Saturday, August 19, 2023





হাই টেক সিটির শিল্প গ্রাম শিল্পরমম

শৌভিক রায়

গ্রাম দিয়ে শহরকে ঘেরার কথা বলেছিলেন কবি। কিন্তু গোটা গ্রামকে যদি শহরে তুলে আনা যায়, তবে কেমন হয়? উত্তর লুকিয়ে হায়দ্রাবাদের শিল্পরমমে।
কে আর জানত চারদিকের আকাশছোঁয়া বহুতল, চোখ ধাঁধানো ফ্লাই ওভার, সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলা মেট্রো আর ভীষণ ব্যস্ততার এই শহরে, এরকম আস্ত একটি গ্রাম রয়েছে ! হায়দ্রাবাদ বলতে তো আমরা বুঝি গোলকুন্ডা ফোর্ট, সালার জং মিউজিয়াম, হুসেন সাগর লেক, মক্কা মসজিদ, রামোজি ফিল্ম সিটি, সাইবার সিটি, আর একবোদ্বিতীয়ম চারমিনার। কিন্তু আয়তনের দিক থেকে ভারতের পাঁচ নম্বর মহানগরের, হাই-টেক সিটির মাঝে, এরকম একটি গ্রাম থাকাও যে প্রয়োজন, সেটা যেন চোখে আঙুল দিয়ে বোঝালেন শিল্পরমমের নির্মাতারা।
ক্রাফট মিউজিয়াম, আর্ট গ্যালারি, লাইব্রেরি, অডিটোরিয়াম, রিসার্চ সেন্টার ইত্যাদি সব কিছু মিলে হায়দ্রাবাদের শিল্পরমম আসলে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ শিল্প ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। মহানগরের কর্পোরেট দুনিয়ার ব্যস্ততার মাঝে ৬৫ একর জুড়ে ১৯৯২ সালে এই কেন্দ্রটি নির্মিত হয়। মূল ভাবনা ছিল ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতির রক্ষণাবেক্ষন ও স্থানীয় শিল্পীদের শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা। কিন্তু নির্মাণের পর থেকে এত দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে শিল্পরমম যে, সারা ভারত থেকেই এখানে ছুটে আসেন শিল্পীরা। দশেরা, মকর সংক্রান্তি, নবরাত্রি ইত্যাদি উপলক্ষে চলে শিল্প অনুষ্ঠান। উগাডি সহ দক্ষিণ ভারতীয় বিভিন্ন উৎসব ও বাৎসরিক হস্তশিল্প মেলাও শিল্পরমমের অন্যতম আকর্ষণ। রয়েছে বিভিন্ন ধরণের কর্মশালা, ট্রেনিং ক্যাম্প ইত্যাদির ব্যবস্থাও। শিল্পরমমের এম্পিথিয়েটারে মাঝেমাঝেই বসে নাটক, সঙ্গীত, নৃত্য বা পুস্তক পাঠের আসর। আর এইসব আসরে অংশ নেন দেশ-বিদেশের নামি-অনামি শিল্পীরা। নাটকে `থার্ড ফর্ম` থেকে মূকাভিনয় যেমন চলে, তেমনি সঙ্গীতে শোনা যায় বিভিন্ন ঘরানা। নৃত্যের ক্ষেত্রেও ভরতনাট্যম, কুচিপুড়ি, মনিপুরী ইত্যাদি নানা শৈলী দেখা যায়। খোলা আকাশের তলায়, মুক্ত পরিবেশে, এইসব অনুষ্ঠানের ভাগীদার হওয়া অত্যন্ত আনন্দের।
সম্পূর্ণ শিল্পরমমই টিপিক্যাল ভারতীয় গ্রামের মতো সাজানো। প্রাকৃতিক টিলা, ঝর্ণা, সবুজ গাছের সমারোহে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রক মিউজিয়াম, স্কাল্পচার পার্ক, ভিলেজ মিউজিয়াম, ১৫টি প্রমাণ সাইজের কুঁড়েঘর ইত্যাদি। সুন্দরনৈসর্গিক পরিবেশে ভিলেজ মিউজিয়ামে ঢুকলে ভারতীয় গ্রাম সম্পর্কে খুব সহজেই একটি ধারণা করা যায়। এখানকার কুমোর, কামার, চাষি, কাঠুরে, ছুতোর ইত্যাদি মূর্তিগুলি এতটাই জীবন্ত যে, অনেকসময় তাদের সত্যি মানুষ ভেবে ভুল হয়ে যায়।




















রক মিউজিয়ামটি অনবদ্য। এই মিউজিয়ামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা। শান্তিনিকেতনের শিল্পী সুব্রত বসুর মস্তিষ্কপ্রসূত এই মিউজিয়ামে তাঁর নিজের স্থাপত্যের পাশাপাশি রয়েছে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীদের অসামান্য সব শিল্পকর্ম। রাজীব মন্ডলের মেটামরফোসিস, রতন সিংয়ের `ইন পারসুট অফ নলেজ`, অদিতি গর্গের 'মিস্টিরিয়াসলি অ্যাটাচড` ইত্যাদি নজরে পড়তে বাধ্য।
`প্রাকৃতিক রাগা' বা লিভিং রক গ্যালারিতে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বিভিন্ন শিল্পকর্ম অত্যন্ত সুন্দরভাবে রক্ষিত। এই গ্যালারি দেখে অবশ্য একটু ঈর্ষা হল। হায়দ্রাবাদকে প্রকৃতি সত্যিই অকৃপণভাবে সাজিয়েছে! যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য ভাঙাচোরা জিনিস দিয়ে তৈরি ক্রাফট মিউজিয়ামটি অভিনব। যে কোনও জিনিসই যে খুব সুন্দরভাবে ব্যবহার করা যায়, তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ এই মিউজিয়ামটি। অবশ্য শুধু মিউজিয়ামে নয়, ক্রাফটের সম্ভার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে প্রায় সর্বত্র।
শিল্পরমমের আর্ট গ্যালারি আর লাইব্রেরি দেশের গর্ব। এমনিতেই নিজামের শহরে শিল্প সংস্কৃতির আলাদা কদর রয়েছে। অতীতে নিজামরা তো বটেই, সালার জঙের মতো আরও কিছু পরিবার শিল্পের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সেই ধারাকেই যেন অক্ষুণ্ণ রেখেছে শিল্পরমম। পাশাপাশি ব্যবস্থা রয়েছে শিল্পসামগ্রী বিক্রয়ের। একটু দরদাম করে এখান থেকে কিনে নেওয়া যায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের শাড়ি, ঘাঘরা, কুর্তা, কার্পেট কিংবা অন্যান্য দ্রব্য।
রুচি, ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এক অদ্ভুত মিলন হল শিল্পরমম। জুবিলি ও বানজারা হিলসের হায়দ্রাবাদে এই টুকরো গ্রাম যেন মরুভূমির বুকে সেই অসাধারণ ওয়েসিস, যেখানে মেলে সত্যিকারের প্রশান্তি।
(প্রকাশিত: শ্বাদল/ সম্পাদক নৃপেন্দ্র ভট্টাচার্য)

No comments: