Saturday, July 15, 2023


 

বাগানে লং জাম্পের পিট বানিয়েছি। খুব একটা পরিশ্রম হয়নি। মাটি নরম ছিল। কোদাল চালাতে ঝুরঝুরে হয়ে গেল। 

দুপুরে আসলে কিছু করবার থাকে না। স্কুল থেকে ফিরে, ভাত খেয়ে, অন্যদিন চালে উঠে পড়ি। রান্নাঘরের ওপর আসব্যাস্টাস দেওয়া। ওটা গরম হয় তাড়াতাড়ি। নরম বলে মাঝে মাঝে ভেঙেও যায়। বারান্দার চাল আর ঘরের চালের মধ্যে কয়েক হাতের ব্যবধান। ঘরের চালের ছায়া পড়ে বারান্দার চালে। ওই চালটা ঘরের চালের মতো ঢালু নয়। দিব্যি শুয়ে থাকা যায়। পিঠে অবশ্য উঁচুনিচু ঢাল। একটু লাগে! তাতে কী? ওটাই আমার দোতলা। মাথার ওপর আকাশের নীল ডিজাইনার ছাদ। দুপুরের ফুরফুরে হাওয়া আর পাকা পেয়ারার গন্ধ। ঘোর লেগে যায়।
 
পেয়ারা গাছটা বড্ড প্রিয়। সব কথা ওকেই বলি। ওরা তিন ভাই। ছোট জন পণ্ডিত কাকুর বাগানে।  দাদা আমাদের বাগানেই। পূবে। তার পেয়ারা বড় বড়। কাক ঠোকরাতে পারে না। তবে এই গাছের পেয়ারা মাঝে মাঝে খেয়ে যায়। অবশ্য কটা আর খাবে! ব্যাগ ভর্তি কত পেয়ারা কত জন নিয়ে যায়! 

মা এলে পাকা পেয়ারা পেড়ে দিই। মা বেশিদিন থাকে না। কিন্তু যাওয়ার আগে আমার জন্য জেলি বানিয়ে দেয়। কোনও কোনও সকালে দীপ্তি বেকারি থেকে পাউরুটি কিনে আনি। সেঁকে নিই কয়লার উনুনে। আমি উনুন সাজাতে পারি। ঘুটে, গুল আর কয়লা দিয়ে উনুন সাজাতে আমার দিব্যি লাগে। সকালে উনুনের ধোঁয়ায় ঢেকে যায় আকাশ। কাকগুলো তারস্বরে চিৎকার করে। গোপাল করের মিষ্টির দোকান থেকে কারিগরের গলা শোনা যায়। কাকদের ডাকে সে। কাক না খাওয়ালে নাকি ব্যবসা ভাল যায় না। আমি খুরমা ভালবাসি। পঁচিশ পয়সা দাম একটার। বাবা সবসময় পয়সা দেয় না। মা এলে চুপি চুপি মা`কে বলি। মা কিনে দেয়।
 
লং জাম্পের পিটে লাফ দিই দূর থেকে দৌড়ে এসে। দিদা ঘুমোচ্ছে। বাবা স্কুলে। দাদারও ক্লাস শেষ হয়নি। শিউলি গাছের পাশেই পিটটা। উত্তর ঘেঁষে। বড় পেয়ারা গাছের দিক থেকে দৌড়োই। দে লাফ! উড়ছি। শূন্যে। আর একটু।  এসে গেলাম প্রায়। আর একটু গেলেই দিনহাটা। শূন্যে কোচবিহার পার করেছি। নেমে আসছি নিচে। এই.....এই মাটি ছুঁলাম! এসে গেছি....মায়ের কাছে। 

মাটিতে জেলির গন্ধে মিশেছে খুরমার ঝুরঝুরে ভাব। 
মা যেন কোলে নিয়েছে আমায়। 

শীতের অবেলায় মাটিতেই শুয়ে থাকি.....

(সিরিজ: মা / শৌভিক রায়)

ছবি- ডুয়ার্সের কুমাইয়ের একটি বাড়ি (নিজের তোলা) 







বাবা নেই। দিনহাটায় গেছে। 

আমি আর দিদা শুধু। 

সকালে ফুল তুলেছি। শিউলি। শয়ে শয়ে ফুল প্রতিদিন পড়ে থাকে মাটিতে। দুটো সাজি ভর্তি হয়ে যায়। একটা সাজি তারের। হালকা। অন্যটা ভারি। আমি দুটোই আনি। 

শিশির পড়ছে এখন। টিনের চালে শিশির পড়ার শব্দ পাই। ভোরে। আমার ছোট্ট ঘরটা মূল বাড়ি থেকে আলাদা।  একলা থাকি। আগে এই ঘরে মদনকাকা থাকত। মদনকাকা এখন বদলি হয়ে গেছে। 

শিউলির গায়ে শিশির লেগে থাকে। মাটিতে পড়লে মাটিও লাগে ভেজা ফুলের গায়ে! কুড়িয়ে নিই সব ফুল। রাখি সাজিতে। সাজি উপচে পড়ে। 

ফুল দিয়ে ঠাকুরের সিংহাসন সাজাবো। থরে থরে সাদা ফুল থাকবে সেখানে। ঘর মো মো করবে শিউলির গন্ধে। 

আমাদের আলাদা ঠাকুর ঘর নেই। মা এলে যে ঘরে ঘুমোয় সে ঘরের এককোণে ঠাকুরের সিংহাসন। অন্য সময় দিদা ঘুমোয়। অথবা কোনও কাকিমা। মা এলে, দিদা বা কাকিমায়েরা দিনহাটায় চলে যায়। আমি তখন মায়ের সঙ্গে শুই ওই ঘরে। কোনও কোনও রাতে ঘুম ভেঙে গেলে বুঝি মা পাশে নেই।
 
সেজ কাকিমা বলে, মাটি লেগে থাকা ফুল ঠাকুরকে দিতে নেই। আমি দিই তবু। ঠাকুরও তো মা। আর ফুল তার সন্তান। মাটি লেগে থাকা ফুলকে মা হয়ত বকবেন। কিন্তু ফেলে দেবেন না। 

দিদার সঙ্গে কখনও চলে যাই বেড়াতে। দিদা ভোরে হাঁটে। কোনোদিন মিল রোডের ওভারব্রিজ, কোনোদিন মহাকাল বাড়ি। দেখা হয়ে যায় সুকেশের সঙ্গে। সুকেশের দিদাও হাঁটে। 

ভোরে কাঁঠালিচাপার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে অনেকটা। ওই গন্ধ পেলেই মনে হয় মা আসছে! মায়ের আসার দেরি নেই। 

রান্নাঘরে খড়ির উনুন। কয়লা নেই। রাতে ভাত করি আমি। দিদা বলে দেয় কীভাবে কী করতে হবে। ভাতে ফেলে দিই কয়েকটা ঢ্যাঁড়স আর টুকরো আলু। সর্ষের তেল, লবণ আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে ফেনা ফেনা ভাতে ঢ্যাঁড়স আর আলু সেদ্ধ খাই হাপুশ হুপুশ। অমৃতের মতো লাগে। মায়ের কথা মনে পড়ে। কী খাচ্ছে মা? বাবা? 

শুয়ে পড়ি নিজের ঘরে। 

শিশির পড়ার শব্দ পাই। টুপটুপ। 

শিউলি খসে....কাঁঠালিচাপার গন্ধ...পেছল পেছল ঢ্যাঁড়স সেদ্ধ...উনুনের আগুন...মা আসে, মা আসছে...


(সিরিজ: মা / শৌভিক রায়)


ছবি- হুগলি জেলার কামারপুকুর গ্রামের একটি বাড়ি  (নিজের তোলা) 





পরা-বাস্তবের জগৎ এক। বাস্তব থেকে অনেক দূরে।  এখানে  সময় অন্তহীন।   এখানে  শরীর অনুভূতিহীন।   এখানে  মন ভাসমান কোনো এক অজানা আকাশে।  রাতও নেই, দিনও নেই।  বরং এক অদ্ভুত ঘোর।  খন্ড খন্ড নানা অতীত মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে যায়.... যেন বর্ষা আকাশের জলভর্তি মেঘ....

হালকা শরীর অথচ মাথা ভার। কখনও  ঠান্ডার আবেশ কপালে। জলপট্টির বা শীতল হাতের। 

বোঝা যায় না কার! উষ্ণ কপালে উষ্ণ হাত। শুধু একটা স্পর্শ মাত্র। কোনও মতে চোখ খুলে তাকানো একবার। সাদা দেওয়াল আরও সাদা। মুখ স্বাদহীন। তেতো। 

মাঝে মাঝে কোনো এক শূন্য থেকে ভেসে আসে চেনা গলা- “কি রে, খেলবি না আজ?’ 
পরক্ষণেই আবার আওয়াজ- ‘তোর জ্বর?' 

ঘোর, ঘোর। সব ঘোরে ঢাকা, অজানা, অচেনা, অদ্ভুত।

মা'কে খোঁজা কেবল। কোথায় মা তুমি, কতটা দূরে! 

মা তো দূরেই। হয়তো দু'দিন বা তিনদিন বাদে জানবে! ততদিনে জ্বর হয় কমে যাবে বা কমে যাবার দিকে আসবে। পিঠে বালিশ গুঁজে বিছানায় বসিয়ে দেবে নরেশদা বা অন্য কেউ। 

কিন্তু এই কদিন কাটবে কিভাবে? মা'কে খুঁজেই কেবল! 

চারদিন-পাঁচদিন পর থেকে শুরু হবে পথ্য। এই  কদিন বার্লি আর সাবুদানা। তারপর গলাভাত, শিং বা মাগুড় মাছ, পেঁপে দিয়ে ঝোল। 
মায়ের কথা তাই বারবার মনে পড়ে। জল চলে আসে চোখে। 

কিন্তু বড় হয়ে যাওয়া ছেলে কাঁদে নাকি! এক একটা বড় অসুখের ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করতে করতে এভাবেই বড় হয়ে ওঠা।

পরা-বাস্তবের জগৎ ফিরে ফিরে আসে.....কখনো গামা ক্যামেরার তলায় শুয়ে থেকে, কখনো এম আর আই মেশিনের এক অজানা সুড়ঙ্গে, কখনো বা অপারেশন টেবলে অচেতন হ'তে হ'তে। 

মা`কে খোঁজা তখনও। হাতড়ে ফেরা বারবার।

বড় কি আমরা হই আদৌ? না কি হয়েছি?  যুবক থেকে শুধু প্রৌঢ় হয়েছি, প্রৌঢ় থেকে বৃদ্ধ। 

তবু খুঁজি সেই আঁচল যা গোপনে মুছিয়ে সেই চোখের জল, যা ফেলতে পারিনা সবার সামনে....


ছবি- চিড়িয়াটাপু , পোর্ট ব্লেয়ার, আন্দামান 


(সিরিজ: মা / শৌভিক রায়)









বড়দাকে ভয় পাই। তবে মেজদাকে আরও বেশি। সেজদা ভাল ভীষণ। রাগী রাগী মুখ হলেও মেজদার মতো বকুনি দেন না। 

রাঙাদা? না খেয়ে এলে মুখ দেখে বুঝে যান। খাইয়ে দেন নিজের কোয়ার্টারে নিয়ে গিয়ে। অঙ্ক না পারলে পাশে বসে বুঝিয়ে দেন। খুব রেগে গেলে, চক দিয়ে কপালে টিপ দিয়ে দেন। চটি পড়েন না। খালি পায়ে হেঁটে বেড়ান। রাঙাদার নাম জানিনা। রাঙাদাদের নাম হয় নাকি! 

মা ভাল অঙ্ক পারে। মা থাকলে ঠিক অঙ্ক বুঝিয়ে দিত। বাবা বুঝিয়ে দেয় ঠিকই। তবে মায়ের মতো না। বাবা ভাল পড়ায় ইংরেজি। টেন্স শিখিয়ে দিয়েছে আমায়। ট্রান্সলেশন ঝটপট করে ফেলি। বড়দা খুশি হন খুব। মা কাছে নেই বলে, অঙ্ক বোঝানোর লোক নেই। অঙ্কে কম নম্বর পাই।

অঙ্ক সত্যি কঠিন। মা বলে, অঙ্ক মেলে না। কালো মায়ের  অনেক অঙ্ক মেলেনি। বর জুটেছে ফর্সা। সুপুরুষ। মায়ের মুখ মিষ্টি। তবু তো কালো! দিদিমনি। রাগী।

বাবাও  ভয় পায়? না বোধহয়। 

তবে মা মাঝে মাঝে কাঁদে। অবাক তাকিয়ে থাকলে বলে, মেয়েদের জীবন নাকি আমি বুঝব না! কেন বুঝব না? ছেলে বলে? 

মানি আসে মাঝে মাঝে। মানিকে ভালবাসি। মানির আলমারিতে আমার ছবি রাখা আছে। কেউ কেউ জানতে চায়, মা না মানি...কে আমার আসল মা? হাসি পায়। মায়ের আসল নকল হয় কখনও ? 

মানিকে দাদা মাসি বলে। মানি এলে আমাকে নিয়ে রাতে ঘুমোয়। মা এলেও আমাকে নিয়ে রাতে ঘুমোয়। কখনও দুজনে একসঙ্গে এলে দুজনের মাঝে আমি ঘুমোই। মানির গায়ে মায়ের গন্ধ পাই না। মায়ের গায়ে মায়ের গন্ধ। মায়ের ওমে কাঁথা লাগে না। 

বৃষ্টি হয়। সারা রাত বৃষ্টি হয়। কোনও কোনও রাতে জেগে উঠে শুনি মা গাইছে, `আমার সকল দুখের প্রদীপ...।` 

মা গাইতে জানে না। দাদাকে তবলা শিখতে দিয়েছিল। অল্প শিখে ছেড়ে দিয়েছে। আমাকে কোনও কিছুতে দেয়নি। 

পেয়ারা গাছকে মাঝে মাঝে বলি, তবলা শিখলে বেশ হত! মায়ের গানের সঙ্গে বাজাতে পারতাম। 

কষ্ট হলে মাদারি রোডে, ওভারব্রিজে, চলে যাই। ওখানে অনেক কুল গাছ আছে। কুল দেখলে মায়ের কথা মনে পড়ে। সরস্বতী পুজোর আগে কুল খেতে নেই। মা বলেছে। 

সরস্বতী পুজো আসছে। মা আসবে। মা আসুক। মা এলে ভাল লাগে। মানি এলেও ভাল লাগে। 

তবে মা এলে বেশি ভাল লাগে.... 


ছবি- রাধানগর, হ্যাভলক, আন্দামান

(সিরিজ: মা / শৌভিক রায়)








রাস্তার ওপারেই মসজিদ। ভোরে আজানের শব্দে জাগি। ঘুমিয়ে পড়ি আবার। 

মসজিদের মাঠে খোঁচা খোঁচা ঘাস। পায়ে লাগে। তবু ফুটবল খেলি। মধু আর আমি। 

মধুদের বাড়ি টিনের। আমাদের বাড়িও। ওদের বাড়ির বড় গর্ত আছে। আমাদেরও আছে। আমরা ওই গর্তকে বলি `পাগার`। মাঝে মাঝে লাফ দিয়ে পাগার পার হই। ওটা আমাদের খেলা। পাগারে নোংরা ফেলা হয়। 
 
জানালা বেয়ে ওপরে ওঠাও আমাদের খেলা। সেদিন মধু সবার ওপরে ছিল। ওর নিচে আমি। আমার নিচে শুক্লা। তারপর মনাদি।  মধু ওর হাতের প্যাকিং বাক্সের কাঠের ঢাকনা ফেলে দিল। সেটা আমার গাল কেটে নিচে পড়ে গেল। 

রক্ত আর রক্ত। বড় কাকিমা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে। 

কাকিমার গায়ে মায়ের গন্ধ। ছোটবেলায় মরে যাচ্ছিলাম। কাকিমা বাঁচিয়েছিল। কাকিমা খুব ভালবাসে। আমিও। 

দুপুরে জ্বর এলো। ব্যথা খুব।

 মুখে তেতো স্বাদ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম বিকেলে। বাড়ির সামনে বড়কাকার স্টেশনারি দোকানের সামনে।
 
মসজিদের পাশ দিয়ে যে রাস্তা, সে রাস্তা দিয়ে মা আসবে। ওই রাস্তা চলে গেছে ডাকবাংলো পাড়ার দিকে। ওখানে মায়ের স্কুল। মা দিদিমণি। 

মায়ের স্কুলের পাশ দিয়ে একটা রাস্তা আরও ভেতরে চলে গেছে। সেই রাস্তায় খানিক এগোলে ডান হাতে পুকুর। ওই পুকুরে চন্দ্রবোড়া সাপ আছে। সেই সাপ রোদ পোয়াতে রাস্তায় শুয়ে থাকে। শর্মিলাদি বলেছিল। শর্মিলাদি আমাকে পড়াত। 

এখন আমি এখানে থাকি না। মাঝে মাঝে আসি। বাবা নিয়ে আসে। বাবুয়াদার সঙ্গেও আসি। দাদাকে বাবা একা ছাড়ে না। 

আমি এলে রাতে মা আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোয়। দুপুরে বড় কাকিমা কাছে নিয়ে শোয়। মানির বাড়িতেও যাই। মানি চিড়ের মোওয়া খেতে দেয়, কখনও নারকোলের তক্তি। মানির খাটে পা ঝুলিয়ে বসে খাই আমি। মানি জড়িয়ে ধরে আদর করে। মানিও দিদিমনি। মানিকে সবাই ভয় পায়। 

মা`কে দেখা যায় ওই। মাথায় ছাতা। পাশে ঝর্ণা মাসি। মা`কে দেখে সামনে এগোই। যেতে পারি না। পা টলমল করে। পেছন থেকে মেজকাকা জড়িয়ে ধরে। গা এলিয়ে দিই। শুধু আকাশ দেখি। বিরাট আকাশ। নীল। 
    
ফুলদিঘির পারে শিশির ডাক্তার বসেন। ওঁর সব ওষুধ একরকম। পেছনের ডিস্পেন্সারিতে কম্পাউন্ডার কাকা লাল ওষুধ বানান। বরফির মতো কাগজ কেটে ওষুধের শিশির গায়ে লাগিয়ে দেন। 

রাতে জ্বর বাড়ে। জ্বর বাড়লে আশুকাকা সামনে আসে। আশুকাকা নেই। মরে গেছে। ওর জন্য আমি চলে গেছি বাবার কাছে। আশুকাকা এসে অনেক কথা বলে। আমাকে নিয়ে যায় থানার পুকুরে। কোয়ালিদহে। ওর সাইকেলে চেপে গোসানিমারি যেতে যেতে পশ্চিমের রোদে খুব গরম লাগে। ঘাম হয়। ভিজে যায় সব। কেউ গা মুছিয়ে দেয়। 

চোখ খুলি। মা চুপ করে বসে। গম্ভীর। কাকিমার চোখে জল। দিদা বলে ওঠে, `চোখ মেলছে, ভয় নাই। পোলাপান। দুষ্টামি তো করবই। অহন কিসু খাওয়াও ওরে।` 

মা কেঁদে ওঠে। চুপ করে থাকি। পাশ ফিরি। কান্না পায়। খুব কান্না পায়। কাঁদি না। আমার নাকি চোখে জল আসে না। সবাই বলে।  

কিন্তু মা কাঁদলে কষ্ট হয়। খুব কষ্ট হয়। কান্না বোধহয় কষ্ট কমায়। কিন্তু কাঁদতে পারি না।          
   
ছবি- ডিগলিপুরের পথে 

 (সিরিজ: মা / শৌভিক রায়)




আশ্রমের রাস্তায় প্রতিমার সারি। তাকিয়ে থাকি। ভাল লাগে বড্ড। প্রতিমার গায়ে মাটির গন্ধ। মাটির গন্ধে মায়ের কথা মনে পড়ে। 

খানিক আগে পতাকা তোলা দেখেছি। মায়ের স্কুলে। বড় মাসি তুলেছেন। বড় মাসি হেডমিস্ট্রেস। পান খান খুব। 

পতাকা তোলা দেখতে ভীষণ ভাল লাগে। ওপরে উঠে গেলে পতাকা থেকে ফুল ঝরে পড়ে। 

ফুল কি শুধুই ঝরে পড়ে! 
ডাল থেকেও, পতাকা থেকেও?

মায়ের ছাত্রীরা বড় সব। আমাকে আদর করে। লজেন্স দেয়। গাল টিপে ধরে। কেউ কাছ ছাড়া করে না।

পতাকা তোলা হলে ওরা গান গাইল। ওদের সঙ্গে গলা মেলালো সবাই। আমি চুপ করে শুনলাম। গানটা আমিও জানি। গাইতে পারতাম। আমার লজ্জা লাগল।

বাড়ি ফিরে মা মাংস রাঁধে। সেজ কাকা নিয়ে এসেছে। 

এই বাড়িতে তাও কখনও মাংস বা ডিম হয়। আমার ওই বাড়িতে হয় না। কে করবে! দিদা থাকে আমাদের সঙ্গে। দিদা মাংস ছোঁয় না।

দিদা মালা জপে। গোপাল পুজো করে। অন্ন ভোগ দেয়। গুরুদেব এলে চরণামৃত খায়। আমাদের দলা প্রসাদ দেয়।

আমি নলি হাড় ভালবাসি। চুষে চুষে খাই। মা দেয়। মনে মনে গুনি কয় টুকরো মাংস আমার পাতে...এক, দুই, তিন......

দুপুরে ভাত ঘুম দিই। বৃষ্টি কমে গেছে। গরমও তেমন নেই। তবু হঠাৎ মেঘ ডাকে। কালো করে আসে চারদিক। মা পাশে শুয়ে গুনগুন করে, তোমাতে বিশ্ব মায়ের আঁচল পাতা....

বিশ্ব মা কে? বড়দা ক্লাসে ভারত মায়ের কথা বলেছেন। প্রতিমার মুখে ভারত মা কে দেখেছি।
অস্পষ্ট অবয়ব তার। প্রতিমার মতোই অসম্পূর্ণ যেন। আমার চোখে। 

বিশ্ব মা ওরকমই দেখতে কি? তার আঁচলও কি মায়ের মতোই শীতল আর মিষ্টি গন্ধে ভরা!

ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ি।

সন্ধ্যায় আকাশে তিন রঙের আতশবাজি। প্রায় সব বাড়িতেই প্রদীপ। শঙ্খ। হৈ চৈ চারদিকে।

দিদাকে পেলাম গোয়ালঘরে। লালির সামনে। 

লালি খুব দুরন্ত। অচেনা মানুষকে গুঁতিয়ে দেয়।তবে দিদার সঙ্গে দারুণ ভাব।

দিদার গলা কানে আসে, তর বান্ধন খুইলা দিছি। যা গিয়া। যেই দিক পারস চইলা যা। নাও যদি ফিরস তাও কিছু কমু না। স্বাধীনতা স্বাধীনতা কইরা সক্কলে মাইতা উঠছে। যে মাইয়া বুকের পোলাডারে হারাইলো তার খবর কেউ রাখছে? যে মা রে তিন টুগরা কইরলি জানতে চাইছস সে ক্যামন আছে? আমাগো যত আস্ফালন এই অবলা জীবের উপর। ক্যান কথা কওন পায় না বইলা? অ লালি....যা গিয়া। তুই গ্যালে তাও একটু স্বাধীনতা বুঝি!

লালি টলটলে চোখে তাকিয়ে থাকে। লালির গলা জড়িয়ে দিদা আরও কী সব বলে চলে...

বুঝি না আমি।
বোঝার চেষ্টায় দাঁড়িয়ে থাকি।

ছবি- রূপসি কলকাতা আকাশপথে 

(সিরিজ: মা/ শৌভিক রায়)




জ্যামা খুব কালো। কষ্টি পাথর কুঁদে বানানো যেন। লাল জামায় টকটক করে ওর গা।
 
গুবরির নাক জ্যামার মতো নয়। বোঁচা। ওর তাই কষ্ট। ও-ও জ্যামার মতো কালো। 

ওরা আমাকে সাহেব ডাকে। বলে, `তু খুব সাদা আছিস। সাহেব হবি।  হামরা কালা আছি।`

ওরা মা`কে মাইজি ডাকে। মায়ের সঙ্গে খুব ভাব ওদের। 

ওরা বাবাকে বাসক গাছ এনে দিয়েছে। ওই গাছ দিয়ে কোয়ার্টারের বেড়া করেছে বাবা। 

কাশি হলেই ওই পাতার রস করে দেয় মা। আমার ভাল লাগে না। তেতো বড্ড। 

মা বলেছে জ্যামা আর গুবরি মদেশিয়া। ওই দূরে কোচবিহার চা বাগানে ওদের বাড়ি। ওদের বাবা কুলি। পাতা তোলে। হাড়িয়া খায়। ওদের মা নেই। আমার মা ওদের মা। আমার মতো ওরাও মায়ের আসবার অপেক্ষা করে।

বিএলআরও অফিসের তলায় আমোদি থাকে। আমোদির মেয়ে অমলা। আমোদি পূর্ব পাকিস্থান থেকে এসেছে। দিদা বলেছে।
 
আমোদি আমাদের বাড়িতে কাজ করে। অদ্ভুত ভাষায় কথা বলে। 

অমলা সারাদিন কাঁদে। আমোদি ওর সামনে এনামেলের বাটিতে মুড়ি দেয়। অমলা একটা একটা করে মুড়ি মুখে দেয় আর কাঁদে। অমলার বাবা নেই। আমোদিও বলে না কোথায় ওর বাবা। 

আমোদির মতো আরও অনেকে অফিসের তলায় থাকে। ওরা রেশন পায়। মোটা চালের জন্য মারামারি করে। 
আমোদি বলে, আমাগো হুদাই ক্ষুধা পায়। দ্যাশডা সব লইয়া গলা ধাক্কা দিয়া শুধু বাইরই করে নাই, ক্ষুধাও দিসে ঠাইসে।
 
ওর কথা শুনে দিদা কাঁদে। বাবা চুপ করে যায়। অমলা শুধু চেঁচায়। 

পূর্ব পাকিস্থানে আমাদের নাকি পুকুর ছিল। ক্ষেত ছিল। আমরা বড়লোক ছিলাম না। কিন্তু নিজেদের মাতৃভূমি ছিল।

আমি মাতৃভূমি বুঝি না। এই বাড়িও আমার নিজের। ওই বাড়িও। মা এখানেও আসে, ওখানেও থাকে। আমার বাড়ি কোনটা মা?

জ্যামা আর গুবরি আমোদির সঙ্গে গল্প করে। ওরা নিজেদের ভাষা বলে। আমোদি নিজের। কেউ কিছু বোঝে না। ওরা হাসে। আবার কথা বলে। অমলা কেঁদেই চলে। আমি দেখি মাতৃভূমি কীভাবে মিলে যাচ্ছে ওপার থেকে এপারে। 

দেখি মা দাঁড়িয়ে ওদের মাঝে। তিনজনকেই ছুঁয়ে রয়েছে মা। 

প্রশ্ন করি মা`কে আবার, আমার মাতৃভূমি কোনটা মা?

মা জড়িয়ে ধরে। 

মা যেখানে যখন জড়িয়ে ধরে সেটাই আমার মাতৃভূমি। বুঝি সেটা। চিনি সেটা। 


ছবি- চেরাপুঞ্জির এক গ্রামে

(সিরিজ: মা/ শৌভিক রায়) 







কোয়ার্টারের টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ। সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। সামনের ঢালু মাঠে জল ছুটছে। ঝর্ণার মতো। জলে পা ভেজাই। আঙুল দিয়ে নরম মাটিতে গর্ত করি। জলের ধারা বদলে যায় অন্যদিকে। হাততালি দিই। আমি নদী তৈরি করেছি। 

কৃষ্ণচূড়া গাছের তলাটা বিলকুল লাল। ফুল ঝরে পড়েছে। বৃষ্টি মাখা ফুলে ছিট ছিট কাদা। হাত বোলাই পাপড়িতে। কুঁড়ি নিই কয়েকটা। কুঁড়ির ভেতর দণ্ড। দণ্ডের মাথায় কেশর। দুটো দণ্ড দুই হাতে। খেলি একাই। 

বৃষ্টি ধরবে বিকেলে। উত্তর আকাশে মেঘ কাটবে। ঝকঝক করবে পাহাড়। এত নীল আর এত নীল! কখনও গায়ে ওর কালো ছোপ। ধস নেমেছে। ধস নাকি সবার নামে। মা বলে। `ধস নামলে মা`কে চিনতে পারবি তো?` মায়ের কথা বুঝি না। মন খারাপ হয়। মা হেসে ওঠে। জড়িয়ে ধরে।

রাত হলে আলো চলে যায়। চা-বাগানে সাপ্লাই দেয়। সবাই বলে। লণ্ঠনের আলো বিরাট ছায়া ফেলে দেওয়ালে। ভয় লাগে। কুপি জ্বলে রান্নাঘরে। মা রান্না করে। মা এলে নানা রান্না হয়। বৃষ্টির রাতে খিচুড়ি খাই। সঙ্গে পাপড় ভাজা। হাঁসের ডিমের অমলেট। অমলেট না মামলেট রে দাদা? কটমট তাকায় দাদা। ভয় লাগে। আর প্রশ্ন করি না। খিচুড়ির রসুনটা চুষে চুষে খাই। বাবা চুল ঘেটে দেয়। দাদা মুখ বেঁকায়।

কাঁথা থাকে না গায়ে। ঠান্ডা লাগে। গুটিসুটি শুয়ে থাকি। মা চুপচাপ আসে ঘরে। কাঁথা বিছিয়ে দেয় গায়ে। বৃষ্টির শব্দ বাড়ে। আমার নদীর জল বাড়বে। শুয়ে শুয়ে ভাবি। কাল আর একটা নদী তৈরি করব। ঘুম চলে আসে। 

সারা রাত ব্যাঙ ডাকে। জলের শব্দ শুনি। ঝরে পড়ার গান গায় বৃষ্টি। মায়ের গলা কানে আসে। মা কি গান গাইছে? নদীর ধারে বসে ? মায়ের গান কি চলে যাচ্ছে অনেক দূরে? স্রোতে মিশে? কী গান গাইছে মা?

কাকভোরে উঠে পড়ি। জল থৈ থৈ চারদিক। নদী নেই। সমুদ্র হয়ে গেছে। সমুদ্র কেমন? কত বড়? আমি সমুদ্র দেখিনি। পাহাড় দেখেছি। সমুদ্র দেখব। মা`কে বলি। মা চুমু দেয় গালে। 

পুটন আসে। ছাতা মাথায়। হাতে চারটে রুটি। কাকিমা পাঠিয়েছে। রুটি ভালবাসি। ঝোলা গুড় বের করে দেয় মা। মাখিয়ে নিই। দুটো রুটি আমার। দুটো পুটনের। জানালায় বসি। পা বের করি দিই বাইরে। দুজনেই। পায়ে বৃষ্টি ঝরে। ঠাণ্ডা লাগে। 

কেউ হাত রাখে দুজনের কাঁধেই। পেছনে তাকাই। মা। মায়ের চোখে জল। ঠোঁটে হাসি। 

`যেদিন শেষ হবে সব, দুজনেই থাকিস আমার কাছে।` মা বলে। 

কী শেষ হবে মা? কী? ও মা, কী??? 

মা কথা বলে না। 

দমকা হাওয়ায় বৃষ্টির ছাট ভিজিয়ে দেয় আমাদের চোখ। 

ভিজিয়ে দেয়? নাকি মুছিয়ে দেয়!  

    
ছবি- বারাটাং, আন্দামান 

(সিরিজ: মা/ শৌভিক রায়) 







 

'....নারায়ণের বাক্যে লক্ষ্মী অতি হৃষ্টমন,/ ব্রত প্রচারিতে মর্ত্যে করিল গমন।/ মর্ত্যে আসি ছদ্মবেশে ভ্রমে নারায়ণী,/ দেখিলেন বনমধ্যে বৃদ্ধা এক বসিয়া আপনি।/ সদয় হইয়া লক্ষ্মী জিজ্ঞাসিল তারে,/ কহ মাগো কি হেতু এ ঘোর কান্তারে।/ বৃদ্ধা কহে শোন মাতা আমি অভাগিনী,/ কহিল সে লক্ষ্মী প্রতি আপন কাহিনী।/ পতি-পুত্র ছিল মোর লক্ষ্মীযুক্ত ঘর,/ এখন সব ছিন্নভিন্ন যাতনাই সার।/ যাতনা সহিতে নারি এসেছি কানন,/ ত্যাজিব জীবন আজি করেছি মনন।/ নারায়ণী বলে শুন আমার বচন,/ আত্মহত্যা মহাপাপ নরকে গমন....'

 বৃহস্পতিবার। 
পুজো শেষে পাঁচালি পড়ে মা। মায়ের কপালে ছোট্ট টিপ। মা`কে দেখি। 
আমার লক্ষ্মী ঠাকুর দেখা হয়। 

প্রণবের মা দেবী দূর্গা। দশভুজা। খড়ির উনুনের আঁচে ফর্সা মুখ টকটকে লাল। পিঁড়ি পেতে খাইয়ে দেন আমাকে। মুসুর ডালের সে কী স্বাদ! আদর করে বলেন, `মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারিস না? ওরা যা বলে বলুক, তুই তো জানিস তোর মা কে!` কাকু বিড়বিড় করেন, `তোদের নিয়েই চিন্তা রে। ভাল করে পড়। চাকরি না পেলে খাবি কী!` 

বাপি নিয়ে যায়। ওদের বাড়ি। কাকিমা সুঁচ সুতো দিয়ে নকশা লেখেন। কাপড়ে। `যখন তোমার কেউ ছিল না তখন ছিলাম আমি/ এখন তোমার সব হয়েছে পর হয়েছি আমি`। কাকিমা.... ও কাকিমা, সত্যিই কি আমাদের সব হয়? সত্যি কি যখন ওঁর কিছু ছিল না তখন তুমি আপন ছিলে! 
হেসে ওঠেন কাকিমা। চুল ঘেঁটে দেন। `নারকোলের তক্তি করেছি। না খেয়ে যাস না.....`

বাপিদের মাঝের বাড়ি ছেড়ে দে ছুট পুটনের কাছে। ঠাকুমা গেটে। রাশভারী। ভয় পাই। কাকিমা হাসেন। পেয়ারা দেন। 

পুটনকে নিয়ে সোজা সুমতি মায়ের কাছে।

সুমতি মায়ের কপালে বিরাট বড় লাল টিপ। পরনে লাল শাড়ি। চুলে জটা। বাড়ির ভেতর মন্দির। মন্দিরে কালী মা। কৃষ্ণকালো। ভয়ঙ্করী। নরমুণ্ড দুলছে গলায়। আমরা ভয় পাই। সুমতি মা হেসে ওঠেন। জড়িয়ে ধরেন আমাদের। ওঁর গায়ে মায়ের গন্ধ। আমার চোখ ঝাপসা হয়।

লাল পুলে চলে যাই। লোহার পাত পাতা। হেঁটে যাই ওপর দিয়ে। রেল লাইন ধরে এগোই। দূরে মিল রোডের ওভারব্রিজ দেখা যায়। 

বা হাতে আঁকাবাঁকা নদী। কু ঝিক ঝিক শোনা যায়। 

কালো ধোঁয়া উড়িয়ে ট্রেন আসে। জনতা এক্সপ্রেস। ইঞ্জিনের দুই ধারে দুই ড্রাইভারকে দেখা যায়। নিচ থেকে কেউ কেউ পাঠকাঠিতে টাকা গুঁজে এগিয়ে দেয়। ঝুপ করে কয়লা নেমে আসে মাটিতে। ওরা তুলে নেয়। এই কয়লায় আগুন জ্বলবে। ঘরে। চুলো ধরবে। রান্না হবে।

আমি দেখি আমাদের মায়েরা সেই কয়লা তুলছে....

বাপি বলে, `চল`

ফিরে তাকাই। মায়েরা নেই। অন্য কেউ। চিনি না তাদের। মলিন বসন। শীর্ণ চেহারা। 

ওভারব্রিজে উঠে আসি। হেঁটেছি অনেকটা। বসে থাকি। 

সামনে ভুটান পাহাড়। নীল। কোথাও কোথাও এবড়ো খেবড়ো। ধস নেমেছে। 

বৈরাগীদা সাইকেল থেকে নামে।  `তোরা এখনও এখানে! বাড়ি যা। সন্ধ্যা হবে। মা ভাববে।` 

তুমি কোথায় গেছিলে বৈরাগীদা? 

`প্র্যাকটিস করে এলাম। বাগানে ফিরছি এখন। যা। রাত করিস না। জায়গাটা ভাল না।`

অন্ধকারে গান ভেসে আসে। শাঁখ বাজে কোথাও।

ফিরি আমরা। 
আবার আসবো বলেই ফিরি। 

মায়েরা ফিরে আসে। 
মায়েরা হয়ত ফিরে আসে না আর....... 

 
ছবি- ফারাক্কা,  পশ্চিমবঙ্গ  

(সিরিজ: মা/ শৌভিক রায়) 





মিটার গেজ ট্রেন। দুদ্দাড় ছুটছে। 
পেরিয়ে গেছি কিষাণগঞ্জ। ডালখোলা। 
এবার ট্রেন বাঁক নেবে। উঁকি দিই জানালা দিয়ে। সামনে। ওইইই যে.....ধোঁওয়া ওড়ানো ইঞ্জিন। 

মা বলে, `পেছনে দেখ।`

অবাক কাণ্ড! ট্রেনের শেষ দেখা যাচ্ছে। 

মা তুমি জানলে কীভাবে?
বারসই যে। জানব তো! এখান থেকেই তো কাটিহারের লাইন। 
কাটিহার বুঝি দারুণ জায়গা মা?
দারুণই তো! 
তোমার স্কুল দেখাবে মা?
দেখিস। আমার দিদিমণিদেরও দেখবি চল। 
তুমি দিদিমণি....তোমারও দিদিমণি!! তাঁরা বুঝি অ..নে..ক বড়?
সব দিদিমণিরাই বড়। তারাও মা। আমার মা। 
ধুস! কতজন মা হয়? মা তো একজনই....
হয় রে হয়....বুঝবি একদিন। বড় হলে। 
কবে বড় হব মা আমি?
হবি না কোনও দিন। ছোট্টটি থাকবি তখনও যখন আমি ছাই হয়ে যাব.....

আলুয়াবাড়ি থেকে ট্রেন চেপেছি। বড়মামা স্টেশন মাস্টার। ছোট্ট কোয়ার্টার। ইঁদারার ওপরে বেড়া। পাশের কোয়ার্টারের অর্ধেক। মামাদের অর্ধেক। মজা লাগে। জল ভাগ। জল কি ভাগ হয় কখনও?

শহর কিছুটা দূরে। ইসলামপুর। এক্কা চলে। টাঙাও। 
ছোটমামা শহরে থাকে। ছোটমামার দোতলা বাড়ি। ওখানেও থাকি। ছোটমামা টুকরি ভরে আমি নিয়ে আসে। ফজলি। কী মিষ্টি, কী মিষ্টি। ঝুনুর মতো। ঝুনু ভাই। ছোট। আদর করি। 

আলুয়াবাড়ি ভাল লাগে। ট্রেন দেখি। ওভারব্রিজে উঠি। সবুদাদা কুন্তুদাদা আদর করে। গোপাদি লিপিদি। ভূতের গল্প বলে। রাতের বেলায় স্টেশনের টিমটিমে আলো। গা ছমছম করে। 

কাটিহারে পৌঁছাই। মেজমামা স্টেশনে দাঁড়িয়ে। সঙ্গে রুনু পাপু। শান্তাদি আসেনি। বাড়িতে আছে। 
হরদয়াল টকিজ পার করে বাড়ি। দিদা দাঁড়িয়ে বাইরে। দাদু নেই। 
দিদার গায়ে মিষ্টি গন্ধ। থুতনিতে আঙুল রেখে চুমু দেয় দিদা।
মা ছোট হয়ে যায়। দুই বিনুনি করে। মা ঝলমলে হয়ে যায়। মা কলকল কথা বলে। দিদা হাসে। মায়ের গায়ে হাত বোলায়। 

দিদা তুমি কি মা`কে বেশি ভালবাসে?
বাসি তো। 
আমার চাইতেও বেশি?
হ্যাঁ রে...
রুনু পাপু শান্তাদি লিপিদি গোপাদি ঝুনু দাদা ....
হ্যাঁ রে বাপু হ্যাঁ। 
কেন? কেন?
তোর মা তো আমার মেয়ে। 
আমরা যে তোমার ছেলে আর মেয়ের ছেলেমেয়ে?
তোদেরও বাসি 
কম বাসো 
তোদের ভালবাসার জন্য তোদের বাবা মা আছে। আমার ছেলে মেয়ের তো বাবা নেই। মা শুধু। তাই আমি বেশি ভালবাসি রে 
দিদা তুমি খুব চালাক। পচা। আমাদের ভালবাসো না। 

দিদা উত্তর দেয় না। ঘুমিয়ে পড়ে। 
আমাদের চোখেও ঘুম। 
ঘুম চোখে দেখি রেল লাইন ধরে মা হেঁটে যাচ্ছে দূরে....কাশ ফুলের পাশ দিয়ে....আকাশে বাবার মুখ....
বাবা বলেছে আকাশের মতো উদার হতে.....কীভাবে উদার হতে হয় বাবা? মা....তুমি বলে দাও মা.....

উদার হতে চাই যে! পারি না তো, কিছুতেই পারি না..... 
 

ছবি- কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ

(সিরিজ: মা/ শৌভিক রায়) 




পরিচ্ছদ। বিশুবাবুর দোকান। উঁচু গদি। অনেকটা ছড়ানো। গদিতে সাদা ফরাস। এক কোণে বড় বাক্স। কাঠের। পেছনে তাকিয়া। সার সার আলমারি। শাড়ি ভর্তি। অন্যদিকে জামা-কাপড়ের থান। 

শাড়ি নামে। সেজো কাকিমা রংচঙে ভালবাসে। মা মেজ কাকিমার শাড়ি পছন্দ করে দেয়। বাবা দেখায় মায়ের শাড়ি। বড় কাকিমার কোনও ইচ্ছে নেই। পিসি সাদা শাড়ি পরে।  জামা-কাপড়ের পিস। কাকুদের সবার। 

বিশুবাবুর দোকান থেকে নারায়ণী ড্রেস হাউস। ছোটদের জন্য। রেডিমেড পাওয়া যায়। বড় কাকিমা কেনে টার্কিশের টি-শার্ট। আমার জন্য। একটু খরখরে। ভাল লাগে পরতে। 

হাওয়ায় ভাসি। দুটো জামা এবার। একটা প্যান্ট। শিবুদা বানাচ্ছে সেটা। নিতে হবে। ওই বাড়ি ফিরে। 

মেকাপ টেলার্স। শিবুদার দোকানের নাম। গলায় ফিতে ঝুলিয়ে শিবুদা কাপড় কাটে। সারাদিন। সময়মতো দিতে পারে না। ঘোরায়। সকাল-বিকেল যাই। ঘুরে আসি। শিবুদা হাসে। 
- পুজোর আগে পেলেই তো হল! জানি তো এবারও চলে যাবি। দেব দেব। শোন একটা কথা। মাস্টারমশাইকে বল একবার থাকতে। এখানকার দশমী দারুণ! দেখলি না আজও....
- ওই বাড়িতে মা আছে যে! পিসি আসে। সুখচর থেকে। ব্রহ্মপুত্রের ওপারে ওদের বাড়ি। ধুবড়ি থেকে যেতে হয়। ওদের গ্রামে শুধু সুখ..... জানো শিবুদা?
- সুখ! না রে বাবা। নেই কোথাও। নামেই সব। সুখ শান্তি কিচ্ছু নেই। 
- আমার পিসির নাম শান্তি গো....
- বাবুয়ার মা?
- হ্যাঁ। আরও দুই দাদা আছে। 
- বাবুয়া তো এখানেই থাকে। ওরা ?
- সুখচরে। 
- ওদের জামা প্যান্ট বানাতে হলে বলিস। নাহ, আমি বলব মাস্টারমশাইকে।
- ওরা আসবে পরে। ওদের জন্য কীভাবে বানাবে! মাপ পাবে কোথায়? দেবে কবে?
- সেটাই তো রে.....
শিবুদা ভাবে। গম্ভীর হয়ে কাপড় কাটে। নতুন বানানো জামা-প্যান্ট ঝোলে। দেখি। লোভ হয়। আমার প্যান্ট কবে হবে? ও শিবুদা কবে হবে!

নারায়ণী থেকে বেরিয়ে আসি। হাতে জামার প্যাকেট। আমার আর ঝিনির। ঝিনি বোন। মেজকাকার মেয়ে। ও মায়ের সব। মায়ের কাছে থাকে। সারাদিন। মায়ের কাছে ঘুমোয়। আমি এলে সেঁটে থাকে। আমার সঙ্গে। 

নতুন জামার গন্ধ। মন কাড়া। শুধু শুঁকি। মা আলমারিতে তুলে রাখে। উঁকি দিয়ে দেখি। পরতে ইচ্ছে করে। ঝিনি এসে কোলে বসে। গলা জড়িয়ে ধরে। আধো আধো বলে,
- দাদাভাই...নতুন জামা দে। 
ঝিনিকে জড়িয়ে ধরি। কোলে তুলি। ঝিনি খিলখিল হাসে। 

স্কুল বন্ধের আর কিছুদিন। ফিরে আসি। মায়ের চোখ ছলছল। আর তো দিন পনের। তারপর মহালয়া। তার আগেই তো আসব! আবার। পুজো কাটবে এখানে। ঝিনি জামা টেনে ধরে। কাঁদে। 

শিবুদার দোকানে যাই। প্যান্ট রেডি। শিবুদা হাসে। আমিও হাসি। আবার হাওয়ায় ভাসি। নতুন প্যান্টের গন্ধ। উড়ে উড়ে যাই। 

লং জাম্পের পিটে লাফাই। খুব জোরে দৌড়াই। পেয়ারা গাছে উঠি। হেঁটে বেড়াই। টিনের চালে। গা ভেজাই। মুখ খোলা কলের জলে।  স্বপ্ন দেখি দিনরাত। 

ভুটান পাহাড় চকচক করে। আকাশে সাদা মেঘ। পেঁজা তুলো। ঢাকের বোল ওঠে। দূরে।  মাঝে মাঝে। 

পুজো আসছে। দুর্গাঠাকুর আসছে। সুখচর থেকে পিসি আসছে। 

আমি যাচ্ছি। মায়ের কাছে। মায়ের কাছেই....

মায়ের কাছেই তো যাই আমরা। প্রতি জন্মে। প্রতি ক্ষণে...


ছবি- মুজনাই/ ফালাকাটা-জটেশ্বর


(সিরিজ: মা/ শৌভিক রায়) 





আজও শিউলি ঝরেছে। বাগান সাদা। হোস্টেলের ক্ষেতেও সাদা কাশ। ঠাকুর কাশ তুলতে গিয়েছিল। বাবা মানা করেছে। 

ঠাকুর হোস্টেলে রান্না করে। ক্ষেতে আলু লাগায়। কুমড়ো ফলায়। মাচা করে লাউ গাছ তুলে দেয়। লাল আর সাদা ফুলে ক্ষেত্রে ভরে যায়। 

পন্ডিতকাকু হোস্টেলের ছেলেদের দেখে। খোঁজ নেয়। পন্ডিতকাকুর মুখে পান। সারাক্ষণ। গায়ে ভুর ভুর করে গন্ধ। জর্দার। বাণী কাকিমা ভালবাসে। খেতে দেয় কত কী! বাসি খিচুড়ি। মুসুর ডালের। খুব ভাল লাগে।

কোয়ার্টারের সামনে ঘর। চারটে। স্কুলের। বড় দাদা দিদিরা পড়ে। দিদিরা কোয়ার্টারে আসে। গল্প করে। দিদার সঙ্গে। গাল টিপে দেয়। আমার। দাদারা খেলে ভলি। দেখি। আমাকে খেলতে নেয় না। ভলিবল ভালবাসি না। 

বিকেলে সব ফাঁকা। শান্ত। শুধু জলের শব্দ। ট্যাপ থেকে ঝরে। ওর মুখ নেই। 

কদম গাছে মোটা তার। টানা দেওয়ার। ইলেকট্রিক লাইনের। গাছে উঠি। তার ধরে ঝুলি। মাটিতে লাফ দিই। গল্প পড়ি। টারজানের। পুটন প্রণব লাফ দেয় না। ভয় পায়। ওরা এমনি খেলে। 

শ্রীবাস মিস্ত্রি বেঞ্চ বানায়। কাঠ কাটে। করাত দিয়ে। দেখি। উবু হয়ে বসে। বাটালি হাতে নিই। কাঠের টুকরো ধরি বাঁ হাতে। বাটালি ঘষি। কাঠ চকচকে হয়। আরও ঘষি। পিছলে যায়। বাঁ হাতের শিরা কেটে যায়। রক্ত ঝরে। সবাই হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসি। ব্যথা করে। হাসি তাও। শিউলি আর কাশফুলের সাদায় লাল রক্ত। ছবি আঁকি। মনে মনে। দেখি দুর্গা মায়ের কপালে বিরাট টিপ। জ্বলজ্বলে। লাল। টকটকে। 

মা আসে। খবর পেয়ে। দিদা মা`কে দেখে কাঁদে। বিছানায় বসে মা। জড়িয়ে ধরে। জ্বরে আমার গা পুড়ে যায়। হাসি তবু। দুর্গার মুখ বদলে যায়। মা`কে দেখি। আমার আর কিছু মনে থাকে না। 

হরকাকু বকুনি দেয়। তর্জনী নাড়ায়। ওই আঙুলে নখ নেই। ধরি আঙুলটা। মজা লাগে। খুব। হরকাকু রেগে যায়। 

প্রমথকাকু কাকিমা আসে। কাকিমাকে দেখে মা কাঁদে। কাকিমা মা`কে জড়িয়ে ধরে। দুই দুর্গা মিলে যায়। 

আমি প্রতিমা দেখি। বিছানায় শুয়ে.....        


 
ছবি - কোচবিহার

(সিরিজ: মা/ শৌভিক রায়) 






- কাইন্দা লও। বাসায় ফিইরা আর কান্দন পাইবা না। নীরদের মা....এইডাই সংসার। আছিলাম কৃষক। চাউলের চিন্তা আছিল না। খাওনেরও। এই দ্যাশে আইসা মুদি হইছি। তুমি যদি জোর না দিতা, বড় পোলারে লেহাপড়া শিখনের লাইগা ধুবড়ি য্যান না পাঠাইতা, তাইলে কয় নীরদটাও ওই মুদিই হইত। গালামালের ব্যবসা করত। অর পড়া শিখা আসলেই তোমার নিজের শিখা। কষ্ট করছ, ফল পাইতেছ। তোমার পুণ্যে আমিও দেইখা লইতেছি। কান্দ। সকলে কয় গঙ্গা পাপ ধুয়ায়। ভুল. নদী কি আর পাপ ধুয়াবার পারে!  না। অই যে কান্দতাছ, তোমার পাপ ধুইয়া যাইতেছে। এই জন্যি ত নদীরে কয় পতিতপাবনী। কান্দ। একডু দ্যাশের জইন্যও কাইন্দ। বাস্তুভিটার জন্য। ফেলায় আসছিলাম। বেবাকটাই। সেইবার কী সবুজ না হইছিল খ্যাত! স্মরণ আছে ? 

ধন বলে। দিদার কান্না দেখে। ধন আরও কীসব বলে। বুঝি না। মা টেনে আনে। আমাকে। ভুট্টা পোড়া দেয়। খাই। মায়ের পাশে বসে। 

লছমনঝোলায় খুব ভিড়। কী বিরাট ব্রিজ। কত নিচে নদী। নামি নিচে। পা ভেজাই। দিদা প্রণাম করে। পয়সা ফেলে জলে। দিদার শাড়ির খুঁটে পয়সা বাঁধা থাকে। 






আমরা ঘুরছি। বহু দিন থেকে।  আগ্রা গেছি। ফতেপুর সিক্রি। তাজমহল। লাল কেল্লা।দিল্লিতে যন্তর মন্তর। বড্ড মজা। কুতুব মিনারের ওপরে উঠি । দাদা নিতে চায় না। জেদ ধরি।  

বেনারস যাই। হরিদ্বার। ঋষিকেশ দেখি।  টাঙায় চাপি। ঘুরে বেড়াই। কত জায়গা ! কত মানুষ! বাবা ছবি তোলে। দাদার আর আমার।

এলাহাবাদে কানে ব্যথা হয়েছিল। ঠাণ্ডায়। স্নান করেছিলাম। প্রয়াগে। ডাক্তার দেখানো হয়েছে। 
আমি শুধু ভুগি। শরীর পচা। বারবার রোগ হয়। দাদা বলে। 

বৃন্দাবনে আসি। ছোট ছোট বাড়ি। মন্দির কত। মন্দির দেখি। নিধুবনে হাঁটি। ধুলো ওড়ে।  ধুলো ওড়ে। 

সাধু সামনে দাঁড়ায়। কোলে তুলে নেয়। আমাকে। চুলে জটা। মুখে দাড়ি। 

- আ মেরে লালা, তেরে লিয়েই সব কুছ, ইয়ে দুনিয়া.... 

দিদা পা ছুঁতে যায়। সাধু আঁতকে ওঠে। পিছিয়ে যায়। কোল থেকে আমাকে নামিয়ে দেয়। দৌড়ে চলে যায়। 
মা ছুটে আসে। পেছন থেকে। জড়িয়ে ধরে আমাকে।

মায়ের চুলে গঙ্গার স্রোত। 
মায়ের গায়ে যমুনার গন্ধ। 
মায়ের মধ্যেই আমার দেশ। 


* ঠাকুরদাদাকে আমরা `ধন` সম্বোধন করতাম। দাদাকে `আমার ধন`, `আমার মানিক` ইত্যাদি বলে আদর করতেন ঠাকুরদাদা। ছোট্ট দাদা `ধন` বলতে ঠাকুরদাদাকে চিনত। সেই থেকে দাদা, আমি হয়ে আমাদের সব ভাইবোন ওই নামেই ডেকে এসেছি মানুষটিকে।  


ছবি- বৃন্দাবন: যমুনায় স্নান (বাঁয়ে দাদা, ডাইনে আমি), 
লছমনঝোলা:  দূরে আমাকে নিয়ে দাদা (ছোটজন আমি, পাশে দাদা)

(সিরিজ: মা/ শৌভিক রায়) 






কোয়ার্টারের সামনে মাঠ। বর্ষায় সবুজ। যেন স্নান করে উঠেছে। মায়ের মতো। সতেজ দেখায়। মা`কে। স্নান করলে।

শীতে ঘাসগুলো হলুদ হয়। মাঠে ধুলো ওড়ে। হালকা। 

দাদারা মাঠে দাগ টানে। সাদা। চুনের। ব্যাডমিন্টন খেলবে। দাদা ভাল খেলে। অলোকদাদাও। প্রদীপদাদাও। রনেশদা আসে। মনোজদা। ভাওয়ালদা। সুজনদা। 
ওরা আমাকে নেয় না। আমি খেলি। একটু দূরে। জয়দার সঙ্গে। 

জয়দা হোস্টেলে থাকে। কার্শিয়াঙে। 
জয়দার দুটো গাল লাল। আপেলের মতো। আরও লাল হয়। রেগে গেলে। 
জয়দা তিনমাসের জন্য আসে। শীতে। ওদের স্কুল বন্ধ থাকে তখন। 
জয়দাদের বিরাট বাড়ি। অনেকগুলো গাড়ি। সবাই ওদের জমিদার বলে। দুর্গাপুজো হয়। ওদের বাড়িতে। আমি যাই। প্রসাদ খাই। সুলগ্নাদি আদর করে। 
জয়দার ঠাকুরদা মস্ত লোক। আমি দেখিনি। বাবা বলেছে। 
জয়দাকে একবার হারাই। জয়দা হারিয়ে দেয় পরের বার। থুক্কুমুক্কু হয়ে যায়। দুজনেই হাসি। কেউ জিতি না। কেউ হারি না।

সন্ধ্যায় ঠাণ্ডা লাগে। সোয়েটার গায়ে দিই। মায়ের বানানো। মা উল-কাঁটা বোনে। ডিজাইন তোলে। দাদার দুটো সোয়েটার। ফুল হাতা। হাফ হাতাও আছে। আমার ফুলহাতা একটা। একটা ভেস্ট। মাফলার জড়াই না। বিপ্লব মাঙ্কি ক্যাপ পরে। আমরা খেপাই। বিপ্লব হাসে। খলখল ক`রে। ওর হাসি খুব সরল। ওকে খুব ভালবাসি। ও আমার বন্ধু।  

ঋত্বিকের মা বিস্কুট দেন। মেরি বিস্কুট। আমূল বাটার লাগানো থাকে। আমি খুব ভালবাসি। আরও খেতে ইচ্ছে করে। লজ্জা লাগে। চাই না। সিনেমা হল পার করে ওদের বাড়ি। হলের পেছনের ঢেউ খেলানো। দৌড়ে নামি। দৌড়ে উঠি। নাগরদোলা। পাশেই গার্লস স্কুল। ওখানে কামিনী গাছ আছে। তাকাই না। ওই গাছে ভূত আছে। কে যেন ফাঁসি দিয়েছিল।

হাই স্কুলের ভেতর রামদা থাকে। গুরুংদাও। গুরুংদা নেপালি। রামদা বিহারি। সারাদিন কাজ করে। বেল বজায়। স্কুলের দরজা খোলে। বন্ধ করে। বেণীদা আসে। তিনজনে গল্প করে। বেণীদা ঝাড়ফুঁক জানে। মায়ের পা ঠিক করে দিয়েছে। মায়ের পা মচকে গিয়েছিল। রামদা মায়ের কাছে চা চায়। গুরুংদা শুধু হাসে। গুরুংদার চোখ ছোট ছোট।

মা ফুলকপির ঝোল করে। কড়াইশুঁটি থাকে ঝোলে। আলু। হাপুস হুপুস খাই। মা হাসে। 
- আস্তে খা। গলায় ঠেকবে। 
বারান্দায় রোদ আসে। পিঠে লাগে। বড্ড আরাম। পিঁড়ি পেতে খাই। বড় পিঁড়ি বাবার। আমার ছোট। 
আমাদের ডাইনিং টেবিল নেই। 

মা খায় সব শেষে। বসে থাকি। মায়ের পাশে। 
- তুই শুয়ে পড়। আসছি আমি। 

মা গল্প বলে। বিছানায় শুয়ে। বলতে বলতে চোখ লেগে যায়। মায়ের। পেয়ারা গাছে উঠি। চুপি চুপি। পেয়ারা নিয়ে নামি। নিচে। অনেক। মা জেলি করবে। পাউরুটি দিয়ে খাব। কিনে আনব। দীপ্তি বেকারি থেকে। 

মা উঠে পড়ে। সন্ধে নামার আগে। আমাকে ডাকে। গাঢ় স্বরে প্রশ্ন করে,
- তোর এখানে মন খারাপ লাগে না তো?

বলি না কিছু। হাসি কেবল। 
হাসতে কষ্ট হয়। তবু হাসি। 

মা এই শীতের বেলার মতো। আর কিছুদিন পরেই চলে যাবে......    

   
ছবি- মানস, অসম 
  
(সিরিজ: মা/ শৌভিক রায়)





পঞ্চমীর সকাল। স্কুলে যাই। সাদা-কালো পোশাক নেই আজ। অনুপ নতুন জামা পরেছে। দশমী অবধি পরবে। ওর অনেক জামা হয়। আমার তিনটে। পরে পরব।
 
দুপুরে বাস। ভানুমা। মিনি। পারাপার, সাফারি সকালে যায়। কোচবিহার নামব। আবার বাস ধরব। 
পার্থ, সারথি, শ্রীমা, মানিক....কত নাম বাসের! 
দূর থেকে বাসের সামনেটা দেখি। নাম বলি। কখনও ঠিক হয়। কখনও ভুল। খেলি। বাবুন, মধু, ভজন, মনা, শুক্লা। 
ট্রেলার বাসও চলে। ধীরে ধীরে। দোতলা বাস কমছে। সরকারি বাসে হাতির ছবি। গ্যা গ্যা করে চলে। তেলের গন্ধ। গা গোলায়। 

দেওয়ানহাটে ঢুকতে বিরাট বাঁক। বেরোতেও। এক বাঁকে মন্দির। মাশান দেবতার। বিরাট চেহারা। ইয়া বড় ভুঁড়ি। মস্ত গোঁফ। নীলচে কালো রং। আর এক বাঁকে শ্মশান। চিতা জ্বলে। মানুষ পুড়ে যায়। ছাই হয়ে যায়। ছাই ঘাঁটি। ছাইয়ে জীবন থাকে?

কলেজ পাড়ার পুজো বিরাট। বাস থেকে দেখি। কত বড় মাঠ। সেই মাঠে কত কী! গোসানিমারি রোডে যাব। সব্যসাচী সংঘেও। থানা পাড়ার পুজোকে সেজে কাকা সাজিয়েছে। ডাকবাংলো পাড়ার প্রতিমা।  ভাল লাগে। ছানু ঠাকুর পুজো করে। গোধূলি বাজারে।

বাড়ি ঢুকতেই মা। পাশে ঝিনি। বড় কাকিমা মোয়া বানাচ্ছে। মেজ কাকিমা নারকোলের তক্তি। 
- এখনই করছ এসব?
- হ্যাঁ রে। পুজোর ওই আসাটাই। দেখবি কী তাড়াতাড়ি চলে গেল। 
- চারদিন তো। কম নাকি?
বড় কাকিমা হাসে। মোয়া দেয়। নিয়ে না। মোয়া ভাল লাগে না। তক্তি নিই। মা বলে হাত ধুয়ে আসতে। 

পিসিমনি এসেছে। সুখচর থেকে। সঙ্গে বাপিদা। বাপ্পা। বাপিদার গায়ে খুব জোর। বাপ্পাও দাদা। নাম ধরে ডাকি। বন্ধুর মতো। দুজনে বেরিয়ে যাই। মদনমোহন পাড়ার ডেকোরেশন দেখি। শহীদ কর্ণার। গান ভাসে। কিশোরকুমারের। `কী দারুণ দেখতে। চোখ দুটো টানা টানা...।` নেপালদার দোকানে। বড় সাউন্ডবক্স। টেপ। লোভ হয়। আমিও কিনব। বড় হলে। গান শুনব। সুমিত্রা সেনের। `ওগো সাঁওতালি ছেলে।` রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা। আমি শুনি। ওই বাড়িতে। রেকর্ড প্লেয়ারে। বাবার রেকর্ড প্লেয়ার আছে। 

বড় কাকার বিরাট দোকান। ছোট কাকাও থাকে। দুজনে ভিড় সামলায়। পারে না। বাপ্পা আর আমি থাকি। নেল পালিশ বিক্রি করি। চুলের ফিতে। নতুন কোম্পানির পাউডার। আমাদের দাম মুখস্ত। ছোট খেলনা বন্দুক দুই টাকা। ক্যাপ চার আনা। বড় কাকা খুশি হয়। দশ পয়সা দেয়। ঘুগনি খাই। হরিদার  দোকানে। হরিদার ঠোঁট কাঁটা। বেশি বেশি দেয় আমাদের। দুজনেই নাকি গেস্টো আমরা।  গেস্টো শুনে হাসি। হরিদা চোখ পাকায়। দিদিমনিকে বলে দেব, ঘুগনি খাচ্ছিস। তাহলে আর খাবো না। তোমার বিক্রি হবে না। হরিদা হাসে। ধুস পাগল। বলব না। খ তোরা। আমি মুকুলদাকে চা দিয়ে আসি। আমরা খাই। লুকিয়ে লুকিয়ে। মা জানলে বকবে। 

সন্ধ্যায় প্রতিমা আসে। থানা পাড়ায়। মুখ এখনও ঢাকা। কাল বোধন। তারপর পুজো।
দৌড়োই গোধূলি বাজারে। প্রতিমা দেখি। মণ্ডপে তৈরি হচ্ছে। কারিগর হাসে। 
- কাল আসিস। চোখ আঁকব। দেখিস।
- চোখ আঁকলেই বুঝি সব দেখা যায় হারানদা?
- না রে বাবা। সেটা যদি হতো রে!
- কেন হয় না?
- উত্তর জানি না। শুধু জানি চোখ থাকতেও মা অন্ধ!
- ধ্যাৎ কী যে বলো। 
- বুঝবি রে বুঝবি। একদিন বুঝবি। যে মায়ের চোখ অন্ধ, তার সন্তানদের আর কী হবে! তোদের দোষ নেই। তোদের সবে শুরু। শেষ যখন হবে, দেখবি সব ফক্কা!
- ও হারানদা কী বলো!
- বলি কী আর সাধে রে। মা কি বোঝে না কিছু? আসলে মায়েরও বোধহয় হাত পা বাঁধা। 

হারানদার কথা শুনি। মন খারাপ হয়। দশমী নামে। পঞ্চমীর সন্ধ্যাতেই। 

- কবি বলেছে In my beginning is may end..... মনে রাখিস। শুরুতেই শেষ।  
- হারানদা.... 
- শুধু মা থেকে যায় রে। আর কেউ নয়......

বাড়ি ফিরি। একফালি চাঁদ। আকাশে। বাপ্পা হাত রাখে। গলায়। 
শুরুতেই শেষ। ভাবি। 
বাতাসে শিউলি ভেসে আসে......

(সিরিজ: মা/ শৌভিক রায়)






গোধূলী বাজারে সানাই বাজে। 
সানাইয়ে বিদায়ের সুর।

আজ ভাসান। মা চলে যাবেন। 
মা বলেছে।
 
সকালে পড়তে বসেছি। বড় ঘরে। এই ঘরেই থাকি। এখানে এলে। 

বড় খাট। বাবা বসে আছে। পড়া দেখছে। 
আজ পড়তে হয়। না হলে মা রাগ করেন। 
মা বলেছে।

ছোট ঘরে বাবা থাকে। এই ঘরে মা, আমি, ঝিনি। দাদা ন কাকুর ঘরে। কাকুদের আলাদা আলাদা ঘর। পিঁড়ি পেতে রান্না ঘরে খাই। সবাই। 
দিদা দেখে। তৃপ্তি নিয়ে। মালা জপে। 

ঝিনি পড়ে। আমার সঙ্গে। লেখে। স্লেটে। বেকাটেরা। মোছে। জল দিয়ে। জলের পোকা জলে যা, আমার স্লেট শুকিয়ে যা। বিড়বিড় করে। আমি হাসি। ঝিনি গলা জড়িয়ে ধরে।

মাংস রান্না হচ্ছে। মেজ কাকা নিয়ে এসেছে। বালিকা থেকে। কচি পাঁঠা। নলি হাড় ভাল লাগে। চুষি। আর এক টুকরো মেটে দেয় বড় কাকিমা। লুকিয়ে। বড় কাকিমার ছেলেমেয়ে নেই।

মা মণ্ডপে যায়। সঙ্গে তিন কাকিমা। সিঁদুর পরিয়ে দেয় মায়ের কপালে। সন্দেশ ঠেকায় মুখে। আমি বই ছুঁইয়ে নিই। মায়ের পায়ে। বেলপাতা নিই। বইয়ের ভেতর রাখি। আবার এসো মা। আশীর্বাদ দিও। দেড় মাস পর পরীক্ষা। এরপর তোমার মেয়ের পুজো। তারপর কালী মায়ের। আলো জ্বলবে। ঝিনি ফোঁটা দেবে। রুমাদি। রুবিদি। মঞ্জু। তারপরই পরীক্ষা। যেন পাস করি। যেন উঁচু ক্লাসে উঠি।

ঢাক বাজে। জামা পরি। বাইরে বসি। দোকানের সামনে। মা যান। ট্রাকে চেপে। থানা পাড়া, সাহেবগঞ্জ রোড, মহামায়া পাট, আমরা সবাই, বোর্ডিং পাড়া, মদনমোহন পাড়া...। মদনমোহন পাড়ার সবাই ধুতি পরেছে। ঝুড়িপাড়ার ছেলেরা নাচছে। বাতাসা ছিটিয়ে দিল গোসানি রোড। হাটখোলার মোটা মাড়োয়ারি ভুঁড়ি নাচাচ্ছে। শান্তি জল ছিটিয়ে দিল বলরামপুর রোডের ক্লাব।

রাত নামছে। ভাসান শেষ। থানার দিঘিতে যাই। মায়ের প্রতিমার কাঠামো ভাসে। বিরাট বট গাছ ঝুঁকে থাকে। জলের ওপর। ঢেকে রাখে। মা কে। যত্নে। পাতা খসায়। জলে। দোলে সে পাতা। যেন নৌকো। যেন নিয়ে যাচ্ছে। মা কে। 

******************************************

বুধানিদার রিকশায় চাপি। মায়ের সঙ্গে। মা চুপ। কথা বলে না। কলেজ হল্ট ছাড়িয়ে যাই। কোয়ালিদহের রাস্তা ধরি। শীত শীত লাগে। হিম পড়ে। দূরে বুড়ির গড়। বাঁশ ঝোপ। অন্ধকার। ভাঙাচোরা রাস্তা। চাঁদের আলোয় আবছায়া। 

বুধানিদা রিকশা থামায়। মা নামে। আলপথ ধরে। আমাদের জমি। ধান গাছ। কোমর সমান। মায়ের। আমি প্রায় ঢেকে যাই। 

মা গাছে হাত বুলিয়ে দেয়। পরম মমতায়। কিছু বুঝি না। চুপ করে থাকি।

অন্ন....অন্নদাতা মা। মায়ের বিদায় হয় না। মা থাকেন। মায়ের পুজো তো অন্নের পুজো। ও ধান, ও আমার অন্ন, ও আমার মা....সবাইকে ভাল রেখো। অন্ন দিও। নিরন্ন ক'র না কাউকে... 

আমার কান্না পায়। মা এসব কী বলে! আঁচল টানি। মায়ের। মা জড়িয়ে ধরে। হিম শীতলে উষ্ণতা। মায়ের। 

মা থাকবে না। 
মা থাকবেন। 
মা থাকেন।

(ছবি- বাগবাজার দুর্গাপুজো, ২০২৩)

সিরিজ: মা/ শৌভিক রায় 







গোকোয়ার্টারের সামনে বাগান। 
বাগানে রোদ। 
রোদে পিঠ পেতে বাবা। পাশে বসি। পড়ি। বাবা টেন্স শেখায়। শিখি। 

বাগানে ফুল। পেনজি, ক্রিসেন্থিয়াম, কসমস, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া। সূর্যমুখী পূবে তাকিয়ে। সূর্যের দিকে। হলুদ। 
হলুদ সর্ষে। হোস্টেলের বাগানে। ঠাকুর ক্ষেতে নিড়ানি দেয়। প্রতিদিন। 

দুই বাগানের মাঝে মাঠ। সবুজ। খেলি। বিকেলে। বন্ধুরা আসে। 

সকালে শিশির ঝরে। টুপ টুপ পড়ে। টিনের চাল বেয়ে। ঘাসের ডগায় আলো পড়লে চমকায়। শিশির। হিরের মতো। মা বলে। আমি হিরে দেখিনি।

মায়ের গায়ে চাদর। হালকা শীত। মায়ের অপারেশন হয়েছে। মা রুগ্ন। মায়ের ঠাণ্ডা লাগে। মায়ের রক্ত কম। ডাক্তারকাকু বলেছে। মায়ের জন্য মাগুর মাছ কেনা হয়। শিং মাছ কেনা হয়। পেঁপে দিয়ে ঝোল হয়। দিদা বলে পথ্য। আমি পথ্য খাই না। মা খেতে বসে। মা`কে দেখি। মায়ের চোখ জ্বলজ্বল করে। মায়ের শরীর শুকনো। আমার কষ্ট হয়। হাত রাখি। মায়ের কপালে। মা হাসে। বড্ড শুকনো। 

ঠাকুরকে ডাকি। মা`কে ভাল করে দিতে বলি। 

আমার ঠাকুর আছে। শীতলা বাড়ি থেকে কিনেছিলাম। কৃষ্ণ ঠাকুর। মা ভাল হবে। ঠাকুর বলেছে।

দুপুরগুলো কেমন যেন। মরা মরা। নির্জন। লোক থাকে না। রাস্তায়। সন্ধে নামে দ্রুত। শাঁখ বাজে। চারদিকে। মা`কে দেখি। চোখ বন্ধ। প্রার্থনা করে মা। আমিও চোখ বন্ধ করি। প্রার্থনা কাকে বলে? জানি না। চোখ বন্ধই থাকে। তবুও। 

কালীপুজো হয়ে গেছে। ভাইফোঁটাও। রুমাদি ফোঁটা দিয়েছে। মঞ্জুও। তুলিদি। রুবিদি। 

ঘুম ভেঙে যায়। অনেক রাতে। চাঁদ দেখা যায়। কাস্তের মতো। এক ফালি। মায়ের মুখের মতো পাণ্ডুর। প্রাণ নেই। 

দিন গুনি।  রাস আসছে। পূর্ণিমা আসছে। আলোয় ভাসবে। চারদিক। ঝকঝক করবে। গভীর রাত। মনে হবে দিন। 

মায়ের মুখে পূর্ণিমা দেখব? ঝলমল করবে মা? আলো হবে আবার? আলো দেবে আবার?

আমি জানিনা... আমি জানিনা..... 


(ছবি- তোর্ষা) 


ধলীসিরিজ: মা/ শৌভিক রায়




 
 গোধূলী বাজারে সানাই বাজে। সানাইয়ে বিদায়ের সুর।

অলকদাদার বাড়ি। বাড়ির সামনে বাগান। মস্ত। শীতে ফোটে অনেক ফুল। বর্ষায় বৃষ্টি। জল থৈ থৈ। সুপুরি গাছে লাল পোকা লাগে। কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে দিই। ওরা পালায়। ছত্রভঙ্গ। পুচি আর আমি হাসি। 

পুচি বন্ধু। সেজদার ছেলে। সেজদা অঙ্ক করান। বেসিক স্কুলে। রাগী। ভয় পাই। 

রুমাদি ডাকে। ঘাম মুছিয়ে দেয়। রুমাদি দিদি। আমার দিদি নেই। আমার বোন নেই। রুমাদি বকে না। 

কাকিমাও বকুনি দেয় না। কখনওই। কাকিমার খুব মায়া। কাকিমার গায়ে মা মা গন্ধ। কাকিমার রান্নায় নবান্ন। কাকিমা জোর করে খাইয়ে দেয়। কাকিমাকে ভালবাসি। 

সামনেই রেল লাইন। ট্রেন যায়। খুব জোরে। একদিকে মাদারি রোড। ওভারব্রিজ। অন্যদিকে মিল রোডেও ওভারব্রিজ। মাঝে লাল পুল। লাল পুলে যাই। হাতে কাঁচা আম। এগিয়ে গেলে বাঁ হাতে নদী। আঁকাবাঁকা। শীতে কুল খাই। লাইনের ধারে গাছ আছে।  

দূরে কুঞ্জনগর। ওখানে জঙ্গল। গণ্ডার-বাইসন-হাতি। দূর থেকে জঙ্গল দেখি। জঙ্গলের ওপারে পাহাড়। নীল। কখনও ধস নামে। ঘায়ের মতো লাগে। পাহাড়ের গায়ে।  

তরুণদলের মাঠে আসি। ডাকবাংলো ওই মাঠে। পুরোনো। মাঠে সবাই খেলে। ঘুড়ি ওড়ায় টাবু। পাশে টিনা। ওর বোন। ছোট। দুই বিনুনি।  

- সাপটানা দেখে আসি। 
প্রণব বলে। 

ভাঙা পার। অন্ধকার। বেত গাছ। ছমছম করে। চারদিক। ভয় লাগে না। 
নদী তো মা। মা`কে ভয় কেন!

নদীর দিকে তাকাই। মায়ের মতো বয়ে চলে। মিশে যায় মুজনাইয়ে। 
মা-ও মিশে যায় প্রবাহে। রক্তের। 

বিপ্লব, পিনু, পুটন, বাপি, প্রণব। আমি। চুপচাপ।

ওপারে কেউ প্রদীপ জ্বালায়। মৃদু আলো। শঙ্খ বাজে। 

আঁচল গলায়। চুল টানটান। কপালে সিঁদুর। চিনি না তাকে। 

চিনিও আবার। মা। তুলসী তলায়। কার মা? মা তো সবার। মা কি কারও আলাদা হয় নাকি! 

- বাড়ি চল। 
বাপি বলে। 
- মা ধূপ দিচ্ছে। 
বিপ্লব বলে। 
- চল ফিরি। 
পিনু বলে। 

ফিরি। সাপটানা বয়ে চলে। মুজনাইও। 

মা`কে মনে পড়ে। 
মা কি নদীতে এভাবেই মিশে থাকে! মা কি এভাবেই বয়ে চলে?
মা উত্তর দেয় না। 
ছলছলাৎ নদীর ঢেউয়ের মতোই মা উত্তর দেয় না.....

(ছবি- মুজনাই)

সিরিজ- মা/ শৌভিক রায়   






  - অই যে দ্যাখোস ব্রিজ, অর অই পারেই আমাগো দ্যাশ...তরা যারে কস মাইতৃভূমি হেইডাই... 

সামনে ব্রিজ। ভাঙা। নদী বিরাট। জল অনেক। পারে গরু। ছাগল। আমার পাশে দিদা। দিদার চোখে জল। 

- আমারও একটা মা আছিল। বুঝছস ভাই? মায়ের কপালডা ভালা। জন্মাইছে যেইহানে, শরীল রাখছেও সেইহানে। আমিই পোড়া কপাইল্যা। ছিলাম মায়ের লগে। আইছি কুন হানে!

দিদার দিকে তাকাই। নদীর দিকে তাকাই। ব্রিজের দিকে তাকাই। 

- অই পারে খুব বেশি কিছু ছিল না আমাগো। কিন্তু জানোস সুখ ছিল। এই হানেও নিজের বাড়ি। পোলাপান। তরা। নাতিরা। কিন্তু সুখ ক্যান জানি পাই না। হাজার হইলেও দ্যাশ দ্যাশই হয়ে রে। 

দেশ কী দিদা? দেশ কাকে বলে? কেন ছেড়ে এলে দেশ নিজের? ভাবি। মনে মনে। প্রশ্ন করি না। দিদাকে। এখন প্রশ্ন নয়। প্রশ্নের সময় নয়। দিদার চোখে জল। মায়ের চোখ ছলছল। 

- আমিও তো কতদূরে মা! সেই কোথায় দক্ষিণের বীরভূম আর কোথায় এই উত্তর! দেশ তো আমিও ছেড়েছি মা। হ্যাঁ ভিটে হারা হইনি। কিন্তু একবার যা ছেড়ে আসা যায়, সেটা কি আর মেলে ফের? 
- মাইয়া মাইনসের ভাগ্য বৌমা, মাইয়া মাইনসের ভাগ্য! আইসা পড়লা বাঙাল ঘরে। আমাগো অনেক ভাষা জানোও না, বুঝোও না। ছাড়তে বুঝছ, মাইয়া মাইনসিকেই হয়। 
- শান্ত হন মা। কী করবেন। দেশ যখন ভাগ হয়, নতুন রাষ্ট্র যখন মানচিত্রে আসে তখন তো মরে আমাদের মতোই মানুষেরা। শুধু ভিটেমাটি টাকাপয়সা ধনে জনে নয়, মনেপ্রাণে। 

দেশ কী মা? রাষ্ট্র কী? কেন ছেড়ে এলে দক্ষিণের বীরভূম? কেন তোমাকেই ছাড়তে হল মা? ভাবি। প্রশ্ন করি না। এখন প্রশ্ন নয়। প্রশ্নের সময় নয়। মায়ের চোখে জল। 

মা কাঁদে। দিদা কাঁদে। নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকি। অসমবয়সী দুই নারী। মাঝে এক বালক। ব্রিজের মতো। ভাঙা। ওই ব্রিজ জোড়া লাগে না। আলাদা রয়ে যায়।            

এই দেশ ওই দেশ। বালককে ঘিরে জুড়ে যায় দুই নারী। ভিটেমাটি ছাড়া। দুজনেই। উদ্বাস্তু। দুজনেই। 

দেশ খুঁজি। দিদার চোখের জলে দেশ আঁকি। মায়ের চোখের জলে রাষ্ট্র আঁকি। 

আমার দেশ কোনটা মা? আমার রাষ্ট্র কোনটা দিদা? কোন কাঁটাতার আলাদা করছে আমাকে? কেন করছে?

উত্তর খুঁজি। 
উত্তরকেই খুঁজি...... 

ছবি- ভোরাম পয়স্থি, গীতালদহ, দিনহাটা / এই ব্রিজ দিয়েই একসময় ট্রেন চলত আজকের এপার আর ওপার বাংলার মধ্যে 

সিরিজ- মা/ শৌভিক রায়

 


   জ ভাসান। মা চলে যাবেন। মা বলেছে।
 মাসির বাড়ি এসেছি। রায়গঞ্জে। দেবীনগর। ছোট মাসি। ওখানে আমার তিন ভাই-বোন। 

বাড়িটা বড়। উঠোন আছে। উঠোনে শিউলি গাছ। ফুল ঝরে। উঠোন সাদা হয়।
 
মাসির বাড়িতে ডাইনিং টেবিল। পা ঝুলিয়ে বসি। মজা লাগে। 
আমাদের বাড়িতে পিঁড়ি। কাঠের। আমার পিঁড়িটা ছোট। মায়ের পিঁড়ি উঁচু। ওটা তোলা থাকে। মা এলে ওটা নেয়। বাবার পিঁড়ি বড়। শীতকালে বাবা রোদে পিঁড়ি নিয়ে বসে। তেল মাখে। গায়ে। ভাত খায়। রোদে পিঠ দিয়ে।

মাসির বাড়িতে পুকুর আছে। মা পুকুরে নামতে দেয় না। মায়ের ভয়। জলে। আমার নাকি ফাঁড়া আছে। আমি হাসি। মা`কে লুকিয়ে পুকুরে নামি। বুরু মা`কে বলে দেয়। বুরু ছোট বোন। মা ছুটে আসে। আমাকে তোলে। পুকুর থেকে। বকে। আমি হাসি। আমার পায়ে কাদা। গায়ে কাদা। মা ধুইয়ে দেয়। কল তলায় নিয়ে। কল তলাটা বড়। বাঁধানো। আমি হাসি। মা রেগে যায়। আমি সাঁতার জানি না। সাইকেল চালাতে জানি না। আমি কিছু শিখিনি। আমি জীবন বুঝি না। আমি মানুষ বুঝি না। মা বলে। আমার কষ্ট হয়। মায়ের জন্য। মায়ের চোখে জল। আমি চোখ মুছিয়ে দিই। মায়ের। 

ভারত সেবাশ্রমের স্বামীজী দেন। ভিকস। উনি আমাদের আত্মীয়। মায়ের বৌদির দাদা। সংসার ওঁকে টানেনি। মা বলে। মাসি গল্প করে। উনি আমাকে ভালবাসেন। আমি যাই। ওঁর কাছে। আশ্রমে কত ফুল। কত গাছ। ফুলগুলোকে স্পর্শ করি। নরম ওদের পাপড়ি। ফুলের মতো নরম হতে হবে। স্বামীজী বলেন। বাবা যে আকাশের মতো উদার হতে বলেছে! উদার হলেই তো নরম হওয়া যায়। স্বামীজী আবার বলেন। মা, উদার কীভাবে হবো? মা, নরম কীভাবে হবো? মা?

রায়গঞ্জের আকাশে অনেক তারা। মাসির বাড়ির ছাদে উঠি। আমাদের কোয়ার্টার্সে ছাদ নেই। টিনের চাল। ছাদ ভাল লাগে। সিঁড়ি দিয়ে উঠি। মনা ওঠে। আমার সঙ্গে। মনা দিদি। ওকে দিদি বলি না। বাপু ওঠে। বাপু ভাই। বাপু কানে কম শোনে। বাপু রোগা। শুধু ভোগে। মাসি কাঁদে। বাপুর জন্য। সব মায়েরাই কাঁদে এরকম? মনা ঘাড় নাড়ে। মনা অনেক কিছু জানে। মনার অনেক বুদ্ধি। মনা আমাদের বোকা বানায়। এটা সেটা বলে। 

আমি তারা দেখি। ওই তারাদের মাঝে ছোটকাকা আছে। ওই তারাদের মাঝে ছোট বুড়িদিদা আছে। ছোট বুড়িদিদা বাবার ছোট পিসি। বর নেই। ছেলে নেই। মেয়ে নেই। বাল্যবিধবা। মা বলেছে। যাদের বর স্বর্গে চলে যায় তারা নাকি বিধবা! বড় বুড়িদিদা ছাড়া ছোট বুড়িদিদার কেউ ছিল না। বড় বুড়িদিদার তাহলে কি কেউ নেই? কেন? আমি আছি তো। নীরদের ছেলে। ছোট ছেলে। বড় বুড়িদিদা আদর করে। ছোট বুড়িদিদাও  করত। আকাশে ছোট বুড়িদিদাকে খুঁজি। আকাশে ছোট কাকাকে খুঁজি। ছোট কাকা তারা হয়ে গেছে। ছোট বুড়িদিদা তারা হয়ে গেছে। মা, মানুষ কেন তারা হয়ে যায়? তুমিও হবে? আমিও হব ? মুখে হাত চাপা দিচ্ছ কেন মা? কেন বলব না? তুমি তারা হলে কীভাবে ধরব তোমাকে? তার চেয়ে চলো দুজনেই তারা হয়ে যাই। পাশাপাশি থাকি। তোমাকে নিয়ে থাকি। মা, তোমার সঙ্গে থাকি! 

মা, তোমার সঙ্গে থাকব...

মনা হাসে। বোকা বলে। আমাকে। বাপু শুনতে পায় না। তবু হাসে। বুরু এসে ছাদ থেকে নামতে বলে। রাত হয়েছে। 

শিউলি ঝরার শব্দ পাই রাতে। শুকনো পাতায় শিউলি ঝরে। রাত কেমন জটিল। রহস্যে ভরা। ঘুম আসে না। জেগে থাকি।  এপাশ ওপাশ করি। বিছানায়। মা ঘুমোয়। মায়ের হাত ধরি। মা টের পায় না। ধরেই থাকি। দূরে কোথাও পাখি ডাকে। নিশাচর। আমিও কি তাই? 

এত ঘুম তবু কেন ঘুম নেই? 
ঘুম কবে আসে মা? তারা হয়ে গেলে? আকাশে?  

ছবি- কার্শিয়াং    

 সিরিজ- মা/ শৌভিক রায়






কোয়ার্টার্সের সামনে মাঠ। মাঠের শেষে তাল সুপুরি গাছ। ঝুরি নামে গাছ থেকে। 
গাছের নিচে জঙ্গল। হলুদ রঙের শিয়ালকাঁটা ফুল। 
ওপাশে ভাট। বুনো বুনো গন্ধ। 
ফল ঝরে গাছ থেকে। কুড়িয়ে আনি। ঘরে রাখি। পচে যায়। দুদিন পর। ফেলে দিই। আবার কুড়োই।
বেশ খানিকটা দূরে ওদাল গাছ। একা। লাল ফুল ফুটে থাকে। থোকা থোকা। হাওয়া দিলে নড়ে। ফুল ঝরে। 
শিমুল আছে আরও দূরে। লাল ফুল ঝেঁপে আসে তাতে। পাখিরা ঘিরে ধরে গাছ। কিচিরমিচির সারাদিন। ফল খায় ওরা। উড়ে যায়  তাল সুপুরি   আর ওদাল গাছে। ফিরে আসে আবার। উড়ে যায় তারপরেই। ফুল ঝরে পড়ে শিমুল থেকেও। 

পলাশ ছিল। ফুলে ঢাকা। এখন ন্যাড়া। পুজোর জন্য সবাই নিয়ে গেছে ফুল। মা আনেনি। ফুল ছিঁড়তে নেই। মা বলে। 
কীভাবে পুজো হবে মা তবে? গাছ নিজে দিলে। যেমন দেয় পাম তার ফল। ওদাল আর শিমুল দেয় ফুল। মাটিতে ফেলে দেয় নিজেরাই। 
কুড়িয়ে আনা ফুলে পুজো হয় মা? পুজো হবে?
কেন হবে না? মাটিই তো আসল। মাটি থেকেই তো মূর্তি। তাতে প্রাণ দান। মাটিতে পরে থাকা ফুলেই তো পুজো তাই। বিশুদ্ধ। 
মা বলে। আমি বুঝি না। 

সকালে উঠি। চলে যাই ওভারব্রিজে। ওখান থেকে পাহাড় দেখা যায়। দেখা যায় গাছ। শিমুল, পলাশ, ওদাল, মাদার। লাল চারদিক। 
আমার মন কেমন করে। মায়ের কথা মনে পড়ে। ফিরে আসি বাড়িতে। মা-কে ডাকি। মা-কে জড়িয়ে ধরি। মা চুলে বিলি কেটে দেয়। কপালে চুমু দেয়। 
দাদা হাসে।  হিংসের হাসি।

হাওয়া দেয় বড্ড। হু হু হাওয়া। সারাদিন। ঠাণ্ডা লাগে। 
শীত ছেড়ে যাচ্ছে। বাতাসে ধুলো। কাশি হয়। 
বাসক পাতার রস করে দেয় মা। আমাদের বাগানের বেড়া ওই গাছ দিয়েই। তেতো লাগে বড্ড। খেতে চাই না। 
তেতো খেলেই ঠিক থাকে সব। কেন মা? চারদিকে মিষ্টি কত!
মিষ্টির স্বাদ বোঝা যায় তেতো খেলেই। জীবন মিষ্টি। তেতো তাই জরুরি। 
মা বলে। আমি বুঝি না। 
তবু খাই। তেতো। মিষ্টি পাব বলে। 

আমাকে দেখ। কালো আমি। তেতো আমি। 
তাই দূরে থাকে কেউ কেউ। ফর্সা খোঁজে। আলো খোঁজে। 
কিন্তু আমাকে না দেখলে, বুঝত কি সে ফর্সার মানে? আলোর মানে? বুঝত কি মিষ্টি কাকে বলে?

মায়ের চোখে জল। চিকচিক করে। মুখে তবু হাসি। আমার ভয় হয়। 

মা কি কিছু বলতে চায়? মা কি কিছু বোঝাতে চায়? 

আমি বুঝি না। সত্যিই বুঝি না। .....


ছবি- ফালাকাটা 

 সিরিজ- মা/ শৌভিক রায়



অর্ঘ্য সেন গান গাইছেন।  `....ও পারেতে উপবনে/ কত খেলা কত জনে / এ পারেতে ধু ধু মরু/ বারি বিনা রে/ কে যাবি পারে ওগো তোরা কে/ আমি তরী নিয়ে বসে আছি নদী কিনারে...`। বসবার ঘরে। রেকর্ড প্লেয়ারে। ছোট রেকর্ড। পঁয়তাল্লিশ আর পি এমে চলে। তেত্রিশে চলে বড় রেকর্ড। আটাত্তরের রেকর্ড এখন নাকি পাওয়া যায় না। 
 
মা গলা মেলান। অর্ঘ্য সেনের সঙ্গে। আমি মায়ের গান শুনি। সোফায় বসে। 

এই রেকর্ড প্লেয়ারটা পুরোনো। অটোমেটিক। নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে যায়। আগেরটা বন্ধ করতে হত। 

মা গান ভালবাসে। বাবা কিনে এনেছে। হরিশ পালের দোকান থেকে। রাজনগরে সেই দোকান। মস্ত বড়। 

বাবা রেকর্ড কেনে। কলকাতায় গেলে। রাজনগরেও। আমাদের ওই বাড়ি যে শহরে, দোকান আছে সেখানেও

কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায় যখন গান `আমি অকৃতী অধম বলেও তো কিছু কম করে মোরে দাওনি....` বাবার চোখ তখন ছলছল করে। 
বাবারা কি কাঁদে? জানা নেই ঠিক।

কিন্তু অখিলবন্ধু ঘোষের `ও দয়াল বিচার করো...` শুনে বড্ড কষ্ট হয়। 
আমার কান্না পায়। ছোটরা কি কাঁদে? গান শুনে? 
গান না সুর? কান্না কীসে আসে মা? 

প্রণব গান ভালবাসে। বাড়িতে আসে। দুজনে গান শুনি। পুটনও আসে। বাপিও। পিকু আসে কখনও। সবাই মিলে গান শুনি। 
মানবেন্দ্র গান `পলাশ ফুলের মউ  পিয়ে ওই বৌ-কথা-কও উঠল ডেকে`। 
প্রণব গলা মেলায়। আমি গাইতে পারি না।

মিশনের রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে প্রণব গায় `পথ হারাবো বলে এবার পথে নেমেছি`। 
বুক কেমন টনটন করে। পুটন হাত চেপে ধরে। শক্ত করে। বাপি চুপ হয়ে যায়। 
মেঠো পথ চলে যায় সর্ষে ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে। 
ফুলের গন্ধে নেশা লাগে। গানের সুরে নেশা লাগে। গানের কথায় নেশা লাগে।

রাতের বেলায় বারান্দায় বসি। রেকর্ড প্লেয়ার চলতে থাকে। সব্যসাচীর গলা শুনি। আবার হারায়ে যাই/ হেরি চারিধার, বৃষ্টি পড়ে অবিশ্রাম....`

সুর এখানেও। চুঁইয়ে চুঁইয়ে সেই সুর নামে অবিরত। 
হাত বাড়াই। স্পর্শ করতে চাই। পারি না। 
সুরহীন আমি। বড্ড। 

আমার সুর কেন নেই, মা? কেন বাঁচি না সুরে?
সুর ছেড়ে কি বাঁচা যায়? মা ছাড়া কি সুর থাকে জীবনে?    
      


(ভিডিও- সেই রেকর্ড প্লেয়ার)






মেলা এসেছে। শিল্প মেলা। ভ্রাম্যমাণ। বিএলআরও অফিসে মাঠে। নাগরদোলা। কথা বলা পুতুল। চিড়িয়াখানায় কুমির।  

গান বাজে। হিন্দি। দুপুর থেকে। নাগরদোলা ঘোরে। বনবন করে। 
প্রণব উঠতে ভয় পায়। আমি পাই না। পুটনকে নিয়ে উঠি। আট আনার টিকিট। চার পাক। লোক নেই। সাত পাক ঘোরে। উঁচুতে উঠি। অনেক। প্রণব ছোট্ট হয়ে যায়। 

ওই দূরে মুজনাই। টাউন ক্লাবের মাঠ। অন্য দিকে। পুরোনো চৌপথি। পেছনে। পাখি মনে হয়। নিজেকে। 

কথা বলা পুতুল হাত পা নাড়ে। টকটক কথা বলে। অঙ্ক করে দেয়। ইংরেজি বলে। মজার মজার কথা বলে। আমরা হাসি। গায়ে ঢলে পড়ি। কাঠগোলাপের গন্ধ ভাসে। বাতাসে। দুটো গাছ। টেরাবাঁকা। জড়িয়ে। একে অন্যকে। অফিসের সামনে। 

উঁচু পিলার। ইঁটের। দেড় মানুষ সমান। তার ওপরে অফিস। কাঠের। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। অফিসে হাত টানা পাখা। লাল রঙের। বড় বড় ঘর। বাবুরা কাজ করে। অফিসের নিচে বহু মানুষ থাকে। ওদের বাড়ি নেই। ঘর নেই। দেশ নেই। গায়ে নোংরা। চুলে জট। ওরা উদ্বাস্তু। মা বলে। আমোদি ওদের একজন।  

আমোদি কাজ করে। আমাদের বাড়িতে। ওর মেয়ে অমলা। ছোট। শুধু কাঁদে। মা মুড়ি দেয়। এনামেলের বাটিতে। অমলা খায়। পা ছড়িয়ে বসে। ওর খুব খিদে। আমোদিরও খুব খিদে। অমলার বাবা নেই। মরে গেছে। দাঙ্গায়। দাঙ্গা কী মা? দাঙ্গা কেন হয়? আমিও কি দাঙ্গা করব?

- চুপ! ও কথা বলতে নেই। মানুষ দাঙ্গা করে না। অমানুষ করে। অমানুষ মানে কিন্তু পশু নয়। পশুরা ভাল। অমানুষরা নয়। আর যা হোস, অমানুষ হোস না। 

বিপ্লব কথা বলা পুতুল সাজে। ক্লাসে। বাপি প্রশ্ন করে। বিপ্লব উত্তর দেয়। পুতুলের মতো। নাকি সুরে। আমরা হাসি। মজা লাগে বড্ড। 
রথীন হাঁটে। বেঁটে জোকারের মতো। সার্কাসে দেখেছিল। আমরা হাসি। মজা লাগে বড্ড। 

পুলককাকুও হাসেন। ওদের প্রাইজ দেন। চকোলেট। পুলককাকু ক্লাস নেন। আমাদের। এলোকিউশন। সপ্তাহে একদিন। 
আমি আবৃত্তি করি। প্রণব গান। পুটন স্পিচ দেয়। ঋত্বিক ছবি আঁকে। 

মা বেছে দেয় কবিতা। যখন আসে। মা শোনে না। আমার আবৃত্তি। ব্লকের ফাংশনে নাম দিই। হিটস হয়। ফাইনালে যাই। 
রাইচাঙায় অনুষ্ঠান হয়। থার্ড হই। মিলিদি সেকেন্ড। সুকুমারদা ফার্স্ট। আনন্দে ভাসি। প্রথম প্রাইজ। 

বাড়ি ফিরি। বেণুদার সাইকেলে চেপে। চাঁদের আলোর বন্যায়। অনেক রাতে। 
মা দরজা খোলে। প্রাইজ দেখাই। মা বুকে চেপে ধরে। 

আমার অমলার কথা মনে হয়। অমলার বাবা নেই। অমলার মা আমোদি আছে। আমোদি কি অমলাকে কবিতা বেছে দেয়? আমোদি কি অমলাকে আবৃত্তি শেখায়?
জানতে চাই। মায়ের কাছে। 

- তুই শেখাস। মানুষই মানুষকে শেখায়। অমানুষরা নয়.....         





        

মা ইন্টারভিউ দেবে। এই শহরের স্কুলে। 
মা চায় এই শহরে থাকতে। বাবার কাছে। আমার কাছে। দাদার কাছে। 
এই শহরের লোক চায় না। হয়ত। 
মায়ের অভিজ্ঞতা অনেক। চাকরির। চব্বিশ বছরের। 
অভিজ্ঞতার দাম অনেক। অভিজ্ঞতার নম্বর অনেক। 
মায়ের চাকরি হবেই। 
অসন্তোষ দানা বাঁধে। মিছিল হয়। স্লোগান ওঠে। বাবার বিরুদ্ধে। মায়ের বিরুদ্ধে। 

- এই শহরে যখন আসি তখন কথা হয়েছি তোমার মা-কেও পরের সুযোগেই নিয়ে আসা হবে। হয়েছিল সুযোগ। কিন্তু তোমার দিদার কাছে সেই দিদিমণি এলেন। তাঁর চাকরিটার প্রয়োজন ছিল। তোমার দিদা অর্থাৎ আমার মায়ের কথা ফেলতে পারিনি। তোমার মা-কে না করেছিলাম। একই ভাবে আরও দুবার সুযোগ ছেড়েছি। কিন্তু আর তো পারছি না। তুমি জানো আমার শরীর....     

বাবা বলে। ছাদের দিকে তাকিয়ে। বাবার মুখে কষ্ট। বাবার অপারেশন হয়েছে। কিছুদিন আগে। খাদ্যনালী অন্য দিকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আমি বাবার দিকে তাকাই। খারাপ লাগে। বুঝি না কী বলব। দরজায় ঢিল পড়ে। টিনের চালে ঢিল পড়ে। বাগানে ঢিল পড়ে। কেউ নোংরা কথা বলে। চিৎকার করে। রেগে উঠি। আক্রোশে। কিন্তু কিছু করতে পারি না। খারাপ লাগে। বুক মোচড়ায়। বাবা সিঁটিয়ে যায়। ভয় হয় না। রাগ হয়। অক্ষম রাগ।  

কেউ কেউ আসেন। পাশে দাঁড়ান। মা ইন্টারভিউ দেন। মা এক নম্বরে থাকে। মা কাঁদে। 

অনেক ফুল আসে। শিউলি গাছে। ছড়িয়ে থাকে। সকালবেলায়। মাটির ওপর। কালো মাটি। সাদা ফুল। বোঁটা কমলা। 

- জীবন সাদা কালো। এই ফুল আর মাটির মতো। কিন্তু রং আছে তাতে। অল্প হলেও। এবার হয়ত সেই রং পাবো। 

মা ফুল কুড়োয়। পরনে শাড়ি। সাদা। লাল পার। কপালে টিপ। লাল। বাবার মুখে হাসি। স্মিত। মায়ের মুখ লাজুক। 
রাতের কালবৈশাখী থেমেছে। সকালের নরম আলো। গন্ধরাজ আর শিউলি সুবাস। ভেজা গন্ধ মাটির। বড্ড আরাম। শীতল যেমন। 

বাবা স্কুলে যায়। মা স্কুলে যায়। একসঙ্গে। 
আমি দেখি। ভাল লাগে। সুখ জেগে ওঠে। চোখে আরাম লাগে।
দূর থেকে কেউ বলে,
- রং আসছে রং। দেখবি কাল রাতের জলের দাগের মতো রংহীন রঙে কত রং.......

রং দেখি। চোখ মেলি। 
সাদা কালো। 
আর তার মাঝে রঙিন কিছু। 
জীবন?  

ছবি- হলদিয়া 
সিরিজ-  মা/ শৌভিক রায় 




কাগাজনের  দল। লাল শালু পরা সন্ন্যাসী। লাল লাল চোখ। কপালে লাল টিপ। সিঁদুরের। ঢাক বাজে। ঢাকের সঙ্গে নাচে সব। বিড়বিড় মন্ত্র বলে। `পদ্মের ফুলে তুষ্ট আমার অমিয় সাগরধুতরার ফুলে তুষ্ট আমার সন্ন্যাসী নাগর/ কালীদহে তুল্লাম ফুল জাহ্নবীতে ধুলাম/ গঙ্গাজলে শুদ্ধ ফুল গাজনে আনিলাম॥` আবার কেউ বলে, `স্বগোত্রং পরিত্যজ্য শিবগোত্রে প্রবিশয়।` 

ইতিকাকুর দোকানের সামনে। গাজনের সং নাচে। ভিড় করে সবাই দেখে। আমিও দেখি। লুকিয়ে। মা জানে না। মা ভয় পায়। গাজন সাধুকে। 

মায়ের ভয় দেখে সাধু হাসে। খলখল। বলে, `দেবগোত্রং পরিত্যজ্য স্বগোত্রে প্রবিশয়। দে মা ভিক্ষে দে। তোর মঙ্গল হবে। স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে থাকবি। চড়কে ঘুরতে ঘুরতে তোর কথা বলব আমি। পিঠে বড়শি থাকবে। জিভে শলাকা ফুটবে। দে মা। ভিক্ষে দে। তোর মঙ্গল হবে।`

মা ভিক্ষে দেয়। তাড়াতাড়ি। আঁচল জড়ায়। গলায়। লাল শিমুল গাছ থেকে ঝরে। লাল রক্ত নামে শরীর বেয়ে। মায়ের কপালে লাল সিঁদুর। মা-কে শিব গৃহিণী মনে হয়। লাল পার শাড়ি। সাধুর দল গর্জন করে। গর্জন থেকে গাজন? সৃষ্টির মূলে এই গর্জন?

পয়লা বৈশাখ। আর কয়েকদিন পর। নতুন খাতা। হালখাতা। বাবা টাকা দেবে। দোকানে দোকানে যাব। নব পত্র। নব পঞ্জিকা। টাকা রাখব থালে। মিষ্টির প্যাকেট পাবো। ক্যালেন্ডার। নতুন। ক্যালেন্ডারের গন্ধ ভাল লাগে। খুব। ক্যালেন্ডারে লেখা থাকে `নববর্ষের সদর সম্ভাষণ গ্রহণ করুন`। কার্ড এসেছে মেলা। কোনও কোনও কার্ডে অগুরুর গন্ধ। চিকমিক চুমকি বসানো। হাতে লেগে যায়। বাবা বাকি রাখে না। তাও কার্ড পায়। বাবার সঙ্গে দোকানে যাই। সবাই আদর করে। নতুন জামা পরি। বেশি দামি নয়। পুজোয় দামি জামা। দামি জুতো। বৈশাখে কম কম। বাবা রেকর্ড চালায়। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। `এসো হে বৈশাখ....` 

নতুন বাড়ি হবে। আমাদের। জায়গা কেনা হয়েছে। অনেকটা দূরে। কোয়ার্টার্স থেকে। শান্ত পাড়া। নির্জন। ছিমছাম। ফাঁকা ফাঁকা। বাড়ি হলে চলে যাব। মন খারাপ হয়। এই কোয়ার্টার্স। এই মাঠ। এই শিমুল আর কৃষ্ণচূড়া গাছ। লং জাম্পের পিট। মায়া বড়। 

চালে উঠি। পেয়ারা গাছে বসে থাকি। ঘুঘু ডাকে একটানা। বিকেল নামে। দেরি ক`রে সন্ধ্যা হয়। আলো নেভে। জোনাকি জ্বলে সারা মাঠে। দিনের বেলা ওরা কোথায় যায়? 

- মন খারাপ? 
মা বলে। 

হাসি। আমি। কিছু বলি না। 

- হবেই তো। তোর তো এখানেই জন্ম। তবে ছেড়ে যেতে হয় সবই। একদিন। এক জায়গায় আটকে থাকলে হবে?

কিছু বলি না। চুপ করে থাকি। 

- এটাই নিয়ম। আমরা চলে যাব। অন্য কেউ আসবে। তার হবে এই কোয়ার্টার্স। তারপর কোনও দিন দেখবি হয়ত বাড়িটাই নেই। কেউ ভেঙে ফেলেছে। 

বুক কেঁপে ওঠে। আমার। মা কেন বলে এসব?

- বুঝবি আমার কথা। কোনও একদিন। ছেড়ে না গেলে, নতুন আসবে কীভাবে? ভেঙে না গেলে, সৃষ্টি হবে কীভাবে? এই বছরটাই ধর। এটা না শেষ হলে নতুন আসত? হালখাতা হত? তোর নতুন জামা কিনে দিতাম?
- তুমি যে ভয় পাও। গাজনের সাধু দেখে!
- সেটা স্বাভাবিক। একটা অভ্যাস ছাড়তে ভয় তো হয়। মন খারাপও হয়। আর সেসব যারা মনে করে তাদের দেখে মনে হয় এবার ছাড়তে হবে। ভয় পাই তাই। কিন্তু সাহায্য তো করি। করি না? নতুনকে আহ্বানও তো করি। মন খারাপ হোক তোর। পুরোনোর জন্য মন খারাপ না হওয়া খারাপ। কেননা অতীতের ওপরেই বর্তমান। কিন্তু পুরোনোকে ছাড়তে হয়। নতুনকে আঁকড়ে ধরতে হয়। 

গাজনের ঢাকের আওয়াজ ভাসে। রাতেও। কান পেতে শুনি। বছর চলে যাচ্ছে। বছর আসছে। 

ভোরবেলায় গা শিরশির করে। আলো ঢোকে ঘরে। নতুন সূর্য। আজকের। 
আগামীর?
আগামী বলে কিছু হয় না। সব আগামী আজ হয়ে যায়। 
থেকে যায় গতকাল শুধু।  


* ছবি- শাখাম  
সিরিজ- মা/ শৌভিক রায়   



 
 ট্রেনের চাকার শব্দ। ব্রিজের ওপর। বিকট। ঘুম জড়ানো চোখ। খুলতে আর চায় না। 

মা ধাক্কা দিতেন। 

- ওঠ ওঠ। 

উঠব কী! ঘুম যে আমার বড্ড। শুধু ঘুম?

সব কিছুই বড্ড। খিদে। খেলা। পড়াশোনা? না না। সেটি বাদ।

- ছেলের ঘুম দেখেছ? ওঠ। দক্ষিণেশ্বর মন্দির তো। গঙ্গা পেরোচ্ছি। প্রণাম কর। 

কাকে প্রণাম করব মা?

- উফফ। মা কে। ওই দ্যাখ মন্দির। রামকৃষ্ণদেব পুজো করতেন এখানে। প্রণাম কর শিগগির।

বুঝে না বুঝে প্রণাম। আকাশের গায়ে আঁকা মন্দির। পাশে গঙ্গা। জল টলটল।

- কলকাতা চলে এলো প্রায়। এরপর বরানগর। দমদম। তারপরেই শেয়ালদা। ঘুমিও না আর।

বাবার গলা কানে আসত। 

ধোঁয়া ধোঁয়া চারদিক। উঁচু উঁচু বাড়ি। গা ঘেঁষাঘেষি সব। এঁকেবেঁকে ট্রেন ঢুকত শেয়ালদায়। 

প্রথম কবে গেছি দক্ষিণেশ্বর? মনে পড়ে না। আমাদের প্রথম কোনও কিছুই আসলে মনে থাকে না- হাঁটা, বলা, শেখা....। বোধহয় মায়ের জন্য‌। 

তার কাছেই তো সব শেখা। তার কাছেই তো থাকা। সারা জীবন ধরে। মায়ের কাছে আবার প্রথম বা শেষ কী! সবই চিরদিনের। 

তাই ওসব হিসেব বাদ। যতবার যাই মায়ের কাছেই ফিরি। কবে প্রথম গেছি, কতবার গেছি এসব ভেবে লাভ!

তবে একটা কথা। মা অন্য রূপেও আছেন কাছে। আর একটি জায়গায়। সেটা জানি। কিন্তু মা ডাকে না সেখানে।

গত সন্ধেয় সে ডাক এলো। কসবার আদ্যাশক্তি কালী মন্দিরে তখন সন্ধ্যারতি। মা চাইলেন আদ্যাপীঠে যাই। সকালে তাই আদ্যাপীঠে। তার আগে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরে।  

শুধু মা কে ভালবাসি। মায়ের কাছে আসি। জগৎ জননী মা তো আমার। কতভাবেই না কাছে থাকেন।

মা ঈশ্বর হয়ে গেলে স্পর্শ করে জীবন। সেই স্পর্শে মায়ের স্নেহ। আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা। 

মায়ের কাছে এটাই তো পাওয়া....

* ছবি: দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির ও আদ্যাপীঠ




পড়তে বসেছি। বড় ঘরে। এই ঘরেই থাকি। এখানে এলে। 

সিঠাণ্ডায় জুবুথুবু। চাদরের তলায় হাত। হাত বাড়ালেই চাঁদ ধরা যাবে। চা বাগানের মাথায়। হাতে ট্রফি। থার্ড প্রাইজ। 
ফুলকপির ক্ষেত। গন্ধ ভাসে। বাতাসে। হিম ভাসে। সাইকেলে হাওয়া লাগে। 
সুকুমারদা ফার্স্ট। মিলিদি সেকেন্ড। আবৃত্তিতে। পুরাতন ভৃত্য। 
উড়ে উড়ে ফিরি। বেণুদার সাইকেলে। শুনশান চারধার। ক্যাঁচকোচ চাকার আওয়াজ।
ফটফটে সাদা চারধার। কুয়াশা জড়ানো। লম্বা চাদরের মতো। ঢেকে রেখেছে হরিতকি গাছ। শিরীষের মাথায় মেঘ যেন। 
শিশির নেই। ঝরবে ভোর রাতে। আওয়াজ হবে। টিনের চালে। কাঁথা টানব। গায়ে। নকশি কাঁথা। মায়ের তৈরি। ওম পাবো। মায়ের। 
বড্ড আনন্দ। বড় প্রতিযোগিতা। বড়দের গ্ৰুপ। বড় কবিতা। প্রাইজ তবু। বড়দের মাঝে। 
বেণুদা প্রাইজ পায়নি। তাও নিয়ে চলে। সাইকেলে। হ্যান্ডেলে বসেছি। ডাবল ক্যারি। প্যাডেল ঘোরে। সাইকেল এগোয়। 
ফুলকপির পাশে বেগুন। এত গাঢ় কালো দেখায়। তিরতির করে কালো জল। ছোট নদীর। 
ডিম খেতে ইচ্ছে হয়। হাঁসের। হলুদ কুসুম। বড় বড় আলু। কষকষে ঝোল। হাপুস হুপুস। মা রাঁধে। 
মা কোথায়! বাবা দরজা খোলে। বেড়ে রাখা ভাত। ঠাণ্ডায় নেতানো। ঠাণ্ডা ডাল। ঠাণ্ডা সবজি। ঠাণ্ডা ঢ্যাঁড়স সেদ্ধ। ডিম হয় না। দিদা ডিম খায় না। দিদা বৈষ্ণব। মালা জপে। তিলক কাটে। দিদা ঘুমোয়। ভাত খাই। প্রাইজ পাশে রাখি। ভাল লাগে।
মা আসে। সপ্তাহ শেষে। ট্রফি দেখে। কপালে চুমু দেয়। চিঠি লেখে। 
`....ছোট ছেলে আবৃত্তিতে প্রাইজ পেয়েছে। ব্লকের প্রতিযোগিতায়। আমি খুব খুশি হয়েছি। বড়দের সঙ্গে ও পারবে ভাবিনি কখনও। আমার তো এটুকুতেই আনন্দ। এই কালো মেয়ের কপালে ঈশ্বর এরকম আনন্দ দেবেন কল্পনাতেও ছিল না। ঠিক বলেছি কিনা বলো দাদা। তুমি তো সব জানো। সংসারে এই ছেলে দুটোর মুখ চেয়েই টিকে আছি। তা না হলে তোমার হাত ধরে ভাই-বোনে কোথাও চলে যেতাম!.....দেখো কাণ্ড! তোমাকেও দলে টানছি। আর বলো কেমন আছো। বৌদি কুশল তো? গোপা লিপি? সৰু আর কুন্তু? অনেকদিন দেখি না ওদের। একবার তো এলেও পারো। আমার তো যাওয়াই হয় না সবদিক সামলে। মা`কে দেখতে ইচ্ছে করে। ভাবছি শীতের ছুটিতে যদি একবার যেতে পারি। কাটিহারে ঠাণ্ডা পড়লেও এদিকের মতো নয়। দেখি তোমার জামাইকে বলে.....`
মায়েরও ইচ্ছে হয়। মা`কে দেখতে। অবাক লাগে আমার। মায়ের দিকে তাকাই। টলটল করছে কি জল? মায়ের চোখে?
তাকিয়ে থাকি। বুঝতে চেষ্টা করি। বুঝি না। 
মায়েদের বোঝা যায় না। কেউ বোঝে না। 
শীত জড়িয়ে আসে শরীরে। কাঁথা টেনে নিই। নকশি কাঁথা। মায়ের তৈরি। মায়ের ওম। 
উষ্ণ হই। আরাম লাগে। চোখ বন্ধ হয়ে আসে। 
ঘুমিয়ে পড়ি। ব্লকের প্রতিযোগিতা...কবিতা...প্রাইজ...ফুলকপির ক্ষেত...চাঁদের আলো....

ঘুম নামে। সাদা চোখে। কালো ঘুম। জ্বলজ্বল করে মা শুধু। মনে পড়ে মায়ের চিঠি.....

ছবি- চা-বাগান, আপার ফাগু 




  
রিজ:খিচুড়ি। মুসুর ডালের। ডুম ডুম পেঁয়াজ তাতে। রসুন কোয়া। দু`একটা। কাঁসার বাটি। মাঝারি। ভর্তি সেটা।
- খেয়ে নে। পুরোটা।
মাধ্যমিক পরীক্ষা। দশটা থেকে একটা। দুটো থেকে পাঁচটা। মার্চ মাস। সকাল রাতে ঠাণ্ডা। হালকা। দিনে গরম। খুব নয়। 
বাড়ি নতুন। অনেক দূরে। সাইকেল চালিয়ে আসি। পরীক্ষা দিতে। খিদে পায়। দুপুরে।
বাণী কাকিমার কাছে খাই। দুপুরে। 
কৌশিক মিষ্টি খায়। ওর বাবা আসেন। সঙ্গে মা। গোপাল করের দোকানে। ডিমের মতো দেখতে ছানাবড়া। মাঝখানটা হলুদ। কৌশিকের বাবা কিনে দেন না। পরীক্ষার সময় ডিম খেতে নেই। নম্বর তবে ডিমের মতো হবে। গোল। 
প্রণব বাড়ি যায়। পুটন। বাপিও। ওদের মা খেতে দেন। 
আমার মা স্কুলে। পরীক্ষার ডিউটিতে। 
বাণী কাকিমা আমার মা। আর এক। 
আগের বেঞ্চে পুচি। ওকে অঙ্ক জিজ্ঞাসা করি। ইংরেজি বলে দিই। 
আড়ি ছিল। পুচির সঙ্গে। ভাব হয়েছে। আবার। 
ব্যথা করে। হাতে। বিকেলের দিকে টান ধরে। আঙুলে। বড় বড় উত্তর। লিখতে হয় অনেক। মাঝে একদিন গ্যাপ। তারপর আবার। পরীক্ষা। 
অঙ্ক সব শেষে। একবেলা। বাণী কাকিমা ছাড়ে না। খিচুড়ি দেয়। বাসি। বাসি খিচুড়ি ভালবাসি। ঠাণ্ডা। মুসুর ডালের। ডুম ডুম পেঁয়াজ। রসুন কোয়া। গরম বেগুন ভাজা। তেলতেলে। হাপুস হুপুস খাই। খিদে পায় খুব। 
- খিদের বয়স। খাবেই তো দিদি। খাক.... 
কাকিমা বলে। মা হাসে। মা এসেছে। বাণী কাকিমার বাড়ি। 
দৌড়ে যাই। পুটন ডাকি। বাপিকে ডাকি। প্রণব আসে। সিনেমা দেখতে যাই। পুটনের বাবা ম্যানেজার। টিকিট লাগে না।  সিট হাতড়ে বসি। অন্ধকারে। 
উত্তমকুমার হাসেন। আমরাও হাসি। গড়িয়ে পড়ি। পুটন মিঠুনকে ভালবাসে। প্রণব উত্তমকুমারকে। বাপি? আমি? জানি না.... 
পরীক্ষা শেষ। মাধ্যমিক।
- জীবনের শুরু এবার। 
মা বলে। চারজনকে। আমাদেরকে। 
বুঝি না। জীবন তো শুরু কবেই হয়েছে। তবু কেন মা বলে!
- বড় হয়ে গেলি তোরা।
বড় হলাম কি? বড় কি হওয়া যায়? আদৌ?
তবু কেন মা বলে? কেন বলে মা?
বাপির চোখ ছলছল করে। পুটন তাকিয়ে থাকে। প্রণব চুপ। 
কেন বলো মা? কেন বলো? বড় হতে চেয়েছি কি? 
চাইনি। কেউ চাইনি। 
বড় হলেই বাঁধন। আষ্টেপৃষ্ঠে। জানি। 
তবু বড় হতে হয়। মা.....বড় হতে হয়.....     

  

ট্রেনের চাকার শব্দ। ব্রিজের ওপর। বিকট। ঘুম জড়ানো চোখ। খুলতে আর চায় না। 


মা ধাক্কা দিতেন। 

- ওঠ ওঠ। 


উঠব কী! ঘুম যে আমার বড্ড। শুধু ঘুম?

সব কিছুই বড্ড। খিদে। খেলা। পড়াশোনা? না না। সেটি বাদ।


- ছেলের ঘুম দেখেছ? ওঠ। দক্ষিণেশ্বর মন্দির তো। গঙ্গা পেরোচ্ছি। প্রণাম কর। 

কাকে প্রণাম করব মা?

- উফফ। মা কে। ওই দ্যাখ মন্দির। রামকৃষ্ণদেব পুজো করতেন এখানে। প্রণাম কর শিগগির।


বুঝে না বুঝে প্রণাম। আকাশের গায়ে আঁকা মন্দির। পাশে গঙ্গা। জল টলটল।


- কলকাতা চলে এলো প্রায়। এরপর বরানগর। দমদম। তারপরেই শেয়ালদা। ঘুমিও না আর।


বাবার গলা কানে আসত। 


ধোঁয়া ধোঁয়া চারদিক। উঁচু উঁচু বাড়ি। গা ঘেঁষাঘেষি সব। এঁকেবেঁকে ট্রেন ঢুকত শেয়ালদায়। 


প্রথম কবে গেছি দক্ষিণেশ্বর? মনে পড়ে না। আমাদের প্রথম কোনও কিছুই আসলে মনে থাকে না- হাঁটা, বলা, শেখা....। বোধহয় মায়ের জন্য‌। 


তার কাছেই তো সব শেখা। তার কাছেই তো থাকা। সারা জীবন ধরে। মায়ের কাছে আবার প্রথম বা শেষ কী! সবই চিরদিনের। 


তাই ওসব হিসেব বাদ। যতবার যাই মায়ের কাছেই ফিরি। কবে প্রথম গেছি, কতবার গেছি এসব ভেবে লাভ!


তবে একটা কথা। মা অন্য রূপেও আছেন কাছে। আর একটি জায়গায়। সেটা জানি। কিন্তু মা ডাকে না সেখানে।


গত সন্ধেয় সে ডাক এলো। কসবার আদ্যাশক্তি কালী মন্দিরে তখন সন্ধ্যারতি। মা চাইলেন আদ্যাপীঠে যাই। সকালে তাই আদ্যাপীঠে। তার আগে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরে।  


শুধু মা কে ভালবাসি। মায়ের কাছে আসি। জগৎ জননী মা তো আমার। কতভাবেই না কাছে থাকেন।


মা ঈশ্বর হয়ে গেলে স্পর্শ করে জীবন। সেই স্পর্শে মায়ের স্নেহ। আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা। 


মায়ের কাছে এটাই তো পাওয়া....


ছবি: দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির ও আদ্যাপীঠ

ছবি: শৌভিক রায় 


শৌভিক রায় 


ট্রেনের চাকার শব্দ। ব্রিজের ওপর। বিকট। ঘুম জড়ানো চোখ। খুলতে আর চায় না। 


মা ধাক্কা দিতেন। 

- ওঠ ওঠ। 


উঠব কী! ঘুম যে আমার বড্ড। শুধু ঘুম?

সব কিছুই বড্ড। খিদে। খেলা। পড়াশোনা? না না। সেটি বাদ।


- ছেলের ঘুম দেখেছ? ওঠ। দক্ষিণেশ্বর মন্দির তো। গঙ্গা পেরোচ্ছি। প্রণাম কর। 

কাকে প্রণাম করব মা?

- উফফ। মা কে। ওই দ্যাখ মন্দির। রামকৃষ্ণদেব পুজো করতেন এখানে। প্রণাম কর শিগগির।


বুঝে না বুঝে প্রণাম। আকাশের গায়ে আঁকা মন্দির। পাশে গঙ্গা। জল টলটল।


- কলকাতা চলে এলো প্রায়। এরপর বরানগর। দমদম। তারপরেই শেয়ালদা। ঘুমিও না আর।


বাবার গলা কানে আসত। 


ধোঁয়া ধোঁয়া চারদিক। উঁচু উঁচু বাড়ি। গা ঘেঁষাঘেষি সব। এঁকেবেঁকে ট্রেন ঢুকত শেয়ালদায়। 


প্রথম কবে গেছি দক্ষিণেশ্বর? মনে পড়ে না। আমাদের প্রথম কোনও কিছুই আসলে মনে থাকে না- হাঁটা, বলা, শেখা....। বোধহয় মায়ের জন্য‌। 


তার কাছেই তো সব শেখা। তার কাছেই তো থাকা। সারা জীবন ধরে। মায়ের কাছে আবার প্রথম বা শেষ কী! সবই চিরদিনের। 


তাই ওসব হিসেব বাদ। যতবার যাই মায়ের কাছেই ফিরি। কবে প্রথম গেছি, কতবার গেছি এসব ভেবে লাভ!


তবে একটা কথা। মা অন্য রূপেও আছেন কাছে। আর একটি জায়গায়। সেটা জানি। কিন্তু মা ডাকে না সেখানে।


গত সন্ধেয় সে ডাক এলো। কসবার আদ্যাশক্তি কালী মন্দিরে তখন সন্ধ্যারতি। মা চাইলেন আদ্যাপীঠে যাই। সকালে তাই আদ্যাপীঠে। তার আগে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরে।  


শুধু মা কে ভালবাসি। মায়ের কাছে আসি। জগৎ জননী মা তো আমার। কতভাবেই না কাছে থাকেন।


মা ঈশ্বর হয়ে গেলে স্পর্শ করে জীবন। সেই স্পর্শে মায়ের স্নেহ। আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা। 


মায়ের কাছে এটাই তো পাওয়া....


ছবি: দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির ও আদ্যাপীঠ

ছবি: শৌভিক রায় 


বড় খাট। বাবা বসে আছে। পড়া দেখছে। আজ পড়তে হয়। না হলে মা রাগ করেন। মা বলেছে।

ছোট ঘরে বাবা থাকে। এই ঘরে মা, আমি, ঝিনি। দাদা ন কাকুর ঘরে। কাকুদের আলাদা আলাদা ঘর। পিঁড়ি পেতে রান্না ঘরে খাই। সবাই। দিদা দেখে। তৃপ্তি নিয়ে। মালা জপে। 

ঝিনি পড়ে। আমার সঙ্গে। লেখে। স্লেটে। ট্যারাবেকা। মোছে। জল দিয়ে। জলের পোকা জলে যা, আমার স্লেট শুকিয়ে যা। বিড়বিড় করে। আমি হাসি। ঝিনি গলা জড়িয়ে ধরে।

মাংস রান্না হচ্ছে। মেজ কাকা নিয়ে এসেছে। বালিকা থেকে। কচি পাঁঠা। নলি হাড় ভাল লাগে। চুষি। আর এক টুকরো মেটে দেয় বড় কাকিমা। লুকিয়ে। বড় কাকিমার ছেলেমেয়ে নেই।

মা মণ্ডপে যায়। সঙ্গে তিন কাকিমা। সিঁদুর পরিয়ে দেয় মায়ের কপালে। সন্দেশ ঠেকায় মুখে। আমি বই ছুঁইয়ে নিই। মায়েকো। যেন নিয়ে যাচ্ছে। মা কে। 

বুধানিদার রিকশায় চাপি। মায়ের সঙ্গে। মা চুপ। কথা বলে না। কলেজ হল্ট ছাড়িয়ে যাই। কোয়ালিদহের রাস্তা ধরি। শীত শীত লাগে। হিম পড়ে। দূরে বুড়ির গড়। বাঁশ ঝোপ। অন্ধকার। ভাঙাচোরা রাস্তা। চাঁদের আলোয় আবছায়া। 

বুধানিদা 

No comments: