Friday, July 14, 2023

 এক অন্য পরিভ্রমণ 

শৌভিক রায় 

এ এক অদ্ভুত যাত্রা...যেন কোনও আবহমানকাল থেকে চলছে তা! এর নেই শুরু, নেই শেষ। কিংবা হয়ত বা শুরু ছিল! ছিল শেষও।  কিন্তু সেটা দেখবার জন্য নিজে ছিলাম না। থাকবও  না শেষর জন্য। তাই নির্দিষ্ট কালখন্ডে ধরা যাচ্ছে না এই চলা-কে। চলছি নিজের মতো। আর চলতে গিয়ে সাজানো গোছানো এই ছিমছাম জনপদটিকে আজকাল কেমন অচেনা লাগছে! মনে হচ্ছে, পাল্টে গেছে সে। 

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি জনপদ পাল্টে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। তাই, কষ্ট হলেও সেই বদলকে মেনে নিতেই হয়। কিন্তু চোখে ভাসছে সেই বিরাট মহীরুহরা, যাদের গায়ে শরৎকালেও লেগে থাকতো পুরু শ্যাওলার আবরণ। কেননা, কিছুদিন আগেই  রাতভ`র বৃষ্টি হয়েছে সারা বর্ষাকাল জুড়ে। টিনের চালে বৃষ্টির টুংটাং যে জলতরঙ্গ সৃষ্টি করেছিল তার আবেশ মিটতে না মিটতে, কোনও কোনও দিন ঘন কালো মেঘ কেটে উত্তর আকাশে দেখা গেছে শ্বেতশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা। এমনিতে অবশ্য প্রায় সারা বছর ধরেই নীল ভুটান পাহাড় ছিল এই জনপদের সঙ্গী। সেই পাহাড়ের গায়ে কালো ধোঁওয়া ছাড়তে ছাড়তে চলে যেত জনতা বা কামরূপ এক্সপ্রেস সেই কোন দূরের কলকাতায়! খবরের কাগজটাও আসত ফিরতি ট্রেনে পরের দিন। আকাশবাণী শিলিগুড়ির অনুরোধের আসরে হেমন্ত-লতা-অনুপ ঘোষাল-রবীন্দ্র জৈনকে শুনতে শুনতে বাসি খবর পড়াই ছিল  ছিল দুপুর-বিলাস। বিকেল হলে খাসমহল ময়দানে বড়দার ফুটবল কোচিং বা টাউন ক্লাবের মাঠে সিজন টিকিট কেটে একমাস ধরে ফুটবল টুর্নামেন্টে রয়াল ভুটান টিমের মিনির দাপট দেখা ছিল শ্রেষ্ঠ বিনোদন। অবশ্য গৌরী টকিজের পেছনে বসে `শোলে` ছবির বিখ্যাত সব ডায়ালগ শোনাও কারও কারও যে খুব প্রিয় ছিল সে কথাও অনস্বীকার্য।

বলছি নিজের জন্মভূমি ফালাকাটার কথা। ছোট একটি বসতি থেকে কবে কীভাবে এই জনপদ গড়ে ওঠে তার প্রামাণ্য ইতিহাস নেই! মোটামুটি একটি আভাস পাওয়া গেলেও কোনও স্থানের উৎপত্তি নিয়ে একদম নির্দিষ্ট করে বলা মানে সত্যের অপলাপ করা। তাই এইসব ক্ষেত্রে ইতিহাসবিদ থেকে শুরু করে সকলেই অনুমানের ওপর নির্ভর করেন। সেই অনুমানের ওপর নির্ভর করে একথা বলা যায় যে, সমৃদ্ধ জনপদ ফালাকাটার জন্ম ডুয়ার্সের অন্য অনেক জনপদের তুলনায় বহু আগে। আসলে ডুয়ার্সের অধিকাংশ জনপদ গড়ে উঠেছিল চা-বাগানকে কেন্দ্র করে। অসমের চা ব্রিটেন-সহ ইউরোপে জনপ্রিয় হলে, দলে দলে ইউরোপিয়ান টি-প্ল্যান্টাররা ভারতে আসতে শুরু করেছিলেন। ঊনবিংশ শতকের চল্লিশের দশকে দার্জিলিং পাহাড়েও চা-চাষের সম্ভাবনা বুঝতে পেরে সেখানেও শুরু চা-বাগান পত্তন। কিন্তু ডুয়ার্সের আবহাওয়া ও পরিবেশ যে চা-চাষের অনুকূল সেটা বুঝতে ইউরোপিয়ানদের আর একটু সময় লেগেছিল। শেষ পর্যন্ত  ডুয়ার্সের গজলডোবায় ব্রাউহাম সাহেব ১৮৭৪ সালে সফলভাবে চা-বাগান তৈরি করলে, ইউরোপিয়ানরা বুঝতে পারেন যে, এই অঞ্চল চা-চাষের পক্ষে অনুকূল। ফলে শুরু হয় অরণ্য নিধন করে চা-চাষের প্রচেষ্টা। আর তার ফলে ডুয়ার্সের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় উনিশটি জনপদ গড়ে ওঠে। প্রশ্ন জগতে পারে, ডুয়ার্স কী? কেনই বা এরকম একটি শব্দের উদ্ভব? সম্ভবত, 'দুয়ার' শব্দটি ইংরেজদের মুখে 'ডুয়ার্স' হয়ে গিয়েছিল। তাহলেও প্রশ্ন থাকছে 'দুয়ার' কেন? আসলে সমভূমি থেকে উত্তরে পাহাড়পথে ভূটানে যাবার জন্য ছিল আঠারোটি পথ বা দুয়ার। বহুবচনে দুয়ারগুচ্ছ। ইংরেজরা DOOARS বা ডুয়ার্স বেছে নেয়। (তথ্যসূত্র: সার্জন রেনি- BHOTAN AND THE STORY OF DOOAR WAR)। হিন্দুস্থানী 'দ্বার' বা ইংরেজি DOOR থেকেই 'দুয়ার' শব্দটির উদ্ভব। একটু দেখে নিই এই আঠারোটি 'দুয়ার' কী কী- ডালিমকোট (বর্তমান কালিম্পঙ জেলায়), ময়নাগুড়ি বা জুমের কোর্ট , চামুর্চি বা সামচি, লক্ষ্মী বা লাককি (বর্তমান জলপাইগুড়ি জেলায়), বকসা বা পাশাখা, ভলকা বা ভুলকা (বর্তমান আলিপুরদুয়ার জেলায়), বরা, গুমর, রিপো ( বর্তমানে আসামের কোকড়াঝাড় জেলায়), চেরাঙ বা ছেরাঙ (আসামের গোয়ালপাড়া জেলায়), বাগ বা ছোটা বিজনি (আসামের বর্তমান বিজনি জেলায়), বুড়িগুমা, কালিং ( বর্তমানে আসামের দরং জেলায়), শুরকোল্লা, বংসকা, চাপাঘোরি বা চাপাগুড়ি, চাপাঘামা, বিজনি (বর্তমানে আসামের কামরূপ জেলায়)। প্রথম এগারোটি জায়গা পূর্বে বেঙ্গল ডুয়ার্স (তিস্তা থেকে মানস পর্যন্ত) ও বাকি সাতটিকে (মানস থেকে ধানসিরি নদী পর্যন্ত) বলা হত আসাম ডুয়ার্স। এখন অবশ্য ডুয়ার্স বলতে তিস্তা থেকে সংকোশ নদী পর্যন্ত এলাকাকেই বোঝায়। ১৮৬৯ সালের পয়লা জানুয়ারিতে জলপাইগুড়ি জেলা গঠিত হবার পর ডুয়ার্সের বেশীর ভাগ অংশই ছিল জলপাইগুড়ি জেলায়। পঁচিশে জুন, ২০১৪ জলপাইগুড়ি জেলা বিভক্ত হয়ে আলিপুরদুয়ার জেলা গঠিত হলে বর্তমানে আলিপুরদুয়ার জেলাতেও ডুয়ার্সের কিছু অঞ্চল অন্তর্ভূক্ত। 

   
কিন্তু চা-বাগান থাকলেও, ফালাকাটার জন্ম ডুয়ার্সের অন্য জনপদগুলি সৃষ্টির বহু আগে। সেই সময় প্রায় ফালাকাটা ছিল অরণ্য অধ্যুষিত। শীতের প্রবল দাপট সহ্য করতে না পেরে ভুটানিরা মুজনাই নদীর তীরে এসে ডেরা বাঁধত বেশ কয়েকমাসের জন্য। নদীর সেই ঘাট ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল ভুটানিরঘাট নামে। অরণ্যের বিস্তার থাকলেও চাষযোগ্য সমতলভূমি শুরু হয়েছিল ফালাকাটা থেকেই। ফলে বনজঙ্গলে ঢাকা ডুয়ার্সের এই অঞ্চলের প্রতি বিশেষ নজর ছিল কোচবিহার ও ভুটানের। দখল নিয়ে চলত যুদ্ধ। ইতিহাস বলছে যে সেসময় রংপুরের রাজা বলে পরিচিত শ্যামল বর্মনের বীরাঙ্গনা স্ত্রী, ফুলটুসি, কোচবিহারের পক্ষে লড়াই করে এই অঞ্চলে ভুটানি সৈনিকদের ফালা ফালা করে কেটেছিলেন। ফলে জায়গাটির নাম হয়েছিল ফালাকাটা। তবে নামকরণের পেছনে গাছ ফালা ফালা করে কেটে সীমান্ত নির্ধারণ কিংবা সাপটানা নদীর জমিখন্ডকে কয়েকভাগে কাটার তত্ত্ব উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অধুনা নামকরণের পেছনে যোগ হয়েছে বাঘের পিঠে বসা লৌকিক দেবতা ফালাকাটার কথাও। শোনা যায় তাঁকে নিয়ে ছড়াও- 'ভক্তি দিনু ফালাকাটা মহারাজ, থাকেন বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গলত। পশ্চিমে হইল করতোয়া, উত্তর হইতে পূর্বেত তিস্তাবুড়ি বহে ধীর...।' তবে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, আমবাড়ি-ফালাকাটার নামকরণের পেছনে এই ছড়াটি বেশি প্রযোজ্য। 

ডুয়ার্সের বহু এলাকার মতো ফালাকাটাও ছিল ভুটানের অংশ। দ্বিতীয় ইঙ্গ-ভুটান যুদ্ধের পর, দর কষাকষিতে ফালাকাটা আসে ব্রিটিশদের হাতে। এই স্থানটি তাদের এত পছন্দ হয় যে, ১৮৬৯ সালে জলপাইগুড়ি জেলা তৈরি করে ফালাকাটাকে মহকুমার মর্যাদা দিয়েছিল তারা। তৈরি করা হয় সেনা ছাউনি, থানা। সম্ভবত ইংরেজরা জেলার দায়িত্ব দিতে চেয়েছিল ফালাকাটাকে। কিন্তু সেটা সম্ভব হয় নি একদিকে তোর্ষা ও অন্যদিকে তিস্তা-জলঢাকার মতো বিরাট নদী থাকায়। ফলে, জেলা সদর থেকে, বিশেষ করে বর্ষাকালে, যোগাযোগ সমস্যা হত। যাহ`ক, ফালাকাটায় মহকুমা পত্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদল এসেছিল সেদিনের জনপদের। লোকবসতি বাড়তে শুরু করেছিল। এমনিতেও এই অঞ্চলের আশেপাশে চাষের জমি ছিল বলে যোগেন্দ্রনাথ বর্মন, সাবান মিঞা, জয়প্রসাদ সিং, কুঞ্জবিহারী মুখোটি, সুখচাঁদ বর্মন প্রমুখেরা জোতদারি পত্তন করেছিলেন। মহকুমা প্রতিষ্ঠার পর পর সাপটানার তীর ধরে গড়ে উঠেছিল বাবুপাড়া। আজকের সুভাষপল্লি অঞ্চলের অস্তিত্ব থাকলেও টাউন ক্লাবের মাঠ মেলার মাঠ নামেই পরিচিত ছিল। কেননা ভুটানের অধীনে থাকার সময়ে এই মাঠে নানাধরণের খেলাধুলার আয়োজন করা হত। বসত বিরাট মেলাও। এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় তহসিল হওয়ায় ফালাকাটায় খাজনা আদায়ের পরিমাণও ছিল প্রচুর। থানার বিপরীতে সাপটানা নদী পার করে অতীতের খাসমহল ময়দানে গড়ে তোলা হয়েছিল তহসিল অফিস। তখনও কিন্তু নতুন চৌপথি তৈরি হয়নি। রাস্তাও ছিল না। আলিপুরদুয়ার বা কোচবিহারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য থানার সামনে দিয়ে রাস্তাই ছিল মূল পথ। থানার সামনেই ছিল মানিক দাসের প্রথম হোটেল। তহসিল অফিসকে কেন্দ্র করে এম ই স্কুল তৈরি হয় ১৮৯৩ সালে। আজ অবশ্য তার আর অস্তিত্ব নেই। আর ১৯০০ সালে Western Dooars Fund Market আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে তিরিশ বিঘা জমি নিয়ে শুরু করেছিল ফালাকাটা হাট। সেই সময়ে এই অঞ্চলে ওইরকম বিরাট হাট আর একটিও ছিল না। থানা, হাট, স্কুল, তহসিল অফিসের সেদিনের ফালাকাটার মানুষেরা সংস্কৃতি চর্চার জন্য ১৯২৪ সালে তৈরি করেছিলেন ড্রামাটিক হল। এখানকার নাট্যচর্চা নিয়ে বহু কথা বলা যায়। ড্রামাটিক হলেই জোতদার অ্যাসোসিয়েশনের অফিস তৈরি করা হয় সেসময় আর তার সামনে শুরু হয় ফালাকাটার প্রথম বারোয়ারি দুর্গা পুজো। সম্ভবত সৈনিকদের আমোদপ্রমোদের বিষয়টি মাথায় রেখেই দুই দশক পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মার্কিন সৈনিকদের জন্য ছাউনি তৈরি হয়েছিল এখানে। পরিত্যক্ত সেই ছাউনিতে ১৯৪৮ সালে স্থাপিত হয় টাউন লাইব্রেরি 'সুভাষ পাঠাগার'। এই দশকেই আরও দুটি ব্যাপার ফালাকাটাকে অন্য পরিচয় দিয়েছিল। এই সময়ে এখানে গড়ে ওঠে দুটি চা বাগান- কাদম্বিনী ও কোচবিহার। কোচবিহার চা বাগানের মালিকানা ছিল কোচবিহার রাজাদের হাতে। পরবর্তীতে সে মালিকানা চলে গেলেও মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণের নামাঙ্কিত বাগানের হাসপাতাল সেই সাক্ষ্য বহন করছে। কিছুদিন আগেও ইউরোপ থেকে রাজবংশের আত্মীয়রা এসে এই চা-বাগান দেখে গেলেন। ১৯৪৯ সালে রেমন্ড মেমোরিয়াল হাই স্কুল প্রতিষ্ঠাও কিন্তু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ছোটনাগপুরের কার্মাটার থেকে স্কুলটিকে এখানে তুলে নিয়ে এসেছিলেন সেভেন্থ ডে অফ আডভেন্টিস্ট চার্চের দুই শিক্ষাবিদ চাম্পিয়ান‌ ও সিম্পসন। প্রসঙ্গত চা বাগানের জন্য কেনা ওই জমিটি বালিময় বলে পরিত্যক্ত হয়। সেই জমিই মিসেস রেমন্ডের সাহায্যে কম দামে কিনতে পেরেছিলেন তারা। সেই জমির অনেকটা অবশ্য পরে ১৯৬৩ সালে ব্রডগেজ রেলপথ স্থাপনের ও স্টেশন তৈরির জন্য অধিগ্রহণ করা হয়। কিন্তু এটা ঠিক যে, এত প্রাচীন স্কুল ডুয়ার্স অঞ্চলে কমই দেখা যায়। শিক্ষার ক্ষেত্রে ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয় ও ফালাকাটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভূমিকাও অসামান্য। ফালাকাটার সামগ্রিক উন্নতিতে এস এস বি-এর কথাও ভুলে গেলে চলবে না। ফালাকাটা সর্বভারতীয় পরিচয় পেয়েছিল স্বাধীনতার কয়েক বছর পর শৌলমারীর হাত ধরে। আরও নির্দিষ্ট বললে ১৯৫৯ সালে। তার আগে, ১৯৪৫ সালে ভারতের অন্যতম প্রাচীন উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থা (তখন নাম ছিল আলাদা) তৈরি হলে, প্রথম যাত্রীবাহী বাসের জন্য রুট বেছে নেওয়া হয়েছিল ফালাকাটাকে। বোঝাই যায়, ফালাকাটার গুরুত্ব ঠিক কতটা ছিল শুরু থেকেই! 

১৮৬৯ সালে প্রাপ্ত মহকুমার শিরোপা ফালাকাটা কিন্তু বেশিদিন ধরে রাখতে পারে নি। ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশরা ফালাকাটা থেকে মহকুমা নিয়ে গেলেন বক্সায়। অতীতে বক্সা পরিচিত ছিল পাশাখা নামে। এখানকার গিরিপথ দিয়েই 'টাঙ্গন' নামের তেজি ঘোড়া ভুটান থেকে বিনিময় প্রথায় পাঠানো হতো রংপুরের হাটে। তাই, পাশাখা  ছিল বিনিময়ের জায়গা। বিনিময়ের হাত ধরেই, এই ঘোড়া পাওয়ার জন্য, কোচবিহার একসময় ফালাকাটাকে ইজারা দিয়েছিল ভুটানের হাতে। রংপুরে এখনও ছটফটে মেয়েদের 'টাঙ্গন মাইয়া' বলার পেছনে অতীতের সেই ঘোড়ার ইতিহাস রয়েছে বলে মনে করা হয়। ভুটানিদের প্রথা ছিল, বিক্রির সময় ঘোড়ার লেজের কিছু অংশ কেটে নেওয়া। পরবর্তীতে ভুটানের সঙ্গে কোম্পানির চুক্তি হলে ইংরেজরা সে প্রথা বন্ধ করে বকশিস দিয়ে। তাই 'বকশিস' থেকে বক্সা কথাটির সৃষ্টি, এ কথা বলে থাকেন অনেকে। তাই আদিম অরণ্যের পাশাখা বা বক্সা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল বাণিজ্যের অন্যতম স্থান। 

১৭৮৪ সালে লেফটেন্যান্ট ডেভিস ও  ১৮৩৮ সালে উইলিয়াম গ্রিফিথ বক্সার দূর্ভেদ্য জঙ্গল ও অপরূপ শোভায় মোহিত হয়ে উচ্ছসিত প্রশংসা করেছিলেন।  গ্রিফিথ ১৮৩২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে যোগ দিয়েছিলেন এবং ১৮৪২-৪৪ সালে কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেনের সুপারিন্টেন্ড হিসেবে কাজ করেছিলেন। প্রকৃতি-প্রেমিক গ্রিফিথের বা ডেভিসের সেদিনের বিবরণ থেকে আজকের বক্সার কিন্তু খুব কিছু পার্থক্য নেই।  ১৯৮৪ সালে যখন প্রথম বক্সায় আসি তখন ফোর্টে যাওয়ার রাস্তা ছিল আলাদা। ১৯৯৩ সালের বিধ্বংসী বন্যায় সেই রাস্তার অস্তিত্ব বিলুপ্ত। ফোর্টের কিছু অবশিষ্ট ছিল সে সময়। আজকের বক্সার অন্যতম আকর্ষণ রহস্যময় ফোর্ট নিয়ে আর নতুন কথা কী বলব! ব্রিটিশ আমলে আন্দামানের সেলুলার জেলের পরেই দুর্গম ও দুর্ভেদ্য বক্সা ফোর্ট, ডুয়ার্স তো বটেই, উত্তরবঙ্গের গর্ব। হিংস্র শ্বাপদের গা ছমছমে বক্সা জঙ্গলের উত্তরে, সিনচুলা পাহাড়ে, ২৮৪৪ ফিট উচ্চতায়, কে বা  কারা ফোর্টটি নির্মাণ করে সে বিষয়ে স্পষ্ট জানা যায় না। কারো মতে ফোর্টটি তিব্বতিদের তৈরী, কেউ কেউ মনে করেন কামরুপীরা ছিলেন এর নির্মাণের পেছনে। আবার ভুটিয়ারা এই ফোর্টের নির্মাতা এরকমটাও মনে করেন ঐতিহাসিকেরা। 

ফোর্টের আরও ওপরে ৪৫০০ ফুট উচ্চতায় রয়েছে রোভারস পয়েন্ট। মাত্র ১১ কিমি দূরে ভুটান। সিনচুলা গিরিপথ পেরোলেই অসামান্য রূপম উপত্যকা। বক্সা ফোর্ট কবে তৈরী সে নিয়ে বিতর্কের মাঝে কিছু তথ্য জরুরী। মনে করা হয়, ১৬৬১ সালে প্রাণভয়ে ভীত কোচবিহার-রাজ প্রাণনারায়ণ এই ফোর্টে এক বছর কাটিয়ে ছিলেন। ফোর্টটি তখন 'জং' নামে পরিচিত। পরবর্তীতে 'জং'-এর অধিকার নিয়ে লড়াই বেঁধে থাকতো ভুটান ও কোচবিহারের। প্রথম ইঙ্গ-ভুটান যুদ্ধে, ইংরেজ ক্যাপ্টেন জোনস ১৭৭৩ সালে বক্সা অধিকার করলেও, ১৮৬৫ সালে সিনচুলা চুক্তি অনুসারে ফোর্টটি পাকাপাকিভাবে ব্রিটিশদের দখলে আসে এবং 'জং` বা দুর্গের দখল নেয় তারা। দখল নিয়ে ব্রিটিশরা ফোর্টের কিছু সংস্কার করেছিল। ফোর্টটি পাথরের দেওয়ালে মুড়ে ফেলা হয়, টিনের ছাদ দেওয়া হয়। নির্মিত হয় অফিসারদের থাকবার ঘর, পোস্ট অফিস। জলের ব্যবস্থাও করা হয়। বক্সাকে দেওয়া হয় মহকুমার মর্যাদা। ১৮৭৩ সালে সেনা মোতায়েন-সহ তিনটি পিকেট বসানো হয় বক্সায় এবং পরের বছর বক্সাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় মহকুমার মর্যাদা। ১৯০১ সালে রাজাভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তী পর্যন্ত মিটার গেজ রেলপথ চালু হলেও ফোর্টের দুর্গমতা কিন্তু একই থেকে যায়। ১৯১৪ থেকে ১৯২৪ অবধি মিলিটারি পুলিশের ছাউনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল ফোর্টটি। অবশেষে স্বাধীনতা আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে ১৯৩০-এ জেলখানায় বদলে যায় ফোর্ট। দুর্গম এই ফোর্টে বন্দি হয়েও সেদিনের স্বাধীনতা-সংগ্রামীরা দমে যাননি। তবে এই ফোর্টে নেতাজি সুভাষকে বন্দি রাখা হয়েছিল বলে যে কথা শোনা যায় তা ঠিক নয়। স্বাধীনতা-সংগ্রামী তৈলক্যনাথ চক্রবর্তীকে অন্য বন্দীরা 'নেতাজি' সম্বোধন করতেন। সম্ভবত সেখান থেকেই নেতাজি সংক্রান্ত বিপত্তি। এই ফোর্ট থেকেই ১৯৩১ সালে বন্দিরা রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তিতে তাঁকে অভিনন্দনপত্র পাঠিয়েছিলেন। বিশ্বকবি প্রত্যুত্তরও দিয়েছিলেন। ফোর্টে প্রবেশের মুখে খোদাই করা দুটো পত্রই দেখা যায় আজও। স্বাধীনতার পর নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের এখানে বন্দি হিসেবে রাখা হয়েছিল। সেই বন্দিদের মধ্যে ছিলেন পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও। ১৯৫৯ থেকে ১৯৭০ অবধি তিব্বতি রিফিউজি ক্যাম্প ছিল ফোর্টে। ১৯৭১-৭২ সালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদেরও  আশ্রয় দেওয়া হয় এখানে এবং শেষ অবধি ১৯৭৬-৭৭ সালে পরিত্যক্ত হয় ফোর্ট। 

১৯৮০ সালে জাতীয় স্মারকের ঘোষণা হলেও, আজ কিন্তু বড্ড অবহেলায় পড়ে রয়েছে আজকের বক্সা ফোর্ট। বক্সাকে নিয়ে প্রবন্ধ-উপন্যাস-গল্প-কবিতায় বহু লেখালিখি হলেও বর্তমান বক্সা ফোর্টের চারদিকে ধ্বংসস্তুপ কেবল! সান্ত্রাবাড়ি থেকে এখনও পাঁচ-ছয় কিমির উঁচু-নীচু পাহাড়ি  হাঁটা পথে যেতে হয় ফোর্টে। অপূর্ব নৈসর্গিক পরিবেশে, ফোর্টের বিপরীতে দেখা মেলে নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার, ফরেস্ট রেস্ট হাউস, পোস্ট অফিস (অতীতের রেসিডেন্টস অফিস) ও  কিছু বাড়িঘরের। কিন্তু ফোর্টের ভগ্নদশায় মন খারাপ হয়ে যায়। ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদের প্রতি এই অবহেলা সত্যি অকল্পনীয়। কে বিশ্বাস করবে যে, কয়েক দশক আগেও লোহার গেট, পাহারাদার, দেওয়াল, আংটাবেড়ি ইত্যাদি দেখা যেত এই দুর্গে। কাঁটাতারে ঘেরা থাকত এলাকা। কাকপক্ষীও ঢুকবার সাহস পেত না। বক্সা ফোর্ট নিয়ে আলোকপাতের অবকাশ আজও রয়ে গেছে। বারংবার দৃষ্টি আকর্ষণ সত্ত্বেও অজানা কারণে বক্সা ফোর্ট অবহেলিত। জানা নেই কবে ঘুচবে এই অন্ধকার, কবে যোগ্য মর্যাদা পাবে ইতিহাসের বক্সা ফোর্ট। বক্সা ফোর্ট থেকে আরও কিমি চারেক ওপরে উঠলে পাহাড়ি ছোট্ট হ্যামলেট লেপচাখা।  চড়াই-উৎরাই পথে, কিছু বাড়িঘর চোখে পড়ে। বেশির ভাগ বাড়ির সামনে রয়েছে 'ক্ষেতি' আর তাতে যথারীতি চাষ হয়েছে ভুট্টা আর মকাই। দেখা যায় ইউ-এর চাষও। সেগুলি দিয়ে পরে তৈরী হবে পানীয়। বাড়িগুলিতে থাংকা ঝোলানো দেখে বোঝাই যায় তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। লেপচাখাতেও রয়েছে চোর্তেন। দেখা মেলে বৌদ্ধ মঠ বা মনাস্ট্রির। আধুনিক সভ্যতার হাত ধরে এখানেও তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি হোম স্টে। ডুয়ার্সের এই অঞ্চল আজও যেন অচেনা, রহস্যময়। লেপচাখা থেকে আর একটি পাহাড়ি পথে চলে যাওয়া যায় রায়মাটাঙে। তবে সেই পথ বড্ড নির্জন আর বিপদসংকুল। সময়ও লাগে আমাদের মতো অনভ্যস্তদের। গাইড ছাড়া যাওয়াও উচিত নয়। 

শুরুতেই বলেছিলাম, এই চলা আবহমান। ইতিহাসের হাত ধরে তাই দাঁড়িয়ে আছি এখন রূপসী জয়ন্তীতে। তথ্য বলছে, ১৮৬৫ সালে দ্বিতীয় ইঙ্গ-ভুটান যুদ্ধের পর সিনচুলা চুক্তির  ফলে, নভেম্বর মাসের ১১ তারিখ ভুটান, বাংলা আর অসমের ৮৮০ বর্গকিমি জায়গা, বার্ষিক ৫০০০০ টাকার বিনিময়ে ব্রিটিশদের সমর্পণ করে। এই এলাকার মধ্যে ছিল ভুটানিদের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র মহাকালধাম। কিন্তু জয়ন্তীর দখল ছিল ভুটানের হাতেই। নিজেদের পবিত্র তীর্থস্থান পুনরুদ্ধারের চিন্তা যেমন ছিল ভুটানের, তেমনি ইংরেজরাও চাইছিল জয়ন্তীকে নিজেদের হাতে নিতে। কেননা এই অঞ্চল যে বিশাল খনিজ ভান্ডারে পূর্ণ সে কথা ইংরেজরা বুঝতে পেরেছিল ১৮৬৫-৬৬ সালে গডউইন অস্টিনের রিপোর্টে। ১৮৭৫ সালে এফ আর ম্যালেটের আর একটি রিপোর্ট, অস্টিনের কথাকেই সমর্থন করে। কিন্তু সে সময়ে শুধুমাত্র অনুমানের ভিত্তিতে ইংরেজরা খনিজ সম্পদ সংগ্রহে আগ্রহী হয় নি। তাদের মনে তখন অন্য ভাবনা। আসলে জয়ন্তী সে সময় ছিল হাতি কেনাবেচার কেন্দ্র। ভারী কাজের ক্ষেত্রে বলশালী এই পশুটি ছিল মুশকিল-আসান। এদের লোভনীয় দাঁত ছিল অত্যন্ত মূল্যবান। সুতরাং ব্যবসা-পণ্য হিসেবে হাতির কদর ছিল আলাদা। কিন্তু মুশকিল হল, হাতি পাওয়া যেত যে অঞ্চলে, সেই জায়গাটি ছিল ভুটানের অন্তর্গত। আর সেজন্যই হাতি ধরতে গেলে নিতে হচ্ছিল ভুটানের বিশেষ অনুমতি। অতএব চলল প্রচেষ্টা। ইংরেজদের ভাগ্যলক্ষ্মী তখন সব দিক থেকেই দিয়েই সুপ্রসন্ন।  ভুটানও চাইছিল ইংরেজদের হাত থেকে তাদের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র নিজেদের হাতে নিতে। অবশেষে সে প্রচেষ্টা সফল হল ১৮৮৮ সালে। আসরে নামলেন এডওয়ার্ড ডালটন। মূলত তাঁর সুপারিশে তদানীন্তন ভারত সরকারের বিদেশ দপ্তর আজকের বক্সা দেওস্থানের পূর্বদিকের অঞ্চলটি কিনে নিলেন। ২১.৪৩ বর্গমাইলের সেই জায়গাটি নিতে তাদের খরচ হয়েছিল ১০০০০ টাকা। এই অঞ্চলটির নাম ইংরেজরা রেখেছিল জয়ন্তী ল্যান্ডস বা জৈনতি। এভাবেই জন্ম নিয়েছিল ডুয়ার্স রানি। এই সময়েই মহাকাল চলে গিয়েছিল ভুটানের দখলে। তীর্থক্ষেত্রের জন্য ইংরেজদের খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না বলে সেদিনের দশ হাজার টাকার সঙ্গে মহাকালকেও দিয়ে তুলে দিয়েছিল তারা ভুটানের হাতে। জয়ন্তীকে নিজেদের কব্জায় নিয়ে হাতি কেনাবেচার ব্যস্ত ব্যবসা কেন্দ্রে পরিণত করতে ইংরেজদের সময় লাগে নি। তবে শুধু হাতি নয়, তাদের নজর ছিল বিপুল অরণ্য সম্পদের ওপরেও। ফলে জঙ্গল দ্রুত মুছে যেতে লাগল। যে বক্সা-জয়ন্তীতে আজও দিনের বেলায় মহীরুহদের গা-ঠেসাঠেসি করে দাঁড়িয়ে থাকায় সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছায় না, সেই জায়গা তবে সেকালে কী ছিল ভেবে ওঠাটাই দুষ্কর। কিন্তু বাস্তব এটাই। ১৮৯৬ সালে এইচ হেডেনের রিপোর্ট বলেছিল, জয়ন্তীতে রয়েছে  লিগনাইট, ডলোমাইট এবং লৌহ তামার আকরিক। কিন্তু তবুও দীর্ঘদিন জয়ন্তীতে সেভাবে কোনও কলকারখানা দেখা যায় নি। এর কারণ সম্ভবত ডুয়ার্সের বিশেষ করে বক্সা-জয়ন্তীর দুর্ভেদ্য জঙ্গল। যাহোক, নতুন শতকে এসে কিন্তু জয়ন্তীর বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। স্থাপিত হয়  কোচবিহার স্টেট রেলওয়ের জয়ন্তি- গীতালদহ রেলপথ। ১৯০১ সাল সেটি। আর এই রেলপথ স্থাপনের পূর্ণ কৃতিত্ব কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ ভূপ বাহাদুরের। ততদিনে জয়ন্তী নদীর ওপাশে গড়ে উঠেছে চা-শিল্প। এসে গেছেন ইউরোপিয়ানরা। জয়ন্তীর কাছে-পিঠে নানা জায়গায় চা-বীজ সবুজ গাছে পরিণত হচ্ছে। বন কেটে বসত গড়ে তুলতে আর দুটি পাতা একটি কুঁড়ি তুলে ফ্যাক্টরিতে পাঠানোর কাজে ভিন রাজ্য থেকে এসে গেছে শ্রমিকেরা। তাই ভারত সরকারের অনুরোধে সাড়া দিতেই রাজাভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তী পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছিল সেই রেলপথ। এই রেলপথ মূলত চা-শিল্পের জন্য তৈরি করা হলেও, জয়ন্তী থেকে বিশালাকার বৃক্ষদের মৃতদেহ যাত্রা শুরু করেছিল ভারতের নানা প্রান্তে ব্রিটিশদের হাত ধরে। 

জয়ন্তীর অবস্থা আরও বদলে গেল ট্রান বুলস, এ জে কিং আর জি সি দে প্রমুখেরা যখন জয়ন্তী নদীর ওপর ব্রিজ তৈরি করলেন। এই সড়ক পথটি হয়ে গেল বক্সা জয়ন্তী সহ ডুয়ার্স যাওয়ার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। রেলপথ, সড়কপথ ইত্যাদি সবকিছু মিলে জয়ন্তীর তখন জমজমাট অবস্থা। এখানকার সোমবারের বিরাট হাটে যোগ দিতে নানা প্রান্ত থেকে দলে দলে মানুষজন আসতে শুরু করেছেন, ফলে জয়ন্তী হয়ে উঠেছে এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান জনপদ। ১৯৩২ আর ১৯৪৭ সাল দুটিও জয়ন্তীর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এই দুই বছরে যথাক্রমে বেঙ্গল লাইম এন্ড স্টোন কোম্পানি ও  জয়ন্তী লাইম কোম্পানি জয়ন্তী থেকে ডলোমাইট তুলবার সরকারি সম্মতি পায়। প্রসঙ্গত ১৯৩৭, ১৯৫০ ও ১৯৫৯ সালে এই অঞ্চলের বহু গর্ভস্থ খনিজ সম্পদ নিয়ে আরও তিনটি  সার্ভে করেছেন এ লাহিড়ী, ডি কে চন্দ্র ও টি কে কুরিয়ান এবং জানা গেছে , জয়ন্তী এই ব্যাপারে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সবকিছু মিলে শিল্পে, চা-চাষে, খনিজ সম্পদ উত্তোলনে জয়ন্তী তখন উত্তরের গর্ব। জয়ন্তীকে ঘিরে স্বপ্ন দেখছেন সবাই। চলছে বিভিন্ন উৎসব। নিয়মিত বসছে যাত্রা থিয়েটারের আসর। শোনা যাচ্ছে রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তীতে কোনও কিশোরের আবৃত্তি। বিরাট দুর্গাপূজায় অংশ নিতে বহু মানুষ ছুটে আসছেন এখানে। কিন্তু অবস্থা পাল্টে গেল কবে যেন। আজকের জয়ন্তী মানে ২৬ মাইল কোর জংগল জিপ্সি সাফারি, পুকুরি পাহাড় এবং তাঁসিগাও নজর মিনার, ভুটিয়াবস্তি ও চুনিয়া জংগল সাফারি, ছোট এবং বড় মহাকাল গুহা। ছোট্ট এই জনপদ দেখলে কে বলবে একসময় এখানে ছিল এত কিছু! অতীতের রেলপথ বন্ধ হয়ে গেছে সেই কবে ১৯৮৬ সালে। মাঝে এই রেলপথ পুনরায় চালুর দাবি উঠেছিল। কিন্তু ১৯৮৩ সালে ব্যাঘ্র প্রকল্পের মর্যাদা পাওয়া বক্সায় এই রেলপথ চালু হওয়া বোধহয় আর সম্ভব নয়। গভীর অরণ্য গ্রাস করেছে লোহার সেই সমান্তরাল লাইনকে। বন্ধ হয়ে গেছে ডলোমাইট তোলা। অধ্যাপক অর্ণব সেন লিখেছেন, 'পাহাড়ে এখানে ডলোমাইটের বিশাল ভান্ডার। তবে ডলোমাইট তোলা নিষিদ্ধ হয়েছে। চুনাভাটির চুন-সংগ্রহও বন্ধ, পড়ে আছে নদীর ওপর পরিতক্ত্য বাংলো। পাথর তোলাও বন্ধ কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে। ১৯৯৩-এর জুলাই মাসে বন্যার দাপটে পাহাড়ের ভেঙে পড়া পাথরে নদীগর্ভ ভরাট হয়ে প্লাবনের আশংকা বাড়িয়ে দিয়েছে।` সত্যি বলতে ১৯৯৩ সালের বিধ্বংসী এই বন্যাই তছনছ করে ফেলেছে প্রাচীন জয়ন্তীকে। ফলে, দেখা যায় না সেদিনের পি ডব্লিউ বাংলো, নদীর ওপর থাকা ব্রিজ। জয়ন্তী নদীর ওপর এই ব্রিজ পার করে একসময় যানবাহন চলত ফাঁসখাওয়া, হাতিপোতা, শামুকতলা। সেই পথ আজ পরিত্যক্ত। আর, পাহাড়ের ভেঙে পড়া পাথর আর ডলোমাইট নদীবক্ষ ভরাট করে তোলায় বিপত্তি হয়েছে দুই ভাবে। নদীতে জলপ্রবাহ এমনিতে দেখা না গেলেও বর্ষাকালে নদী  দুই কূল ছাপাচ্ছে। ফল, বন্যা ও বাসিন্দাদের ঘর ছাড়া হওয়া। এই মুহূর্তে জয়ন্তীর লোকসংখ্যা বারোশোর কাছাকাছি। রেভিনিউ ভিলেজের মর্যাদা পাওয়ার জন্য যা যা থাকা দরকার তার সব থাকা সত্বেও এখনও জয়ন্তী সে মর্যাদা পায় নি। জয়ন্তীর বাসিন্দা অজয় রায় লিখছেন, `রেভিনিউ ভিলেজে পরিণত হতে একটি হাই স্কুল প্রাইমারি স্কুল, প্রাইমারি হেলথ সেন্টার, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, পি ডব্লু ডি . পাকা সড়ক পথ, ৫০০ জনের উপরে ভোটার, পাকা বাড়ি, তিনটের বেশি সরকারি প্রতিষ্ঠান, যাতায়াতের জন্য সরকারি ব্যবস্থা সব কিছু থাকা সত্ত্বেও আজ আমাদের জয়ন্তি গ্রাম রেভিনিউ ভিলেজ-এর আওতায় আসেনি। যদিও এই গ্রামের ২০১৪ পর্যন্ত জুডিশিয়াল লিস্ট (J L number) 45 ছিল। এখন জে এল নম্বর 45 এর পাশে জয়ন্তি গ্রামের নামের পরিবর্তে বক্সা ফরেস্ট (পানবাড়ি খন্ড) হাওয়ায় আমরা আমাদের জমি থেকে পাট্টা থেকে বঞ্চিত এবং অধিকার পাওয়ার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি।`

মহকুমার শিরোপা বক্সাও বেশিদিন ধরে রাখতে পারে নি। ১৮৭৬ সালে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য আলিপুদুয়ারকে বেছে নেওয়া হয়।       
আলিপুরদুয়ার সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাটি হল, এই নামটি এসেছে কর্নেল হেদায়েত আলির নাম অনুসারে। যদিও এই ধারণাটি সঠিক নয় বলে মনে করেন ঐতিহাসিকেরা। আসলে এই ধারণাটি সেটেলমেন্ট অফিসার স্যান্ডারের রিপোর্টার ওপর ভিত্তি করে এসেছিল। ১৮৯৫ সালে তিনি প্রথম উল্লেখ করেন যে, কর্নেল হেদায়েত আলির নাম অনুসারে আলিপুরদুয়ারের নাম রাখা হয়েছে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক খান চৌধুরী আমানতুল্লা আহমেদ এই মতকে সমর্থন করায় হেদায়েত আলির নাম অনুসারে অলিপুদুয়ার তত্ত্বটি জোরদার হয়। ১৮৬৪ সালে কোচবিহার রাজার সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিতে কোচবিহারের তদানীন্তন ব্রিটিশ কমিশনার জেসি হটনের নির্দেশে হেদায়েত আলি কোচবিহারে আসেন। সে বছরই তাঁর নেতৃত্বে কোচবিহার ভুটান যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল এবং ১৮৬৫ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচ ব্রুসকে তিনি যে রিপোর্ট দেন তাতে বেশ কয়েকবার 'আলিপুর' কথাটির উল্লেখ করেন তিনি। যে জায়গার নাম তাঁর নাম অনুসারে রাখা হবে ভবিষ্যতে, সে জায়গার উল্লেখ তাঁর রিপোর্টে থাকবে একথা ভাবা সঠিক হবে না। তাই বলা যেতে পারে যে, আলিপুর নামটি আগে থেকেই ছিল, পরে হয়ত  'দুয়ার` যোগ করা হয় কলকাতার আলিপুরের সঙ্গে তার পার্থক্য বোঝানোর জন্য। প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্র ভুটানের জন্য প্রশাসনিক দিক থেকে আলিপুরদুয়ারের গুরুত্ব সবসময়ই আলাদা। আবার অসম ঠিক পাশে হওয়ায় আলিপুরদুয়ারকে পশ্চিমবঙ্গের গেটওয়েও বলা হয়ে থাকে। আরণ্যক পরিবেশের এই শহর কয়েক দশকে আমূল বদলে গেলেও, এখনও তার গায়ে কসমোপলিটান গন্ধ লেগে রয়েছে। অতীতের সেই কাঠের দোতলা বাড়ির জায়গা পাকা দালান বাড়ি করেছে। কিন্তু শহরের চরিত্র সেভাবে বদলায় নি। শিক্ষা-সংস্কৃতি-কৃষ্টিতে নিঃসন্দেহে আলিপুরদুয়ার উত্তরের গর্ব। 

অন্যদিকে, আলিপুরদুয়ার জেলার আর একটি গর্বের জায়গা হল কুমারগ্রামদুয়ার। রাজধানী কলকাতা থেকে দূরত্বের বিচারে এই রাজ্যের সবচেয়ে দূরের ব্লক হল এটি।  একসময় কোঙাররা ছিলেন এই এলাকার জমিদার। ভুটানরাজ তাঁদের কাঠাম বা বিচারক নিযুক্ত করেন। আসলে কাঠামরা ছিলেন রেভিনিউ এজেন্ট। মনে করা হয় যে, হংসদেব কোঙারের নামে এই এলাকার নাম হয়েছে কুমারগ্রাম। তবে এই বংশে জয়দেব কোঙারও ছিলেন ডাকসাইটে মানুষ। কুমারগ্রামের সঙ্গে দুয়ার বসেছে ভুটানে যাওয়ার অন্যতম দ্বার বোঝাতে। তবে রাজপরিবারের কুমার বা কায়স্থ পরিবারের বসবাস থেকেও কুমারগ্রাম শব্দটি আসবার তত্ত্বকে অস্বীকার করা যায় না। অত্যন্ত সমৃদ্ধ প্রাচীন এই জনপদের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ।  'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের সময় পোয়াতু দাস, দেবেন দাস, অবিনাশ দাস, সুনীল সরকার, দেওয়ান রায় প্রমুখের নেতৃত্বে এই কুমারগ্রাম থানা দখল করে স্বাধীন ভারতের পতাকা তোলা হয়েছিল। শোনা যায় যে, পোয়াতু দাস দারোগার বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লে তিনি বন্দুক নামাতে বাধ্য হন।  তারও আগে অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে কুমারগ্রামে মঘা দেওয়ানি, পশুপতি কোঙারের সরকারি হাট বয়কট করে কুলকুলির হাট স্থাপন, নিঃসন্দেহে সাড়া জাগানো ঘটনা ছিল। মঘা দেওয়ানিকে গ্রেপ্তার করেও জনতার চাপে মুক্তি দিতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রশাসন। আর সেই আন্দোলনে চন্দ্রদীপ সিং ও কুলদীপ সিং নামে দুই পাঞ্জাবি যুবকের ভূমিকা কখনই ভুলবার নয়।  দেশপ্রেমিক সতীন সেনকে বন্দি করা হয়েছিল এখানকার থানায়। স্বাধীনতা পরবর্তীকালেও কুমারগ্রামের চা-বাগানগুলির শ্রমিক আন্দোলন উল্লেখযোগ্য। কুমারগ্রামদুয়ারের থানা কিন্তু অত্যন্ত প্রাচীন। মনে করা হয় যে, লস্ট হরাইজন বা স্যাংগ্রিলা অর্থাৎ ভুটান থেকে নেমে আসা দুর্বৃত্তদের দমন করবার জন্যই এখানে থানা তৈরি করা হয়েছিল। গড়ে তোলা হয়েছিল তহশিল। এই এলাকার জয়দেবপুর, অমরপুর ইত্যাদি নামের মধ্যে অতীতের সেই তহশিলদারের নাম লুকিয়ে রয়েছে। অত্যন্ত প্রাচীন এই জনপদ  থেকে খুব সহজে কালিখোলা হয়ে চলে যাওয়া যায় ভুটানে। রায়ডাক ও সংকোশ নদীর মাঝের এই তরঙ্গায়িত ভূখন্ড অসাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশ, সবুজ চা-বাগান এবং শাল-সেগুন-জারুল-চিকরাশির অরণ্যে সমৃদ্ধ। চা-বাগান, বক্সার গভীর অরণ্য, রায়ডাক-সংকোশ নিয়ে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতার সাক্ষী হওয়া যায় এখানে। কিন্তু টুরিস্টের দৃষ্টিতে নয়, দেখতে হবে ট্রাভেলারের মতো। তবেই মিলবে আসল রস। 

আলিপুরদুয়ার-কুমারগ্রামদুয়ারের অতীত আর বর্তমানকে স্পর্শ করে আবার চলে যাই বক্সা টাইগার রিজার্ভের গেটওয়ে রাজাভাতখাওয়াকে স্পর্শ করে অন্য আর একদিকে। নদী আর অরণ্যের এই জনপদে প্রখ্যাত সাহিত্যিক অমিয়ভূষণ মজুমদারের উদ্বোধন করা 'নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার`, নার্সারি দেখতে দেখতে মনে পড়ে সেই কবে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনকালে এখানেই কোচবিহার-রাজ্ ধৈর্যেন্দ্রনারায়ণ প্রথম অন্নাহার করেন! প্রখ্যাত ঐতিহাসিক খান চৌধুরী আমানাতুল্লা আহমেদ বলছেন, 'রাজাভাতখাওয়ার অদূরে চেকখাতা অবস্থিত ছিল। চেকখাতায কোচবিহার ও ভুটানরাজের যে বার্ষিক ভোজের অনুষ্ঠান হইত, সেই ভোজের স্থান হইতে রাজাভাতখাওয়ার নাম সৃষ্ট হইয়া থাকিবে`(A HISTORY OF COOCHBEHAR IN BENGALI, PART 1) আজ অবশ্য অরণ্যের রেখা, কখনো ভেসে আসা হাতি বা অন্য পশু ও ঝিঁঝির ডাক, জনজাতি ও অপার নির্জনতা ও শান্তি মিলে রাজাভাতখাওয়া অনাবিল প্রশান্তির জায়গা। এখান থেকেই  ডিমা নদী পার হয়ে চলে আসি কালচিনিতে। ১৮৯০ সালে এখানেই এসেছিলেন আর জি. শ. এন্ড কোম্পানি।  নিয়েছিলেন  ৩০০০ একর জমি লিজ হিসেবে।  প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বক্সা ডুয়ার্স টি কোম্পানি। সেই কোম্পানির এক শাখা অফিস খোলা হয়েছিল কালচিনিতে। শুরু হয়েছিল চা-বাগান প্রতিষ্ঠা। জন্ম নিয়েছিল  কালজানি, রায়মাটাং ও চিনচুলা নামের তিনটি চা-বাগান। প্রাবন্ধিক সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, 'বক্সা ডুয়ার্স টি কোম্পানি লিমিটেডের পরিধি বিস্তৃত ছিল পশ্চিমে কালজানি নদী পর্যন্ত, পূর্বে গাঙ্গুটিয়া ফরেস্ট রেঞ্জ, উত্তরে মেচপাড়া ও ভাটপাড়ার চা-বাগিচার সীমানা পর্যন্ত এবং দক্ষিণে নিমতি ফরেস্ট রেঞ্জ পর্যন্ত।`

এই সীমানা বিন্যাস থেকেই কিন্তু পরিষ্কার যে, কালচিনি ছিল সেই সময় ঘন জঙ্গলে ঢাকা। চা-বাগানকে কেন্দ্র করেই সেখানে জনসমাগম হয়েছিল। ইউরোপিয়ান ও নানা বর্ণের ভারতীয় মিলে কালচিনি সেই অতীতেই নিয়েছিল কসমোপলিটান চেহারা, যা আজও বিদ্যমান। তবে কালচিনির গুরুত্ব বাড়ে ১৯১৪ সালের পর। কেননা ইস্টার্ন রেলের মিটার গেজ লাইন এই সময় রাজাভাতখাওয়া থেকে সম্প্রসারিত হয় দলসিংপাড়া অবধি। তখন কালচিনির স্টেশনটি কালচিনি হল্ট স্টেশন নাম পরিচিতি পেলেও, পরবর্তীতে ইঞ্জিনিয়ার হ্যামিল্টনের নামানুসারে হ্যামিল্টনগঞ্জ রাখা হয়। ডুয়ার্সে চা-বাগান প্রতিষ্ঠার দিনগুলি থেকে কালচিনি কোথায় যেন একটু হলেও আলাদা। শুধু অসামান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য নয়, কালচিনির চরিত্রেই রয়েছে ভিন্ন স্বাদ। একদা পশ্চিম ডুয়ার্সের অলিখিত রাজধানী এই ছোট্ট জনপদটি ছিল শিক্ষা-সংস্কৃতিতে অনন্য। তাকে দেখে ঈর্ষা করত অন্যেরা। চা-বাগান পত্তন করতে এসে ইউরোপিয়ানরাও বোধহয় কালচিনির প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। তাই চেষ্টা করেছিলেন নিজেদের মতো চা-শহরটিকে সাজিয়ে তুলতে। তাই এখনও সন্ধানী চোখ কালচিনিতে খুঁজে ইউরোপিয়ান স্থাপত্য বা পরিবেশের ভগ্ন চিহ্ন। তবে এই ভগ্নদশার মধ্যেও  কাজিমান গোলের সংগ্রহশালা অনবদ্য। তামাং সম্প্রদায়ের সামান্য শ্রমিক কাজিমান গোলে কালচিনির এক পরম বিস্ময়। ভুলতে বসা তামাং সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন তিনি। জনপ্রিয় করেছেন তামাংদের বাকপা নৃত্যশৈলীকে। লিখেছেন কবিতা, গান। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কালচিনির উন্নয়নে কাজ করে গেছেন সমাজের তথাকথিত বিত্তশালীদের সঙ্গে। তাঁর সংগ্রহশালায় রয়েছে দুশো বছরের পুরোনো 'মাদানি' বা ঘি জমাবার কাঠের পাত্র, মানুষের হাড় দিয়ে তৈরী বিশেষ ধরণের বাঁশি 'কাংলিং' বা তামাং গোষ্ঠীর লামাদের খাবারের বিশেষ পাত্র 'ফুরু'। রয়েছে অজস্র মুখোশ, প্রাচীন মুদ্রা, ডুয়ার্সের জনজাতি গোষ্ঠীর ব্যবহৃত বেশভূষা, বাদ্যযন্ত্র, পুঁথি, ছবি ইত্যাদি। 

কালচিনি-হাসিমারার জনপদ, চা-বাগান ছাড়ালে, খরস্রোতা তোর্ষা তীর থেকে ঘন অরণ্যের ছায়া শীতল করে তোলে পরিশ্রান্ত মনকে। আসলে ইতিহাসের যাত্রা পথে দেখার ও জানার এত বিষয় যে সময় যেমন লাগে, তেমনি ধৈর্যও ধরতে হয়। তাই মাদারিহাটে এসে বিশ্রাম নিতেই হচ্ছে।আসলে জিরিয়ে নেওয়ার জন্য এই জনপদের জুড়ি মেলা ভার। মাদারিহাট ৩৮০.৯৬ বর্গ কিমির ব্লক হলেও, জনসংখ্যার দিক থেকে বেশ কিছুটা পিছিয়ে। খুব স্বাভাবিক সেটি। কেননা এই ব্লকের অনেকটাই ডুয়ার্সের সবুজ অরণ্যে ঢাকা। তার মধ্যে রয়েছে ভুবনবিখ্যাত জলদাপাড়া অভয়ারণ্য। একশৃঙ্গ গন্ডারের আবাসভূমি জলদাপাড়ার ৯৯.৫১ বর্গ কিমি  বক্সা বন বিভাগের অধীনে, ১৯৪১ সালে, গেম স্যাংচুয়ারির মর্যাদা পায়। একশৃঙ্গ গণ্ডারকে তখন থেকেই সংরক্ষণের জন্য আইন করা হয়েছিল। ১৯৫১ সালে বনবিভাগের কোচবিহার ডিভিশন তৈরী হলে জলদাপাড়া সেই ডিভিশনের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৭৬ সালে অরণ্যের বৃদ্ধি হয়  ১১৫.৫৩ বর্গ কিমি পর্যন্ত।  ১৯৯০ সালে আরও ১০০ বর্গ কিমি নেওয়া হয়। ২০১২ সালে জলদাপাড়া ন্যাশনাল  পার্ক হিসেবে ঘোষিত হয়। ২০১৯ সালের গণনায় জলদাপাড়া ও লাটাগুড়ি মিলে পশ্চিমবঙ্গে ২৮৯টি গন্ডার রয়েছে , সারা পৃথিবীতে এই সংখ্যাটি ৩৫৫০। মাদারিহাট সংলগ্ন  জলদাপাড়ার পাললিক তৃণভূমি ও নদী বনভূমি জি আই ও এইচ প্রজাতির গন্ডারের জন্য আদর্শ বলে, জলদাপাড়ায় গন্ডারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২১৬ বর্গকিমির এই বনভূমির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত তোর্ষা, মালঙ্গী, সলং, চিড়াখাওয়া, শিশামারা, ভালুকা, বুড়ি তোর্ষা। রয়েছে হাতি, হরিণ, হগ ডিয়ার, বাইসনের মতো প্রাণী, ক্রেইত, কোবরা, পাইথনের মতো সরীসৃপ। জলদাপাড়ায় দেখা যায় হর্নবিল, ক্রেস্টেড ঈগল, ফ্লোরিক্যান, কাঠঠোকরা, ময়ূর ইত্যাদি প্রায় ২৪০ প্রজাতির পাখি। বিভিন্ন দিক থেকে প্রবেশ করা যায় এই বনাঞ্চলে। তবে মাদারিহাট দিয়ে হলং টুরিস্ট লজে পৌঁছনোটাই রেওয়াজ। অন্যদিকে পূর্ব জলদাপাড়া দেখতেও আজকাল শালকুমার অঞ্চলে ভিড় জমাচ্ছেন পর্যটকেরা। বিশেষ করে শালকুমারের দিক থেকে প্রবেশ করে, শিশামারা নদী ও তার পার্শ্ববর্তী অরণ্যভূমি দেখা যেন 'ভার্জিন স্পট'কে প্রত্যক্ষ  করা। এখানে প্রায়শই দেখতে পাওয়া যায় অরণ্যচারীরা হাতি, বাইসন, গন্ডারদের। জলদাপাড়ার পশ্চিমে খয়েরবাড়িও অফবিট একটি জায়গা। মাদারিহাট থেকে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দশ-বারো কিমির বনপথে দক্ষিণ খায়েরবাড়ি চলা এক অসামান্য অভিজ্ঞতা। যদিও হাতি-সহ অন্য বন্যপ্রাণের জন্য মাদারিহাট-ফালাকাটা রাজ্যসড়ক পথটি  সুরক্ষিত। জলদাপাড়ার দক্ষিণেই রয়েছে কুঞ্জনগর নামের ছিমছাম নেচার পার্কটি। অবশ্য কুঞ্জনগর ও দক্ষিণ খয়েরবাড়ি ফালাকাটার কাছাকাছি বলে, ফালাকাটা থেকে যাওয়াই সুবিধে। জলদাপাড়ায় এলিফ্যান্ট সাফারি বা কার সাফারিতে দেখা যায় গন্ডার-সহ নানা প্রাণী। হলং টুরিস্ট লজের সামনের ঝোরায় রাতের বেলায় জল খেতে আসে নানা প্রাণী। চাঁদনী রাতে জলদাপাড়া যে সুন্দর রূপোলি পোশাক পরে তাতে এক অনির্বচনীয় অপার্থিব আনন্দে তিরতির করে সমস্ত মনপ্রাণ। 

মাদারিহাট কিন্তু আলিপুরদুয়ার জেলার একদম ভরকেন্দ্রে যেন! এখান থেকে ডুয়ার্সের সব কিছুই যেন হাতের নাগালে। জগৎবিখ্যাত টোটোপাড়ার দূরত্ব ২৫কিমি। হাসিমারা হয়ে ভুটানের ফুন্টশেলিংও ৩০কিমি। একদিকে ফালাকাটা ২৪কিমি, অন্যদিকে বীরপাড়াও খুব কাছে। বীরপাড়া পথে সামান্য এগোতে রাঙালিবাজনা বা শিশুবাড়ি থেকে উত্তরমুখী ডান দিকের পথে, উত্তরের পর্যটন মানচিত্রে রহস্যময় বলে পরিচিত মুজনাই নদী ও চা-বাগান। অবশ্য মাদারিহাট টোটোপাড়া পথে বাঙ্গাবাড়ি থেকেও আসা যায় এখানে। চা-বাগানটি অত্যন্ত প্রাচীন। সম্ভবত এই চা-বাগানের চা অন্যত্র পাঠানোর জন্য ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ ডুয়ার্স রেলওয়ের সম্প্রসারণের সময় শিশুবাড়িতে যে স্টেশন তৈরী করা হয়, তার নাম দেওয়া হয় মুজনাই। উঁচু টিলার ওপর অবস্থিত এই চা-বাগানটি চা-বলয়ে বিশেষভাবে পরিচিত ক্রমাগত তার মালিকানা হাতবদলের জন্য। মুজনাই চা-বাগানের কুলি লাইন পার করে, উঁচু টিলার ঠিক পাশেই, রয়েছে বেশ কিছু প্রস্রবণ। মাটির তলা থেকে অনবরত বেরিয়ে আসা জল স্থানীয় মানুষদের যেমন জলের উৎস, তেমনি জলঢাকার প্রধান উপনদী মুজনাইও এই জলেই সারা বছর পুষ্ট। মুজনাইয়ের উৎস নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, নিঃসন্দেহে এই কথা বলা যায় যে, এই প্রস্রবণগুলির জল মুজনাইকে সারা বছর জলের যোগান দেয়। একথা জোর দিয়ে বলা যায়, কেননা মুজনাই চা-বাগান বা টোটোপাড়া যেতে আজও এমন কিছু নদী পার হতে হয় যেগুলি সারা বছর জলহীন শুকনো খাত ছাড়া আর কিছু নয়। শুখা নদী নামেও এদের পরিচয় রয়েছে। মুজনাইয়ের যাত্রাপথে পরবর্তীতে কিছু নামহীন প্রবাহ ও অন্যান্য ছোট নদী অঙ্গীকৃত হলেও প্রাথমিক জলের উৎস কিন্তু এই প্রস্রবণগুলি। ডুয়ার্সের আরও কিছু জায়গায় এরকম প্রস্রবণ দেখা যায়, যেগুলি ছোট ছোট নদীর স্মৃতি করেছে। দুর্ভাগ্য আমাদের যে, এখনও সে সমস্ত প্রস্রবণ ও নদীগুলি নিয়ে সেভাবে কোনও সমীক্ষা হল না। মুজনাইকে রহস্যময় বলা হয়ে থাকে এই কারণেই। আবার এক সময়ে ঘড়িয়ালের কিংবা বর্তমানেও বাতাগুড় বাসকা নামের বিরল প্রজাতির কচ্ছপের উপস্থিতিও এই নদীকে আর পাঁচটা নদীর থেকে আলাদা করেছে। প্রস্রবণের পাশেই টিলার ওপর রয়েছে শিবমন্দির। ফেব্রুয়ারি মাসে মন্দির ঘিরে বিরাট মেলাটিও এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। সত্যি বলতে মুজনাইয়ের যাত্রাপথে বিভিন্ন স্থানে শিব বা মহাকালের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। এই নদীর খুব কাছে জটেশ্বর জায়গাটির নামের মধ্যেই যেমন মহাদেবকে পাওয়া যায়, তেমনি এখানকার প্রাচীন মন্দির বা ফালাকাটায় নদীর তীরে মহাকাল মন্দির সবই যেন একটি দিক নির্দেশ করে যে, এই নদী যেন মহাদেবের একান্তই  নিজস্ব। মাদারিহাট থেকে রাঙালিবাজনা পার করে মুজনাই যেতে পথের দুধারে যে মানুষদের দেখা যায় তারাও অনেকেই শৈব ধর্মে বিশ্বাসী। সব মিলে মুজনাইয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর রহস্যময়তা আজকের মাদারিহাটকে অন্য পরিচয় দিচ্ছে। একসময় মুজনাই থেকে মাদারিহাট সড়ক পথে মোটর যোগাযোগ ছিল। খুব কাছের রাঙালিবাজনায় ১৯৪৮ সালে হীরালাল ভগতের দান করা জমিতে প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব  মোহন সিং-এর নামে গড়ে উঠেছিল বিদ্যালয়। অন্যদিকে মাদারিহাটে ১৯৬০ সালে  প্রতিষ্ঠিত হয় উচ্চ বিদ্যালয়। একসময় কমলালেবুর বিরাট বাজার বসত এখানে। বিশেষ করে টোটোপাড়া থেকে প্রচুর পরিমান কমলালেবু আসত সেই বাজারে। ওয়েস্টার্ন ডুয়ার্স ফান্ড মার্কেট ছিল বিক্রির জায়গা এবং তা স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে এই জনপদ ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছিল। বাড়তে শুরু করেছিল জনসংখ্যা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আজ একটি অত্যন্ত পরিচিত নামে এই জায়গাটি।  একটা সময় প্রখ্যাত লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি কিশোর উপন্যাসে এখানে গল্পের ক্লাইম্যাক্স ঘটেছিল। উপন্যাসের ছোট্ট ছেলেটি স্বপ্ন দেখেছিল যে, ব্যাংক ডাকাতের গুলিতে নিহত দ্বাররক্ষী তাকে বলছে, সেই দুষ্কৃতীরা 'মা দাঁড়িয়ে' নামের কোনো একটি জায়গায় লুকিয়ে রয়েছে। পরবর্তীতে সেই ব্যাংক ডাকাতদের ধরা হয় উত্তরের বিখ্যাত 'মাদারিহাট' থেকে। লেখকের কল্পনায় স্থানটির নাম 'মা দাঁড়িয়ে' থেকে এলেও, স্থাননামের ইতিহাস অবশ্য বলছে অন্য কথা। একসময় মাদারী সম্প্রদায়ের মানুষদের দেখা যেত এই অঞ্চলে। ফকির সুফি সম্প্রদায়ের এই মানুষেরা নানা ধরণের খেলা দেখাতেন। সম্ভবত তার থেকেই নামটি এসে থাকবে। আবার মাদার গাছ বা মন্দার গাছ থেকেও স্থানটির নাম এসে থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। ওয়েস্টার্ন ডুয়ার্সের ফান্ড মার্কেট তৈরী হওয়ার আগে থেকে এই অঞ্চলে মাদার বা মন্দার গাছের নিচে বসা হাট থেকে আজকের মাদারিহাট- এই তথ্যটিও গুরুত্বপূর্ণ। যতই মহাকবি বলুন না কেন 'নামে কী এসে যায়', অন্তত স্থাননামের পেছনে লুকিয়ে থাকে কোনও না কোনও ইতিহাস। ডুয়ার্সের খাসতালুক মাদারিহাট সেটাই যেন প্রমাণ করছে। শুধু মাদারিহাট কেন, কাছের রাঙ্গালিবাজনার নামের পেছনে রয়েছে জোতদার রাঙ্গালি মেচের নাম। মেচ সম্প্রদায়ের জাঁকজমক বোঝাতে বাজনা শব্দটি যুক্ত হয়েছে। সংলগ্ন পৃথিবীবিখ্যাত জলদাপাড়ার নামও এসেছে প্রাচীন জলদা গোষ্ঠীর মানুষদের থেকে। কালের নিয়মে তারা আজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লেও একসময় তাদের আধিপত্য ছিল এই অঞ্চলে। একইভাবে টোটোপাড়ার পেছনে আছে টোটো সম্প্রদায়ের মানুষদের বাসস্থানের কথা।

টোটোপাড়ার পথে, হান্টাপাড়া পার হতেই উত্তরে দেখা গেল হিসপা-কে। আর পশ্চিমে চোখ ফেরাতে নজরে এল পদুয়া। অবশ্য এখান থেকেও গন্তব্য একেবারে কম দূর নয়। দাম্পি আর দ প্রুঙকে দেখতে হলে অবশ্য এখনও চলতে হবে আরও খানিকটা পথ। এমনিতে  বল্লালগুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত দপ্তর অবধি রাস্তা এখন ঝকঝকে কালো পিচের। তারপর পাথুরে ধুলো মাখা পথে আরও গেলে অবশেষে তাদিং পাহাড়ের কোলে বিস্ময়কর ছোট্ট সেই জনপদ। পদুয়া আর হিসপা পাহাড় দুটি এখানকার মূল বাসিন্দাদের কাছে দেবতার মত পবিত্র। চারপাশের এই পাহাড়গুলি থেকেই নেমে এসেছে  দাতিঙতি, হাউড়ি, কাংদুতি, দীপ্তি, চুয়াতি, নিটিংটি, জৈপ্তি, গোয়াতি, নামতিতি ও মুটি নামের ঝোরাগুলি। আপাত শান্ত এই ঝোরাগুলিই বর্ষায় আকুলিবিকুলি করে চারপাশ এমন ভাসায় যে, প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এই ছোট্ট গ্রামটি! সমগ্র ডুয়ার্স এত সুন্দর যে, আলাদা করে এই জনপদের  প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ণনা করবার প্রয়োজন হয় না। আর সত্যি বলতে, প্রকৃতিপ্রদত্ত রূপমাধুরীর জন্য নয়, এই জনপদের পরিচিতি তার বাসিন্দাদের জন্য।  অবশ্য পাকদন্ডী রাস্তা, হাউড়ি-তিতি-তোর্ষা নদী, দিনের বেলায় ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাকের ছমছমে জঙ্গল, অদূরের ভুটান পাহাড়, সাপ্তাহিক হাটে রঙচঙে মানুষজন এবং সুপারি আর কমলালেবু বাগান ঘেরা জনপদটির টান প্রবল। সঙ্গে আছেন এখানকার এখানকার মানুষেরা যাদের জন্য  সেই কবে থেকে ছুটে আসছেন পন্ডিত ব্যক্তি যেমন, তেমনি আসছেন আমার মতো অর্বাচীন মানুষেরাও। মাদারিহাট ব্লকের টোটোপাড়ার এমনই! আশির দশকে প্রথম যখন যাই সেখানে, তখন পথঘাট ছিল দুরূহ। ঝাঁকুনিতে শরীরের কলকব্জা খুলে আসার উপক্রম হত প্রায়!  টোটোপাড়ার  আরণ্যক পরিবেশে তখন আক্ষরিক অর্থেই গা ছমছম করত। মাদারিহাট থেকে চব্বিশ কিমির সম্পূর্ণ রাস্তা ছিল পাথুরে। যোগাযোগের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া সেভাবে কিছুই ছিল না। দেখা যেত পান সুপুরি চিবোতে থাকা স্থানীয় মানুষদের। তাদের চোখে সমতলের মানুষদের জন্য লেগে থাকত বিস্ময়। অবশ্য এমনটা নয় যে, তারা সমতলের মানুষদের দেখেন নি। বহুদিন আগেই তাদের আবিষ্কার করেছিলেন ইংরেজরা। তবু নিজের মনে প্রশ্ন জাগে যে, ১৮৯০ সালে যখন সান্ডার সাহেব জমি জরিপ করছিলেন তখন তিনি জানতেনই না কী আবিষ্কার করতে যাচ্ছেন!

মনে করা হয় যে, লুপ্তপ্রায় জনজাতি টোটোরা একসময় ভুটান-রাজের মালবাহকের কাজ করত। ভারবহনের সূত্র ধরেই তারা জলপাইগুড়ির বিভিন্ন জায়গায় বসতি স্থাপন করে। ভারত-ভুটান যুদ্ধে ভুটানের পরাজয় হলে বিভিন্ন গ্রামে বসবাসকারী টোটোরা ভুটানের নানা জায়গায় আশ্রয় নিলেও, টোটোপাড়ার টোটোরা সম্ভবত বিভ্রান্ত হয়ে নিজেদের গ্রামে থেকে যান। কেননা তারা ভেবেছিলেন তাদের গ্রামটি ভুটানের অন্তর্ভুক্ত। সে ভুল ধরা পড়ে একসময়। এই ছোট্ট গ্রামটি ভারতের বলেই পরিচিতি পায় ও টোটোরা ভারতীয় হিসেবে গণ্য হন। তথ্য বলছে যে, ১৮৮৯ সালে যে টোটোদের সান্ডার সাহেব দেখেছিলেন, তার দেখা টোটোরা, টোটোপাড়ায় সাত-আট পুরুষ আগে এসেছিলেন। ঐতিহাসিকরা বলছেন যে, তারও আগে মালবাজারের টটগাওঁ, আলিপুদুয়ারের টটপাড়া ইত্যাদি জায়গায় টোটোদের বসতি ছিল। অনেকের মতে, কোচ রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে তারা ভুটান পাহাড়ের পাদদেশে এই অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আবার 'ডয়া' নামের এক ভুটানি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের যুদ্ধবিগ্রহ তাদেরকে আজকের জায়গায় নিয়ে এসেছিল বলেও অনেকের অনুমান। কারণ যেটাই হোক, আজকের টোটোপাড়া কিন্তু জগৎবিখ্যাত একটিই কারণে আর সেটা হল এখানকার মানুষেরা। পশ্চিমবঙ্গের ৪০টি উপজাতি ও ৩টি আদিম সম্প্রদায়ের মধ্যে টোটোরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে চিহ্নিত এবং তাদের হাত ধরেই টোটোপাড়া বিশ্বজগতে স্থান করে নিয়েছে। আজকের টোটোপাড়া দুমসি গাওঁ, পূজা গাওঁ, মিত্র গাওঁ, সুব্বা গাওঁ, মন্ডল গাওঁ ও পঞ্চায়েত গাওঁ নিয়ে গঠিত। এবাদেও হাউরি লাইন, হাসপাতাল লাইন, চানবা লাইন, স্কুল লাইন, পরগাওঁ, পাখাগাওঁ, তাদিং ইত্যাদি ভাগেও ভাগ হয়েছে টোটোপাড়া। টোটো সম্প্রদায়ের নামের বিবর্তন হিসেবে বলা হয় যে, জেপাঙ থেকে এই শব্দের সৃষ্টি। জেপাঙ থেকে জিতেন - টোটাভি- টোটা - টোটো এভাবেই বিবর্তিত হয়েছে শব্দটি।        

একসময় টোটোপাড়া সন্নিহিত পাহাড়ে কমলালেবুর ফলন ছিল চোখে পড়ার মতো। এখানকার মানুষদের মূল জীবিকাই ছিল কমলালেবু সংগ্রহ করা। পঁয়তিরিশ-চল্লিশ বছর আগেও টোটোপাড়ার অর্থনীতি কমলালেবুকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হত। সমতল থেকে ব্যবসায়ীরা এসে সেই কমলালেবু কিনে নিয়ে যেতেন। শোনা যায় যে, তারও বহু আগে ইংরেজ আমলে, একটি দুটি সিগারেটের বিনিময়েও নাকি বানিয়া ইংরেজ সংগ্রহ করত ডুয়ার্সের সুস্বাদু কমলালেবু। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, আজ আর কমলালেবু বাগান নেই। ফলে, টোটোপাড়ার অর্থনীতির অভিমুখ আজ বদলে গেছে। কিছুদিন আগেও সেই অর্থনীতিতে এখানকার মাটিতে জন্মানো স্বাভাবিক বাঁশ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিত। কিন্তু কমলালেবুর মতো সেখানেও অজানা রোগ হানা দিয়ে ফলন বন্ধ করেছে। ফলে আজকের টোটোপাড়ার বাসিন্দাদের মূল কাজ কৃষিকাজ এবং এই কৃষিতে সুপারির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এখানকার মাটিতে সুপারির অধিক ফলন হেতু এখানে প্রচুর পরিমানে সুপারি চাষ হয়। 

নব্বইয়ের দশকের শেষেও কিন্তু টোটোপাড়ার চেহারা ছিল আলাদা। আজকের মতো এত সংখ্যক বাড়িঘর ও মানুষজনের দেখা পাওয়া যেত না সেখানে। আজ প্রায় ৫০০০ লোকের বাস টোটোপাড়ায়।  অসমর্থিত সূত্র অনুসারেএই জনসংখ্যার মধ্যে ১৬০৩ হলেন টোটো সম্প্রদায়ভুক্ত। আদিবাসী সম্প্রদায়ের অতীতের সেই সামাজিক জীবনেও এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে। টোটোদের নামকরণে বাংলা, নেপালি শব্দের প্রয়োগ তার প্রমান। এখন শুধু নিজেদের মধ্যেই নয়, তাদের বিয়ে হচ্ছে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গেও। পরিবর্তিত পরিস্থিতি তাদের জীবনে বদল আনলেও এখনও টোটো সম্প্রদায় ১৩টি গোত্রে বিভক্ত- বঙ্গবি-বে, বৌদুবি-বে , বুদুবি-বে, নুরিং -চানকোবে, দিড়িঙ -চানকোবে, পিশু - চানকোবে, নুবি-বে, রেংকাই জি-বে, দাংকোবে, দাংত্র বি, মাংকোবি, মাংত্র বি, মাং-চি-বি। স্বগোত্রে বিয়ে সাধারণত দেখা যায় না টোটো সমাজে। বিয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত উদার হলেও, নিজের গোষ্ঠী ছাড়া অন্য সম্প্রদায়ে বিয়ে করতে হলে, প্রায়শ্চিত্তের প্রয়োজন রয়েছে টোটো সমাজে। অনেক সময় সন্তান আসবার পরেও বিয়ের অনুষ্ঠান চলে 'বিয়ো পং-পেওয়া'-এর মাধ্যমে। কিন্তু বিবাহিত দম্পতির কেউই বিচ্ছেদ  ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন না। বিয়ের পর নবদম্পতির জন্য আলাদা ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়। 

টোটোদের বাসগৃহ নির্মাণেও বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে।  বাঁশ বা কাঠের খুঁটির ওপরে খড়ের দোচালা ছাউনি দিয়ে তাদের ঘর নির্মিত হয়। তাদের ভাষায় এই ঘরের নাম হল 'না কে শা'। ঘরে প্রবেশের জন্য একটি মাত্র দরজা বা 'লাপুঙ' থাকে। সাধারণত মাটি থেকে পাঁচ-সাত ফুট উচ্চতায় ঘরের মেঝে তৈরী করা হয়। দরজার সামনে থাকে উন্মুক্ত বারান্দা, মেঝের উচ্চতার চাইতে সামান্য নিচে। 'কাইবু' বা খাঁজ কাটা গাছের গুড়ি ব্যবহার করা হয় বাড়িতে প্রবেশের জন্য। ঘরের ভেতর থাকে 'চি মা' বা গৃহদেবতার জন্য নির্দিষ্ট স্থান। তাছাড়াও রান্নার জায়গা বা 'মে-রিং', শোওয়ার ঘর বা 'সিরি', অতিথির জায়গা বা 'দেইচি কো সিরি', বাড়ির তলায় চলে পশুপ্রতিপালন। বারান্দা শুধুমাত্র আপ্যায়নের জন্য নয়, সাংসারিক সব কাজই চলে সেখানে। তবে আজকের টোটোপাড়ায়  'না কে শা' পাওয়া মুশকিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টোটোদের চিরাচরিত বাড়িও পাল্টে গেছে, লেগেছে আধুনিকতার স্পর্শ। এখন অধিকাংশ টোটো পরিবার পাকা দালানবাড়িতে থাকতেই অভ্যস্ত। সাবেক সেই বাড়ির অভাব টোটোপা ড়ার চেহারা সামান্য হলেও বদলে দিয়েছে। তবে কে না জানে যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন অত্যন্ত স্বাভাবিক। 

ঘরের ভেতর সাধারণত চই সুন, জিরং কোবে, সংকা মংকা পূজা হয়ে থাকে। সাতরিং, জিদিং, কুংরি, বারাইগোরি নুচে, পাদুওয়া (পাহাড় পুজো), তোর্ষা মেরে মধি, লাপু ভিন্তি, দাংতেনতি-হইনতি (নদীপূজো), বিরকো চইসুন, পকিংসওয়া (পাথরের পুজো) ইত্যাদি পুজো বাইরে হয়ে থাকে। টোটো সমাজের পুজোয় বলিপ্রথা রয়েছে আজও , তবে নব্যশিক্ষিত টোটো যুবকদের অনেকের সঙ্গেই কথা বলে মনে হয়েছে যে, তারা এই প্রথার বিরোধী। কিন্তু দীর্ঘদিনের সংস্কার ও প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতে একটু সময় লাগে বৈ কী! অত্যন্ত ধর্মভীরু টোটো সমাজে সারাবছর পুজোপার্বন লেগেই থাকে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে, তাদের মন্দিরে কোনও বিগ্রহ থাকে না। আসলে তারা প্রকৃতির পূজারী। আকাশ, পাহাড়, নদী ,গাছ, ভূমি ইত্যাদি তাদের উপাস্য। 'ঈশপা' হলেন টোটোদের প্রধান দেবতা। পুরুষ রূপে তিনি মহাকাল ও নারী রূপে মহাকালী বা সইনঝানি। টোটো সমাজে 'মইনাঙ্গ' বা 'পিদুয়া' নামের দেবতা বা অপদেবতাও রয়েছে। টোটোদের পুজোয় প্রধান পুরোহিত বা  'দেবপাও' বা 'কাইজি' এবং তার সহকারী 'দেওসী'-এর ভূমিকা বিরাট। টোটোদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের নাম হল 'ওমচু' ও  'ময়ূ' এবং এই দুটি পুজোই  ঈশপার উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকে। তবে তাদের পুজোয় মূর্তি দেখা যায় না, চিগাইমু এবং মুগাইমু নামের দুটি বড় বড় ঢোলকে তারা মহাকাল ও মহাকালীর প্রতীক হিসেবে পুজো করে থাকে। ওমচু পুজোর সময় কাল এখন পাঁচদিন থেকে তিনদিনে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। জুলাই মাসের শেষে বা অগাস্টের শুরুতে ওমচু পুজোর ২২ দিন পর ময়ূ পুজো হয়ে থাকে। ময়ূ পুজোর পরিধিও এখন ৯দিন থেকে ৫দিনে আনা হয়েছে। বাদ পড়েছে গরু বলির মতো প্রথাও। ধর্মীয় উৎসব ও সমাজ পরিচালনার জন্য কাইজি (পুরোহিত), গাপ্পু (মোড়ল), পাও (ওঝা), নামপনের  (সংগঠক) ভূমিকা মেনে নেওয়া হয়েছে। 

টোটোদের খাদ্যাভাসেও এখন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চাল বা ভুট্টার ভাত, ডাল,সবজি এখন প্রধান খাদ্য হিসেবে পরিগণিত। চলে লবন চা বা 'না চাসিং'। আটা, মারুয়ার রুটির পাশাপাশি দাঙনিং, কাইরিং, বুরিং, দুরিং, ডাকানি, লিসু , সতেই, লাকা, লাইরা ইত্যাদি পাহাড়ি ও জংলী আলু সংগ্রহ করা হয়। মাছ-মাংসও টোটো সমাজে বিশেভাবে আদৃত। 'চরুসাই' নামের শাকও তাদের খুব প্রিয়। আর রয়েছে টোটোদের নিজস্ব পানীয় ইউ। সাধারণত মারুয়া ও কাউন থেকে ইউ তৈরী করা হয়ে থাকে। বলা যেতে পারে যে, ইউ হল টোটোদের সর্বক্ষণের পানীয়। সঙ্গে থাকে পান ও সুপুরি। রয়েছে ধূমপানের অভ্যেস। তবে আজকাল তামাক পাতা মুড়িয়ে নলের মধ্যে ঢুকিয়ে ধূমপানের চিত্র বিরল হয়ে এসেছে। বয়স্ক কিছু মানুষের মধ্যে এই অভ্যেস দেখা গেলেও, আধুনিক সময়ের টোটোদের পছন্দ বাজার চলতি প্যাকেটের সিগারেট। ঝুম চাষের রীতি পাল্টে যাওয়ার জন্য অতীতের খাদ্য আজ লুপ্ত হতে বসেছে। তবে এখনও শূকর-মাংস অত্যন্ত চালু। টোটোপাড়ার চারপাশের নদীতে মাছের সংখ্যা কমে আসায় বাজারের মাছের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে টোটো সম্প্রদায়। 

আজও টোটোপাড়ায় বিনোদনের জন্য বিদ্যালয়ে সদ্য নির্মিত অডিটোরিয়াম ছাড়া আর কোনও ধরণের প্রেক্ষাগৃহ দেখা যায় না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তথ্যের কোনও বিনোদন নেই। প্রতিটি আদিবাসী সমাজের মতোই ততসমাজ নৃত্য গীতে পটু। টোটো ভাষা জানলে বা বুঝতে পারলে লক্ষ্য করা যায় যে, তাদের গানে সমাজচিত্র থেকে শুরু করে অতীত ইতিহাস ফুটে ওঠে। গানে বলা হয় শিকারের কথা, ধর্মের কথা। আবার নারী-পুরুষের পারস্পরিক মন দেওয়া নেওয়ার কথাও তথ্যের গানে লিপিবদ্ধ। টোটোদের গানের একটি গুরুত্বপূর্ণ গান হল 'লেতিগেহুয়া' বা স্বপ্নদ্রষ্টাদের গান। কোনও সাধারণ টোটো এই গান গাইতে পারে না, এই গান গাইবার অধিকারী ইয়ং টং রাই, যিনি স্বপ্নের মাধ্যমে দেবতার আদেশ পান এবং গান বাঁধেন। ধর্মীয় সংগীত হলেও এই গানে জীবনের কথাই ফুটে ওঠে। গানের পাশাপাশি টোটো নৃত্যও কিন্তু অসাধারণ। যদিও আজ 'চি চি পাওয়া' বা মহিলাদের নৃত্যের মতো বেশ কিছু নাচ বিলুপ্ত হয়ে গেছে তবু টুং টুং গামু, দৈতাপা, সেংজা, পেলা হো ইত্যাদি নাচগুলি দেখা যায়। সেংজা ছাড়া বাকি সব নাচেই শুধুমাত্র পুরুষদের দেখা যায়।    

অতীতের সেই টোটোপাড়ার আমূল বদল না হলেও, পরিবর্তন তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। পর্যটনের সুযোগ রয়েছে বুঝে টোটোপাড়ায় এখন পিকনিক স্পটও দেখা যায় পাহাড়ের ওপরে। টোটোপাড়া যাওয়ার পথে সরকারি পর্যটক আবাস যেমন রয়েছে তেমনি কিছু হোম স্টে তৈরি হয়েছে। সরকারি পর্যটক আবাসটি থেকে লঙ্কাপাড়া, হান্টাপাড়া, টোটোপাড়ার পাশাপাশি মাদারিহাট, জলদাপাড়াও কাছেই হয়। টোটোপাড়ার মঙ্গলবারের হাটে জামাকাপড় থেকে শুরু করে বহু কিছুই মেলে, তবে দেখা যায় না কমলালেবুর বেচাকেনা কিংবা পিঠে কমলালেবুর টুকরি নিয়ে পাকদন্ডী বেয়ে নেমে আসা আদিবাসী সুঠাম পুরুষ বা ঝলমলে মহিলাকে। বল্লালগুড়ি পঞ্চায়েত অফিস থেকে টোটোপাড়া পর্যন্ত পথে এখনও পিচের আস্তরণ পড়ে নি, তবে টোটোপাড়ায় রাস্তাঘাট পাকা, ফলে যান চলাচলে কষ্ট হয় না। প্রায় অধিকাংশ বাড়িতেই দুই চাকার বাহন রয়েছে, ফলে মাদারিহাট থেকে কখন বাস বা ট্রেকার আসবে সেই ভরসায় থাকতে হয় না বেশির ভাগ মানুষকেই। তবে মাদারিহাট থেকে এখন বাসের পাশাপাশি কিছু জিপ ও মারুতি ভ্যান চলছে। টোটোপাড়ার খুদে পড়ুয়ারা বাঙালি-নেপালি=বিহারি-টোটো নির্বিশেষে ভীড় জমাচ্ছে টোটোপাড়ার ধনপতি টোটো মেমোরিয়াল হাই স্কুলে কিংবা মাদারিহাট-টোটোপাড়া পথে উত্তর খয়েরবাড়ির কাছে  তৈরী হওয়া বিভিন্ন মাধ্যমের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে। 

বারবার গিয়েও টোটোপাড়া পুরোনো হয় না। প্রতিবারই নজরে পড়ে নতুন কোনও পরিবর্তন। হয়ত সেই পরিবর্তনের অনেককিছু ভাল লাগে না, কিন্তু এটা বুঝি যে, এই পরিবর্তন না মানবার কিছু নেই। টোটো সম্প্রদায়ের মানুষেরা যত বেশি নিজেদের সম্পর্কে সচেতন হবেন, তত তাদের নিজেদের মঙ্গলের সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও ভাল। কেননা খুব কম জনপদের টোটোপাড়ার মতো সম্পদ থাকে। সেদিক থেকে আমরা ডুয়ার্স তথা উত্তরবঙ্গবাসী অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। অন্যতম ক্ষুদ্র আদিবাসী সম্প্রদায় হওয়ায় আমাদের ওপরেও দায়িত্ব এসে পড়ে তাদেরকে দেখে রাখবার। বংশগত দারিদ্র, শিক্ষাহীনতা, অপুষ্টি দূর করে যেদিন টোটোপাড়া আমাদের সবার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াবে, সেদিন হয়ত আমাদের কর্তব্য শেষ হবে। তাই যখন আমার প্রিয় দুই ছাত্র বিপ্লব ও অভিষেক তাদের নিজেদের ভাষায় গেয়ে ওঠে 'নুবাই কাঙ জোড়া দিবাই কাংয়াং গোত্র/ দাঙতা কাঙ, হিপসা খাংতা কাঙ চুংচা/ অকো পাই কতা ইয়ং কো জেজেঙ কইয়া লোই/ লেই বার বার লেই / তে বার বার তে সানি / তাত্রপুন তেনা / সেনে বোকো তে লাকা ডাইকো তে / ইয়চ পুঙ, ওয়াঙ পুনা মুমুঙরো সেঙ্গে /লেই বার বার লেই /লুনডি ইয়ং বিহিং মোই দিঙনা / মোইবে তিঙ্কো লেই সামা তিঙ্কো লেই/ লেই বার বার লেই' (পূর্বে তোর্ষা, পশ্চিমে পাহাড়, উত্তরে দেবতা হিপসা, দক্ষিণে ঘন অরণ্য, তার মাঝে সুন্দরী টোটোপাড়া, এস বন্ধু এস। চলো বন্ধু সূর্য উঠেছে, জঙ্গলে যাই কাঠ আনতে, বৃষ্টি হলে গাছ ভিজবে, মাঠ আমাদের ডাকে, ধান লাগাই চলো, মারুয়া লাগাই চলো, চলো বন্ধু চলো),তখন মনে হয় চলি আবার পাহাড়-নদী -অরণ্য  ঘেরা রহস্যময় টোটোপাড়ায়।  


সবশেষে এবার বীরপাড়া। ছোট্ট নদী বীরপিয়া থেকে নাকি  জায়গাটির নাম হয়েছে বীরপাড়া। পিয়া 'পাড়া' হতেই পারে...সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লোকমুখে কত শব্দই তো পালটে যায়! তবে বীর যখন আগে আছে, তখন ভাবনা আসে যে, নির্ঘাৎ এমন কোনও চরিত্র ছিল যার নামটি ছিল বীর অথবা স্বভাবে ছিল বীরত্ব। হয়ত ছিল তার কোনও প্রেয়সী। রূপসী কোনও নারী। দু'জনে মিলেমিশে হয়েছিল তাই বীরপিয়া। আবার আলাদা আলাদাভাবে বীর ও পিয়া...দুটি সরল নদী একসাথে মিশে যদি হয়ে যায় বীরপিয়া, তবে তো কথাই নেই! কেননা নদী মানেই তো মিলন। নদী মানেই বয়ে চলার অনন্ত ইতিহাস। সেই ইতিহাসে রয়ে যায় ভাঙনের পাশাপাশি গড়ার কথা। আর সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে ডুয়ার্সের ছোট্ট শহর, বীরপাড়া। তবে আয়তনে ছোট হলে হবে কী, এই শহরের গুরুত্ব দিনদিন বেড়েই চলেছে। অবশ্য নামকরণের ইতিহাস এখানেই থেমে নেই। সাঁওতাল ভাষা বলছে যে, 'বীর' শব্দটির অর্থ অরণ্য। ডুয়ার্সের এই অঞ্চল যে জঙ্গলে পূর্ণ ছিল তা তো বলাই বাহুল্য। আর সেই বীর শব্দটির সঙ্গে পাড়া যোগ করে নামকরণের তত্ত্বটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যেমন অস্বীকার করা যায় না আদিবাসী নেতা বীরসা মুন্ডার নামে এই স্থানের নামকরণের অন্য ধারণাটিকে। চা-শহর বলতে যা বোঝায় বীরপাড়া আসলে তা-ই। সেই কবে, কোন একসময়ে ইংরেজ সাহেবরা দলে দলে কালো কালো গরীর মানুষগুলোকে নিয়ে এসেছিল ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে! উদ্দেশ্য ছিল সহজ, সাদা। কাটতে হবে জঙ্গল। তৈরি করতে হবে চা-চাষের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি। এই বিপুল অরণ্য তাই কেটে তৈরি হয়েছিল একের পর এক চা-বাগান। তবে শুধু চা-বাগান হলে তো হবে না! আনুসাঙ্গিক সুযোগ-সুবিধাও দরকার তো। আধুনিক জীবন যাপনে প্রয়োজন হয় যা আর কী! অথচ আলাদা আলাদা করে সব চা-বাগানে সেটা সম্ভব নয়। সব চা-বাগানের পকেটের রেস্ত সমান নয়। সবার ইচ্ছেও সমান নয়। তাই আশেপাশে চা-বাগান নিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল এক একটি জনপদ, যেখানে পাওয়া যাবে নগর জীবনের ছন্দ। তবে বন কেটে বসত বানানো সেইসব জনপদ একদিনে গড়ে ওঠেনি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছে তারা। তাদের বুকে লেখা হয়েছে কত না ইতিহাস। আবার সেই ইতিহাসে সময়ের ধুলো জমলেও, সেখান থেকেই পাওয়া যায় প্রবাহমান জীবনের চিত্র। আক্ষরিক অর্থেই ডুয়ার্সে যখন চা-বাগান তৈরির ধুম পড়েছিল, বীরপাড়ার চলা শুরুও তখন। তার আগে জায়গাটি ছিল ঘন অরণ্যে ঘেরা। আজকের বীরপাড়ার কাছে ভুটানের গুমটু থাকলেও, তুলনায় এই জায়গাটি নতুন। সিমেন্ট তৈরির কারখানার ধোঁওয়া আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো ডলোমাইটের গুঁড়ো গুমটুর ট্রেডমার্ক হয়ে গেলেও, মানুষজনের টান কিন্তু ভারত সীমান্তের প্রখ্যাত কালীমন্দিরের জন্য। উঁচু টিলার ওপর বাহান্নটি সিঁড়ি ভেঙে এই মন্দিরের দেবী দর্শন আর আরও ওপরে পাহাড়ের গায়ে, ভুটান ভুখন্ডে বৌদ্ধ মঠ বেড়াতে যাওয়া, শুধু বীরপাড়া নয়, আশেপাশের একটা বৃহত্তর অংশের রীতি ও রেওয়াজ। নতুন গাড়ি কেনা হয়েছে কিংবা নতুন বিয়ে হয়েছে? মাকরাপাড়ার কালীমন্দিরে মাথা ঠেকিয়ে এলে মনে করা হয় যে, শুভ হবে সবকিছু। এখানকার সৌন্দর্যও কিন্তু নজরকাড়া। অসমতল ভূমি, পাগলি নদীর ছিপছিপে রহস্যময়তা, চারপাশের অদ্ভুত নির্জনতা আর ঝিঁঝিঁপোকার ডাক...সব মিলে অসামান্য। আর অতি অবশ্যই রয়েছে মাকড়াপাড়া চা-বাগান।

পরিভ্রমণ শেষ করি এবার। 
বলছি ঠিকই শেষ করি, কিন্তু জানি আসলে তা শেষ হওয়ার নয়। 
আসলে কোনও চলাই শেষ হয় না কখনও। যেখানে শেষ হয়, শুরুও হয় সেখান থেকেই। এক অদ্ভুত বৃত্তপথে আমরা এভাবেই ঘুরে যাই। অর্জন হয় যা, তার রেশ থেকে যায় এক জীবন ছাড়িয়েও অন্য কোনও জীবনে। আর সেখান থেকেই  শুরু আর এক চলা। কিন্তু সেই চলা দেখার জন্য ব্যক্তি থাকে না, সমষ্টি রয়ে যায়......   

(প্রকাশিত: উত্তরাবাস, সম্পাদনা- রিমি দে/ হাওয়াকল প্রকাশন)

No comments: