স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব বর্ষে একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ হল অবশেষে।
বৃত্তপথে যাত্রাটি শুরু হয়েছিল মে মাসে। আন্দামানের সেলুলার জেল থেকে। শেষ হল আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে।
একদা কুখ্যাত এই দুটি কারাগার আজ পরিণত মুক্তিতীর্থে।
১৯০৬ সালে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে লাল ইঁট দিয়ে নির্মিত কারাগারটিতে দীনেশ গুপ্ত, কানাইলাল দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, বীরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, গোপীনাথ সাহা, প্রমোদ রঞ্জন চৌধুরী, অনন্ত হরি মিত্র, রামকৃষ্ণ বিশ্বাস, দীনেশ মজুমদার প্রমুখ প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।
বন্দি ছিলেন পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, ডঃ বিধানচন্দ্র রায়, কাজি নজরুল ইসলামের মতো বরেণ্য মানুষদের পাশাপাশি ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া বহু দেশপ্রেমিক স্বাধীনতা সংগ্রামী।
জেল নির্মাণে ব্রিটিশ দার্শনিক জেরেমি বেন্থামের আবিষ্কৃত প্যানোপটিকন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, `একটি বৃত্তাকার ভবন...পরিধি বরাবর বিস্তৃত কক্ষে বন্দিরা...কেন্দ্রে থাকবেন প্রশাসক। জানালার খড়খড়ি এবং অন্যান্য কৌশলের মাধ্যমে বন্দিদের দৃষ্টির আড়ালে থাকবেন করা-পরিদর্শক। একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে সবকটি কক্ষ দেখতে পাওয়া যাবে।` অনেকটা আন্দামানের সেলুলার জেলের ধাঁচের সেন্ট্রাল টাওয়ারে বসে বিপ্লবী বন্দিদের ওপর নজর রাখত সেদিনের অত্যাচারী শাসকেরা।
জেলের সেন্ট্রাল টাওয়ারকে ঘিরে বৃত্তাকারে তৈরি করা বিভিন্ন সেল বর্তমানে উন্মুক্ত আমাদের মতো সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য। ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের জন্য পৃথকীকরণ কক্ষ, বন্দিদের জীবনচর্চা কক্ষ না দেখলে ঠিক বোঝা যায় না কতটা নির্মম অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের।
স্থায়ী প্রদর্শনী কক্ষে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম অসামান্যভাবে বিবৃত হয়েছে। আবার প্রদর্শনী কক্ষেও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হচ্ছে অতীত ইতিহাস। অবশ্য সন্ধ্যার লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো দেখবার গুরুত্ব ও অনুভূতি আলাদা। শো-তে সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের খুঁটিনাটি।
সাধারণ বন্দিদের অবস্থা অবশ্য ছিল অত্যন্ত করুণ। লম্বা ঘরে তাদের প্রায় গায়ে গা লাগিয়ে থাকতে হত। একই ঘরের মধ্যে পঞ্চাশজনের জন্য একটি শৌচাগার বলে দেয় তাঁদের নারকীয় দশা। বন্দিদের সেই দিনযাপনও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তবে শুধু গাদাগাদি ঠাসাঠাসি করে থাকা নয়। উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে হত সবাইকে। তাঁতকলে কাজ করে নির্দিষ্ট পরিমাণ সুতো বের করতে না পারলেই জুটত অকথ্য অত্যাচার।


























No comments:
Post a Comment