Saturday, July 15, 2023

বাংলা গল্প উপন্যাসে পিছিয়ে পড়া মানুষরা: একটি রূপরেখা 

শৌভিক রায় 

সাহিত্য সমাজের দর্পণ যেমন, তেমনি চলমান জীবনের জীবন্ত ইতিহাসও বটে। এমনিতে ইতিহাস বলতে আমরা বুঝি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় এবং অনেকাংশে সামাজিক জীবনের ধারাবাহিক বর্ণনা। সাহিত্যের সঙ্গে ইতিহাসের এই ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা মিল রয়েছে। তবে সাহিত্য শুধুমাত্র ধারাবাহিকতার দলিল নয়। ইতিহাসের যে অংশ সাধারণভাবে অস্পষ্ট বা অধরা থাকে, সাহিত্য সেটিই তুলে ধরে। কল্পনা ও বাস্তবের মিশেল ঘটিয়ে সাহিত্যিক ও কবিরা লিখে চলেন জায়মান জীবনের গাথা। সেই গাথায় মিশে যায় প্রত্যেকেই। আর খুঁটিয়ে দেখলে আমরা পাঠকরা পাই, সেই গাথা আসলে বলছে মানুষেরই কথা। বিশ্বের যে কোনও মহৎ সাহিত্য কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কথা বলে। সমাজজীবনে তথাকথিত `পিছড়ে বর্গ`- এর জীবন, সংগ্রাম, উত্তরণ ফুটে ওঠে সেইসব লেখায়। হেমিংওয়ের `ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সি` থেকে শুরু করে হাল আমলের নোবেলজয়ী আব্দুলরাজাক গুরনাহর `প্যারাডাইস` বা `ডিসার্শন` কিংবা `বাই দ্য সি` সবেতেই আমরা সেই পিছিয়ে পড়া মানুষদের কথাই পাই। 

বাংলা সাহিত্যও কিন্তু এই বিষয়ে বিশ্ব সাহিত্যের হাত ধরেই চলছে। বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিক পাঠ এই সত্যে উপনীত করে যে, অন্ত্যজ বা নিম্নবর্গের মানুষদের ভাষা বাংলা সাহিত্যে বহুবার স্থান পেয়েছে। বাংলা সাহিত্যের দিগগজ লেখকেরা তথাকথিত উচ্চবিত্ত সমাজের ছবি যেমন এঁকেছেন, তেমনি পিছিয়ে পড়া মানুষদের প্রকৃত চিত্র আঁকতে পিছপা হননি। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন এমন হল? কেন বাংলা সাহিত্যে বারবার নিম্নবর্গের মানুষরা জায়গা করে নিয়েছেন? এর খুব সাধারণ উত্তর হল, আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় এই শ্রেণির মানুষদের প্রাধান্য বেশি। সুদূর অতীত থেকে এই মানুষরা সংখ্যাগুরু। স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পরেও আজ অবধি সেই অবস্থার ইতর বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। ফলে সেই অতীতের সঙ্গে পার্থক্য বলতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাওয়া সমাজব্যবস্থায়। কিন্তু সেটা ছাড়া অর্থনৈতিক যে ব্যবধান সমাজের দুই শ্রেণির মধ্যে ছিল, তা একইরকম আছে। বিত্ত পুঞ্জীভূত হয়েছে কতিপয় মানুষের হাতে। বাকিরা আজও সেই একই জায়গায়। ফলে, আজও বাংলা সাহিত্য নিম্ন বা মধ্যবিত্ত নায়ক-নায়িকা ও পার্শ্বচরিত্রের যে ভিড় দেখতে পাই তা অত্যন্ত স্বাভাবিক। একই কারণে কবিদের সৃজনেও ফুটে ওঠে নিম্নবর্গের মানুষদের জীবনযন্ত্রণা ও বঞ্চনার ইতিহাস। তবে শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকে উচ্চ বা নিম্ন বর্গ ভাবাটা বোধহয় ভুল হবে। বাঙালি তথা ভারতীয় সমাজে আজও জাতপাত একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা রাখে। সেই বিচারেও তথাকথিত নিম্নবর্গের মানুষ কিন্তু কম নেই। লক্ষ্যণীয়, বাংলা সাহিত্যে জাতপাতের বিচারে পিছিয়ে পড়া মানুষদের আখ্যান কম থাকলেও, তাদের অস্বীকার করার জায়গা নেই। হতে পারে, বাঙালিদের মননে জাতপাত সেভাবে কোনোদিন প্রভাব বিস্তার করেনি (এই বিষয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে)। ফলে, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষেরা বাংলা সাহিত্যে যতটা স্থান পেয়েছেন, জাতপাতের ভিত্তিতে নিম্ন বর্গের মানুষদের উল্লেখ সেখানে কম। তবে, কোনোভাবেই `নেই` বলা যাবে না। 

বাংলা সাহিত্যের প্রথম নিদর্শন হিসেবে যদি চর্যাপদকে ধরা হয়, তবে সেখানে পিছিয়ে পড়া মানুষদের কথা কিন্তু আমরা পাই। সেই সময় বাঙালি সমাযে  ব্রাহ্মণ্যদের দাপট প্রকট ছিল।  চর্যাপদের কবিরা কিন্তু  ডোম, শবর, চণ্ডাল প্রভৃতি অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের জীবন ও জীবিকার নানা তথ্য তাদের  লেখায় তুলে ধরেছেন। একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লেই দেখা যায়, চর্যাপদে আসলে অন্ত্যজ সমাজের এক দরদী চিত্র আঁকা হয়েছে- "টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী। হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী।। বেঙ্গ সংসার বডহিল জাঅ। দুহিল দুধ কি বেন্টে ষামায়।।" অর্থাৎ, `` টিলার ওপরে আমার ঘর, আমার কোনো প্রতিবেশী নেই। হাঁড়িতে আমার ভাত নেই, আমি প্রতিদিন উপোস থাকি।  প্রতিদিন আমার সংসার বেড়ে চলেছে, যে-দুধ দোহানো হয়েছে তা কি আবার ফিরে গাভীর বাঁটে।`` তবে চর্যাপদের পদগুলির বৈশিষ্ট্য হল,শুধুমাত্র পিছিয়ে পড়া মানুষদের সমাজজীবন নয়,  সঙ্গে সেই আমলের  পারিবারিক জীবনের আচার ও ব্যভিচারও ফুটিয়ে তোলা। অস্বীকার করবার উপায় নেই, সবকিছুই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন চর্যাপদের কবিরা। ডঃ অসিতকুমার বন্দোপাধ্যায়ের মতে, `কেবল চিত্ররূপময় বর্ণনার সৌন্দর্য বা প্রকৃতিরূপ-চিত্রনের অসাধারণত্বই নয়, চর্যার পদগুলিতে রূঢ় বাস্তব মৃত্তিকালগ্ন জীবনের যে প্রতিফলন ঘটেছে, সেই জীবন-চিত্রও চর্যাপদাবলীকে গুঢ় ধর্মতত্ত্বের সীমানা অতিক্রম করে সর্বজনগ্রাহ্য সাহিত্যের স্তরে উন্নীত করেছে। সাহিত্য তাে জীবনের দর্পণ। চর্যায় সেই জীবনের ছবি বাস্তব এবং জীবন্ত। টিলার উপর নির্বান্ধব মানবকের দারিদ্র্যপীড়িত জীবনের ছবি, নাড়িয়া ব্রাহ্মণের প্রবৃত্তিবশত গােপনে অস্পৃশ্য চণ্ডালীর গৃহগমন-চিত্র, ক্ষপণক স্বামীর দরিদ্রা গর্ভিনী স্ত্রীর আক্ষেপ-ইত্যাদি সহজিয়া সাধনতত্ত্বের উর্ধে সাহিত্যগুণের পরিচয়বাহী। সেইসঙ্গে চর্যায় প্রকাশিত বিস্তৃত সমাজচিত্রটিও চর্যাপদের সাহিত্যধর্মের প্রকাশক।` ডঃ সত্যব্রত দে বলছেন, "সামাজিক বৈষম্য ও পক্ষপাত, উচ্চবর্ণের মধ্যে নানাপ্রকার অন্যায় ও ব্যভিচার, নিম্নবর্ণ অন্ত্যজদের সামাজিক প্রতিষ্ঠার অভাব ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ইহাই ছিল চর্যার রচনার যুগে সামাজিক অবস্থার স্বরূপ।..চর্যাপদগুলির মধ্যে যে সমাজচিত্র ও বাস্তব জীবনযাত্রার আভাস-ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাহাতে একদিকে সমাজের এই ভেদবিভেদ এবং বৈষম্যের চিত্র, অন্যদিকে দুঃখপূর্ণ দরিদ্র জীবনযাত্রার কখনও পূর্ণাঙ্গ কখনও বা খণ্ডবিচ্ছিন্ন উপাদান লক্ষ্য করা যায়।`` এই সময় সমাজের নিম্নশ্রেণীর লােকেরা ছিল অবজ্ঞার পাত্র এবং আর্থিক দিক থেকে বিপর্যস্ত। এদের বাসস্থান ছিল শহরের বাইরে। চলতে হত উচ্চবর্ণের স্পর্শ বাঁচিয়ে। ``কিন্তু উচ্চবর্ণের সঙ্গে এদের যে কোন সম্পর্ক ছিল না, তা নয়, বরং উচ্চবর্ণের মনস্তুষ্টির জন্য ডােম্বীদের আতিশয্য কিছুটা সংশয়েরই সৃষ্টি করে। এই সকল অন্ত্যজ অস্পৃশ্য শ্রমিকদের বৃত্তি অর্থকরী কিংবা প্রশংসনীয় ছিল না। এদের কেউ ছিল তাঁত-বােনা তাতী, চাঙ্গড়ি- প্রস্তুতকারী ডােম্বী, নৌকাবাহক জেলে বা নেয়ে। এ ছাড়া ছিল শুড়ি যারা মদ তৈরি করত, ছিল। বৃক্ষছেদক, ছিল নট-সম্ভবতঃ এরা লেটোর দল নিয়ে গ্রামে গ্রামে নেচে গেয়ে বেড়াত।``

সন্ধ্যা ভাষার সেই দিনগুলি অতিক্রম করে আমরা যদি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও তার পরবর্তী সময়ে আসি, তবে দেখব নিম্নবর্গের মানুষেরা বিভিন্নভাবে বাংলা সাহিত্যে এসেছেন। প্রাবন্ধিক মিল্টন বিশ্বাস সুন্দর ব্যাখ্যা করেছেন- `উপন্যাসের যাত্রালগ্নে সাধারণ মানব মানবীর জীবন অবলোকন সূত্রে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিম্নবর্গের মানুষের জীবন উন্মোচিত হয়েছে। এক্ষেত্রে `আলালের ঘরের দুলাল`-এর ঠকচাচা, `কপালকুন্ডলার` নির্মম ধর্মসাধনায় নিয়োজিত কাপালিক, `ইন্দিরা`, `রজনী`, বিষবৃক্ষ` ও `কৃষ্ণকান্তের উইল` উপন্যাসের নারী চরিত্রগুলি নিম্নবর্গের অন্যতম নিদর্শন। বিষবৃক্ষের হীরাদাসী চরিত্রটি নারীর নিম্নবর্গের ব্যতিক্রমী রূপায়ণ হিসাবে স্বীকৃত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের `চোখের বালি`র বিনোদিনী নিরাশ্রয় নারীর নিম্নবর্গত্বকে প্রকাশ করে। তাঁর `গোরা`র একদিকে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় শাসকগোষ্ঠী, অন্যদিকে গোরার আত্মানুসন্ধান প্রকৃতপক্ষে উচ্চবর্গ নিম্নবর্গের সমান্তরাল বিন্যাস। উপন্যাসটিতে জনতা আছে, আছে মুসলমান ও ব্রাত্যজীবনের কথাও। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসগুলোতে কখনও প্রেমবর্জিত, আবার কখনো বা দাম্পত্যপ্রেম ও তার বিরোধকাহিনী আবার নিষিদ্ধ সমাজবিরোধী প্রেমের চিত্র অঙ্কন করেছেন। এর মধ্যে `শ্রীকান্ত`, `চরিত্রহীন`, `গৃহদাহ` প্রভৃতি উপন্যাসে নারীর নিরাশ্রয়তা, নিঃসঙ্গতা ও উন্মিলিত বাস্তবতা প্রকাশিত হয়েছে। নিম্নবর্গের তাত্বিকদের কাছে এসব নারীর স্বতন্ত্র মূল্য রয়েছে।`

অন্যদিকে ডঃ বিভাস মণ্ডল লিখছেন, ` "গোরা" উপন্যাসে সর্বধর্মবর্ণ সমন্বয়ের চেতনা সুস্পষ্ট রূপ লাভ করেছে।এখানে রবীন্দ্রনাথ অহমিকা ও সংস্কারবোধকে আঘাত হেনেছেন। গ্রামীণ সমাজের অবহেলিত পতিত মানুষজনের প্রতি প্রবল মমত্ববোধ, বর্ণবৈষম্যহীন বিদ্রোহী মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। তৎকালীন ভারতের সমাজ জীবনের অজ্ঞতা, জড়তা, কুসংস্কারাচ্ছন্নতা, জাতপাত নিয়ে মিথ্যে বিরোধ সম্পর্কে গোরার মনোভাবের পরিবর্তন ঘটেছে। এ উপন্যাসে নিম্নবর্গ সমাজের তন্তুবায়, কামার, কুমোর, ছুতোর, অন্ত্যজ অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ের মানুষের কথা উঠে এসেছে। যাদের মধ্যে খৃস্টান দাসী লছমিয়া, ঘোষচরপুরের মুসলমান প্রজাসাধারণের প্রতি রবীন্দ্রনাথের মমত্ববোধের প্রকাশ ঘটেছে। সমগ্র ভারতবর্ষ উঠে এসেছে এই উপন্যাসে । গোরা জাতীয় ঐক্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তমনা পরেশবাবুর শিষ্য হয়েও সমস্ত জাতপাতের প্রাচীর ভেঙে সংস্কারের বেড়া পেরিয়ে সামাজিক অনাচার কে নির্মূল করার ব্রত নিয়েছে। সমস্ত ছুৎমার্গের ঊর্দ্ধে উঠে খৃস্টান রমণী লছমিয়ার জল গ্রহণেও তৎপর হয়েছে। সেইসঙ্গে অর্থনৈতিক শ্রেণীবৈষম্যের কথাও এখানে উঠে এসেছে। চরঘোষপুরের সকল প্রজাই মুসলমান। তাদের সঙ্গে নীলকর সাহেবদের বিরোধ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে জাত পাতের বিভেদ। বদমেজাজি ফর সর্দার নীলকরদের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তার সঙ্গে সহযোগিতা করেছে গোরা।` অনেকটা একই চিত্র দেখি তাঁর `চতুরঙ্গ' ও `ঘরেবাইরে` উপন্যাসে। রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প পড়লেও `সমাজের শোষিত বঞ্চিত নিপীড়িত অভাজনদের মর্মব্যথা` দেখতে পাই আমরা। দেনাপাওনা, পোস্টমাস্টার, ত্যাগ, শাস্তি, মেঘ ও রৌদ্র, অনধিকার প্রবেশ, মুসলমানীর গল্প, দুরাশা, উলুখড়ের বিপদ , হালদারগোষ্ঠী প্রভৃতি ছোটগল্পে অন্ত্যজ শ্রেণির কথাই ফুটিয়ে তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ। 

এই ধারা অক্ষুণ্ণ থেকেছে রবীন্দ্র পরবর্তী যুগেও। জগদীশ গুপ্ত থেকে শুরু করে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখের লেখায়।  কয়লাখনির শ্রমিক, গণিকা, সমাজের একেবারে নিচু স্তরে থাকা অত্যন্ত সাধারণ মানুষ চিত্রায়িত হয়েছেন এঁদের লেখায়। আর একটু পরে তিন বন্দোপাধ্যায় অর্থাৎ বিভূতিভূষণ, মানিক ও তারাশঙ্কর তো এই বিষয়ে রীতিমতো দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। গণদেবতা, হাঁসুলী বাঁকের উপকথা, পদ্মানদীর মাঝি, পুতুল নাচের ইতিকথা, পথের পাঁচালি, আরণ্যক ইত্যাদিতে যেভাবে সমাজের নিম্নবর্গ স্থান পেয়েছেন, তার উদাহরণ বিশ্ব সাহিত্যে খুব কমই আছে। দুর্ভাগ্য, সঠিক অনুবাদের অভাবে এই মাস্টারপিসগুলি বিশ্ব পাঠকের কাছে আজও সেভাবে পৌঁছায়নি। ফলে, অচেনা রয়ে গেছেন সাধারণ নিম্নবর্গের মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করা এই মহান লেখকরা। সমরেশ বসু, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, সতীনাথ ভাদুড়ী প্রমুখরা তাঁদের পূর্বসূরীদের দেখানো পথেই লিখে গেছেন বিভিন্ন উপন্যাস। তাঁদের লেখায় ধরা পড়েছে জেলে থেকে রাস্তার মাস্তান কিংবা গার্হস্থ্য জীবনে অতি পরিচিত বঁধু থেকে পতিতাপল্লীর নারীরা। মনোজ বসু, রমাপদ চৌধুরী, প্রফুল রায়, বিমল মিত্র, দেবেশ রায়, বিমল কর, সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়  প্রমুখেরা একইভাবে তাঁদের লেখায় তুলে ধরেছিলেন নিম্নবর্গের মানুষদের। এই তালিকায় অতি অবশ্যই যোগ করতে হবে অমিয়ভূষণ মজুমদার, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখদের। 

``সরোজকুমার রায়চৌধুরীর 'ময়ূরাক্ষী', 'গৃহকপোতী ও সোমলতা' এই তিন উপন্যাসে বৈষ্ণবজীবনের চিত্র পাওয়া যায়। অজয় ভট্টাচার্যের অরণ্যানী'তে আছে পার্বত্য বাসিন্দা ত্রিপুরাদের গোষ্ঠীজীবনের পরিচয়। বিভূতিভূষণের 'আরণ্যকে নিম্নবর্গের মিছিল গোষ্ঠী থেকে ব্যক্তি, ব্যক্তি থেকে প্রাকৃত প্রজাসাধারণের রাজ্যে অনুপ্রবিষ্ট। তাঁর 'পথের পাঁচালী' 'অপরাজিত' গ্রামীণ নিম্নবর্গের অসামান্য দলিল। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের 'দ্বীপপুঞ্জ পল্লীজীবনের কাহিনী। এতেও নিম্নবর্গের জয় ঘোষিত হয়েছে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর 'লালসালু', আবু ইসহাকের 'সূর্য দীঘল বাড়ী' নিম্নবর্গের গ্রামীণ জীবনের রূপায়ণ হিসেবে অনন্য। রমাপদ চৌধুরীর বনপলাশির পদাবলী পল্লীজীবনেরই চিত্র। হরিপদ দত্তের ঈশানে অগ্‌নিদাহ ও অন্ধকূপে জন্মোৎসব উপন্যাসে বাংলাদেশের গ্রামীণ নিম্নবর্গের সমাজ কাঠামোর বিচিত্র পরিবর্তনের দৃশ্য অঙ্কিত হয়েছে।.....  অনেক উপন্যাসে নিপীড়িত নিম্নবর্গের কৃষক শ্রমিকের সঙ্গে অপরাধী জনগোষ্ঠী বস্তুনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। উচ্চবর্গের ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে দূরবর্তী নিম্নবর্গের জীবন জীবিকা ও পেশার বিস্তৃত বিবরণ এবং নতুন পেশা অবলম্বনে জীবনের সমস্যার দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। পেশার রূপ রূপান্তর তাদের আর্থ উৎপাদনব্যবস্থার একটি অন্যতম দিক। বিভিন্নজনের উপন্যাসে ভিড় করেছে বিচিত্র চরিত্র ও পেশার মানুষ। বৈষ্ণব বাউল সন্ন্যাসী, জাদুকর, বেদে বাজিকর, রাজমিস্ত্রি, ভিক্ষুক, কবিয়াল, নিম্ন শ্রেণীর ব্রাহ্মণ, কুমার, ডাইনি, চৌকিদার টহলদার, চোর ডাকাত, মাঝি, পিয়ন প্রভৃতি। আবার নিপীড়িত অবলুপ্তপ্রায় মানুষের পরিচয় উপন্যাসের অনেক স্থানজুড়ে আছে। রাঢ় ও মানভূমির মৃত্তিকায় যাদের বর্তমান অস্তিত্ব নেই, এমন অনেক সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীর বিবরণ বিভিন্ন উপন্যাসে পাওয়া যায়। সুবোধ ঘোষের শতকিয়া উপন্যাসে মানভূমির আদিম সংস্কার প্রধান জীবনের চিত্র রয়েছে। মনোজ বসুর 'নিশিকুটুম্ব চৌর্যবৃত্তির বাস্তব রূপায়ণ। চোর আর ডাকাতের চিত্র রয়েছে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের তিন খণ্ডের উপনিবেশ এ। একদিকে শাসকগোষ্ঠী তথা খানা পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট, অন্যদিকে নিম্নবর্গের জীবন বিস্তৃত পরিসরে এখানে উন্মোচিত হয়েছে। বনফুলের উপন্যাসে, বিশেষত স্থাবর ও জঙ্গম এ মানবজীবনের ইতিহাস নিম্নবর্গীয় বিন্যাসেই উপস্থাপিত।`` (মিল্টন বিশ্বাস)   

বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি বিভাগেই নিম্নবর্গের উপস্থিতি অত্যন্ত প্রকট। সাম্প্রতিক কালে স্বপ্নময় চক্রবর্তী, ভগীরথ মিশ্র, নলিনী বেরা, দেবজ্যোতি রায়ের মতো লেখকরা তুলে আনছেন তাদের। কিন্তু আমরা আলোচনা গত শতকের নব্বই দশক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখছি বলে বিস্তারিত যাচ্ছি না আর। আসলে আমাদের মনে রাখতে হবে, যে কোনও দেশে, যে কোনও কালে সমাজ ও সাহিত্য সৃষ্টি করে সাধারণ পিছিয়ে পড়া মানুষেরাই। তাদের বাদ দিয়ে কোনোভাবেই আমাদের পক্ষে এগোনো সম্ভব নয়। কেননা সমাজের ভরকেন্দ্রে তারাই থাকেন, যদিও সমাজের চালিকাশক্তির অধিকারী হন না তারা। এটাই হয়ত তাদের ট্র্যাজেডি, যদিও ট্র্যাজেডির কোন সংজ্ঞায় তারা পড়েন, সেটা নিয়ে বিতর্ক চলবে। কিন্তু একথা ঠিক, যেহেতু তারা বৃহত্তর সমাজকে প্রতিনিধিত্ব করছেন, তাই তাদের কথা যদি লিপিবদ্ধ না হয় সেই আমলের সাহিত্যে, তবে সেই সাহিত্য কখনই প্রকৃত সাহিত্যের মর্যাদা পেতে পারে না। যারা নিজেরা পিছিয়ে থেকেও সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন, তারাই তো আসল নায়ক। আর নায়কবিহীন গল্প বা উপন্যাস? ভাবা যায় না সেটি।

(প্রকাশিত- এক পশলা বৃষ্টি/ সম্পাদক- অম্বরীশ ঘোষ)         

No comments: