Wednesday, May 24, 2023




।। সবুজ দ্বীপ আর বালক।।

         শৌভিক রায় 


নিচে ঘন নীলে সবুজ ছোপ। 

আকাশের গায়ে সবুজ মেঘ....তাও আবার হয় নাকি!

চোখ কচলে দেখি, মেঘ নয়। ভূখণ্ড। আর নীল রংটাও আকাশের নয়। সমুদ্রের।

প্লেন যে ইতিমধ্যে অনেকটা নিচে নেমে গেছে সেটা আসলে বুঝতে পারিনি। অবশ্য ঘড়ি বলছে প্রায় দু' ঘন্টা হতে চলল। 

কলকাতা থেকে ১৩০০ কিমির আকাশপথে আন্দামানের রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ার পৌঁছতে দু'ঘন্টা লাগে। তাই বুঝলাম পৌঁছে গেছি। প্লেনের ছোট্ট জানালা দিয়ে তাকাতে ইতস্তত তাকাতে, ছোট ছোট বেশ কয়েকটা দ্বীপ দেখা গেল। 

এর আগে দ্বীপ দেখিনি তা নয়। দিউ গেছি। গুজরাটে। অসম্ভব ভাল লেগেছিল। কিন্তু দিউ মূল ভূখণ্ড থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে। একটা ব্রিজ পার হয়েই পৌঁছে যাওয়া যায়। এরকম এত দূরে 'water water everywhere not a little drop to drink' -এর মাঝে উজিয়ে থাকা ভূখণ্ডে বা দ্বীপে আসা? না। নিজে তো আসিনি কোনও দিন, আমার পরিবারের আর কেউও আসেনি! আক্ষরিক অর্থে তাই আমিই প্রথম কালাপানি পার হলাম! 

কালাপানি নামটি যে সার্থক সেটা অবশ্য বুঝতে পারছিলাম। সমুদ্রের জল এত নীল যে কালো বলে বিভ্রম হয়। আর সেই কৃষ্ণ কালো জলে সাদা ব্রেকার্স যে কী দারুণ দেখাচ্ছে ওপর থেকে, সেটা না দেখলে ঠিক বোঝা যায় না! 

ইতিমধ্যে প্লেন ঢুকে পড়েছে ভূখণ্ডে। ঘন সবুজের ফাঁকে ফাঁকে বাড়িঘর দেখতে পাচ্ছি। অধিকাংশ বাড়ির ওপরেই নীল টিনের আচ্ছাদন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে পুরো দ্বীপটাই উঁচু-নিচু। টিলাময়। দূরে দূরে নীল সমুদ্রের উঁকিঝুঁকি। অজস্র গাছের সবুজে অদ্ভুত মায়াময় দেখাচ্ছে শহরটাকে। রোদ যে বেশ কড়া বোঝা যাচ্ছে সেটাও। দ্রুত দৃশ্যপট বড় হতে হতে প্লেন পোর্ট ব্লেয়ারের মাটি ছুঁয়ে ফেলল। স্বাধীনতা সংগ্রামী সাভারকারের নামাঙ্কিত বিমানবন্দরটি আসলে ন্যাভাল বেস। তাই যথেষ্ট কড়াকড়ি। ছবি তোলা নিষেধ। কিন্তু কে শোনে কার কথা! অনেককেই দেখলাম ছবি তুলতে। আসলে মানুষ তো অদ্ভুত এক প্রাণী....নিজেরাই আইন করে আবার নিজেরাই ভাঙে!

সেল ফোন নর্মাল মোডে আনতেই মেসেজ ঢুকল টুংটাং- ওয়েলকাম টু আন্দামান।

আন্দামান! রামায়ণে আছে লঙ্কা পাড়ি দিতে নাকি বীর হণ্ডুমান (হনুমান) এখানে পা রাখতেন। তাঁর নাম থেকেই দ্বীপের নাম আন্দামান। পৌরাণিক যুগ থেকে যদি সরেও আসি, তবু দেখছি আন্দামানের কথা উল্লেখ করছেন টলেমি। নাম দিচ্ছেন গুড স্পিরিট আইল্যান্ড। ৬৭৩ খ্রিস্টাব্দে চিনা বৌদ্ধ ভিক্ষু ইত সিং আন্দামানকে নগ্ন মানুষদের দেশ বলে অভিহিত করেছিলেন। একই কথা রয়েছে ১০৫০ সালের চোল রাজাদের তাঞ্জোর শিলালিপিতে। পাঁচশ বাহাত্তরটি দ্বীপের আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ তাঁদের ভাষায় 'নাক্কাভরম'। 

তবে আন্দামান ও নিকোবর শব্দ দুটি সম্ভবত মার্কো পোলোর Angamanian ও Necuveron থেকে এসেছে। তাঁর মতে, ১৩.৫ ডিগ্রি ও ৬ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২ ডিগ্রি ও ৯৪ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমায় বিস্তৃত মোট ৭২৫ কিমি বিস্তৃত এই দ্বীপপুঞ্জে বাস করে হিংস্র মানুষেরা। সমকালীন চিনা লেখকরাও একই কথা বলছেন। কিন্তু এটাও সত্যি, আন্দামান উদিত সূর্যের দেশ, গোল্ড ফ্লাওয়ার, আন্ধার মানিক্য, ল্যান্ড অফ মেরিগোল্ড ইত্যাদি নামেও পরিচিত।

আসলে আন্দামান ও নিকোবর দুটি আলাদা দ্বীপপুঞ্জ। আন্দামান গ্রুপে রয়েছে নর্থ, মিডল, সাউথ আর লিটল আন্দামান। নিকোবর গ্রুপে দেখা মেলে কার নিকোবর, কাছাল, নানকৌড়ি, চাওরা, টেরেসা ও ক্যাম্বেল বে নামের দ্বীপগুলির। তবে আরও অজস্র দ্বীপ রয়েছে দুই গ্রুপেই। কিন্তু মাত্র ৩৬ টি দ্বীপে বসতি গড়ে উঠেছে। বহু দ্বীপে এখনও মানুষের পা পড়েনি। 

আমরা অধিকাংশই আন্দামান বলতে বুঝি পোর্ট ব্লেয়ার, হ্যাভলক, নিল আর বারাটাংয়ের একটি অংশ। এটুকু দেখেই ভাবি আন্দামান দেখা হয়ে গেল। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে বারাটাং যেতে জারোয়া রিজার্ভে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন আদিবাসীদের চাক্ষুষ দেখে মনে করি, আন্দামানের সব জেনে গেলাম! কিন্তু বড্ড ভুল সেটি।

নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে আমরা সাধারণত যাই না। দুই একটি জায়গা বাদে বিশেষ অনুমতি ছাড়া সেখানে যাওয়া সম্ভব না। লিটল আন্দামানেও যাওয়া বেশ কষ্টকর। সেভাবে যোগাযোগ নেই আজও। আন্দামানে দক্ষিণেই যা আমাদের ঘোরাফেরা। উত্তর আন্দামানকেও আমরা অনেকসময় ভ্রমণ সূচির বাইরে রাখি। ফলে বাদ পড়ে যায় পিকচার ক্যালেন্ডারের ছবির মতো অসামান্য জায়গা সব!

অন্যদিকে, লোকাল বর্ন, সেটেলার, সেকেন্ড ক্যাটাগরি ইত্যাদি মানুষরা রয়েছেন আন্দামানে। পেনাল সেটেলমেন্ট হিসেবে স্বীকৃত আন্দামানে শাস্তিপ্রাপ্ত বন্দীদের উত্তরপুরুষ লোকাল বর্ন হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতার সময় বা পরবর্তীতে বাংলাদেশ গঠিত হওয়ার সময় আগত শরণার্থীরা পেয়েছেন সেটেলারের তকমা। এই দুই শ্রেণির নন, অথচ তিরিশ চল্লিশ বছর থেকে রয়েছেন, তারাই সেকেন্ড ক্যাটাগরি। ভাগ্য অন্বেষণে গিয়ে এই মানুষরা আন্দামানকেই নিজেদের ঠিকানা করেছেন। রয়েছেন শ্রীলঙ্কা থেকে আগত একদা শরণার্থী তামিলরা। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু, কেরল ইত্যাদি থেকে আসা মানুষের সংখ্যাও কিন্তু  কম নয়।

তবে আন্দামান নিকোবরের আদিবাসীরা বোধহয় আজও মূল আকর্ষণ। এখানে স্বীকৃত আদিবাসীদের গোষ্ঠী হল ছয়টি। এদের মধ্যে শাম্পেন ও নিকবরিরা মঙ্গোলয়েড। আন্দামানি, ওঙ্গি, সেন্টিনেল এবং জারোয়া গোষ্ঠী হল নিগ্রোয়েড। এখনও অনেকে গোষ্ঠী তথাকথিত সভ্যতার মুখ দেখেনি। নিজেদের মতো লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতেই ভালবাসে তারা। বন কেটে বসতের সঙ্গে সঙ্গে তারা পিছু হটেছে যেমন, তেমনি অনেকেই মূল গোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সভ্যতার সংস্পর্শে আসবার জন্য। ১৯৬৮ সালে পোর্ট ব্লেয়ারে একদল জারোয়াকে আনা হয়েছিল শহর দেখাতে। ফিরে যাওয়ার পর তারা আর মূল সমাজে জায়গা পায়নি। উপদল হিসেবে তাদের অন্যত্র ঠাঁই নিতে হয়েছে। আবার সেন্টিনেলদের হিংস্রতা সবাই জানে। 

তবে আজকাল জারোয়া রিজার্ভ ঘেঁষা জনপদগুলিতে তারা যে আসে, সেখানকার মানুষদের সঙ্গে মেশে তার প্রমাণ পেয়েছি। রাস্তা সারাই করবার ঠিকেদারের ট্রাকে চেপে বেড়াতেও দেখেছি। তবে সে কথা পরে। 

এই মুহূর্তে সেল ফোনে অনির্বাণের নাম ফুটে উঠেছে। আমার প্রিয় ছাত্রটি নেভিতে রয়েছে। ওর পোস্টিং পোর্ট ব্লেয়ারে। আন্দামানে ও আমার অভিভাবক। 

বেল্ট থেকে লাগেজ নিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরে আসতেই শহরের ঝকঝকে চেহারাটা অনির হাসি মুখের সঙ্গে এক হয়ে গেল.....



প্লেন থেকে আন্দামানের দ্বীপ 


সাভারকারের মূর্তি, পোর্ট ব্লেয়ার এয়ারপোর্ট 


জগার্স পার্ক থেকে এয়ারপোর্ট 


বীর  সাভারকার এয়ারপোর্ট 


                                                      বীর  সাভারকার এয়ারপোর্ট 



আন্দামানের ম্যাপ 


আন্দামানের পর্যটন মানচিত্র 


গন্তব্য কাপুরদের হোম স্টে।

কাপুরদের হোম স্টে'র কথা প্রথম শুনি আমাদের অত্যন্ত প্রিয় মানুষ শ্রী অলক কুমার গুহর মুখে। পরে খোঁজ-খবর নিয়ে জেনেছি, ২০১৯ সালে আন্দামান ট্যুরিজমের গোল্ড সার্টিফিকেট পেয়েছে ফিনিক্স বে'র মওলানা আজাদ রোডের প্রায় শতাব্দী প্রাচীন এই বাড়িটি। 

অতীত পোর্ট ব্লেয়ারের সাবেক বাড়ির মতোই, বড় বড় থাম সম্বলিত কাঠের এই দোতলা বাড়ির ওপরের অংশে কাপুররা থাকেন। বাড়ির সামনেই দোতলায় উঠবার সিঁড়ি। নিচের অংশকে দুই ভাগ করা হয়েছে। প্রত্যেক ভাগেই একটি বিরাট থাকবার ঘর, ডাইনিং রুম, কিচেন, টয়লেট। রান্নার গ্যাস থেকে সব সরঞ্জাম মজুদ। বাড়ির নাম দেখলাম 'সি ভিউ'। কিন্তু সমুদ্রের নাম গন্ধ নেই আশেপাশে! 

আমার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি পড়ে ফেললেন বয়স্কা মিসেস কাপুর। জানালেন, উল্টোদিকে বহুতল হয়ে যাওয়ায় এখন আর বাড়ির সামনের সুন্দর বাগানে বসে সমুদ্র দেখা যায় না। পোর্ট ব্লেয়ার বদলে গেছে। জনসংখ্যা বাড়ছে দিনদিন। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাড়িঘরের সংখ্যাও! 

আসলে এমনটাই হয়। এটাই স্বাভাবিক। তা না হলে একসময়ের পেনাল সেটেলমেন্ট আজ কেন অন্যতম সেরা পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে!

একটু উঁকি দিই অতীতে।

আন্দামানের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগ ১৭ শতকের শেষদিকে। মারাঠা অ্যাডমিরাল কানৌজি অংরের হাত ধরে। ১৭২৯ অবধি তিনি ব্রিটিশ, ডাচ ও পর্তুগিজদের ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। পরে অবশ্য ডাচ আর পর্তুগিজরা কিছুদিন আন্দামানে ছিল। ব্রিটিশরাই মূলত আন্দামানের দখল নেয় আরও কিছুদিন পর যখন তাদের মাথায় পেনাল সেটেলমেন্টের ভাবনা জাঁকিয়ে বসে।

ব্রিটিশরা সমুদ্র পারে প্রথম পেনাল সেটেলমেন্ট তৈরি করেছিল ১৭৮৭ সালে সুমাত্রার বেনকোলেনে ( তদানীন্তন ফোর্ট মালবারো)। পরবর্তীতে একই রকম সেটেলমেন্ট গড়ে ওঠে পেনাং, মালাক্কা, আরাকান, তেনাসেরিম, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি জায়গায়। সিঙ্গাপুর থেকেই পেনাল সেটেলমেন্ট স্থানান্তরিত হয় আন্দামানে। সেই সময় আন্দামান নিকোবর অঞ্চলে জাহাজডুবি ছিল খুব সাধারণ ব্যাপার। আসলে আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ভূখণ্ড পাহাড়ের উপরিভাগ। চারদিকে বিশালাকৃতি পাথর বা রক ছড়িয়ে ছিটিয়ে সমুদ্রের ভেতরে। 

জাহাজডুবি হলে যদিও বা নাবিকরা সমুদ্রের হাত থেকে রেহাই পেত, কিন্তু তাদের মরতে হত এখানকার হিংস্র আদিবাসীদের হাতে। ফলে হতভাগ্য নাবিকদের জন্য একটি আশ্রয়স্থল তৈরি করা জরুরি হয়ে উঠেছিল। 

অন্যদিকে, মূল ভূখণ্ডের দাগি অপরাধীদের জন্য এমন একটি পেনাল সেটেলমেন্ট দরকার হয়ে পড়েছিল যেখান থেকে কোনও ভাবেই পালানো যাবে না। এই প্রসঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামী বারীন ঘোষের স্মৃতিচারণের কিছু অংশ তুলে ধরছি। সেই স্মৃতিচারণে তিনি একটি ভাষণের উল্লেখ করেছেন। ভাষণটি দিয়েছিলেন কুখ্যাত সেলুলার জেলের ততোধিক কুখ্যাত জেলার ডেভিড বারি-

You see the wall around? Do you know why it is so low? Because it is impossible to escape from this place. The sea surrounds it for a distance of 1000 miles. In the forest you do not find any other animals than pigs and wild cats, it is true; but there are savages who are called Jarrawas. If they happen to see any man they do not hesitate to pierce him right through their sharp arrows.

ডেভিড বারির এই ভাষণটি কিন্তু বিংশ শতকের প্রথম অর্ধে। আর আমি যে সময়ের কথা বলছি সেটা তারও একশো-স‌ওয়া বছর আগে। আসলে পেনাল সেটেলমেন্ট তৈরির উদ্দেশ্য শুধুমাত্র দাগি অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া ছিল না। সভ্য মানুষের পা না পড়া এবং হিংস্র আদিবাসী অধ্যুষিত একটি জায়গার গভীর জঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি স্থাপন ও উন্নয়নের বিষয়টি মুনাফালোভী ব্রিটিশদের মাথায় অবশ্যই ছিল। আর সেই কাজে আদিবাসীদের আক্রমণে বা নানা রোগ ব্যাধিতে মৃত্যুর ব্যাপারটি যে কাদের ওপর দিয়ে গেছে সে তো বোঝাই যাচ্ছে!

যাহোক পেনাল সেটেলমেন্টের ভাবনা নিয়ে ১৭৮৮-৮৯ সালে লেফটেন্যান্ট টি এইচ কোলব্রুক আর লেফটেন্যান্ট আর্চিবল্ড ব্লেয়ার সরজমিনে দেখতে পৌঁছে গেলেন দ্বীপে। তাঁদের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ১৭৮৯ সালে সাউথ-ইস্ট বে'র চাথাম দ্বীপে সেটেলমেন্ট তৈরি হল। নাম হল পোর্ট কর্ণ‌ওয়ালিস। ১৭৯১তে লর্ড কর্ণওয়ালিসের ভাই কমোডর কর্ণওয়ালিসের প্রস্তাবে সেটেলমেন্ট স্থানান্তরিত হল উত্তর আন্দামানে। কিন্তু সব বিফলে গেল ম্যালেরিয়ার তীব্র আক্রমণে। পিছু হটতে বাধ্য হল ব্রিটিশরা। ১৭৯৬ তে পরিত্যক্ত হল সেটেলমেন্ট। উদিত সূর্যের দ্বীপে সভ্যতার (নাকি অসভ্যতার) সূর্য উঠতে না উঠতেই অস্ত গেল।

মাঝের কয়েক দশক আন্দামানের কথা সেভাবে আর কেউ মনে রাখেনি। মাঝে মাঝে জাহাজডুবি আর আদিবাসীদের হাতে সভ্য জগতের মানুষদের মৃত্যুর খবর শোনা গেলেও, জঙ্গল গ্রাস করছিল প্রথম সেটেলমেন্টের বাড়িঘরকে। সমুদ্রের নোনা বাতাসে জং ধরছিল কলকব্জায়। গায়ে উল্কি, মুখে রং মাখা মূল বাসিন্দাদের হয়ত দেখা যাচ্ছিল এদিক ওদিক। তাদের দুর্বোধ্য ভাষা আর সমুদ্রের অনন্ত কল্লোল ছাড়া কোনও শব্দ শোনাও যাচ্ছিল না। সত্যি বলতে মাঝ সমুদ্রের ওই দ্বীপ নিয়ে সেভাবে উৎসাহ ছিল না কারও।

অবস্থা পাল্টালো ১৮৫৭তে। স্বাধীনতার প্রথম সংগ্রাম ব্রিটিশদের আবার বাধ্য করল পেনাল সেটেলমেন্ট নিয়ে ভাবতে। কেননা স্বাধীনতা সংগ্রামে যাঁরা মেতেছে তাঁরা সামান্য অপরাধী নয়। এঁরা রাষ্ট্রদ্রোহী। মূল সমাজ থেকে এঁদেরকে না সরালে অচিরেই বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে দেবে এঁরা। প্রচুর সংখ্যক ধৃত এই অপরাধীদের একটাই জায়গা। সেটা কালাপানির ওপারে। 

অতএব ড. জে এফ ম‌ওয়াট, ড. জি আর প্লেফেয়ার, লেফটেন্যান্ট জে এ হিথকোটের এক্সপার্ট কমিটি ১৮৫৭ সালের ৮ ডিসেম্বর আন্দামান এলেন। পেনাল সেটেলমেন্টের জন্য প্রচুর ঘোরাঘুরি করে কোনও জায়গা না পেয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন সেই পুরোনো জায়গাতেই সেটেলমেন্ট হোক। তদানীন্তন ভারত সরকার প্রস্তাব মেনে নিলে ১৮৫৮ সালের ১৫ জানুয়ারি পুরোনো জায়গার নাম পাল্টে রাখা হল পোর্ট ব্লেয়ার (অর্চিবল্ড ব্লেয়ারের স্মরণে)। ক্যাপ্টেন মান সেটেলমেন্ট গড়বার দায়িত্ব পেলেও মূল কাজ করলেন পোর্ট ব্লেয়ারের প্রথম সুপারিনটেনডেন্ট ড. জে পি ওয়াকার। 'সেমিরামিস' নামের জাহাজে কলকাতা থেকে ২০০ জন সাজাপ্রাপ্ত সিপাই, দুজন ভারতীয় ডাক্তার, একজন ভারতীয় ওভারশিয়ার আর ৫০ জন পাহারাদার নিয়ে। চাথামে সেটেলমেন্টের কাজ শুরু হলেও জলের অভাবে পরিত্যক্ত হল সেই অঞ্চল। এরপর রস আইল্যান্ডে গড়ে তোলা হল ব্রিটিশদের প্রধান কার্যালয়। ১৯৪২ অবধি রস আইল্যান্ড‌ও পরিত্যক্ত হয় যখন জাপানিরা আন্দামান দখল করে। 

আজকের পোর্ট ব্লেয়ার চাথাম, হাড্ডো, সিপ্পি ঘাট, মিনি বে, ফিনিক্স বে, জংলিঘাট, নর্থ বে, রস আইল্যান্ড, চিড়িয়াটাপু, কার্ভিন কোভ ইত্যাদি সব কিছু নিয়েই। কোনও কোনও জায়গায় পৌঁছতে বোট দরকার হয়। কোথাও আবার সড়ক পথেই যাওয়া যায়।

******************************************

রীনা ম্যাগি তৈরি করে নিয়ে এসেছিল। প্লেনে খিদে না পাওয়ায় এখন সেটার সদ্ব্যবহার করা গেল। অনির্বাণ ব্যস্ত হয়ে উঠেছে ওর কোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়ার জন্য। 

মিনি বে'তে অনির্বাণের আস্তানা। ন্যাভাল এরিয়া। লম্বা-লাইন রাস্তা ধরে পৌঁছে গেলাম ওর বাড়ি। ওর আড়াই বছরের ছোট্ট ছেলের সঙ্গে দ্রুত ভাব হয়ে গেল। বৌমাও কোচবিহারের মেয়ে। 

অনিই নিয়ে গেল ওদের কোয়ার্টারের কাছের ভিউ পয়েন্টে।

এই প্রথম দেখছি পাহাড়-দ্বীপ-সমুদ্রের আন্দামান। আর দেখা মাত্রই বুঝলাম, এতদিন না এসে কী বোকামিটাই না করেছি!!



মিনি বে থেকে একটি দৃশ্য 



কাপুর টুরিস্ট কটেজ। পোর্ট ব্লেয়ারে আমার ঠিকানা 




পোর্ট ব্লেয়ারের সাবেক বাড়ি 



পোর্ট ব্লেয়ারের সাবেক বাড়ি




ন্যাভাল কোয়ার্টার, মিনি বে 


                                                                      মিনি বে 


 

:অবশেষে মুক্তিতীর্থে:

আটলান্টা পয়েন্টের মহাত্মা গান্ধি রোডে হলুদ অমলতাসের বন্যা। 

খানিক আগেই পেরিয়ে এসেছি পোর্ট ব্লেয়ারের বিখ্যাত আবারডিন বাজার। এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সে জায়গাটি খানিকটা উঁচুতে। সমুদ্র দেখা যাচ্ছে নিচে। সমুদ্রের মাঝেই খানিকটা দূরে রস আইল্যান্ড দেখা যাচ্ছে। এপারে অর্থাৎ পাহাড়ের নিচে ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্স, বুদ্ধ গার্ডেন, একুরিয়াম, মেরিন পার্ক একের পর এক দাঁড়িয়ে। আরও খানিকটা দূরে সমুদ্রের গা ঘেঁষে বিরাট উঁচু দণ্ডের মাথায় পতপত করে উড়ছে জাতীয় পতাকা।

কিন্তু এসব কিছুই টানছে না এখন। অদ্ভুত মায়াময় এই পরিবেশ আকৃষ্ট করতে পারছে না এক ফোঁটাও। 

না পারার‌ই কথা।

কেননা সামনে সেলুলার জেল। কোনও পার্থিব দৃশ্য এই মুহূর্তে ওই কারাগারের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। গা কাঁটা দিয়ে উঠছে ভাবতে যে, ভারতের বাস্তিল নামে কুখ্যাত এক কারাগার যা ক্রমে হয়েছিল মুক্তিতীর্থ...আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে! 

সম্মোহিত হয়ে থমকে ছিলাম। গাড়ির ড্রাইভার তামিল যুবক রাজা বোধহয় বুঝতে পারছিল আমার অবস্থা। মৃদু স্বরে সে বলল, "জাইয়ে বাবুজি অন্দর..."

সেলুলার জেলের মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে ডাইনে বাঁয়ে প্রদর্শনী কক্ষ। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে যাঁরা বন্দি ছিলেন তাঁদের সচিত্র পরিচয় রয়েছে বাম দিকের গ্যালারিতে। ডান দিকের গ্যালারিতে সেলুলার জেলের ইতিহাস, কয়েদিদের জন্য বরাদ্দ বিভিন্ন ধরণের শৃঙ্খল, পোষাক ইত্যাদি বহু কিছু প্রদর্শিত। 

গ্যালারি শেষ করে সামান্য এগোলে একদিকে অমর জ্যোতি, অন্যদিকে সেই প্রাচীন বৃক্ষ যা সেলুলার জেল নির্মাণের প্রথম দিন থেকে রয়েছে। পাশেই বহু চেয়ার পাতা রাতের 'সন এ লুমিয়ের' বা লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো'র জন্য। একটু এগিয়েই মূল জেলখানা যেখানে বন্দি থাকতেন কয়েদিরা। এক পাশে ফাঁসি ঘর ও তার সামনে রাখা টাব। এই টাবেই ফাঁসির আগে কয়েদিদের স্নান করানো হত। ফাঁসি ঘরে তিনজনকে একসঙ্গে ঝোলানোর ব্যবস্থা ছিল।

গোগ্রাসে দেখে নিচ্ছি সব। তারার মতো গঠনের (ছবি দ্রষ্টব্য) এই জেলে সাতটি উইং ছিল। প্রতিটিই ছিল তিনতলা। সেলের সংখ্যা ছিল ৬৯৮টি। ১৯৪১ সালের ভূমিকম্প ও জাপানি হানায় আজ টিকে রয়েছে ৩টি উইং। সেলের সংখ্যাও হয়েছে ২৯৬। এক একটি সেল ১৩.৫ ফিট লম্বা আর ৭.৫ ফিট চওড়া। প্রত্যেকটি সেলে রয়েছে মোটা লোহার দরজা। সেলের সামনে চার ফিট বারান্দা ধনুকাকৃতি দেওয়ালের সঙ্গে পোক্ত লোহার রেলিংয়ে আটকানো। 

প্রত্যেক উইংয়ে কিন্তু সম পরিমাণ সেল ছিল না। এক ও দুই নম্বর উইংয়ে ছিল ১০৫ টি করে মোট ২১০ টি সেল। তিন নম্বর উইংয়ে সেলের সংখ্যা ১৫০। বাকিগুলিতে যথাক্রমে ৭৮, ৭২, ৬০ ও ১২৬ টি সেল। কোনও উইংয়ের সেল মুখোমুখি নয়। অর্থাৎ একটি উইংয়ের বারান্দা বা সেল থেকে অন্য উইংয়ের পেছন দেখা যাবে। সেলগুলিতে ৩ফিট চওড়া ও ১ফুট লম্বা যে গবাক্ষ রয়েছে সেটিও মেঝে থেকে নয় ফিট উঁচুতে। ফলে ওই ওত উঁচুর ছোট্ট ভেন্টিলেটর দিয়ে পেছনের উইংকে দেখা সম্ভব নয়।

তারার মতো সাতটি উইং যে জায়গায় মিলেছে সেখানে তিনতলা সেন্ট্রাল টাওয়ার। সাতটি উইংয়ের করিডোর গোল হয়ে এক জায়গায় মিলেছে। প্রত্যেকটি করিডোর লোহার গেট দিয়ে আলাদাভাবে আটকানো। সেন্ট্রাল টাওয়ারে যেমন সশস্ত্র রক্ষী থাকত তেমনি ত্রিতল সাত উইংয়ের প্রতিটি তলায় একজন করে মোট ২১ জন প্রহরী পাহারা দিত। 

প্রতিটি উইংয়ের সামনের যে ফাঁকা জায়গা সেখানে কয়েদিদের কাজে লাগানো হত। নারকেল থেকে তেল বের করা ছিল মূল কাজ। ঘানিতে জুতে দেওয়া হত তাদের। সারাদিনে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল উৎপাদন করতে হত। সেটা না পারলে জুটত অবর্ণনীয় অত্যাচার। অন্যান্য অমানবিক কাজ তো ছিলই। এই ফাঁকা জায়গাতেই রাখা থাকত বড় জলাধার। পাইপ দিয়ে নিচের সমুদ্র থেকে জল আনা হত। তবে পানের জন্য ছিল অন্য জল। দ্বিতীয়বার শৌচাগার যেতে চাইলে অনুমতি পাওয়া যেত না। পেট খারাপের সমস্যা হলে নারকীয় দশা হত বন্দীদের। প্রবল পরিশ্রমে শরীর খারাপ হলে ভাগ্যের হতে নিজেকে সঁপে দেওয়া ছাড়া কিছুই করবার ছিল না। কোনও প্রতিবাদে জুটত প্রবল প্রহার। সেটা যে কী অমানুষিক তা ভাবতেও শিউরে উঠতে হয়। এই প্রসঙ্গে সাভারকারের স্মৃতিচারণ উল্লেখ করছি। তিনিও কুখ্যাত ডেভিড বারির ভাষণের উল্লেখ করেছেন-

Listen ye prisoners, in the Universe there is one God and he lives in heaven above but in Port Blair there are two: one the God of Heaven and another the God of Earth- that is myself. The God of Heaven will reward you when you go above but this God of Port Blair will reward you here and now. So ye prisoners behave well. You may complain to any superior against me, my word shall prevail; I hold my own.

চরম অত্যাচারে উল্লাসকর দত্ত পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। পঁচিশ বছরের তরতাজা ইন্দুভূষণ রায় গায়ের জামা কাপড় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন। পন্ডিত রামরক্ষা অনশনে বসে শহীদ হন। সর্দার ভান সিংকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। অনশনরত মহাবীর সিং, মোহিত মৈত্র ও মোহন কিশোর নমদাসকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করার সময় খাবার আটকে তাঁরা মারা যান। উদাহরণ কত দেব! 

আজ আমরা যারা পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো স্বাধীনতা পেয়েছি তারা কি এই মহাপ্রাণদের সংগ্রামকে বিন্দুমাত্র বুঝতে পারি? বোধহয় না। 

গর্বে বুক ফুলে উঠল পিকচার গ্যালারি ও শ্বেত পাথরে বন্দিদের তালিকায় পরম শ্রদ্ধেয় পূর্ণেন্দু শেখর গুহ মহাশয়ের ছবি ও নাম দেখে। কোচবিহারের মানুষ তিনি। তাঁর দুই সুপুত্র শ্রী অলক কুমার গুহ ও শ্রী অরূপ কুমার গুহ আমাদের অত্যন্ত প্রিয় ও ভালবাসার মানুষ। ১৯৩৫ সালের রংপুর ষড়যন্ত্র মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে সংগ্রামী পূর্ণেন্দু শেখর গুহ ১১ বছরের জন্য শাস্তি পান। ওই বছরের মে মাসে তাঁকে সেলুলার জেলে পাঠানো হয়। সংগ্রামীদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে দেশব্যাপী প্রবল আন্দোলনের চাপে ব্রিটিশ সরকার ধাপে ধাপে সেলুলার জেল থেকে বন্দি সরানোর কাজ শুরু হয়। ১৯৩৭-৩৮ সালে পূর্নেন্দুবাবুকেও কলকাতার আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে স্থানান্তরিত করে। পেলাম জলপাইগুড়ির শ্রদ্ধেয় নগেন্দ্র মোহন মুস্তাফির ছবিও, যদিও ওঁর সম্পর্কে কিছুই জানিনা। যদি কেউ আলোকপাত করেন ওঁর বিষয়ে খুব খুশি হব। 

সব দেখছি আর ভাবছি পেনাল সেটেলমেন্ট তো এমনিতেই ছিল। চারদিকে তরঙ্গায়িত নীল জলের মাঝে জেগে থাকা দ্বীপে সেটি তৈরি করার ভাবনার মধ্যে ব্রিটিশদের বদ-বুদ্ধির পরিচয় মেলে। যে দ্বীপপুঞ্জের কোনও একটি থেকে আর একটিতে যাওয়া আজও দুরূহ, সেখানেও ব্রিটিশরা ভাইপার জেল তৈরি করেছিল। কিন্তু তার পরেও কেন এরকম কুখ্যাত সেলুলার জেলের প্রয়োজন হয়ে পড়ল?

উত্তর খুঁজব তার...



সেলুলার জেলের প্রবেশমুখে 



সেলুলার জেলের একটি অংশ 




অতীতে সেলুলার জেল এরকমই ছিল। একটি মডেল 



ফাঁসি কক্ষ ও ফাঁসির দড়ি 



একটি অংশ 






সেলের সামনের বারান্দা 



এই বৃক্ষ অতীতের সাক্ষী 



ফোটো গ্যালারির সামনে রীনা 


কয়েদিদের পোশাক 


আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় পূর্ণেন্দু শেখর গুহ 


কয়েদিদের নেক লক 



 :মুক্তিতীর্থ: ফিরে দেখা:

আগেই বলেছি আন্দামানে প্রথম পেনাল সেটেলমেন্ট হয়েছিল ১৭৮৯ সালে। কিন্তু ১৭৯৬-এ সেটি পরিত্যক্ত হয়। নতুন করে পেনাল সেটেলমেন্ট তৈরির ব্যাপারটি ব্রিটিশদের মাথায় আসে ১৮৫৮ সালের মহাবিদ্রোহের পর। সিপাহী বিদ্রোহে অংশ নেওয়া দুশো সাজাপ্রাপ্ত বন্দিকে নিয়ে শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় দফার পেনাল সেটেলমেন্ট।

সিপাহী বিদ্রোহের পর থেকেই স্বাধীনতা আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে শুরু করে। ওয়াহাবি আন্দোলন, রুম্পা বিদ্রোহ, বার্মিজ আন্দোলন, মপ্লাহ বিদ্রোহ, খিলাফত আন্দোলন ইত্যাদি হয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। বাংলা এই আন্দোলনে অগ্রণী হলেও দেশের অন্যত্র তার অভিঘাত পড়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশদের চোখে এই আন্দোলনকারীরা ছিল ঘৃণ্য অপরাধী। হয়ত সেই সময় যে ভারতবাসীরা ব্রিটিশদের সমর্থন করত, তাদের কাছেও এই বিদ্রোহীরা ছিল দুষ্কৃতি! 

সুতরাং দমন পীড়ন চলবে এ কথা বলা বাহুল্য। আর সেটা করতে গেলে আন্দামানের পেনাল সেটেলমেন্ট ছাড়া উপযুক্ত আর কী হতে পারে! সুতরাং পাঠাও এদের কালাপানির ওপারে, প্রয়োজনে পরিবারের লোকদেরকেও দণ্ড দাও। আন্দামানে সাজাপ্রাপ্ত এরকম ২৫৮ জন মপ্লাহ বিদ্রোহীকে চাষের জন্য জমি দেওয়া হল যাতে মূল ভূখণ্ড থেকে আসা তাদের পরিবারের ৪৬৮ জনের গ্রাসাচ্ছাদন হয়। আরও ২৭২ জন পুরুষ ও ৩১ জন মহিলা এলেন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের কারাগার থেকে। মহিলারা নিজেদের পছন্দে বিয়ে করে এখানেই থেকে গেলেন। 

এভাবেই বাড়ছিল আন্দামানের তদানীন্তন জনসংখ্যা। ১৮৫৮ সালে দ্বিতীয় দফার সেটেলমেন্ট তৈরি হওয়ার তিন মাসের মধ্যে যেখানে ৭৭৩ জন বন্দিকে আনা হয়েছিল, সেলুলার জেল তৈরির আগে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬১০৬। অবশ্য এই সংখ্যার মধ্যে বন্দিদের পরিবারের সদস্যদেরও ধরা হচ্ছে।

কিন্তু সেলুলার জেল তৈরির আগে এই বন্দিরা থাকত কোথায়? ভাইপার দ্বীপে। এই দ্বীপটি ছিল "স্বাভাবিক কারাগার"। ১৮৬৪ থেকে ১৮৬৮ পর্যন্ত তৈরি করা হয়েছিল জেলটি। পুরুষদের রাখা হত এখানে। মহিলা বন্দিরা সাউথ পয়েন্টে অন্য আর একটি জেলে। যাদের পরিবার এসেছে, তারা অবশ্য জমি পেয়ে এখানকার বাসিন্দা হয়ে গেছে। এই জমি দিয়ে আন্দামানের বাসিন্দা করে দেওয়ার মধ্যেও ব্রিটিশদের কূটবুদ্ধি প্রকাশ পায়। "নতুন জায়গার সবকিছুর মুখোমুখি হও তোমরা। ভাল হলে আমাদের লাভ। খারাপ হলে তোমাদের ওপর দিয়ে যাক। এই দ্বীপে হিংস্র জন্তুর দেখা মেলে না ঠিকই, কিন্তু রয়েছে হিংস্রতর আদিবাসী, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, বড় বড় ডাঁশ আর অজানা অনেককিছুই...."

ক্রমাগত রাজনৈতিক আন্দোলন বৃদ্ধি পাওয়ায় মূল ভূখণ্ডে যখন বন্দি সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সাম্রাজ্যের ভিত একটু একটু করে নড়বড়ে হচ্ছে, তখনই ব্রিটিশরা বুঝতে পারে এমন একটি জেল তৈরি করা দরকার যেখানে রাষ্ট্রের চোখে দাগি বন্দিরা 'সলিটারি সেল'-এ অন্তত ছয় মাস নিঃসঙ্গ কাটাবে। তারপর তাদেরকে ধীরে ধীরে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা হবে। আর এই দাগি অপরাধীরা অধিকাংশই হল রাজনৈতিক বন্দি যাঁরা দেশ স্বাধীন করতে উঠেপড়ে লেগেছে। সুতরাং দরকার একটি শক্তপোক্ত জেল দরকার হাতে বিপুল পরিমাণ রাজনৈতিক বন্দিদের আটকে রাখা যাবে। 

এই ভাবনা নিয়েই জেল তৈরির পরিকল্পনা চলছিল। খুব স্বাভাবিক ভাবেই আন্দামান ছিল তালিকার শীর্ষে। মাঝ সমুদ্রে ওরকম দ্বীপে রাজনৈতিক বন্দিদের পাঠানো হলে, মানসিকভাবে তাঁরা যেমন বিধ্বস্ত হবে, তেমনি মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন জেলে বসে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করতে পারবে না। ডুয়ার্সের বক্সার দুর্ভেদ্য জঙ্গলে একটি ফোর্টকে এরকম একটি জেলে পরিণত করাও এই ভাবনা থেকেই আসে।

ইতিমধ্যে কেরলের কুন্নুরে এক বিশেষ মিটিংয়ে ঠিক হয়েছিল সেলুলার জেল তৈরি করার। মোটামুটিভাবে তার গঠন, সেল সংখ্যা, সেলের মাপ ইত্যাদি ঠিক হয়েছিল। সুতরাং আন্দামানে একের পর এক বিশেষজ্ঞ দল আসা শুরু হল। অবশেষে ১৮৯০ সালে স্যার চার্লস জেমস লিয়াল ও ড. আলফ্রেড সেইন লেথব্রিজের কমিটির রিপোর্ট গৃহীত হয়। এই রিপোর্টেও বলা হয়েছিল কট্টর অপরাধীদের বাগে আনবার জন্য ন্যূনতম ছয় মাসের আলাদা রাখার বিষয়ে জোর দেওয়া হল। 

সেলুলার জেল তৈরির প্রথম ধাপে, পোর্ট ব্লেয়ারের তখনকার সুপারিনটেনডেন্ট কর্নেল থমাস ক্যাডেলকে বলা হল অন্তত ৬০০ সেল বিশিষ্ট সেলুলার জেলের প্ল্যান ও এস্টিমেট জমা দিতে। ড. লেথব্রিজের সাহায্যে যে প্ল্যান হল তাতে দরকার ছিল ১২২০ ফিট বাই ৬৩০ ফিট জায়গার জমি। প্রথমে দেখা হল পাহাড়গাঁও ও প্রথারাপুরের এলাকা যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০০ ফিট উঁচুতে। কর্নেল ক্যাডেল কিন্তু পছন্দ করলেন আটলান্টা পয়েন্টের ওপর আবারডিনের ৭৯০ ফিট বাই ২৩১ ফিট এলাকার অঞ্চলটি যার উচ্চতা ৭৫ মিটার। 

এইসব দেখাদেখির মাঝেই পোর্ট ব্লেয়ারের সুপারিনটেনডেন্ট পাল্টে গেল। কর্নেল এন এম হরসফর্ড এলেন পোর্ট ব্লেয়ারে নতুন সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে। জায়গা নিয়ে আপত্তি না তুললেও, তিনি তিন তলার বদলে পরিবর্তে দোতলা জেল তৈরির পক্ষপাতী ছিলেন। যুক্তি ছিল ভূমিকম্পে ভেঙে পড়তে পারে জেল।  

কিন্তু বন্দি সংখ্যার কথা মাথায় রেখে নির্মাণকারীদের হাতেই ছাড়া হল বিষয়টি। ১৮৯৬ থেকে ১৯০৬ অবধি নির্মাণ চলল সেলুলার জেলের। নির্মাণ কাজে হাত লাগলেন বন্দিরাই! স্থানীয় পর্যায়ে যে সামগ্রী ব্যবহৃত হল তার মূল্য ছিল ২,৫৮,৭৬৪ টাকা। বন্দিদের শ্রমের মূল্য ছিল ১,৬২,৭০৮ টাকা। অন্যান্য নিয়ে নির্মাণ খরচ হয়েছিল মোট ৫,১৭,৩৫২ টাকা।

নির্মাণের পর ১৯০৬ থেকে সেলুলার জেলের ইতিহাস ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে। একদিকে স্বাধীনতা সংগ্রামী সর্বহারা বিপ্লবীরা আর অন্যদিকে দুরন্ত অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসকরা। মূলত ১৯০৯-১৯১৪, ১৯১৬-১৯২০ ও ১৯৩২-১৯৩৮ এই তিন পর্যায়ে এই সংগ্রামীরা এখানে এসেছেন। তাঁরা নিজেরা যেমন কষ্ট সহ্য করেছেন, হাসিমুখে ফাঁসির দড়িতে মৃত্যু বরণ করেছেন, তেমনি ব্রিটিশদের ঝুঁকতে বাধ্য করেছেন। তাঁদের দুই বারের অনশন সমগ্র ভারতবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। দ্বিতীয়বার স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধিজির অনুরোধে তাঁরা অনশন তোলেন। তাঁদের লাঞ্ছনার কথা জেনে সারা দেশে এমন আলোড়ন সৃষ্টি হয় যে, শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশরা পিছু হটে। দফায় দফায় বন্দিদের মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন জেলে পাঠানোর কাজ শেষ হয় ১৯৩৮ সালে। বন্দিমুক্ত হয় সেলুলার জেল।

তবে ১৯৪২ সালে সেলুলার জেল সহ আন্দামান চলে যায় জাপানিদের হাতে। শুরু হয় অবিচারের আর এক ইতিহাস। ইংরেজদের চর সন্দেহে একের পর এক মানুষকে ঢোকানো হয় জেলে। চলে অকথ্য অত্যাচার। ১৯৪৩ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তোজো আজাদ হিন্দ ফৌজের হাতে আন্দামানকে তুলে দেন। ২৯ ডিসেম্বর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আসেন আন্দামানে। জিমখানার মাঠে ৩০ ডিসেম্বর তিনি ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। ১৯৪৫ সালের ৭ অক্টোবর আবার ব্রিটিশরা আন্দামান দখল করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পতন হয় জাপানিদের। কিন্তু আর বেশিদিন ব্রিটিশরা আন্দামানকে নিজেদের দখলে রাখতে পারেনি। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে সারা দেশের সঙ্গে আন্দামান‌ও স্বাধীন হয়।

স্বাধীনতার পর থেকেই সেলুলার জেলকে জাতীয় স্মারক তৈরির চেষ্টা চলে দফায় দফায়। Ex Andaman Political Prisoners Fraternity Circle এর সেই প্রচেষ্টা সফল হয় ১৯৬৩ সালে। সেলুলার জেলকে জাতীয় স্মারক ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় না। ১৯৬৯ সালে ভারত সরকারের বিশেষজ্ঞ দল সেলুলার জেল পরিদর্শন করলেও লাভ হয়নি। ১৯৭৮ সালে Ex Andaman Political Prisoners Fraternity Circle তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি সঞ্জীব রেড্ডি ও প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের সঙ্গে দেখা করলে কাজ হয়। ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মাননীয় মোরারজি দেশাইয়ের উপস্থিতিতে সেলুলার জেল জাতীয় স্মারকের মর্যাদা পায়। 

***********************************************************************************

সেলুলার জেলের বিখ্যাত লাইট অ্যান্ড সাউন্ড দেখে যখন বাইরে আসি তখন রাত প্রায় নয়টা। নিচে মেরিন ড্রাইভে আলোর রোশনাই। সমুদ্রের জলে সেই আলো পড়ে চিকচিক করছে। পূর্ণিমার পরে চাঁদ একটু নিষ্প্রভ হলেও তার রূপ অনবদ্য। জেলের সামনের সাভারকার পার্কটি অন্ধকারে ঢেকে আছে।

হেঁটে চলি আবারডিন বাজারের দিকে। ভাবতে থাকি, আমার এই দীর্ঘ কথন ক'জন পড়বেন, শুনবেন‌ই বা ক'জন! যে শহীদদের শ্বাসে আজও আন্দামানের বাতাস ভারী হয়ে আছে তাদের কথা মনে রেখেছি কি আমরা? 

জানিনা এই জন্মে আর কোনও দিন সেলুলার জেলে আসবো কিনা! কিন্তু যা নিয়ে যাচ্ছি তা এক জন্মের নয়, বহু জন্মের সঞ্চয়, বহু জন্মের অর্জন।



ফলক 



জেলের একাংশ 


জেলের বাইরের বীর সাভারকার পার্ক 



রাতের মেরিন ড্রাইভ, সেলুলার জেলের সামনে থেকে 


সেলের ঘুলঘুলিতে বসে থাকা পাখি 









রাতের সেলুলার জেলের প্রবেশদ্বার 


জেলের একাংশ


                                                         জেলের একাংশ








(তথ্য: লাইট অ্যান্ড সাউন্ড, সেলুলার জেল/ গ্যালারি, সেলুলার জেল/ Cellular Jail by Priten 

Roy & Swapnesh Choudhury)


:একটি স মিল ও কিছু অর্জন:

বিয়াল্লিশ, আটচল্লিশ আর চুয়ান্ন ইঞ্চি রি স। আটচল্লিশ ইঞ্চি ব্যান্ড রি স। পেন্ডুলাম ক্রস কাট স। ট্রিমার কাট....

বোঝা যাচ্ছে না তো? প্রথমটায় আমিও বুঝিনি। কী এগুলি? স (saw) মানে তো চেরাই করা। সেটা বুঝছি। কিন্তু বাকিটা?

ধীরে ধীরে বুঝলাম। এগুলো আসলে বিভিন্ন ধরণের করাতের নাম। যে করাত ব্যবহৃত হয় স মিলে। কাঠ কাটার কাজে।

কিন্তু এই পাহাড় সমুদ্রের দেশে এসে হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই স মিল কেন দেখতে যাব? দেখবার আছে কী? এই ঝকঝকে রোদেলা দিনে সুন্দর চাথাম দ্বীপে দাঁড়িয়ে শেষটায় কাঠ চেরাই দেখতে হবে! ধ্যাত কে যাবে দেখতে!

এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই বিদ্যুৎ চমকের মতো মনে হল, আরে চাথাম স মিল! এই স মিলের কথা তো জানি! বহু শুনেছি।

নিজের স্মৃতিশক্তির ওপর খানিকটা রাগ‌ই হল। বুড়ো হচ্ছি। বুঝলাম সেটাও।

**********************************************************************************

আন্দামানের চাথাম স মিল এশিয়া মহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ! ১৮৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স মিলের কাটা পাদুক কাঠ দিয়ে ইংল্যান্ডের বাকিমহাম প্যালেসকে সাজানো হয়েছে! এখনও বছরে ২০,০০০ লগ কাটা হয় এই মিলে। মজা হল এই বিপুল পরিমাণ কাঠ কিন্তু আন্দামানবাসীরাই ব্যবহার করেন। অতীতে এই স মিলের কাঠ পাড়ি দিত লন্ডন, নিউইয়র্কে।

পাদুকের পাশাপাশি পিউমা, গুর্জন, সাটিন, মার্বল উড, থিংগাম, কোকো, মহওয়া, লালচিনি, দিদু ইত্যাদি কাঠের চেরাই চলে এখানে। এই সব কাঠ বাড়ি তৈরির শাটারিং থেকে আসবাবপত্র, প্যাকিং বাক্স, বোট, প্লাইউড ইত্যাদি বহু কাজে ব্যবহৃত হয়। 

অদ্ভুত লাগে দেখতে বড় বড় কাঠের গুঁড়ি চুবিয়ে রাখা হয় সমুদ্রে। লবণাক্ত জলে 'সিজনড' হলে শুরু হয় চেরাইয়ের কাজ।

সমুদ্র পাহাড়ের অদ্ভুত কম্বিনেশন ছাড়াও আন্দামানে যে কী বিপুল পরিমাণ অরণ্য সম্পদ রয়েছে, সেটা চাথামের সরকারি এই স মিলটি দেখলেই বোঝা যায়। হাড্ডো জেটির এক/দুই কিমির মধ্যে থাকা চাথামের সঙ্গে পোর্ট ব্লেয়ারের যোগ সেতুর মাধ্যমে। প্রথমে সেই সেতু ছিল কাঠের। পরবর্তীতে কংক্রিটের সেতু তৈরি হয়। অবশ্য খাঁড়ি হওয়ায় এখানে সমুদ্র একেবারেই শান্ত। 

আর্চিবল্ড ব্লেয়ার যখন ১৭৮৯ সালে প্রথম আন্দামানে আসেন 'ভাইপার' নামের জাহাজ চেপে, তখন চাথাম লাগোয়া দ্বীপটিতে নামেন। বলা ভাল, নামতে বাধ্য হন। জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই দ্বীপ আজ ভাইপার দ্বীপ নামে পরিচিত। ভাইপার থেকে চাথামে এসে পেনাল সেটেলমেন্ট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। তাই চাথামের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নামটি গেঁথে রয়েছে। আর সম্ভবত সেই পদার্পণের সেদিন থেকেই স মিলের বীজ লুকিয়ে ছিল।

চাথামের বিখ্যাত স মিলটি কাজ শুরু করে ১৮৮৩ থেকে। প্রথমে সেকেন্ড হ্যান্ড বিদেশি মেশিন ব্যবহৃত হত। আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কাঠের যাবতীয় প্রয়োজনে এই মিল ছিল অতীতের একমাত্র ভরসা। আজও তাই। 

১৯৪২ এর ১০ মার্চ এই স মিলেই জাপানিরা বোমা ফেলে। মারা যায় প্রচুর শ্রমিক। সমুদ্রের জল উথালপাথাল হয়। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ জাপানিরা ছিল মিলের মালিক। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশরা আবার মিলের দখল নেয়। স্বাধীনতার পর ভারত সরকার দায়িত্ব নেয় ঐতিহাসিক চাথাম স মিলের।

আজ সাড়ে সাতশোর অধিক মানুষ চাথাম স মিলে কর্মরত। লগ ডিপো, মিল, টিম্বার প্রসেসিং, ইয়ার্ড ইত্যাদি বিভিন্ন ইউনিটে বিভক্ত হয়ে তারা কাজ করছেন। বিরাট বিরাট মেশিন, কাঠের লগ, মেশিনে কাঠ কাটার আওয়াজ ইত্যাদি সব মিলে এ যেন এক অন্য জগত!

২০০৬ সালে পরিবেশ ও বন দপ্তর একটি মিউজিয়াম তৈরি করেছে মিল চত্বরে। আন্দামান নিকোবরের প্রচুর দুষ্প্রাপ্য ছবি, নানা ধরণের সুভেনিয়ার, কাঠের দুর্দান্ত শিল্পকর্মে মিউজিয়ামটি সমৃদ্ধ। 

১৮৫৮ সালের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের যে দুশো সংগ্রামীকে আন্দামানে পাঠানো হয়েছিল এবং যাঁদের দিয়েই শুরু হয়েছিল বর্তমান আন্দামানের ইতিহাস, তাঁদের স্মরণে তৈরি চাথাম মেমোরিয়াল দেখে প্রণাম করলাম। ১৯৫৮ সালে ১০ মার্চ এই সংগ্রামীদের এখানে আনা হয়।

মিলের ১২৫ বছর পূর্তিতে ২০০৯ সালে স্থাপন করা হয়েছে পিলার অফ দ্যা প্ল্যানেট। রয়েছে সেই বোম্ব পিট। একটি বোমার অভিঘাত কী হতে পারে সেটি ওই বিরাট গর্তটি দেখলে বোঝা যায়। 

আন্দামানের ট্রাম লাইনের ইতিহাসও পাওয়া গেল মিলে। ১৮৯০ সালে ধানিকারিতে প্রথম ট্রামলাইন বসে। তখন ট্রাম ছিল পশুবাহিত। নির্দিষ্ট করে বললে মোষ টানত সেই গাড়ি। কোথাও কোথাও মানুষকেও টানতে হয়েছে কাঠের লগ বয়ে নেওয়ার জন্য। ১৯০৩ সালে স্টিম ইঞ্জিন আসে। ১৯৩১-এ উত্তর আন্দামানে হাতি টানা ট্রামের ব্যবস্থা করা হয়। ১২৫২ সালে আসে ডিজেল ইঞ্জিন চালিত ট্রাম। কিন্তু ১৯৯১-এর পর আর ট্রাম চলেনি আন্দামানে।

একটি স মিল যে এতটা ঐতিহ্যবাহী হতে পারে সে সম্পর্কে সত্যিই কোনও ধারণা ছিল না। মিলের প্রত্যেকটিই জায়গায় ইতিহাস লুকিয়ে। সময়ের ধুলো তাতে আজও গাঢ় হতে পারেনি। পাশেই সমুদ্র থেকে উঠে আসা বাতাস সেই ধুলোকে জাঁকিয়ে বসতে দিচ্ছে না। শুধু একটু ধৈর্য ধরে দেখা আর বোঝা। এক অসামান্য অভিজ্ঞতার সাক্ষী হওয়া যায় তাতেই!


*********************************************************************************

চাথামের স মিলে আন্দামানের অরণ্য জীবন সম্পর্কে কিছু জেনে চলে এলাম মানুষের জীবন জানতে। অবশ্য লোকাল বর্ন, সেটেলার বা সেকেন্ড ক্যাটাগরির মানুষদের নয়। আন্দামানের মূল বাসিন্দা অর্থাৎ জারোয়া, গ্রেট আন্দামানিজ, সেন্টিনেল, ওঙ্গি, নিকোবরি প্রমুখদের। ১৯৭৫-৭৬ সালে নির্মিত পোর্ট ব্লেয়ারের জোনাল আন্থ্রোপোলজিকাল মিউজিয়াম সেই জীবন তুলে ধরল। আন্দামানের আদিবাসী সমাজের সব কিছুই যেন এখানে মজুদ। এই আদিবাসীদের ব্যবহৃত বিভিন্ন আকারের নৌকো, অস্ত্রশস্ত্র, পোষাক, ব্যবহার্য জিনিসপত্র থেকে শুরু করে তাদের বাড়িঘরের মডেল পর্যন্ত রাখা। সঙ্গে অজস্র ছবি যেগুলি খুঁটিয়ে দেখতে অন্তত দিন সাতেক সময় লেগে যাবে! 

জারোয়াদের ব্যবহৃত বর্ম, নারলেক বা পাম পাতা দিয়ে বানানো বাস্কেট ইত্যাদি যে এই আদিবাসীদের শিল্পী সত্বাকে যেমন প্রকাশ করে তেমনি বিরাট বিরাট তীর দেখলে বোঝা যায় কতটা সংগ্রাম করে তাদের বেঁচে থাকতে হয় বোঝা যায় তা। বড্ড ভাল লাগল মিউজিয়ামটি। তবে মনে হল, দেখভালের একটু অভাব রয়েছে। আরও ঝকঝকে হতে পারত অসামান্য এই মিউজিয়ামটি।

**********************************************************************************

ফিশারিজ মিউজিয়াম বা জলজীবশালাও চমকপ্রদ। ৩৫০-এর ওপর বিভিন্ন প্রজাতির জলজ প্রাণীর এই বিরাট সংগ্রহ না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন, কী অদ্ভুত তাদের রূপ আর কী অপূর্ব গঠন। 'এক সে বড় কর এক' কোরাল দেখে জানলাম টেবল, ফ্যান, ব্রেন, ট্রি ইত্যাদি কত ধরণের গঠন তাদের! কচ্ছপের প্রজাতিগুলি দেখে বুঝলাম তাদের সম্পর্কে আমি অন্তত কিচ্ছু জানি না। সেই কোন সুদূর থেকে এরা পাড়ি দেয় আন্দামানে! আবার নির্দিষ্ট পথে ফিরেও যায়। রংবেরংয়ের মাছগুলি দেখলে মনে হল সারাদিন বসে বসে ওদের এই চলাফেরা দেখি। এত বিপুল জলজ প্রাণীর সংগ্রহ খুব কম মিউজিয়ামে দেখেছি। সেদিক থেকে এটা একটা বিরাট প্রাপ্তি হল। আর প্রদর্শনের মুন্সিয়ানায় এখানে রাখা জলজ জীবন থেকে চোখ ফেরাতে ইচ্ছে হয় না। আক্ষরিক অর্থেই।

*********************************************************************************

মিউজিয়াম পর্ব শেষ হল। আন্দামানের অরণ্য, মনুষ্য আর জলজ জীবন সম্পর্কে খানিকটা জানায় সুবিধে হল অনেকই। আন্দামানকে জানতে, বুঝতে এবং চাক্ষুষ দেখতে এটুকু জানা অত্যন্ত দরকারি। সেটা না হলে পদে পদে ঠোক্কর খেতে হয়। কেননা মূল ভূখণ্ডের আমরা আজও আন্দামান নিয়ে খুব বেশি কিছু জানি বলে মনে হয় না। আজও যেন আন্দামান অনেকই অজানা, অনেকই অচেনা।

পোর্ট ব্লেয়ারের বেশ কিছু এখনও বাকি। সেগুলি শেষ করে বেরিয়ে পড়ব দ্বীপে দ্বীপে। 

নিজেকে এখন সত্যিই পর্যটক মনে হচ্ছে। আমার আগে বহু জন বহু কিছু দেখে গেছেন। কিন্তু তাতে আমার কী? 

"আমার অনুভূতিতে তাহা যে অনাবিষ্কৃত দেশ। আমি আজ সর্বপ্রথম মন, বুদ্ধি, হৃদয় দিয়া উহার নবীনতাকে আস্বাদ করিলাম যে!"



কাঠের লগ সমুদ্রে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে 



ভাইপার দ্বীপের পথ, চাথাম  



                                                                                  চাথাম  


 চাথাম স মিল






চাথাম ব্রিজ 



































ফিশারিজ মিউজিয়াম 







এনথ্রোপোলজিকাল মিউজিয়াম 




ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্স থেকে রস ও নর্থ বে আইল্যান্ড যাওয়ার জেটি 


:I LOVE PORT BLAIR:


চার মহানগর সহ দেশের বেশ কিছু রাজ্যের রাজধানী দেখবার সুযোগ হয়েছে। কেন্দ্রশাসিত কয়েকটি অঞ্চল‌ও ঘুরে বেড়িয়েছি। 

পোর্ট ব্লেয়ারের সঙ্গে কিন্তু কারোর তুলনা করতে পারছি না। সমুদ্র দিয়ে ঘেরা আর ছোট ছোট টিলা দিয়ে ঢাকা শহরটা প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই নানা রঙের বোগেনভিলা ফুটে আছে। কৃষ্ণচূড়া, অমলতাস ইত্যাদির সংখ্যাও প্রচুর। রাস্তাগুলি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ট্রাফিকের মারাত্মক ব্যস্ততা নেই। সমুদ্রের ধীরে ধীরে আসা ঢেউয়ের মতো বেশ ঢিলেঢালা জীবন। রাস্তার ধারে বাইক বা সাইকেল খোলা রেখে গেলেও চুরি হওয়ার কোনও ভয় নেই। তবে সমস্যা পানীয় জল আর বিদ্যুতের। মাঝে মাঝেই ডুব দেয় তারা। একটি আধা গ্রামীণ আর আধা শহুরে ছাপ যেন আজও পোর্ট ব্লেয়ারের গায়ে। 

**********************************************************************************

দাঁড়িয়ে আছি ফ্ল্যাগ পয়েন্টে। আমার সামনে ভারতের বিরাট পতাকা সমুদ্রের হওয়ায় উড়ছে পতপত করে। সামনে কূলহীন সমুদ্র হলেও, দেখা যাচ্ছে রস ও নর্থ বে নামের আইল্যান্ড দুটি। খানিক আগের দেখা ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্সের জেটি থেকে স্পিড বোট আর অন্য ভেসেলগুলি চলছে গন্তব্যে। 

ফ্ল্যাগ পয়েন্টের কাছেই জিমখানা মাঠে ১৯৪৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্দামানকে স্বাধীন ঘোষণা করেছিলেন। সেই স্বাধীনতা অবশ্য বেশিদিন টেকেনি। তবু ভারতের ইতিহাসে ওই দিনটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ওই বছরটিকে স্মরণে রেখে মেরিন রোডের ধারের এই জায়গাটিতে স্মারক বসানো হয়েছে। তৈরি হয়েছে একটি ছোট্ট বাগিচা। রোদ উপেক্ষা করা গেলে, এখানে বসে সারাদিন কাটিয়ে দেওয়া যায়। 

ব্যস্ত মেরিন রোড অত্যন্ত সুদৃশ্য। সমুদ্র তীরের এই পথের উল্টোদিকে এস রাধাকৃষ্ণন পার্ক, রামকৃষ্ণ মিশন, রাজকীয় মহাবিদ্যালয়, কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতির বাড়ি সহ বহু কিছু। অদূরে ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্স আর বিরাট মেরিন পার্ক। মেরিন পার্কে মনীষীদের মূর্তির পাশাপাশি বিনোদনের বহু কিছু মজুদ। মেরিন পার্কের উল্টোদিকের টিলায় ভারতের মানচিত্রটি দেখলে চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করে না। প্রশস্ত রাজপথে গাড়িঘোড়ার পাশাপাশি ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা স্কেটিং করছে। সব মিলে জমজমাট অবস্থা।

খানিক আগে দেখেছি জগার্স পার্ক আর গান্ধি পার্ক। সাদিপুরের ভি আই পি রোডের ধারে উঁচু পাহাড়ের ওপর তৈরি হওয়া জগার্স পার্ক অত্যন্ত সুদৃশ্য। উঁচুতে বলেই পোর্ট ব্লেয়ারের অনেকটা অংশ এখান থেকে দেখা যায়। মরশুমি ফুলে ছাওয়া এই পার্কের থেকে দেখা যায় রস আইল্যান্ড‌ও। সকাল বিকাল হাঁটার ৪.৬ মাইল বৃত্তের এই পার্কের বিকল্প হতে পারে না আর।

জগার্স পার্ক, মেরিন পার্ক ইত্যাদি যেমন ঝাঁ চকচকে পোর্ট ব্লেয়ারের নতুন সংযোজন, ঠিক তেমনি গান্ধি পার্ক পুরোনো দিনের স্মৃতি বহন করছে। একসময় এই পার্কের ভেতরের দিলথামান ট্যাঙ্ক ছিল আন্দামানের জলের উৎস। জাপানিজ মন্দির, বাঙ্কার, বিভিন্ন ধরণের রাইড ইত্যাদির ব্যবস্থা থাকলেও, দেখভালের অভাবে সামান্য হলেও পার্কের সৌন্দর্য নষ্ট হয়েছে। তবে পার্কের মাঝে সবচেয়ে উঁচু জায়গায় বিরাট গান্ধি মূর্তি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। পার্কে ফুলের সমারোহও লোভনীয়। কাছেই সেক্রেটারিয়েট, আন্দামানের মুখ্য শাসকের নিবাস সহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সরকারি অফিস। 

পোর্ট ব্লেয়ারে রাধাকৃষ্ণ মন্দির, গুরুদোয়ারা, দক্ষিণ ভারতীয় মন্দির, জুলজিকাল গার্ডেন ইত্যাদির মতো আরও কিছু দ্রষ্টব্য রয়েছে, কিন্তু এবার আমাদের গন্তব্য করবাইন কোভসে, সেই অর্থে, আন্দামানের প্রথম সি বিচে। 

শহরের কেন্দ্র থেকে মেরিন ড্রাইভ ধরে কিমি তিনেক দূরে করবাইন কোভস। দুই দিকে উঁচু পাহাড়ের মাঝে অর্ধচন্দ্রাকৃতি বিচটি মুহূর্তেই মন কেড়ে নেয় নিজস্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে। খানিক দূরে সমুদ্রের মাঝে স্নেক আইল্যান্ড। স্পিড বোটে সাহসীরা দ্বীপ পর্যন্ত যাচ্ছে মূহুর্মুহ। পাশেই রয়েছে ব্ল্যাক আইল্যান্ড। করবাইন কোভসের সূর্যোদয় অত্যন্ত সুন্দর। মিহি হলুদ বালি, নীল সমুদ্রের জল আর লাল টকটকে সূর্য মিলে যে ছবি দেখা যায় তা সত্যিই বাঁধিয়ে রাখার মতো।

পোর্ট ব্লেয়ারের ২৪ কিমি দূরে পান্না সবুজ জলের বিচ চিড়িয়াটাপু দেখে বুঝলাম কেন আন্দামান পর্যটন মানচিত্রে ওপরের সারিতে। সংকীর্ণ খাঁড়ি দিয়ে সমুদ্র এখানে প্রবেশ করেছে পাহাড়ের নিচে। পাহাড়টি আবার জঙ্গলে ঢাকা। সেই পাহাড়ের ট্রেক করে কিমি খানেক ওপরে উঠলে মেলে ভিউ পয়েন্ট, যা সুইসাইড পয়েন্ট নামেও খ্যাত। বিচে ভিড় তুলনায় কম। বসবার ব্যবস্থা প্রচুর। রয়েছে ম্যানগ্রোভ অরণ্যও। জাতীয় উদ্যান ঘোষিত হয়েছে পাহাড় জঙ্গল সমুদ্রের চিড়িয়াটাপু। 

রীনা চটি খুলে সমুদ্রে পা ভেজাতে নেমে গেল। নরম বালির বিচে হেঁটে বেড়ানোর মজা আলাদা। আমি অবশ্য কোনও একটি জায়গায় বসে সমুদ্র দেখতে ভালবাসি। 

আমি বসে রইলাম তাই। সমুদ্রের জল আমার সামনে এসে ফিরে যেতে লাগল বারবার। বোধহয় আমাকেই ডাকতে....




ফ্ল্যাগ পয়েন্ট 




মেরিন ড্রাইভে 


করবাইন কোভ বিচ 




চিড়িয়াটাপু বিচ 





করবাইন কোভ বিচ 







রামকৃষ্ণ মিশন 



গান্ধি পার্ক 



মেরিন ড্রাইভ 



জগার্স পার্ক 





রাজকীয় মহাবিদ্যালয় 


মেরিন পার্ক 






ফ্ল্যাগ পয়েন্টে নেতাজির কথা 




:দ্বীপে দ্বীপান্তরে:

ঘড়ির কাঁটায় সবে সাতটা বাজে। কিন্তু হাড্ডো জেটিতে ভিড় যথেষ্টই। বিভিন্ন দিকে ক্রুজ, ভেসেল চলছে। স্থলপথে অভ্যস্থ চোখে অবাক লাগে দেখে বৈকি! কিন্তু ব্যাপারটা আর কিছুই না। আমাদের যেমন বাস স্ট্যান্ড বা স্টেশন, এটিও তাই। শুধু অনন্ত জলরাশির এই পথে সাথী হল সমুদ্র।

এয়ারপোর্টের কায়দায় ব্যাগেজে স্টিকার লাগল। সিকিউরিটি চেকও হল। তারপর লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে জেটিতে প্রবেশ।

ঢুকেই চোখ ছানাবড়া। দাঁড়িয়ে আছে এক বিরাট জাহাজ। দেখেশুনে বুঝলাম ইংল্যান্ড থেকে এসেছে সেটি। এরকম বিরাট জাহাজ আমি এর আগে দেখিনি। জেটি অফিস ও প্রবেশ মুখে ছবি তোলা বারণ হলেও, এখানে সেই নিষেধাজ্ঞা নেই। তাই লোভ সামলানো গেল না সকালের এই সোনা রোদে।

চলেছি হ্যাভলক দ্বীপে। নাম পাল্টে সেটি এখন স্বরাজ দ্বীপ। সেখান থেকে যাব নিল বা শহীদ দ্বীপে। আমাদের ক্রুজের নাম নওটিকা। ২০২২ সালে জলে নেমেছে অত্যাধুনিক এই ক্রুজটি। ডবল ডেকার ক্রুজের দোতলায় আমাদের টিকিট। রাজকীয় ব্যবস্থা। ঝকঝকে বিলাসবহুল ক্রুজ যথা সময়ে রওনা দিল। গতিবেগ ঘণ্টায় ৩০ নট। সেই হিসেবে হ্যাভলকে পৌঁছতে অন্যেরা ঘণ্টা দুয়েক নিলেও এ পৌঁছে যাবে দেড় ঘণ্টায়।

পোর্ট ব্লেয়ার থেকে পূব দিকে একটু এগোতেই চোখে পড়ত রস আর নর্থ বে আইল্যান্ড। গতকাল সারাদিন এই দুই আইল্যান্ডে সময় কেটেছে। সে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা!

*********************************************************************************

ব্রিটিশ মেরিন সার্ভেয়ার ড্যানিয়েল রসের নামে নামাঙ্কিত দ্বীপটি ১৯৯৬ সালে লক্ষ্মীবাইয়ের নামে রাখা হয়। তবে আজকাল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু দ্বীপ নামেও পরিচিত রস। পোর্ট ব্লেয়ারের খুব কাছের এই ছোট্ট ভূখণ্ডে অতীতে ছিল ব্রিটিশদের প্রশাসনিক ভবন। ১৮৫৮ সালে যখন দ্বিতীয় দফায় আন্দামানে পেনাল সেটেলমেন্ট শুরু হয়, তখন ব্রিটিশরা পোর্ট ব্লেয়ারের কাছের তিনটি দ্বীপের অধিকার নেয়। এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার এইচ মান ব্রিটিশ পতাকা উত্তোলন করেন দ্বীপে। সেটা জানুয়ারি মাস। মার্চ মাসে জেল সুপারিনটেনডেন্ট জে পি ওয়াকার বন্দিদের নিয়ে আন্দামানে এসে জল কষ্টের সম্মুখীন হন। ফলে পোর্ট ব্লেয়ারের পূর্বে এই দ্বীপটিতে প্রশাসনিক ভবন তৈরি করা হয়।

ব্রিটিশ চিফ কমিশনারও থাকতেন এই দ্বীপে। ১৯৪১ সালের প্রবল ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রস। পরবর্তীতে জাপানিদের আক্রমণে আরও বাজে অবস্থা হয় দ্বীপের। ১৯৪৫-এ ব্রিটিশরা আবার দ্বীপের অধিকার নিজেদের হাতে নিলেও প্রশাসনিক দপ্তর আর ফেরেনি। পরিত্যক্ত হয় রস। 

ব্রিটিশ ও জাপানি উপনিবেশের স্মৃতি নিয়ে রস কেমন যেন ছন্নছাড়া। চিফ কমিশনার হাউস, চার্চ, হাসপাতাল, টেনিস কোর্ট সব কিছুই আজ ধ্বংসের মুখে। বিরাট বিরাট গাছপালা আর তাদের শেকড় জড়িয়ে ধরেছে পুরোনো বাড়িগুলিকে। সব মিলে রস যেন এক অন্য জগৎ। যদি মন কল্পনাপ্রবণ হয়, অতীতের জন্য যদি ভালবাসা থাকে তবে রসের মতো সুন্দর দ্বীপ আর একটিও নেই। কিন্তু সেটি না হলে উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা তিওয়ারিজির মতোই মনে হবে "ইয়ে কেয়া হ্যায়! খন্ডহর দেখনে কে লিয়ে কৌন আতা হ্যায় ইধার!"

ফিনিক্স বে'র জেটি থেকে বড় ভেসেলে রসে পৌঁছেছিলাম। মিনিট পাঁচ সাতেকের সমুদ্র যাত্রায় রসে যখন নেমেছি তখন কড়া রোদ। আকাশ ভয়ানক নীল। 

রস দ্বীপটি টিলাময়। যে প্রান্তে নামা সেখান থেকে শুরু হয় টিলায় ওঠা। আর উঠবার রাস্তার দুধারে দেখা মিলল অতীতের ব্যারাক, প্রশাসনিক ভবন, প্রেস, চার্চ, কবরস্থান, গ্র্যান্ড বলরুম, টেনিস কোর্ট, হসপিটাল ইত্যাদির। একদম ওপরে পৌঁছে চারদিকের দৃশ্য দেখে মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম। সমুদ্রের নীল জল, আকাশ, দূরের দুই একটি দ্বীপ সব মিলে অনবদ্য চারদিক। 

টিলার ওপারে, উত্তরে, সমুদ্রের মাঝে লাইট হাউস। দ্বীপ থেকে পৌঁছে যাওয়া যায় সেখানে সমুদ্রের ওপর দিয়ে তৈরি করা পথের সাহায্যে। তার আগে অবশ্য নামতে হবে বেশ কিছু সিঁড়ি। লাইট হাউসের এখানে, সমুদ্রের মাঝে, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কমান্ডার ইন চিফের ফ্ল্যাগ ২৫ জুলাই, ২০২২ এখানে স্থানান্তরিত হয়েছে। এই অসাধারণ দৃশ্য চোখে না দেখলে বোঝা যায় না, একজন ভারতীয় হিসেবে কতটা গর্বিত বোধ হয় ওরকম জায়গায়!

রস আইল্যান্ডের লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো-তে রস সহ সমগ্র আন্দামানের ইতিহাস জানা যায়। বড্ড দামি এই শো'টি। তবে রস ও নর্থ বে আইল্যান্ড সারাদিনের পর্যটন সূচিতে থাকে বলে অনেকের পক্ষেই সেটা দেখা সম্ভব হয় না।

রস থেকে মিনিট পনেরোর জল যাত্রায় পৌঁছে যাওয়া যায় নর্থ বে আইল্যান্ড। পোর্ট ব্লেয়ারের উত্তরে অবস্থিত বলে দ্বীপটির এই নাম। এখানেও টিলা। আর তার ওপর লাইট হাউস। হেঁটে ওঠা যায় টিলায়। কুড়ি টাকার পুরোনো নোটে (যেগুলির রং পিঙ্ক, তুলনায় নতুন নোটের চাইতে বড়) যে ছবি দেখা যায়, তা নর্থ বে দ্বীপের। সেরকমই একটি ছবি এই লেখার সঙ্গে ছবিতে রয়েছে। আগ্রহী হলে মিলিয়ে দেখতে পারেন। 

নর্থ বে'র নিজস্ব কোনও জেটি নেই। জলের ওপর ভাসমান অস্থায়ী জেটি দিয়ে দ্বীপে নামতে হয়। সঠিক ভাবে ও সাবধানে পা না ফেললে পড়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। 

রস বা পোর্ট ব্লেয়ারের মতো নর্থ বে'র কোনও গৌরবময় ইতিহাস নেই। কিন্তু যা আছে তাতে বোধহয় সে টেক্কা দিয়েছে সবাইকে। আসলে এই দ্বীপকে ঘিরে প্রায় দুই কিমি জায়গা জুড়ে রয়েছে প্রবাল প্রাচীর। সমুদ্রের তলার সেই প্রাচীর আর জলজ জীবন দেখতে পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের কথা। অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে, সরকারি নিয়মেই প্রতিনিয়ত দেখবার ও দেখানোর জায়গা বদলে যায়। শুধু প্রবাল প্রাচীর নয়, জলের তলার বিভিন্ন রঙিন মাছ ও অন্যান্য প্রাণী এবং উদ্ভিদরা এখানে তৈরি করেছে ন্যাচারাল অ্যাকুয়ারিয়াম। 

নর্থ বে'র প্রবাল প্রাচীর ও জলজ জীবন দেখবার বেশ কিছু ব্যবস্থা রয়েছে। অনেকে সি ওয়াকিং বা স্কুবা ডাইভিং করেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশিক্ষিত গাইড থাকা আবশ্যিক। পঞ্চাশ বছরের ওপরে যারা তাদের জন্য স্কুবা ডাইভিং নিষিদ্ধ। এছাড়াও রয়েছে সেমি সাবমেরিনের সাহায্যে জলের তলার জীবন দেখা। সেমি সাবমেরিনের ওপর তলায় চলে গান বাজনা চালিয়ে দেদার ফুর্তি।

আমি ছাপোষা নির্ভেজাল ভিতু বাঙালি। মিথ্যে গুছিয়ে বলতে পারি না। নিজের বয়স লুকিয়ে ঝুঁকি নিয়ে হিরোগিরির শখ‌ও নেই। সমুদ্রের ধারে বসে অনন্ত সময় কাটাতে ভালবাসি। জলে নামতেও নয়। নাচানাচি হইচইয়ে পারদর্শী নই। তাই চেপে বসলাম বিপুল শক্তিশালী লেন্স লাগানো জলযান ডলফিনে। ডলফিনের মতো দেখতে সেই ভেসেল আমাদের নিয়ে গেল সমুদ্রে। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালো সমুদ্রের নিচের সেই অজানা জগৎ। লেন্স দিয়ে দেখতে পাচ্ছি একের পর এক প্রবাল প্রাচীর। কী তাদের রূপ আর কী তাদের রং ও আকৃতি। ফাঁকে ফাঁকে খেলা করছে অজস্র মাছ। প্রকৃতির দেওয়া নিজস্ব রূপে তারা সমৃদ্ধ। অসামান্য এক অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম বেশ খানিকটা সময় ধরে।

সব কিছু দেখাতে দেখাতে ডলফিন যে কখন আমাদের প্রায় রসের কাছে নিয়ে গিয়েছিল বুঝতে পারিনি। ফেরার পথে ডলফিন স্পিড বোটের মতো গতি তুলে বেশ মজা দিল। ক্রু মেম্বার এক তরুণ নিজে থেকে রীনা আর আমার ছবিও তুলে দিল বেশ কিছু (ভিডিও ও ছবি দ্রষ্টব্য)।

বাকি সময় নর্থ বে'র সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে, পাতায় ছাওয়া ঘরে প্রায় শুয়ে বসে কাটিয়ে, ডাবের জল খেয়ে, ছোট ছোট দোকানগুলি থেকে কিছু সুভেনিয়ার দেখে ও কিনে কোনদিক দিয়ে যে কেটে গেল টেরই পেলাম না। যখন ফিরছি পোর্ট ব্লেয়ার, তখন সূর্য অস্ত যাবে প্রায়। দূরের মেরিন পার্ক, ফ্ল্যাগ পয়েন্ট, জেটি সবেতেই সন্ধ্যা নামছে। 

আর ঘনায়মান সেই সন্ধ্যায় ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্সের সামনে দুটি স্মৃতি স্মারক মনকে বিষন্ন করে তুলল। একটি তৈরি করা হয়েছে ১৮৫৯ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দামানের আদিবাসীদের লড়াইয়ে নিহত শত সহস্র বীর যোদ্ধাদের জন্য। এই যুদ্ধ আন্দামানের ইতিহাসে 'ব্যাটল অফ আবারডিন' নামে পরিচিত। আর একটি উৎসর্গ করা হয়েছে ২০০৪ সালের ভয়ঙ্কর সুনামিতে মৃত আন্দামানের বাসিন্দাদের জন্য। কান পাতলে আজকের আন্দামানেও প্রায় দুই দশক আগের সেই বিভীষিকা শোনা যায়। কত জায়গায় সুনামির ফলে সমুদ্রের জল ঢুকে চাষের জমি শেষ হয়ে গেছে! কোথাও আবার সেই জল ব্যাক ওয়াটারের মতো রয়েই গেছে। আন্দামানবাসীর একাংশ আজও বিশ্বাস করেন, সুনামি না হলে এই দ্বীপপুঞ্জ যে ভারতের অংশ সেটা বৃহত্তর ভারতবাসী জানত না। সুনামি ক্ষতি করলেও এটুকু করেছে, আন্দামানকে চিনিয়েছে।

*********************************************************************************

- Thank you for choosing us. We are very near to Havelock. Hope to reach within fifteen minutes. Hope a pleasant stay here. Those who are going to Nil please be seated. 

ন‌ওটিকার ক্যাপ্টেনের গলা পেয়ে সম্বিত ফিরল। পোর্ট বে থেকে রওনা হওয়ার পর খানিকক্ষণ দ্বীপগুলি দেখা যাচ্ছিল। তারপর চারদিকে শুধুই জল আর জল। এখন আবার দূরে দেখা যাচ্ছে সবুজ ডাঙা। হ্যাভলক চলে এলো। দেড় ঘণ্টা কেটে গেল সমুদ্রপথে। এত সুন্দর এলো নওটিকা যে সমুদ্রযাত্রার দুলুনি বা ঝাঁকুনি কিছুই বুঝলাম না। 


 রস আইল্যান্ড থেকে পোর্ট ব্লেয়ার 



নর্থ বে`র স্কুবা ড্রাইভিং এক্সপার্ট 



                                                                            রস আইল্যান্ড


                                                 






নর্থ বে, কুড়ি টাকার পুরোনো নোটে এই ছবিই দেখা যায় 



নর্থ বে থেকে রস আইল্যান্ড 




ডলফিন বোট 



রাজীব গান্ধির মূর্তি 




সুনামি স্মারক, ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্স, পোর্ট ব্লেয়ার 



ব্যাটল অফ আবার্ডিন শহীদ স্মারক 




 নর্থ বে 



রস আইল্যান্ডের অতীত স্মৃতি 












নর্থ বে`র দোকানপাট 





রস আইল্যান্ড 




ডলফিন বোট যখন জোরে চলল 


রস আইল্যান্ডে পৌঁছনো 



:দ্বীপে দ্বীপান্তরে:


এতদিন গোপন রেখেছিলাম যে কথাটি, সেটি এবার না বললে নয়....


আন্দামানে যাওয়ার জন্য যখন সব প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি, তখন জেনেছিলাম বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় 'মোখা' (কেউ কেউ বলছেন মোচা) আসছে। পূর্বাভাস বলছিল, যে সময় আমরা আন্দামানে থাকব, সেই সময়ই তার তাণ্ডব শুরু হবে। আর এই ঝড়ের উৎপত্তিস্থল হচ্ছে আন্দামান সাগর।


সব জেনেও পিছিয়ে আসিনি। একটা রোখ চেপে গিয়েছিল। তাছাড়া এরকম ঘূর্ণিঝড় কী করতে পারে, সেটা দেখবার একটা সুপ্ত ইচ্ছেও ছিল। আন্দামানের হ্যাভলক দর্শন আমার প্রায় শেষ হতে চলা জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হয়ে রইল। বাকি আর যে কটা দিন আছি, ভুলব না সেই অভিজ্ঞতা। তবে সে কথা এখন নয়। খানিক পরে।


*********************************************************************************


ব্রিটিশ জেনারেল স্যার হেনরি হ্যাভলকের নামে পরিচিত এই দ্বীপ আজ স্বরাজ দ্বীপ বলা হয়। প্রধানমন্ত্রী মাননীয় নরেন্দ্র মোদি ২০১৮ সালে দ্বীপের নতুন নামকরণ করেন। এই নামকরণের ইতিহাস অবশ্য লুকিয়ে ১৯৪৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে স্বাধীন ঘোষণা করার বার্তায়। 


'রিচিস আর্কিপেলাগো'র অন্যতম বৃহৎ এই দ্বীপটি লম্বায় ১৮ কিমি, চওড়ায় ৮ কিমি। দ্বীপের কোস্টলাইন হল ৫৮.৫ কিমি। অন্যান্য দ্বীপের মতো এটিও টিলা আর জঙ্গল অধ্যুষিত। তবে জঙ্গলে কোনও হিংস্র প্রাণী নেই। বাড়িঘরগুলি ইতস্তত ছড়ানো। মাঝে প্রচুর ফাঁকা জায়গা। 


কিন্তু রিচিস আর্কিপেলাগো ব্যাপারটি কী? আর্কিপেলাগো বলতে বোঝায় ছোট ছোট দ্বীপের ক্লাস্টারকে। ব্রিটিশ মেরিন সার্ভেয়ার জন রিচি দুই দশক ধরে আন্দামান ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় সমীক্ষা চালিয়ে প্রথম আন্দামান ও নিকোবর সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্য তাঁর এই অসাধারণ কাজ সে আমলে বিশেষ পাত্তা পায়নি। হতাশ মানুষটি ১৭৮৭ সালে নিজের দেশে ফিরে যান। আর কী পরিহাস, তার ঠিক বছর দুই পরে তাঁরই দেখানো দ্বীপপুঞ্জে পেনাল সেটেলমেন্ট তৈরি করতে পা রাখে ব্রিটিশরা।


হ্যাভলক দ্বীপে আমাদের আস্তানা হল ডলফিন রিসোর্টে। আধা-সরকারি এই বিরাট রিসোর্টটির ব্যবস্থাপনা অতুলনীয়। বিশাল জায়গা নিয়ে তৈরি হওয়া রিসোর্টে বিভিন্ন ধরণের কটেজ রয়েছে। আছে রেস্টুরেন্ট, বার, অ্যাসেম্বলি হল আর নিজস্ব বিচ। সম্পূর্ণ রিসোর্ট নারকেল বাগিচায় ছাওয়া। তা বাদেও আছে নানা ধরণের গাছ, ফুল। ঝুনো নারকেল পড়ে রয়েছে সর্বত্র। কেউ তাকিয়েও দেখছে না। ব্যাগপত্র রেখে দৌড়লাম নিজেদের বিচে। সবুজ পান্নার মতো জল। জোয়ারের সময় বলে বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে। একদিকে মিহি বালি আর অন্য দিকে শক্ত মাটি। সময় যে কোনদিক দিয়ে কেটে গেল টেরও পেলাম না!


ঠিক করাই ছিল রাধানগর বিচে অনেকটা সময় কাটাব। দেখব সানসেট। হ্যাভলকের এই বিচটি ২০০৪ সালে টাইম পত্রিকার বিচারে এশিয়ার শ্রেষ্ঠ বিচের মর্যাদা পেয়েছে। পৃথিবীর সেরা দশটি বিচের অন্যতম এটি। এছাড়াও ২০২০ সালে পেয়েছে অত্যন্ত মর্যাদাকর ব্লু ফ্ল্যাগ বিচের তকমা। Foundation for Environmental Education থেকে প্রদত্ত এই পুরস্কারের ক্ষেত্রে জলের কোয়ালিটি, পরিবেশ সম্পর্কিত তথ্য, পরিবেশ রক্ষা এবং সুরক্ষা ও সার্ভিস ইত্যাদি দিকগুলি দেখা হয়। যেসব জায়গায় স্থানীয় কমিউনিটি নিজেদের প্রচেষ্টায় কোনও বিচকে প্রোমোট করে, তারাই এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়। 


রাধানগর বিচের বিশালত্বের মাঝে মুহূর্তেই হারিয়ে গেলাম। উত্তরের দিকে জঙ্গল আর টিলা আর সামনে বিরাট বেলাভূমি ও সমুদ্র। তার রঙ কখনও নীল হচ্ছে, কখনও সবুজ। ঢেউ ভাঙছে খুব মৃদু লয়ে। আবার কখনও বিরাট বিরাট ঢেউ আছড়ে পড়ছে নিজেদের খুশি মতো। দক্ষিণের দিকে কিছু রক আর টিলার এগিয়ে আসা অংশ। সেটা পার করেও একই রকম চঞ্চল সমুদ্র। দুই কিমি লম্বা এই বিচের ট্রপিক্যাল অরণ্যও অসাধারণ। 


একটা গাছের গুঁড়ি দেখে জাঁকিয়ে বসলাম। রীনা পাগলের মতো লাফাচ্ছে। লোকজন খুব কিছু নেই। তবু তার মধ্যে অস্ট্রিয়া থেকে আসা বারবারা নামের এক তরুণীর সঙ্গে রীনার ভাব হয়ে গেল। হাত ধরাধরি করে খানিকক্ষণ দুজনে ঘুরে ফিরেও বেরালো। দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি প্রতিটি মুহূর্ত নিংড়ে নিলাম! এক অসামান্য অভিজ্ঞতা। এর কোনও তুলনাই হয় না!


সাড়ে নয়টার মধ্যে ডিনার হয়ে গেলেও, রিসোর্টের বিচে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। রাতের সমুদ্রের একটা অন্যরকম মাদকতা আছে। বিরাট বিরাট রকের গায়ে ধাক্কা খেয়ে জল যখন ছড়িয়ে পড়ে, আধা-অন্ধকারে তার রূপ আলাদা হয়ে যায়! সঙ্গে রয়েছে সমুদ্রের নিজস্ব সঙ্গীত। সেই গান যে শুনেছে সে মরেছে!





***********************************************************************************


সূর্যোদয়ের আগেই উঠেছিলাম। দেখি সমুদ্র অনেকটা দূরে সরে গেছে। ঝটপট রেডি হয়ে চলে গেলাম কালাপাথর বিচে। আগেই ঠিক ছিল, এলিফ্যান্ট দ্বীপ দেখব না। 


কালাপাথর বিচের কথা প্রথম শুনেছিলাম ছোট ভাই প্রসূনের কাছে। নিজে দেখে বুঝলাম এক বর্ণ বাড়িয়ে বলেনি ও। সত্যিই পিকচার পোস্ট কার্ডের মতো এই বিচ। ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এখানে সমুদ্রের সঙ্গে মিলে এমন শিল্প সৃষ্টি করেছে যে, তার দ্বিতীয় উদাহরণ একটিও নেই।


বসে বসে দেখছি সেসব। কোচবিহার থেকে অলকদার ফোন এলো। টিভিতে দেখাচ্ছে মোখা চোখ রাঙাচ্ছে। আমরা কেমন আছি! দিব্যি রোদ। দারুণ সুন্দর চারদিক। ছবি তুলে অলকদাকে পাঠালাম। খানিক পর হালকা বৃষ্টি শুরু হল। সমুদ্রে বৃষ্টির অন্য রূপ। সেটার আনন্দও নেওয়া গেল। কিন্তু বৃষ্টি ধরতেই এলো খারাপ খবর। 


*****************************************


মোখা তাণ্ডব শুরু করেছে। অতএব পোর্ট ব্লেয়ার থেকে আজ কোনও ক্রুজ আসেনি। হ্যাভলক থেকেও জলযান ছাড়বার অনুমতি মেলেনি। সাধারণত হ্যাভলক থেকে দফায় দফায় নিল যাওয়ার বোট মেলে। কিন্তু নিল দ্বীপ ওপেন সি তে হওয়ায় সেখানে সমুদ্র উত্তাল। হ্যাভলক খানিকটা খাঁড়ির মধ্যে। 


মাথায় হাত পড়ল। ভাই রুদ্রর মুখে শুনে শুনে নিল সম্পর্কে আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু শুধুমাত্র নিলের জন্য এতদিন অপেক্ষা করা বোকামি। কেননা পরশু আমার যাওয়ার কথা ডিগলিপুর। যে কোনও ভাবে আগামীকাল পোর্ট ব্লেয়ার পৌঁছতেই হবে। কাল সকালে আবহাওয়া ঠিক হলে না হয় নিল ছুঁয়ে পোর্ট ব্লেয়ার চলে যাব। থাকলাম না নিলে। সেরকম হলে পোর্ট ব্লেয়ার থেকে দিন এসে দিন ফিরে যাব। এসব নানা ভাবনার মধ্যেই খবর এলো দিন তিনেকের মধ্যে নিলে যাওয়ার অনুমতি আর পাওয়া যাবে না!


কী করব, না করব বুঝতে পারছি না। সাহায্য করল অনন্ত। আমি ঠিক ট্যুর অপারেটরের সাজানো সূচিতে না ঘুরলেও, হোটেল বুকিং আর গাড়ির জন্য সাহায্য নিচ্ছিলাম। হ্যাভলকের বাঙালি তরুণ অনন্ত সেরকমই একজন। যাহোক বিকেলের দিকে সমুদ্রের আবহাওয়া একটু ভাল হওয়ায় পোর্ট ব্লেয়ার থেকে নওটিকা সহ আরও একটি ক্রুজ এলো। 


কখনও ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি, কখনও হালকা রোদ আর মেঘ এরকমই চলছিল। বুঝবার কোনও উপায় নেই মাঝ সমুদ্রে কী চলছে। যাহোক অনন্ত আমাদের ব্যবস্থা করে দিল। এমনিতে আমাদের টিকিট ছিল হ্যাভলক থেকে নিল আর নিল থেকে পোর্ট ব্লেয়ার। মাঝে নিলে এক রাত থাকা। হ্যাভলক-নিল টিকিট ক্যানসেল হচ্ছে। কিন্তু নতুন করে টিকিট কাটবার দরকার নেই। ওই টিকিটেই হয়ে যাবে। কেননা নিলে আগামী তিন চারদিন কোনও ভেসেল যাবে না।


 নওটিকায় জানালার ধারে বসলাম। নিল দেখতে পেলাম না বলে মন বিষন্ন হয়ে রয়েছে। তবে এই মুহুর্তের পরিস্থিতি বিচারে পোর্ট ব্লেয়ার ফেরাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।


******************************************


মিনিট দশেকের মধ্যে মাঝ-সমুদ্রে এসে পড়লাম। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক ক্রুজে বসে টের পাচ্ছিলাম সমুদ্রে প্রলয় চলছে। হাওয়ার প্রবল বেগ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।


আমাদের সমান্তরাল চলছে আর একটি ক্রুজ। খানিক পর শুরু হল প্রবল দুলুনি! একতলা দেড় তলা বাড়ির সমান উঁচু এক একটি ঢেউ আছড়ে পড়তে শুরু করল ক্রুজের গায়ে। খোলামকুচির মতো একবার ঢেউয়ের ওপরে উঠছি, মুহূর্তেই ধপ করে নিচে নামছি। ঢেউ কখনও ঢেকে দিচ্ছে ডাবল ডেকার ক্রুজকে। আমাদের সঙ্গে থাকা ক্রুজটি পিছিয়ে গেছে। অথবা ফিরে গেছে।


অবর্ণনীয় অবস্থা। জানালার ধারে বসেছি বলে সমুদ্রের অবস্থাটা ভাল করে বুঝতে পারছিলাম। কোথায় সেই গাঢ় নীল অথবা পান্না সবুজ সমুদ্র! বরং কুচক্রির ঘোলাটে চোখের মতো তার রঙ। দু'হাত তুলে বিপুল জলরাশি সে ছুঁড়ে দিচ্ছে আমাদের দিকে। রীতিমতো ছেলেখেলা করছে।


বাতাস আর সমুদ্রের মিলিত গর্জনে ক্রুজের আওয়াজ চাপা পড়ে গেছে। ঢেউ ওপরে উঠে যেন থাপ্পড় মারছে ভেসেলের মাথায়। টালমাটাল অবস্থা। এ ওর গায়ে পড়ছে। বিলাস বহুল ক্রুজের স্মার্ট টিভি থেকে শুরু করে সব কিছু বন্ধ। শুধু পরিত্রাহি চিৎকার। আমার চোখে শুধু পুত্রের মুখ ভাসছে! যে অবস্থা তাতে আর উপায় নেই। আজ আর বাঁচব না। সলিল সমাধি হবে বুঝতে পারছি। থর থর করে কাঁপছে নওটিকা। অন্ধকারও ঘনিয়ে এসেছে। ক্রুজের নিচে থেকেও বিকট যান্ত্রিক আওয়াজ ভেসে আসছে। 


এরপর বোধহয় শুরু হল আরও বেশি তাণ্ডব। এক মুহুর্ত থেমে নেই ক্রুজের দুলুনি। সমুদ্র আরও মারাত্মক। কোনও ব্রেকার নেই। শুধু ঢেউ আর ঢেউ। আর এক একটা ঢেউয়ের কী বিরাট উচ্চতা! কল্পনা করা যায় না। প্রবল অভিঘাতে ক্রুজ একবার এদিকে আর একবার ওদিকে টলছে। বার কয়েক পুরো উল্টে যেতে যেতেও রক্ষে পেল যখন তখন দিক পরিবর্তন করলেন ক্যাপ্টেন। ফিরে চললেন আবার। হ্যাভলকে। সেদিনের যাত্রা বাতিল হল। বললেন, পরদিন সকালে আবার চেষ্টা করবেন। 


ডলফিন রিসোর্টে বুকিং নেই আর। ইতিমধ্যে যারা এসেছে তারা আর আমরা এই যাত্রা বাতিলের দল মিলে মোটামুটি ভাল ভিড়। তবু একটি রিসোর্টে জায়গা হল। ফোনে ছেলের বকুনি শুনে ঘুমোতে গেলাম। কিছুতেই ঘুম এলো না। ভোরে উঠে আবার দৌড়লাম জেটিতে।


বিগত দিনের মতো অশান্ত না হলেও সেদিনও যথেষ্ট ভয়ঙ্কর সমুদ্র। আসলে ঘূর্ণিঝড় পাক খাচ্ছে যে অঞ্চলে তার মাঝে পড়েছিলাম গতকাল। হাওয়া তখন বিপরীতে বইছিল। এই বারো তেরো ঘণ্টায় তার গতিপথ সামান্য বদল হওয়ায় খানিকটা রক্ষে। তবু বেশ কয়েকবার সেই বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে ফেলল। এভাবেই দুলতে দুলতে ঘণ্টা দুয়েক পর রস আইল্যান্ডকে দেখতে পেয়ে নিশ্চিন্ত হলাম। পোর্ট ব্লেয়ার এসে গেছে!


নিল বা শহীদ দ্বীপে যেতে পারলাম না ঠিকই। কিন্তু সমুদ্র ঝড়ের যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম, তার তুলনা হয় না। সে যে কী মারাত্মক সেটা লিখে বা বলে বোঝানো যাবে না।


*****************************************


নিল আইল্যান্ড বাদে দক্ষিণ আন্দামানের মোটামুটি সবই দেখা হল। যদিও মিনি আন্দামান সহ আরও কিছু দ্বীপে যাওয়া হল না। বিশেষ অনুমতি নিয়ে যেতে হয় যেসব জায়গায় বাদ রইল সেগুলিও। 


কিন্তু এখন আর পেছনে দেখা নয়। সামনে অনেকটা বাকি। এবার চলা মধ্য আন্দামান হয়ে উত্তর পথে। এগুলিও আলাদা আলাদা দ্বীপ ছিল আগে। তবে দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রা করে পৌঁছতে হয় এরকম দ্বীপ নয়। ব্যাক ওয়াটার স্থলভাগকে আলাদা করেছে। কিছু জায়গায় ব্রিজের সাহায্যে সেই দ্বিখণ্ডিত ভূভাগকে জুড়ে দেওয়াও হয়েছে। 


মধ্য ও উত্তর আন্দামান আমার জীবনের সেরা স্মৃতির একটি হয়ে রইবে সেটা কিন্তু ওখানে পৌঁছনোর আগে বিন্দুমাত্র বুঝিনি। পোর্ট ব্লেয়ারকে কেন্দ্র করে রস, নর্থ বে, হ্যাভলক, নিল ইত্যাদি দেখে যারা ফিরে যান তারা অনেককিছুই হারান। বারাটাংয়ের লাইমস্টোন কেভ আর জারোয়া রিজার্ভও আন্দামানের সব নয়। 


বলব সে কথা। তবে একটু বিরতির পর.....



ডলফিন রিসোর্টের বিচ 








রাধানগর বিচ 






















কালাপাথর বিচ 



ডলফিন রিসোর্টের বিচ 






রাধানগর বিচ 













কালাপাথর বিচ 










হ্যাভলোকের জেটি 








ইংল্যান্ড থেকে আসা জাহাজ 




হ্যাভলক প্রবেশ 




রাধানগর বিচ 











:উত্তরপথে:

মারিয়া পাতায় সাজানো গাড়ি। অবাক চোখে দেখছিলাম। সুভাষ বলল, `বিয়ের গাড়ি। রাঁচি বিয়ে।` 


রাঁচি বিয়ে? একটু অবাক হলাম। শুধু সুভাষের মুখে নয়। অনেকের মুখেই `রাঁচি` শুনছি। সুভাষের স্ত্রী-ও রাঁচি ফ্যামিলি। 

আন্দামানের প্রায় সত্তর ভাগ মানুষ বাঙালি। বিভিন্ন সময়ে তারা আন্দামানে এসেছেন। স্বাধীনতা আন্দোলন তো বটেই, দেশভাগের সময় ১৯৪৭ সালে বা পরবর্তীতে ১৯৭২-এ বাংলাদেশ গঠনের সময় বহু বাঙালি ঠাঁই নিয়েছিলেন আন্দামানের বিভিন্ন দ্বীপে। পরবর্তীতে ভাগ্য অন্বেষণেও এসেছেন অনেকে। ভাল লাগায় থেকে গেছেন এখানেই। বাকি তিরিশ শতাংশের মধ্যে বিভিন্ন প্রদেশের মানুষরা আছেন। 

এই তিরিশ শতাংশের একটি বড় অংশ আজকের ঝাড়খণ্ড থেকে আসা মানুষরা। আমাদের আদরের ডুয়ার্স নিয়ে খুব সামান্য পড়াশোনা করেছি বলে, একটি বিষয়ে মিল খুঁজে পেলাম। ডুয়ার্সের দুর্ভেদ্য অরণ্যভূমি কেটে পরিষ্কার করবার জন্য, ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকেই কিন্তু শ্রমিকদের নিয়ে আসা হয়েছিল। ঠিক একই ভাবে আন্দামানকে বাসযোগ্য করে তুলতে কয়েদিদের পাশাপাশি সাহায্য নেওয়া হয়েছিল ঝাড়খণ্ডের সেই মানুষগুলিরই। সময়টাও ছিল মোটামুটি এক। দ্বিতীয়বারের জন্য আন্দামানে পেনাল সেটেলমেন্ট তৈরি হচ্ছে ১৮৫৮ সাল থেকে। আর ওই শতকের চল্লিশের দশকে, দার্জিলিংয়ে চা বাগান প্রতিষ্ঠা হলেও, ডুয়ার্সে চা বাগান পত্তন শুরু হয় সত্তরের দশকে। অর্থাৎ আরও বছর তিরিশেক পর থেকে। প্রশ্ন জাগছে, ডুয়ার্সে ঝাড়খণ্ডের মানুষদের শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগানোর ভাবনা কি আন্দামান থেকেই এসেছিল? 

এরকম ভাবছি কেননা আন্দামানের আদিবাসীরা যেমন জঙ্গল কাটার কাজে হাত লাগায়নি, তেমনি ডুয়ার্সেও তাই। চা-বাগানগুলিতে কিন্তু স্থানীয় মানুষেরা শ্রমিকের কাজ আজও করেন না। বাইরে থেকে নিয়ে আসা ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা বা নেপালি সম্প্রদায়ের মানুষদেরকে চা-শ্রমিক হিসেবে দেখা যায়। আন্দামানেও যেন তেমনটাই। আবার সেলুলার জেলের পরেই যে জেলটি দুর্ভেদ্য হিসেবে পরিচিত ছিল, সেটিও কিন্তু ডুয়ার্সের বক্সায়। এদিক থেকেও যেন মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম।

ঝিরকাটাংয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে বেরিয়েছি রাত আড়াইটায়। সিপ্পিঘাট হয়ে ফেরারগঞ্জ আর মাইল তিলক পার করে পৌঁছতে হয়েছে এই চেক পোস্টে। দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। সারা রাস্তাতেই হালকা বৃষ্টি পেয়েছি। কিন্তু সিপ্পিঘাটের পর থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল অসামান্য প্রাকৃতিক পরিবেশ। যদিও রাতের অন্ধকারে সেভাবে বুঝতে পারিনি। 

কিন্তু এত রাতে কেন? সোজা বাংলায় উত্তর হল, লাইনে আগে জায়গা পেতে। ঝিরকাটাংয়ের চেক পোস্টে পৌঁছে অবশ্য পেলাম সেটা। যদিও আমাদের আগে এগারোটা গাড়ি রয়েছে। 

আসলে ঝিরকাটাং থেকে শুরু হয় `জারোয়া রিজার্ভ`। সাইনবোর্ডে এই কথাটি দেখে চমকে উঠেছিলাম। টাইগার রিজার্ভ, এলিফ্যান্ট রিজার্ভ ইত্যাদি শুনেছি। কিন্তু আদিবাসী একটি সম্প্রদায়ের নামে রিজার্ভ ফরেস্ট হতে পারে কল্পনাতেও ছিল না। 

যাহোক, ঝিরকাটাং থেকে জঙ্গল পার করে, দেড় ঘন্টায়, পৌঁছতে হবে মিডল স্ট্রেটে। তবে একা চলা যাবে না। যেতে হবে কনভয়ে। একদম সামনে সবুজ পতাকা নিয়ে থাকবে পুলিশের গাড়ি। তারপর লোকাল বাস। এরপর অন্য গাড়ির সারি। একদম শেষে ট্রাক ও লাল পতাকা নিয়ে আর একটি গাড়ি। কেউ কাউকে ওভারটেক করতে পারবে না। এপার অর্থাৎ ঝিরকাটাং থেকে গাড়ির কনভয় ছাড়বে সকাল ৬, ৯, ১২ আর বিকেল ৩টায়। ওপার অর্থাৎ মিডল স্ট্রেট থেকে গাড়ি ছাড়বে ৬.৩০, ৯.৩০, ১২.৩০ ও ৩.৩০-এ। রাস্তায় দেখা হবে বিপরীতমুখী দুই কনভয়ের। কোনও জায়গায় থামার প্রশ্ন নেই। ছবি তোলা, ভিডিওগ্রাফি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ধরা পড়লে প্রচুর পরিমাণ ফাইনের সঙ্গে হাজতবাসও হতে পারে। জঙ্গলের ওপারে মিডল স্ট্রেট থেকে বিরাট ভেসেলে গাড়ি নিজেরা উঠে ব্যাক ওয়াটার পার করে নামতে হবে বারাটাংয়ে। সেখান থেকে স্পিড বোটে আমরা যাব লাইমস্টোন কেভ দেখতে। 

অধিকাংশ পর্যটক বা টুরিস্ট এর পর ফিরে আসেন পোর্ট ব্লেয়ারে। তাদের গাড়ি পার করার ব্যাপার নেই। কিন্তু আমরা আরও এগিয়ে যাব। উত্তরে। ফিরব দুই তিনদিন পর। তাই আমাদের গাড়িকেও ওপারে যেতে হবে। 

নিজেদের ব্যবস্থাপনায় যাচ্ছি বলে, আধার কার্ডের সমস্ত তথ্য দিয়ে ফর্ম ফিল আপ করতে হল। সই করতে হল নির্দিষ্ট জায়গায়। যারা লোকাল বসে যাচ্ছেন তাদের দরকার হচ্ছে না। তবে পরিচয়পত্র দেখাতে হচ্ছে আমাদের মতো বেড়াতে আসা সবাইকেই। 

ছোট্ট জায়গা ঝিরকাটাং। পাহাড়ের পাদদেশে সবুজে মোরা এই জনপদে কিছু খাবারের দোকান রয়েছে। ব্যবসার সময় মোটামুটিভাবে ভোর সাড়ে-তিন থেকে বিকেল পাঁচ/ সাড়ে-পাঁচ অবধি। তাও মাঝে মাঝে বিরতি। কেননা কোনও গাড়ি নেই। সুতরাং খাওয়ার লোকও নেই। 

যথা সময়ে কনভয় ছাড়ল। নির্দিষ্ট গতিতে চললাম আমরা। আমি একদিকে আর রীনা একদিকে সজাগ দৃষ্টি রেখেছি। সুভাষ দেখছে সামনে। যদি জারোয়াদের দেখা যায়। দেখা গেলেও থামা যাবে না। চলা অবস্থাতেই দেখতে হবে। সত্যি বলতে, আমার একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। জারোয়া মানেই কি দেখবার বস্তু? এভাবে কেন দেখতে হবে তাদের? তারা কি আমাদের দেখতে যায় এভাবে? 

আশ্বস্ত করল সুভাষ। `স্যার ওরাও আমাদের দেখে। ওদেরকে শিক্ষিত করবার, সভ্য করবার চেষ্টা তো চলছে। অনেকটা হয়েছেও। ওরা এখন আর আদিম অবস্থায় থাকে না। জামাকাপড় পরে। আর আমরা তো ওদের বস্তিতে গিয়ে দেখছি না। জঙ্গলেও ঢুকছি না। রাস্তায় যদি আসে, তবেই দেখবেন। আসবেই সে গ্যারান্টি নেই। আসলে এদের দেখলে আন্দামানের আদিবাসীদের সম্পর্কে খানিকটা ধারণা পাবেন। এটুকুই আর কি! এই যে কনভয় চলছে এটা ওদের আজকের ফার্স্ট শো। আরও তিনটে শো হবে!`

হেসে ফেলি সুভাষের কথা শুনে। অস্বস্তিও কাটে খানিকটা। চোখ রাখি জঙ্গলে। সুভাষ জঙ্গল নিয়ে বলতে শুরু করেছে। পশ্চিমবঙ্গের বাইরের প্রায় সব মানুষের মতোই ওরও ধারণা আমরা কলকাতার লোক। জঙ্গল, নদী, পাহাড় ইত্যাদি কিছু দেখিনি। জানিও না। আমাদের ডুয়ার্সের অরণ্যের ছবি, দার্জিলিংয়ে তোলা কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি, কোচবিহার রাজবাড়ির ছবি ইত্যাদি দেখিয়ে থামালাম ওকে। 

পোটাটাং চলে এলো। নামেই জনপদ। রাস্তার ধারে কোনও বাড়িঘর নেই। কেবল পাহাড়ের গায়ে জারোয়াদের কয়েকটা ঘর। পাতায় ছাওয়া সেই ঘরগুলিতে ঢুকতে হবে মাথা নিচু করে। কিন্তু ঘরগুলির সামনেও কেউ নেই। চারদিকেই ঘন জঙ্গল। পাহাড়ি পথ যেমন হয় রাস্তা তেমন। আঁকাবাঁকা। উত্তরমুখী সব গাড়ি চলছে। নির্দিষ্ট সারিতে, নির্দিষ্ট গতিতে। কোনও মানুষ নেই সারা পথে। দুই এক জায়গায় ফরেস্ট গার্ড দাঁড়িয়ে। আর এক জায়গায় ব্রিজ সারাইয়ের কাজের জন্য কয়েকজনকে দেখা গেল। কিন্তু এরা কেউই জারোয়া নয়। 

উল্টোদিক থেকে আসা কনভয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সুভাষ বলল, `একদম শেষে ট্রাক আসবে। একটু খেয়াল করবেন। অনেকসময় ট্রাকে চেপে আসে জারোয়ারা।` সেকি রে! ট্রাকে চেপে আসে কেন? খেলা। খানিকটা এসে ফিরে যায় আবার। কিন্তু ট্রাক ড্রাইভাররা নেয় কেন ওদের? জঙ্গলের, সমুদ্রের জিনিস পায় যে! মানে? এই ধরুন কোরাল বা ঝিনুক বা হরিণের মাংস অথবা টাটকা ফল। বিনিময়ে? ওই ট্রাকে চাপা আর আমাদের যা  খুব দামি তার বদলে এক বোতল মদ। 

মন খারাপ হয়ে গেল। জানি আমাদের তথাকথিত আধুনিকতা সবাইকেই গ্রাস করবে একদিন। কিন্তু তবু খারাপ লাগে! আদিবাসী সম্প্রদায়ে মাঝে মাঝে যে মহামারী দেখা যায় সেটা তো সভ্যতার দান। সকলের অগোচরে থাকা এই মানুষগুলির মধ্যে আমাদের মতো প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়েই ওঠেনি। খুব সহজেই কাবু হয়ে যায় এরা। আমাদের লোভ এদেরকে নষ্ট করছে। এরাও নষ্ট হচ্ছে। 

সুভাষের কথা মিলে গেল। একটি ট্রাকে ড্রাইভারের পাশে বসে থাকা দুইজন আর ট্রাকের ডালায় তিনজন দাঁড়িয়ে থাকা জারোয়াকে দেখতে পেলাম। খালি গা। কোমরের কাছে কাপড় জড়ানো। মুখে রং মাখা। সুগঠিত চেহারা। চকচকে কালো রং। মুখে দুর্বোধ্য আওয়াজে আমাদের কনভয়কে কিছু বলছে তারা। কনভয় এগিয়ে চলল। মিডল স্ট্রেটের কাছাকাছি পৌঁছতে আর একজনকে দেখা গেল। এর অবশ্য সারা শরীর ঢাকা আধুনিক জামাকাপড়ে। তবে মুখে রং মাখা। 

আন্দামান ভ্রমণে জারোয়াদের দেখতে পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় বিষয়। সবার এই ভাগ্য হয় না। আমরা সেদিক থেকে অবশ্যই অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। এজন্যই বলছি কেননা বারাটাং পেরিয়ে রঙ্গতের পথে আরও একটি জারোয়া রিজার্ভ পড়ে। ফেরার দিন এই দুই রিজার্ভে প্রচুর সংখ্যক জারোয়াদের দেখেছিলাম। ছিল জারোয়া নারী ও শিশুরাও। জারোয়া নারীদের সৌন্দর্য দেখে মোহিত হয়ে গেছি। কী দারুণ টানা টানা চোখ আর শারীরিক গঠন। অন্যদিকে যুবকদের সুঠাম পেটানো চেহারা রীতিমতো ঈর্ষণীয়। শিশুরা সব দেশেই সুন্দর। তাদের নগ্ন সৌন্দর্য বলছিল তারা সত্যিই অরণ্যচারী।অজন্তা-ইলোরার গুহাচিত্রের বা পাথর কুঁদে বানানো মূর্তি মতোই তাদের রূপ। নর্মান্ডিক এই আদিবাসী সম্প্রদায়ের কতজন রয়েছেন সেটি সঠিক জানা না গেলেও মনে করা হয় এদের সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি। আমরা মোট কতজনকে দেখেছিলাম? রীনা হিসেবে কষেছিল। ছাপান্ন। এরপরেও কি নিজেদের অতি সৌভাগ্যবান বলব না? 

মিডল স্ট্রেট চলে এলো। গাড়ি থেকে নেমে বার্জে উঠলাম। বাস সহ মিলে মোট ছয়টি গাড়িও পার হচ্ছে। আমাদের গাড়ির নাম্বার আসবে তিন নাম্বার ট্রিপে। সুভাষ রয়ে গেল। আমরা চললাম ওপারে। বারাটাংয়ে। 

চারদিকে সবুজ ম্যানগ্রোভ। ব্যাকওয়াটার। দুই একটা দ্বীপ। অদূরে পাহাড়। সবুজে ঢাকা। এত সবুজ দেখিনি কখনও। মাঝেমাঝে অজানা পাখির ডাক ভেসে আসছে। 

বারাটাং অন্যদের মতোই একটি দ্বীপ। এখনও পারাপার চলছে বার্জে। তবে বেশিদিন নয় আর। মিডল স্ট্রেট থেকে ব্রিজ তৈরি হচ্ছে। বারাটাং থেকে আরও উত্তরে রঙ্গত যেতে আগে আর একবার জলপথ ব্যবহার করতে হত। এখন সেখানে ব্রিজ হয়েছে। সেকথা অবশ্য পরে বলব। 

চারদিক দেখতে দেখতে বারাটাং পৌঁছে গেলাম। এই দ্বীপে প্রথম এসেছিল ছয়জন। সেই ছয়জনের বারোটি পা বা টাং (হিন্দিতে) থেকেই নাকি জায়গাটির নাম হয়েছে বারাটাং!!



ঝিরকাটাংয়ের ভোর 


 
       

  বিয়ের বাস 






জারোয়া রিজার্ভ চেক পোস্ট অফিস 


বারাটাং 






বার্জে চলছে গাড়িও 








 

বারাটাং পথে 







১০


:বারো পা, গুহা আর কাদা:

বারাটাংয়ের নীলাম্বর জেটি থেকে আমাদের স্পিড বোট যখন ছাড়ল, তখন আকাশে মেঘ আর রোদের খেলা চলছে। বারো কিমির এই জলপথে আমাদের গাইড হল অতুল। নিতান্তই বাচ্চা ছেলে। ওর কাছেই জানলাম মোট ১১৭টি বোট রয়েছে এরকম। দিনে একটি তো বটেই, পিক সিজনে তিনটে ট্রিপও হতে পারে! ভাল লাগল জেনে। এটুকু ছেলে কী সুন্দর দাযিত্ব নিয়েছে আমাদের বুড়োদের। ওর বোটের যে চালক, সেও মেরেকেটে বড়জোর পঁচিশ! 

লকডাউন উঠে যাওয়ার পর থেকে আন্দামানে টুরিস্টের সংখ্যা বেড়ে গেছে। তবে অধিকাংশই বারাটাং অবধি দেখে ফিরে যান। খুব স্বাভাবিক। সময় ও অর্থ দুটোই বাঁচে। দক্ষিণ আন্দামানও দেখে নেওয়া যায়।   

প্রত্যেকটি বোটে আটজনের বসবার ব্যবস্থা। মাথাপিছু ১০০০ টাকা ভাড়া। নিজেরাও বোট নিয়ে যাওয়া যায়। তবে ভাড়া ওই একই গুণতে হবে। হিসেবে কষলাম। কত থাকতে পারে এক একটা ট্রিপে? অতুলের নিজের পরিশ্রম, চালকের বেতন, ট্যাক্স, তেল, দেখভাল ইত্যাদি যোগ করে খরচ যদি ৬০০০ টাকাও হয়, তাহলে দিনে আসছে দুই হাজার। অর্থাৎ মাসে ষাট হাজার। এই হিসেবে সারাদিনে একটি মাত্র ট্রিপ পেলে। বেশি হলে আসবেও বেশি। 

আন্দামানে ষাট হাজার টাকা সংসার চালানোর পক্ষে মন্দ নয়। মিষ্টি জলের মাছ, আলু, স্কোয়াশ ইত্যাদির মতো কিছু জিনিস মেনল্যান্ড থেকে যায় বলে দাম একটু বেশি পড়ে। কিন্তু অন্যান্য সবজি যেমন মোচা, সজনে ডাটা, কাঁঠাল, কলা, সুপারি ইত্যাদি অফুরন্ত। নারকেলের কথা আগেই বলেছি। পোর্ট ব্লেয়ারের মতো শহরে একটু আধটু বিক্রি হলেও, অন্য কোথাও কেউ নারকেল কেনে না। এমনিই পাওয়া যায়। ধান চাষ যথেষ্ট হয়। অবশ্য সুনামিতে বহু ধানি জমি নষ্ট হয়ে গেছে। এটাও ঠিক। তবে যা আছে তাতে  ৪.৩৪ লক্ষ (২০১৯ সালের হিসেবে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের লোকসংখ্যা) লোকের জন্য দিব্যি চলে যায়। প্রতিটি শহরে বাজার একটিই।     

হিসেবে বলছে যদি বাজে খরচ না হয়, তবে স্পিড বোটের দাম উঠতে তিন-চার বছরের বেশি লাগবে না। এমনিতেই সেটেলারদের প্রত্যেকের ভাগে রয়েছে ৩০ বিঘা জমি। এই ৩০ বিঘার মধ্যে ১৫ বিঘা চাষযোগ্য। বাকি ১৫ বিঘা পাহাড় বা টিলার ওপর। ইচ্ছে করলে প্রবল পরিশ্রম করে সেখানেও চাষের কাজ করা যায়। কোনও কোনও সেটেলার অতীতে চাকরি ও জমি দুটোই পেয়েছিলেন। শুধু জমি পেয়েছিলেন যারা, তারাও কঠোর পরিশ্রমে পরবর্তী প্রজন্মকে একটি জায়গায় দাঁড় করিয়ে গেছেন। যারা আজ থেকে তিরিশ-চল্লিশ বছর আগেও গেছেন, তারাও অনেক সুবিধে পেয়েছেন। হ্যাভলকের মতো পর্যটন প্রধান দ্বীপে, অনেকে জমি বিক্রি করে পোর্ট ব্লেয়ারে চলে এসেছেন। অনেকে মেনল্যান্ডেও বাড়িঘর করেছেন। ভাগ্য অন্বেষণে গিয়ে অনেকে কোটিপতিও হয়েছেন।      

অতীতের সেই অবস্থা এখন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। তবে একটি ব্যাপারে আন্দামান একইরকম রয়েছে। এখানে কোনও অশান্তি নেই, রাজনীতির কচকচানি নেই, `আমরা ওরা`র ব্যাপার নেই। মানুষ  রাজনৈতিক নেতাদের চেনেনও না, পাত্তাও দেন না। যে কয়দিন ছিলাম, একটাও রাজনৈতিক মিছিল বা মিটিং দেখিনি। দুই একটি পার্টি অফিস দেখেছি ঠিকই, কিন্তু সেখানেও করুণাপ্রার্থীদের ভিড় নেই। যে কোনও অনুষ্ঠানে মঞ্চ আলো করে বসা সবজান্তা নেতা ও তাদের মোসাহেবদেরকেও দেখিনি। জীবন চলছে নিজস্ব গতিতে।

বারো কিমির জলপথে, স্পিড বোটে আসতে আসতে, দুদিকের দ্বীপগুলিতে ঘন সবুজ ম্যানগ্রোভ অরণ্য দেখতে পাচ্ছিলাম। সত্যি বলতে এই পরিমাণ ঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্য এর আগে দেখিনি। তবে একদিকে পাহাড়ও দেখা যাচ্ছিল। ওই দিকটি জারোয়াদের বাসভূমি। ওরা এই ব্যাকওয়াটার ধরে সমুদ্রে চলে যায় মাঝেমাঝে। সংগ্রহ করে আনে অনেককিছুই যা আমাদের মতো মানুষদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। আমাদের সামনে বা পেছনেও বেশ কিছু স্পিড বোট এসেছে। টলটলে স্বচ্ছ জলে চারদিকে সবুজ আর ওপরে নীল সাদা আকাশ নিয়ে এই যাত্রা অন্য আনন্দ দিল।    

নামলাম খাঁড়ির মধ্যে বানানো কাঠের জেটিতে। ছোট ছোট নৌকো বা বোট ছাড়া এখানে বড় কোনও জলযান ঢুকতে পারবে না। জেটি থেকে শুরু হল হাঁটা। দুই কিমির এই পথের বেশ কিছুটা জলের ওপর। কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে হেঁটে মাটি পেলাম। পুরো পথটিই ম্যানগ্রোভ, পাদুক গাছে ভর্তি। রয়েছে জংলী আমের মতো বৃক্ষও। খানিকটা পর ছোট্ট গ্রাম দেখা গেল। নয়াডেরা। ছোট্ট মানে ছোট্টই। মাত্র কয়েকটি বাড়ি। কিছু জায়গায় চাষবাস হচ্ছে। মুরগি, মোষ ইত্যাদিও দেখা গেল। বোঝা গেল সেগুলি পালিত। রাস্তা কোথাও উঁচু, এলোমেলো পাথরের মধ্যে দিয়ে। কোথাও আবার সমতল। কোথাও একজনের চলার মতো। কোথাও সামান্য প্রশস্ত। 

নয়াডেরার একদম শেষে আন্দামানের বিখ্যাত লাইমস্টোন কেভ। এরকম সুন্দর কেভ এর আগে দেখিনি। না, লাইমস্টোন কেভ দেখেছি। চেরাপুঞ্জি, মৌসিনরাম, জয়ন্তী ইত্যাদি নানা জায়গায় দেখবার সৌভাগ্য হয়েছে। কিন্তু বারাটাংয়ের লাইমস্টোন কেভের সঙ্গে তাদের তুলনা চলে না। সবচেয়ে বড় কথা হল, এই কেভ এখনও পরিবর্তিত হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনে আজ যে চেহারা রয়েছে তার, আগামীতে সেটি পাল্টে যাবে সেটা বলা বাহুল্য। 

কিন্তু লাইমস্টোন কেভ কেন তৈরি হয়? একটু বোঝার চেষ্টা করি।  বৃষ্টির জল এবং ভূগর্ভস্থ জল ফাটলের মাধ্যমে  মাটির অভ্যান্তরে প্রবেশ করে। এই প্রবেশের পর, সেই জল কার্বন-ডাইঅক্সাইড অথবা মাটির কার্বনের সংস্পর্শে এসে মৃদু অ্যাসিডে পরিণত হয়। ``জল চুনাপাথরের ফাটলগুলিতে ঢুকে গেলে শুরু হয় রাসায়নিক বিক্রিয়া। চুনাপাথর ক্যালসিয়াম বাই-কার্বনেট যৌগে রুপান্তরিত হয়। তারপর মিশে যায় বৃষ্টির জলে। ফাটলগুলি আকারে বাড়তে থাকে। তৈরি হয় চুনাপাথরের গুহা। গুহার ছাদে ঝুলতে দেখা যায় চুনাপাথরের নানা আকৃতি। ঝুলে থাকা এইসব আকৃতির নাম স্ট্যালাকটাইট। অনেক সময় গুহার ছাদ ভিজে থাকে ক্যালসিয়াম বাই-কার্বনেট মেশানো বৃষ্টির জলে। মজার ব্যাপার হল জলে মিশে থাকা ক্যালসিয়াম বাই-কার্বনেট বাতাসের সংস্পর্শে এলেই আবার চুনাপাথরে পরিণত হয়। গুহার ছাদে চুনাপাথর জমে তৈরি হয় স্ট্যালাকটাইট। চুনাপাথরের গুহা ছাড়াও আরও অনেক রকম গুহার ছাদে জল, এমন কি আগ্নেয়গিরির লাভা জমেও স্ট্যালাকটাইট তৈরি হয়। কখনও স্ট্যালাকটাইট থেকে মেঝেতে ঝরে পড়ে ফোঁটা ফোঁটা ক্যালসিয়াম বাই-কার্বনেট মেশানো জল। চুনাপাথর জমাট বাঁধে স্ট্যালাকটাইটের নীচে। সৃষ্টি হয় স্ট্যালাগমাইট। উপর থেকে নীচে নেমে আসে স্টালাকটাইট। আর স্ট্যালাগমাইট নীচ থেকে উপরের দিকে উঠে স্ট্যালাকটাইটকে ছুঁতে চায়। এক সময় দু’জনে মিলে তৈরি করে সুন্দর একটা স্তম্ভ।`` (কৃতজ্ঞতা: তরুণ রায়চৌধুরী)

বারাটাংয়ের লাইমস্টোন কেভ না দেখলে বোঝা যায় না, প্রকৃতি কী অপূর্ব সৃষ্টি উপহার দিয়েছে এখানে। কোথাও বিরাট স্তম্ভ, কোথাও গণেশের মূর্তি, কোথাও সিংহের মতো কেশর, কোথাও শিবের মতো জটাধারী ইত্যাদি নানা শিল্পকর্ম সাজিয়ে রেখেছে সে। কিছু অংশে আলো জ্বালিয়ে দেখতে হয়। কিছু অংশে প্রবেশ নিষেধ। এই বিরাট গুহার পুরোটিই অসামান্য। এই অজানা অচেনা দ্বীপে প্রায় জনমানবহীন একটি এলাকায় এভাবে লোকচক্ষুর অন্তরালে স্বয়ং ঈশ্বর ছাড়া আর কে এই সৃষ্টি কর্মে মেতে উঠবেন! অসম্ভব এই প্রাকৃতিক সৃষ্টি দেখে বিস্মিত হওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই! আমি শুধু ভাবছিলাম, কী অদ্ভুত জায়গা এই আন্দামান। প্রকৃতি সত্যিই আন্দামানকে অন্যভাবে সাজিয়েছে। এত ঐশ্বর্য ভারতের আর কোন প্রান্তে আছে?

লাইমস্টোন কেভ দেখে ফিরবার পথে টকটকে লাল পোশাক পরা এক পূর্ণবয়স্কা নারীকে দেখলাম ওই বিশাল ব্যাকওয়াটারের এক প্রান্তে, তীর ঘেঁষে, নৌকো চালাচ্ছে। সঙ্গী আরও জানা চারেক। অতুল বলল, জারোয়া নারী। 

বারাটাংয়ে আমাদের পরের গন্তব্য ছিল মাড ভলক্যানো। উইকিপিডিয়া বলছে,  A mud volcano or mud dome is a landform created by the eruption of mud or slurries, water and gases. Several geological processes may cause the formation of mud volcanoes. Mud volcanoes are not true igneous volcanoes as they do not produce lava and are not necessarily driven by magmatic activity. Mud volcanoes may range in size from merely 1 or 2 meters high and 1 or 2 meters wide, to 700 meters high and 10 kilometers wide. Smaller mud exudations are sometimes referred to as mud-pots. 

আর একটি তথ্য উল্লেখ করছি, Mud volcano is created by natural gases emitted by decaying organic matter underground. As the mud containing rock fragments of marine sediments, sandstone, red and green colored shales, quartz-calcite, pyrites is pushed upwards by the gas, it deposits and hardens above ground. These marine sediments are layered in the sedimentary rock and mobilized by large scale compression (Push) forces. the muds quietly seep to the surface through faults in the rock or may be forcefully expelled.

চিনের জিনজিয়াং প্রদেশে বেশ কিছু মাড ভলক্যানো রয়েছে। রাশিয়া, ইতালি, রোমানিয়া, ইরান, পাকিস্তান ইত্যাদি দেশেও দেখা যায় তাদের। প্রতিটি ভলক্যানোতেই যথেষ্ট পরিমাণে হাইড্রোকার্বন থাকে। ফলে  ভলক্যানোর অস্তিত্ব মানেই ভূগর্ভে হাইড্রোকার্বনের সঞ্চয়। আন্দামানে এখনও অবধি ১১টি মাড ভলক্যানোর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ৮টি রয়েছে বারাটাং ও মধ্যে আন্দামানে। বাকি তিনটি উত্তরে।

টিলা ধরে খানিকটা উঠে পাওয়া গেল মাড ভলক্যানো। জায়গাটাকে ঘিরে রাখা হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় মাটি উঠে আসছে যেভাবে প্রস্রবণ থেকে জল বেরিয়ে আসে। এ এক অদ্ভুত দৃশ্য। মাটির তোলা থেকে এভাবে কাদা বেরিয়ে আসে কল্পনাতেও ছিল না! অস্বীকার করব না, আন্দামানে আসবার আগে এই ব্যাপারটা নিয়ে খুব কিছু জানতাম না। ইচ্ছে তো হচ্ছিল বাকি যত মাড ভলক্যানো আছে, দেখি সব কয়টা! কিন্তু সাধ আর সাধ্যের মধ্যে ফারাক তো বিস্তর! 

অবাক লাগছিল একটা ব্যাপারে। ওই দিন মাড ভলক্যানোতে গেছি শুধু আমি আর রীনা। আর কেউ আসেনি। ব্যাপারটা কি পর্যটক বা টুরিস্টদের অজ্ঞতা, নাকি যারা ট্যুর কন্ডাক্ট করেন তাদের অনীহা! বোধগম্য হল না। আমাদের ড্রাইভার সুভাষও প্রথমে গাঁইগুঁই করছিল। কিন্তু ও তো আর জানে না, পড়েছে যবনের হাতে...তার ওপর সঙ্গী হল রীনা। কিচ্ছু বাদ দেবে না! 

বারাটাং শেষে উত্তরে এগিয়ে চলি। জঙ্গলে ঢাকা বেশ খানিকটা পথ। ভাঙাচোরা। পেরিয়ে গেলাম সাউথ ক্রিক আর আরাজিক। রাস্তার দু`ধারের জঙ্গলে সবুজের সমারোহে অজস্র পাখির গান শোনা যাচ্ছিল গাড়ির আওয়াজ ছাপিয়ে। খানিক বাদে পৌঁছলাম হামফ্রি স্ট্রেট ক্রিকে। বারাটাংয়ের উত্তরের শেষ জায়গা এটিই। কিছুদিন আগেও এখানকার গান্ধি ঘাট থেকে ভেসেলে ওপারে উত্তরা ঘটে যেতে হত। 

এখন নতুন ব্রিজ হয়েছে। ১.৪৫ কিমির সেই ব্রিজের নাম আজাদ হিন্দ ফৌজ ব্রিজ। সুদৃশ্য সেই ব্রিজ জুড়ে দিয়েছে রঙ্গত ও বারাটাং দ্বীপকে।  

তখনও বুঝিনি কী অসামান্য হতে চলেছে আগামী দিনগুলি। এবার দেখব একের পর এক ছোট্ট জনপদ আর একটির পর একটি বিচ। সেই বিরাট বিরাট বিচে শুধু আমি আর রীনা। আর কেউ নেই! 

সত্যিই তখনও জানিনা, নিজেকে সবুজ দ্বীপের রাজা মনে হবে!



লাইমস্টোন কেভ

































ম্যানগ্রোভের শেকড় 




লাইমস্টোন কেভের পথে 



খাঁড়ি 




জেটি 


আজাদ হিন্দ ফৌজ ব্রিজ 





















নয়াডেরা 








লাইমস্টোন কেভের পথে 






পার হচ্ছি আজাদ হিন্দ ব্রিজ 




১১

:মধ্য এলাকায়:

- আপনাদের বাড়ি কোথায় ছিল?
- আমার বাড়ি এখানেই। বাবা-ঠাকুরদা বা শ্বশুরমশাইয়ের মুখে শুনেছি বাংলাদেশ নাকি ওয়েস্ট বেঙ্গলের কোথাও ছিল একটা বাড়ি। বলতে পারব না। আমার জন্ম, বড় হয়ে ওঠা, বিয়ে সবই এই আন্দামানে। ওই সব দেশভাগের আবেগ আমাদের নেই।

প্রায় সত্তর ছুঁই ছুঁই টুটুল মণ্ডলের কথা শুনে অবাক হইনি। আন্দামানে যে বাঙালিরা একসময় উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিলেন, তাদের এখন তিন বা চার প্রজন্ম চলছে। এখানেই জন্মেছেন ও বড় হয়ে উঠেছেন যারা, তাদের কেনই বা পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশ নিয়ে টান থাকবে? খুব স্বাভাবিক। আমার বাবাকে ভিটেমাটি ছাড়তে হয়েছিল একদিন। সারা জীবন বাংলাদেশের কথা বলেছেন বা ভেবেছেন। আমার সেই টান কোথায়? আবার আমার পুত্রের কোচবিহারের জন্য যে টান থাকবে, সেটা বাংলাদেশের ময়মনসিংহের এক অখ্যাত গ্রামের জন্য থাকবে কি? আন্দামানের বাঙালিরা বরং বাংলা না বললে বোঝা যায় না, তারা বাঙালি। তাদের বাংলাতেও অজস্র হিন্দি শব্দ। তবে বাড়িতে যে বাংলা বলেন, সেই কথায় ওপার বাংলার ছাপ স্পষ্ট। 

স্বামীর অবর্তমানে টুটুল মণ্ডল ছেলে-বৌমা নিয়ে হোটেল চালাচ্ছেন কদমতলায়। আজাদ হিন্দ ব্রিজ পার করে আমরা ঢুকেছি তাঁর হোটেলে খাবার খেতে। ছেলে-বৌমা মিলে রান্না করে। দুজনেরই রান্নার হাত দুর্দান্ত। টুটুলদি ক্যাশ সামলান। ছোট্ট জায়গা হলে কী হবে, হোটেলে ভিড় বেশ ভালই। আমাদের মতো টুরিস্টদের ভরসায় অবশ্য হোটেল চলে না। পোর্ট ব্লেয়ার থেকে রঙ্গত, মায়াবন্দর বা ডিগলিপুরগামী বা ওই জায়গাগুলি থেকে পোর্ট ব্লেয়ারের বাসের প্যাসেঞ্জাররাই মূল খরিদ্দার। 

এখনও অবধি যতগুলি জনপদ পেরিয়ে এসেছি প্রতিটিই আয়তনে ছোট্ট। চারদিক ফাঁকা ফাঁকা। পশ্চিমবঙ্গের জনঘনত্ব দেখা অভ্যস্ত চোখ তাই বারবার ধাক্কা খাচ্ছিল যেন!

কদমতলা থেকে তিন নম্বর গেট দিয়ে আমরা পৌঁছব ১৫ নম্বর গেটে। অর্থাৎ আবার একটি জারোয়া রিজার্ভ। আগের সেই অরণ্যভূমির মতোই এটিও পাহাড়ের গায়ে। মোটামুটি মাঝখানে ফুলতলা নামমাত্র কয়েকটি ঘর নিয়ে একটি গ্রাম এলো। জানলাম, এখানকার বাড়িগুলিতে নাকি জারোয়ারা মাঝে মাঝে চলে আসে। এটা সেটা দিয়ে যায়। হয়ত লিপস্টিক পাউডার ইত্যাদি নিয়ে যায়। মজা লাগল শুনে। ফিরবার সময় এই জঙ্গলেই অনেককে দেখেছিলাম। সে কথা আগেই বলেছি। 

কৌশল্যা নগর থেকে বেশ খারাপ রাস্তায় কলসি, বকুলতলা ও সবরি হয়ে পৌঁছলাম রঙ্গতে। মধ্যে ও উত্তর আন্দামানকে যে তিনটি প্রশাসনিক জেলায় ভাগ করা হয়েছে রঙ্গত তার অন্যতম। সারা জেলায় লোকসংখ্যা হয়ত ৫০ হাজারের ওপরে হবে না। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে খানিকটা দূরে সমুদ্র। পাহাড়ের গায়ে কিছু বাড়িঘর রয়েছে।  রাস্তার দুই ধারে সার বাঁধা দোকানপাট। ছিমছাম জনপদ। কোলাহল নেই। সন্ধে নামলেই শহর যেন ঘুমিয়ে পড়ে। রঙ্গতে যে কটেজে ছিলাম সেটি সুদৃশ্য। রাতে খেলাম যে হোটেলে সেখানেও শ্বশুর-শাশুড়ি-বৌমা মিলে হোটেল চালাচ্ছেন। শ্বশুরমশাই আমার সঙ্গে বার তিনেক হ্যান্ডশেক করলেন কোচবিহারের লোক শুনে। মদের নেশার চাইতে গাঁজার নেশা ভাল এই বিষয়ে তাঁর মুখে অনেকটা শুনবার পর বুঝলাম ভদ্রলোক দুটোই খেয়ে আছেন। সে গল্প অন্য কোনও প্রসঙ্গে বলা যাবে না হয়!   

রঙ্গত থেকে শুরু হল আমাদের বিচ পরিক্রমা। রাস্তা এখন দারুণ। চার নম্বর জাতীয় এই সড়ক আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড নামেও পরিচিত। শহর ছেড়ে সামান্য এগিয়েই ঢুকে পড়লাম রমন বাগিচায়। বিচটি রঙ্গতের জেটির কাছে। এই জেটি থেকে সরকারি ভেসেলে লং আইল্যান্ড, হ্যাভলক, নিল, পোর্ট ব্লেয়ার ইত্যাদি প্রতিটি জায়গায় যাওয়া যায়। এখানকার বাসিন্দারা সাধারণত জলপথেই যান। কিছু জায়গায় পিচ রাস্তার বেহাল দশা, জারোয়া রিজার্ভগুলি পার করবার জন্য নির্দিষ্ট সময় পৌঁছোনো ইত্যাদি ঝক্কির চাইতে ট্রাফিকহীন অনন্ত সমুদ্রপথ অনেক ভাল। 

রমন বাগিচায় আমাদের ড্রাইভার সুভাষকে ধরলে আমরা তিনজন। পাতার ছাউনি দেওয়া গোল গোল বসবার জায়গা, নারকেল বীথি, কেয়া গাছ আর বিরাট বেলাভূমির রমন বাগিচায় জোরে কথা বলতে হচ্ছিল সমুদ্রের গর্জনের জন্য। রমন বাগিচা দেখে একটা ব্যাপার বুঝলাম। আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড ও রঙ্গতের বসতি তৈরি করা হয়েছে পাহাড় কেটে সমতল করে। কেননা রমন বাগিচায় পৌঁছতে আমাদের খানিকটা উঁচুতে উঠে, আবার নিচে নামতে হয়েছে। সমগ্র আন্দামানই মোটামুটি এরকম। পাহাড়ের মতো টিলা আর সমুদ্র। টিলা কেটে সমতল তৈরি করে সমুদ্রের ধরে বসতি গড়ে তোলো!

রমন বাগিচার পর আমকুঞ্জ বিচ। খাঁড়ির মধ্যে সমুদ্র প্রবেশ করলেও এখানকার ঢেউ পুরীর কথা মনে করিয়ে দিল। বিচের একদিক পাথুরে। অন্যদিকে বালি। এখানেও বেশ কিছু কুকুর আমাকে ঘিরে ধরল। রমন বাগিচায় পেতে রাখা ডেক চেয়ারে আধাশোয়া হয়ে ছিলাম। একটি তো রীতিমতো গায়ের ওপর উঠে বসেছিল। আমকুঞ্জেও একদল। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি। পূর্ণবয়স্ক কুকুরগুলোও আকারে ছোট। প্রথমটায় মনে হবে বাচ্চা কুকুর। কিন্তু সেটি নয়। এদের আকৃতিই ছোট! কারণ বুঝলাম না। এরা টুরিস্ট পেলে ঘিরে ধরে খাবারের লোভে। 

মানস মণ্ডলের দোকান থেকে বিস্কুট কিনে খাওয়ালাম শেষটায়। মানসদা চল্লিশ বছর আগে শ্যামনগর থেকে আন্দামানে এসে আর ফিরে যাননি। বিচের কাছেই ওঁর বাড়ি। দুই ছেলের একজন চাকরি করে। বৌমাও চাকুরে। আর এক ছেলে বাবার সঙ্গে ব্যবসা করে। তার বৌ গৃহবধূ। রীনা চলে গেল মানসদার বাড়ি দেখতে। আমি বসে বসে ডাব খেলাম। তিরিশ টাকায় যে জল পেলাম তা দিয়ে দুটো গ্লাস ভরে যাবে। সঙ্গে আবার শাঁস। খানিক বাদে দেখি রীনা মোচা, কাঁচা কলা, সজনে ডাঁটা নিয়ে হাজির। মানসদার বাড়ি থেকে সব দিয়েছে। আমার ভয়ে এঁচোড় আনেনি। যদি বলি, তবে সেটাও আনবে। চোখ পাকালাম। এসব বইতে হবে আমাকেই। মানসদা বারবার বললেন, ফেরার পথে যেন আর একবার আসি। দুর্ভাগ্য, ফেরার পথে অনেকটা দেরি হয়ে যাওয়ায় মানসদার সঙ্গে আর দেখা করতে পারিনি। 

আমকুঞ্জের পর থেকে সমুদ্র আমাদের সঙ্গী হল। একপাশে পাহাড় আর একপাশে সমুদ্র। দীর্ঘ পথ। কোথায় লাগে মুম্বাই, চেন্নাই বা পন্ডিচেরির মেরিন ড্রাইভ। এই পথে যে যায়নি সে কোনোদিন বুঝবে না পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর পথ ব্যাপারটা ঠিক কী! আর এই পুরো পথে আমরা তিনজন মাত্র। দুই একটা গাড়ি আসছে না তা নয়। আসছে। কিছু মানুষজনও দেখা যাচ্ছে কখনও। কিন্তু তাদের সংখ্যা এত কম যে মনে হচ্ছে আমরা সভ্যতার থেকে বহু দূরে চলে গেছি। এই চলতে চলতেই দেখে নিলাম মরিস ডেরা ও পঞ্চবটি। দুর্দান্ত দুটি বিচ। পঞ্চবটিতে বাচ্চাদের উপযোগী কিছু রাইড রাখা। মরিস ডেরায় বিরাট রকের ওপর বসবার ব্যবস্থা। নিচে সমুদ্র মহা গর্জনে ভেঙে পড়ছে সেই রকের গায়ে। ভয় ভয় লাগে রীতিমতো। সমুদ্রের ভেতরেও রকের ছড়াছড়ি। সব মিলে একেবারেই অন্যরকম! 

এবার ধানিনালায়। স্থানীয় ভাষায় ধানিপাত্তি নামের এক বিশেষ ধরণের ম্যানগ্রোভের নামে পরিচিতি এই বিচে, ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের ভেতর পাতা কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে প্রায় দেড় কিমি হেঁটে পৌঁছতে হল বিচে। লাইমস্টোন কেভেও এরকম হেঁটেছি। পার্থক্য হল ওখানে অনেকের সঙ্গে। এখানে শুধু আমরা। হাঁটতে হাঁটতে শুনতে পাচ্ছিলাম পাখির ডাক। মধ্যে আন্দামানে মিনিভেট,উড স্যান্ডপাইপার, অরেঞ্জ হেডেড থ্রাশ, এমারেল্ড ডাভ, আন্দামান কুকু, গোল্ডেন প্লোভার, ক্রেস্টেড ঈগল সহ আরও বহু প্রজাতির পাখি দেখা যায়।  ধানিনালা  বিচটিও অসাধারণ। মনে হল ম্যানগ্রোভের জঙ্গলে সে যেন লুকিয়ে আছে। বেশ কিছুক্ষণ বসে নিজেদের মতো সময় কাটিয়ে চলা শুরু আবার। 

পার হয়ে গেল বেটাপুর, বিল্লি গ্রাউন্ড, নিম্বু ডেরা। সামনে বাদাম নালা রেস্ট ক্যাম্প। এখন থেকে চল্লিশ কিমির পথ অত্যন্ত খারাপ। ঘন জঙ্গল আর পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে চলতে হবে এবার। রয়েছে বুনো জন্তুর ভয়ও। এই এলাকা পেরিয়ে পৌঁছব টোগাপুরে। তার খানিক পরে রাস্তা দুই ভাগ হবে। একদিকে যাবে মায়াবন্দর। অন্যদিকে ডিগলিপুর। 

আমরা দুই দিকেই যাব। আন্দামানের মধ্যাঞ্চল ছেড়ে আমাদের স্করপিও এবার প্রবেশ করল মায়াময় উত্তরে। 





























        
              
১২

: মায়ার খেলা:

`মায়াবন্দরে দ্যাখবার আছে কী স্যার! কেন শুধু শুধু সময় নষ্ট করবেন?` সুভাষের প্রশ্ন। 

ওর এই জিজ্ঞাসা খুব স্বাভাবিক। আন্দামানের পর্যটন মানচিত্রে মায়াবন্দরকে সেভাবে অনেকেই জানেন না। অথচ মধ্য ও উত্তর আন্দামানের প্রশাসনিক সদর হল  এই মায়াময় শহর বা তহশিল। জনসংখ্যা মেরেকেটে হাজার তিরিশ-পঁয়ত্রিশ। 

আন্দামানের অন্য জনপদগুলির মতোই মায়াবন্দরেরও সেটেলাররা এসেছিলেন ব্রিটিশ আমলে। বাংলাদেশ গঠিত হওয়ার পরে বেশ কিছু মানুষের স্থায়ী ঠিকানা হয় পোর্ট ব্লেয়ার থেকে ২৪২ কিমি দূরের মায়াবন্দরে। স্বাভাবিকভাবেই বাঙালি এখানে বেশি। কিন্তু আর এক সম্প্রদায়ের মানুষদের বসবাসের জন্য মায়াবন্দরের সংস্কৃতি মিশ্র এবং তাদের জন্যও মায়াবন্দর পরিচিত। এরা হলেন ক্যারেন প্রজাতির মানুষ। আজকের মায়ানমারের (অতীতের বার্মা) অন্যতম প্রাচীন জনগোষ্ঠীর এই মানুষদের খোঁজ ২০০০ বছর আগেও পাওয়া যায়। এদের সুসজ্জিত লম্বা গলার জন্য এরা আদৃত। মূলত পাহাড়ি এই জনগোষ্ঠী নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে আজ বেশ কিছু দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন। রাজনৈতিক সেই বিষয় আর বিস্তৃত উল্লেখ করছি না।  

কিন্তু এরা আন্দামানের মায়াবন্দরে কীভাবে এলেন? আসলে ১৯২৪ সালে ব্রিটিশরা আন্দামানে একটি নতুন নীতি প্রণয়ন করে। বলা হয়, দুর্ভেদ্য জঙ্গল পরিষ্কার করে কৃষিজমি তৈরি করলে বা কাঠ চেরাইয়ের কারখানায় যারা যোগ দেবে, তাদের ভাতা দেওয়া হবে। কাকতালীয়ভাবে সেই সময় রেঙ্গুনের ক্যারেন ব্যাপটিস্ট থিওলজিকাল সেমিনারির প্রধান ডঃ এইচ আই মার্শাল আমেরিকা থেকে বার্মা ফেরার পথে পোর্ট ব্লেয়ারে এসেছিলেন খুড়তুতো ভাই, আন্দামান নিকোবরের সেই সময়ের চিফ কমিশনার, লেফটেন্যান্ট কর্ণেল মাইকেল লয়েড ফেরারের (যাঁর নামে ফেরারগঞ্জ) সঙ্গে দেখা করতে। ভাই ফেরারের পরামর্শে, রেঙ্গুনে ফিরে, স্থানীয় খবরের কাগজে তিনিও বিজ্ঞাপন দিলেন। বিজ্ঞাপনে কাজ হল। রেভারেন্ড লুইগি নামের এক খ্রীষ্টান ফাদারের নেতৃত্বে ১৯২৫ সালে ১৩টি ক্যারেন পরিবার মায়াবন্দরে জঙ্গল কেটে কৃষিজমি তৈরির কাজ করতে আসে। আরও ৫০টি পরিবার আসে পরের বছর। তাদের এক বছরের রেশন ও জমি দেওয়া হয়। সেই জমি অবশ্য ছিল জঙ্গলে ভরা।    

২০০৫ সালে ক্যারেনরা ওবিসি ক্যাটেগরির মর্যাদা পেয়েছে। যদিও তাদের দাবি তপশিলি জাতির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে তাদের। ১৯২৮ সালে  রেভারেন্ড লুইগি ক্যারেনদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেও তাদের ভাষার বই পাওয়া যেত না। ২০১০ সাল থেকে খানিকটা আন্দোলন করেই তারা নিজেদের ভাষাকে সরকারি সেকেন্ডারি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অন্তুর্ভুক্ত করতে পেরেছে। মায়াবন্দর ও ডিগলিপুরের আটটি গ্রামে ছড়িয়ে থাকা এই সম্প্রদায়ের মানুষদের সংখ্যা ২০০৪ সালে ছিল ২০০০। এই মুহূর্তে তারা কত সংখ্যায় রয়েছেন সেটার প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।   

ক্যারেনদের দেখা এবং সঙ্গে সঙ্গে মায়াবন্দরের একটু স্পর্শ নেওয়াই ছিল আমার উদ্দেশ্য। জেটির দিকে যাবো না আগেই ভেবে রেখেছিলাম। কেননা সব জেটিই কমবেশি এক। জানতাম এভিস,ইন্টারভিউ আর রামপুর বিচ দেখা সম্ভব হবে না। সময় পাবো না। কিন্তু কারমাটাং বিচ দেখতেই হবে। অলিভ রিডলে আর আন্দামান গ্রীন প্রজাতির কচ্ছপদের অত্যন্ত প্রিয় এই বিচটি। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় তারা এখানে এসে ডিম দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোলে দলবল সমেত আবার চলে যায় গভীর সমুদ্রে। 

কারমাটাং যাওয়ার পথে পাওয়া গেল মায়াবন্দরের এম জি কলেজ। সরকারি এই কলেজ আন্দামানের অন্যান্য কলেজগুলির মতোই পন্ডিচেরি ইউনিভার্সিটির অধীনে। স্কুলগুলিতে বাংলা পড়ানো হয়। বাংলা মিডিয়াম রয়েছে। সিবিএসই অনুমোদিত। শিক্ষাক্ষেত্রে দিল্লি বা পন্ডিচেরির অধীনে থাকা আন্দামান নিকোবরের  বিচারক্ষেত্র কিন্তু কলকাতা হাই কোর্টের অধীন।

মায়াবন্দরের কলেজটি সমুদ্রের ধারে। হাতের বা দিকে, পশ্চিমে, সেই সমুদ্রকে রেখে এগিয়ে চললাম। ফাঁকা জায়গা। বহু দূরে দূরে এক একটা বাড়ি। খানিক আগে দেখা সুভাষের গ্রাম ধর্মপুরের মতোই। 

আমাদের ড্রাইভার সুভাষ পোর্ট ব্লেয়ারে থাকলেও বিল্লি গ্রাউন্ডের কাছে ধর্মপুরে ওর বাড়ি। নিতান্তই ছোট্ট একটি জনপদ। আসলে ওটা যে গ্রাম সেটা বোঝা যায় না। কেননা বাড়িগুলি অনেকটা দূরে দূরে, মায়াবন্দরের মতোই। চন্ডি মণ্ডপ, কালীমন্দির, শীতলাতলা, গৌড়ীয় মঠ সবই আছে কিন্তু কেমন যেন ছাড়াছাড়া। রীনা আর আমি সেই কথাই বলছিলাম। সুভাষই ব্যাপারটা পরিষ্কার করল। 

আসলে সবাই তো সেটেলার। প্রত্যেকেই ৩০ বিঘা জমি পেয়েছে। তাই প্রতিটি বাড়ির মধ্যে গ্যাপ অনেকটা। এতক্ষণে বিষয়টা মাথায় ঢুকল। ভারতের আর কোথাও তো এই ব্যাপারটা নেই। গ্রামাঞ্চলের বাড়িগুলির মধ্যে দূরত্ব থাকলেও এতটা নয়। আর শহরের কী অবস্থা সেটা বলা বাহুল্য! 

কারমাটাং পৌঁছলাম। সুন্দর সাজানো বিচটি মুহূর্তেই মন কেড়ে নিল। পরিবেশ-বান্ধব এই বিচটি ভারতের Turtle’s Paradise-এর খেতাব পেয়েছে। গাছ-বাড়ি, ছোটদের খেলবার জায়গা, ড্রেসিং রুম, আয়েশ করবার ব্যবস্থা, বিচ স্পোর্টসের সুবিধে ইত্যাদি নিয়ে কারমাটাং অনবদ্য। স্নানের জন্য রয়েছে সোনালী বালির ওপর নীল জলে অপূর্ব ঢেউ। নারকেল সহ অন্যান্য গাছ তৈরি করেছে আরণ্যক এক পরিবেশ। তবে একটি জায়গায় `কুমির থেকে সাবধান' বোর্ডও দেখলাম। এই বোর্ড আরও দেখেছি পথে। যেখানেই ব্যাকওয়াটার, সেখানেই এই সাবধানবাণী। 

কারমাটাং বিচে ক্যারেন সম্প্রদায়ের দুই তরুণীকে দেখলাম নিজেদের মতো বসে আছে। কলেজ ছাত্র চারজনের আর একটি দলকে পেলাম। খানিক আগে,  হিন্দি ফিল্মের নায়ক-নায়িকার মতো একজোড়া তরুণ-তরুণী খুব জোরে বাইক চালিয়ে আমাদের আগে আগে আসছিল। ভেবেছিলাম দেখা পাবো তাদের। কিন্তু এখন দেখছি নেই। বোঝা যাচ্ছিল কাছের ওয়েব, লখনৌ, দেওপুর ইত্যাদি ক্যারেন অধ্যুষিত কোনও গ্রাম থেকে তারা এসেছে বেড়াতে।  

কারমাটাং বিচে বসে থাকলাম অনেকক্ষণ। ছাত্রের দল আর দুই তরুণী চলে যাওয়ায় আমরাই শুধু। 

ডেক চেয়ারে বসে অসীম সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মন খারাপ হয়ে হচ্ছিল। আমাদের আন্দামান ভ্রমণ শেষ হতে চলেছে। এরপর রইল শুধু ডিগলিপুর। তারপর ফিরতে হবে পোর্ট ব্লেয়ার হয়ে নিজের জায়গায়। এই সুন্দর দ্বীপ ছেড়ে আবার সেই দৈনন্দিনতায় ফিরব ভেবে বিষণ্ণ হচ্ছিলাম। 

কিন্তু যাওয়া মানে তো শেষ পর্যন্ত ফেরা। কোনও একটা শেষ মানে শুরু আবারও। 

ঢেউ ভাঙে কারমাটাং বিচে। অনিন্দ্যসুন্দর মায়াবন্দরের মায়ায় ভেসে যেতে যেতে হারিয়ে যাই নিজের মতোই!


















 ১৩


অসাধারণ এই বিজনভূমি। পানিঘাট ব্রিজ পার হতেই প্রজাপতিরা ঝাঁকে ঝাঁকে আমাদের গাড়ি ঘিরে ধরছে। রাস্তার দু`ধারে তাদের মেলা। একসঙ্গে এত প্রজাপতি কবে দেখেছি? মনে পড়ে না। আদৌ কি দেখেছি কোনও দিন! বক্সা অরণ্যভূমির প্রজাপতিরা আমার বড্ড প্রিয়। প্রচুর সংখ্যায় তাদের দেখাও যায়। কিন্তু এত সংখ্যায়! না। কখনই নয়। বাজি ধরে বলতে পারি। 

চলছি মায়াবন্দর থেকে ডিগলিপুর। আন্দামান ভ্রমণে আমার অজানা পথের শেষ এটিই। পাহাড় আর অরণ্যে ঘেরা এই পথে সম্ভবত আজকে ডিগলিপুরে পর্যটক হিসেবে আমরাই যাচ্ছি। দক্ষিণ আন্দামানে যে ভিড় দেখেছিলাম তার একদম উল্টো এখানে। মোহনপুর আর কিশোরীনগর পার হয়ে এসেছি। সারা রাস্তাতে মাত্র এই দুটি জনপদ। তবে মূল সড়ক থেকে মাঝে মাঝে ডাইন-বাঁয়ে শাখা-প্রশাখা বেরিয়েছে। সেগুলি চলে গেছে ডিগলিপুর তহশিলের বিভিন্ন জায়গায়। 

উত্তর আন্দামানের সবচেয়ে বড় শহর ডিগলিপুর আমাদের এবারের আন্দামান ভ্রমণের শেষ জায়গা। ৮৮৪ বর্গকিমির এই অঞ্চলটির লোকসংখ্যা ৫০ হাজারের কিছু ওপরে। মৎস্য উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে ডিগলিপুর পরিচিত। এখানে মাছ ধরার বোটের রেজিস্টার্ড সংখ্যা হল ৫১৪। রয়েছে ১২০০ মৎস্য-শিকারি পরিবার। মৎস্য সংরক্ষণের জন্য আইস প্ল্যান্ট ও কোল্ড স্টোরেজও রয়েছে ডিগলিপুরে। সমুদ্রপথে মায়ানমারের দক্ষিণ তটরেখার দূরত্ব মাত্র ৩০০ কিমি। দৃশ্যমানতা পরিষ্কার থাকলে অনেক সময় নাকি রাতে মায়ানমারের এল দেখা যায় ডিগলিপুর থেকে।  

পৌঁছেছিলাম রাতে। সকালে মোখার প্রভাবে এক পশলা বৃষ্টি হল। সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। খানিক বাদেই সব পরিষ্কার। হোটেলবন্দি না থেকে বেরিয়ে পড়লাম। কাছেই দক্ষিণ কালীবাড়ি। তার থেকে খানিকটা দূরে নেতাজির মূর্তি ও পৌরসভার দপ্তর। লাগোয়া আরও কিছু অফিস। ছোট্ট ছিমছাম শহরটি একবার ঘুরে বেড়াতেই যেন শেষ হয়ে গেল। সেই অর্থে শহরে কিছু দেখবার নেই। স্বপন সুইটস আর বেকারির মালিক স্বপন দাসের সঙ্গে চা খেতে খেতে গল্প হল খানিক। সেই একই কথা। বড্ড ভাল আছেন। সকলে মিলে একসঙ্গে আছেন। পশ্চিমবঙ্গের অসহ্য রাজনীতি থেকে দূরে চলে এসে বুদ্ধিমানের কাজ করেছেন। 

কিচ্ছু বলার নেই। লেখা বাক, বলবার মুখ নেই। সত্যিই তো। যা চলছে এই রাজ্যে এই মুহূর্তে তাতে রাজ্যের বাইরে অনেকসময় বাঙালি পরিচয় দিতে লজ্জা হয়। কী ছিল রাজ্যের শিক্ষা-সংস্কৃতি, আর কোথায় তাকে নিয়ে গেলাম আমরা। যাহোক, সেই প্রসঙ্গ আলাদা। এখন চলছি এরিয়েল বে`র দিকে। মাত্র ৯ কিমি দূরে।  

এরিয়েল বে সমুদ্রের একদম পাশে। এখান থেকে রস ও স্মিথ আইল্যান্ডের বোট ছাড়ে। এই দুই দ্বীপ যমজ দ্বীপ বলেও পরিচিত। পঞ্চাশ মিটার বেলাভূমির এই দুই দ্বীপ জোয়ারের সময় সমুদ্রের জলে পৃথক হয়ে যায়। অন্য সময় এক দ্বীপ থেকে আর এক দ্বীপে যাওয়া যায় পায়ে হেঁটে। সমুদ্র দুদিকে সরে গিয়ে তৈরি করে দেয় পথ। প্রকৃতির এক অসম্ভব বিস্ময় এখানে। রস ও স্মিথকে নিয়ে বহু কিছু লেখা যায়। বর্ণনা করা যায় অনেককিছু। কিন্তু বলব না সেসব। কেননা পারব না। এই অসম্ভব দৃশ্য নিজে চোখে দেখাই ভাল। সেটাই উচিত। পৃথিবীর কোনও শব্দই বর্ণনা করতে পারবে না এই ক্যারিশমা!

রস অ্যান্ড স্মিথ বাদেও আমার নজর ছিল তুলনায় কম প্রচারিত আর একটি বিচের দিকে। বিশেষজ্ঞরা জানেন এই বিচটির অসাধারণত্ব।  অন্য বিচের বালির রং অন্য বিচগুলির মতো নয়। `ভলক্যানিক গ্রে` রং হল কালিপুর বিচের বৈশিষ্ট্য। তবে রঙের জন্য নয়। এই বিচটির পরিচয় আর একটি কারণে। মায়াবন্দরের কারমাটাং বিচের মতোই কালিপুর বিচ `Turtle Nesting`-এর জন্য বিখ্যাত। ডিগলিপুরের রামনগর আর কালিপুরের প্রসিদ্ধি তাই জগৎজোড়া। এর মধ্যে আবার কালিপুর এগিয়ে, কেননা এখানে  Olive Ridley, Leather Back, Hawksbill and Green Turtles এই চার প্রজাতির কচ্ছপ আসে যা নিঃসন্দেহে বিরল ঘটনা। সমুদ্রের জলও ভীষণ স্বচ্ছ এখানে। জোয়ার না থাকলে হেঁটে চলে যাওয়া যায় অনেকটা দূর। দেখা যায় কিছু ম্যানগ্রোভ আর খাঁড়ি। কালচে ধূসর বালিতে সাদা জলের ভেঙে পড়া আর অদূরে তাকালে নীল এবং খানিক দূরে সমুদ্রের বুকে জেগে থাকা রস ও স্মিথ আইল্যান্ড ইত্যাদি সব মিলে এক অসামান্য ল্যান্ডস্কেপ হল কালিপুর। বলতে ভুলে গেলাম, এই বিচের আর একটি বিশেষত্ব হল পেছনের সুউচ্চ পাহাড়টি!

পাহাড়? কোন পাহাড়? মেঘ খেলা করছে পাহাড়ের মাথায়! বেশ গর্বিত ভঙ্গিতে সে ছুঁয়ে আছে আকাশ। মনে হল শাসন করছে যেন সমুদ্রকে! 

চমকে উঠলাম নামটা জেনে। স্যাডল পিক! আন্দামানের সর্বোচ্চ। মনে হল সব পেয়ে গেছি যেন। এখানে রয়েছে মেহেন্দি তিরকে ভিউ পয়েন্ট। রয়েছে আন্দামানের একমাত্র নদী কালপংয়ের নামে একটা বাঁধও। আমরা অবশ্য সেসব যাচ্ছি না। তবে পাহাড়ের পাদদেশে একেবারেই টুরিস্ট না যাওয়া লামিয়া বে বিচটি অবশ্যই দেখব। জাতীয় উদ্যানের মর্যাদা পাওয়া স্যাড পিকের নিচে এই বিচ থেকে পাথুরে পথ উঠে গেছে পাহাড়ের গায়ে। ওপর থেকে খুব স্বাভাবিকভাবেই অতুলনীয় লাগবে প্যানোরামা। কিন্তু এতদিন ধরে ঘুরে বেরিয়ে আমাদের সেই শারীরিক অবস্থা ও সময় কোনোটাই আর নেই। তাছাড়াও মোখা ডিগলিপুর অঞ্চলে চোখ রাঙাচ্ছে বলে, কিছু বিধিনিষেধও রয়েছে। তবু এতদূর থেকে এসেছি জেনে পার্কের লোকেরা ঢুকতে দিল। তাদের আশ্বস্ত করলাম, পাহাড়ে উঠব না। শুধু বিচ দেখব। 

এ এক অনবদ্য বিচ। অজস্র গাছে ভর্তি। মাটির ওপর পড়ে রয়েছে আম, নারকেল। অজস্র প্রজাপতি উড়ে বেড়েছে। পাখিরা লুকিয়ে রয়েছে প্রায় প্রতিটি গাছে। তাদের কলরব সমুদ্র গর্জনকেও হার মানাচ্ছে। কালিপুরের মতো এই বিচের বালিও ভলক্যানিক গ্রে। তবে পাথরের ভাগ বেশি। খুব স্বাভাবিক। এই উত্তুঙ্গ পাহাড়ের নিচে পাথর থাকবে এটাই নিয়ম। তবে সমুদ্রের জলের অভিঘাত সেই পাথরকে ছোট নুড়ি পাথরে পরিণত করেছে। বিচে সেভাবে স্নানের জায়গা নেই। বোঝাই যাচ্ছে সমুদ্র জলের আঘাতে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পাহাড়ের পাদদেশ ক্ষয়ে ক্ষয়ে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এখন পাহাড় আর সমুদ্রের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব থাকলেও একসময় যে সেটা ছিল না তা স্পষ্ট বোঝা যায়।

লামিয়া বে`তে বসে থাকি। 

দীর্ঘ যাত্রা শেষে শরীর ক্লান্ত। কিন্তু মন প্রসন্ন, তরতাজা। সমুদ্রও সেই শান্ত মনের কদর বোঝে। তার শব্দ ক্রমশ কমে আসে যেন। 
স্যাডল পিকের গাম্ভীর্যকে মর্যাদা দিয়ে সে শুধু খেলা করে নিজের মতো আমার সামনে.....

এক পরিভ্রমণ শেষ হয় আমার। 

শেষ কি হয় আদৌ? নাকি এক অজানা বৃত্তপথে আমরা কেবল ঘুরেই চলি সারা জীবন!!
























































































































      
     

















 


 






 








No comments: