি মুখ। তাই অবিরাম ধারায় জল নামে প্রতিটি মুখ থেকে। চারিদিকে সবুজ পাহাড়, জানা অজানা নানা গাছ। বিভিন্ন ফুলের দল শোভা বাড়িয়েছে জায়গাটির। অজস্র পাখিরও দেখা মিলল।
আমাদের ট্যাক্সি ড্রাইভার হরিদ্বার প্রবাসী মাধবদা অবশ্য বলছেন, সহস্রধারা সেই সৌন্দর্য আর নেই। নোংরা হয়ে গেছে চারধার। অত্যাধিক ভিড় আর ব্যবসার জন্য নাভিশ্বাস উঠেছে পাহাড়ের। কথাটা অবশ্য অবিশ্বাস্য নয়। উত্তর ভারতের যে কোনও পর্যটন কেন্দ্র ঘিরে যে মারাত্মক ভিড় আর দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে নিত্যদিন, তার বাইরে নয় হিমালয়ের কোলের এই সুন্দর শহর। এভাবে চললে সহস্রধারা বা গুচ্ছপানির মতো প্রকৃতিপ্রদত্ত বিস্ময়গুলি আর কতদিন সুষ্ঠ থাকবে বলা মুশকিল। অথচ হিমালয়ে আজও লুকিয়ে অসীম ঐশ্বর্য। তাদের যদি রক্ষা করতে না পারি ঠিকঠাক, তবে কী লাভ উচ্চকিত প্রচার আর উদ্ধত গর্ব করে!




















* ছবি- লেখক ও রীনা সাহা

(প্রকাশিত: বিবর্তন/ সম্পাদক- ডঃ উজ্জ্বল আচার্য)

No comments: